01 Jan

সামাজিক দায় নয়, লেখক চান পাঠককে ছুঁতে – মৃদুল দাশগুপ্ত

লিখেছেন:সাক্ষাৎকার/মৃদুল দাশগুপ্ত


 

 

[ কবি হিসেবে দুই বাংলায় বিখ্যাত মৃদুল দাশগুপ্ত। কিন্তু কবিতার পাশাপাশি তিনি যে গল্পও লেখেন তা হয়ত বহু পাঠকেরই আজানা।  একান্ত একটি আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তাঁর গল্প ও গল্প রচনা বিষয়ে নানা তথ্য। আলাপন বিভাগে গল্পের সময়ের হয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন চিন্ময় ভট্টাচার্য এবং সমীর ঘোষ। ]

 

গল্পের সময় – আপনি এই সময়ের খ্যাতিমান এবং শক্তিমান কবি। কিছুটা ঘোষণা করেই নির্দিষ্ট আটটি   গল্প   লিখেছেন।আর গল্প লিখবেন না এমন ঘোষণাও করেছেন। হঠাৎ কেন গল্প লেখার সিদ্ধান্ত?

মৃদুল দাশগুপ্ত – আমি আটটা গল্প লিখেছি, বা আটের থেকে একটু বেশি লিখেছি, ১০-১২ টা গল্প লিখেছি। তার থেকে আটটা গল্প বেছে নিয়ে একটা বই করবার আমার পরিকল্পনা আছে। তা এই ১০-১২ টা গল্প হঠাৎ করে আমি লিখিনি। ১০-১২ টা গল্প লিখতে আমার মোটামুটি বছর ২০ বা তার বেশি সময় লেগেছে। মানে আমি সবগুলোই লিখেছি কোনও না কোনও পত্রিকা,  গল্প ছাপতে চায় এমন কাগজে – বন্ধুবান্ধবদের আমন্ত্রণে বা পরামর্শে। সেগুলো গত ২০-২৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে ঘটেছে।

১৯৬৫ সাল নাগাদ, যখন ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়- সে সময় আমি স্কুলে পড়ি। সে সময় স্কুল ম্যাগাজিনে আমার একটা গল্প ছাপা হয়। তার মধ্যে দেশপ্রেম, দেশাত্মবোধ ইত্যাদি ব্যাপার ছিল। অন্যদিকে এই ৬৫-৬৭ সাল নাগাদ আমি কবিতা লেখা শুরু করি। বা কবিতা লেখার একটা ঘোর আমার লাগতে শুরু করে। কিন্তু ঘটনাচক্রে আমার প্রথম বই (পুস্তিকা) গল্পের। সেটির নাম ‘আমি আর পিপি’।  ৭৪ বা ৭৫ সাল নাগাদ শেওড়াফুলির একটা কাগজ থেকে প্রকাশিত হয়। এতে তিনটে গল্প ছিল। ১৯৮০ সালে আমার প্রথম কবিতার বই ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ আমি হঠাৎ করে গল্প লিখতে শুরু করেছি এমনটা নয়। গল্প আমার ভেতরে আছে, কিন্তু আমি সত্যি বলতে কি গল্প লিখতে চাই না। গল্প লেখাটা আমার কাজ বা গল্প লেখার একটা দায়িত্ব আছে, এমন বোধ আমার মধ্যে কাজ করে না। আমি যে আটটি গল্প নিয়ে বই করব ঠিক করেছি তার অষ্টম গল্পটি এবছর ‘গল্পপত্র’ শারদ পত্রিকায় লিখে ফেলেছি। কিন্তু সেই গল্পটি আমার অষ্টম গল্প হিসাবে বইয়ে থাকবে কিনা তা নিয়ে দোটানায় আছি। ফলে অষ্টম গল্পের জায়গায় আমায় আরও একটি গল্প লিখতে হবে। আমি যে আটটা গল্পের কথা বলেছি তা হল  পছন্দের আটটা গল্প। আমার লেখা ১২-১৪টা গল্পের মধ্যে থেকে গোটা ছ’য়েক বাদ দিয়ে এই আটটা গল্পের বাছাই করব। তবে যেদিন আমি বাছাই আটের আট নম্বর গল্পটি লিখে ফেলতে পারব, সেই দিনই একটি সংকলনের কথা ভাবব।

গল্পের সময় -এই নির্দিষ্ট আটের মধ্যে কোনও রহস্য আছে কী? আপনার তো এখনও দীর্ঘ সময় লিখে চলার কথা।

মৃদুল দাশগুপ্ত – পছন্দের আট নম্বর গল্পটি লেখা হয়ে গেলে আর লিখব না। নির্দিষ্ট সাতটি গল্প আমি লিখে ফেলেছি, অষ্টম গল্পও আমার লেখা হয়ে গেছে, কিন্তু একটু দোটানায় আছি। পছন্দের অষ্টম হয়ে গেলে আমি আর গল্প লিখব না।

গল্পের সময়  – সে গল্প কবে লেখা হবে তা নিয়ে কোনও সময়সীমা ভেবে রাখা আছে?

মৃদুল দাশগুপ্ত – এ বিষয়ে আমার কোনও তাড়াহুড়ো নেই। গল্পটা আমার যখন লেখা হবে তখন আমি সিদ্ধান্ত নেব যে আর লেখার দরকার নেই।

গল্পের সময় – আপনি তো কবিতার মধ্যেই বাস করেন। কবিতায় যা বলা যায় না, তা গল্পে বলবেন বলেই কি আপনি গল্প লিখলেন?

মৃদুল দাশগুপ্ত  – আমি এতে একদম বিশ্বাস করি না।আমি মনে করি কবিতা এমন একটা জিনিস যা দিয়ে সব কিছু বলা  যায়। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্যে আমি কবিতা লেখা এবং চিত্র শিল্পকে – মানে এই দুই শিল্প দিয়ে সব বলা যায় বলে মনে করি। কবিতায় লিখতে পারছি না, সে জন্য আমি গল্প লিখছি এমন কোনও আক্ষেপ আমার নেই।

গল্পের সময় –  আপনি  বললেন যে কবিতা এমন একটা জিনিস যা দিয়ে সমস্ত কিছু বলা যায়…

মৃদুল দাশগুপ্ত –   এটা আমি মনে করি। এটা যে সবাই মনে করবেন এমন কথা নেই। কোনও চিত্রশিল্পী হয়তো বলবেন যে কবিতার  থেকেও আমরা ছবি এঁকে অধিক বলতে পারি – সেটা হতে পারে। আবার আমি এইরকম দেখছি, ৬০ দশকের এক কবি, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তিনি মনে করেন কবিতায় যা বলতে চেয়েছেন তা পারছেন না বলে তিনি সিনেমা তৈরি করেছেন। এটা তাঁর মত।

গল্পের সময় –    আমরা খেয়াল করলাম যে আপনি বলছেন ‘আমায় গল্প লিখতে হবে’। এই যে গল্প লিখবেন, এরকম একটা সিদ্ধান্ত আপনি নিয়েছেন এক্ষেত্রে – গল্প এলে লিখেছেন নাকি গল্প লিখতে হবে বলে লিখেছেন?

গল্পের সময় –    আপনি বলেন যে আপনার কবিতা আকাশ থেকে নামে – গল্পও কী তাই?

মৃদুল দাশগুপ্ত –  সত্যি বলতে আমি মনে করি কবিতা আকাশ থেকে নামে এবং আকাশ থেকে নামার যে পদ্ধতিগত বিষয়গুলো, সেগুলো আমার ভিতরে ঢুকে গেছে। কবিতার ঘোর কী জিনিস, কবিতা কী ভাবে আসছে আমার ভিতরে তা আমার প্র্যাকটিস আছে। আমি এটা খেয়াল করে দেখেছি যে আমি বানিয়ে গল্প লিখতে পারি না। এর অর্থ, বিষয়টা আমার শরীরের ভিতরে কাজ করে। আমি সেভাবে কবিতা লেখার চেষ্টা করি, তবে আমার মনে হয় গল্পের ভেতর যে গাঢ়, ঘন, অন্তর্নিহিত ব্যাপার থাকে তা শূন্য থেকে আসে। তা কোনও বিষয়, বিবেচনা, যুক্তি বা সংগঠিত ব্যাপার থেকে আসে না। অর্থাৎ তা তৈরি হয় না, ফুটে ওঠে।

গল্পের সময় –    আপনার আটটা গল্পের ভেতর দিয়ে সমাজকে কী কোনও বার্তা দিতে চান, নাকি সে রকম কোনও দায় আপনি নিতে চান না।

মৃদুল দাশগুপ্ত  –  আমি মনে করি না যারা নানারকম কিছু সৃষ্টি করেছেন তারা সমাজকে কোনও বার্তা দিতে পারঙ্গম বা সক্ষম। অন্যদিকে, সমাজকেও কোনও বার্তা দেওয়ার বাসনা থাকতে পারে বলে আমার মনে হয় না। একজন লেখক, কবি বা অন্য কেউ – যারা মৌলিক সৃষ্টি করেন তারা যে সব সৃষ্টি করেছেন তা সমাজকে কোনও বার্তা দেওয়ার জন্য নয়। শিল্পের অনুরণন আছে, শিল্পের একটা সৌন্দর্য আছে। সুন্দর শিল্প সৃষ্টি মানুষের উপর, এমনকী জীব জগতের উপর প্রভাব ফেলে। এমতাবস্থায় শিল্প সৃষ্টিকারীদের কোনও সামাজিক দায় আছে বলে আমার মনে হয় না। আমারও কোনও সামাজিক দায় আছে বলে আমি মনে করি না। আসলে লেখক কী চায়? সে চায় পাঠককে স্পর্শ করতে। সে চায় পাঠকও যেন তাকে স্পর্শ করতে পারে। ভেতরের ওই ক্ষীণ, গোপন বাসনা নিয়েই একজন লেখক কাজ করে যান। পাঠক যেমন সমকালে আছেন, তেমন আগামীকালেও থাকতে পারেন। সুদূরতম পাঠকটিকে স্পর্শ করতে পারাই একজন লেখকের কাজ। সেটাই একজন কবির কাজ বা দায়বোধ বলে আমার মনে হয়।

গল্পের সময় – এখানে কিন্তু একটা দায়বোধের কথা চলে আসছে। তা হল পাঠকের কাছে দায়বোধ। একটা লেখা যখন লেখা হচ্ছে তখন সেই দায়বোধের কথাটা কি মাথায় থাকছে। নাকি শিল্পীর নিজস্ব বোধেই এগিয়ে চলছে। পাশাপাশি আপনি একটা আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার কথা বলেছেন। সেক্ষেত্রে কী ব্যর্থতার ভয় ও থাকে? আমি গল্প লিখছি, আমি পাঠককে ছুঁতে পারব কি পারব না। নাকি গল্পে যে ভাব চলে এসেছে সেটাই লেখাকে চালিয়ে নিয়ে যাবে?

মৃদুল দাশগুপ্ত – না ঠিক এই বোধটা থাকে না। আমি পাঠককে ছুঁতে পারিনা, মানে আমি লিখতে পারছি না। বিষয়টা এমন নয়। বরং অভিমান আসতে পারে যে, আমি লিখছি, তা পাঠক নিতে পারছেন না। আমি ছুঁতে পারছি না তাহলে আমি লিখব কেন? আমি যদি মনে করি আমি লিখতে পারছি না তাহলে আমি থেমে যাব। আমার লেখা উচিত নয়। বিনয় মজুমদারের একটা কবিতা আছে, তিনি নারীদের উদ্দেশ্যে লিখেছেন ভালবাসা দিতে পারি, তোমরা কী গ্রহণে সক্ষম। তার মতোই এখানে আমি দিতে চাইছি, আমি দিচ্ছি, তুমি গ্রহণ করতে পারছ না। তুমি অন্য কিছুতে মেতে আছ। অভিমান। ভাবনায় থাকে… আমি এটা লিখলাম, কেউ কিছু বলল না। এটা তো সর্বদা বোধ হয়। যারা ভালো কবি, অনেকেই তারা জনপ্রিয় নন। এরকমটা আমাদের সময়েও ঘটে গেছে, এই সময়েও আছেন। কিন্তু সেইসব লেখা আয়ুপ্রাপ্ত, সেইসব লেখা সুদুরগামী সেটাও একটা আশার কথা। সেটাও একটা স্বপ্নের কথা, সেটাও একটা ভবিষ্যতের কথা।

গল্পের সময়  – আজকের দিনে মানুষের হাতে সময় কম। মানুষ লাইব্রেরি যায় না। আপনার কি মনে মানুষের গল্প বা উপন্যাস পড়ার প্রবণতা বা ইচ্ছে কমে গেছে?

মৃদুল দাশগুপ্ত – এ বিষয়টা নিয়ে আমি খুব একটা ভাবিত নই। আমাদের ছোটবেলায়, আমাদের কম বয়সে এইসব প্রযুক্তিবাহিত বিনোদনের উপকরণ ছিল না। আজকের টিভি ইত্যাদি বই পড়ার মনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা আমদের মা, মাসি,পিসিদের পাঠাভ্যাসের কারণে ছোটবেলায় তারাশংকর, বিভূতিভূষণের মতো ক্লাসিক পড়ে ফেলেছি । বাবা অফিস লাইব্রেরি থেকে বই এনে দিত। সে সব দুপুর ছিল সিরিয়াল হীন। পাঠক-পাঠিকা ছিল। পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি ছিল। আজকে সেগুলো আর নেই। এখন টিভি আছে, ট্যুইটার আছে, ফেসবুক আছে। পাঠক শ্রেণির পড়ার মন চলে গেছে। ত বলে সাহিত্য তো শেষ হয়ে যায় নি। তবে যাকে বলে সাহিত্যের পাঠক – তাঁরা চিরকালই সংখ্যালঘু। এযুগেও সেরকম পাঠক আছেন। আমার মনে হয় সমস্যা সেরকম নয় । যাদের কাছে বই পৌঁছোনো দরকার, তাদের কাছে ঠিকই যাচ্ছে। যেমন ভাস্কর চক্রবর্তী, আজ তরুণ প্রজন্মের কাছে তার কবিতার চর্চা আরও বেড়ে গেছে। তিনি আরও গৃহীত হয়েছেন। জীবিতকালে সেভাবে সম্মান পাননি।

গল্পের সময়  – এই প্রজন্ম গল্প-উপন্যাস পড়ছে না, টিভি সিরিয়াল দেখছে। কোনও কল্পনার জগৎ নেই তার কাছে। এতে কী সামাজিক অবক্ষয় হচ্ছে বা হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

মৃদুল দাশগুপ্ত – বাঙালি সাহিত্য পড়ছে না। এটা একটা অবক্ষয় ঘটেছে, এটা সর্বক্ষেত্রেই ঘটেছে বলে আমি মনে করি। সংবাদপত্র অফিসে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, সাহিত্যক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের জানা-বোঝার জায়গাটা কম। অনেক বিষয়ে তাদের কৌতূহল নেই বা তাদের প্রয়োজনে পড়ছে না।  আমি ব্যাঙ্কে চাকরি করি, আমার তারাশংকরকে দিয়ে কী দরকার। ৩২ বছর বয়সে বন্ধুদলে আমি যদি ‘ঢোড়াই চরিত মানস’ পড়িনি বলতাম তাহলে অপমানিত হতাম। আজ আর সে পরিস্থিতি নেই।

গল্পের সময়  – কবিতার ক্ষেত্রে আপনি বললেন একটা লাইন নেমে আসে, গল্পের ক্ষেত্রেও কী তেমনটা  হয়? একটা লাইন আসে না প্লট হিসেবে আসে?

মৃদুল দাশগুপ্ত – অনেক সময় অনেক রকম ভাবে আসে, যেমন ‘মানসের বোন’ নামে যে গল্পটা লিখেছি সেটা একদিন আমি যখন সেক্টর ফাইভে কলেজ মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম তখন হঠাৎ দেখা একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে। কবিতার একটি লাইন আসে, তারপর গোটা কবিতা লিখে ফেলা হয়, সেটা একটা পদ্ধতি। কবিতা নানা জনের কাছে নানারকম ভাবে আসে, এইটা নিয়ে শিলং-এ নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর সঙ্গে আমাদের কয়েকজনের বেশ দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। গল্প লেখার ক্ষেত্রে নানা রকম বিদ্যুৎ ঝলক কাজ করে বা দৃশ্য কাজ করে। ভুলে যাওয়া একটা ঘটনা হঠাৎ ভেসে উঠে গল্প লেখার বিস্তার ঘটিয়ে দিতে পারে।

গল্পের সময়  – আমাদের এতটা সময় দেওয়ার জন্য ‘গল্পের সময়ের’ পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

মৃদুল দাশগুপ্ত – ধন্যবাদ।

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ