05 Feb

জুঁইফুল পনের বছর

লিখেছেন:কণা বসু মিশ্র


আকাশে প্লেন ওড়া দেখলেই মনে পড়ে তোমায়। সময় বদলে যায়। মানসিকতার পটটাও। একটা দূরত্বের বলয় তৈরি করে। একরাশ জুঁইফুল পনের বছর বয়সটার ছবি আঁকে। সেই আমার পনের বছর, সেই আমার ভালবাসার আকাশ। কুঁড়ির মধ্যে যৌবনের কান্নাটা যেন ধাক্কা মারতে থাকে। যদিও এখন সবই ফসিল। তবু এরোপ্লেনের শব্দটা অনেকবছর আগের পাতা উল্টেযায়।

চিঠি লিখতে বসেছি তোমায়। কি বলে সম্বোধন করব’ বলত ? ‘ডিয়ারেস্ট’ ? তুমি আমায় ‘সুইটহানি’ বলে সম্বোধন করতে। মনে পড়ে ‘স’ ? তোমার নামের প্রথম অক্ষরটি অনেকদিন পর ব্যবহার করছি। ফিকে মলাটের মত প্যাডের পুরনো পাতাগুলো মনের গভীরে দাগ কেটে কবেকার পুরনো ‘আমিকে’ ফিরিয়ে দিতে চাইছে।

ছোটবেলা থেকেই এরোপ্লেন নিয়ে খেলাটা ছিল আমার একটা নেশা। কাগজের প্লেন বানিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেবার প্রচেষ্টাটা থেকেই যেত’। তারপর ডানা ছেঁড়া পাখীর মত সেই কাগুজে এরোপ্লেন মাটিতে আছড়ে পড়লে প্রচুর দুঃখ হত। ‘স’ ! পনের বছর বয়সের আবিষ্কার তুমি। এসেছিলে জন্মদিনে ‘কেক’ নিয়ে। কেকটা ছিল একটা বিশাল প্লেন। তুমি তখন পঁচিশের যুবক।

মনে পড়ে সেই নদীটার কথা ? বর্ষায় পাড় ভাঙছে ক্ষ্যাপা নদীর ঢেউ। তুমি বললে, আমায় কোনদিন ভুলবে না বল?

ভুলব না। ভুলব না। ভুলব না। প্রমিস ? প্রমিস।

তবু ভুলে গিয়েছি। ভালবাসার কারিগর মন এক জায়গায় তো থেমে থাকে না। সে বার বার ঘাট বদলায়। একঘাট থেকে আরেকঘাটে। এক নৌকো থেকে আরেক নৌকোয়। কখনও হিসেবী মহাজনের খাতায় কখনও গানের জলসায়, কখনও ‘সিন্‌বাদ দ্য সেলার’ নাবিকের মত সে শুধু চলমান সমুদ্রের ঢেউ গোনে।

নীল আকাশের গায়ে পেঁজা তুলোর মত মেঘ। তার ভেতর দাগ কেটে কেটে চলে যায় মিক্‌ বিমান, স্যাবারজেট্‌…। তুমি তো ছিলে এয়ারফোর্সের পাইলট। ওই প্লেনগুলোই তো চালাতে তুমি। দু বিনুনী ঝুলোন স্কার্ট পরা মেয়েটা অবাক হ’য়ে দেখত তোমায়। হাত বাড়িয়ে দিতে তুমি। যে বলিষ্ঠ হাতের কব্জিতে ছিল দুর্জয় সাহস। বাতাসে যখন ছিল প্রচুর অক্সিজেন। আমার সেই কৈশোর – যৌবনের সন্ধিক্ষণ তোমার হাতটা ধরতে গিয়েও পারেনি। ‘বাবাতঙ্ক’ ব্যাধিতে। স্কলার বাবা চাইতেন, ‘টু ফলো নলেজ লাইক্‌ আ সিনকিং স্টার’…। ছেলেদের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব কি ?

 

বুকের মধ্যে জলভরা মেঘ। কখনও অভিমানের নদী। তবু কেন বিদ্রোহ ছিল না বাবার বিরুদ্ধে ? ঢালু রাস্তার চড়াই ভেঙে যে সাইকেল ছুটিয়ে যেত। কখনও সার্ট, প্যান্টপরা সেই দুষ্টু মেয়েটা দুর্দান্ত খেলোয়াড়ের মত ফুটবলে মারত লাথি। মেয়ে হ’য়ে জন্মানোর পরাধীনতাকে অস্বীকার করতে চাইত। সেই তখনও পারেনি। বাবার কড়া শাসনের ভয়ে শামুকের খোলের মধ্যে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। কিন্তু রাত্তিরে চোখের জলে ভিজে যেত বালিশ। বুকের মধ্যে আছড়ে পড়ত একটা কান্নার দলা। সেই তাজা বয়সটা স্বপ্নের মধ্যে খুঁজে পেত তোমায়। ঘুঘু ডাকা দুপুরে কোনও নির্জন রাস্তার চড়াই ভেঙে পাহাড়ের পথে, কখনও বৃষ্টির বিকেলে। গেটের পাশে বকুল গাছটার নীচে দাঁড়িয়ে, যখন ঝুর ঝুর করে বকুলফুল পড়ত। চুইয়ে চুইয়ে জল পড়ত গাছের পাতা থেকে। সেদিনও ছিল দুর্যোগ। কালো মেঘে ছেয়েছিল আকাশ। বিকেলটা রাত হয়ে গেল। আকাশের গায়ে ফালা বিদ্যুৎ। কড় কড় শব্দ। কোথাও বাজ পড়ল। হঠাৎ তুমি এসে হাজির, তোমার স্কুটার নিয়ে। ইচ্ছে হ’ল তোমার কোমরটা জড়িয়ে স্কুটারের ক্যারিয়ারে বসতে। কিন্তু স্বপ্নের মধ্যেও কেন সাহস নেই ?

ইস ! আজ যদি ফিরে পেতাম সেই পনের বছর বয়সটাকে ? সেই টগবগে প্রাণচঞ্চল মেয়েটি তার বাবাকে টা টা করে নিশ্চয় বেপরোয়া ভঙ্গিতে চেপে বসত তোমার স্কুটারে। দুনিয়াকে থোড়াই পরোয়া। সে চলে যেত তার প্রেমিকের সাথে।

এখনও তোমায় ভুলিনি কেন বলত ? আসলে মনের ভেতর মন থাকে। কল্পনার মধ্যে আকাশ। সেই আকাশের ব্যাপ্তি বাস্তব আকাশের চেয়েও বড় হ’য়ে যায়। যখন ভালবাসার লোনাজলের স্বাদে চোখের পাতা ভিজে ওঠে, তখন আকাশটা হাত বাড়িয়ে বলে, আমি আছি, আমি থাকব।

‘স’ কাকে আর প্রেমপত্র লিখছি ? সেই পনের বছর বয়সের বিলাপ ? বিমান দুর্ঘটনায় অনেকদিন আগেই তো তোমার মৃত্যু হ’য়ে গেছে।

প্ল্যানচেটে কিন্তু এসেছিল একবার। মনে পড়ে ?

 

বইমেলা(২০০৫),সইসাবুদে প্রকাশিত। লেখকের অনুমতিতে গল্পের সময়ে  প্রকাশিত হল

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ