09 Mar

লেখা আসে নিঃসঙ্গতার গর্ভ থেকে – মনোজ দাস

লিখেছেন:মনোজ দাসের সাক্ষাৎকার


  [ ভারতীয় সাহিত্যের বিশিষ্ট ছোটোগল্পকার, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক মনোজ দাস। মনোজ দাস ওড়িয়া ও ইংরাজি মিলিয়ে আশিটির ওপর বই লিখেছেন। সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তির তালিকাও দীর্ঘ। ঝুলিতে রয়েছে সাহিত্য আকাদেমি, সরস্বতী সম্মান, উৎকলরত্ন, ডি.লিট,  শ্রীঅরবিন্দ পুরস্কার। সাহিত্য আকাদেমি তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘ফেলো অব দি আকাদেমি’ অর্পণ করেছেন মনোজ দাসকে। অশীতিপর এই সাহিত্যিকের এই সাক্ষাৎকারটি গৃহীত হয় ২০০৮ সালে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন  কবি ও লেখক স্বপন কে. ব্যানার্জি। সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৮ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারি ‘সানডে হেরাল্ড’ পত্রিকায় ‘আর্টিকুলেশান’ বিভাগে। ‘গল্পের সময়’-এর পাঠকদের কথা ভেবে এবং বাঙালি পাঠকদের কথা মনে রেখে লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন দেবাশিস মজুমদার।] 

মুলক রাজ আনন্দ একবার আমাকে বলেছিলেন যে কোনও প্রতিভাবান লেখকের কাজকে সঠিকভাবে বুঝতে একজনের অবশ্যই তার (স্রষ্টা’র) বাসভূমি থেকে ঘুরে আসা উচিত। যখন আমি পণ্ডিচেরিতে পদ্মশ্রী মনোজ দাসের সঙ্গে দেখা করতে যাই তখন আমি বুঝতে পেরেছিলাম সমুদ্রের মনমরা ধ্যানমগ্ন মেজাজ, অরবিন্দ আশ্রম আর অরোভিলের স্তব্ধতা কেমনভাবে তাঁর বেশিরভাগ গল্পের আত্মা হয়ে উঠে তাদের একটা অতীন্দ্রিয় আত্মিক সত্তায় ঋণী করেছে। গোলকুণ্ডা গেস্ট হাউসের ঠিক বিপরীতের বাড়িটাই এই গল্পলেখকের নিভৃত আবাস। মনোজ দাস আর কখনও ছোটগল্প লিখবেন না। তিনি সেই দর্শনের মানুষ যিনি বিশ্বাস করেন যে একটি ছোটোগল্পের অবশ্যই অনুপ্রেরণার কাহিনী হওয়া উচিত। তা কখনই নির্মিত বা কল্পিত কাহিনী হওয়া উচিত নয়। এই সামান্য প্রেরণাই তাঁর একশ’র বেশী ‘অন্যরকম’-এর গল্পের মধ্যে পড়েছে। তিনি এমন একটি প্রেরণার মধ্যে আছেন যা তাঁকে স্বতন্ত্র ধারার সৃষ্টিতে  চালিত করছে – স্বপন কে. ব্যানার্জি। 

স্বপন কে ব্যানার্জি – লেখালিখি কি সবসময় নিঃসঙ্গতা বা একাকিত্বের ভেতরের দিক থেকে বেরিয়ে আসে?
মনোজ দাস –  অবশ্যই। আইডিয়াটা কারোর মধ্যে যে কোনও সময় আসতে পারে। একটি কোলাহলের আবহাওয়ায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও একধরনের ধ্যানমগ্ন একাকিত্ব কারোর মধ্যে তৈরি হতে পারে। কিন্তু এটিকে একটি সৃষ্টিশীল সাহিত্যখণ্ডের আকার দিতে হলে বা অন্যরকমভাবে বললে আইডিয়াকে ব্যক্ত করতে হলে  আপনার প্রয়োজন নিঃসঙ্গ একাকিত্ব। একাকিত্ব না থাকলে এটি অপরিণত ভাবনা হিসাবেই থেকে যাবে। মূল ভাবনার অন্তরাত্মাটিকে  অনুভব করতে পারবে  কেবলমাত্র তখনই যখন একজন একাকিত্বের সান্নিধ্যে আসবে আর নিঃসঙ্গতা তাকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে। নিঃসঙ্গতা বলতে আমি শুধু শারীরিক নিঃসঙ্গতার কথা বোঝাতে চাইছি না, একটি জনসমারোহের মধ্যেও একজন একাকী হয়ে যেতে পারে বা থাকতে পারে।  এটি হওয়ার শর্ত একটাই, তা হল– তার মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা কাজ করছে। কিন্তু যোগীর আত্মমগ্নতা তাকে চালনা করছে।

স্বপন কে ব্যানার্জি – আপনার কবিতার প্রসঙ্গে আসছি। আপনি কি কবিতা একেবারেই লিখছেন না ?
মনোজ দাস – আমি আমার কোনও কবিতাই ইংরাজিতে লিখিনি। আমি এখনও সেই রক্ষণশীল মতে বিশ্বাসী যে কেউ তার নিজের মাতৃভাষাতেই সবথেকে ভাল কবিতাটা লিখতে পারে। শ্রী অরবিন্দর ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম রয়েছে। তার মাতৃভাষা ছিল সম্পূর্ণভাবেই ইংরাজি যদিও তার মা কখনই ইংরাজিতে কথা বলতেন না। ভারতে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত তিনি ইংরাজি ছাড়া অন্য কোনও ভাষাও শেখেন নি… ইংরাজিতে মহাকাব্যিক কবিতা সাবিত্রী লিখেছেন। ভারতে ফিরে এসে প্রায় একপ্রকার জেদের বশেই তিনি সংস্কৃত, বাংলা আর অন্যান্য কিছু ভারতীয় ভাষা শিখে ফেলেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন স্বতন্ত্র স্রষ্টা, স্বতন্ত্র চরিত্রের মানুষ। অন্য মানুষদের মতন তিনিও বিশ্বাস করতেন যে সবচেয়ে ভাল কবিতা মাতৃভাষাতেই আসতে পারে। মাতৃভাষাই সেই ভাষা যা মানুষের অবচেতনের ভাষা। ঐ ভাষা এমন যার মাধ্যমে আপনি ঈর্ষা করেন, স্বপ্ন দেখেন। আমি দীর্ঘ বিরতির পর কবিতা লিখেছিলাম। সেগুলির তিনটি কালেকশান আছে।

স্বপন কে ব্যানার্জি -সেক্ষেত্রে আপনি কেমনভাবে জে. পি. দাস আর জয়ন্ত মহাপাত্রকে বিচার করবেন? তারা দুজনেই ইংরাজীতে কবিতা লিখছেন।
মনোজ দাস – জে. পি. দাস একসঙ্গে ওড়িয়া আর ইংরাজিতে লিখেছেন। জয়ন্ত কেবলমাত্র ইংরাজিতে লিখেছেন। এখন সে ওড়িয়াতে লিখছে। তারা দুজনেই ‘গিফটেড্‌ রাইটার’।

স্বপন কে ব্যানার্জি – অনেক ওড়িয়াই ইংরাজিতে কবিতা লিখছেন?
মনোজ দাস – আমি বেশি পড়ি নি। কিন্তু জয়ন্তকে আমি জানি। সে একজন জাত কবি। একইরকম ভাবে জে.পি. ও।

স্বপন কে ব্যানার্জি – দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্যসম্মান সম্প্রতি আপনাকে প্রদান করা হয়েছে। সাহিত্য আকাদেমি ফেলোশিপ ব্যাপারটি যদি একটু ব্যাখ্যা করেন।
মনোজ দাস – এটি কেবলমাত্র একটি সম্মান। সে সমস্ত লেখকদের এই ফেলোশিপ প্রদান করা হয়, তারা সাহিত্য জগতে অমর বলে বিবেচিত হন। সাহিত্য আকাদেমির সংবিধান অনুযায়ী কোন সময়ই সেখানে ২১ জনের বেশি ফেলো সাহিত্য আকাদেমিতে থাকতে পারে না। তাদের মধ্যে তিন থেকে চার জন বিদেশী লেখক, সম্মানীয় ফেলো যেমন নোবেল প্রাপকও আছেন। অন্যরা ভারতীয় । একমাত্র যদি তাদের মধ্যে কেউ মারা যান তখন শূন্যস্থান পূরণের জন্য অন্য একজন লেখককে বাছাই করা হয়। আপনি জানেন যে সম্প্রতি অমৃতা প্রীতম আর নির্মল ভার্মা প্রয়াত হয়েছেন।

স্বপন কে ব্যানার্জি – সাম্প্রতিককালে আপনি বলেছেন যে আপনি একইসঙ্গে ছোটোগল্প লেখাও থামিয়ে দিয়েছেন।
মনোজ দাস – হ্যাঁ আমার বহু পাঠকের একই অতৃপ্তি আছে। তারা আমাকে ফোনে জিজ্ঞাসা করেছে। চিঠিও লিখেছে।  দেখুন  আমি ছোটোগল্প লেখা জোর করে বন্ধ করিনি। অনুপ্রেরণা হল জীবনের একটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। লেখক যদি দক্ষ হন, তিনি একখানা নির্মিত গল্প অথবা অনুপ্রেরণার গল্প লিখতেই পারেন। অনুভবী পাঠক এই দু’ধরনের গল্পের পার্থক্যও করতে পারবেন না। আমি এখনও অসংখ্য তৈরি-করা গল্প লিখতে পারব। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি অনুপ্রেরণার গল্পে বা ভেতর থেকে তৈরি-হওয়া গল্পে। দেখ,গল্পের জন্য যে অনুপ্রেরণা লাগে তা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর আমার কাছে এখন আদৌ আসে না।

স্বপন কে ব্যানার্জি -কাকে আপনি একজন দক্ষ লেখক বলে মনে করেন?
মনোজ দাস – কেউ কেউ হন ‘গিফটেড জিনিয়াস’ অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট প্রতিভা নিয়েই জন্মেছেন। কিন্তু দক্ষতা এমন এক জিনিস যা বেড়ে ওঠে অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে। একজন দক্ষ লেখক সেই, যে তার নিজের জীবনেই কাজের পরিণতি প্রাপ্তির পদ্ধতিটি দক্ষতার সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন। যদি আমি আজ ত্রিশ বছর আগের একটি অংশের পুননির্মাণ করি শব্দ, শব্দগুচ্ছ, শব্দবন্ধ পরিবর্তন করব। আমি এটিকে আরও সঙ্ঘবদ্ধ আর বাগবৈশিষ্ট্যপূর্ণ করব যা আরও যথাযথ হবে। সুতরাং, এভাবেই দক্ষতা জন্মায়। যখন একজন তার নিজের মধ্যে এই উন্নতি নিয়ে সচেতন হন তিনিই একজন দক্ষ লেখক হয়ে ওঠেন। একটি উন্নত স্তরে সেই দক্ষ লেখক যিনি একটি থিমের কেন্দ্রস্থলটিকে ধরতে পেরেছেন আর যার মধ্যে রয়েছে লেখার গুরুত্বপূর্ণ উদ্যম বা প্রেরণা । আর এর সঙ্গে তার মধ্যে থাকতে হবে শব্দসম্ভার ব্যবহারের ওপর পূর্ণ ওস্তাদি। সঙ্গে মিশবে গল্প অথবা উপন্যাসটির গঠন বা উপস্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট থিমটির ব্যবহারের নৈপুণ্য। দক্ষ লেখক স্বাভাবিকভাবে কেন্দ্রীয় ভাবনা আর অন্তিম পর্যায়ের স্বতঃস্ফূর্ত মেলবন্ধন ঘটান, আর একইসঙ্গে গল্পের চূড়ান্ত পর্যায়ে কেন্দ্রীয় থিমের সমান্তরালভাবে চলমান নানা উপকাহিনীর সার্থক সমন্বয় ঘটাতে পারেন।

স্বপন কে ব্যানার্জি – আপনি বলেছেন থিম ই হল লেখার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি আপনার মধ্যে কিভাবে আসে?
মনোজ দাস – থিম একটা অস্পষ্ট ধারণার আকার আনতে পারে। তারপর যখন কেউ তার ওপর মনোনিবেশ করে তখনই প্লট তৈরি হতে আরম্ভ করে … এমনকি এই ধরনের একটি অস্পষ্ট ধারণা উপন্যাসেও উন্নীত হতে পারে…
হ্যাঁ, অবশ্যই এটা হতে পারে। ১৯৮৭ সালের সাইক্লোন– একটি চরিত্র থেকে একটি উপন্যাসের সৃষ্টি করেছিল। সেটা হঠাৎ করে আমার মাথায় উদয় হয়েছিল।  এটা থেকে আমি একটা চরিত্রকে দৃশ্যায়িত করেছিলাম। আমি বলছি এটাই নয়। আসলে এটা অবশ্যই আসে অবচেতন মনের কোনও অনুপ্রেরনা থেকে যেখানে কেউ প্রভাব ফেলে গেছে। কিন্তু এটাই আসল, যেখানে ওই প্রভাব ফেলা চরিত্রটাই ‘থিম’। আর পুরো উপন্যাসটাই তার চার পাশে গড়ে উঠেছিল।

 

স্বপন কে ব্যানার্জি – কিছু কিছু লেখক ‘বেস্টসেলার’ লেখার জন্য একটি ‘শর্টকাট মেথড্‌’ নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটা কি সম্ভব?
মনোজ দাস – অবশ্যই। প্রত্যেক দশকে একধরনের ‘জনগণের পছন্দের বিষয়’ (মাস টেস্ট) থাকে। আসলে আমি একজন লেখক বলতে একজন নিবেদিত প্রাণ লেখক অথবা সৎ লেখক, নিষ্ঠাবান লেখককে বোঝাতে চাইছি  না যে লিখনসত্তার অধিকারী। সে সুবিধা নিতেই পারে – এই বিচিত্র মুহূর্তগুলিকে লক্ষ্য করে সে একটি নতুন কিছু তৈরি করতেই পারে। আমি এই ধরনের কিছু উপন্যাস দেখেছি। আমি সেগুলো খুঁটিয়ে পাঠ করতে পারিনি। আমি কেবলমাত্র সেগুলি ওপর-ওপর চোখ বুলিয়েছি। এগুলোর মধ্যে ষাট শতাংশ সামাজিক বাস্তবতা আর চল্লিশ শতাংশ কামোদ্দীপক রসের সংমিশ্রণে একটি অসাধারণ মিশ্রণ রয়েছে। এগুলোই বেস্টসেলার তৈরি করে। আমাকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে তারা সবাই সক্ষম লেখক, কেউই একটা বেস্টসেলার উপন্যাস রাখতে পারবে না লিখনসত্তার গুণ ছাড়া।

 

 

পরিচয়লিপি

স্বপন কে ব্যানার্জি – যে ক’জন ভারতীয় ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় ব্যস্ত আছেন তাদের মধ্যে  একজন স্বপন কে ব্যানার্জি। স্বপনবাবু দীর্ঘ কয়েক দশক ধ’রে ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার বিশিষ্ট মানুষদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে চলেছেন। এগুলি দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। নিজে ইংরাজি ভাষা সাহিত্যের মানুষ হিসাবে গবেষণা ছাড়াও রচনা করেছেন গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার গ্রন্থ ‘People who meet people: Interviews with the Stars’ (Publisher: Westland)

 

 দেবাশিস মজুমদার –  জন্ম, বেড়ে ওঠা শ্রীরামপুরে। সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা, লেখালিখি। নেশা ভ্রমণ ও নিবিড় সাহিত্যপাঠ। অন্য পরিচয় কবি ও ছোটোগল্পকার।

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ