13 Apr

৮ থেকে ৮০র জন্য লিখি

লিখেছেন:সাক্ষাৎকার/ নারায়ন দেবনাথ


[বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা-ভোঁদা আর নন্টে-ফন্টে – ছোটোবেলায় এদের খপ্পরে পড়েনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। বাঁটুল,হাঁদা-ভোঁদার কাণ্ডকারখানা পড়ার জন্য প্রতি মাসেই নতুন ‘শুকতারা’ নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত আজকের বড়দের মধ্যে। আজ কয়েকশো চ্যানেলের টিভি আর ইন্টারনেটের হাত ধরে বিশ্ববাজারের হাজারো কমিকস ও কার্টুন চরিত্র হুড়মুড়িয়ে বাঙালির ঘরের ভেতর ঢুকে পড়লেও হাঁদা-ভোঁদা,নন্টে-ফন্টের সৃষ্টিতে আজও নিরলস সেই অশীতিপর মানুষটি। তিনি নারায়ন দেবনাথ। ২০১৪ সালে শীতের এক দুপুরে বাংলা শিশু সাহিত্য জগতের প্রায় প্রচারহীন এই সম্রাটের সঙ্গেই দুপুর থেকে সন্ধ্যা কাটান দেবাশিস মজুমদার। সঙ্গে ছিলেন দেবাশিস সাহাসুফল দেবনাথ। সম্পূর্ণ অপ্রকাশিত এই  দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটিই ‘গল্পের সময়’এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল ‘আলাপন’ বিভাগে।]

 

 ‘শুকতারা’ পত্রিকার সাথে কবে পরিচয় হল ?

আমার বিবাহসূত্রে কলেজ স্ট্রিট পাড়ার এক জনের সঙ্গে পরিচয় হল। তাঁর কাছে জানতে পারলাম যে, শুকতারা পত্রিকার প্রকাশন সংস্থার নাম দেব সাহিত্য কুটির। এও জেনেছিলাম যে ওদের ছোটোদের জন্য গল্প আর ছবিতে ভরা অনেক বই আছে এবং তখনকার নামকরা শিল্পীরা ওঁদের বইয়ের ছবি আঁকেন। যাই হোক সেই আলাপ হওয়া ভদ্রলোক আমাকে বললেন সুবোধ মজুমদার মহাশয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন। সুবোধবাবু তখন ছিলেন দেব সাহিত্য কুটিরের কর্ণধার। তাঁর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবেন শুনে আমার মনে যে কি আনন্দ হল তা ভাষায় বোঝানো যাবে না। মনে হচ্ছিল আমি এতদিন ধরে যা চাইছিলাম তা বোধহয় পেয়ে গেলাম। যাই হোক, একদিন তিনি আমাকে বললেন যে কাল আপনাকে সুবোধবাবুর কাছে নিয়ে যাব। যিনি আমাকে নিয়ে যাবেন বলেছেন তিনি ওঁদের প্রুফ দেখতেন। সেই সুবাদেই সুবোধবাবুর সঙ্গে তাঁর বেশ খাতির ছিল। তিনি পরদিন আমাকে নিয়ে সুবোধবাবুর কাছে গেলেন। ঘরে ঢুকে দেখলাম একজন রাশভারী লোক বসে আছেন। যিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি আমাকে দেখিয়ে বললেন, সুবোধবাবু আমি এর কথাই বলেছিলাম। সঙ্গে আমার আঁকা ছবিও দেখালাম। আমি তখন ভাবছি যেখানে সে সময়ের বাঘা বাঘা ছবি আঁকিয়েরা ছবি আঁকছেন সেখানে আমার আঁকা ছবি কি পাত্তা পাবে। কিন্তু মনের সব দুর্ভাবনা কাটিয়ে উনি সেদিনই আমাকে ‘শুকতারা’ অফিসে পাঠালেন ‘শুকতারা’ সম্পাদকের কাছে। চিরকুটে লিখেছিলেন আমাকে ছবি আঁকার জন্য গল্প দিতে। তখন মনে মনে ভাবছি যে আমি এতদিন ছবি আঁকার যে স্বপ্ন দেখেছি তা পূরণ হতে চলেছে। যাই হোক আমি চিরকুট নিয়ে সম্পাদকের কাছে যেতে উনি আমাকে গল্পের ম্যানুস্ক্রিপ্ট দিলেন না, কাগজে লিখে দিলেন কী কী আর কীরকম ছবি করতে হবে। আমি সেটা নিয়ে এসে তিনটি ইলাস্ট্রেশন এঁকে নিয়ে পরদিনই গিয়ে দিয়ে দিলাম এবং সঙ্গে সঙ্গেই ছবির পারিশ্রমিক পেয়ে গেলাম। সেই শুরু হল আমার দেব সাহিত্য কুটীরের সঙ্গে যোগাযোগ, যা আজও অব্যাহত।

 

আমরা আপনাকে আপনার কমিক্স দিয়ে তো চিনি। এই কমিক্সের দুনিয়ায় আপনার পদার্পন হল কীভাবে ?

তখন দেব সাহিত্য কুটিরের হয়ে পুরোদমে ছবি আঁকা চলছিল। সবই গল্পের ছবি, ইলাস্ট্রেশান।প্রথমদিকে ম্যানুস্ক্রিপ্ট দিতেন না, পরে গল্পের ম্যানুস্ক্রিপ্ট দেওয়া শুরু হল। গল্প বাড়িতে এনে পড়ে ভালো জায়গামতো ছবি এঁকে দিতাম। এইভাবে চলতে চলতে একদিন সুবোধবাবুর ছোটো ভাই ক্ষীরোদবাবু আমাকে বললেন যে বাংলায় তো ছোটোদের কোনো কমিক্স, মানে ছবি দিয়ে গল্প নেই। আপনি কি পারবেন ? আমি বলে দিলাম, পারব। আমার মনে তখন আমাদের দোকানের সামনে আমার বয়সের ছেলেরা রাস্তায় খেলা করতে করতে যে দুষ্টুমি করত সেগুলি মনে পড়ল। আমি সেগুলি গল্প আকারে সাজিয়ে তারপর ছবির সাহায্যে তাকে ‘ছবিতে গল্প’ তৈরি করে ‘হাঁদা-ভোঁদার কান্ডকারখানা’ নাম দিয়ে করে দিলাম এবং প্রতি মাসেই নতুন নতুন কাহিনী প্রকাশ হতে লাগলো।

 

বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা–ভোঁদা, নন্টে–ফন্টে – তিনটি কমিক্সের স্রষ্টা আপনি। এদের মধ্যে কাকে আপনার সবচেয়ে বেশী পছন্দ ?

(একটু হেসে)এই প্রশ্ন বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও মিডিয়া থেকে বহুবার এসেছে। তারা অনেকেই জানতে চায়  আমার প্রিয় চরিত্র কোনটা ? আমি বলি যে দেখুন, সব চরিত্র আমারই সৃষ্টি। আমার কাছে সবাই ভালো। তবু তারা জোর করে বলাতে চেয়েছে কে বেশী ভাল ? কাঁহাতক কতবার বলা যায় ? যতটা বুঝতে পারলাম যে তারা বলাতে চাইছে যে বাঁটুল, বাঁটুল হল আমাদের হিরো মানে সুপারম্যান। তো আমি বললাম যে তাই হোক, যদি তাকেই পছন্দের ভাবো, তবে তাই।

 

কথাটা আপনাকে দিয়ে বলানো নয়। আপনার থেকে আপনার ব্যাক্তিগত মতামত জানতে পারলে খুশি হব।

এরা সবাই তো আমারই সৃষ্টি। আমার কাছে সবাই ভালো। সবাই সমান, যেমনি হাঁদা–ভোঁদা, যেমনি বাঁটুল, তেমনি নন্টে–ফন্টে সবাই পছন্দের।

তথ্য যা বলে, তাতে ১৯৬৫ সালে বাঁটুলের সৃষ্টি আর ৬২ সালে হাঁদা – ভোঁদা। আপনি কি বলেন ? আগে হাঁদা – ভোঁদা সৃষ্টি হয়েছিল ?

হ্যাঁ, আগে হাঁদা–ভোঁদা।

আর নন্টে – ফন্টে ?

নন্টে–ফন্টে অনেক পরে। আগে হাঁদা–ভোঁদা আর বাঁটুল।

বাঁটুলের জন্ম ১৯৬৫ সালের গ্রীষ্মের সময়। এরকম বিষয় জানতে ইচ্ছা করে সেইজন্যই কি তাকে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরতে দিয়েছিলেন ?

(খানিক হেসে)তা নয়। সব কমিক চরিত্রেরই যেরকম বিভিন্ন পোশাক থাকে। আমার দেওয়া পোশাক। ওই জামা প্যান্ট গেঞ্জি।

আরেকটা কথা, বাঁটুল খুব বলবান, খুব পুরুষ্ঠ মানুষ ; কিন্তু পাগুলো বড় সরু, এর মধ্যে কি কোনো কারণ, কোনো বিদেশী প্রভাব, বা কোনো কিছু আছে ?

না কিছু না। এটা একরকম আমার মতন করে ক্যারেকটার করতে চেয়েছি। আর কিছু না।

বাঁটুল, হাঁদা–ভোঁদা,নন্টে–ফন্টে দীর্ঘদিন আপনি এদের নিয়ে মেতে থাকলেন, কাজ করলেন। কখনো এই সব চরিত্রগুলিকে এক জায়গায় আনবার কথা মনে হয় নি ?

এরকম প্রস্তাব এসেছিল। তবে একটা গল্পে আনতে গেলে যেভাবে ভাবতে হয়,সেভাবে ভাবতে হবে আর কী। সেভাবে তো কোনোদিন ভাবা হয়নি। কাজে কাজেই যখন অনেকেই বলেছে করলে কেমন হয়, বলেছি ভালোই হয়। তবে ভবিষ্যতে চিন্তা করতে হবে।

হাঁদা–ভোঁদার মজার কান্ডকারখানা দেখে একটা কথা মনে হয় ; যে এই দুটি ছেলের সঙ্গে এই যে পিসেমশাইএর চরিত্র জুড়ে দেওয়া। এর পেছনে কি আলাদা কোনো ভাবনা কাজ করেছে ?

না না কোনো ভাবনাই কাজ করেনি। মানে একজন অবিভাবকের আন্ডারে ওদের নিয়েছি।

আর বাটুল ? বাটুলের ঐ চেহারা বানানোর সময় কি ব্যাক্তিজীবনে কারও থেকে প্রেরণা পেয়েছেন ?

না না, পুরোটাই কাল্পনিক।

এখন তো ইউরোপে গ্রাফিক্স নভেল চলছে। আর হাঁদা–ভোঁদা, বাটুলদের তো আমরা দুপাতায় দেখি মাত্র, তা এদের নিয়ে কোনো গ্রাফিক্স নভেল  লিখবার কথা ভাবেন নি ? বা একটা বড় বই ?

পত্রিকা যাদের, তাদের সেটা ইচ্ছা নয়।

কিন্তু, ধরুন যদি কোনো পত্রিকা বা প্রকাশক সংস্থা আপনাকে এরকমই বড়ো মাপের ছবিতে গল্প লিখতে বলল। আপনি কি আগ্রহী হবেন ?

হ্যাঁ। এ বিষয়ে যে কাজ শুরু হয়নি তা নয়। প্রস্তাব এসেছিল। শুরুও হয়েছিল। তবে দু’তিনবার লেখবার পর তারা বলল যে না, বড়ো গল্প চাই না। তা কি ব্যাপার ? না ; পাঠকদের কাছ থেকে আপত্তি আসছে। আপত্তি কেন ? তারা বলল যে একটা সংখ্যা যদি পাঠকরা মিস্‌ করে যায়, তবে তাদের ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। কাজে কাজেই, যেমন চলছিল তেমনই চলুক।

কাদের থেকে প্রস্তাবটা এসেছিল ?

ঐ ; দেব সাহিত্য কুটীর।

মানে; যাদের সঙ্গে আপনার এই দীর্ঘ সাহিত্য জীবনের পথ চলা শুরু ?

হ্যাঁ, যাদের সাথে শুরু, সেই দেব সাহিত্য কুটীর।

হাঁদা–ভোঁদা সৃষ্টির ভাবনা কি ছেলেবেলায় পেয়েছিলেন ?

না ছেলেবেলায় নয়, এর সৃষ্টি বলতে পারেন হঠাৎই। আমি তো ইলাস্ট্রেটার মানে অলঙ্করণ শিল্পী। আমার ছেলেও মূলত তাই। ওদের থেকে প্রশ্ন এল ছবিতে গল্প পারবেন কি না ? আমি বললাম চেষ্টা করব। আর তারপর শুরু হল হাঁদা – ভোঁদা।

রেবতিভূষণ, আর কে লক্ষ্মণ এরা তো আপনার সমসাময়িক কমিক্সের জগতের লোক। এদের কারও কাজ আপনার ভালো লাগে ?

হ্যাঁ, রেবতিভূষণের কাজ ভালো লাগে। তিনি তো মূলত রাজনৈতিক কার্টুন নিয়ে কাজ করেছেন।

কিন্তু রেবতিভূষণ বা চন্ডী লাহিড়ী এদের কারোরই কার্টুন কিন্তু দীর্ঘজীবী হতে পারল না, মানে আপনার হাঁদা – ভোঁদা, নন্টে–ফন্টেদের মতো, কালজয়ী হতে পারল না। কিন্তু আপনার চরিত্রগুলো দীর্ঘকাল চলল। আমি বলতে চাইছি না তারা খারাপ, তবে আপনার এবং তাদের চরিত্রগুলির মধ্যে মূল রসায়নের ফারাকটা কোথায় ?

আমার তো মনে হয় ওনারা [একটু থেমে] বিশেষ কোনো গল্প নিয়ে খুব বেশী চলেন নি। যেটা আমি করেছি এবং এখনও করে চলেছি। তাদের কমিক ছিল অনেকটা রাজনৈতিক ধর্মী। কার্টুনিস্ট হিসাবে তাঁরা খুব ভাল, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁরা মজাদার গল্পের বিষয়গুলি এড়িয়ে গেছেন।

মানে আপনি বলতে চাইছেন যে বাঙালি পাঠক স্টোরি লাইনটাই বেশি

হ্যাঁ। সাধারণ মানুষ শুধু কার্টুন চাইবে না।পছন্দ করে ?গল্পও চাইবে। একটু হলেও; মানে গল্পটা চাই-ই।

আপনি তো কমিকসের স্রষ্টা, তা কোনোদিন কার্টুন আঁকবার ইচ্ছা হয়নি ?

না। আমার তো কমিকস করেই সময় হয় না।

কার্টুন,কমিকসের স্রষ্টা না লেখক কোন হিসেবে আপনি নিজের পরিচয় দিতে বেশী পছন্দ করবেন ?

কথা হচ্ছে যে কোনোটাই কম নয়। যেমনি লেখকের দরকার, তেমনি ছবি যারা আঁকবে, তাদেরও দরকার। এবং প্রত্যেকটাই অপরিহার্য। অনেকে আমাকে দিয়ে ছোট গল্পও লিখিয়েছে। তবে বাটুল, হাঁদা – ভোঁদাদের প্রবাহমানতা বজায় রাখতে রাখতে এসব কথা ভাবি নি।

কোনো বিদেশী কমিকসের প্রভাব কি পড়েছে আপনার এই কমিকসগুলিতে ?

না। তেমনভাবে কিছু নয়।

বিদেশী কমিকস পড়েন ? ভালো লাগে ?

কিছু কার্টুন, কমিকস তো খুবই ভালো। যেমন টম এন্ড জেরি আর ওয়াল্ট ডিজনির কিছু ভালো কার্টুনও হয়। এগুলো যখন সময় হয় টিভিতে দেয়, দেখি। এসবতো আমাদের দেশে সবে শুরু। বিদেশে তো অনেক এগিয়ে গেছে। কিন্তু পশ্চিমবাংলার কাজ প্রচুর নিম্নমানের।

আপনার নন্টে–ফন্টে, বাঁটুল নিয়ে অ্যানিমেশনের প্রচুর কাজ হয়েছে। তবু অনেকে মনে করেন যে অ্যানিমেশনের  তুলনায় কমিকসে এদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি। আপনি কি মনে করেন ?

বইয়ের প্রভাব যা মানুষের ভালো লেগেছে তা অ্যানিমেশনে পড়েনি। কারণ তা নিম্নমানের।

আচ্ছা অ্যানিমেশনের যে পাঠক্রম বিভিন্ন ইউনির্ভাসিটিতে পড়ানো হয়, তাতে তো আপনার বাটুল, হাঁদা – ভোঁদা বা নন্টে – ফন্টে একটা অ্যানিমেশনের টেক্সট হিসাবে স্থান পেতে পারত। কিন্তু এটা হয় নি এবং তাতে আপনার স্রষ্টা হিসেবে খারাপ লাগে না ?

আমার খারাপ লাগলে কি হবে ? তবে একথা ঠিক যে এখানকার অ্যানিমেশনের কাজ অত্যন্ত বাজে। আমি তো দেখি না। আমার গল্পের অ্যানিমেশনই আমি দেখি না।

এই যে বাটুলকে এতবছর ধরে এক তুলির টানে তৈরি করে যাচ্ছেন, এতে আপনার আলাদা কিছু কৃতিত্ব বা হাতের দক্ষতা স্বীকার করেন ?

না না ! করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। চেহারাটা করতে করতে আপনা-আপনিই চলে আসে। অভ্যেস হয়ে যায়।

কিছুদিন আগে Indian Art College এ একটা Seminar হয়েছিল। ওখানে David Hawleings একটা Story Line নিয়ে ফটোগ্রাফ বানিয়ে ছিলেন। ওনার একটা মন্তব্য ছিল যে, যাঁরা এর আগে বিভিন্ন কমিকসে কাজ করেছেন, তারা নাকি বিভিন্ন লেন্সের উপর চরিত্রগুলিকে ফেলে উল্টো ছাপটা নিয়ে হুবহু এঁকে ফেলতেন। তা আপনি কি এরকম কোনো Technique বা কোনো Application use করেছেন ?

না না, ব্যাপার হচ্ছে যে যদিও সেই নিয়ে নানারকম চর্চা ও গবেষণা হয় তবে আমাদের এখানে কমিকস নিয়ে এত চর্চা কেউ করে না। মাথাই ঘামায় না। এখানকার বড়ো বড়ো বিজ্ঞরা একসময় ঠিক এই কথাই বলেছেন যে এ আবার কী ? এতো ছবি। এতে আবার সাহিত্যের কি আছে ?

কিন্তু আপনি যে Story Line টা দিচ্ছেন?

কিন্তু ওরা তো দেখছে ছবিটা শুধু। ওর ভেতরে যে গল্পটা আছে সেটাতো মাথায় ঢোকেনি। বিজ্ঞ হলে কি হবে ? তারা তাচ্ছিল্য করেছে ওটা। বলেছেন, ও সাহিত্যের পর্যায়ে পড়ে না, কিন্তু এখন তারা কি বলবেন, এখন তো সাহিত্য একাদেমি সেটাকে মেনে নিয়েছে ; যে এটা সাহিত্য পর্যায়ে পড়েছে। এবার সেই বিজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীরা কি বলবেন ?

ভবিষ্যতে যদি আপনার এই কমিকসের অংশ শিশু পাঠ্যবইতে আসে, তবে কেমন হয় ? আপনি কি চান যে এটা আসুক ?

সবাই চায়, যেটা ঠিক সেটা হোক। যেমন সাহিত্য একাদেমির ব্যাপারটাই ধরুন না। আমার মনে একটা ক্ষোভ ছিল যে এখানকার বিজ্ঞ যারা, যারা এটাকে তাচ্ছিল্য করেন, সাহিত্যের পর্যায়ে ফেলে না, তারা এটা কেন ভাবেন না যে এর মধ্যে একটা Story Line আছে। এখন অনেক পত্র–পত্রিকাতেই গল্পকে ভিত্তি করে কমিকস হচ্ছে। তাহলে সেটা কিভাবে হল? তবে কি সাহিত্য এর মধ্যে নেই ? গল্প লেখা সহজ তবে তা চিত্রায়ন করা বড়ো কষ্টকর। এটাকে তারা নস্যাৎ করে দিতেন ? এখন তারা কি বলবেন ?

শিশুদের পাঠ্যবইতে আপনার কমিকস এলে খুশি হবেন তো ?

তাতে তো খুশি হবারই কথা। এটা তো ছোটোদের জন্যই। ছোটোদের উপলক্ষ্য করেই, শিশু সাহিত্যের জন্যই এটা করা। তা শিশুপাঠ্যতে এলে খুশি তো হবই। খুশি হবারই কথা।

কিন্তু বড়োরাও তো সময় পেলে টুক করে কমিকসের পাতাটা উল্টে নেয়। মজাটা নিয়ে নেয়।

(একটু হেসে) বড়োরাই তো দেখে। ওসব লেখাতো ৮ থেকে ৮০। মজা জিনিসটাতো বড়োদের জন্যও।

ব্যাপার হচ্ছে কি এখন সিনেমার বড়ো প্রভাব। এর মধ্যে ভালো মজার গল্প দিয়ে শিশুদের মানসিক ভাবে তৈরি করারও তো একটা প্রয়োজন আছে বলে আপনি কী মনে করেন ?

বহুবছর আগে আমার হাঁদা–ভোঁদা নিয়ে দূরদর্শনে এক ভদ্রলোক সিরিয়াল করেছিলেন, কাগজে এর প্রশংসাও বেরোয়। কিন্তু ব্যাপার হল কি, তিনি বললেন জানেন, আমি Producer খুঁজে পাচ্ছি না। যাকে বুঝিয়ে সুজিয়ে কাজটা করেছিলেন, কিন্তু আর পারলেন না। Producer ধরতে পারলেন না। অনেকে আমাকে এই বলে নিরাশ করেছেন যে ছোটদের নিয়ে কাজ করে কি হবে ; বড়োদের নিয়ে করুন, খুব চলবে।

আজকাল বাচ্চারা প্রচুর অ্যানিমেশন দেখছে। তা এই অ্যানিমেশন গুলির মধ্যে কি কিছু কাঠিন্যতা আছে বলে আপনার মনে হয় ? বাচ্চারা যে পত্রিকা পড়ত, তার জনপ্রিয়তা শেষ হতে চলেছে। এতে বাংলা কমিকসের যে দেশজ ঘরানা, সেটা কি নষ্ট হচ্ছে না ?

বাংলা কমিকসে অ্যানিমেশনের উদ্যোগের অভাবে। জাপানি অ্যানিমেশন তো ছেয়ে গেছে, মানে টিভি খুললেই দেখা যায়। ওরা উদ্যোগী। আমাদের ছেলেরা বাইরের কার্টুন দেখে। দেশজ গল্পে উৎসাহ কই ?

আচ্ছা বাহাদুর বেড়ালটা বন্ধ হয়ে গেল কেন ?

(সামান্য হেসে) না ওটা বন্ধ হয়নি, মানে আগে যেমন টানা চলত এখন তেমন টানা নয়, বিশেষ একটা সংখ্যায় বেরোয়। পুজো সংখ্যায় বের হয়।

বাহাদুর বেড়ালের চাহিদা কি একটু কম বাচ্চাদের মধ্যে ?

বাহাদুর বেড়াল যখন বেরোল তখন তো বাচ্চাদের ভালো লাগত। ওটা ছিল একটা জন্তুর চরিত্র।সেই তুলনায় ছেলেমেয়েরা বোধ হয় আমাদের বাটুল–হাঁদা–ভোঁদাকেই বেশি ভালোবাসে।

আমাদের দেশে কমিকসের ক্ষেত্রে কি পশুপাখির চাইতে মনুষ্য চরিত্র বেশি আকর্ষনীয় ?

তা ঠিক মনে হয় তো নয়। তবে বাহাদুর বেড়াল বন্ধ হয়ে গেল এবং যা বন্ধ হয়ে যায় তা মানুষের মন থেকে ধীরে ধীরে অবলুপ্ত হয়ে যায়। এটা একটা কারণ হতে পারে।

আপনি মনীষীদের জীবনী নিয়ে একসময় অনেক কাজ করেছিলেন।

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ, স্বামীজি এঁনাদের নিয়ে কাজ করেছিলাম। আনন্দমেলায় বেরিয়েছিল।

স্বামীজির প্রতি কি আপনার কোনো দুর্বলতা আছে না পত্রিকার অনুরোধে করে গেছেন ?

অনুরোধ মানে কি ; উনি তো সারা পৃথিবীর শ্রদ্ধেয়। তখন রবীন্দ্রনাথের একশো বছর। বিমল ঘোষ লিখেছিলেন এবং আমার ছবি ছিল। তারপর শুরু হল বীরেশ্বর বিবেকানন্দ। ওটার ছবি ছিল মারাত্মক। ওটা প্রকাশ করেছিল আনন্দ পাবলিশার্স।

এখন এগুলো কি পাওয়া যায় ?

না। লালমাটি প্রকাশন ‘রবিছবি’টিকে সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিল ২০১০ সালে।

বিদেশী Popular Art এর মধ্যে কী বাটুল, হাঁদা–ভোঁদা বা নন্টে–ফন্টেকে আনা যায় ?

(হেসে) সেটা আমি কি বলব। সেটা বলবে যারা পাঠক। আমি তো কাজ করে যাচ্ছি শুধু।

আরেকটা জিনিস জিজ্ঞেস করি, সেটা হচ্ছে সমসাময়িক যাঁরা ছোটগল্প লিখছেন বা শিশুসাহিত্যিক তাদের কারও লেখা ভালো লাগে ?

ভাল লাগে সুকুমার রায়ের ছবি ও ছড়া। ওকি আর কেউ করতে পারবে ? সুকুমার রায় আর জন্মাবে না। ছড়ার সঙ্গে মিলিয়ে ছবি এ একমাত্র সুকুমার রায়। দ্বিতীয় সুকুমার রায় আর আসবে না।

আচ্ছা এই যে বাংলার শিশুসাহিত্যে এত ক্রাইসিস হচ্ছে, এব্যাপারে আপনি শিশুসাহিত্যজগতের এত প্রবীণ মানুষ হিসাবে কেমন বোধ করেন ?

এখন হচ্ছে সব হুজুগের ব্যাপার। কে কাকে কীভাবে খালি চমকে দেবে সেই এখন প্রচেষ্টা। ভাল কিছু করলুম ওটার থেকে, ওইটাই এখন বেশী। ঝপ করে চমকে দিয়ে প্রচার পাওয়া। মৌলিক সৃষ্টি এখন তো খুবই কম।

জাপানিদের ‘মঙ্গা আর্ট’ বলে একটা আর্ট আছে। তেমনি আপনার বাটুল,হাঁদা–ভোঁদার তো একটা নিজস্বতা আছে। যার সঙ্গে ফাইন আর্টস মেলে না। কমিকসের একটা ভিন্ন দেশজ ধারা সৃষ্টি করেছেন আপনি। সেই দেশজ ধারার বক্তা হিসাবে আপনাকে যদি এই ভঙ্গি কে কোনো নামকরণ করতে বলা হয়। একদম দেশজ কোনো নামকরণ। সেটা কি করতে পারবেন ?

নামকরণ করে চমকে দেবার কোনো চিন্তা আমার নেই। তেমন কোনো পরিস্থিতি হলে দেখা যেতে পারে।

আপনি তো জীবনের উপান্তে এসে সাহিত্য একাদেমি পেলেন। আপনার সঙ্গে তো বাটুল, হাঁদা–ভোঁদা,নন্টে– ফন্টেরাও তো সাহিত্য একাদেমি পেল। সেটাতো মানবেন ?

হ্যাঁ সে তো বটেই। উপরন্তু কমিকস যারা বানায় এটা তাদেরও পাওনা। কারণ তারা আর তাচ্ছিল্য পাবে না। কমিকস স্রষ্টাকে আর কমিকাল ব্যাপার করে তোলার আর কোনো জায়গা রইল না। শুধু যে আমি পেলুম তা নয়, তারাও পেল।

যারা কমিকস তৈরি করেন তাদের কাছে সমসাময়িক সমাজের অভিঘাত কি কমিকস সৃষ্টির মূলে থাকে না ? আপানার কি মত ?

ঐভাবে লিখতে গেলে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে যায়। তখন আর মজাটা থাকে না। তবে এরকম যে হয় না তা নয়।

আপনি যে এত প্রবীন মানুষ। সমাজের নানা, উত্থান পতনকে আপনি আপনার লেখার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। কিছু না হয় কাল্পনিক। তবে সামাজিক প্রসঙ্গও তো থাকে। তো আপনাকে একজন সমাজ গবেষক হিসাবে আখ্যা দেওয়া যায়।

(একটু ভেবে) যদি দেওয়া যায় তো দেওয়া যায়। না দিলেও ক্ষতি নেই।

এতদিন ধরে তো এত কাহিনী তৈরি করেছেন। বাটুলের কতগুলো সংখ্যা হয়েছে বলতে পারবেন ?

(হেসে) না না। ৬০ – ৬৫ বছর ধরে গল্প তৈরি হচ্ছে। ৫০ বছর পার হয়ে গেছে তা তো আমিই জানি না। আমি তো সৃষ্টির খেয়ালে কাজ করেই চলেছি। মাথায় রাখা কি সম্ভব ?

দীর্ঘপথ তো কমিকসের দুনিয়ায় চললেন। তা আত্মজীবনী মূলক কিছু লিখতে ইচ্ছে করে ?

আত্মকথা যদি বলতে হয়, তবে বেহালার ‘বৈশাখী’ বলে একটি পত্রিকা ছিল। তারা একটি স্মৃতিকথা চেয়েছিল। যদিও বড়ো কিছু একটা লেখবার বিশেষ ধৈর্য আমার নেই। তবু ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে লিখেছিলাম ‘স্মৃতির সোপান বেয়ে’ নামে বেরিয়েছিল।

এতদিন ধরে দেব সাহিত্য কুটিরের সঙ্গে, দীর্ঘ পথ চলেছেন, তা দেব সাহিত্য কুটিরের বহু বন্ধু–বান্ধবও আপনার সঙ্গে ছিলেন যারা এখন নেই। তেমন কোনো বন্ধুর কথা মনে পড়ে যার বিরহবেদনা আজও আপনাকে ছুঁয়ে যায় ?

না। সেরকম যে কিছু একটা ছিল না। তবে আর্টিস্ট বলতে ময়ূখ চৌধুরী যিনি মারা গেছেন তাঁর বিরহ কাজ করে।

আচ্ছা বিদেশে আপনার কার্টুন নিয়ে কোনো কিছুতে কোনো কাজ হয় নি।

(থামিয়ে) না না। ওসব আবার কোথায় দেখা যাবে।

হাঁদা–ভোঁদা,বাটুল দি গ্রেট বাংলা শিশু সাহিত্যের একটা মাইলস্টোন। তো এ ব্যাপারে আপনি এত নিস্ক্রিয়তা দেখাচ্ছেন কেন ?

সে এ তো… (নীরবতা)

লন্ডন মিউজিয়াম যদি কৃষ্ণগোপাল মিত্রের আত্মচরিত রাখতে পারে, তবে হাঁদা–ভোঁদা, বাটুল দি গ্রেট কেন নয় ?

সে তো আমি বলতে পারি না। কোনো উদ্যোগ তেমন নেওয়া হয়নি।

না আমি বলতে চাইছি যে, আপনার নিজে হাতে আঁকা বাটুল প্রকাশক সংস্থাকে দিচ্ছেন ;তারা ছাপছেন। তো আপনার নিজের হাতে আঁকা মাস্টার কপি গুলোতো সংগ্রহ করা একটা বিরাট গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে আমার মনে হয়।

(একটু থেমে) কথা হচ্ছে যে, যাদের দেওয়া আছে। সেটা কি তারা রেখেছে ? সেটাই সন্দেহ। তাদের তো কাজ হল পাওয়া। তবে মাস্টার কপিগুলো রাখেনি, সেটাই আমার সন্দেহ। এই তো শিশু সাহিত্য পুরস্কারটা দেওয়া হয়েছে এটাই অনেকের মনমতো হয় নি। আমি জোর গলায় বলতে পারি, ঠিক হয় নি। নানারকম লোক তো থাকেই। আমাদের এখানে দেখা যায় যে কেউ কারও ভালো দেখতে পারে না। আমাদের এখানে মনোভাবটাই এটা।

তবু তো মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং অবশ্যই আরও অন্যান্য গুরুজনদের বিচারে আপনি আপনার প্রাপ্য সম্মানের খানিকটা হলেও পেলেন। নাকি ?

দিদি (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) আমাকে একবার হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত করিয়েছিলেন। সেবার খুব সিরিয়াস অবস্থা হয়েছিল।

এমনি আপনার বাড়িতে এসে দেখাটেখা করে গেছেন কখনো ?

না না, বাড়িতে আসেন নি, হাসপাতালে গিয়েছিলেন।

এটা আমাদের কাছে খুব আক্ষেপের বিষয় যে কমিকস কখনো ফাইন আর্টস-এর মূল শাখার মধ্যে এসে শিক্ষার্থীদের শেখানো হল না, তা এটা নিয়ে কোনো ক্ষোভ নেই ? বা কোনো উচ্চস্তরের মানুষকে বলেন নি ? আপনি বললে তো কোনো একটা কাজ হলেও হতে পারে।

সেটা হচ্ছে, কে করবে না করবে তার উপর। অনেকেই আমাকে এই প্রশ্ন করেছেন। আমি বলেছি দেখুন কমিকস না হয় সে আঁকতে পারবে। কিন্তু গল্পটা পাবে কোত্থেকে ? তার জন্য তো সৃষ্টিশীল হওয়া দরকার। সেটাতো তার নিজের কল্পনা। কাজে কাজেই গল্প লেখা ও ছবি আঁকা উভয় দক্ষতাই দরকার।

আন্তর্জাতিক স্তরের কোনো কমিকসের লোকজন কখনও যোগাযোগ করেছেন? বা কোনো সেমিনার থেকে ডাক এসেছে ?

(হেসে) না না। আমি সেই এই ঘরেই। এখান থেকে বাইরে কোথাও নেই(আবার হাসলেন)।

আচ্ছা। এখন অবসরে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করেন? ভালোলাগা বাংলা সাহিত্য কিছু ?

সাহিত্যের মধ্যে আমার বেশি ভালো লাগে গোয়েন্দা গল্প।

কার গল্প খুব প্রিয় ?

একসময় শরদিন্দুবাবুর (শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়) ব্যোমকেশ খুব পড়েছি। খুব ভালো লাগত পড়তে। যখন কোনো চিন্তা আমার মধ্যে নেই তখন এসব গল্প পড়েছি। তারপর ইদানিং ভালো লাগত প্রফেসর শঙ্কুর গল্পগুলো। আমি কোনো উপন্যাস পড়ি না।

পুরোনো দিনের কোনো উপন্যাস ? বিভূতিভূষণ বা তারাশঙ্করের কোনো উপন্যাস পড়েন নি ?

না,ওই যে বললাম ; উপন্যাসের প্রতি আমার তেমন বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই। তবে, অ্যাডভেঞ্চার গল্প, বিশেষ করে গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালো লাগে।

ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায় তো প্রায় আপনার সমসাময়িক। তা ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়ের সাথে যোগাযোগ ছিল ?

হ্যাঁ, উনি আসতেন আমার বাড়িতে, অনেক বার এসেছেন। উনি তো শুকতারা ছেড়ে আনন্দমেলায় গিয়েছিলেন। আনন্দমেলা থেকে আমার কাছেও তিন – তিনবার লোক পাঠিয়েছিল।

গেলেন না কেন ? দেব সাহিত্য কুটিরের সুবোধবাবুদের সঙ্গে দীর্ঘদিন পরিচয়ের জন্য ?

যে যাই বলুক শুকতারার মাধ্যমেই আমার উঠে আসে। এর পেছনে আনন্দবাজারের কোনো কৃতিত্ব নেই। তখন হাঁদা–ভোঁদা,বাটুল মধ্যগগণে। সেই সময় ওনারা চাইছেন। আমার তখন খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। সত্যি কথা বলতে কি যাই নি।

তার মানে শুকতারার সাথে যোগাযোগের সুদৃঢ় বন্ধনটা ভাঙতে চান নি, তাই তো ?

শুকতারা থেকে একবার আমার কাছে লোক এসে হাজির। তারা কানে শুনেছেন যে আমি নাকি আনন্দমেলায় ভিড়ে যেতে পারি। আমি বললুম যে, ঠিক আছে আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি যাচ্ছি না। অনেকে আমাকে বললেন যে আপনি বোকামি করলেন কেন ? আমি বললুম যে দেখুন, যেখান থেকে আমি উঠেছি তার প্রতি বদান্যতা ত্যাগ করে আমি আনন্দমেলায় যাই কি করে ?

কমিকসের দুনিয়ায় কোনো উত্তরসূরি তৈরি করেছেন ? কেউ আসে কাজ শিখতে ?

এখন যুগটা খুব জটিল। ছবি এবং গল্পের সমন্বয় ঘটাতে সবাই পারে না। যারা ছবি আঁকছে তাদের এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই।

কমিকসের ভবিষ্যৎ কীরকম হবে বলে মনে করছেন ?

যারা ওই সব টারজান, অরন্যদেব ইত্যাদি নিয়ে কাজ করছেন, তারা উল্লেখ্য। তবে মৌলিক কাজ তো নেই। তবে আসছে না একথা বলা যাবে না।।

আপনার প্রিয় চিত্রশিল্পী ?

আমার ছবি ভালো লাগে পর্যন্ত। আলাদা করে কারও কাজ দেখব কি করে? সময় কোথায় ? মাথায় তো খালি ঘুরছে সামনের সপ্তাহে কিস্তি দিতে হবে।

এখন কোনো বন্ধু–বান্ধব আছেন ? কোথাও আলাপ আলোচনা সভায় যান ?

না না। আমার বন্ধু–বান্ধব যারা ছিলেন তাদের বেশীর ভাগই তো পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

তাহলে অবসরে কি করেন ? টিভি দেখেন ?

অবসরে টিভি দেখি।

সিরিয়াল দেখেন ?

না। সিরিয়াল দেখি না। সিরিয়াল ভালো লাগে না। সব একঘেঁয়ে জিনিষ। পুরনো দিনের কোনো ভালো বাংলা ছবি দিল, দেখলাম। যেমন ‘টক–ঝাল–মিষ্টি’ ছবিটা খুব ভাল লাগে দেখতে। ‘পিতৃভূমি’ বলে একটা এই প্রজন্মের ছবি আছে। দেখতে ভালো লাগে। এইরকম আছে কিছু কিছু। মিঠুনের কটা ছবি আছে। দেখি, তবে ইংরেজি ছবির প্রতি আমার একটা দুর্বলতা আছে।

কিছু বিশেষ হলিউড ছবি ?

যেগুলিতে বিশেষ অ্যাডভেঞ্চার আছে। যেমন স্পাইডারম্যান,সুপারম্যান,জেমস বন্ড-এর ছবি যেগুলো হয়, ভালো লাগলে দেখি। নইলে নয়।

এখনকার বাংলা ছবি দেখেন ?

না না। এখনকার বাংলা ছবির তো নামের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। সব অদ্ভূত অদ্ভূত নাম। ভালো লাগে না একদম। এই প্রজন্মের ছেলেদের হয়তো ভালো লাগে। আমরা তো পুরোনো লোক। আমাদের ভালো লাগে না।

আপনি বলছেন আপনি পুরোনো লোক। কিন্তু আপনার সৃষ্টিতে তো এখনও নবীনতা। মনের দিক থেকে আপনি সবচেয়ে সজীব।এটা কি আপনি মানবেন না, যে মানুষ বাচ্চাদের আনন্দ দিতে পারে, তাকে বাচ্চাদের মতো করে আনন্দটা উপভোগ করতে হয়।

(বেশ কিছুক্ষণ হেসে) হ্যাঁ হ্যাঁ। সে তো আছেই।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কখনও যোগাযোগ হয়েছে ?

না না, ওনার সঙ্গে আমার কখনও যোগাযোগ হয়নি।

উনি তো সন্দেশ পত্রিকা চালিয়েছেন আর আপনি তো শুকতারার পাতা ভরিয়ে তুলছেন বাটুল দি গ্রেট, হাঁদা – ভোঁদা, নন্টে–ফন্টে দিয়ে। তো, কখনো যোগাযোগ হয়নি।

এটা জানতাম যে উনি একটি বিজ্ঞাপন সংস্থায় কাজ করেন। ওনার নাম তো ছড়াল যখন ‘পথের পাঁচালি’ হল, তাও এখানে নয়। বিদেশ থেকে যখন ঘুরে এল তখন তাঁর নাম হল। মনে আছে আমার বাড়ি থেকে কয়েকজন গিয়েছিল সিনেমাটা দেখতে। সবে রিলিজ হয়েছিল তখন। দেখে এসে বলছে যে হল-এ মাত্র ২০ থেকে ২৫ জন দর্শক। তারপর যখন বিদেশ থেকে ঘুরে এল ছবি তারপরে লোক ধরে না। এই তো আমাদের দেশ। বিদেশের কোনো তকমা না পড়লে আমাদের হুঁশ ফেরে না।

‘সন্দেশ’ থেকে কোনো অনুরোধ এসেছিল ?

হ্যাঁ একবার এসেছিল। তখন সন্দেশের যুগ্ম সম্পাদক সন্দীপ রায় আর আরেক ভদ্রলোক। সেই ভদ্রলোক এসেছিলেন আমার কাছে একটা গল্প নিয়ে। মুজতবা সিরাজের গল্প। সেই গল্পটা অলংকরণ করে দিতে হবে। একটা Live Drawing ; আরেকটা চার রঙ দিয়ে। তো আমি করেছিলাম। যদিও গল্পটার জোর নেই, তবু করেছিলাম। যাবার সময় বলে গেলেন, শুধুহাতে নয় ; পাবেন কিছু। যাই হোক, দিন যায়, মাস যায়, পুজো সংখ্যাও বেরিয়ে গেল, পুজোসংখ্যা বেরোল কি না, তাও জানি না। আর কোনো খবর নেই। পরে শুনলাম বেরিয়েছিল নাকি। তবে কোনো বইও পাই নি, কিছু না। ওখানেই শেষ।  (একটু হাসলেন) তারপর আবার শুনলাম নাকি যুগ্ম সম্পাদকের সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছে। এই তো সব ব্যাপার আর কি। সেই অর্থে শুকতারাই একমাত্র এতদিনের দীর্ঘ সম্পর্ককে অটুট রেখেছে।

সত্যজিৎ রায়ের গল্প ‘ফেলুদা’ পড়েন ?

হ্যাঁ। ফেলুদা ভালো লাগে। প্রথম যেটা (একটু ভেবে) সোনার কেল্লা ! ভালো লাগে।

বাটুল দি গ্রেট-এ Science Fiction তো প্রচুর আছে। এগুলো কি অজান্তেই করেন ?

এগুলোতে তেমন করে Science Fiction কিছু নেই। পুরোটাই কল্পনা।

গল্প বা পত্র–পত্রিকা কিছু পড়েন ?

কিছু কিছু পত্র–পত্রিকা আসে।একটু খুলে-টুলে দেখি। যদি মনে হয় কোনো গল্পটা একটু ভালো লাগছে, সেটা একটু পড়ি। আমি তো কিশোর ভারতীর কোনো গল্পই পড়ি না।

গান বাজনা শোনেন ?

এককালে ভীষণ শুনেছি। এখনো শুনি। তবে অবশ্যই পুরোনো দিনের গান।

দেবব্রত বিশ্বাস কেমন লাগে ?

বাবা ! আমি দেখি যে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে গেলেই ওনার অন্যরকম গলা। তাছাড়া নাকি রবীন্দ্র সঙ্গীত হয় না। সে যার ভালো লাগে শোনে।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ভালো লাগে ?

হ্যাঁ। হেমন্ত মুখার্জি ভালো। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ভালো। তখনকার দিনের গানের কথা ছিল ভাল, সুর ছিল ভাল। এখনকার গানের কথা যেমন জঘন্য, তার সুরও তেমনি। তবে নচিকেতা ভাল লাগে। নচিকেতা একবার এসেছিল আমার এখানে। বলল আমি আপনার খুব গুনগ্রাহী, খুব ভক্ত আপনার।

নচিকেতারর গান শুনেছেন ?

(একটু ভেবে)না,নচিকেতার গান তেমন শোনা হয়নি।

অনেকক্ষণ কথা বললাম আপনার সঙ্গে। এটা আমাদের কাছে পরম প্রাপ্তি। আপনাকে ধন্যবাদ।

(একটু হাসলেন)আপনাদেরও ধন্যবাদ।

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ