13 Apr

নববর্ষে বইপাড়ার আড্ডা

লিখেছেন:নববর্ষে বইপাড়া


[পৃথিবীর যে খানেই বাঙালি থাকুক না কেন বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন বা পয়লা বৈশাখ তার কাছে নিয়ে আসে এক বিশেষ অনুভব । ঢাকার বৈশাখী উৎসবের একটি আবশ্যিক অঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের সঙ্গীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে আহ্বান করা হয় নতুন বছরের সূর্যকে। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গায় বসে বৈশাখী মেলা। নববর্ষ মানেই নতুন জামাকাপড়, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, থাকে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। থাকে ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন,যার পোশাকি নাম হালখাতা। বাংলা নতুন বছরে এই হালখাতা ঘিরেই একসময় জমজমাট হয়ে উঠত কলকাতার কলেজ স্ট্রিট। নববর্ষের দিন বইপাড়ায় আড্ডা জমাতেন প্রখ্যাত সাহিত্যিকরা। লেখকদের পাওনাগণ্ডা মেটাতেন প্রকাশকরা। হত নতুন বই প্রকাশ। থাকত মিষ্টিমুখ,খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা। এবারের নববর্ষে কী ভাবনা লেখকদের? কি-ই বা আয়োজন প্রকাশকদের ? প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বিখ্যাত প্রকাশকদের কথা শুনলেন মিতালি মিত্রসমীর ঘোষ।]    

 

মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়(শঙ্কর),সাহিত্যিক

পয়লা বৈশাখ বইপাড়ার আয়োজনে আমি আগে গিয়েছি। আমার বই ছাপে এমন বেশ কয়েকটি প্রকাশন সংস্থার আমন্ত্রণ তো থাকেই। তাতে অংশ নিয়েছি। বাঙালির নতুন বছর। তা ঘিরে প্রকাশন সংস্থার আয়োজন বেশ ভালই লাগে। প্রকাশন শিল্প বইমেলা কেন্দ্রিক হয়ে গেলেও এখনও কলেজ স্ট্রিটের বেশ কয়েকটি প্রকাশক  লেখকদের আপ্যায়ন, নতুন বই প্রকাশের ধারাটি টিকিয়ে রেখেছেন। তবে এখন আর ব্যক্তিগত কারণে বিশেষ যাওয়া হয় না। গত দু বছর তো যাই নি।

 

 

 

 

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়,সাহিত্যিক

নতুন বছরের প্রথম দিনটি আমি ইদানীং আমাদের আশ্রমেই কাটাই।এবারও ঝাড়গ্রামের কাছে সেই আশ্রমে  ১লা বৈশাখ কাটাব। বর্ষবরণে কলেজ স্ট্রিট খুব একটা যাওয়া হয় না। আগে যেতাম। আনন্দ সহ অন্যান্য প্রকাশনাতে যেতাম। তখন সুনীলরা আসত। সত্যি বলতে কী, বইপাড়ার উন্মাদনা থাকলেও এখন দুপুরে গরমে বেশ কষ্টও হয়। আর আগেতে নতুন বছরে বই প্রকাশ হত।এখন তো সবই বইমেলা কেন্দ্রিক। দুএকটা বই হয়ত প্রকাশ পায়। আমার লেখক জীবনে ১লা বৈশাখ কী কী বই বেড়িয়েছে তা স্পষ্ট করে মনেও নেই। আসলে আমি দেখেছি পুজো সংখ্যায় উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তা বই হয়ে বেরিয়ে গেছে। পয়লা বৈশাখের অপেক্ষা আর থাকত না। 

 

 

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়,সাহিত্যিক 

প্রতি বছরই আমি বইপাড়া যাই। দীর্ঘ বছর ধরে আমার এ রুটিন। তবে একসময় বইপাড়ার নববর্ষ  যা জমজমাট ছিল, এখন তা অনেকটাই ফিকে। আমার প্রকাশকদের আমন্ত্রণে আমায় উপস্থিত থাকতেই হয়।একসময় বাংলা নতুন বছরে আমার বহু বই প্রকাশ হয়েছে।এখন সব কিছু মনেও নেই। বয়সের কারনে এখনতো আর লিখতেও পারিনা সেভাবে। তবে বইপাড়া আমায় টানে। আজও পয়লা বৈশাখ দুপুর থেকে সন্ধ্যে কেটে যায় বইপাড়ার গন্ধেই।

 

 

 

সমরেশ মজুমদার, সাহিত্যিক

পয়লা বৈশাখে বইপাড়ার জমজমাট আড্ডাটাই হারিয়ে গেছে। গত পঞ্চাশ বছর ধরে পয়লা বৈশাখ কলেজ স্ট্রিটে যাই আমি। এক সময় বাংলা সাহিত্যের দিকপালেরা বিভিন্ন প্রকাশকের ঘরে আসতেন। আমরা তখন তরুণ। তাঁদের কথা শুনতাম। আজ তো অনেকেই নেই। আজ আমরা প্রবীন। কিন্তু শোনার লোক নেই। তবে এখনও মাঝেমাঝে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়রা আসেন। আড্ডা মারি। নতুনদের তো সেইভাবে বইপাড়ার আড্ডায় পাই না। এখন তো বই ব্যবসা বইমেলা কেন্দ্রিক। কিন্তু সেখানেও আর প্রাণ খুঁজে পাই না। আগে বইমেলা ছিল চিড়িয়াখানা,এখন মিউজিয়াম মনে হয়। তবে পয়লা বৈশাখ বইপাড়ার বাইরে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বই হীন আড্ডা মারি সারাদিন।

 

 

সবিতেন্দ্রনাথ রায়, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স

আগে বইপাড়ায় ১লা বৈশাখের হালখাতা ছিল জমজমাট ব্যাপার। এখন ইনকাম ট্যাক্সের হুকুমনামায় এই উৎসবটি নামে মাত্র হয়। একটা সময় ছিল যখন কলেজ স্ট্রিটের অনেক ব্যবসায়ী, কাগজওয়ালা,প্রকাশক, পুস্তকবিক্রেতা পয়লা বৈশাখে নতুন হিসেবের খাতা শুরু করতেন। পরবর্তীকালে লেখক–প্রকাশক আড্ডার ব্যবস্থা করা হয়।এটা আমি আমাদের সংস্থায় প্রথম থেকেই দেখে আসছি। যেমন মনীষায় আড্ডা হত। এখনতো অনেক জায়গাতেই হয়। এক এক সময় গুণীজনের ভীরে আড্ডাঘরে জায়গা অকুলান হয়ে যেত। তখন প্লেটে করে বা বসিয়ে খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল। তবে আমাদের এসব অঞ্চলে তখনও বুফে( দাঁড়া খাবারের) চল হয় নি। হালখাতার সময় রঘুনাথ দত্ত, ভোলানাথ দত্তর বাড়িতে ভিয়েন বসত। ঠাকুর রেখে রান্নার আয়োজন করা হত। যারা কাগজের দেনদার তারা এদিন মোটা টাকা শোধ করতেন। এইরকম এক হালখাতার দিনে ভোলানাথ দত্তের দোকানে গিয়ে দেখি দাদাঠাকুর (শরৎচন্দ্র পণ্ডিত)। সেখান থেকে ছাঁদা বেঁধে মিত্র-ঘোষ এ এলেন। তখনও বাংলা সাহিত্যের দিকপালেরা আসতেন, এখনও আসেন।

 

সুধাংশু দে,কর্ণধার,দে’জ পাবলিশিং

১৯৭০ সাল থেকে এই পয়লা বৈশাখ ঘিরে কত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, কাকে ছেড়ে কার কথা বলব? নামগুলো ভীর করে আসে। বছরের প্রথম দিনে আসতেন সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, তারাপদ রায়,শক্তি চট্টোপাধ্যায়,পূর্ণেন্দু পত্রী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্তোষ কুমার ঘোষ, সমরেশ বসু,গৌরকিশোর ঘোষের মত বিখ্যাত সব মানুষেরা। এখন আসেন নবনীতা দেবসেন,বাণী বসু,প্রফুল্ল রায়,সমরেশ মজুমদার অনেকেই। নতুনদের মধ্যে আসেন প্রচেত গুপ্ত, উল্লাস মল্লিক, বিনোদ ঘোষাল প্রমুখ। সকাল থেকে শুরু হয় আড্ডা। চলে রাত অবধি। যে যখন পারেন আসেন। কথায় গল্পে কত রকমের ঘটনার কথা জানা যায়। আমরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি এই দিনের জন্য।এদিন কিছু বই প্রকাশিত হয়। বইয়ের বিক্রি-ব্যবসা ভালই হয়। লেখক-পাঠক যোগাযোগ হয়। এবছর থেকে আবার হচ্ছে নববর্ষ বইমেলা(১১ থেকে ১৯ এপ্রিল)।

ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়,কর্ণধার,পত্র ভারতী

পয়লা বৈশাখ মানেই লেখক,পাঠক, প্রকাশক মুখোমুখি হওয়ার দিন। বইপাড়ার এটা একটা ঐতিহ্য। এত গুণীজন সমাবেশ অন্য সময় হয় না। ধর্মীয় ব্যাপারটাকে সরিয়ে রেখেই বলছি,এর মধ্যে আনন্দের যেটা – এদিন এক ছাদের তলায় সকলে আসেন। সামিয়ানা টাঙানো থাকে। উৎসবের আয়োজন। লেখকরা আসেন। আসেন অটোগ্রাফ শিকারিরা। থাকে মিষ্টিমুখের ব্যবস্থা। তালশাঁস সন্দেশ থেকে ডাবের জল। এখনতো কোল্ডড্রিঙ্কসও থাকে। বইও বিক্রি হয় ভাল। তবে আগে যেমন এদিন লেখকদের সম্মানদক্ষিণা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল এখন তা আর হয় না। সেটা অর্থ বছর হিসেব করে আলাদাভাবে করা হয়। আসলে এদিন বাংলা প্রকাশনা জগতের এক আনন্দের দিন । এদিন এক মিলনমেলা।

 

 

 

সৌরভ মুখোপাধ্যায়,সপ্তর্ষি প্রকাশন

নববর্ষে প্রতি বছরই আমরা লেখকদের আমন্ত্রণ জানাই। একটু জলযোগের ব্যবস্থাও থাকে। সংখ্যায় কম হলেও প্রায় প্রতি বছরই নতুন বই প্রকাশ করি আমরা। গত বছরও বই বেরিয়েছে। তবে এবার প্রকাশনার বাজার খুব খারাপ,তাই নতুন বই প্রকাশের কথা ভাবা হয় নি। আগামী দিনে ভাবনা আছে নতুন ভাবে পয়লা বৈশাখকে পালন করার।

 

 

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ