তারিখ: 13 Apr

বাংলা সাহিত্যে সমকামিতা

শম্পা ভট্টাচার্য


মানবমন অতলান্ত। সেই মনের অতলে লুকিয়ে থাকে গুপ্ত ও সুপ্ত কামনা বাসনা। তবে মাত্রাভেদে ভিন্নতা তো আছেই। তার সঙ্গে যখন যুক্ত হয় শরীরের বিবিধ রসায়ন, তখনই সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় একটি মানবরূপ। তৈরি হয় সম্পর্কের নানা রূপভেদ, যে সম্পর্ক নানা প্রকৃতির, নানা প্রবৃত্তির। কারণ বৈষ্ণবশাস্ত্র অনুযায়ী সব ভাবই বিবিধ রসাশ্রিত। এর মধ্যে মধুর ভাব থেকেই মুখ্যত আকর্ষণ বোধের জন্ম এবং নারী পুরুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ যুগে যুগে সাহিত্যে ও সমাজে প্রধান হয়ে উঠেছে। ‘প্রেম’ শব্দের মধ্যে লুকিয়ে আছে রহস্যের অনন্ত ঘেরাটোপ, কিন্তু বহু আগে ‘প্রেম’ শব্দটি সাহিত্যে যতখানি স্থান পেয়েছিল, ‘যৌনতা’ শব্দটি স্বমহিমায় উচ্চারিত ছিল না ততটা। কিন্তু এ এমন এক প্রবৃত্তি, যা মানুষের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মতই সহজ স্বাভাবিক। মাত্রাভেদে কারো কম, কারো বেশী। কিন্তু সমলিঙ্গের প্রতি প্রবৃত্তির যে গতায়াত, তা শুনলে এখনো ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে ওঠে। কারণ তা গতানুগতিক জীবনের ভিন্নমুখী স্রোত। সাহিত্যে তাই এর প্রয়োগও খুব বেশী দেখা যায় না। কিন্তু মানুষের অন্তঃপ্রবৃত্তিকে স্বীকার করতে গেলে এই কামনাকে অস্বাভাবিক বলে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায় না, তাই এই যুগে এই বিষয় আইন – আদালতের পথ পেরিয়ে সমাজ – সাহিত্যে বেশ খানিকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে।

সমকামিতার প্রসঙ্গ এলে দেখা যায় তার উদাহরণ যুগে যুগে। আধুনিক সাহিত্যে, সিনেমাতেও বারবার জায়গা করে নিয়েছে সমকামী মানুষের গল্প। প্রাচীন নাগরিক সমাজ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণা জন্ম নিয়েছিল গ্রীসে। সেই গ্রীস, যে কখনো নাগরিকের যৌন স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। সমলিঙ্গ যৌন সংসর্গের বৈধতা নিয়ে কোনও প্রশ্ন ছিল না সেখানে। হেরোডেটাস, প্লেটোর মতো দার্শনিক চিন্তাবিদদের লেখায় প্রায়ই পাওয়া যায় সমকামী সম্পর্কের কথা। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রীসের লেসবন দ্বীপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন স্যাফো। এই মহিলা কবির লেখার প্রতিটি পরতে পরতে ছিল নারী শরীরের বন্দনা। স্যাফোর জন্মস্থান লেসবন থেকেই অভিধানে জায়গা পেয়েছে লেসবিয়ান শব্দটি।

প্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীন পারস্যে সমকামী সম্পর্কের প্রচলন ছিল। বাৎস্যায়নের কামসূত্রও বলেছে সমকামিতা যৌন সম্পর্কের অন্যরূপ। অতীত ও বর্তমান কোন কালেই সমকামিতাকে অস্বীকার করার উপায় না থাকলেও রক্ষণশীল সমাজের বাধা তো আছেই। তাই সাহিত্যের দিকে তাকালে তার পরিসরের ক্ষেত্রকে খুব সীমাবদ্ধ বলে মনে হয়েছে। তবু, সাহিত্যে যা নিদর্শন পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে কোনমতেই অস্বীকার করা যায় না এর অন্তরালে থাকা মনস্তাত্ত্বিক কিছু প্রবৃত্তিকে। এছাড়া শারীরিক কিছু কারণ তো অবশ্যই বর্তমান। ইংরেজি সাহিত্যে ক্রিস্টোফার মার্লোর ‘এডওয়ার্ড দি সেকেন্ড’ (১৫৯৩ – ১৫৯৪) এবং মহেশ দত্তানির ‘Bravely fought the queen’ (1991) নাটক বর্তমান সমাজে বহু আলোচিত।

জগদীশ গুপ্তের গল্পে সমকামিতার আভাস পাওয়া যায় মাত্র। রাণুর স্বামীর বদলি জনিত কারণে অন্যত্র যেতে হবে। যাবার আগে রাণু কানুর স্ত্রী ইন্দিরার সঙ্গে একরাত্রি কাটাতে চায়। তার মুখ থেকে নির্গত হয়, “তুই আর আমি এক হয়ে যাই’। অর্থাৎ এক নারী অপর নারীর সাথে এক হয়ে যাওয়ার বাসনা শুধুই সমকামিতার দিককে প্রকাশ করে না, সমকামিতা হয়ে যায়, একটা মাধ্যম। মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে রূপকে অতিক্রম করে ইন্দিরার অঙ্গসান্নিধ্যে লিপ্ত কানুর সঙ্গে মিলনের প্রবলতম ইচ্ছে। অর্থাৎ রূপ নয়, অরূপের মধ্যে দিয়ে নিজেকে স্বামী আর ইন্দিরাকে স্ত্রী ভেবে মিলনেচ্ছায় রাণু বলেই ফেলে সেই ইচ্ছের কথা। ইন্দিরার মুখে শুনি – “যেন স্বামী আর স্ত্রী, সে আর আমি”। কিন্তু লেখক এখানে মুখ্যত দুই নরনারীর সুপ্ত কামকেই স্পষ্ট করে তুলতে চেয়েছেন।

একদিন পরিচিতজনের বাড়ীতে গিয়ে সে বোঝে, পুরুষের আকর্ষণদৃষ্টির ক্ষমতা তার কমেছে ; তবু মন আছে আছে করে ওঠে এখনও। কুমারী বলে তাকে গ্রাহ্য করবে না, একথা প্রতিবার মনে হয়। কমলকুমার মজুমদারের মল্লিকা বাহার – এ সমকামিতার স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। মল্লিকার পুরুষ সঙ্গের অভাব তার যৌনতার অভিমুখ বদলে যায়। গল্পের মোড় ফেরে শোভনাদির সঙ্গে মল্লিকার দেখা হওয়ার ঘটনায়।

একটি বাক্যে লেখক ব্যক্ত করেছেন – ‘শোভনার চোখে অন্য এক আলো এসে পড়েছে, তার চোখে মুখে দেখা যাবে পুরষালি দীপ্তি, যে কোন রমণী যে সে ঘাটের পথে, বাটের পথে চিকের আড়াল হতে দেখুক, ভাল এ দৃষ্টি লাগবেই’। “শোভনার স্পর্শের মধ্যে কেমন এক দিব্য উষ্ণতা, এ উষ্ণতা বহুকাল বয়সী বহুজন প্রিয়। মল্লিকার এ উষ্ণতা ভাল লেগেছিল ভারী ভাল লেগেছিল”। এই বর্ণনা থেকে অস্বীকার করার তো উপায় নেই, মল্লিকার মন সায় দিয়েছিল বলেই তো তার ভাল লাগা ; অথবা অন্তর থেকে সে স্পর্শসুখকাতরতা অনুভব করেছিল বলেই শোভনার সঙ্গে সে তাদের বাড়ীর ছাদে যায় কিছুক্ষণ সময় কাটানোর জন্য। সেখানে শোভনার আচরণের মধ্যে পুরুষালি ভাবের পরিচয় এবং “শোভনা আপনার মধ্যে মল্লিকাকে এনেছে, সোহাগ করে মালা পরিচয় দিয়েছে, সে মালা তার কণ্ঠে বিলম্বিত, চুম্বনে চুম্বনে শোক ভুলিয়ে দিয়েছে”। গল্পের শেষ অংশটিতে অনেক সাহসী কথোপকথন লক্ষ্য করা যেতে পারে– “এবার শোভনা খেদের গলায় বলে,‘কই তুমি তো আমায় খেলে না ? তুমি আমায় ভালোবাসো না’ ? ‘বাসি !’। মল্লিকা শোভনাকে বিশেষ অপটুতার সঙ্গে গভীরভাবে চুম্বন করলে। শোভনা জিজ্ঞাসা করলে, ‘আগে কাউকে কখনো  এমনভাবে ………” হ্যাঁ …… আচ্ছা আপনি’ ? ‘ আমায় তুমি বলো, আমি তোমার কে ? বলো ?’  ‘আচ্ছা তুমি ?’ ‘না, দৃঢ় কণ্ঠে শোভনা বললে। বোধহয় মিথ্যা। হেসে বললে, ‘আমি তোমার স্বামী, ‘তুমি’, ‘বউ শুনে শোভনা আবেগে চুম্বন করলে। শোভনার মুখসৃত লালা মল্লিকার গালে লাগল”।

পূর্ব্বোক্ত গল্প আর এই গল্পটির মধ্যে মূল ভাবের তফাৎ আছে ঠিকই ; কিন্তু লক্ষ্যণীয় সাহিত্যিকরা এগিয়ে চলেছেন মানবমনের অন্তরশায়ী প্রবৃত্তিকে নানা মাধ্যমে তাকে প্রকাশ করার দিকে। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, এই মিলন স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থায় কিছুটা অপ্রচলিত। কিন্তু সাহিত্যে যা ঘটে, বাস্তব থেকেই তো ঘটে তার প্রতিফলন। কাজেই কমলকুমারের গল্পে শেষের দিকে লেসবিয়ানিজম – এর প্রাধান্য। কোন কোন ক্ষেত্রে সমকামী যৌন আচরণকে অপ্রাকৃতিক বলে মনে করা হত। কাজেই সাহিত্যে তা এসেছে ; তবে সেই পর্দার আবরণ খুব সূক্ষ। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘বুটিক ছুটকি’ গল্পেও খুব সংক্ষিপ্তভাবে শেষ দিকে এসেছে দুই বোনের স্পর্শজনিত অনুভবের কথা। দারিদ্র্যের এক ভয়াবহ চিত্র এই গল্পের প্রেক্ষাপট হিসেবে বর্তমান। মাতৃহীন দুই সমবয়সী বোনের জীবনে না আছে কোন আনন্দের কলরব অথবা কোন আশার প্রদীপ। ক্রাচ নিয়ে জীবনোপায় অবলম্বন করা দরিদ্র পিতা প্রতাপের বাড়ীতে ইলেকট্রিকের আলো কেটে দিয়েছে। কোনক্রমে দুবেলা গ্রাসাচ্ছাদন তাদের একমাত্র জীবনের ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রাকৃতিক নিয়মে দুই বোন চৌদ্দ পনেরোয় যখন পৌঁছায়, তখন স্বাভাবতই পুরুষের দৃষ্টির আওতার বাইরে থাকে না তারা, ‘বটুকির কোমরের দিকটা সুন্দর। ছুটকির বুকের দিকটা’। গল্পের মধ্যে সীমাহীন দারিদ্র্যের ছবির মধ্যে থেকে ফুটে ওঠে আরো একটা দিক। উদ্ভিন্ন যৌবনা দুই নারী রাত একটা অবধি নিশ্চিদ্র অন্ধকারের মধ্যে জেগে থাকে বাবার আসার প্রতীক্ষায়, কখন ফিরবে বাবা, ততক্ষণ দুই বোন পরস্পরের সহমর্মী হয়ে বেঁচে থাকে। জামা – কাপড়ের অভাবে রাতের অন্ধকারে তারা নিরাবরণ হয়ে শোয় – একজন দেখে ‘দিদির ঘাড়ের সুন্দর বাঁক। শাঁখের মতন সরু হয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে আসা গলা’। আর দিদি দেখে ‘সবুজ আলোটা বল্লমের মতো খোঁচা মেরে ছুটকির সুন্দর উঁচু বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, পাতলা জামার ছিদ্র দিয়ে, উদ্ধত স্তনের চূড়ায়। একটা চূড়া বেরিয়ে এসেছিল”। দুই নারীর পরস্পরকে অবলোকনই নিয়ে আসে দুজনকে কাছাকাছি। বিশেষত ছুটকি যখন বলে “রক্ষা করো বাবা, দরকার নেই রাজার ছেলের, বিনা পণে যদি বুড়ো মদন এসে তুলে নিয়ে যায় বাঁচি” তখন বোঝাই যায়, কামনা বাসনার প্রতি লোভাতুর হয়ে আছে অসহায় নারী। না হলে রাত্রের অন্ধকারে নিরাবরণ দুই বোন দুটি শরীরকে আশ্রয় করে উষ্ণতা চাইবে কেন ? রাতের অন্ধকার দুজনের কামনা প্রকাশের সহায়ক হয়ে ওঠে ; গল্পটির পড়ে মনে হয়, সমকামনা উদ্ভূত হয়ে ওঠার একটা পরিবেশ রচনা করেছেন লেখক। সম্ভবত তার মনস্তাত্ত্বিক কারণটিও খুব অযৌক্তিক নয়। নারীর উদ্ভিন্ন যৌবন চায় স্তুতি, অন্যের সপ্রশংস চাহনি। কিন্তু লক্ষণরেখা টেনে দেওয়া প্রতাপের শাসনে তারা একপ্রকার গৃহবন্দী, তাই দুজন তখন হয়ে ওঠে দুজনের দোসর, কামনার বর্ণে যা রঞ্জিত।

বাণী বসুর ‘স্বপ্নময়’ গল্পটিকে সেই অর্থে সমকামিতার গল্প বলা যায় না ; কিন্তু গল্পটিকে ঘিরে রেখেছে রহস্যময়তার এক স্বচ্ছ আবরণ। গল্পটির মুখ্য অংশ জুড়ে রয়েছে বারো বছরের কিশোর স্বপ্নময় তথা দুষ্টুর কাহিনী আর গল্পটির মধ্যে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে আছে বাসন্তী – জয়তী – নমিদি – চামেলি – শশধর – কান্তিময়ের উপাখ্যান। গল্পটির মধ্যে কোথাও মাথা উঁচু করে দেখা যায় নি কামনার তীব্র প্রসঙ্গ ; কিন্তু স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সমাজে চারদিকে তাকালে কি এমন পুরুষ চোখে পড়ে না, যারা প্রকৃতিতে পুরুষ চিহ্ন ধারণ করেও অন্তরে নারীধর্মে বলবান ? প্রকৃতি একদিন লিঙ্গ বিভাজন করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল প্রজনন শুধু প্রজনন। ক্রমে এই লিঙ্গ বিভাজন মানুষের সমাজে এক দুস্তর সমস্যা হয়ে উঠলো। যৌন অপরাধ আর বিকৃতি ভয়ানক আকার নিল, মানুষের আত্মিক অগ্রগতির পথে অন্যতম বাধা হয়ে উঠলো, এ যেন অন্তর আনন্দের সন্ধানে যাওয়ার তীর্থপথে হঠাৎ এক অন্ধকার ভুলভুলাইয়ায় হারিয়ে যাওয়া। প্রকৃতি কি তাই নানাভাবে তাদের মেলাবারও আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ! কিন্তু সব ফল হচ্ছে – সমকামী। বাণী বসুর উপন্যাসটির ক্ষেত্রে এটা বলা যেতে পারে একটা যে, পারিবারিক কোমল পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকে তিনি প্রশ্ন তুলে এনেছেন বর্তমান সমস্যার দিকে, যা লিঙ্গান্তর চর্চার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে পাঠকদের। আর যারই পরিবর্তিত রূপ আমরা দেখি স্বপ্নময় চক্রবর্তী রচিত ‘হলদে গোলাপ’ উপন্যাসটির মধ্যে। তার আগে আর একটি উপন্যাসের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তা হল তিলোত্তমা মজুমদারের ‘চাদের গায়ে চাঁদ’ উপন্যাসটি –

এটি একটি সমাজকেন্দ্রিক উপন্যাস। এই উপন্যাসটিতে আছে যৌনতা বিষয়ক কিছু ধারনার কথা। একটা আবাসিকের কিছু অন্তর্দৃশ্য আর শ্রুতি নামক একটি মেয়ের জীবনের সামনে এক একটি রহস্য পর্দার উন্মোচন। মাতৃহীন মেয়েটি প্রতিবন্ধী মানসিক জড়বুদ্ধিসম্পন্ন ভাই আর অসহায় পিতাকে রেখে হোস্টেলে যায় পড়াশুনো করতে। হায়ার সেকেন্ডারিতে উজ্জ্বল ফলের অধিকারিণী শ্রুতি ফিলজপিতে অনার্স নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করে এবং একই ঘরে চারটি মেয়ের একত্র অবস্থান ভিন্ন ধরনের প্রতিবেশ সৃষ্টি করে। দেবরূপার শ্রেয়সীর প্রতি সমকামিতার প্রকাশ তাকে ক্রমশঃ বিপন্ন করে তোলে … “শ্রুতি হোমোসেক্সুয়াল ঘেন্না করে। শ্রুতি হোমোসেক্সুয়াল ভয় পায়”। দেবরূপা শ্রেয়সীর প্রতি আসক্ত, যদিও শ্রেয়সী শুভ্রশীলের প্রতি প্রণয়াসক্ত। কিন্তু কাহিনী থেকে জানা যায় দেবরূপা প্রচন্ডই পুরুষবিদ্বেষী। তাই সে শ্রেয়সীকে শুভ্রশীলের কবল থেকে মুক্ত করতে চায়। আর এই সব কিছুর মূলেই যে তীব্র কামচেতনা তা লেখিকা বুঝিয়ে দিতে চান উপন্যাসে – “তোমাদের মধ্যেও দেখো এই দুই বিভাগ। পীড়ক ও আত্মপীড়ক। কিন্তু দুই–ই স্বাভাবিক। দুই–ই কামবোধের প্রকাশ। দুই-ই প্রকৃতির ইচ্ছা। শুধু বৈচিত্র ব্যাপ্ত। নারী নারী, পুরুষ পুরুষ সম্পর্কে ভেদ নাই। কারণ শুধুই মানুষে মানুষে টান সমাজের জন্ম দিয়েছিল। মানুষে মানুষে টান গড়নের জন্ম দেয়”।

দেবরূপার সঙ্গে শ্রেয়সীর গাঢ় বন্ধুত্ব শ্রুতির কাছে ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। পড়াশুনোর যে লক্ষ্য নিয়ে সে কোলকাতায় হোস্টেলে এসেছিল, তা এই সমকামিতার চাপে কিছুটা বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে এবং এক সময়ে হোস্টেলে দেবরূপা শ্রেয়সীর ব্যাপার জানাজানি হয়ে গেলে সে শ্রেয়সীর মুখ চেয়ে বিরুদ্ধাচারণ করতে পারে না। হোস্টেলচ্যুত হয় এবং সবার সামনে সে ‘ভয়ার’ রূপে প্রতিভাত হয়। যে শব্দটির মানে অজানা ছিল শ্রুতির কাছে ; পরে জেনেছিল, a sexual pervert who derives gratification from surreptitiously watching sexual acts or objects : a peeping Tom : One who takes a morbid interest in sordid sights’. প্রতিটি শব্দই তার পক্ষে যথেষ্ট অপমানকর। কিন্তু পাঠকের মনে বিশ্বাস জন্মায় শ্রুতি নেহাতই মানবিকতা ও বন্ধুত্বের খাতিরে এই সমকামী সম্পর্ক উন্মোচন করেনি সকলের সামনে।

এই প্রসঙ্গে উপন্যাসে আসে কিছু বিদেশী মানুষের প্রসঙ্গ। যেমন – ডেভিড হকনি, ম্যারিও ডাবস্কি – এঁরা সমকামী। এঁরা শিল্পী। ডাবস্কি আসার পর গে লিবারেশন মুভমেন্ট আরো জোরদার হয়। এরপর ভেনিস ও সুলেভিন ১৯৭৮ সালে ‘টয়েলেট পিস’ নামে যে স্থাপত্যকীর্তি সৃষ্টি করেন তার মধ্যে দিয়ে সমকামী জীবনের স্বীকৃতি আন্দোলনকে আরো তীব্রতর করে। এরপর মানব জীবনের তৃতীয় সত্তার কথা তুলে ধরেন ; শুধুমাত্র হোমোসেক্সুয়াল বা লেসবিয়ানদের কথা না ভেবে বিখ্যাত গায়ক ফ্রেডি মার্কারি, এল্টন জন, বিখ্যাত ডাইভার গেরগ লোগোনিস, নামকরা ফ্যাশন ডিজাইনার জিয়ানি ভার সাচি এবং টেনিস প্লেয়ার মার্টিনা নাব্রাতিলোভা – এর প্রত্যেকেই প্রতিভাবান, স্বাভাবিক, সুন্দর এবং সমকামী। এরা সবাই সমাদৃত।

কিন্তু তিলোত্তমা গভীর বিষাদে বলেন “শিল্প তার নিজস্ব উপলব্ধিতে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আমরা দিই নি। দিতে পারিনি। আমরা স্বাভাবিকতা এবং অস্বাভাবিকতার ব্যাকরণ হাতে মুখোমুখি থমকে দাঁড়িয়ে আছি কত বর্ষব্যাপী। সমাজের কাছে চূড়ান্ত গ্রহণযোগ্য সর্বার্থে একজন পূর্ণাঙ্গ পুরুষ এবং পূর্ণাঙ্গ নারী”। লেখিকার এই ভাবনাকে সমাদর করতে সাধ জাগে ; শ্রদ্ধা করতে  ইচ্ছে হয়।

এরপর আসে উপন্যাসের অন্য অংশ ; যেখানে শ্রুতি হোপ সি সি আইতে জয়েন করছে ফিল্ড এসোসিয়েটের পদে ; একটি এন জি ও সংস্থার হয়ে। যেখানে তার আবার দেখা হয়ে যায় দেবরূপার সঙ্গে। যে দেবরূপা পরনে পুরুষালি পোষাকে সজ্জিত নয় ; শাড়ি পরিহিতা – কিন্তু জীবনের বিকৃত কামের মুখোমুখি হয়েছে শ্রুতি। ষোল সতেরোর যে ছেলেগুলোকে তারা লালন করে, সেখানে দেখেছে জীবনের কদর্য রূপ, শুনেছে পায়ুসঙ্গমের কথা, সাক্ষী হয়েছে একটি শিশুর মৃত্যুর – কিশোরদের ওপর নিষ্ঠুর পাশবিক অত্যাচার। তার কারণও কি সঠিক দেওয়া যায় ? দেবরূপার ভাই দেবাংশু তার কারণ প্রসঙ্গে বলে – “জীবনের তো কোনও নিজস্ব রুটিন নেই। কোনও অনুভূতিকেই ব্যাখ্যা করতে যাওয়াটা অর্থহীন লাগে আমার। মনই তো সেই চূড়ান্ত রহস্য, সেখানে কি অন্ত পাওয়া যায়” ? দেবরূপার কথা চিন্তা করতে গিয়ে শ্রুতির সমবেদনা জেগেছে তৃতীয় লিঙ্গের প্রতি। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এখানে লেখিকা ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন মনুষ্যধর্মকে, সাহিত্যে এই সহানুভূতিটুকুও তো খুব সহজলভ্য নয়। সেই অর্থে তিলোত্তমাকে অগ্রণী বলা যেতেই পারে। তিনি স্পষ্টতই বলেছেন – “কোনও মানুষ, তার ভুল যৌনাঙ্গের জন্য দায়ী নয়। তার মস্তিষ্ক ঠিক বলে, তার অনুভূতি ঠিক বলে, তার মানবতাবোধ সুস্থ ও স্বাভাবিক। তা হলে সে গ্রাহ্য হবে না কেন” ? অথবা, “যারা সমলিঙ্গকামী বা যাদের লিঙ্গ নির্ধারিত নয়, তারাও সঙ্গ প্রার্থনা করে। মানুষ চায়। সমাজ চায়। তাদের যৌন চাহিদার প্রকৃতি প্রকাশ করলে সমাজে ব্রাত্য হবে জেনেও তারা তা প্রকাশ করে, কারণ না করে তাদের উপায় নেই। কারণ চাহিদাই তাদের কাছে প্রাকৃতিক”। সুতরাং উপন্যাসের সঙ্গে নারী রূপী ললিতা আর পুরুষরূপী দেবরূপার শরীরী মিলনকে শ্রুতি দেখে উদাসীন চোখে। কিন্তু যে সংস্থা কিশোরদের লালন করে, তাদের সামনে এরূপ কামনালিপ্ততার ছবি নিষিদ্ধ তো বটেই। তাই শ্রুতির চেতনাবোধ জাগ্রত হয়ে ওঠে প্রমিতাদিকে এই সম্পর্কের কথা জানাবে বলে, কিন্তু মনের দিক থেকে শ্রুতি নানা ভাঙ্গনের পথ পেরিয়ে আত্মোপলব্ধির একটা জায়গায় এসে থেমেছে “আমি জানি, সুকুমার বুঝবে না, ওরা শরীর প্রকৃতি ছাপিয়ে গেছে। মন–প্রকৃতিতে মিলেছে। চিরন্তন নারী–মন চিরন্তন পুরুষ-মনে মিলেছে। দেহ–গঠন এখানে বাধা হয়নি। নারীদেহধারী পুরুষ, পুরুষদেহী নারীকে জড়িয়েছে। জয় প্রকৃতির জয় !” আপন চন্দ্রালোককে মনের আলোয় প্রতিফলত হতে দেখে শ্রুতির আত্মোপলব্ধি বাংলা সাহিত্যকে কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বর্তমান সাহিত্যে সমকামিতা রূপান্তরকামিতার প্রসঙ্গ আসছে। একেবারে প্রথম দিকের সাহিত্যে যা ছিল অনুচ্চকিত আজ একবিংশ শতকে এসে তা অনেকটাই উন্মুক্ত। বদলেছে মানুষের মানসিকতা, বদলেছে মানুষের প্রান্তিক ধ্যান ধারণা। তাই আজ পুরস্কার পায় স্বপ্নময় চক্রবর্ত্তীর ‘হলদে গোলাপ’। এই উপন্যাসটির পর্যালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রধান আলোচ্য এর বক্তব্য বিষয়টি। দীর্ঘ গবেষণা, সাক্ষাৎকার, পুরাতত্ত্ব, বর্তমান সমাজতত্ত্ব, নর নারীর যৌন সম্পর্ক, সমকামীদের আকাঙ্খা – যন্ত্রণা, একটি বিশেষ তৃতীয় লিঙ্গের সম্প্রদায়ের বিস্তৃত বিবরণ উপন্যাসটিকে একটি বৈপ্লবিক মাত্রা এনে দিয়েছে তাই নয়, এটি হয়ে উঠেছে তথ্যপূর্ণ এক ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস – যার উল্লেখ না করলে এই আলোচনা থেকে যায় অসম্পূর্ণ। সাহিত্যগুণের প্রসঙ্গ আমার বিচার্য নয়, কিন্তু লক্ষ্যণীয় লেখক এখানে তীব্রভাবে মানবিক এবং মানুষের মনে প্রচলিত রক্ষণশীল মনোভাবকে মেয়েলি ছেলেদের  অপমানিত হয়ে দেখেছি সমাজের নানা ক্ষেত্রে। ওদের কষ্ট পাওয়া উপলব্ধি করেছি। মানুষের লিঙ্গ পরিচয় এবং লৈঙ্গিক আচারণের আলোছায়া বুঝতে চেষ্টা করেছি”। এই আলোছায়ার একটা পর্দা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এই উপন্যাসের মধ্যে। খুব সচেতনভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, যৌন শিক্ষা নিয়ে আমরা কতটা আলোচনা করতে চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সঙ্গে ? এ নিয়ে যেন আমরা ঝাড়া হাত পা হলেই বাঁচি। ভাবি বয়সের বুদ্ধি ওদেরকে জানিয়ে দেবে, বুঝিয়ে দেবে সব কিছু। এ থেকেই ‘হিজড়া’ সম্প্রদায় সম্পর্কে আমাদের নিজেদেরও একটা সঙ্কোচের ভাব বিদ্যামান। তাই তারা সমাজের প্রান্তিক বাসিন্দা রূপে বিবেচ্য। ‘হলদে গোলাপ’ প্রসঙ্গে মনে পড়ে বিচারপতি কে এস রাধাকৃষ্ণণের উক্তি-‘তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি কোনও সামাজিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত ইস্যু নয়, মানবাধিকারের প্রশ্ন বলেই বিবেচ্য”। কিন্তু তারপর ? এখনও ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া তাদের আর অন্য উপায় কি ? ক’জন নিতে পারে অত্যাধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সুযোগ ? সহমর্মী মানুষ পাশে পায় কজন ? এই উপন্যাসে অনিকেত একজন বেতারকর্মী ; যিনি সমকামী, লিঙ্গান্তরকামী কিছু মানুষের কথা তুলে ধরেছেন এখানে, বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করেছেন হিজড়ে সম্প্রদায়ের অন্ধকারময় জীবনের কথা ; যৌনতার বিকৃতিজনিত কিছু অসুস্থতার কথা ; যাদের বর্তমানে এল জি বি টি বলে চিহ্নিত করা হয়, তাদের জীবনচিত্র। উপন্যাসের একটি অংশে উল্লেখ করা হয়েছে – “গোলাপের রঙ তো আমরা গোলাপ – ই বুঝি। পিংক। কিন্তু গোলাপ যদি সাদা কিংবা হলুদ হয়, তবে কি সেটা গোলাপ নয় ? আমরাও পুরোপুরি মানুষ। মানুষের সমস্ত ধর্ম আমাদের মধ্যে আছে। আমাদের মধ্যে শিল্পীসত্তা আছে, পরের জন্য দুঃখবোধ আছে, সমাজ সচেতনতা আছে, আবার হিংসা পরশ্রীকাতরতা আছে। শুধু ব্যক্তগত যৌনতার ক্ষেত্রে আমরা আলাদা”। মানবিকতার মূলে তীব্র জিজ্ঞাসা – কিন্‌সের তত্ত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছেন – “প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই পুরুষ সত্তা এবং স্ত্রী সত্তা আছে। সব পুরুষের কম বেশি সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ আছে”। অর্থাৎ লেখক স্বপ্নময় যুক্তি দিয়ে এখানে দেখাতে চাইলেন, বিষমকাম যেমন স্বাভাবিক একটা ব্যাপার, সমকামও তেমনি। তবে মানুষের হরমোনাল একটা ‘স্কেল’ থাকে। তার তারতম্যেই আসে ‘এল জি বি টি’ তত্ত্বটি।

উপন্যাসের মধ্যে এসেছে বর্তমান কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ মানবী বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা, এসেছে পরি নামক একটি চরিত্র – যে লিঙ্গান্তরের মধ্যে দিয়ে পেতে চেয়েছে নারী জীবন। বিবিধ অস্ত্রোপচারের পথ পেরিয়ে সে নিজের নারীত্বকে দেখে উৎফুল্ল হয়েছে, বিবাহ করে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছে আর এক সমকামী চয়নের সঙ্গে, কিন্তু গল্পের শেষে লেখক বলেন – ‘কাহিনি শেষ হল। এক সময় তো শেষ করতেই হয়। রূপকথার গল্পের মতো এবার যদি বলা যেত তারপর তাহারা পরম সুখে দিনাতিপাত করিতে লাগিল …… আহা ! যদি বলা যেত। …… এখানে মনের মধ্যে সঞ্চারিত হয় অনেক প্রশ্নের। পরিমলের ক্রমে পরি হয়ে ওঠা এবং অবশ্যই নিজের যোগ্যতায়। নিজের উপার্জিত অর্থে, তার পরিণতির সার্থকতা কি শুধুই লিঙ্গ পরিবর্তনে ? পরবর্তী সময়ের যৌন পরিতৃপ্তির কথা অজানা থেকে যায় আমাদের ; সে অভিজ্ঞতা হয়তো জানা যাবে আরও পরবর্তীকালের কোনও সাহিত্যে। কিন্তু আশংকা জাগে, প্রকৃতির বিপক্ষে গিয়ে মনোবাসনাকে পূর্ণ করতে গিয়ে প্রকৃতির প্রতিশোদের কবলে পড়বে না তো মানুষ ? পরিবর্তন মানেই তো বিপ্লব নয় ; প্রকৃতির বিরোধিতা করা নয়। সুধীর চক্রবর্তী গ্রন্থটির আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন ‘আনকমনদের বেদনার্ত আখ্যান’।

‘হলদে গোলাপ’ যেহেতু তথ্যনির্ভর উপাখ্যান, সেই সূত্রেই জানতে পেরেছি বেশ কিছু পত্র পত্রিকার কথা – যেখানে এল জি বি টি –দের মুক্ত মনের আদান প্রদান ঘটে, কবিতা প্রকাশিত হয়। বইমেলাতে গিয়ে লক্ষ্য করা যায় এদের দলবদ্ধতা, জমায়েত, নিজেদের কথাকে সর্বসম্মুখে তুলে ধরার একটা তীব্র আকুতি। সারা দেশ জুড়েও শুরু হয়েছে এল জি বি টি –দের আন্দোলন, একত্রীকরণ, সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে তার প্রকাশ পরবর্তীকালে আরও গল্প উপন্যাসের জন্ম দেবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বর্তমানে এ বিষয়ক একাধিক গল্প বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় উঠে আসছে। বিচিত্র তার গতি, কিন্তু কোনটাই মিথ্যে নয়, সজ্জিত নয়। ছোটগল্পের ধারায় চোখে পড়েছে ইন্দ্রলীন সান্যালের ‘কৃষ্ণকলি’ ‘ব্যাচেলার্স পার্টি, শ্রাবণী দাশগুপ্তের ‘ভ্রূপল্লবে ডাক দিলে’। কবিতাতেও এ প্রসঙ্গ আসছে। আধুনিক কবি অনুপম মুখোপাধ্যায়ের প্রকৃতির এই প্রবৃত্তিকে অন্তর দিয়ে সমর্থন জানিয়েছে নিচের কবিতায় –

সমকাম

আমার খবর জবাব নেই। কুসুমের কাছে

বাগান আমাকে এখানে। এই। নোটিশ দিয়েছে।

বোঁটা জানে, ডাল জানে। মালি নই আমি

বেতন দিয়েছে। শুধু। পরাগ দিল না।

হায়ের বয়স কত। কেউ কি তা জানে

এতদিন। ছায়া সে তো রোদেই ফেলেছে।

ধুলোর অনেক কাছে। রেণু। রাখা ছিল

আমার এলার্জি। তার। ঠিকানা পেল না।

সুগন্ধ এভাবে। বেশ। কেটেই চলেছে

অপর সুগন্ধী। সেই। মনে পড়ে গেল।

কিছু নেই। খুব জানি। কিছুই তো নেই

মাসের ১ম। এই। সুরাহা দিয়েছে।

এই কবিতাটি প্রসঙ্গে একটি কথা এখানে উল্লেখ করি। কবি বিরামচিহ্ন এবং কেটে দেওয়া শব্দগুলিকে এভাবেই মুদ্রিত রাখতে বলেছেন। সেটি তার নিজস্ব অভিমত এবং সেটি শৈলীগত ব্যাপার। সে আলোচনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু কবিতাটির অন্তর্নিহিত অর্থ অনুধাবন করে সমকামিতা বিষয়ক কিছু শব্দ উল্লেখ করতে চাই, যেমন – ‘পরাগ দিল না’ অথবা ‘রেণু’। রাখা ছিল / আমার এলার্জি / তার ঠিকানা পেল না’। দ্বিতীয় স্তবকটি গভীর ব্যাঞ্জনাবাহী। বাগান, ফুল, বোঁটা, ডাল, পরাগ, রেণু শব্দগুলি ব্যবহার করেছেন যাদের সাথে সৃষ্টির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। কিন্তু তারপরই ‘মালি নই আমি / বেতন দিয়েছে / শুধু / পরাগ দিল না’ – বাক্যবন্ধের মধ্যে দিয়ে যৌন সম্পর্কের ব্যর্থতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।

আধুনিক কালের অন্যতম কবি চৈতালি চট্টোপাধ্যায়ের ‘বান্ধবীবিহার’ কবিতাটি মনকে দ্রবীভূত করে। সমাজের সমপ্রেমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকাকে কবি ‘খোলা বাথরুম’ রূপে বর্ণনা করছেন। আধুনিক সময়ে স্বনির্বাচিত জীবনকে তুলে নিয়ে আসছি সাহিত্যের দরবারেও। অগ্রজ কবিদের থেকে একালের কবিতা এ বিষয়ে অনেক বেশী গতিশীল। কবি বলেছেন –

ব্যত্যয় নেই কোনও ! আমি

জানি, তোকে ভালবাসি, তাই এ–জগত

মধুময় লাগে। আয়োজনে, যদি কিছু

বিরোধিতা জাগে ! খুনি বোমা বেঁধে

চলে, কোকিল লুকিয়ে কাঁদে

বসন্তগোড়ায়, দুধে–বিষে মিশে গেলে,

তখন সমাজ, খোলা বাথরুম হয়ে,

যায় ! … দরোজা দিয়েছি, জানলাও,

আমাদের ঘরে মধুঘুম নামবে, বল

সখি, মম সঙ্গে লিভ–ইন করবে কি”।

সাহিত্যে এই ধরণের সম্পর্ক সমান্তরাল যৌন সত্তা বলে চিহ্নিত হচ্ছে বর্তমানে। পূর্বে যা ছিল অস্পষ্ট, ছিল ইঙ্গিতময়, এখন তাই হয়ে উঠেছে খোলা জানালা। মুক্ত বাতাস। এই সমান্তরাল সম্পর্ক এখন অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধনীভুক্ত হচ্ছে, তাই সাহিত্যেও এর অনাবিল প্রকাশ ঘটেছে। রক্ষণশীল বাঙালি সমাজের পরিবর্তন ঘটছে। মুক্তমন নিয়ে বিচার করলে দেখা যায়, সাহিত্যের আয়নায় বদলে রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপ থেকে বিম্বিত হচ্ছে মানুষের মনের যৌন প্রবৃত্তির বিভিন্ন রূপ।

অধ্যাপক শম্পা ভট্টাচার্য  কলকাতার দেশবন্ধু কলেজ ফর গার্লস–এর বাংলা বিভাগের প্রধান। গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখে থাকেন। বেশ কিছু নামী পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।   

প্রবন্ধটি ‘অন্বেষী’ (বৈশাখ-চৈত্র সংখ্যা,১৪২৩)তে প্রকাশিত। সম্পাদক ও লেখকের অনুমতিক্রমে ‘গল্পের সময়’এ পুনরায় প্রকাশ করা হল।

Tags: ,

 

 

 

  • কোটেশন ব্লগ

  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা

  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।