10 May

ছবির রবীন্দ্রনাথ

লিখেছেন:ছবির রবীন্দ্রনাথ


সাতষট্টি বছর বয়েসে ছবি আঁকার নেশা পেয়ে বসলো রবীন্দ্রনাথকে। তদ্দিনে কবিতা লিখে নোবেল প্রাইজও পাওয়া হয়ে গেছে তাঁর। আর সত্যিকথা বলতে কি কবিতার ভাষাও গেছে অনেকদূর এগিয়ে। ছবি দেখে ভক্তজন আহা আহা করতে লাগলো। ‘ঠাকুর’ এঁকেছে বলে কথা, খারাপ হতেই পারে না, নৈব নৈব চ। কিন্তু শুধু ভক্তজন বললেই তো আর চলে না, তাত্ত্বিক লোকজনের মতামতও দরকার। এগিয়ে এলেন শিল্পতাত্ত্বিক কুমারস্বামী। বললেন ‘নট চাইল্ডিশ বাট চাইল্ডলাইক’। ব্যাস, আর যায় কোথা।যারা এদ্দিন কি বলবে বুঝে উঠতে পাচ্ছিল না তারা হৈ হৈ করে উঠল ‘ঠিক ঠিক, হক কতা বলেচে,কবির মধ্যে যে শিশুটি বিরাজমান এ তারই খেলা,অবচেতনে’।‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশুর আনমনে’ ।

রানী চন্দ এক চিঠিতে লিখেছিলেন সেই ‘ছেলেখেলা’ প্রত্যক্ষ করবার কথা। গুরুদেব ছবি আঁকতে আঁকতে কালির শিশি উপুড় করে দিলেন তার ওপর, তারপর আবার তা থেকে ছবিটা উদ্ধার করবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কি কান্ড বলুন দিকিনি!

ছোটবেলায় ইস্কুলের বইতে ছাপা বিবেকানন্দ, নেতাজী, গান্ধি, আম্বেদকার এঁদের ছবির ওপরে দাড়ি, গোঁফ, চশমা, এইসব এঁকে অন্য মানুষ বানিয়ে দেওয়ার খেলা খেলেছেন কখনো?

রবীন্দ্রনাথ খেলতেন, বিশ্বভারতী নিউজের প্রচ্ছদে ছাপা নিজের ছবির ওপরে কলম চালিয়ে কখনো সাদা দাড়ি গোঁফকে করে দিচ্ছেন কালো,  কখনো নিজের দাড়ি গোঁফ মুছে দিয়ে নিজের মুখটাকে পাল্টে করে দিচ্ছেন এক মহিলার মুখাবয়ব।

আরও শুনবেন। রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইউরোপ গিয়েছিলেন ১৮৭৮ সালে। তখন সেখানে ইমপ্রেশনিস্ট এবং পোষ্ট ইমপ্রেশনিস্ট আন্দোলন চলছে। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ জীবিত।  শেষবার গিয়েছিলেন ১৯৩০সালে। তখন পল ক্লি এবং ক্যান্ডিনস্কি ব্লু রাইডার আন্দোলন পেরিয়ে চলে গেছেন বিমূর্ত শিল্পের দিকে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপ হয়েছে বাওহাউসের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াল্টার গ্রোপিয়াসের। কাজ দেখছেন এমিল নোলডে প্রমুখ জার্মান অভিব্যক্তিবাদী শিল্পীদের। আর কি কি দেখেছিলেন বলুন তো রবি ঠাকুর? ভ্রমন করেছেন জার্মানি, চেকোস্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, গ্রীস, রাশিয়া, ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স। তারপর দুই আমেরিকা। ওদিকে চীন, জাপান, মিশর, পারস্য, শ্রীলঙ্কা সহ অন্যান্য দেশে।

সে সময়ের আর কোন ভারতীয় শিল্পীর এইরকম দেখবার অভিজ্ঞতা হয়েছিল জানেন?

কারোর না।

রবীন্দ্রনাথ ইউরোপে চিঠি লিখছেন ঠিক কোন বিশেষ ধরনের ছবি আঁকার কাগজ তার কত পরিমাণে চাই। কিরকম রঙ, কোন কোম্পানির রঙিন কালির শিশি কতগুলো লাগবে তার নির্দেশ দিচ্ছেন। একেবারে পেশাদার আর্টিস্টের মতই। কেন বলুন তো? ছেলেখেলা করবার জন্য।

একটু দূরে ছিলেন রবি ঠাকুরের এক ভাইপো, তিনি ছবি আঁকতে পারতেন। তিনিই কেবল বললেন, এটা আসলে একটা ভলক্যানিক ইরাপশান। যা লিখে বলা যাচ্ছে না, গানে বলা যাচ্ছে না কিন্তু বলার প্রবল তাগিদ থেকে যাচ্ছে সেইটাই ছবি হয়ে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে আসছে। রবিকার প্রিয় এই ভাইপোটির নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একমাত্র লোক যিনি লক্ষন দেখেই রোগটা আন্দাজ করেছিলেন মোক্ষম।

জার্মান অভিব্যক্তিবাদী শিল্পীদের কাজ রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন খুব। ওদের আবার উডকাট বা কাঠ খোদাই ছবি নিয়ে বিরাট আন্দোলন চলছে তখন। এইসব একেবারে কাছথেকে দেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাঠখোদাই ছবিতে কাঠের খোদাই করা অংশটা হয় সাদা। আর ওপরের তলে কালি মাখিয়ে ছাপ নেওয়া হয় বলে সেটা হয় কালো বা অন্য গাঢ় রঙের। রবীন্দ্রনাথের ইচ্ছে ওইরকম এফেক্ট ওঁর ছবিতেও থাকে। দেখলেন হাল্কা রঙের প্যাস্টেল বা মোম রঙে ড্রয়িং করে তার ওপর কালি ঢেলে মুছে দিলে প্যাস্টেলের ওপরে কালি টেঁকে না, শুধু ফাঁকফোঁকর গুলোতেই রয়ে যায়, ফলে যে বুনট তৈরি হয় তা দেখতে প্রায় উডকাট প্রিন্টের মত। ব্যাস, শুরু হল প্যাস্টেলে এঁকে কালি ঢেলে টেক্সচার তৈরি করবার পরীক্ষানিরীক্ষা। তাতেও কি শান্তিতে কাজ করবার যো আছে। দেখে ফেললেন রানী চন্দ। রবীন্দ্রনাথের কি সময় আছে রানীকে জার্মান এক্সপ্রেশনিজমের তত্ব বোঝানোর, না ব্যাখ্যা করবার ধৈর্য আছে তিনি রঙ তুলি নিয়ে আসলে কি খুঁজছেন। সুতরাং রানী লিখে দিলেন গুরুদেব এঁকে তার ওপর কালি ঢেলে দিচ্ছেন, আর সবাই বললে ‘আহা চাইল্ড লাইক’ (আর মনে মনে ভাবলে বুড়োর ভীমরতি ধরেচে)।

১৯৩৪ সালের বিশ্বভারতী নিউজ পত্রিকার কতগুলি প্রচ্ছদ। কবির জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা। তাতে ছাপা রয়েছে কবির নিজের মুখের ছবি। আরম্ভ করলেন তার ওপর কাটাকুটি। একটা ছবিতে সাদা দাড়ি কালো হয়ে গেল, যার একটায় কবির মুখ হয়ে গেল এক মহিলার ছবি। অন্য কেউ এটা করলে তার কি শাস্তি হত জানেন তো? তিনমাসের জেল আর সাতদিনের ফাঁসী। কিন্তু গুরুদেব নিজেই যদি এইসব কালাপাহাড়ি কাণ্ড করেন তো কি আর বলা যায়।

‘ডিকন্সট্রাকশান’ কথাটা তখনো বাজারে আসে নি। লাঁকা, ফুকো, দেরিদা এঁরা সব হয় জন্মাননি অথবা উঠোনে হামা টানছেন। আর তখন রবীন্দ্রনাথ নিজের ছবির ওপর কলম চালিয়ে, নিজের লিঙ্গ পরিচয় পর্যন্ত পাল্টে দিয়ে নিজেই নিজেকে ‘বিনির্মাণ’ করছিলেন। নিজের সময়ের থেকে অর্ধশতাব্দী এগিয়ে গিয়ে ‘উত্তর আধুনিক’ ছবি আঁকছিলেন। সবাই ভাবলে বীরভূমের গরমে বোধহয় গুরুদেবের মাথাটাই……।

মানুষ আঁকার সময় হাত পায়ের ড্রয়িং ‘ভাল’ হত না রবীন্দ্রনাথের। মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু ওঁকে একটা খাতায় কিছু ড্রইং করে দিলেন, হাত মকশো করবার জন্য। কদিন চেষ্টা করেই রবীন্দ্রনাথ বুঝে গেলেন ওসব তাঁর কর্ম নয়। নতুন উদ্যমে নিজের কাজে মন দিলেন। অনেকদিন আগে অ্যান্টন মভের স্টুডিওতে একটা প্লাস্টারের তৈরি মানুষের পা দেখে আঁকতে অস্বীকার করেছিলেন এক ছাত্রশিল্পী। বলেছিলেন ‘আমি সেইদিন প্লাস্টারের তৈরি হাত পা দেখে আঁকা শিখবো যখন দুনিয়ায় আসল মানুষের হাত পা বলে আর কিছু থাকবে না’। অ্যান্টন মভ ঘাড় ধাক্কা দিয়ে এই অবাধ্য ছাত্রটিকে দূর করে দেন। এই ছাত্রটির নাম ছিল ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ।

তো এই হচ্ছে গিয়ে ব্যাপার। সমকালীন আর্টের পণ্ডিতেরা নোবেলজয়ী কবির রংতুলি নিয়ে ‘ছেলেখেলা’কে কোন কমপার্টমেন্টে ফেলবেন সেটা ঠিক করতে না পেরে বলে বসলেন এ হল ‘নাঈভ’ আর্ট। তা এই ‘নাঈভ’ কথাটার মানে কি? অভিধান বলছে নাঈভ মানে (of a person or action) showing a lack of experience, wisdom, or judgment!!! তাহলে ব্যাপারটা কি দাঁড়ালো? একজন সংবেদনশীল কবি, যিনি লিখে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, সশরীরে ঘুরে বেড়িয়েছেন প্রাচ্য ও পশ্চিমের অধিকাংশ দেশ, মন দিয়ে দেখেছেন সেইখানকার শিল্পসংস্কৃতির অসংখ্য নিদর্শন, ব্যক্তিগত সংস্পর্শে এসেছেন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের তিনি যখন ছবি আঁকছেন তখন সেখানে অভিজ্ঞতা, উইসডম বা জাজমেন্টের অভাব থেকে যাচ্ছে। আর যারা দুকলম লিখে আর দুটো বই পড়ে পণ্ডিত হয়েছেন, বা আর্ট ইস্কুলের গতানুগতিক শিক্ষায় ‘শিক্ষিত’ হয়েছেন তারা হলেন সব ‘প্রশিক্ষিত শিল্পী’। রবীন্দ্রনাথ নিজেও জানতেন ব্যাপারটা, তাই এদের প্রশ্রয় দিতেন, বলতেন হ্যাঁ ঠিক ঠিক, আমি ছবি আঁকার কিচ্ছু জানি না।

এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী ও তাত্ত্বিক কে জি সুব্রমানিয়ান বলেছেন ‘নাঈভ’ নয় রবীন্দ্রনাথ আসলে ‘সেলফটট’। উনি স্বশিক্ষিত। যেমন কারোর কাছে কবিতা লেখা না শিখেও উনি লিখেছেন তেমন ছবি আঁকাটাও উনি নিজে নিজে শিখেছেন ওঁর দেখা, শোনা, জানা ও বোঝার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে। এই শিক্ষার সঙ্গে কোন আর্টস্কুলের গতানুগতিক শিল্পশিক্ষার তুলনা হয় না, এ হল সেই খাঁটি শিক্ষা যা অনেক ‘ছবি আঁকতে জানা’ মানুষের সঙ্গে একজন ‘শিল্পী’র পার্থক্য গড়ে দেয়। রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শিখেছেন ‘ট্রায়াল এন্ড এরর’ পদ্ধতিতে। নিজে ভুল করেছেন, ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং নিজেই নিজেকে শুধরে নিয়েছেন। তাই যারা বলেন ‘রবীন্দ্রনাথ তো ঠিক ছবি আঁকা শেখেন নি কোনদিন …’ তাঁদের শিক্ষা সম্পর্কে ধারণায় মূলগত গলদ আছে।

যাইহোক এতশত যুক্তি দিয়ে রবীন্দ্রনাথের ছবিকে জাস্টিফাই করবার জাস্ট কোনও দরকার নেই। বলবার কথা এইটাই যে ছবি আঁকিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের সময়ের থেকে এতটাই এগিয়ে ছিলেন, আজ সত্তর আশি বছর পরে তাঁর আঁকা ছবিগুলো দেখতে গিয়ে তাদের সমকালীনতায় বিস্মিত হয়ে যাচ্ছি। আর বুঝতে পারছি এদেশে অবন ঠাকুর, বা বিদেশে পল ক্লী, ওয়াল্টার গ্রোপিয়াস, ক্যাথে কল্ভিতস এর মত হাতে গোনা কয়েকজন মহান শিল্পী ছাড়া ওঁর সমকালে কেউ ধরতেই পারেন নি যে রঙ তুলি নিয়ে উনি কি কাণ্ডটি করে গেছেন। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য, গান, সমাজভাবনা, শিক্ষানীতি ইত্যাদি নিয়ে বিস্তর কাজকর্ম হলেও ওঁর আঁকা ছবি নিয়ে যা কাজ হয়েছে তা প্রায় কিছুই নয় অথবা অধিকাংশই মিসলিডিং।

ছবি আঁকিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠিক ‘২৫শে বৈশাখের প্রাণের মানুষ’ নন। সেখানে তিনি সাংঘাতিক সেরিব্রাল এবং অকপট। ‘মনে ভক্তি আর চোখে ছানি’ নিয়ে এই রবীন্দ্রনাথের নাগাল পাওয়া শক্ত।

লেখক চিত্রকর । জন্ম শ্রীরামপুরে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং বরোদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিল্পকলায় স্নাতোকত্তর । চার্লস ওয়ালেশ ফেলোশিপ প্রাপক হওয়ার সুবাদে গ্লাসগো প্রিন্ট স্টুডিয়োতে কাজের অভিজ্ঞতা। একক ও যৌথ প্রদর্শনী হয়েছে বিদেশের লন্ডন, নিউইয়র্ক, প্যারিস, বার্লিন, মিউনিখ, গ্লাসগো, আলেকজান্দ্রিয়া, টোকিও, সিঙ্গাপুর, হংকং ইত্যাদি শহরে ।  দিল্লি, মুম্বই, কলকাতা, বেঙ্গালুরু, ভোপাল, আমেদাবাদ, বরোদা শহরে নিয়মিত প্রদর্শনীতে অংশ নেন। বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্পকলা বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কৌশিক on May 11, 2017

    খুব ভাল লেখা।

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ