তারিখ: 10 May

ডোন্ট পারসিউ থিংস,লেট দেম পারসিউ ইউ- রাস্কিন বন্ড

সাক্ষাৎকার/রাস্কিন বন্ড


‘তিনি নিঃসঙ্গতাকেও বাঙ্ময় করে তুলেছিলেন’- বলেছেন ভি.এস. নইপল। তিনি বলতে রাস্কিন বন্ড। জন্মেছেন হিমাচল প্রদেশের কসৌলিতে। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ হলেও মাঝখানে বছর চারেক বাদে ভারত ছেড়ে আর পা বাড়াননি বিদেশে। মাত্র সতেরো বছর বয়সে প্রথম উপন্যাসের জন্য পেয়েছিলেন আর্ন্তজাতিক পুরস্কার। আকাদেমি পেয়েছেন ১৯৯৩তে। ৯৯’ তে পেয়েছেন পদ্মশ্রী। ২০১৪তে পদ্মভূষণ। তাঁর লেখা থেকে জনপ্রিয় সিরিয়াল ছাড়াও ছবি করেছেন শ্যাম বেনেগাল, বিশাল ভরদ্বাজের মতন পরিচালকরা। অসংখ্য ছোটো গল্পের রচয়িতা রাস্কিনের ব্লু আমব্রেলা, ফ্লাইট অফ পিজিয়ন্স,সুজানাস সেভেন হাজব্যান্ডস তাঁকে চলচ্চিত্র জগতে সমান জনপ্রিয় করে তুলেছে। অশীতিপর এই মানুষটি এবছর পা রাখলেন ৮৩ বছরে। মে মাস রাস্কিনের জন্মমাস। ভারতীয় সাহিত্যের এই  অসামান্য মানুষটির সঙ্গে নানা সময়ে দেশ–বিদেশের নানা পত্র–পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার গ্রহন করছেন বিশিষ্ট কবি প্রাবন্ধিক ও ইন্টারভিউয়ার স্বপন. কে. ব্যানার্জি। সেগুলি নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘ইকনমিক টাইমস্‌’ সহ নানা কাগজে। ই. টি. প্রকাশিত সেই সাক্ষৎকারের (১৯৯৭ সালে) বাংলা রূপান্তর প্রথম প্রকাশ করেছিল ‘বইয়ের দুনিয়া’ পত্রিকা ২০০৭ সালে। মূল ইংরেজিকে ভিত্তি করে ও  অনুদিত বাংলা সাক্ষাৎকারটির পরিমার্জনা করে নবরূপে ‘গল্পের সময়’-এর পাঠকদের কাছে তুলে ধরলেন গল্পের সময় পরিবারের অন্যতম সদস্য দেবাশিস মজুমদার

 

 

স্বপন কে বান্যার্জি -আপনার গল্প, উপন্যাস আর কবিতার যেসব সংকলন পাওয়া যায় তার ভূমিকাগুলোও পড়তে অনেকটা গল্পের মতন। আপনি কি কখনও এইসব ভূমিকাগুলো নিয়ে কোনো বই এর কথা ভেবেছেন ?

রাস্কিন বন্ডের বাড়িতে সাক্ষাৎকারী স্বপন কে ব্যানার্জ্জি

রাস্কিন বন্ড– পেঙ্গুইন থেকে যখন ‘কালেকটেড স্টোরিজ অ্যান্ড নভেলস’ আর ‘বেস্ট অব রাস্কিন বন্ড’ এর প্রকাশের কাজ চলছিল। তখন আমিও ওদের বলেছিলাম, আমার কিছু বই এর ভূমিকাও ওখানে রাখতে। তা ওরা কথাটা খুব একটা সিরিয়াসলি নেয়নি।

স্বপন কে বান্যার্জি – ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’তে ১৯৫২তে ‘লস্ট’ নামে যে কবিতাটি বেরিয়েছিল, সেটাই কি আপনার প্রথম প্রকাশিত লেখা ?

রাস্কিন বন্ড – হ্যাঁ, ওটাই আমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা। তবে তার আগে দুই একটা গল্পও কিন্তু বেরিয়েছিল। তার মধ্যে একটা হল ‘মাই কলিং’- আমার স্কুলের একজন মাস্টারমশাইকে নিয়ে লেখা গল্প। আমি স্কুল ছাড়ার ঠিক পরেই এটা লিখেছিলাম। গল্পটা আমার কোনো সংকলনে নেই। কোথাও ওটা রিপ্রিন্টও হয়নি। হয়নি কারণ, আমার বিচারে ওটা একটা লিটিল ওয়ার্ক অব আ নভিস। আমার প্রথম চেষ্টাও বলতে পারেন।

স্বপন কে বান্যার্জি – বাবার প্রতি অসম্ভব একটা ভালবাসা আপনার সব লেখাতেই ছড়িয়ে থাকে। আপনার বাবার কম বয়সে মৃত্যু আপনাকে সবসময় খুব নাড়া দেয় বলেও মনে হয়। আপনার লেখার মধ্যে দিয়ে আপনি কি সেই যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতিগুলিকে অতিক্রম করেছেন?

রাস্কিন বন্ড – আমার মনে হয় আমি তা পেরেছি। দেখুন, এখন যাঁরা আছেন আমার চেনা–পরিচিত আমার আত্মীয়–স্বজন তাদের মধ্যে তো কেউ নেই, যিনি আমার বাবাকে চিনতেন। অন্তত এমন কারোর সঙ্গে ওর ব্যাপারে কথা বলার সেরকম সুযোগ নেই। বাবা যে খুব মিশুকে মানুষ ছিলেন তাও নয়। তো তাঁকে নিয়ে লিখতে লিখতেই অন্তত তাঁর কথা কিছুটা বলতে পারি : তাঁর কাছে আমার ঋনের কথা বলতে পারি। যেমন ধরা যাক, তাঁর কাছে পাওয়া বই, ভালোবাসা ইত্যাদি… জীবনের এই দিকটা তুলে ধরা যায় এভাবে। কম বয়সে বাবাকে যারা হারায় তাদের কাছে বাবার জায়গাটা অনেক উঁচুতে রয়ে যায়। এটা তো ঘটনা তাই না? হয়তো তিনি একেবারে নিখুঁত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু ছোটোবেলার দেখাটাও তো একটা ব্যাপার। এর একটা বিরাট প্রভাব রয়েই যায় জীবনে।

স্বপন কে বান্যার্জি – ‘দ্য সেনসুয়ালিস্ট’ লেখার জন্য আপনাকে গ্রেপ্তার করতে ওয়ারেন্ট পর্যন্ত বেরিয়েছিল।

রাস্কিন বন্ড – ‘দ্য সেনসুয়ালিস্ট’ প্রথমে ধারাবাহিকভাবে বের হয় ৭৪ – ৭৫ সালে। বম্বের ‘ডেবনেয়ার’-এ। তখন একজন ছিলেন, তিনি…  হয়ত কোনো অফিসিয়াল বা কেউ, তিনিই আপত্তিটা তোলেন। তারপর অভিযোগ করা হয়। অশ্লীলতার অভিযোগ উঠেছিল আমার ঐ কাগজের সম্পাদক ও প্রকাশকের বিরুদ্ধে। মুসৌরিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও পৌঁছেছিল। আমি জামিন পেয়ে গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু আমায় অ্যারেস্টও করা হয়েছিল। অফিসারদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে চা–বিস্কুট খাওয়া–টাওয়া …… তবে বার দুই আমায় কোর্টে যেতেই হয়েছিল।

স্বপন কে বান্যার্জি – এর কোনো প্রভাব কি পরে পড়েছে আপনার ওপর ?

রাস্কিন বন্ড – প্রথমটায় তো পড়বেই, তাই না ? ভয়ও পেয়েছিলাম বেশ। আমার ভয় হয়েছিল আমায় হয়ত ৭ বছর বম্বে সেন্ট্রাল জেলে থাকতে হবে বা ওরকম কিছু। তবে এসব তো জীবনে আসবেই। অনেক লেখককেই এসব নিয়ে ভুগতে হয়েছে।

স্বপন কে বান্যার্জি – আপনার কিছু কবিতা, গল্প ‘বিনিয়া’ নামে কোনো একজন মহিলাকে উৎসর্গ করা হয়েছে। তিনি কি আপনার চেনা কেউ ?

রাস্কিন বন্ড – যাঁর কথা বলছেন, সে কিছুটা স্বপ্ন কিছুটা বাস্তব। বছর ১৫ – ২০ আগে সে পাহাড়ি এলাকায় থাকতও বটে। তখন আমি  ম্যাপেলউড লজে থাকি। তখন কোনো মেয়েকে নিয়ে কোনো গল্প লিখতে গেলেই তার কথা মনে এসে যেত। আসলে রোল মডেল তো একটা না একটা রয়েই যায়, না ? ‘ব্লু আমব্রেলা’ তে সে এসেছে  ছোট হয়ে, ‘বিনিয়া পাসেস বাই’ তে সে সামান্য বড়। ওকে নিয়ে কয়েকটা প্রেমের কবিতাও রয়েছে আমার।

স্বপন কে বান্যার্জি – আপনার গল্প কিন্তু অনেকসময় এইচ. ই. বেটস-এর কথা মনে করায়। আপনি কি কখনও তাঁর গল্পগুলো পড়েছেন ?

রাস্কিন বন্ড – যখন আমি স্কুলে তখন আমি বেটস পড়তে আরম্ভ করেছিলাম। আসলে তাঁর ছোটো গল্প গুলি সব সময় আমাকে আনন্দ দিত, আর তিনি যেগুলি লিখেছিলেন তাতে প্রকৃতি আর গ্রামাঞ্চলের প্রতি অসম্ভব সংবেদনশীলতা রয়ে গেছে যা কোনোভাবে আমার ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

স্বপন কে বান্যার্জি – ‘দাস স্পোক ক্রো’তে আপনি শিল্পীদের জন্য কতগুলো নিয়ম খাড়া করেছেন। এক ধরনের ফিলোজফিও এসে গেছে।

রাস্কিন বন্ড – ওখানে আমি একটা কাকের সঙ্গে বিয়ার ভাগ করে নিয়েছিলাম, তাই না ? ওই জন্যই বোধহয় এমন কিছু কথা এসে গেছে যা খুব প্র্যাকটিক্যাল নয়। ওই সময়টায় আমি তাওইজম-এর দ্বারা দারুন প্রভাবিত। লাওৎসে পড়ছি খুব। সম্ভবত ওখানে কাকটা আমায় যেসব কথা বলেছে বা আমি নিজে বলেছি ওকে, তা কিছুটা তাওইস্ট। ইট অ্যাপ্লায়েড টু  মাই সিচুয়েশন অ্যাজ আ স্ট্রাগলিং রাইটার।(একজন লড়াকু লেখক হিসেবে আমার অবস্থা বোঝাতে এটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল)। ‘ডোন্ট পারস্যু থিংস, লেট দেম পারস্যু ইয়্যু (কোনও কিছুর পিছনে ছুটো না সবাইকে তোমার পিছনে ছুটতে দাও)– তখন এই পরামর্শটাই আমি নিজেকে দিয়েছিলাম,এখনও মনে আছে।

 

স্বপন কে ব্যানার্জি – যে ক’জন ভারতীয় ইংরাজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় ব্যস্ত আছেন তাদের মধ্যে  একজন স্বপন কে ব্যানার্জি। স্বপনবাবু দীর্ঘ কয়েক দশক ধ’রে ভারতীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন ধারার বিশিষ্ট মানুষদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে চলেছেন। এগুলি দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। নিজে ইংরাজি ভাষা সাহিত্যের মানুষ হিসাবে গবেষণা ছাড়াও রচনা করেছেন গল্প,কবিতা,প্রবন্ধ। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার গ্রন্থ ‘People who meet people: Interviews with the Stars’ (Publisher: Westland)

দেবাশিস মজুমদার –  জন্ম, বেড়ে ওঠা শ্রীরামপুরে। সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা, লেখালিখি। নেশা ভ্রমণ ও নিবিড় সাহিত্যপাঠ। অন্য পরিচয় কবি ও ছোটোগল্পকার।

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • কোটেশন ব্লগ

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।