21 Jun

মেঘে ফোটা তারা

লিখেছেন:দীলতাজ রহমান


বাস থেকে নেমে ময়েনউদ্দিন একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার নিয়ে গ্রামে ঢুকলো। কালো পলিব্যাগে মোড়ানো হাতের ছোট পুটুলিটা অন্ধকারে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অবশ্য বকের ডানার শাদাও গিলে খেতো এ অন্ধকার। বড় রাস্তা থেকে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে বাড়িমুখো আলপথে নেমে যেন সে অন্ধকার আরো গাঢ় করতে করতে ধীরলয়ে হেঁটে যাচ্ছে ময়েনউদ্দিন। পথ যেন তার পায়েই পেঁচিয়ে আছে। গেরো লাগা দড়ির মতো। খুলে খুলে শেষ হতে চায় না। অথচ অন্য সববার, মানে সে আগে যে ক’বার এসেছে।  যেন রাশি রাশি আনন্দ নিয়ে বাড়ি ঢুকেছে। এই পথ দিয়ে। চেনা কাউকে দেখলে জাপটে ধরে নিজের কথার চেয়ে মেয়ের কথাই তখন বেশি শুনিয়েছে।

হতদরিদ্র মানুষেরা যে জীবন দেখেইনি তা তারা বিশ্বাস করেই-বা কী করে! তবু তারা নিজের নিজের কল্পনার ক্ষুদ্রপটে নামিয়ে আসমানের পরীর মতো সাজিয়ে দেখেছে, সাদামাটা স্বভাবের, সত্যভাষী ময়েনের কণ্ঠের উপচে পড়া উচ্ছ্বাসে ভাসা তার এতটুকু সেই মেয়েকে।

তেমন কিছুই না। শহর থেকে দু-এক প্যাকেট চকলেট তার দরিদ্র ভাই বোনদের ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর জন্যে। আর রঙিন কিছু জামা-কাপড়। কিছু রাবারের খেলনা। আর তাতেই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে সবাই। সে নিজেও। তার আসার খবর শুনে চলে এসেছে তার বোনেরা নিজের নিজের সংসার ফেলে। দু’টি বোন তার। দু’জনারই অভাবের সংসার। একগাদা করে ছেলেমেয়ে। আর ময়েনউদ্দিনকে বাদ দিয়ে ভাই আছে আরো তিনটে। ময়েনউদ্দিন এদের সবার বড়। একত্রিত সবার মধ্যে ময়েনউদ্দিনও খুশিতে ফোয়ারা হয়ে যেত। তার যাপিত জীবনের প্রতিটি ঘটনার বর্ণনা শোনানোর সুযোগ পেয়ে। তার ওপর আছে বাপের ভিটের টান। শেকড়ে না ফিরলে বোঝাই যায় না তার স্বাদ।

গাছপালায় ছাওয়া, তিন পোতায় তিন ভাইয়ের তিনখানা খড়ের ঘর। তার নিজের ঘরখানা কবেই লুটপাট হয়ে গেছে ভাই-বউদের হাতে হাতে। থাকলেই আর কী হতো? হয়তো সেটুকু থাকলে তা সাথী আর স্বাতী হতো না। একজন সেই কবে তার সব টান আকাশের বুকে গেঁথে দিয়েছিলো। ময়েনউদ্দিন আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতে আবারও হোঁচট খায়। কাল রাত থেকে শুরু হয়েছে তার এই আকাশমুখো চাওয়া। একটা একটা করে প্লেন যায়, আর সে ঘাড় উঁচু করে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কোন প্লেনে  গেলো মেয়েটি? ফিরোজ সাহেবই বা কখন ফিরে গেলেন? সমস্ত রাতটুকু ফিরোজ সাহেব তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার  জায়গার কাছে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থেকেও সে জানতে পারলো না, কোন জাহাজখানা উড়িয়ে নিলো তার পরানপাখিটারে!

রাতটা পার হলো এয়ারপোর্টের কাছেই। ঢুলুনি ছুটে গেলেই দমটা কেমন আটকে আসছিলো। শেষে এই গাঁ-ই তাকে ফিরিয়ে আনলো? কিন্তু সে তো ফিরতে চায়নি নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানায়। কখন, কীভাবে গাবতলী থেকে কেন যে সে বাসে চেপে বসেছিলো? সেই একবছরের ধুলোমাখা পায়ের ছাপ এখান থেকেও যে মুছে গেছে! কেউ চিহ্ন ধরে রাখতে জানে না! চিহ্ন বড় ভার! ‘দুনিয়াদারির আর সব রাতে দেখা স্বপ্ন কইরে দেয়!’ ফোটা কার্পাস তুলোর মতো এখন তার বুকের মধ্যে এই সব বোধের আগুন শুধু গনগনাচ্ছে। তাই বুঝি পায়ে এখন আর ব্যথা টের পাওয়ার বোধটুকু নেই ময়েনউদ্দিনের। তবু সে চলছে নিজের ভিটের ধুলোমাটিতে কারো পায়ের স্পর্শের খোঁজে।

শহর ছেড়ে তার গ্রামে আসা হতো না। সেদিনও এসেছিলো বহুবছর বাদে। ক’দিনে হঠাৎই ন্যুব্জ হয়ে গেছে ময়েনউদ্দিন। প্রতিটি প্লেন যখনই মেঘ ঢেকে ফেলে, তখনই তার পাঁজর পোড়ো বাড়ির ইঁটের মতো ঝুরঝুর করে ভেঙে আসে। পরান পাখিটাকে কোন প্লেনখানা চিলের মতো ছোঁ করে নিলো বাপ হয়ে সে তা জানতে পারলো না? এতদিন তাহলে কী আগলে রাখলো! পরের বাড়ি চাকর খেটে যার জন্য জীবনটা গেলো! নির্দিষ্ট আর কোনো ঠিকানা তার রইল না। সে তো সব বিক্রি করে গেলো ক’দিন আগে এসে!

টলে পড়ে যাচ্ছে ময়েনউদ্দিন। চেনা কারো দেখা পেলে ভালো হতো। ভর সন্ধ্যায় চন্দ্রদিঘলিয়া বাসস্টপজে নেমে, সেখান থেকে অবশ্য চেনা কাউকেই খুঁজতে শুরু করেছে সে। কিন্তু মাঝখানে আরো একটি গ্রাম পার হয়ে তার গ্রাম, সুকতাইল। যার পাড়ে মধুমতি। তার যৌবনের টগবগে মধুমতি মরে এসেছে। কিন্তু তার ভাঙন সে আবার নিজের বুকের মধ্যে নতুন করে শুনতে পাচ্ছে। এত বছর পর আবার সেই সবকিছু ভেঙে নামার আতঙ্ক ফিরে এসেছে? কুয়াশা এমন গাঢ় না হলে হয়তো কেউ তাকে চিনতে পারতো।

বছর সাতেক আগে আরো একবার কিছুদিনের জন্য গ্রামে এসেছিলো। জমি-জমা সংক্রান্ত ব্যাপারে। তখন সবাইকে ডেকে নিজেকে চেনাতে হতো। তখন আগ্রহও ছিলো নিজেকে চেনানোর। যদিও এসেছিলো অনেকগুলো চিঠি পাওয়ার পর। যখনই তার নামে কোন ইনভেলপ গেছে, খুলতেই হুড়হুড় করে তাকে সবগুলো ভাইবোনের আলাদা করে লেখা একগাদা চিঠি বেরিয়ে পড়েছে। সবার লেখায় ওই এক কথা-‘মিঞাবাই, জমি নিয়া শরিকের সাতে গ-গোল…আপনি না আসলি মিটতিছে না। ময়েনকে তার ভাইবোনেরা তুইতোকারি করেই বলতো। শেষে ভুল বানানে লেখানো চিঠিতে আপনি সম্বোধনটা বেশ উপভোগ করতো ময়েনউদ্দিন। তবে বানানের ভুল-শুদ্ধ’র ময়েনউদ্দিনই-বা কী বোঝে? বুঝতো সে। উত্তর দেয়ার প্রয়োজন হলে ও-বাড়ির মেয়ে স্বাতীকে বিনয় করে বলতে হতো। সে অবশ্য এমনি লিখে দিতো। তবু অমন বাহানা না করে বললে ময়েনেরই মন ভরতো না। যাকে দিয়ে প্রতিবার ওদের প্রতিটি বাক্যের উত্তর সে লিখিয়েছে। তাকে নিয়েই তো একসঙ্গে এক বাড়িতে কাটিয়ে এলো বিশটি বছর। তবু নিজেকে তার করে রাখার শক্তি হলো না।

সেই পঁচিশ বছর বয়সে ময়েন গিয়ে ঢুকেছিলো জামিল সাহেবের বাসায়। জামিল সাহেবের বয়স তখন ত্রিশের কোঠায়। এক ল্যাজব্যাজে যুবক ময়েন সেদিন কাজ খুঁজতে ঢাকায় এসেছিলো। রাতে রাস্তায় পড়ে ঘুমাতো। আর দিনের আলোর আভাস পেলেই উঠে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতো ক’দিন পর রাস্তায়ই গাঁয়ের একজনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সে-ই ডেকে নিয়ে দু’দিন তার এক ঘরের পরিসরে বউ-ছেলেমেয়ের মধ্যে থাকতে দিলো। সেখানে থাকলো ক’দিন। কিন্তু তিনবেলা চার-চারটে খাবার পাতে দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠার অবস্থায় একদিন জসিম মিঞা বলেই ফেললো, ময়না ভাই, ডাকায় কামকাইজ পাওয়া সোজা কতা না! তয় তুমি যদি রাজি অও আমি তোমারে এক বাসায় একটা কাম জোগার কইরে দিতি পারি। বাসা বাড়ির কাজ আর কী।’

-কী কাজ তা আর ময়নউদ্দিনের জানার সাহস ছিল না। কারণ রিকশা টানাটাও তার শেখা নেই। কুলিগিরিও ভালো পারে না। শরীরের বল তখন নিজেই টের পেতো না। জীবনভর খাওয়ার টানাটানিতে থাকা মানুষ বোঝা নিয়ে হাঁটতে গেলেও তার পা টলে। বউ সফুরা প্রায়ই মুখ ভার করে থাকত তার অকর্মণ্যতার জন্য।

তবু কাজের ধরন জানতে চেয়ে ময়েনউদ্দিন প্রশ্ন করে ফেললে জসিম মিঞা বলতেই বিপদে পড়ে যেত। ময়েনউদ্দিন কোনো ধরনের প্রশ্নের ধারে কাছে গেলো না। সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলো কাজের খবরটুকু পেয়েই। বলেছিলো ‘এহনই নিয়া চলো বাই! আমার এহন কাজ দিয়া কতা। এক বছরের বাচ্ছাডারে ফেলাইয়া থুইয়া আইছি। সূতিকা রোগে ওর মা মরলো এহনো চল্লিশটা দিন অয়নাই…।’ ময়েনউদ্দিন চোখ থেকে পুরনো, তেলশিটে গামছাখানা সরাতে পারে না। নিরামিষ তরকারি দিয়ে মোটা চালের মাখা ভাত, খেতে বসা ক’জনার সবার থালায় আঙুলের নাড়াচাড়া খায়। সবার মুখের কথাও বন্ধ হয়ে যায়। রোগাটে যুবক ময়েনউদ্দিনের চোখের পানিতে।

জসিম ড্রাইভার তার বাই-সাইকেলের পিছনে বসিয়ে গ্রাম-সম্পর্কের ভাই ময়েনকে সেদিনই নিয়ে গিয়েছিলো তার অফিসের বড়কর্তা জামিল সাহেবের বাড়ি। দারোয়ান রাখার সঙ্গতি তখন জামিল সাহেবের ছিল না। সরকারী বাসা। সরকারি গাড়ি। জসীমও অফিসের ড্রাইভার। কিন্তু সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য একজন মানুষের প্রয়োজন জামিল সাহেবের। কতবার ড্রাইভার বদল হয়ে নতুন ড্রাইভার এলো, আবার জামিল সাহেব কতখানে বদলি হয়ে নতুন গাড়িসহ নতুন নতুন ড্রাইভার পেলেন। কিন্তু ময়েন এর বদল হলো না। সে থেকেই গিয়েছিলো ওদের তিনজনের একজন হয়ে। বাড়ির খুটিনাটি কাজ করতে করতে, শেষে ঘরের কাজে ডাক পড়তে লাগলো। সে বাবুর্চী সেজেছিলো ইচ্ছে করেই। ঘরে থাকতে। সাবিহা বেগম যখন দেখলেন ময়েন রান্নাবাড়াটা ভালোই ধরেছে তখন নিজে রান্নার হাল ছেড়ে বাঁচলেন।

সাজিয়ে-গুছিয়ে মেয়ের হাত ধরে ফুরফুর করে ঘুরে বেড়াতেন। আর তাই চেয়ে জামিল সাহেব কখনো না দেখলেও ময়েন দেখতো। দেখতো, তারই সাথীর জন্য তার বেগম সাহেবের আত্মীয়স্বজনের কাছেও কেমন বায়নাক্কা। আত্মীয়স্বজন প্রতিদিন কেউ না কেউ গাড়ি পাঠাচ্ছে ওকে নিয়ে যেতে। এতদিন এর-ওর দাওয়ায় অনাহারে অনাদরে গড়াগড়ি খাওয়া, কাঁদা-মাটিমাখা মেয়েটি এখানে এসেই সাত রাজার ধন হয়ে উঠলো!

ময়েন যখন ও বাড়িতে ঢোকে, তখন সাবিহা বেগমের সংকটাপন্ন অবস্থা। তার নিঃশ্বাস এখন যায় তখন যায় দশা। আত্মীয়স্বজন সারাক্ষণ ঘিরে থাকত তাকে। সাবিহা বেগমের মা হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন একটি সন্তান। কন্যাসন্তান হলে ভালো হয়, বলতেন। প্রথম এবং বাচ্চা জন্মদানের সঙ্গে সঙ্গে ফেলে দিতে হয় সাবিহা বেগমের টিউমারসহ জরায়ু। তার এক বছরের সেই মেয়ে স্বাতী, চারতলার ছাদ থেকে পড়ে মরে গেছে। সাবিহা বেগম কিছুতেই ভুলতে পারছেন না সে দৃশ্য। শেষে ইচ্ছে করে তাকে অজ্ঞান করে রাখা হয়েছে। ক’দিনের দ্বিধায় টলায়মান ময়েন সাবিহার মা’কে বলেই ফেললো, ‘আমি যদি আমার দ্যাশতেন এটা মাইয়া আইনা দিই আপনারা রাখপেন আম্মা।’

-‘আছে তোর জানাশোনা।’ সাবিহা বেগমের অশীতিপর বৃদ্ধা মা কাতর কণ্ঠে জানতে চাইলেন।

-আছে তয় দেহি! এহনি যাই যদি, পাইলে কাইল না অলিও পরশু চইলা আসপো।

ময়েনউদ্দিনের ও-বাড়িতে নাম হলো ময়েন। স্বাতী তাকে বলতো ময়না চাচা। ময়না চাচার কাছে আসা চিঠির উত্তর লিখতে লিখতে স্বাতী ময়েনউদ্দিনের বাড়ির সবার সঙ্গে পরিচিত হয়ে উঠেছিলো। ময়েন নাম ধরে স্নেহাশীর্বাদ জানাতে আলসেমি করতো না একবছরের শিশুটিকেও। তার ভাগের পৈত্রিক এবং কেনা জমির ফসলের ভাগ কে কতটুকু নেবে তাও তোকে লিখে দিতে হতো। শেষে কিনা বিবাদ হয়। ওদিকে বিবাদ ঠেকাতে স্বাতীর একটি বেলাই পার হয়ে যেত। স্বাতীর মা স্বাতীকে বারবার নিরিখ করে যেতেন, ভয়-বিরক্তি ও উদ্বেগঝরা স্বরে ময়েনের উদ্দেশে বলতেন, ‘আহা ময়েন, মেয়েটিকে দিয়ে তুমি কী যে সব লেখাচ্ছো!’ উল্টে ময়েন কাঁচুমাচু করে বলতো, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাহেন তো বুবু। আমি কি কম বুজি!’ এরপর দ্বিতীবার কথা বলে এত জোর সাবিহা বেগমের ছিলো না। অন্তত ময়েনের কাছে ছিলো না।

কিন্তু তেজী মানুষ জামিল সাহেবের ছিলো। তিনি ছুঁতোনাতায় অন্যদের সঙ্গে ময়েনকেও ধমকে একসা করতেন। স্বাতীর ব্যাপারে তার ওধরনের ধমকের জোর বেড়ে যেত আরো। কিন্তু অন্য কারো না হলেও ময়েনের প্রতি স্বামীর আচরণ চশমখোরের মতোই মনে হতো সাবিহা বেগমের। মাঝে মাঝে বলেও ফেলতেন, ‘তুমি ওকে ওভাবে বকবে না তো! দেখো না ও কেমন মাটির মানুষ? ও দোষ যা করে না বুঝে করে। তাছাড়া সারাক্ষণ তোমার ভয়ে কেমন মিইয়ে থাকে, দেখে আমারই মায়া হয়।’ এরপরও কিছু বলতে চাইতেন কিন্তু অতো নির্মম সত্য উচ্চারণ করা যে মাথা খুঁড়ে রক্ত ঝরানোর শামিল। কিন্তু জামিল সাহেবের সোরসারের জের খুব বেশিক্ষণ চলতো না। কারণ তিনি বাড়িতে থাকতেনই-বা কতক্ষণ!

প্রতিটি চিঠিতেই শেষে ময়েন স্বাতীকে লিখতে বলে-‘লেহো তো মা, এবাড়ির মেয়ে স্বাতী বালো আছে, সাথী লেইহো না কিন্তুক! তাইলি তোমার মা আবার আমারে বকপে। লেহো। সে এখন কলেজে পড়ে। যাকে বলে এগারো ক্লাস! ওর শরীরের রংডা য্যান কাঁচা সোনা ‘স্বাতী ময়েন চাচার খুশির দাম দিতে উৎফুল্ল হয়ে সত্যি সত্যি নিজের কথা ময়েনের মতো করে লিখে দিতো। ময়েন চাচার কাছে তার এই অতীব গুরুত্বটা সে ভীষণ উপভোগ করতো। আর তা দেখে ময়েন আরো আহ্লাদ বোধ করতো। এইটুকু ছাড়া জীবনে নিজের করে আর সবকিছু ময়েন ভুলেই গিয়েছিলো। ওর স্ত্রী মারা যাওয়ার পরে ও ভেবেছিলো ‘কিছু টাকা জমলি আর একটা বিয়া করা নাগবে। না অলি মাইয়াডারে দেখফে কিডা? এহনি তো বাই আর তার বউগে হাঁফ দইরে গেছে!’ কিন্তু মেয়েটার গতি হওয়ায় নিজের জীবনটা কেমন পাল্টে গেলো। বিয়ে-শাদির কথা আর মনেও আসলো না ময়েনউদ্দিনের! নিজের যুবক বয়সটা এখন মেঘলা দিনের একফালি রোদের মতো মনে পড়ে তার।

কিন্তু সাবিহা বেগম মারা যাওয়ায় আকাশ ভেঙে পড়লো ময়েনের মাথায়। বলা নেই কওয়া নেই… অবস্থা হঠাৎই বেগতিক হয়ে উঠলো। মাঝরাতে ফোন করে সাহেব এম্বুলেন্স ডাকলেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সব পরীক্ষার পর, পরদিন দুপুর নাগাদ রিপোর্টে দেখা গেলো লিভার সিরোসিস। রোগটার নামও ময়েন প্রথম শুনেছিলো। রোজ তার হাসপাতাল আর বাসায় দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। তাই-বা আর ক’দিন। কোনো সময়ই কাউকে দিলো না মানুষটা। ছ’মাস গেলো না সাহেবের উপর একজন তদারকি শুরু করে দিলো। মহিলাটার হাবভাব প্রথম থেকেই ভালো ঠেকলো না ময়েনের। সাহেবের জীবনধারা পাল্টে দেয়ার জন্য যেন তার তর সইছিলো না। আটঘাট বেঁধে নেমে পড়েছিলো সে। সাহেবের তরফ থেকে কেউ কোনো বাধা দিলো না। আর বেগম সাহেবের মা মারা গেছেন মেলাদিন। ভাই একটা বিদেশে থাকে বউ ছেলেময়েসহ। আর একটা ঢাকায় বড় চাকরি করেন। রাশভারি স্বভাবে জামিল সাহেবকেও তিনি হার মানান। বয়স জামিল সাহেবের সমান হলেও সম্পর্কের ভার তিনি আঁকড়ে চলেন।

ময়েন ভাবছিলো সাহেবের বড় ভাইকে বলে, ‘সাহেবেরে আপনারাই দেইখা-শুইন্যা একটা বিয়া করাইয়া দ্যান। সাহেবের পিছন পিছন গুরগুর করা ওই মাইয়ে লোকটারে আমার বালো লাগে না। সোনার সংসারডা তছনছ কইরে দেবে বুইলে আমার মনে অয়!’ কিন্তু ময়েনের সাহসে কুলোয় না। ভাবানাতেই সব ঠেকে থাকে। ছোটমুখে বড় কথা সে ভুলে গেছে নিজেকে গুটাতে গুটাতে। কাঁচা-পাকা চুল, বিশাল দেহ, রাশভারি ওই মানুষটার সামনে ময়েনের আর বয়স বাড়তে পারলো না। সে আজো কাঁপে ভারী কিছু বলতে হলে। বেগম সাহেব ছিল তার কাছের মানুষ। যার হাতে তুলে দিতে পেরেছিলো নিজের আসল সম্পদটুকু। তারপর তরতর করে বিশটা বছর কেমন করে কেটে গেলো স্বপ্নের মতো করে। আবার মেঘের মতো সব ভাসিয়েও নিলো, যেমন দিয়েছিলো। নাকি তাকেই মেঘভেলা করে ভাসিয়ে দিলো। গ্রাম ছাড়ার দিনগুলো আর আজ, যেন সুতোয় বোনা রুমালের দু’টি প্রান্ত, টেনে জোড়া লাগানোর চেষ্টা করে ময়েন। ঘুরতে ঘুরতে ভাগ্যের শেকল শেষে তাকে এভাবে পেঁচালো! বিড়বিড় করে বলে ময়েন, ‘য্যান নিজির সঙ্গে নিজিরে?’

দুঃস্বপ্নের মতোই এক সন্ধ্যায় অনিমা খান সাহেবের গাড়ি থেকে নেমে সাহেবের সঙ্গে সমান তালে পা ফেলে তার শয়নকক্ষে ঢুকে পড়লো। ময়েন বুঝলো, এ আসা লিখেপড়ে আসা। বেগম সাহেব মারা যাওয়ার পর এর আগে অনিমা খান বহুবার এলেও কপালে এমন দাপটের ছাপ ছিলো না। পায়ে বেপরোয়া শব্দ ছিলো না। স্বাতীকে অবশ্য আগেও কখনো ডাক-খোঁজ করেনি সে। আর তাতেই শঙ্কাটা পাখোয়াজের মতো পাঁজরে বেজে বেজে ময়েনকে দীর্ণ করছে। কেঁদে কেঁদে মেয়েটি কেমন লেপ্টে আছে বিছানায়। মা-মরা ধকল অতো সহজে কারো কাটে! তারপর বাবারও যদি হয় বৈরি আচরণ! মেয়েটা ময়েনের দিকে সেই আবার হাঁটিহাঁটি পাপা’র সাথীর মতো টলোমলোভাবে ফিরে আসছে। আর তাই বুঝতে পেরে ময়েন ছুটে পালাচ্ছে। তার এ সতর্ক পলায়ন কেউই যে আর টের পায় না। বেশিক্ষণ বাড়িতে থাকলে তার হাঁফ ধরে যায় এখন। ‘মায়ার জালে মাকড়সা করে ঘরের ঝুলঝালে আটকে রাখার চাইতে পক্ষী করে উড়াইয়া দেওন অনেক বালো।’ রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে দম টানার মন্ত্র জপে ময়েন।

একবছরের সাথীকে এনে যখন সে সাবিহা বেগমের কোলে তুলে দিয়েছিলো, বলেছিলো-‘এ্যার বাপ মরছে ওরে ওর মার প্যাটে থুইয়ে, ওর মা মরছে ওর জন্ম দেওনের সময়। আর ওর নাম অলোগিয়া সাথী!’ সাবিহা বেগম তক্ষুনি সাথীর থেবড়ে যাওয়া কাজলের টিপে নিজের মুখখানা মাখামাখি করে নিতে নিতে বলেছিলেন, ‘ওর নাম ‘স্বাতী’ তুইও ওকে স্বাতী বলবি। ভুল যেন হয় না।’

নিজের মেয়েকে সেদিন বেগম সাহেবের কোলে ওভাবে দেখে আনন্দে ময়েনের কণ্ঠ বুঁজে আসার উপক্রম হয়েছিলো। দ্রুত সে বাড়ির বাইরে গিয়ে, বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দম টেনে স্বাভাবিক হয়ে এসেছিলো। মেয়েকে ডাকতে গিয়ে এমনিতেই তা ‘সাতী; হয়ে যেত। তার জন্য আর আলাদা কসরৎ করতে হয়নি। তাই স্বাতী আর সাথীর পার্থক্যটাও সে আলাদা করতে নির্ণয় করতে, জানতে চায়নি। ‘মানুষটো অতো ভালো ছেলো বুলেই আল্লা বুক ভইরে কষ্ট দিয়া রাখছিলো। পাপের দুনিয়া থেইকে তুইলেও নেলো তাড়াতাড়ি!’ দিনের মধ্যে কয়েকবার করে, ইদানীং এই আপ্তবাক্যটি না আওড়ালে যেন ময়েনের আক্রোশ মিটে না। আক্রোশ কি-তার নিজের উপরও কম?

অনিমা খান চাকরি করে জামিল সাহেবের সঙ্গে, একই অফিসে। প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে আরো দু’বার সংসারে ঢুকেছিলো সে। কিন্তু অল্পেই সে সব ভেঙে আসে। তিন সংসারে তার বাচ্চা আছে দুটো। রেখেছেন নিজের কাছেই। অতো হাঙ্গামা করে দু’জন পিতার কেউই তাদের সন্তানের অভিভাবকত্ব দাবি করেনি। করলেও পেতো কিনা সন্দেহ।

বাবাকে এখন স্বাতী ডেকে পায় না। অনিমা খান সব কর্তৃত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে স্বাতীকেও বাধাগ্রস্থ করে রেখেছে, বাবার কাছে যেতে। আর তার নিশ্চিন্ত কারণটি টের পায় ময়েন। ময়েন বুঝে গেছে এ মেয়েছেলে নিশ্চয় জানে স্বাতী জামিল সাহেবের সন্তান নয়। মেয়েটিকে নিয়ে হয়েছে ময়েনের জ্বালা! সবতাতে তার ময়না চাচা। বাপের উপর চটে গাল ফুলিয়ে বসে থাকে। শেষে শোনে বাপ কোন ফাঁকে অফিসে চলে গেছে। আর সে হ্যাপাও বিশ বছর ধরে এ বাড়িতে চাকর খাটা ময়েনকে সামলে নিতে হয়।

কিন্তু সামলাতে আর পারে কই! একদিন অনিমা খান অসুস্থ হয়ে পড়লে সেই গিয়ে ডাক্তার ডেকে আনলো, অলক্ষুণে ডাক্তার বলে গেলো, ‘গিন্নি প্রেগন্যান্ট।’ ডাক্তারের ঘোষণা দৈববাণী! আর তারই জের-এ হু হু করে জঞ্জালের মতো বাড়ি ভরে গেলো অনিমা খানের পুরনো ফ্ল্যাটের সব ফার্নিচারসহ তার ছেলেমেয়ে দুটোর অনাচারে। জামিল সাহেব আচরণে ওদেরই বাবা হয়ে উঠলেন। পর হয়ে গেলো স্বাতী। ময়েন নিজের চোখের সামনে কেমন সবকিছু ওলট পালট হয়ে যেতে দেখে। কোনো ক্ষোভ নেই, অভিমান নেই, পাংসুটে ম্রিয়মাণ মুখখানায়। নাকি আলোর মতো মনের গহন আঁধারে মেয়েটি সব লুকাতে জানে!

বেশি বয়সে বাচ্চা! সমঝে চলতে হয়। আর তারই বাড়তি ভার সবটুকু ময়েনের উপর গিয়ে পড়ে। অনিমা খানের চোটপাট থেকে রেহাই পায় না স্বাতীও। ময়েনকে ডাকার মতো চোটপাটে একটুতেই ওরা তিনজন চড়াস্বরে ডাকে সাথী! সাথী! কোমরে বাধা গামছাখানায় ভেজা হাত দু’খানা মুছতে মুছতে ময়েন দৌড়ে যায়। বলে, ওর নাম স্বাতী! সাথী না। আগের বেগম সাব, ওর মা, সাবিহা বুবু রাখছিলো।

এতটুকুও, তা তুমিই তো মেয়েটিকে তোমাদের আগের বেগম সাহেবের কোলে এনে দিয়েছিলে, তাই না। অনিমা খান কর্কশ কণ্ঠে বলে।

-এসব কথা আপনে জানেন কীভাবে? চমকে উত্তর দেয় উত্তর চল্লিশের ময়না ওরফে ময়েনউদ্দিন। এ সংসারটাকে যে আগলে রেখেছে দশ হাতে।

-আমি কেন অনেকেই জানে! নির্বিকার উত্তর অনিমা খানের।

-কিন্তু মাইয়াডা জানে না বুবু! ও জানলি ওরে সামলে রাহা বড় মুশকিল অবে।

এমনিতে মায়ের শোক সামলে ওঠেনি! ময়েন এই প্রথম বুবু সম্বোধন করলো অনিমা খানকে। যেন সে কোনো বিপর্যয় ডেকে না আনে। কিন্তু কাজ হলো না। ঠাটা ফেলে নিষ্ঠুরভাবে চমকে দেয়ার মতো করে রূঢ় স্বরে অনিমা খান আরো বলে ফেললো, ‘মেয়েটিকে যেখান থেকে এনেছিলে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া যায় না?’

-বলেন কী? বিস্ময়ে আরো কতক্ষণ হা করে থেকে আবার ধাতস্থ হতে হতে ময়েন বলতে থাকে,  তা ছাড়া ওর যে কেউ নাই!

-ঠিক আছে! এখন এ নিয়ে আর কথা তুলো না। পরে দেখা যাবে। বলতে বলতে ঠাণ্ডা মাথার খুনিদের মতো হাতের তাচ্ছিল্যে ইশারায় ময়েনকে আপাতত সেখান থেকে সরে যেতে বললো। কিন্তু ময়েন সরলো না, সে বলেই যেতে লাগলো, কী সর্বনাশা কতাডা কইছেন, ভাইবা কইছেন বুবু?

-ভেবেছি! কতখানেই এমন হয়। না হয় বেশি করে কিছু টাকা ধরিয়ে দিতাম।

-সাহেবেরও কি এই মত? নিরুত্তাপ কণ্ঠ ময়েনের। শুধু কিছু বলার জন্য বলা।

-ওর আবার মতামত কী? তাছাড়া ওর তো নিজের সন্তানই আসছে!

– কিন্তু বেগমসাব, এই সংসারে ও এতখানি বড় অইছে যার পরিচয়ে, তার কোনো অধিকার নাই ওরে পরিচয়-ছাড়া করে।

-কেন? সেটা কি রাস্তা থেকে তুলে এনে বড় করার অপরাধে?

-অপরাধে না বেগমসাব, দায়বোদে! আর সাহেব তা করবেন বুইলাও আমার মনে অয় না। কারণ আমি তো তারে ঢের দিন থেইকা চিনি।

-এখন অন্যভাবে চিনবে! আমি চিনাবো! রূঢ় স্বর অনিমা খানের।

-আর মাত্র কয়ডা দিন বেগম সাব…।

-তারপর? শেষ হতে দেয় না অনিমা খান ময়েনের মুখের কথার। নিজের চূড়ান্ত প্রশ্নটি ধারালো পাথরখন্ডের মতো ছুড়ে দেয়।

-তারপর আর কী? মাইয়াডা বড় অইয়া গেছে, বিয়েশাদী অইয়া গেলে সেও বাঁচে, আপনাগেও ফরজ কাজডা অয়!

-না, ও এখানে থাকলে সাহেব ওরে ডাক্তারি পড়াবে। তার সেই রকমই ইচ্ছে। তো তার নিজেরই সন্তান আসছে!

-হ! সাবিহা বুবুর তো সেরম ইচ্ছেডাই ছেলো। কিন্তু অবাগির কপালে না থাকলি…।

-শোনো ময়েন, তুমি ওর আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ করো! আমি তোমাকে মোটা অঙ্কের বকশিস দেবো। আর ওকে একবারে সম্বলহীন করে নামাবো না। ওর মায়ের গহনাগুলো তো আগলে আছে। সেগুলো তোমরা দু-একদিনের মধ্যে আমাকে দেখাবে। আর দেখি, আমি নিজেই মেয়েটার সঙ্গে কথা বলবো।

-ময়েনের মাথায় বজ্রপাত ঘটে বুঝিবা। সে উপুড় হয়ে অনিমা খানের পায়ের উপর পড়ে গিয়ে বলতে থাকে, ‘না বুবু এমন কাজ ভুলিও করবেন না! ধর্মে সবে না। আপনার দুইডা পোলাপান তো এ বাড়িতেই থাহে…

ময়েনের কপাল থেকে এক ঝটকায় নিজের পা সরিয়ে নিয়ে মারমুখী হয়ে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে অনিমা খান। তারপর চোখে বিদ্যুৎ খেলিয়ে নিচুস্বরে বলতে লাগলো, ‘তোমার সাহস তো কম না! নচ্ছার! তুমি আমার বাচ্চাদের সঙ্গে কুড়িয়ে আনা একটা মেয়ের তুলনা করতে পারো?’

-না, স্বাতী কুড়িয়ে আনা না! তার জাতবংশ আছে…।

-তবু তুমি জানো আমার ওই দুই বাচ্চার দুই বাবা কে কে?

-হ, তাতো দেকতিই পাচ্ছি! কয়দিন পর অবে তিন বাচ্চার তিন বাফ! একই ছাদের নিচে বসবাস করে তিনটে বাচ্চা জানবে তারা এক মায়ের পেটে জন্ম নেয়া তিন বাপের তিন সুন্তান। ইডা কত ঘেন্নার, তা আপনি বোজবেন না বুইলাই আমার বয়ডা ছেলো। কথাগুলো বলে ময়েন আর দাঁড়ায় না। বারান্দায় গদি-আঁটা চেয়ারটার হাতল ধরে অনিমা খান বারুদের মতো জ্বলছিলো অনেকক্ষণ ধরে। আর সে-ই আগুন পাকিয়েই চাবুক গড়ছিলো সে আরেকজনকে কষাঘাতের উদ্দেশ্যে। বিনা নোটিশে বাড়ি ছাড়া ময়েনের খোঁজ না পেয়ে ক’দিনের মধ্যে জামিল সাহেব অস্থির হয়ে উঠলেন। সংসারে অচলাবস্থা দেখে শেষে পণ করলেন এবার চাবকে ময়েনের পিঠের ছাল তুলে নেবেন।  সন্দেহে শেষে স্বাতীকে ডেকে জানতে চাইলেন ‘দেখ তো তোর মায়ের গহনাগুলো আছে কিনা, ময়েন সটকে পড়েছে।

-বাবা! বাবার শেষের কথাটিতে আঁতকে ওঠে স্বাতী।

-হ্যাঁ, এখন তো আর ইচ্ছেমতো খরচাপাতি করতে পারে না। আগে তোর মা তাকে বেতনের আগাম টাকা দিয়ে রাখতো, তাই দিয়ে দেশে বেশ জমিজমাও করেছে। এখন আর তার পরের বাড়ি চাকর না খাটালেও চলবে…।

-চুপ করবে বাবা! তোমারও অধঃপতন ঘটেছে।

-ওটাই সত্যি, দেখিস! বলে জামিল সাহেব দাঁড়ান না। মেয়ের সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার জোর তার নষ্ট হয়ে গেছে, এই প্রথম সরে যেতে যেতে তিনি তা বুঝলেন।

অনিমা খান সাতদিনে হাঁফিয়ে উঠেছে। অবশ্য কোনো কাজেই সে হাত লাগাচ্ছে না। শুধু তার ময়না চাচার বিরুদ্ধে কটু কথা শোনার ভয়ে লেখাপড়া ফেলে স্বাতী উঠেপড়ে কাজ করছে। যা আগে সে করেনি। রান্না থেকে প্রতিটি কাজে সে ঠেকে যাচ্ছে, কিন্তু হাল ছাড়ছে না। অনিমা খান অফিস করছে ঠিকই। কিন্তু বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে ঢুকে আর সাড়াশব্দ করেছে না। দশ এবং বারো বছরের ছেলেমেয়ে দু’টোর বাড়িময় কী নির্বিঘ্ন বিচরণ! মনে মনে ক্ষেপে উঠলেও আবার দমে যায় স্বাতী, কেন তা সে নিজেই জানে না। সে কি চরম ঈর্ষা, নাকি ঘেন্না? তাও সে জানে না।

শুধু ময়না চাচার মুখখানা মনে পড়ে মাঝে মাঝে ফুঁসে উঠছে। চাচা একবারও তার কথা ভাবছেন না! বাবা বাড়ির কাজের জন্য একটা লোক যোগাড়ের কথা পর্যন্ত ভাবছেন না। কলেজের পড়া তৈরি, কোচিংয়ের যাওয়া সব আপাতত বন্ধ। তবু তার বিশ্বাস ময়না চাচা ফিরে আসবেই। তার টানেই আসবে। মা ময়না চাচাকে কতবার বলেছেন, ‘এবার আমাদের জন্য ভালো একটা লোক দেখে দিয়ে তুমি দেশে গিয়ে থাকো। আবার বিয়ে-শাদী করো ভাই! একটা টিনের ঘর করতে যা টাকা লাগে আমি দেবো।’ উত্তরে ময়না চাচা বলেছে, ‘না বুবু আপনাগে সাতে থাকতি থাকতি বড় মায়ায় জড়াই গেছি। আপনি, তারপর আমার স্বাতী মা… এবাবে জীবনডা কাটাতি দেন। তাছাড়া বিয়া তো একবার করছিলাম… আমার কপালে আর আল্লা গর লেহে নাই, আমারে খালি খালি আর এই গরতেন বাইর কইরেন না।’

ময়না চাচা মাকে কেমন বিষণ্ণ করে তুলতো। ময়না চাচার কথায় মার কান্না কান্না মুখখানা ভারি প্রিয় ছিলো স্বাতীর। ময়না চাচাকে আর একা মনে হতো না। বরং ময়না চাচার কথাই সত্যি মনে হতো, আপনে আছেন, স্বাতীমা আছে…। কিন্তু মা উঠে গেলে হাউমাউ করে ময়না চাচা কেঁদে বলতো, ‘তুই আমাকে কোথাও যেতে দিসনে মা! কোথাও যেতে দিস না। আমি মইরা গেলিও কবরডা দেখতি যাস…।’

দীর্ঘ সাতদিন পর ময়না ঠিকই ফিরে এসেছিলো। কিন্তু এবার আর ভৃত্যের মেজাজে নয়। তার বুকের ভিতর একটা বাঘ যেন কাউকে নিরিখ করে আছে। যা দেখে স্বাতীর আর কেঁদে উঠতে সাহস হলো না। আবার স্বাতীরও এমন দুরবস্থা দেখে ময়েন এতটুকু কাতর হলো না। বরং থমথমে মুখে স্বগতোক্তি করলো-‘এই কয়দিনে একটা কামের মানুষ জুগাড় করার প্রয়োজন মনে করলো না সাহেব! তোমারে দিয়া সব কামগুনো করাইছে?’

-না চাচা, আমি ইচ্ছে করে করেছি! তুমিও তো করো! ক্লিষ্ট হাসি স্বাতীর সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। নিজেকে ময়না চাচার দৃষ্টির আড়াল করতেই নতমুখে এমন সব পরিস্থিতিতে দ্রুত সেখান থেকে সরে যেত স্বাতী। ময়না চাচার কথা, হাবভাবে স্বাতী টের পায় একটা পথ যেন ধেয়ে ছুটে আসছে তাকে সরিয়ে নিতে। কিন্তু কোথায়, কতদূরে তাকে নিয়ে যাবে পথ? মানুষের ছায়ার মতো, মানুষের মনেরও কী ছায়া থাকে? না থাকলে স্বাতী কেমন করে থৈ থৈ ঢেউয়ের মতো অথৈ দূরত্ব সাঁতরে পার হয়ে বাবাকে জাপটে ধরতে চায়, সে কী শুধু আশঙ্কা থেকে? নাকি কোনো রহস্য আবৃত করে আছে অন্য কোনো ঘটনা?

কেন ভাসে অনাগত পরিণতির সব ছবিগুলো? স্পষ্ট করে কিছু বোঝে না সে। কিন্তু বিরাট দূরত্ব ঠেলে কিছুতেই এগোতে পারে না। স্বাতী কি নিজে পিছিয়ে যাচ্ছে? নাকি তার পিতাই সরে যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হতেই মায়ের মুখখানা প্রকট হয়ে ওঠে। আর সবকিছুই যেন ময়েন চাচাই ঘোলা করে তুলছে। কাকে সে বেশি ভয় পাচ্ছে-ময়েন চাচাকে, নাকি জামিল সাহেবকে?

অনিমা খান এ ক’মাসে একদিনও তাকে ডেকে কথা বলেনি। তাকে এড়িয়ে চলছে। যেন এ বাড়িতে স্বাতীই অবাঞ্ছিত। স্বাতীরও রুচি হয় না সেধে কথা বলে। অথবা তার সঙ্গে বলার মতো ওর কোনো কথাই নেই। বাবার মনেও মা’র কোনো স্মৃতি আছে বলে তার মনে না। এ সংসারে যেন স্থপতিহীন এক ভিত্তি। যেন কোনো শুরু ছিলো না এর।

ময়না চাচা যে কী! সমীরের সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতা দেখে ভেবে রেখেছে, দু’জন দু’জনকে বিয়ের জন্য পছন্দ করে। তাই একদিন স্বাতীর অগোচরে সমীরকে বলেই ফেলেছে, ‘মাইয়াডারে বিয়া যহন করবাই, আগে থেইকা উদ্ধার করো বাবা! সমীর ময়েনের কথায় আশ্চর্য হয়ে বললো, আমরা বিয়ে করবো কে বলেছে তোমাকে! স্বাতী বলেছে বুঝি?’

-না বাবা, না। আমি তাই ভেবেছিলাম। আমরা মূর্খ মানুষেরা জোয়ান ছেইলে মেয়ের এবাবে মেলামেশা দেখলি সেরমই ভাইবে বসি।

সমীর ময়েনের কথা শুনে একাই হেসে খুন হয়। স্বাতী ঘরে ঢুকলে ভেঙে পড়া চুরমার হাসিতে তাকে বলে, -শোনো তোমার ময়না চাচার কথা! তোমার আমার নাকি বিয়ে করার সম্পর্ক?

-কে বলেছে? একটু লজ্জা পেয়েই হেসে জানতে চায় স্বাতী।

-কে আবার? ওই ময়না চাচা।

-শোনো চাচা, ও আমার বন্ধু। আচ্ছা ওর মতো বন্ধু আমার আরো আছে না? তুমি তো সবাইকে চেনো! তুষার, আসিফ, সামিয়া, মুনমুন, আশিক, ফারজানা, শিপ্রা, প্রীতম… শেষ জনের নামটি উচ্চারণ করতে গিয়ে একটু যেন শিউরে ওঠে স্বাতী। তবু ছেদহীন টেনে যায় সম্পর্কের বর্ণনা। … এদের কারো সঙ্গেই কি আমার কম বন্ধুত্ব? তুমি আর এমন ভাববে না।

ময়েন কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তবে এটুকু বুঝেছে মেয়েটিকে সে সমীরের কাছে ছোট করে ফেলেছে। কিন্তু উপায় খুঁজে খুঁজে সেও তো হয়রান, এরা সব ময়েনের ভাষায় ‘আতে-পায়ে লাম্বা অওয়া মানুষ।’ এরা কী বুঝবে? স্বাতী তখনই আবার বলে উঠলো, ‘আর এটা আমাদের বিয়ের বয়সও না চাচা! আমি এমবিবিএস পাস করবো, চাকরিতে ঢুকবো। তারপর বিয়ে! তাও কার কোথায় তাই-বা কে জানে? আর সবাইকে যে বিয়ে করতেই হবে এমন কথাইবা ভাবো কেন? তুমি জানো সমীর আগামী মাসে কানাডা যাচ্ছে। সামিয়া, আশিক আমেরিকার ভিসার জন্য চেষ্টা করছে। আমার মা বেঁচে থাকলে দেখতে আমাকেও ওরকম পাঠাতেন!’

-একটা মাইয়া অতোদূরে একা একা যাতি পারে?

-কেন পারে না! কতজন যাচ্ছে। মুনমুন গেলো না? তবে ইচ্ছে করলেই যে কেউ যেতে পারে না। টাকার ব্যাপার, ভালো রেজাল্টের দরকার…। যারা ভিসা দেবেন তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা…। রীতিমত কসরত চালাতে হয় নিজেকে নিয়ে…। কিন্তু দেখছো না এখন তো তোমার সঙ্গে আমাকেও সংসারের জোয়াল টানতে হচ্ছে। না হলে তুমিও তো একা পেরে উঠবে না।

-অলক্ষ্মীর মতো কথা কইও নাতো! তুমি বুজি সুংসারের কাম করতি পইড়্যা থাকপা?

স্বাতীর কথার ভেতরেই যেন ময়েন তাকে দূরে সরানোর উপায় খুঁজে পেয়ে যায়, সে সমীরের মুখে দৃষ্টি তীরের মতো বিঁধিয়ে বলে ওঠে, ‘তোমরা ওর বন্ধুরা, ওরে তোমরা কেউ তোমাগের সাতে নিয়া যাতি পারো না?’

সমীর কিছুটা ভড়কে যায় যেন, ময়েনের কথাগুলো আক্রমণাত্মক শোনায় ওর কাছে। তবু সে বলে, ‘হ্যাঁ চাচা পারি…।’ স্বাতী ময়েনের কথাগুলোকে বাতুলতা মনে করে বলে উঠলো, হ্যা আমি সবই করবো, কিন্তু চাচা তুমি দয়া করে ওর সঙ্গে আমার বিয়ে দিতে চেয়ো না। আর ও তো হিন্দু… তাছাড়া বয়সে সমান বর আমার পছন্দ নয়…।’ সমীর হাসতে হাসতে বেরিয়ে যায়। স্বাতী গম্ভীর হয়ে ময়না চাচার মুখোমুখি দাঁড়ায়, কিছুটা ভর্ৎসনার স্বরেই বলে ওঠে, তুমি কি সত্যি আমার বিয়ের কথা ভাবছো? কিন্তু কেন? তুমি ভাববার কে…।

ময়েন উত্তর দিতে কথা খুঁজে পায় না। ছুরির তীক্ষ্ম ফলটি যথার্থই গেঁথে গেছে বুকে। তবু যেমনটি দাঁড়িয়েছিলো তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে। আর তাতেই আরো তেতে ওঠে স্বাতী। ঝাঁঝিয়ে বলে ওঠে, সে ভাবনা তো আমার বাবার! তোমাকে কি তিনি আমার দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন?

কঠিন একটা কিছু বলতে গিয়েও পাথর গেলার মতো ময়েন গিলে ফেলে। পাকিয়ে ওঠা কষ্টের গোলাটি কণ্ঠনালী চেপে রাখে অনেকক্ষণ। ময়েনের দৃষ্টি চৈত্রের ফাটা মাঠের মতো খটখট করে স্বাতীর চোখের মণির উপর। অনধিকার চর্চার বাহুল্য নয়, বরং দায়বোধের কাঠিন্য ভেসে থাকতে দেখে সে তাতে। তারপর নিজেই চুপসে যায় ফুটো বেলুনের মতো। দ্রুত সেখান থেকে না পালিয়ে পারে না। নিভৃতে নিবিষ্ট হতে মায়ের পরে এই একজন মানুষ ছাড়া তার আর কাউকে মনে পড়ে না ছায়াদায়ক। ধড়ফড় করে আবার উঠে পড়ে সে ময়না চাচার খোঁজে। মূর্খ ময়েনউদ্দিনের মাথার মধ্যে অন্য চিন্তা ঢুকে গেলো দুশ্চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে। ‘হতভাগী, পোড়া কপালীডারে কোনোদিন জানানো যাবে না কে তার বাপ! তাহলি আর ক্ষতির পূরণ অবে না।’ ঘুম আসে না ময়েনের। দিনের কাজেকর্মেও ভুলভাল লেগে আছে।

(বাকি অংশ পরের সংখ্যায়)

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ