21 Jun

সাহিত্যের সাধনা

লিখেছেন: সাহিত্যের সাধনা/ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়


 

রাজনীতি বা সমাজ–সংস্কারাদির জন্য সঙ্ঘ– সমিতির বৈঠক এবং সাহিত্য – সভার মধ্যে পার্থক্য অনেকখানি। পূর্বোক্ত ব্যাপারগুলিতে সঙ্ঘগঠন, অধিবেশন ইত্যাদি অপরিহার্য। জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রাথমিক প্রয়োজনাবলীর সঙ্গেই প্রধানতঃ এই কর্মবিভাগগুলি সংশ্লিষ্ট, বহুর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে মিলিত না হয়ে এখানে প্রচেষ্টা সফল হয় না। অন্যদিকে, সাহিত্য যদিও সর্ব–সাধারণের মধ্যে আন্তরিকতম মিলনের যোগসূত্রস্বরূপ এবং যদিও চারিপাশের মানুষকে বাদ দিয়ে এখানে কোনো সৃষ্টি সার্থক হওয়া দূরে থাক্‌, প্রায় সম্ভবই নয়, তবুও সাহিত্য– সৃষ্টি লোকালয়ের হাটের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে করবার জিনিস নয়। কবি, সাহিত্যিক, আর্টিস্টদের মধ্যে এক ধরনের সহজাত নিঃসঙ্গতা থাকে। সার্থক রসসৃষ্টি, সাধারণ দৈনন্দিন জীবনোত্তীর্ণ বৃহৎ আনন্দলোকের আবাহন, যার জন্য প্রতি শক্তিশালী কবিমানসেই আত্মপ্রকাশের প্রেরণা তাঁর শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলিতে সঞ্চারিত হয় এর জন্যে আর্টিস্টের প্রয়োজন। আপন কল্পনার আবহাওয়ায় যত বেশীক্ষণ সম্ভব এবং যত গভীরতমরূপে সম্ভব বাস করা। দুঃখ – বেদনা, হাসি– অশ্রু, সমস্যা – বিজড়িত অপরূপ মানুষের জীবন এবং জগৎ তাঁর লেখার মালমসলা কিন্তু নিরাসক্ত আনন্দের মধ্যেই তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি সম্ভব। কবি সাহিত্যিক আপনার জন্য লেখেন, কেননা সেই লেখার মধ্য দিয়েই তাঁর আত্মপ্রকাশ, কেননা অস্তিত্বের সেই একমাত্র রূপের মধ্য দিয়ে তিনি আপনাকে উপলব্ধি করেন। তিনি আরও জানেন যে ভালবাসার আলোকক্ষেপ ব্যতীত সৃষ্টিতে সত্যকারের বর্ণ ফোটে না – প্রেম ও এক ধরনের নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি ব্যতীত বাস্তব জগৎ এবং মানবহৃদয়ের গহনতম রহস্য উদ্ঘাটিত হওয়ার নয়। আপনাকে প্রতি মুহূর্তে পূর্ণ করেও প্রতি মুহূর্তে তিনি আপনাকে অতিক্রম করে যান। চারিপাশের মানবসমাজের অন্তরতম হৃদয় – স্পন্দনকে তিনি একান্তভাবে অনুভবের চেষ্টা পান – তাতেই তো তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠ প্রেরণার ক্ষণে যখন কথা বলেন, তখন তাতে সব দেশ সব কালের বিশ্বমানবের কন্ঠ বাজে, জীবনের মূলতম রহস্যের আবেগ সেখানে একান্তভাবে সঞ্চারিত হয়। সুতরাং সকলের সঙ্গে আপনাকে নিরন্তর যুক্ত রেখে তাঁর সাধনা। তবুও মনের দিক দিয়ে তাঁর পক্ষে চরম একাকিত্ব একটি প্রকান্ড সত্য – অপরিহার্য ও প্রয়োজনীয়।

সাহিত্যের কি মূল্য ? ঘন এক টুকরো কবিতা, অনবদ্য একটি ছোটগল্প, নিবিড় রেশময় একটি ‘লিরিক্‌’, ঠাসবুনোট একখানি উপন্যাস, বিপুলতম যার ব্যঞ্জনা, যেখানে বাস্তব জীবন – নাট্যের বিচিত্র কলকোলাহল, উত্তেজনা ধ্বনিত হয়েছে – আমাদের জীবনে এসবের জন্যে বিশেষ স্থান নির্দিষ্ট করে রাখা কি এতই দরকার ? উত্তর হচ্ছে, দরকার ; অত্যন্ত বেশী দরকার আরো এই জন্যে যে, এই সব প্রশ্ন এখনো আদৌ ওঠে। তেল – নুন – লক্‌ড়ির কারবার করতে করতে আমাদের অনেকেরই দিন আসে মিলিয়ে। বাঁধা রাস্তায় আমরা জন্মাই ও মরি – দু পাশের এ দুই চরম পরিচ্ছেদের মাঝখানের রাস্তাটা আমরা অনেকেই যে ভাবে চলি, তাতে যেন আমাদের স্রষ্টাকেই ব্যঙ্গ করা হয়। সাহিত্য তাই আমাদের এই অতি – অভ্যাসে বদ্ধ ঝিমিয়ে আসা মনের পক্ষে আকাশ স্বরূপ, দিগন্ত এখানে অত্যন্ত বিস্তৃত, আবহাওয়া সর্বদাই উজ্জ্বল, অজস্র খোলা জানলা দিয়ে অদৃশ্য কেন্দ্র থেকে প্রতিক্ষণে দিব্যি যৌবনময় আলো আর চেতনা এসে ঝড়ে পড়ে। জীবনের এই অতি বিরাট পটভূমিকার জগতে এসে পাঠক এক মুহূর্তে আপনাকে বড় করে পায়। দৈনন্দিন জীবনের পারিপার্শ্বিকতার সহস্র ক্ষুদ্রতা, ক্লেদ, গ্লানি পেছনে পড়ে থাকে – মানুষ খানিকক্ষণের জন্যে অন্ততঃ খন্ড কাল ও দেশের অতীত এক জ্যোতির্ময় চেতনাস্তরের মধ্য দিয়ে অববাহিত হয়ে আসে। প্রত্যেক আত্মসত্তার এই যে বিস্তারের সম্ভাবনা – কাব্য ও সাহিত্য, তথা আর্টের অন্যান্য বিভাগ, এতে প্রত্যেককে অত্যন্ত প্রত্যন্ত প্রত্যক্ষরূপে সহায়তা করে।

সাহিত্য আরো অনেক কিছু করে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কম – বেশী পরিমাণে একটি মানুষ আছে, যে নাকি স্বপ্ন দেখে, যে নাকি অন্ততঃ কোনো কোনো ক্ষণের জন্যেও আদর্শবাদের তীব্র প্রেরণা অনুভব করে, যে অতীত স্মৃতির অনুধ্যানে সহসা উন্মনা হয়, ভবিষ্যতের কল্পনায় নেশার মত হয় আসক্ত – রসসাহিত্যের একটি প্রধানতম কাজ হচ্ছে প্রত্যেকের ভেতরকার এই স্বপ্নালু লোকটির তৃপ্তি বিধান করা। তা ছাড়া, কথা–সাহিত্যিক সমসাময়িক সমাজ বা রাষ্ট্রনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশকালান্তরিত জীবনের ছবি আঁকেন। এর মননশীল দিক প্রধানতঃ জীবন–সংগ্রামে ও সভ্যতার সংগঠনে আমাদের শক্তি জোগায় এবং বিশেষ করে রসসাহিত্যের সাধনা হচ্ছে অবিচ্ছিন্নভাবে সে আনন্দের রূপীকরণ ও পরিবেশনে, যে মূল আনন্দের প্রেরণায় জীবনের হোল উৎপত্তি, – সুখদুঃখ হর্ষবেদনা প্রেমদীপ্ত ক্ষয়মৃত্যু সব ছাড়িয়ে যে নৈর্ব্যক্তিক আনন্দ সত্তা জীবনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে প্রতিক্ষণে আপনাকে প্রবাহিত করে চলেছেন এবং একটু একটু করে মেলে ধরছেন। আমাদের ধরণী এবং ধরণীর এই জীবন সম্বন্ধে আমাদের দৃষ্টি বারে বারে ঝাপসা্‌ হয়ে আসে – প্রকৃতির বাইরেকার কাঠামোটাকে দেখে আমরা বারে বারে তাকে ‘রিয়ালিটী’ বলে ভুল করি, জীবন– নদীতে অন্ধ গতানুগতিকতার শেওলা দাম জমে, তখন আর স্রোত চলে না ; তাই তো কবিকে, রসস্রষ্টাকে আমাদের বার বার দরকার – শুকনো মিথ্যা বাস্তবের পাঁক থেকে আমাদের উদ্ধার করতে।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে বলা যেতে পারে যে, সাহিত্য ও শিল্পকে সর্বসাধারণের উপযুক্ত করে দাও – এই একটী আধুনিক ধুয়ার কোন মানে হয় না। এ কথার অর্থ তো এই যে, শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের রস অত্যন্ত ঘন, একে খানিকটা জলো করে দাও – এর শিল্পের বুনুনীতে অত সূক্ষ্ম তন্তুর বদলে মোটা দড়ির ব্যবহার প্রচলিত কর। কারণ, তা’হলে তখন শিক্ষা ও শক্তি নির্বিশেষে এ সাহিত্য যাবতীয় জনেরই হয়ে উঠবে ; রসের মন্দিরে ভিড়ের আর কম্‌তি থাকবে না। আমাদের বক্তব্য এই যে, এ রকম কোন আদর্শের উপর যদি জোর দেওয়া হয়, তবে সাহিত্যের সর্বনাশ করা হবে, এবং যাদের  দিকে চেয়ে সাহিত্যে এই ভুয়ো গণতন্ত্রের সুর আমদানীর জন্য আমরা এ করতে যাব তাদেরও শেষ পর্যন্ত উপকার কিছু হবে না। রসসাহিত্যের উপভোগ সামর্থ্যের দিক দিয়ে যারা ‘হরিজন’, সাহিত্যকেও জোর করে ‘হরিজন’–মার্কা করে তাদের স্তরে না নামিয়ে উক্তরূপ তথাকথিত ‘হরিজনদের’ আর্ট ও সংস্কৃতিগত শিক্ষার এমন সুযোগ ও সাহায্য দিতে হবে, যাতে করে তারা মনের দিক দিয়ে ক্রমশঃ উঠে আসতে পারে, সূক্ষ্মতম রসের স্বাদ গ্রহণে পারগ হয় – যেমন ধর্মের ক্ষেত্রে, তেমনি এ ক্ষেত্রেও অধিকারী ভেদ মানতে হয়। বাস্তবিকপক্ষকে আমরা দেখতে পাই যে চিন্তামূলক বা সৌন্দর্যমূলক সত্য, ইন্দ্রিয়জ বা অতীন্দ্রিয় রসের আবেদন, অথবা একই শ্রেষ্ঠ কাব্য উপন্যাস বা নাটক, জন্মগত ক্ষমতা তথা অনুশীলনবৃত্তির চর্চাভেদে বিভিন্ন পাঠকের মনে প্রধানতঃ “ইন্‌টেনসিটি”র দিক দিয়ে বিভিন্ন রকমের সাড়া জাগায়। সুতরাং আমাদের কর্তব্য হচ্ছে, সাহিত্যের যে একটি স্বাভাবিক আভিজাত্য আছে, এমন কিছু না করা যাতে তা এতটুকু ক্ষুণ্ন হয়, পরন্তু আমাদের সবাইকে তার উপযুক্ত হতে শিক্ষিত করা।

সাহিত্য জাতির  মেরুদন্ডস্বরূপ। একটী জাতির সমগ্র আশা, আকাঙ্খা, হর্ষ, বিষাদ নিয়ে সেই জাতির সাহিত্য। সাহিত্য একটী বিশাল মহীরুহ – এর কান্ড, শাখা – প্রশাখা, ফুল, ফল, মূল, পত্রপুঞ্জ একজনের কীর্তি নয়, বহু শতাব্দী ধরে বহু রসিক মনের সৃষ্টি। এই বিপুল সমগ্রতাকে সহজ মনে স্বীকার করে নিলে আমাদের মধ্যে দলাদলির প্রশ্নই উঠতে পারে না – সকল সাহিত্যিক দ্বারা গঠিত এই জাতীয় সাহিত্যের মধ্যে উচ্চনীচ সবারই স্থান আছে এবং এদের সকলেরই কাছে আমরা সমান কৃতজ্ঞ।

পক্ষান্তরে যে সাহিত্য টবের ফুল – দেশের সত্যিকার মাটিতে শিকড় চালিয়ে যা রস সঞ্চয় করচে না, দেশের লক্ষ লক্ষ মূক নরনারীর আশা আকাঙ্খা, দুঃখবেদনা যাতে বাণী খুঁজে পেল না – তা হয় রক্তহীন পান্ডুর, থাইসিসের রোগীর মত জীবনের বরে বঞ্চিত নয় টো সংসারবিরাগী, ঊর্ধবাহু মৌনী যোগীর মত সাংসারিক জীবনের বাইরে অবস্থিত। মানুষের মনের বা সমাজের চিত্র হিসেবে তা নিতান্তি মূল্যহীন। মিথ্যাকে আশ্রয় করেও কথা – সাহিত্যিক রসসৃষ্টি করতে পারেন না এমন নয়, কিন্তু সে হয় মানুষকে ক্ষণকালের জন্য ভুলিয়ে রাখবার সাহিত্য। সাহিত্যে আমরা দেখতে চাই মানুষের জীবনকে। গভীর রহস্যময় এই মানবজীবন। এর সকল বাস্তবতাকে, এর বহুবিচিত্র সম্ভাব্যতাকে রূপ দেওয়ার ভার নিতে হবে কথাশিল্পীকে। তাঁকে বাস করতে হবে সেখানে, মানুষের হট্টগোল কলকোলাহল যেখানে বেশী, মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে, তাদের সুখদুঃখকে বুঝতে হবে। যে বাড়ির পাশের প্রতিবেশীর সত্যিকার জীবনচিত্র এঁকেচে – সে সকল যুগের সকল মানুষের চিত্রকে রূপ দিয়েচে লেখনীর তুলিকায়। মানুষ যা কিছু করে, যা কিছু ভাবে, সবই সাহিত্যের উপাদান।

কিন্তু এই বাস্তবতার কি একটা সীমা নেই ? জীবনের নগ্ন চিত্র – দিগ্বসনা ভীমা ভয়ঙ্করী ভৈরবীর মত করাল – সে চিত্র মানুষের মনে ভয় সঞ্চার করে, অবসাদ আনে, সাধারণ রসবিলাসীর সাধ্য নয় সে কঠিন নিষ্ঠুর সত্যের সম্মুখীন হওয়া। সূর্য্যের অনাবৃত তাপ পৃথিবীর মানুষে সহ্য করতে পারে না। তাই বহু মাইল ব্যাপী বায়ুমন্ডলের আবরণের মধ্য দিয়ে তা পরিস্রুত হয়ে, মোলায়েম হয়ে, অনেক পরিমাণে সহনীয় হয়ে তবে আমাদের গৃহ – অঙ্গনে পন্ডিত হয় বলে রৌদ্র আমাদের উপভোগ্য, প্রাণীকুলের উপজীব্য।

সে আবরণ দেবেন শিল্পী তাঁর রচনায়। নির্বাচনের স্বাধীনতা তিনি ব্যবহার করবেন শিল্পীর সংযম ও দৃষ্টি নিয়ে।

দুদিন বা দশ দিন পরে কেউ আমার বই পড়বে না, এ ভয় কোন সত্যিকার কথা – সাহিত্যিক করেন না। করেন তাঁরা, যাঁরা একটা মিথ্যা ভবিষ্যতের ধূম্রলোকে নিজেদের চিরপ্রতিষ্ঠ দেখতে গিয়ে বর্তমানের দাবীকে অস্বীকার করেন। কত বড় বড় নামওয়ালা কথা – সাহিত্যিক তলিয়ে গিয়েচেন মহাকালের ঘূর্ণিপাকের তলায় – সেই যুগের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে পরবর্তী যুগের লোকেরা ধুলো ঝেড়ে ছেঁড়াপাতাগুলো উদ্ধার করবার কষ্টও স্বীকার করে না। দু – দশজন সাহিত্যরসিক, দু – পাঁচজন পন্ডিত, দু – একজন বৈদগ্ধ্যগর্বী মানুষ ছাড়া আজকালকার যুগে কথা – সরিৎসাগর কে পড়ে, গোটা অখন্ড আরব্য উপন্যাস কে পড়ে, ডনকুইকসোটের মত উপন্যাস কে পড়ে ! চসার, দান্তে, মিলটন এঁদের কথা বাদ দিই – ছাত্র বা অধ্যাপক ছাড়া কেউ এঁদের পাতা ওল্টায় না, তাও ওল্টাতে হয় তাদের পরীক্ষা বা চাকুরীর দায়ে, কিন্তু অত বড় যে নামজাদা ঔপন্যাসিক বালজাক্‌ – তাঁরও উপন্যাসরাশির মধ্যে কখানা আজকাল লোকে সখ করে পড়ে ? স্কট, হেনরি জেমস্‌, থ্যাকারে, ডিকেন্স সম্বন্ধেও অবিকল এই কথা খাটে। নবীন সেনের ‘রৈবতক’ বা হেমচন্দ্রের ‘বৃত্রসংহার কাব্য’ আমাদের মধ্যে কয়জন পড়েছেন, এ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়। ফিলমে্‌ না উঠলে অনেকের অনেক উপন্যাস কি নিয়ে লেখা তাই লোকে জানতে পারতো না। নামটাই থেকে যায় লেখকের, তাঁর রচনা আধমরা অবস্থায় বেঁচে থাকে ; অনেক ক্ষেত্রে মরে ভূত হয়ে যায়।

জানি, একথা আমাদের স্বীকার করতে মনে বড় বাধে। খোলাখুলি ভাবে বললে আমরা এতে ঘোর আপত্তি করি –  ‘বিশ্ব’, ‘অমর’, ‘শাশ্বত’ প্রভৃতি বড় বড় গালভরা কথা জুড়ে দীর্ঘ ছাঁদে সেন্টেন্স্‌ রচনা করে তার প্রতিবাদ করি। কিন্তু মনে মনে আমরা আসল কথাটি সকলেই জানি। পাঠাগারের কথাই ধরা যাক, পার্ক ষ্ট্রীটে ওয়েলডন্‌ লাইব্রেরী একটা খুব বড় বিলিতী ও আমেরিকান্‌ উপন্যাস আমদানীকারক লাইব্রেরী। অনেক সাহেব, মেম, আমাদের দেশের অনেক লোক পড়বার জন্যে তার সভ্য হয়ে থাকেন। কিন্তু আমি জানি তিন বছর অন্তর বইয়ের আলমারি থেকে সমস্ত পুরাতন বই নিষ্কাশিত করে দিতে হয়, সস্তায় পুরোনো বইবিক্রেতারা সেগুলো নীলামে ডেকে নিয়ে যায়। লোকের হুজুগ নতুন বই চায়, তারা লেখক বাছবে না, বইয়ের গুণাগুণ বিচার করবে না, সাহিত্যরসের ধার ধারবে না – নতুন হোলেই হোল। এ মাসের যদি হয় তবে এর ও মাসের চাইবে না প্রায় সেই অবস্থা।

সাহিত্যে প্রোপ্যাগান্ডার স্থান সম্বন্ধে অনেকে অনেক কথা বলেচেন। আমাদের বক্তব্য এই যে, সমাজসংস্কারর্থ হোক্‌, দেশপ্রেমই হোক, অথবা অন্য কোন সমস্যদির সম্বন্ধে মতবাদই হোক – সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সব কিছু করা যেতে পারে, যদি তা তারপরেও সাহিত্যই থাকে, কোনো প্রচার বিভাগের বিশদ ও চিত্তাকর্ষক প্যাম্ফলেট না হয়ে ওঠে। সাহিত্য ও আর্টের জাত নষ্ট হয় তখনি – যখন এ অপরতর কোনো উদ্দেশ্য সাধতে গিয়ে আপনার মূল সাধনা, সমসাময়িক সমস্যার অতীত, শাশ্বত সৌন্দর্যসৃষ্টির প্রেরণা থেকে বিচ্যুত হয়। মনে রাখতে হবে ‘স্বধর্ম ত্যাগ করা ভয়াবহ’, অনেক কিছুর মত এক্ষেত্রেও। বাইরের পৃথিবী এবং মানুষের জটিল জীবনকাহিনী তাদের অন্তনির্হিত রসরূপে তখনই আমাদের অভিভূত করতে পারে, যখন আমরা এদের পাই একই সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে এবং ইন্দ্রিয়াতীতরূপে আমাদের মানবসচেতনায়। এই জন্য আদিরসের কথা বলতে গিয়েও কবি যখন নিরাসক্ত কুতূহলে অতীন্দ্রিয় ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে চলেন – তখনই শুধু তা হয় আর্ট। তখন তার সম্বন্ধে শ্লীলতা বা অশ্লীলতার কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। অর্ন্তদৃষ্টি যথেষ্ট পরিষ্কার হোলে লেখক ও পাঠক উভয়েই দেখবেন যে বাইরের জগতে যা ঘটে, তার চেয়ে লেখকের মনের জগতে এর এক মহত্তর ব্যঞ্জনাময় বাস্তব আছে। সকল প্রতিভাশালী লেখকই এই বাস্তবের সঙ্গে পরিচিত এবং সৃষ্টির ক্ষেত্রে একে উপেক্ষা করবার ক্ষমতা তাঁদের নেই।

আরও একটা কথা আমাদের প্রণিধানের যোগ্য। নির্জলা সত্যের রূপ দেখবার সৌভাগ্যও তো সকল শিল্পীর হয় না। এমন অনেক দিক আছে জীবনের, নারীর প্রেমের, নিজের মনের গোপন রূপের, মানুষের চরিতের – যা কেবল দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পরে প্রকাশ পায়, সে অভিজ্ঞতা অর্জন করা সময়সাপেক্ষ। অল্পদিনের মধ্যে সে গভীর জ্ঞান সকলের করায়ত্ত হয় না – যে জ্ঞান মায়ামৃগের মত শিল্পীকে গহন থেকে গহনতর রহস্যের পথে, বিপদের পথে নিয়ে যায়, কারণ তার অর্জনের পথেই বহু বাধা, বহুবিপদ। জনপ্রিয়তার স্পর্ধায় যে শিল্পী মনে করেন তিনি জীবন সম্বন্ধে যা বলেচেন তাই সত্যি – এবং তাই সবাই মেনে নেবে, তিনি সরল পাঠকবর্গকে প্রতারিত তো করেনই – সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও প্রতারিত করেন।

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ