24 Aug

যদি এমন হত

লিখেছেন:দেবাশিস মল্লিক


হ্যালো সুমিত্র বলছি। ও আন্টি, বলুন, হ্যাঁ আমি বাসে, হাওড়া জাচ্ছি। না, আত্রেয়ী তো আমার সঙ্গে নেই। হ্যাঁ আমরা সবাই আজ কলেজে গিয়েছিলাম। এস এস ম্যামের কাছে প্র্যাক্টিক্যাল খাতা জমা দিতে, না, আত্রেয়ী তো আজ কলেজে আসে নি। কী বলছেন! কলেজে যাবে বলে ও সেই দুপুরবেলায় বাড়ি থেকে ব্যাগপত্র নিয়ে বেরিয়েছে। না না, আমি তো খাতা জমা দিয়েই বাড়ি ফিরে এসেছি। বাড়ি থেকে এই তো বেরলাম। সে কী! দুপুরে ফোন করে আমার সঙ্গে আছে বলেছে! কিন্তু ওর সঙ্গে তো আজ দেখাই হয় নি! কী বলছেন! তারপর থেকে ফোনে ওকে ধরা যাচ্ছে না! সে কী! কোথায় গেল? আন্টি বিশ্বাস করুন, সত্যিই আমি জানি না আত্রেয়ী কোথায় আছে। আর কে থাকবে? এ ক’দিন বাড়িতে মা একলাই থাকবে। ওর খবর কিছু পেলে একটু জানাবেন।

একটু পরেই মুঠোফোনটা আবার বেজে উঠল – হ্যালো মা, বলো, আমি বাসে, এখনো পৌঁছই নি। কী! আন্টি আবার তোমায় ফোন করেছে! আরে কী সব বলছ! আমি বাবুদাকে তুলতে যেতে বারণ করেছি হাওড়া থেকে বাবুদাকে সোদপুরে ফিরতে হবে বলে। এই অফিসটাইমে রাস্তায় কত জ্যাম থাকে। ওর মিথ্যে হয়রানি হবে ভেবে। কী বলছ মা, আমি সত্যি জানি না আত্রেয়ী কোথায় গেছে। কী জন্য ও আন্টিকে মিথ্যে বলেছে তাও জানি না। আমার সাথে তো আজ দেখাই হয় নি। আমার কথা তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না! আমি তো বলছি, আরে, আমার কথাটা তো আগে শুনবে। আরে আরে যাহ্ ফোনটা কেটে দিল।

কিছুক্ষণ ফোন করার চেষ্টা ক’রে বলে ওঠে – নাহ্ রিং হয়ে যাচ্ছে, মা ফোনটা ধরছেই না।দাঁড়াও মজা দেখাচ্ছি। এবার রিং করেই হ্যালো আন্টি, কী ব্যাপার, আপনি আমাকে যা তা বলছেন, আমার মাকে ফোন করে অপমান করছেন, কেন বুঝতে চাইছেন না আপনার মেয়ে কোথায় গেছে আমি জানি না। শুনুন, আপনার মেয়ে নাবালিকা নয়, সে হয়ত নিজের ইচ্ছেয় কোথাও গেছে। কী বলছেন, আঙ্কল হাওড়ায় আসছেন এস্পার ওস্পার করতে? আসুন না। কী? ওপরমহলে আপনাদের যথেষ্ট চেনাজানা আছে? আচ্ছে এসব কথা আমায় শোনাচ্ছেন কেন? শুনুন এ নিয়ে আমায় বা আমার মাকে প্লিজ আর বিরক্ত করবেন না। বরং ওই যে ওপরমহলে চেনাজানার কথা বলছিলেন, তাদের দিয়ে মেয়েকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করুন। উত্তেজিত হয়ে ফোনটা কেটে দেয় ছেলেটি।

বাসে ওঠার পর থেকেই ছেলেটাকে একটার পর একটা ফোন করে যেতে দেখছি। খুব উত্তেজিত ভঙ্গি। কখনও ক্রুদ্ধ কখনও বেশ হতাশ। ইতিমধ্যে অনেকক্ষণ দাঁড়াবার পর রবীন্দ্রসদনের কাছে এসে বসতে পেলুম ছেলেটির পাশে। দেখি ছেলেটি বেশ ঘামছে। ‘কী হল তোমার? শরীর খারাপ নাকি?’ আসলে ভয় হচ্ছিল জানলার ধারে বসে এত হাওয়ার মধ্যে এত ঘামছে, বমি টমি ক’রে না ফ্যালে আবার! ‘না কাকু, একটা বিপদ হয়েছে।’ ঠিক তক্ষুণি বেজে উঠল ছেলেটির ফোন।

হ্যালো প্রলয়, সুমিত্র বলছি রে, হ্যাঁ আমি তোকে ফোন করেছিলাম। গুরু, একটা কেস খেয়ে গেছি। আরে বিশাল কেস। আজ আমরা কলেজ থেকে এক্সকারশানে সিমলা যাচ্ছি। কালকা মেলে, সন্ধ্যে সাতটা চল্লিশে হাওড়া থেকে ছাড়বে। এখন ঐ আত্রেয়ী আছে না, ও বাড়িতে আমার সঙ্গে হাওড়া যাচ্ছে বলে কোথাও একটা চলে গেছে। আমি কিচ্ছু জানি না। ওকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে আন্টি আমার কথা বিশ্বাস করছে না। মাকে ফোন ক’রে যাচ্ছেতাই অপমান করেছে। মা তো খচে ভিসুভিয়স। ফোন তুলে আমায় যা তা বলল, কোন কথাই শুনল না। তারপর থেকে ফোন করছি কিন্তু ধরছে না। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। এদিকে আত্রেয়ীর বাবা-মা আমায় পুলিশের ভয় দেখাচ্ছে। শোন, আমারটা আমি সামলে নেব। বস তুই শুধু মাকে একটু দেখিস। একটু বোঝাস। আমি তো কিছু না জেনে, না ক’রেই মিথ্যে কেস খেয়ে গেলাম। হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাড়িতে মা একদম একা হয়ে গেছে। মায়ের জন্য খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে গুরু। শুধু তোর ভরসাতেই ক’দিনের জন্য চললাম। ফিরছি সতেরই। আচ্ছে আচ্ছে, হ্যাঁ হ্যাঁ, ওখান থেকে তোর সঙ্গে যোগাযোগ করব। তুই কিন্তু মাকে একটু বোঝাস ভাই। আচ্ছা আচ্ছা রাখছি।

এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া চোখে মুখে লাগতেই জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি বাস এখন হাওড়া ব্রিজ পার হচ্ছে। ছেলেটা হয়ত উদ্বেগে – দুশ্চিন্তায় চোখ বুজে বসে আছে। আশপাশ থেকে চূর্ণ মন্তব্য ভেসে এল – ‘তখন থেকে মশাই বকবক – মাথা ধরে গেল একেবারে’

‘কোথায় কী কেলেঙ্কারি ক’রে এসেছে, ঠিক আছে?’

‘বুঝলেন না, আজকালকার ছেলেমেয়েদের কাণ্ড, ঘেন্না ধরে গেল মশাই’

ব্রিজ থেকে নেমে বাসটা এক পাক ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। সবাই  অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে যে যার পজিশন নিচ্ছে। অন্যদিনের মত ব্যস্ত হয়ে দৌড় লাগাবার কোন তাগিদ যেন নেই আমার। ভাবছি মেয়েটির কথা। কোন নারীপাচারচক্রের পাল্লায় পড়ে যায় নি তো? কতই বা বয়স! আহা! আমরা কি এসব কাগজে পড়ি না? টিভিতে দেখি না? ঠিক করলুম প্লাটফর্মে নয়, বরং বড় ঘড়ির নিচে যেখানে ওদের কলেজের সবার একজোট হওয়ার কথা সেখানেই যাব। হয়ত আত্রেয়ীর বাবা ওখানেই পুলিশ নিয়ে সুমিত্রর জন্য অপেক্ষা করছেন। সুমিত্রকে দেখলেই ওর জামার কলার চেপে ধরে বলে উঠবেন ‘স্কাউন্ড্রেল, আমার মেয়ের সর্বনাশ ক’রে বেড়াতে যাবে ভেবেছ?’ নাকি দেখা হতেই প্রথমে গালে এক চড় বসিয়ে দেবেন!

কিংবা এমনও হতে পারে আত্রেয়ীর বাবা যখন পুলিশ ডেকে সুমিত্রকে গ্রেপ্তার করতে বলছেন, সেই সময় দূরের দিকে দৃষ্টি গেল তাঁর। মেয়েকে এদিকেই এগিয়ে আসতে দেখে থ’ হয়ে গেলেন তিনি। আচ্ছা, আত্রেয়ী কি কাউকে ভালবাসে? ও কি তাকে বিয়ে করে বসল? নিশ্চিত ক’রে কিছুই বলা যায় না। বয়সটাই তো এমন হঠকারি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুকূল। একমাথা সিঁদুর নিয়ে এগিয়ে এসে বলল – ‘না বাবা, ওকে কিছু বোল না, ওর কোন দোষ নেই। ও কিছু জানে না।’ তারপর সুমিত্রর দিকে তাকিয়ে ‘কিছু মনে করিস না। জানি তোর ওপর দায় চাপিয়ে মস্ত অন্যায় করেছি। কিন্তু বিশ্বাস কর, এছাড়া আমার আর কিছু করার ছিল না।’ সুমিত্র তখন কি করবে? আত্রেয়ীর হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ওর মাথায় যদি আগুন জ্বলে যায়? খুব কি দোষের হবে যদি ও এবার একটা চড় মেরেই বসে?

…না। সুমিত্র এসব কিছুই করে নি। বরং বাস থেকে নেমে কয়েক পা একসঙ্গে হাঁটার পরই ও আমার দিকে ফিরে আমার হাতদুটো ধ’রে বলেছে – ‘ধন্যবাদ কাকু, আর আমার সঙ্গে আসার দরকার নেই। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করছে না। যাদবপুরে নয়, আমার বাড়ি আসলে কোলাঘাটে। বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ায় অনার্সটা কমপ্লিট করতে পারলুম না। এখন প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করি। জানেন খুব শখ ছিল লেখক হব। এখন ডিলার-ডিস্ট্রিবিউটার-স্কিম-টার্গেট-অ্যাচিভমেন্ট এসবের সঙ্গে আমার সহবাস। সেলস প্রমোশনের ইঁদুরদৌড়ে নেমে গল্প লেখার সুযোগ তো পাই না। তাই যাতায়াতের পথে এক-একদিন মুখে মুখে এমন গল্প বানিয়ে … সময়টা বেশ কাটে। সুযোগ পেলে বোধহয় খুব খারাপ লিখতুম না। কি বলেন?’

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ