তারিখ: 26 Sep

মিষ্টি কুমড়ো ও এক ভালোমানুষের গল্প

সিদ্ধার্থ সান্যাল


‘মিষ্টি কুমড়ো যে কোনোদিন কিনে খেতে হবে এ কখনো ভাবিনি বাবু ! ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি এ তো গরুতে খায়” ! কানাইদার কাঁচি আমার মাথার মধ্যে চলতে চলতে থেমে গেলো ! পঞ্চদশবর্ষীয় আমি, খালিগায়ে, ডবল পেজ খবরের কাগজের মধ্যে ফুটো করা মাথা-গলানো মেক-শিফট কাগজ-জামা থেকে ঘাড় তুলে বললাম ” সে কির’ম, কানাইদা ?”

কানাইদাকে নিয়ে অন্য কেউ কিছু লিখবে ভাবিনি কখনো……কিন্তু আমার মনের মধ্যে ,আমার কৈশোর ও তরুণ জীবনে অনেকের মাঝে যে আপাত বর্ণহীন মানুষটি তার বর্ণময় অস্তিত্ব নিয়ে স্থায়ী দাগ কেটেছিল সে হচ্ছে কানাইদা….উত্তর শ্রীরামপুরের চাতরা অঞ্চলের বারোয়ারী অন-কল নাপিত কানাইদা। বাবা, ছেলে, নাতি…..সবাই-এর কানাইদা !

আমাদের বাড়ির সঙ্গে কানাইদার সম্পর্ক প্রায় পঞ্চাশ বছরের…..তার মৃত্যুকাল পর্যন্ত ! পরাধীন ভারতের দিনে আমার ছোটপিসীর বিয়ে, তারপর ১৯৫০-এ আমার বাবার বিয়ে, সেই থেকে শুরু করে আমার পৈতে, বিয়ে, মায় আমার প্রথম পুত্রের পৈতে পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে কানাইদা ছাড়া আর কোনো নরসুন্দর পা রাখেনি ! এছাড়া নিয়মিত দাড়ি চুল নখ কাটা তো ছিলই ! যেটুকু মনে পড়ে আমাদের প্রথম সাক্ষাতে কানাইদার বয়স ছিল বোধ হয় পঞ্চাশের এধারে…..আর আমার দশ-বারো হবে ! আমাকে বোধ হয় আদর করেই ‘বাবু’ বলে ডাকতো।..কারণ আমার বাবাও ছিল তার কাছে ‘বাবু’ ! আর আমি তার কাছে ছিলাম “দিনকালে জজ-মেজেস্টর” হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে জন্ম নেওয়া ‘বাবু’ ! হ্যাঁ, জজ ম্যাজিস্ট্রেট ছিল কানাইদার কাছে সবথেকে পাওয়ারফুল আর শ্লাঘনীয় পরিচয় ! কারণ তাদের এক কলমের খোঁচায় তো যে কারুর “জেবনভোর জেল” হয়ে যেতে পারে !

কানাইদার কাঁচি আর মুখ একেবারে সমান গতিতে চলতো ! সাধারণ ভাবে নাপিত সম্প্রদায়ের এ একটা গুণ ! কিন্তু কানাইদা ছিল একেবারে আলাদা, তাদের দলছাড়া ! এমনই দলছাড়া যে তাকে নিয়ে একটা গল্প লেখা যায় ! মাঝারি গড়নের, কৃশ চেহারার কানাইদার গায়ের রং ছিল সেকালের আই টি আই ব্যাঙ্গালোরে তৈরি টেলিফোনের রঙের থেকে কিছুটা হালকা ! তাই আমার চুল কাটতে কাটতে সে যখন একবার বলেছিল যে চাতরার সেকালের নামকরা যাত্রাদলে সখীর পার্টটা ছিল তার এক্কেবারে বাঁধা, তখন সেই কৈশোর বয়সেই মাথা নিচু করে নিঃশব্দে হাসতে আমার কোনো অসুবিধে হয়নি !

এহেন কানাইদার কাছে চুল কাটতে বসার সত্যিকারের পাওনা ছিল তার বর্ণময় গল্পগুলো ! শীতকালের সকালে, একতলা বাড়ির ছাদের রোদ্দুরে, কানাইদার কাছে উবু হয়ে বসে, খালি গায়ে খবরের কাগজের জামা পরে চুল কাটা ……..গল্প বলার উত্তেজনার চোটে নাটকীয় ভঙ্গিতে কানাইদার সেই কাঁচি হাতে নিয়ে নিজের মাথা ছেড়ে দূরে চলে যাওয়া….আবার দূর থেকে গল্প বলতে বলতে কাছে এসে বসে পড়ে আবার কাঁচি চালানো……মনে হয় এই তো সেদিনের কথা….মাঝখানের অর্ধশতাব্দী তার অজস্র ঘটনাবলী নিয়ে কোথায় হারিয়ে যায় !

– ‘মিষ্টি কুমড়ো যে কোনোদিন কিনে খেতে হবে এ কোনোদিন ভাবিনি বাবু ! ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছি এ তো গরুতে খায় ” !

– সে কির’ম কানাইদা ?

– আমাদের শেওড়াফুলীর গঞ্জ তো দেখেছ বাবু …আজকের দিনে তার অতো হাঁক-ডাক নেই ! কিন্তু এক্কালে সে ছিল এক বিরাট হাট…….কাঁচা শাকসবজির পাইকিরী কেনাকাটার জায়গা…..লৌকোর পর লৌকো আমাদের এই ঘাটের পাশ দিয়ে চলে যেতো পাহাড়ের মতো জমা করা মিষ্টি কুমড়ো নিয়ে….মাঝি মাল্লা সব ঢাকা পড়ে যেত সেই কুমড়ো পাহাড়ের পিছনে ! দুপুর বেলায় জোয়ারের টানে লৌকো ভেসে যেত শেওড়াফুলির ঘাটের দিকে আর সেই সময়েই আমরা..তখন তোমাদের মতো বয়েস গো….গঙ্গায় ঝাঁপাই জুড়তাম….

-‘ঝাঁপাই’ কি কানাইদা ?

– সে বড়ো মজা বাবু ! আমাদের ওই হরবাবুর ঘাট জানো তো ? দূর থেকে দৌড়ে এসে সেই ঘাটের উঁচু পাটান থেকে গঙ্গায় ডিগবাজি খেয়ে ঝাঁপ দিয়ে পড়া হচ্ছে ‘ঝাঁপাই’ ! কিন্তু তার থেকেও মজা ছিল সাঁতরে গিয়ে চুপি চুপি ওই হাটের কুমড়ো-লৌকোর পাশগলুই থেকে কুমড়ো নিয়ে গঙ্গার মধ্যে ফুটবল খেলা।….চারটে পাঁচটা যতগুলো ইচ্ছে নাও…মাঝি বেটা তো আর আমাদের দেখতে পাচ্ছে না !

-কুমড়ো দিয়ে তোমরা গঙ্গায় ওয়াটারপোলো খেলতে…..বাঃ !

– হ্যাঁ তো……সে তুমি যাই নাম দাও ! আর হালের মাল্লাটা যদি বা দেখে ফেললো……তখন তো জোয়ারের টানে লৌকো আগিয়ে গিয়েছে…. সে ব্যাটা আর করবেটা কি !

-তারপর…..তারপর ?

– তারপর তো সে….মাথাটা নাড়িও না বাবু ….সে সবাই ঘন্টাভর খেলে, দম টম ফুরিয়ে, যে যার কুমড়ো নিয়ে ঘাটে উঠে সে আর এক পব্ব ! কুমড়ো মাথার ওপর তু-উ-লে দমাস করে ঘাটের শান বাঁধানো পৈঠের ওপর আছড়ে মারা…..কার পাকা কুমড়োটা বেশী চোচ্চির হয়ে পড়লো….সে-ই জিতলো….ব্যাস খেলা শেষ !

-শেষ ?

-না-আ তো ! ঘাটের ধারে ঘাসজমির ওপরে সেকালে সবসময় গরু চরতো ! আমরা তা-আ-পর সেই-ই কুমড়োর টুকরোগুলো ছুঁড়ে ছুঁড়ে গরুদের দিতাম আর গরুরা এসে কচর মচর করে ভোজ লাগাতো !

-বাঃ ! গরুতে কুমড়োগুলো খেয়ে নিতো !

-সেই তো বাবু ! বোঝো…এখন সেই-ই কুমড়ো….দু টাকা সের কিনে খেতে হচ্ছে !!

এই ছিল কৈশোরের কানাইদা…..কানাই নাপিত ! ঠা ঠা দুপুরে রাস্তার ধারের জানলাবন্ধ ঘরে বসে, গরমের ছুটিতে দেওয়া হোমটাস্কের অঙ্ক করতে করতে, নিস্তব্ধ রাস্তায় যদি চটি ঘষে ঘষে যাওয়া পায়ের আওয়াজ শুনতাম…..একছুট্টে জানলার খড়খড়ি ফাঁক করে দেখতাম কানাইদা সকালের খেপ সেরে বাড়ি ফিরছে। একহাতে তার নাপিতের বাক্স, কাঁধে গামছাটা আর অন্য হাতে ছোট্ট বাজারের ব্যাগ… তার মধ্যে হয়তো মাছের টুকরো আর কিছু সবজি ! জানতাম অকৃতদার কানাইদা একা থাকে। হাওড়া জেলার গ্রামের বাড়িতে তার একমাত্র ভাইপো দেখাশোনা করে তাদের টুকরো পারিবারিক জমিজমা….আরও জানতাম যে সে তার কাকার সঙ্গে খুব একটা ভালো ব্যবহার করে না !

নির্লোভ এই মানুষটাকে তার কাজ শেষ করার পর পয়সা গুনে নিতে দেখিনি……না কোনোদিন নয় ! সেইদিনগুলোতে জানতামও না চুল কাটার দাম কত দিতে হয় ! বাবার কাছ থেকে নিয়ে যা দিতাম সোজা তার আধময়লা বুকপকেটে চলে যেতো ! সেই কিশোর বয়েসেই গরিব খেটে-খাওয়া মানুষটাকে চারপাশের বস্তু-কেন্দ্রিক টাকাপয়সা-চেনা অজস্র মানুষের মধ্যে অদ্ভুত নিরালা লাগতো ! এর অনেক অনেক বছর পরে যখন চাকরিসূত্রে শ্রীরামপুরের বাইরে থাকতাম তখনো ছুটিতে বাড়িতে এসে কানাইদার কাছে চুলকাটার আগ্রহ কিছুমাত্র কমেনি…..বরং মুখিয়ে থাকতাম কখন কানাইদা রাস্তা দিয়ে যাবে আর তাকে ডেকে নেবো…….তার গল্পের ঝুলিতে ঢোকার আগ্রহে ! সময়ের পরিবর্তনেও সেই প্রায়-বৃদ্ধ মানুষটির অভ্যাসের কোনো ব্যত্যয় দেখিনি…..সেই পাল্টে-যাওয়া সময়েও সে কোনোদিন গুনেও দেখেনি তার বাকবৈদগ্ধ্যে মুগ্ধ তরুণ “চাকুরে বাবু” এখন তার পাওনার থেকে কতটা বাড়তি টাকা তাকে দিয়ে দিচ্ছে !

১৯৮১ সালের শেষভাগ। আমার বিয়ের তোড়জোড় চলছে। লম্বা ছুটিতে আমি তখন শ্রীরামপুরে ! কানাইদাকে বললাম…..কানাইদা, বিয়েটা কিন্তু হচ্ছে কলকাতায়, বালিগঞ্জের হিন্দুস্থান পার্কে ! রাত্রে কিন্তু ফিরতে পারবেনা বাড়িতে…ওখানে থাকতে হবে…কুশণ্ডিকা, সিঁদুরদান সব পরেরদিন সকালে। একেবারে পরের দিন বিকালে, আমার সঙ্গে বৌ নিয়ে আমার গাড়িতে ফিরবে !

– সে ঠিক আছে..ভালোই তো ! তা লগ্নটা কটায় ?

-রাত বারোটার পরে পড়েছে !

-ওহ ! তা আগে কোনো লগ্ন ছিল না ?

– না ! পরে একটা ছিল….সেটা রাত চারটেয় !

– না না ! ওই লগ্নটা ভালো নয় ! ওটাকে কথায় বলে “হেগো” লগ্ন !

আমি প্রাকৃত ভাষার ঐরকম অকস্মাৎ প্রয়োগে একটু বিব্রত বোধ করি ! যাই হোক তখুনি তখুনি কানাইদাকে বর বৌয়ের সামনে পরামানিকের ‘ছড়াকাটা’ ইত্যাদি নিয়মের সময়ে প্রাকৃত ভাষার ব্যবহার সম্বন্ধে আগে থেকে কিছুটা সতর্ক করে দিলাম। মধ্যরাত্রের পর বিবাহ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হলো ! বিয়ের পরদিন সকালে…….ক্ষুর-এ ‘ধার’ তোলার পাথর নিয়ে চললো কানাইদার নিরন্তর ঘষাঘষি ! যতই বলি ‘এবার বোধহয় যথেষ্ট ধার হয়ে গেছে কানাইদা’…..তার জবাব……’তুমি থামতো বাবু।..একে বলে ‘বর কামানো’…তার জন্যি ‘ধার’ তুলতে সময় লাগে’ ! তার পরেই তার ক্ষুরধার প্রশ্ন….

– এই ক্ষুরটা চলছে কতদিন সেটা কি জানো বাবু ?

– না তো !

– সে তো প্রায় কুড়ি বছর হলো গো….সেই যে ভারত চীনের লড়াই হলো বাবু…..সে বছর ওই-ই চাঁপাতলা লেনের জোড়া পরী-গেটের বাড়ি, সেই যে সিংগীর মুখ-ওলা ডেরেন-পাইপ আছে গো …… সে বাড়ির সরোজের দাদা …জার্মেনী থেকে এনে দেছেল। ….সে তো অকালে চলে গেছে দশ বছর আগে ….যন্তরটা আমার কাছে বেঁচেবর্তে আছে আজো ….এখন কেবল বিয়ের কাজের সময় বার করি ! কি জিনিসই না জার্মেনী বার করেছে বলো দিনি !

ভাবলাম কোয়ালিটি কন্ট্রোল-এর মডার্ন ফান্ডাটা কানাইদাকে শুনিয়ে দি…একটা ক্ষুর দিয়ে যদি কুড়ি বছর কাজ চলতে থাকে তাহলে তো সেই ক্ষুর কোম্পানী লাটে উঠে যাবে !..কিন্তু না…. সেই সময়ে পাথরে একমনে ক্ষুর ধার দিতে থাকা কানাইদার উদ্ভাসিত মুখটাতে ঠান্ডা জল ঢালতে ইচ্ছা হলো না ! আর তারপর সেই সুপার ধারালো ক্ষুর দিয়ে আমার গালটার ওপরে যা চললো…সেই ‘বর কামানো’…..পাঁচ বার….ছ বার…আর বারবার হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কানাইদার পরখ করা…আমার গালটা বর হওয়ার উপযুক্ত মসৃণ হয়েছে কিনা … সে সময় তো আমার নিজেকে শিবরাম চক্রবর্তী মনে হচ্ছিলো…..সেই যে তিনি তাঁর নিজের বই-এর দামের বদলে সেলুনে যখন কুড়িবার একসঙ্গে একই গালের দাড়ি কমিয়ে নিয়ে ছিলেন…. প্রায় সেই রকম ব্যাপার আর কি !!

বিয়ের পরে বৌ নিয়ে ফিরছি। ফুল দিয়ে সাজানো আম্বাসাডার গাড়ির সামনের সীটে বাবার সঙ্গে কানাইদা। পেছনে আমি, নববিবাহিত বধূ আর ছোট্ট ভাগ্নীটি ! ঢাকুরিয়া থেকে শ্রীরামপুর প্রায় আড়াই তিন ঘন্টার লম্বা রাস্তা ! আমার চার বছরের কোর্টশিপ করা বৌ তো তার বাপের বাড়ি থেকে বিদায় ও তন্নিষ্ঠ চোখের জলের পর্ব শেষ করে দিলো যাত্রা শুরুর মিনিট পনেরোর মধ্যেই……গাড়ি চলছে……আমরা নিচু গলায় বাকি রাস্তাটা কথা বলতে বলতে এলাম ! শ্রীরামপুরের বাড়ির দরজায় পৌঁছে সানাই-এর হালকা আওয়াজের মধ্যে শুনলাম কানাইদার নিচুগলায় আমার বাবার প্রতি মন্তব্য….”যাক নতুন বৌয়ের সঙ্গে বাবুর আলাপ পরিচয়টা তো দেখছি ভালোই হয়ে গেছে” !!

– কানাইদা, তুমি আমার ঠাকুরদাকে দেখেছো ?

– কি বলছো বাবু…..দেখিনি আবার ! সেই আমার এটটুকুন বেলা থেকে তেনাকে দেখেছি !

– তাই !

– হ্যাঁগো বাবু ! তেনার ছোট ছোট শালাবাবুরা……তোমার বাবার মামারাই তো ছিল আমার খেলার সাথী ! কতোবার দেখেছি……রোজ সক্কালে গঙ্গাচানে যেতেন

– ঠাকুরদা গঙ্গাচান করতেন…..রোজ ?

– তা নয় তো কি ! সেকালে আমাদের এই চাতরার মানুষজনের, কি ব্যাটাছেলে কি মেয়েছেলে, চানের জায়গাই ছিল গঙ্গা ! টাইমকল বা টেপাকল তখন কোথায় ! ওই যে তোমাদের ছোড়দাদুর বাড়ি….মানে তোমার ঠাকুরদার শৌরের ভিটে…..তার সামনে ছিল খাঁদুর তেলেভাজার দোকান……এত্ত বড়ো বড়ো ফুরুলি পয়সায় চারটে !!

– কানাইদা কথাটা ফুরুলী নয় ফুলুরী !

– ওই হলো বাবু !

– তারপর ?

– তো তোমার ঠাকুরদা চান করতে যেতেন …..ধুতি মালকোঁচা মেরে…..গৌরবন্নো……গায়ে গামছা….ওই শৌরবাড়ীর সামনে একটু গামছাটা ভালো করে গায়ে ঢাকাঢুকো দিয়ে খাঁদুর দোকানে রোজ একপয়সার চারটে ফুরুলি কিনতেন….যাকে বলে ডেলি……..

– সকালবেলায় ফুলুরী !

– হুঁ হুঁ….সে ব্যাপার আছে বাবু ! ডানহাতে খাঁদুর ফুরুলী চেপো তো তোমার বাঁহাতে পুরো একপলা তেল ! মুখের মধ্যে গ্যালো ফুরুলী আর তেলটা মাখা হলো গায়ে মাথায়..ব্যাস ! রোজকার গঙ্গা চানের নিয়ম !

– সেকি…….ওই কড়াইয়ের তেলেভাজার তেল গায়ে !

– সে গায়ে ওই তেল আর কতোক্ষন ! ঘাটের সাবাং গায়ে মাখা হবে না ? সেই তেল তুলতে হবে না ?

– ঘাটে আবার সাবান রাখা থাকতো নাকি ?

– তবে আর বলছি কি ! রেতেরবেলার জোয়ারের জল নেমে গেলে ঘাটের শেষ পইঠেতে হালকা পলিমাটি পড়ে থাকতো বাবু ! সেইটে ছিল তোমার ঘাটের সাবাং…যত ইচ্ছে মাখো আর ডুব দাও…ব্যাস তেল মেল্ সব একেবারে পোস্কার !

– বাঃ বেশ তো !

-কানাইদা, তুমি রোজ আমাকে গল্প শোনাও….আজ আমি তোমাকে একটা গল্প শোনাই ?

– তা বেশতো, শোনাও না বাবু !

– এই তোমাকে নিয়েই গল্প !

– আমাকে নিয়ে……আমাকে নিয়ে আবার কি গল্প হবে…হা হা হা !

– না-আ, মানে তোমাদের নিয়ে গল্পটা আর কি ! আচ্ছা তুমি ‘জলচল’ কথাটার মানেটা জানো ?

– ‘জলচল’……’জলচল’…..মানে শাস্তরে যাকে বলে যাদের হাতে জল খাওয়া চলে..তাইতো ?

– ভেরি গুড ! তুমি কি জানো নাপিত-রা ‘জলচল’ কিন্তু ছুতোর-রা ‘জলচল’ নয় ?

-নাতো…….তাই নাকি ? একটু উত্তেজিত কানাইদার হাতের কাঁচি তাড়াতাড়ি চলতে লাগলো !

– হ্যাঁ ! এইটা কি করে লোকমুখে চালু হোলো সেই গল্পটাই আমি এখন তোমাকে বলবো ! সে অনেকদিন আগে……দুই বন্ধু ছিল নাপিত আর ছুতোর…..তাদের খুব ভাব…..যদিও ছুতোর ছিল বেশ বড়োলোক…..তার তৈরি আসবাব অনেক দামে বিক্রি হতো….তার বাড়ি ঘরদোর ঠাটবাট সব খুব ভালো ! ওদিকে নাপিত বেচারি ঘরে ঘরে চুল দাড়ি কেটে বেড়ায়…..দিন-আনা দিন-খাওয়া মানুষ ! তা এই দুজনের যেমন ভাব আর তেমনি এক বিষয় নিয়ে রোজ ঝগড়া…… কে জাতে বড়ো…নাপিত না ছুতোর ! রোজ সকালে বন্ধুর দাড়ি কামাতে নাপিত আসে আর নাপিতের কাজের ফাঁকে দুজনের তর্ক শুরু হয় ! ছুতোর বলে…..দ্যাখ আমি কাঠ কেটে খোদাই করে কত সুন্দর আসবাব বানাই। কতো বড়ো বড়ো লোকে আমার কাজ দেখে প্রশংসা করে…কতো দাম দিয়ে সেসব কিনে নিয়ে যায় ! সমাজে আমার কাজের নাম দাম দুই-ই আছে ! আর তুই ? দাড়ি…..চুল…নখ…সাবানের ফেনা…….যত্ত সব নোংরা ব্যাপার ! কিন্তু নাপিতবন্ধুকে সে যুক্তিতে দমাতে পারেনা ! নাপিত বলে…ওরে তোর সেই সমাজের বড়ো বড়ো মানুষগুলোকেই তো আমি সাজাই, আরও সুন্দর করে তুলি।….তাই তো আমাদের বলে ‘নরসুন্দর’ সেটা জানিসতো …তাহলে কে বড়ো হলো সেটা বল ?

– বাহ্। তাই তো….তাই তো……ঠিক তো বলেছে ভায়া আমার। তারপর কি হলো বাবু……ছুতোর কি বললো তারপর ?

– তারপর এই তর্কটা তো পৌঁছে গেলো স্বর্গে ! সেখানে নারায়ণ দেখলেন এদের তর্ক তো আর থামে না ! কে যে জাতে বড়ো তার আর নিষ্পত্তি হয় না ! নারায়ণ ঠিক করলেন তিনি নিজেই এই সমস্যার সমাধান করবেন !

– স্বর্গের নারাণ ঠাকুর ?

– হ্যাঁ ! নারায়ণ ঠাকুরের তো যে কথা সেই কাজ ! একদিন সকালে ছুতোরের বাড়ির উঠোনে রোজকার মতো দাড়ি কামানো চলছে ও যথারীতি তর্ক-ও জারী……..এমন সময়ে নারায়ণ এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশ ধরে এসে দাঁড়ালেন দুজনের সামনে…..বললেন….আমি বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ….বড়ো তৃষ্ণার্ত……একটু জল পাওয়া যাবে বাবা ? ব্রাহ্মণকে দেখে তো ছুতোর দাড়ি কামানোর জলচৌকি থেকে উঠে তড়িঘড়ি ছুটে ভেতর-বাড়িতে গেলো……রুপোর গেলাস বার করে মেজে ধুয়ে তাতে করে খাবার জল নিয়ে আসতে ! জল আনতে ছুতোরের দেরী হচ্ছে দেখে নাপিত বললো……বাবা দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার খুব তেষ্টা পেয়েছে…..যদি কিছু মনে না করেন….. এই আমার বোতলের জল…….আজ সকালেই ভরেছি….তাই যদি আপনি ইচ্ছা করেন…..এই বলে নাপিত সেই দাড়ি ভেজানোর বোতলের জল দিয়ে তার ছোট্ট বাটিটা ধুয়ে তাতে জল ভরে ব্রাহ্মণের দিকে এগিয়ে ধরলো ! ব্রাহ্মণ-বেশী নারায়ণ একবার নাপিতের দিকে তাকালেন…..তারপর সেই ছোট্ট বাটির জল খেয়ে বললেন…. আঃ, বড়ো তৃপ্তি পেলাম বাবা ! তেষ্টার জল দিয়ে তুমি আমায় বাঁচালে !

– বাহ্ বাহ্ ! তারপর কি হলো বাবু?

– ওদিকে ছুতোর বাবাজী তো রুপোর গেলাস ধুয়ে মেজে, তাতে করে জল নিয়ে এসে দ্যাখে ব্রাহ্মণের জল খাওয়া শেষ, হাতে তার নাপিতের ছোট্ট বাটি ! ছুতোরকে দেখে নারায়ণ তাঁর স্বরূপ ধরে ছুতোরকে বললেন…..তুমি তোমার অর্থের অহংকারে তৃষ্ণার্ত ব্রাহ্মণকে রুপোর গেলাসে জল খাওয়াতে চেয়েছিলে, তাতে যতো না তোমার চিন্তা ছিল আমার তৃষ্ণা নিবৃত্তির জন্য তার থেকে বেশী ছিল তোমার সম্পদ প্রদর্শনের ইচ্ছা…..আর এই চিত্তশুদ্ধ নাপিতকে দ্যাখো…সে শুধু আমার তৃষ্ণাটুকু বুঝেছে…..তাই সংকোচ না করে তার কাছে যা-ই সাধন ছিল তাই দিয়ে আমার তৃষ্ণা নিবারণ করার চেষ্টা করেছে ! আমি সর্বকল্যাণময় নারায়ণ, আজ নাপিতের হাত থেকে জলগ্রহন করেছি……তাই নাপিত আজ থেকে ছুতোরের থেকে জাতে বড়ো প্রতিপন্ন হবে…সে হবে ‘জলচল’…….ছুতোর নয় ! এই-ই হচ্ছে তোমাদের…….মানে নাপিতদের…..’জলচল’-এর গল্পটা……বুঝলে কানাইদা !

আমার চুলের মধ্যে কানাইদার কাঁচি যে কখন থেমে গিয়েছিলো আমি খেয়ালই করিনি ! জবাবে গলার আওয়াজ না পেয়ে মুখ তুলে দেখি চকচকে চোখ নিয়ে সে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ! কয়েক সেকেন্ড পরে অত্যন্ত খুশী খুশী গলায় বললো….কি বেড়ে গল্পটা শোনালে বাবু…..মনটা ভরে গেলো….এমনতো কেউ আমাকে শোনায়নি….কে বেঁধেছে বলদিনি গল্পটা ?

প্রায় চল্লিশ বছর হয়ে গেছে….সরল প্রৌঢ় মানুষটার সেই খুশীতে জ্বলজ্বলে তখনকার মুখটা আজ-ও আমি ভুলিনি !

– কানাইদা, তুমি আমাদের রাজবাড়ীর রোজকার সন্ধেপুজোর প্রসাদ খেয়েছো ?

– খাবোনা আবার ! বাবু…আমাদের ছোটবেলাতে তো সেটাই ছিল একটা বিরাট ব্যাপার গো ….সন্ধ্যেবেলায় রাজার বাড়ির শেতলের ঘিয়ে ভাজা লুচি হালুয়া !

– ঘিয়ে ভাজা মানে……ভালো ঘিয়ে ?

– নয় তো কি ! হুঁ হুঁ বাবা রাজার বাড়ির ঘিয়ে ভাজা লুচি হালুয়া……তার সোয়াদ-ই আলাদা ! সেরকম আর খেলাম নাগো বাবু ! কি তার ময়ান……কি খাস্তা !

-ময়ান….ময়ান কি কানাইদা ?

– সে তোমায় বলছি বাবু ! সাদা ময়দা তো মাখা হলো……বেশ করে গাওয়া ঘি দিয়ে ! তাকেই বলে ময়ান দেওয়া ! তারপর সেই প্রথম লুচিটা ভেজে ভোগ-রাঁধুনী ছুড়ে ফেললো পাশের খোলা ছাদে !

-সেকি কেন…. কেন ?

– বাঃ ময়ান টেস্টো করতে হবে না…….কাকের টেস্টো ?

– কাক !

– হ্যাঁ গো বাবু…..কাক ! ছাদের দেয়ালের ওপরে বসে থাকা কাক এ-এ-সে সেই লুচি মুখে করে নিয়ে চলে যাবে ! য-ও-দি সে পুরো লুচিটা মুখে করে নিয়ে যেতে পারে তো সেই ময়দা বাদ……শেতলপুজোয় চলবে না……পুরোটা ফেলে দেওয়া হবে ! আবার নতুন করে ময়দা মাখা হবে !

-সেকি…..ক্যানো ?

– হুঁ হুঁ বাবা…..আঃ ঘাড়টা এদিকে ঘুরিয়ে রাখো বাবু….নাড়িও না…..ময়ান যদি ঠিক মাপমতো হয় তাহলে তো কাক যেটুকু ঠোকরাবে সেটুকু-ই মুখে করে নিয়ে যেতে পারবে ! তবেই ময়ান ঠিক হয়েছে মানা যাবে……নাহলে সব আবার প্রথম থেকে…. বুঝলে তো বাবু এবার ? একে বলে রাজবাড়ির লুচির ময়ান……একি সাধারণ বাড়ির ব্যাপার !

-বাঃ বেশ মজার ব্যাপার তো ! আর ওই রাজবাড়ির মানুষগুলো…….তারা কি রকম ছিল কানাইদা ?

– সে তুমি এখন তাদের জ্ঞাত গুষ্টি দেখে একটু একটু বুঝতে পারবে ! যেমন ছিল তাদের লম্বা চওড়া চেহারা আর তেমনি ফর্সা টকটকে দুধে-আলতা গায়ের রং…ঠিক য্যানো গোরার বাচ্চা !!

-তাই ?

-তাই তো ! আর তাদের মোটরগাড়ীর ডেরাইভারগুলোর ও ছিল তেমনি চেহারা….টকটকে রং, সব ছফুটিয়া লম্বা, মাথায় টুপি,বড়ো বড়ো পেতলের বোতাম লাগানো ধবধবে সাদা ডেরেস……সে এক এলাহী ব্যাপার বুঝলে বাবু । মোটরগাড়ি তো তখন ছিল কেবল রাজবাড়ী গোঁসাই বাড়িতে ! তুলসী গোসাঁই-এর বড়ো কালো গাড়ীটা বেরোলেই আমরা ছেলেপিলেরা ঘিরে দাঁড়াতাম আর তখন তুলসী গোঁসাই-এর সেই ডেরাইভার…..আমাদের তাড়া লাগতো…..আমরা ছুট লাগাতাম ! শোনো তো বাবু আরও একটা মজার কথা ! সেই ডেরাইভারের এমন সোন্দর গোরা চেহারা ছিল যে অনেকে তো তাকেই তুলসী গোঁসাই ভেবে ভুল করতো…….হা হা হা !

-তাই নাকি !

সাদা ময়দার লুচি খাওয়া তো প্রায় ছেড়েই দিয়েছি এই প্রৌঢ় বয়েসে ! তবুও কখনো সখনো যদি সবজি বাজারে কুমড়ো কিনতে যাই গিন্নীর ফরমায়েসে……বেশী করে ময়ান দেওয়া ময়দার লুচির সঙ্গে কুমড়োর ছক্কার রবিবারের মেনুর জন্য… সেই সময়গুলোতে মাঝে মাঝে ওই নির্লোভ, আপাদমস্তক ভালো মানুষটির কথাটা হঠাৎ আমার কানের মধ্যে বেজে ওঠে……মাঝখানে বয়ে যাওয়া পঞ্চাশটা বছর কোথায় যেন মিলিয়ে যায়…….”মিষ্টি কুমড়ো যে কোনোদিন কিনে খেতে হবে এ কখনো ভাবিনি বাবু ….”

Tags: ,

 

 

 

  • কোটেশন ব্লগ

  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা

  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।