তারিখ: 26 Sep

তৃতীয় নয়ন

স্নেহাশিস


                                                                                                    ১

 তীব্র শীতের মতো এক দেশ। খাঁ খাঁ প্রান্তর, কুয়াশা মোড়া, নিঃস্তব্ধ, কোলাহলহীন। সে কি আগে এসেছে এখানে ? কখনো ? কই চিনতে পারছে না তো কাউকে। কেমন সব অলীক মুখ চোখের মানুষজন, অচেনা অঙ্গভঙ্গি, অদেখা  পরিবেশ! অনুভূতিহীন চোখ মেলে সে তার চারপাশ দেখে নেয়। না তার ভয় করছে না। কোন উদ্বেগ, উৎকন্ঠা কিছুই নেই।উদ্দেশ্যরহিত, পরিকল্পনাহীন হলেই বুঝি সব ভয়, উৎকণ্ঠার শেষ। কোথাও পাখি ডাকছে, বুঝি দিগন্তের ওপার থেকে ভেসে আসছে সে অস্ফউট আহ্বান। নিবিড়, নির্জন, নিভৃত সে ডাকে তার নিঃসার সত্তায় প্রাণ জাগছে , গোপনে চুপিসারে। এমন শূন্য, শুনশান দেশে সে কিভাবে এলো ? কেনই বা এলো ? তুষারশুভ্র হিমেল আবহে সে চুপটি করে শুয়ে থাকে। দীর্ঘ, দীর্ঘদিন পর এমন অশেষ অবসর, লম্বা ছুটি। চোখ বুজে সে  স্মৃতি চারণের চেষ্টা করতে থাকে। অনতিঅতীতও মনে করতে পারছে না সে। সে কি কোন হঠাৎ জন্মানো, ঔরসবিহীণ ভ্রূণ? কোন পূর্বপরিকল্পনাহীন,পিতৃমাত্র পরিচয়বিহীন  একটা ভুঁইফোঁড় ঘটনা মাত্র ? বোধের অতীত, জ্ঞানের অতীত এক ছায়ামানুষ  প্রতিবিম্বিত হয় তার মনের দর্পণে। হাত পা চোখ, মুখহীণ এক তরঙ্গায়িত প্রতিকৃতি মাত্র। সে গভীর বিস্ময়ে, অনাস্বাদিত পূর্ব পুলকে ছায়া- মানুষের পরিচয় জানতে চায়। সে মানুষটি হাসলে ভোর হওয়ার মতন আলো ফোটে, বসন্ত এসে যায় পাখির কূজনে। খাঁ খাঁ মাঠও সবুজ ঘাসের গালিচা পেতে দেয়, প্রসন্নতার তরঙ্গ বয়ে যায় চরাচর জুড়ে। স্মিত হাস্যে ছায়ামানুষ কোন ভুলে যাওয়া দিনের গানের ভাষা মনে পড়িয়ে দেয়। ভোরের ঘুম ভাঙানো দিনের আলোয় ফুল ফুটতে বলে দেয়, এই অচেনা ছায়াশরীরের নাম ‘তৃতীয় নয়ন’।

প্রথমবার মৃত্যুতে যতো ভয় লাগে, দ্বিতীয় বার মরণে তত ভয় নেই। সরমা যখন বিয়ে হয়ে বাপের বাড়ি থেকে দীপনাথের বাড়িতে এসেছিলো, যে কষ্ট তো এক প্রকার মৃত্যুরই সামিল। সে প্রাণ নিংড়োনো যন্ত্রণার দিনগুলো এখন সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে, সরমা তো যৌথ পরিবারে মানুষ। দাদু, ঠাকুমা, বাবা – মা, জেঠু – জেঠিমা, ভাই – বোন –  ভরভরন্ত সংসার! আর শুধু মানুষজনই কেন, তাদের দোতলার গোলবারান্দা, কাঁচের  জানলা – দরজা, নিকোনো উঠোন, ছাদের ভোরবেলাকার কাকেদের কলরব, বাগানের চাঁপা, গুলঞ্চ গাছের মায়াময় ছায়াপথ সবই তো তার সত্তায়, স্মৃতিতে জড়িয়ে রইলো আজীবন।

স্বাধীনতার বছরে তার জন্ম। তার দাদু স্বাধীনতা সংগ্রামে পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এক সময় নাকি তাদের বাড়িতে অস্ত্রশস্ত্রও লুকানো থাকতো। বিপ্লবীরাও বারকয়েক গা-ঢাকা দিয়েছে তাদের বাড়িতে – ইংরেজ আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে। এ সবই অবশ্য জেঠু বা বাবার কাছে শোনা গল্প, কি আশ্চর্যের কথা এই দাদুই আবার নারী স্বাধীনতার পরিপন্থী হয়ে রইলেন আজীবন। সে জন্ম থেকেই মেধাবী এবং একনিষ্ঠ। পূর্ণ অভিনিবেশে পড়াশোনার অবসরে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎ-এ মজে থাকতো। ইন্টারমিডিয়টে প্রথম স্থান অধিকার করেও কলেজে পড়া হলো না বাড়ির অনিচ্ছায়। বাবা – মা পড়াতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দাদুর মুখের ওপর কথাই বলতে পারলেন না। এমনকী গান, যে গান সরমার প্রাণাধিক প্রিয় ছিলো, ছিল ঈশ্বর প্রদত্ত, জন্মসিদ্ধ সহজাত সুর, সে গানকেও গলাটিপে হত্যা করা হলো। তখন হয়তো তার তেরো কি চোদ্দ বছর বয়স। বিয়ে হয়ে গেলো অন্তত কুড়ি বছরের এক যুবকের সাথে!

বেদনাবিধুর, বিষণ্ণ সেই কিশোরী মেয়েটা বিয়ের সাজে বসে আছে তার হাত দুয়েকের দূরত্বে। যেন সেই চাইলেই ছুঁতে পারে সেই মনখারাপের কিশোরীবেলাকে। দূরত্ব বিশেষত সময়ের দূরত্ব কি নিঠুর বাস্তব, অথচ কি মধুর বাস্তব। এই নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বে এলেও দোষারোপ কি সাজে তার ? দাদু তার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন, বাবা – মা বা বাড়ির অন্য কেউ প্রতিবাদ করেনি – এ কথা নিশ্চয়ই সত্যি। কিন্তু আরো বড় সত্যি কি এটা নয় যে সে নিজেও ছিল নিশ্চুপ প্রতিরোধহীন ? মেনে নিয়েছিলো তার ভবিতব্য ? অনিশ্চিত ভবিষ্যতের থেকে নিরাপত্তা দামী হয়ে উঠেছিলো তার কাছে ? দামী দামী শাড়ী ,গয়না, স্বামী নিজের সংসার – এগুলো কি সুখের শর্ত নয় ? আরামের, সম্ভোগের উপাদান নয় ? ইচ্ছা পূরণ করতে করতে জীবনপাড়ি দিয়েছে স্বাধীনতা দিবসে জন্ম নেওয়া সেই সাধারণ মেয়েটি আর ইচ্ছেগুলো নিজেদের বদলে নিয়েছে প্রতি পল,অনুপলে।

আর আজ এতদিন পর এসে সেই ইচ্ছেদের ইচ্ছামৃত্যু হলো। তাই তো আরোগ্যের হাওয়া বয়ে যায়, নতুন দেশের ভালোবাসার রোদ এসে পড়ে তার সত্তার গভীরে। ক্ষমা করতে ইচ্ছে হয় সেই কিশোরীকে আর তার পরিজনদেরও। সে প্রার্থনার ভঙ্গিতে দুহাত জড়ো করে চোখ বোজে। আর ‘তৃতীয় নয়ন’ তার কপালে ছুঁইয়ে দেয় উপশমের স্নেহস্পর্শ।

যেন একটা ছবির অ্যালবাম। মূহুর্তের পর মূহুর্তের কোলাজ। পুরনো দিনগুলো তার সমস্ত আনুষাঙ্গিক স্মৃতিসমেত তার সামনে সটান দাঁড়িয়ে। চেনা মানুষের মতো চেনা চেনা সময়ের খন্ডচিত্র তাকে কুশল সম্ভাষন করে যায়। সে নির্বাক নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে একা। যেন ঐ অ্যালবামের ছবিগুলি তার নয়। কোন দ্বিতীয় ব্যক্তির। সে কেবল অনুভূতিহীন দর্শক অথবা শ্রোতা মাত্র। বহতা নদীস্রোতে হাত ছুঁইয়ে ছুঁইয়ে জলস্পর্শ পায় আর ভেজা ভেজা খন্ড মন নিয়ে যাপিত জীবন দেখে অপলকে।

দীপনাথ বা তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে চিনতে, আপন করে নিতে সময় লেগেছিল সরমার। ছোট্ট কিশোরী মেয়েটিকে স্নেহের চোখেই দেখেছিলেন দীপনাথ আর তাঁর বাবা – মা। দীপনাথের এক বোনও ছিল, দিপালী। কিন্তু সে মানসিক ভারসাম্যহীন। তাই তার জায়গা হয়েছিলো মেন্টাল অ্যাসাইলামে। দীপালির ব্যাপারে কি দীপনাথ, কি তার বাবা – মা – কেউই মুখ খুলতো না। এমনকী বিয়ের আগে দীপালির ব্যাপারটা সরমার বাড়ির লোকেরা জানতেই পারেননি। যদিও দীপনাথ মাসে অন্তত একবার বোনকে দেখতে যেতো, সরমা প্রথমে যেতে চায়নি, একটা  অদ্ভুত ব্যাখ্যাতীত ভয় ওকে গ্রাস করতো ননদকে দেখতে যাবার কথা উঠলেই।

‘ভয় ? কিসের ভয় ? কাকে ভয় পেয়েছিলে তুমি ? দিপালীকে ? না ওর ‘পাগল’ উপাধিটাকে ? দীপালির চেয়ে হিংস্র, দীপালির চেয়েও অপ্রকৃতিস্থ, উন্মাদ তুমি আর কাউকে দেখোনি ? যারা সুস্থতার মুখোশ পরে ঘোরে ? রাতের অন্ধকারে লোকচক্ষুর আড়ালে যাদের পাগলামি প্রকাশ পায় ? দেখোনি, সরমা ? ছায়াশরীর প্রশ্ন করে।

সরমা নিরুত্তর অথচ মুখের হাসিটি অমলিন। এ যে নতুন দেশ! এখানকার নিয়মকানুন আলাদা। এখানে প্রশ্নের উত্তরে প্রতিপ্রশ্ন নেই। নেই নিজেকে ঠিক প্রমান করার তাগিদ। নিজের সমস্ত অতীত সিন্ধান্তকে যুক্তিগ্রাহ্য প্রতিপন্ন করার তাগিদ। বরং সে অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে থাকে।

প্রথম প্রথম সে দীপনাথকে দিয়ে পাঠাগার থেকে বই আনাতো। রবিবাবুর ‘গল্পগুচ্ছ’ যে তার কতবার পড়া। বিশেষ করে ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পটি। সে এই গল্পটি দীপনাথকে পড়ে শুনিয়েছিল। দীপনাথ ছাপোষা কেরানী মানুষ। বৌ-মানুষ স্বামী, শ্বশুরকে, শাশুড়িকে মেনে চলবে- লক্ষ্মী বউটি হয়ে থাকবে- সে এমন বৌ-ই চেয়েছিল। ঘরের বউ, তার আবার অত বিদ্বান হয়ে কি কাজ ? বরং বিয়ের পর বছর গড়িয়ে গেল, সে সন্তানের জন্য উশখুশ করছিল। সরমার শাশুড়িও ঠারেঠোরে তাঁর বংশপ্রদীপের আকাঙ্খা সরমার কাছে পেশ করেছিলেন – ‘নাতির মুখ দেখে মরতে চাই, বৌমা।’ অতএব, ষোল বছরেই প্রথম সন্তান, ছেলে নয়, মেয়ে। তবে দীপনাথরা সুভদ্র রুচিবান মানুষ। তাই তেতো ওষুধ খাবার মতো করে মেনে নিয়েছিলেন সোহিনীর জন্মের ঘটনাটি। যত্নেই বেড়ে উঠছিলো সুস্থ, সবল শিশুটি। সরমা নিজে ওকে পড়াতো। ক্লাসের পড়া তো বটেই, সঙ্গে অবনঠাকুর, লীলা মজুমদার, পরে রবিঠাকুর পর্যন্ত। নিজের সন্তানের মধ্যে নিজে যা কিছু আয়ত্তাধীন, তা একটু একটু করে ঢেলে দিয়ে তার শারীরিক, মানসিক ও বৌদ্ধিক বিকাশ ঘাটানো – এ যে কি আনন্দের, কি পরিতৃপ্তির সে কেবলমাত্র কোন মা-ই বুঝতে পারে। সোহিনীর সরমার মতো সহজাত গানের গলা তো ছিলই, সাথে ছিল নৃত্যশিল্পের প্রতিও এক অপ্রতিরোধ্য অনমনীয় আকর্ষন।

‘তুমি তো মা। মেয়ের জন্য এটুকু চেষ্টা করবে না ? প্রতিবাদ করবে না মধ্যযুগীয় বস্তাপচা ধ্যানধারনার ? কেন পড়তে তবে রবীন্দ্রনাথ ? কি শেখালো তবে ‘স্ত্রীর পত্র’ ?

সরমা অবারও চুপ, সত্যিই তো এ প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। সোহিনীকে সে তো সত্যিই তার নিজের ইচ্ছেমতো বড়ো করতে চেয়েছিল, দিতে চেয়েছিল সমস্ত স্বাধীনতা যা থেকে সে নিজে বরাবর বঞ্চিত থেকেছে। কিন্তু পারেনি দীপনাথ বা তার শ্বশুর – শাশুড়ির অনুমতি জোগাড় করতে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে গ্রাসাচ্ছাদন জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় সেখানে কন্যা সন্তানের শখ পূরণ করা বাহুল্যেরই সামিল। তবু সে নুন আনতে পান্তা ফুরনো সংসারেও দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়া অবশ্য আটকায় না। বংশরক্ষার জন্য পুত্রসন্তান তো চাই ! তাতে যত সন্তান প্রসব করতে হয় হোক।

‘তুমি তো দ্বিতীয় সন্তান চাওনি, তাই না ?’

‘না চাইনি, তোমার কাছে আর কিই বা লুকোবো ? তবে সিদ্ধার্থকে আজ যখন দেখি, সফল, সার্থক একজন মানুষ হিসেবে দেখি, তখন মা হিসেবে গর্বই হয়।’ সরমার মুখে পরিতৃপ্তির হাসি !

ভরা সংসার ফেলে রেখে এসেছেন সরমা। হেঁটে যেতে হবে তাকে বহু বহুদূর, কোন পিছুটানের সম্ভাবনা ছাড়াই। শ্বশুর – শাশুড়ি তো আগেই দেহ রেখেছিলেন। বছর সাতেক আগে স্বামীও। পড়ে রইল সোহিনী – রঞ্জন, সিদ্ধার্থ – দয়িতা। পড়ে রইলো সোহিনীর মেয়ে তিন্নি, সিদ্ধার্থর ছেলে গোগোল। ধনে – জনে জুড়ে থেকেছিলেন, জড়িয়ে রেখেছিলেন নিজেকে। আজ সময়ের অবসানে কে বা কারা যেন কোন জাদুকাঠিতে খাঁচার দরজা খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ অতন্দ্র কারাবাসের পর স্বাধীনতা দিবসজাত মেয়েটির দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে, গভীর ঘুম। শুধু জেগে থাকে ‘তৃতীয় নয়ন’। একা।

‘আর তো বেশীদিন অপেক্ষা করা চলে না। দুদিন তো রইলে ! কাল ভোরেই বেরিয়ে পড়ো। আমায় কিন্তু কাল জয়েন করতেই হবে, অ্যাট এনি কস্ট।’

‘হুম ! সে তো বুঝছি। তুমি না হয় কাল বেরিয়ে পড়ো। আমার আর একটা দিন থেকে যাওয়া প্রয়োজন। ভাই এর সঙ্গে একটু দরকারও আছে। গত দুদিন তো সেভাবে কথাই হয়নি। শ্রাদ্ধানুষ্ঠান কিরকম কি হবে, কেমন কি খরচাপাতি …’।

ওকে, থেকে যাও তবে এক – দুদিন। সুযোগ বুঝে সিদ্ধার্থকে মায়ের গয়না, অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করে নিও একটু। আমাদেরও তো একটা …। বাড়ির দলিলটাও …’

সোহিনী আর রঞ্জনের নিভৃত সংলাপ কানে আসছে সরমার। কিন্তু কই, কোনো অনুভূতি জাগছে না তো ! কোন গ্লানি অনুভব করছেন না তো তিনি ! অনুরূপ সংলাপ তো তিনি শুনে এসেছেন সিদ্ধার্থ আর দয়িতার ঘর থেকেও। তিনি তো এই সন্তান – সন্ততির জন্য প্রাণপাত করে এসেছেন, বড়ো করেছেন অকুন্ঠ বাৎসল্যে। তার কি এটাই পাওয়ার ছিল ? তবু তার এসব কথা মনে আসেনি। বরং প্রশান্তির স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে তার সমস্ত সত্তায়। ছড়িয়ে পড়ছে শিরায় উপশিরায় অনুযোগহীন    ব্যপ্তিতে। যেন এমনটাই হওয়ার ছিল। রিপু সর্বস্ব, হিসেবী পৃথিবীটা থেকে অনতিক্রম্য দূরত্বে দাঁড়িয়ে আর চাওয়া-পাওয়ার  হিসেব করতে ইচ্ছে করেনি তার। আর কদিন পরই দেবীপক্ষ মহালয়া। শিউলির গন্ধ আর কাশবনের দোলায় আবাহণের সুর বাজছে প্রকৃতির বুকে। তার তার সত্তার গভীরে আরো গভীরে ছায়া শরীর ফিসফিস করে বলছে – ‘হিসেব মেলে না, হিসেব মেলে না’।

তার মৃত্যুর খবর পেয়ে তিন্নি আসেনি। আসার কথাও নয়। তার সামনে বোর্ডের পরীক্ষা। তাছাড়াও সে ব্যস্ত তার নিজের জীবন নিয়ে। যেমন ব্যস্ত এখন সিদ্ধার্থর ছেলে গোগোল। ওই তো, সে দেখছে গোগোল ও তার বন্ধুরা চিলাকোঠার ঘরে ক্যারাম খেলছে। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরের মানুষজন অস্পষ্ট। সে ছাদে বেরিয়ে এলো। ছাদের এই চিলতে অংশটুকুই তার প্রাণের আরাম, তার একলার অবসর। এখানেই গড়ে উঠেছিল গাছপালা নিয়ে তার নিজস্ব জগত, তার একান্ত নিজের বাগান।

কিন্তু একি ! এমন শুকিয়ে গেলো তার সাজানো বাগান ? এমন হতশ্রী চেহারা, এহেন হৃতসর্বস্ব রূপ! আগে সে গাছের পাতায় পাতায়, শাখায় শাখায় স্নেহস্পর্শ বুলিয়ে দিতো। আর আজ সে প্রথমবার তাদের ছুঁয়ে নিচ্ছে অনুভবে, অংশীদার করে নিচ্ছে তাদের তার স্মৃতির, তার সত্তার। কেউ চলে যাওয়ার দুঃখ এমন করে বাজে এদের বুকে ? এমন গভীর করে, নিবিড় করে ভালবাসতে পারে এরা ? সে অঙ্গবিহীন আলিঙ্গনে জড়িয়ে নিয়ে চায় তার একান্ত নিজস্ব ছোট্ট সবুজ পৃথিবীকে। ভালোবাসার চেয়েও গভীরতর ভালোবাসায় ওরা বেঁচে থাকুক, বাঁচিয়ে রাখুক। আগলে রাখুক তার কাছের ও আপাত দূরের মানুষগুলোকে। সুরক্ষিত থাকুক পৃথিবীর বুকে জন্ম নেওয়া সমস্ত প্রাণবিন্দু। বেঁচে থাক এ বসুন্ধরা তার রূপ – রস  – গন্ধ সমেত, তার ভালোবাসা, স্নেহ, আশ্রয় সমতে। সরমা জোড়হাত কপালে ঠেকায়, ‘তৃতীয় নয়ন’ জলে ভরে ওঠে।

 

‘যা চন্ডী, সিংহস্থা শশিশেখরা’

এক চটকায় ঘুম ভেঙে যায় দিপালীর, মহালয়া ? হ্যাঁ, ঠিক, মহালয়ার ভোর নামছে। হাওয়ায় হাওয়ায় লালিত আবহ। মা আসছেন। মা আসছেন। বৌদি, আমায় চিনতে পারছো তুমি ? অত দূরে দাঁড়িয়ে কেন ? কিসের ভয় তোমার, বৌদি ? আজ যে পুণ্য লগ্ন! মঙ্গলশঙ্খ বেজে উঠছে দিকে দিকে। একটা গোটা আকাশ আজ জড়ো হয়েছে তোমার ওই একটুকরো ছাদের ছোট্ট সংকীর্ণ পরিসরে। হাওয়ারা, গাছেরা, ফুলেরা ডাক পাঠিয়েছে আজ। খাঁচা খোলার ডাক। খুলে যাচ্ছে। এক এক করে সমস্ত শেকলগুলো।হাট করে খুলে যাচ্ছে জন্ম – জন্মান্তরের বন্ধ থাকা জং ধরা জানলা দরজা। আসছি আমি, আসছি তোমার বাগানে। সবুজ গাছেরা, এক টুকরো আকাশ, মিঠে হাওয়ারা … অপেক্ষা কোরো … একটু অপেক্ষা কোরো তোমরা।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • কোটেশন ব্লগ

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।