তারিখ: 26 Sep

সেফ কাস্টডি

সমীর ঘোষ


আজকেই শেষ হয়ে যেত তরকা। শেষ মানে একেবারে খতম। এ তল্লাটে আর চুরবুড়ি মারাতে হত না। দাগী স্বপনের ভাই কেলেজনা গতরাতে খতম হয়ে যাওয়ার খরবটা শোনার পর থেকেই ব্যাপারটা একটু একটু করে অনুভব করতে পারছিল তরকা। চারপাশেই স্বপনের দলের ছেলেগুলো ওকে নজরে রাখছিল। অর্থাৎ সুযোগ খুঁজছিল। তরকাও এখান থেকে পালাবার তাক করছিল। কিন্তু পালানো ব্যাপারটা অত সহজ নয়। তাতে অনেক হিসেব কষার থাকে। প্রথমত স্বপনের দলের ছেলেরা আছে, তার ওপর পুলিশ। গতকালের খুনের পর আজকে পালাতে গেলেই পুলিশের সন্দেহ বাড়বে। তাছাড়াও পালানোর আগে রমেনদাকে কিছু কথা বোঝাতে হবে। জরুরী কিছু কাজ সারতে হবে। না হলে পরে ঝামেলা হবে। স্বপনের ছেলেরা ওর ওপর নজর রাখছে। তরকা বেশ বুঝতে পারছে একটু সুযোগ পেলেই ওরা এ পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবে ওকে। ও আজকে জগা, বুলডা, কবু, ডনেদের সঙ্গে আলোচনা করেছে ব্যাপারটা নিয়ে। আজ সকাল ছ’টার সময় ডন ছুটতে ছুটতে হাঁফাতে হাঁফাতে এসে যখন খবরটা দিল তখন ওরা পশু হাসপাতালের ছাদে বাংলা খেয়ে বেঘোরে ঘুমোচ্ছিল। খবরটা শুনে ওরা ঝটপট শ্মশান আর তারা মায়ের মন্দিরের পাশে বনবাদাড়ের মধ্যে ভাঙা পাতকুয়ো আর খাটা পায়খানা দিয়ে আড়াল করা ঘরটায় গিয়ে ঢুকেছিল। তখন চারজনেই হাঁফাচ্ছিল। তরকা ডনকে জিজ্ঞাসা করেছিল – তুই ঠিক দেখেছিস তো!

– হ্যাঁ গুরু, মাইরি বলছি, এখনও রাস্তার পাশে পড়ে রয়েছে। মেশিন চালিয়েছে, ভোজালিও ঢুকিয়ে দিয়েছে।

– কিন্তু ওকে তো শালা টিকটিকি তুলেছিল, রোববার! কবু বিস্মিত হয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় সবার সামনে।

– গান্ডুটা বোধহয় ভেগেছিল। ছোটাছুটি করে একচোট হাঁপানোর পর বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে বুলডা বলে।

– আরে না, না। দত্তটা  কাল ওকে ছেড়ে দিয়েছিল। আমি জানি, মা কসম্ বলছি, ডন বলল।

ডনের শালা এই এক দোষ। কথায় কথায় মা কসম্, মাইরি, মা কালির দিব্যি এইসব বলবে। কী সত্যি আর কী মিথ্যে, সবেতেই ও দিব্যি গালবে। তবে তরকা আজকে ওসবে গুরুত্ব দিল না। ও বলল – কিন্তু স্বপনের ভাইকে ঝাড়ল কারা?

– ওরা কিন্তু আমাদেরই …

– বুলডাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই তরকা উত্তেজিত ভাবে বলল – আমাদের ক’দিন গা ঢাকা দিতে হবে। বুলডা আর ডন তোরা এখনই সরে পড়, তোদের ওই জায়গায়। কবু আর জগা গঙ্গার ধারে নিমাইবাবুর ফাঁকা বাংলো বাড়িতে চলে যা। আমার নাম করে বলবি দু-একদিন থাকব। বলবি বেশি পিঁয়াজি মারালে ব্যাবসার শেষ করে দেব।

– আর তুই শালা এখানে বসে কী ছিঁড়বি? ওরা তো তোকে পেলেই ঝেড়ে দেবে – জগু প্রশ্ন করল।

– জানি, কিন্তু রমেনদাকে ব্যাপারটা না বোঝালে হবে না। পার্টির লোক, বহুৎ হারামি। পরে বলবে, গাণডু আগে জানাসনি কেন যে তোরা মার্ডারটা করিসনি!

সেই থেকে তরকার ভেতরে একটা ভয় শুরু হয়েছে। দাগী স্বপনের ছেলেরা মানে ভন্টা, দুলাল, শিবা, রশিদ, ভেটকি ওরা। বাড়ি, রমেশের চায়ের দোকান, চোলাইয়ের ঠেক – কোথাতেও শান্তি পাচ্ছে না তরকা। দাগী স্বপনের ভাই কেলেজনার মার্ডার হওয়ার খবরটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়। পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে গেছে। খুন হয়েছে হাইওয়ের ধারে। স্বপনের ছেলেরা এসে বাজারে, রোডের ধারের দোকানগুলোয় হামলা চালিয়ে হুমকি দিয়ে গেছে। তাই সব পটাপট বন্ধ হয়ে গেছে। তবে শহরের মধ্যে কোনও প্রভাব পড়েনি। সাধারণ কর্মব্যস্ত মানুষ দাগী স্বপন বা তরকার দলের কে কমে গেল বা কে বেড়ে গেল তার খোঁজখবর রাখে না খুব একটা। কবিতা পাঠ,জন্মজয়ন্তী পালন,রাজনৈতিক জমায়েত বা উইক-এন্ডে প্রিয়জনকে নিয়ে একটু ইটিং-আউটের  আপাত সুস্থির চলমান   জীবনের মধ্যেই  আণ্ডার ওয়ার্ন্ডের লোকজনের মধ্যে একটা হিসেব বুঝে নেওয়ার পালা চলতেই থাকে সবসময়।

কেলেজনা এলাকার ত্রাস ছিল। মেয়েদের উত্যক্ত করত। বাজার থেকে জোর করে টাকা নিত। মাথার ওপরে মস্তান দাদা থাকায় ও আরও বেড়েছিল। সাধারণ লোকে না জানলেও তরকারা জানে যে ও চারটে রেপ করেছিল। প্রচুর ছিনতাই, একটা মার্ডার। আসলে মার্ডারটা হয়েছিল পঞ্চা। তরকার দলের ছেলে। সকালে বাজারে টাকা তুলতে গিয়ে ঝামেলা বেঁধেছিল। ঠিক সন্ধের সময় চুল্লু খেয়ে ফেরার পথে কেলেজনা ও আরও দুটো ছেলে ভোজালি দিয়ে কুপিয়ে দিয়েছিল পঞ্চাকে। অবশ্য তার কিছুদিন আগে স্বপনের দলের ভুল্লু আর বাপি খুন হয়েছিল তরকাদের হাতে। ভুল্লুর আঠারো বছরের বোনকে গ্যাং রেপ করেছিল তরকারাই। বাজারের বখরা নিয়ে, গুমটিগুলো থেকে তোলা টাকা নিয়ে বহুবার লড়াই হয়েছে দাগী স্বপনদের সঙ্গে তরকাদের।

কিন্তু কেলেজনাকে মারল কে? তরকা সকাল থেকে ভেবে ভেবে এই প্রশ্নটার কোনও কিনারা করতে পারে নি। ওরাও কেলেজনাকে খতম করে দেবার কথা ভেবেছিল। তাই ফাঁক খুঁজছিল, সময় নিচ্ছিল। কিন্তু এ যে সব হিসেব গোলমাল হয়ে গেল। কোন শালা এসে কেলেজনাকে মেরে দিল আর সন্দেহের চোখ ঘুরে গেল তরকাদের দিকে।  স্বপনের ছেলেরা নজর রাখছে। আশপাশের কারোর বোঝার উপায় নেই যে এত কিছু জমজমাট বাজার, দোকান, বড় রাস্তার মাঝেই একজনকে খুন করে ফেলার ছক সেজে উঠছে ক্রমশ। খুন কা বদলা খুন। চারজন নিযুক্ত হয়েছে এই কাজে। কারণ তরকা আশপাশে চারজনকে ঘোরাঘুরি করতে দেখছে বারবার। বুলডারা চলে যাবার পর তরকা একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছিল। যেখানে অন্তত স্বপনের ছেলেদের চোখ বাঁচিয়ে কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকা যাবে। জলার ধারে, বনজঙ্গল আর পাঁকে ভর্তি পরিত্যক্ত খাটা পায়খানাটায় গিয়ে লুকোবে কী না ভাবছিল। এমন সময় হঠাৎ কোথা থেকে প্রায় ঝড় তুলে পুলিশের জিপটা এসে থামল রমেশের চায়ের দোকানের সামনে। ড্রাইভারের পাশের সিট থেকে সাব ইনসপেক্টর দত্তবাবু নেমে এসেই তরকার কলার ধরে হেচকা টান দিয়ে বলল – এই শালা চল থানায়। সঙ্গে সঙ্গে অবশ্য তিনজন কনস্টেবল এসে তরকাকে কব্জা করে ফেলল। তখনই তিনটে শক্ত রুলের বাড়ি পড়ে গেল তরকার দেহে। আয়ু বেড়ে গেল তরকার। লকআপে স্বপনের ছেলেরা পৌঁছোতে পারবে না, নইলে আজকেই শেষ হয়ে যেত তরকা।

[দুই]

আজকেই শেষ হয়ে যেত তরকা। দত্ত বাবু, রাম সিং, সাহাবাবুদের হাতে প্রচণ্ড মার খাওয়ার ভয় থাকলেও তরকা কিছুটা নিশ্চিন্ত যে স্বপনের সাকরেদদের হাতে বেঘোরে প্রাণটা দিতে হবে না ওকে। লকআপের গেটটা খুলে পেছনে প্রচণ্ড জোরে একটা লাথি মেরে দত্তবাবু যাবার সময় বলে গেছে – হারামি, বহুৎ বেড়েছিস তোরা। আজকে একেবারে শিক্ষা দিয়ে দেব।

পেছনে ভারি বুটের লাথি খেয়ে লকআপের ভেতরে একেবারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল তরকা। দুপুরবেলা বলে ভেতরে কিছুটা আলো এসে ঢুকেছে। ঘরে আর কেউই নেই। বোধহয় কাল রাতে ছিল। পেচ্ছাপ, থুতুতে বাঁ দিকের কোনাটা ভর্তি। পেচ্ছাপ বেরোনোর একটা খুব ছোট্ট নর্দমা অবশ্য আছে। কিন্তু ধুলো ময়লায় বুজে গিয়ে ওটা দিয়ে আর তা বেরোতে চায় না। জমে থাকে। বিটকেল ঝাঁঝালো গন্ধ ছাড়ে। অবশ্য তরকার এসব গন্ধ নাকে লাগে না। সহ্য হয়ে গেছে। এ নিয়ে বহুবার ওকে কারণে অকারণে লকআপে ঢুকতে হয়েছে। প্রতিবারই মারাত্মক মার খেতে হয়েছে। মারের চোটে  স্বীকারও করেছে  অনেককিছু। এ লাইনে আর থাকবেও না বলেছে। কখনও আবার রমেনদা   এসে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে। উল্টে সেবার সাহাবাবুই ধমক খেয়েছিল। রমেনদা ওর বসকে নিয়ে এসেছিল। বলেছিল – আপনারা ভোটের সময় এদের ধরছেন কোন আক্কেলে? এখানকার জল- হাওয়া ভাল লাগছে না বুঝি?

ব্যাস, এতেই কাজ হয়েছিল। মারধোর খাওয়ার আগেই তরকারা বেরিয়ে আসতে পেরেছিল সেবার। আর একবার বহুত কেলিয়ে ছিল রাম সিং। তরকার সামনের দিকের চারটে দাঁত ভেঙে   গেছিল। ডান হাতে প্লাস্টার করতে হয়েছিল। বাড়িতে পাক্কা একমাস পেছন উল্টে পড়েছিল। সে সময় চারজন লোক গেছিল ওর বাড়িতে। বেশ ভদ্রলোক, ফর্সা-ফর্সা, কাঁধে ব্যাগ, চোখে চশমা, পায়ে জুতো, সুন্দর জামাপ্যান্ট, বুক পকেটে পেন। বলেছিল ওরা পুলিশকে দেখে নেবে। পুলিশ ওভাবে মারতে পারে না। তরকাকেও না। পুলিশ কাউকেই মারতে পারে না। মারার আইন নেই। আর ধরে নিয়ে গেলে তো নয়ই। পুলিশ হেফাজত হল সেফ কাস্টডি, নিরাপদ আশ্রয়। তরকাকে শুধু সাহায্য করতে হবে। এখানে মানুষের অধিকার কীভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে তা কাগজে প্রকাশ হয়ে যাবে। কোর্টে কেস হবে। তরকা ঘাবড়ে গেছিল। এ আবার কী বলে রে বাবা! সবাই চায় তরকারা মরে যাক। পুলিশ জেলে ভরে দিক। আর পুলিশ তো ক্যালাবেই। সেরকমই তো বন্দোবস্ত। তরকা রাজি হয় নি। ও জানে, সাহাবাবু জানতে পারলে শালা আরও মারবে। মারের চোটে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবে।

সারাদিনের টেনশন আর দৌড়ঝাঁপে তরকার শরীরটা অবসন্ন হয়ে গেছিল। ও একটু ঝিমিয়ে পড়েছিল। এই সময়ই ফাঁক ফাঁক লোহার রডের তৈরি দরজা খোলার ধাতব শব্দ হল। তরকা আধবোজা চোখ মেলে দেখল সামনে দত্তবাবু। পেছনে আরও একজন। বেশ লম্বা-চওড়া চেহারা। ভুড়িটা এগিয়ে এসেছে অনেকটা সামনের দিকে। খাঁকি পোশাক। হাতে তেল চকচকে মোটা কালো লাঠি। ঘরটা এতটাই ছোট যে আর চার পা এগোলেই তরকার সঙ্গে ধাক্কা লেগে যাওয়ার কথা। তরকা ছড়ানো পা চকিতে নিজের দিকে টেনে নিল। ও জানে এরপর কী হতে চলেছে। এক দুঃসহ ভয়ঙ্কর মুহূর্তের জন্য মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করল। জায়গা ছেড়ে ও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল। ততক্ষণে দত্তবাবু মোটা লাঠিটা দিয়ে তরকার থুতনিটা ঠেলে তুলে ধরে বলল – বল, কেলেজনাকে কে মেরেছে, তোরা তো?

তরকা হাত জোড় করে কাঁদতে কাঁদতে বলল – বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা সত্যি জানি না, আমরা মারিনিকো।

এবার লাঠি সক্রিয় হল। লাটির যে কোনাটা তরকার থুতনিটা ধরেছিল সেই কোনাটাই সপাটে ধাক্কা মারল ওর মুখে। মুখে হাত দিয়ে বসে পড়তে চাইল তরকা। কিন্তু মিহির দত্ত ওরফে দত্তবাবু, থানার এস আই ওকে বসতে দিল না। দত্তবাবু কনস্টেবলদের উদ্দেশে বলল – ও শালার হাত দুটো বাঁধ লোহার রডের সঙ্গে। দেখি কত রস আছে …

কথামত কাজ হল। নিমেষে তরকার হাত দুটো সামনে এনে দরজার লোহার রডের সঙ্গে বেঁধে ফেলল ওরা। প্রথম লাঠির ঘা পায়ের গোড়ালিতে পড়েই উঠে এল হাঁটুতে। তারপর কোমরে। সারা বিশ্বের অন্ধকার দুচোখে ভীড় করে এল তরকার। যেন প্রচণ্ড শব্দে পৃথিবী ফাঁক হয়ে আবার সশব্দে জুড়ে যাচ্ছে। এরই মাঝে অবিরত বোঁ বোঁ একটা ভীষণ আওয়াজ চাগাড় দিয়ে উঠছে আর নামছে, উঠছে আর নামছে। ক্রিকেট ব্যাট সর্বোচ্চ রান তোলার জন্য যে গতিতে চালিত হয় তরকার দেহের বিভিন্ন অংশে ঠিক সেই গতি বা তার চেয়েও বেশি গতিতে আছড়ে পড়ছিল তেল চকচকে মোটা লাঠিটা। তরকার বীভৎস চিৎকার বারবার ধাক্কা খেয়ে খেয়ে শোষিত হয়ে যাচ্ছিল থানার ভেতরের বিভিন্ন দেওয়ালে। এই প্রচণ্ড মার, ভয়ঙ্কর চিৎকার কিছুই যেন রেখাপাত করছিল না থানার কারোর মনে। সাব ইন্সপেক্টর, অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর, কেরানী, বন্দুকধারী প্রহরী সকলের কাছেই ব্যাপারটা অতি স্বাভাবিক। তাই ওদের গল্প-গুজব হাসি-ঠাট্টার মধ্যে তরকার আমি জানিনা … বাঁচান … মরে যাব … ইত্যাদি কাটা কাটা গগণভেদী চিৎকার কোনও প্রভাব ফেলল না। এ এস আই সুবল ভড় দুই ঠোটের মধ্যে ভেতরের আলোচনা থেকে উঠে আসা হাসিটুকু ঝুলিয়ে রেখে একবার উঁকি মেরে দেখে গেল লকআপের ভেতরের মালটি কে?

পায়ে, কোমরে, পিঠে অবিরাম লাঠির ঘা খেতে খেতে তরকার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবার ক্ষমতা কমে গেল। হাত দুটো লোহার রডের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় ও বসে পড়তে চাইল। এতে দেহটা অনেকটা ঝুলে পড়ল। তরকার চোখ তখন দত্তবাবুর মুখের দিকে ও লাঠির দিকে। ও বসে যাওয়াতে লাঠির আঘাত থেমে গেল। দত্তবাবু জানতে চাইল – বল হারামি, কেলেকে তুইই মেরেছিস …

তরকা যন্ত্রণা আর ব্যথায় ভরা শরীর সরিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল – সত্যি স্যার, দিব্যি গেলে বলছি, আমি মারিনি।

তরকার উত্তর মোহন দত্তের পছন্দ হল না। বলল – তোকে শালা স্বীকার করতেই হবে, যাবি কোথায়? তোকে কোর্টে তুলব, সব স্বীকার করবি … এবার কথা আদায়ের অন্য ব্যবস্থা হল। দত্তবাবুর কথামত দুজন কনস্টেবল তরকার হাত দুটো রডে বাঁধা অবস্থাতেই পা দুটো দুদিকে তুলে ধরল। অর্থাৎ মুখ নিচের দিকে করে তরকা ঝুলে রইল। মাথা এবং সারা শরীর যন্ত্রণায় টনটন করতে লাগল। এরপরই কোমরে, পায়ে পিঠে নেমে এল লাঠির আঘাত। এক একটা আঘাতে তরকার দেহটা লাফিয়ে উঠছিল। কনস্টেবলরাও ঠিকঠাক পা চেপে ধরে রাখতে পারছিল না ওকে। আগের নানা আঘাতে যে সব প্রচণ্ড চিৎকার বেরিয়ে আসছিল তরকার মুখ দিয়ে এখন তা আর রইল না। মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ বের করতে পারল না তরকা। সারা দেহে-মাথায় যেন এক গরম স্রোত ছোটাছুটি করে বেড়াতে লাগল। কোনও দিকেই আর হুঁস রইল না। প্যান্টেই মুতে ফেলল ও। মুখ দিয়ে গড়িয়ে এল লালা, থুথু। বেদম প্রহারের পর তা বেশ উপযুক্ত হয়েছে বিবেচনা করে তরকার পা দুটো ছেড়ে দিতে বলল দত্তবাবু। হঠাৎ পা দুটো ছেড়ে দেওয়ায় প্রায় অচৈতন্য দেহটা আছড়ে পড়ল মেঝেতে। হাতের বাঁধনও খুলে দেওয়া হল। একেবারে নেতিয়ে পড়া তরকার দেহটাকে সজোরে এক লাথি মেরে দরজার কাছ থেকে ভেতরে সরিয়ে দিয়ে দত্তবাবু বলল – শালা, একটু রেস্ট নিয়ে নে। পরে আসল ওষুধ হবে। তিনজন একে একে বেরিয়ে যাবার পর ঘটাং করে লোহার রডওলা দরজা বন্ধ হয়ে গেল। তাতে চাবি পড়ল।

[তিন]

দরজা বন্ধ হোক বা না হোক তরকার ওসব কিছুই ভাবনার মধ্যে ছিল না। মোটা লাঠির আঘাতে ছিঁড়ে যাওয়া জামা প্যান্ট আর চামড়ার ভেতরে জমে যাওয়া রক্তে কালসিটে পড়া দেহ নিয়ে ও প্রায় বেহুঁস হয়ে ছিল। এপাশ বা ওপাশ ফেরার ক্ষমতা ছিল না। চারদিকে শুধু ব্যথা আর ব্যথা। বিশ্বজুড়ে ব্যথা। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ সূচ যেন কেউ ওর সারা শরীরে ফুটিয়ে রেখেছে। একবার নড়লেই সব বিঁধে যাচ্ছে পটাপট। একটা বিশাল ঢাক কেউ যেন ওর কানের কাছে বাজাতে বাজাতে একবার কাছে নিয়ে আসছে আর একবার পিছিয়ে যাচ্ছে। সামনেই রয়েছে সাহাবাবু, দত্তবাবু। একেবারে সামনে রাম সিং। সবার হাতে ঢাক। সবাই বিশাল এক একটা লাঠি দিয়ে ঢাকে বাড়ি মারছে। উল্লাস, উল্লাস। প্রচণ্ড প্রচণ্ড আওয়াজ হচ্ছে। সব আওয়াজ একসঙ্গে এসে ঢুকছে তরকার কানে। কান ফেটে যাচ্ছে। তরকা দেখতে পেল সামনে প্রচুর পুলিশ। খাঁকি পোশাক। সবার হাতে লাঠি আর বন্দুক। আর কোমরে গোঁজা ছোরা। পুলিশের সামনে তরকার বোন, মা। পুলিশ তাড়া করেছে। ওরা ছুটছে। না ছুটতে পারলে ইজ্জত লুঠে নেবে পুলিশ। তাই ছুটছে। খাঁকিদের তাড়া খেয়ে আরও অনেকে ছুটছে। বুলডা, কবু, ডন, জগা সবাই। দাগী স্বপনের ছেলেরাও ছুটছে। ডাক্তারবাবু, মাস্টারমশাই, জলের মিস্ত্রী, দুধওলা, বাড়িওলা, চা -ওলা, দিদিমণি কেউই বাকী নেই। না পালাতে পারলে পুলিশের মার খেয়ে সবাইকে মরতে হবে। এ এক ভয়ের দৌড়, আতঙ্কের দৌড়, অস্তিত্বরক্ষার দৌড়। শুধু ওই যে চারজন লোক, যারা তরকার বাড়িতে এসেছিল তারা রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছে। বলছে এ অন্যায় … এ অন্যায় …

এরই মধ্যে কখন বিকেলের আবছা আলো সরে গিয়ে লকআপ অন্ধকার হয়ে গেল এবং বাইরের দালানে একটা চল্লিশ ওয়াটের ল্যাম্প জ্বলায় তার একফালি ম্যাড়মেড়ে আলো দরজার ফাঁক দিয়ে যে ভেতরে এসে পড়ল তার কোনও খবরই রাখা হয়ে ওঠে নি তরকার। ঘড়ির কাঁটা বেশ ঘুরে গেল। থানা চত্বর ফাঁকা হয়ে গেল। কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর মাঝে দু চারটে গাড়ির আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বেহুঁস তরকার গা বেশ গরম। ফারেনহাইট স্কেলে মাপলে তা তখন একশো তিন ছাড়িয়ে গেছে। অনেকক্ষণ কিছু না খাওয়ায় গুলিয়ে গুলিয়ে উঠছে দূর্বল শরীর। চারপাশে মশার সংখ্যাও বেড়ে গেছে প্রচুর। এমন সময় লকআপের তালা খোলার শব্দ হল আবার। ভেতরে ঢুকে এল তিনজন। ও সি বিশ্বনাথ সাহা, এস আই রাম সিং এবং কনস্টেবল বিশু দে। একটা জোরালো টর্চের আলো এসে পড়ল তরকার মুখে। চোখ কুঁচকে উঠল ওর। এরপরই মুখে ছুটে এল জল। জলে চোখ, নাক, কান সব ধুয়ে একাকার। চোখে জোরালো আলো ফেলে রেখেই বিশু হাত ধরে টেনে তুলে দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিল ওকে। সাহাবাবু হুঙ্কার ছাড়ল – বল, তাহলে তুইই খুনটা করেছিস!

তরকার সবকিছু গুলিয়ে উঠছিল। প্রচণ্ড জ্বরে মাথা দপদপ করছিল। প্রশ্ন কিছুটা অনুভব করলেও উত্তর গুলো সাজাতে পারছিল না ও। কিছুক্ষণ থেমে সাহাবাবু আবার প্রশ্ন করল। এবার বেশ জোরে, রাগতভাবে। তরকা অনেক কষ্টে উত্তরটা সাজাল। বলল – আমি মারিনি, আমি জানি না। এসব উত্তরের মধ্যে করুণা লাভের জন্য যে ভয় মিশ্রিত ভক্তি প্রকাশের একটা ব্যাপার থাকে এক্ষেত্রে ব্যাতিক্রম হল। তরকার উত্তর শুনে সাহাবাবু আবার হুঙ্কার ছাড়ল। বলল, তুই না মারলেও বলতে হবে যে তুইই খুনি। তোকে কোর্টে তুলব, সেখানেও তাই বলবি।

কথাটা ছড়িয়ে পড়ল কিন্তু মোটা দেওয়ালের ঘর অতিক্রম করে বেশিদূর যেতে পারল না। তবে রাম সিং আর বিশুর কানে গিয়ে ঢুকল কথাটা। তরকার কানেও ঢুকল। ও যেন ক্রমশ বাস্তব থেকে পিছিয়ে পড়ছিল। শরীর ওকে আর স্বাভাবিক থাকতে দিচ্ছিল না। কেমন যেন সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছিল। যদিও ওর বোঝা উচিত ছিল যে পুলিশবাবুরা রাতের বেলায় ওর সঙ্গে মস্করা করতে আসে নি। তরকা আবার উত্তর সাজালো। বলল – আমি মারিনি … জানি না। উত্তরটা বোধহয় রুঢ় হয়ে গেল। আগের উত্তরটায় যতটুকু কোমলতা ছিল এবারে আর তাও রইল না।

তরকার দেহটা দেওয়ালে হেলান দিয়ে নেতিয়ে ছিল, মেঝেতে বাঁ হাত দিয়ে নিজেকে কোনওরকমে ঠেলে ধরে রেখেছিল ও। ঘাড় ঝুলে পড়েছিল কাঁধের কাছে। এমন অবস্থায় সাহাবাবুর ভারি বুটের লাথি সজোরে আছড়ে পড়ল তরকার পেটে। ওর যে বেহুঁস অবস্থা ছিল তা কেটে গেল। ও প্রচণ্ড যন্ত্রণায় বাবা গো – মা গো বলে শুয়ে পড়ল মেঝেতে। একইরকম ভাবে পরপর চারটে লাথি মারল সাহাবাবু। হাঁটুতে, পিঠে, পাছায় এবং শেষে পেচ্ছাপের জায়গায়। বিকট চিৎকারে ছটফট করতে লাগল তরকা। এ চিৎকারের মাত্রা এত বেশি ছিল যে তা লকআপের সামনের বারান্দা থেকে দালান পেরিয়ে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ল। থানার পাশাপাশি যে কটা বাড়ি তাদের বাসিন্দাদের কাছে এ চিৎকার জবরদস্ত পরিচিত। প্রতিদিনই থানা লকআপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আর্ত চিৎকার, অসহায় কান্না। কখনও কখনও দিনে বা রাতে ঘুম ভেঙে যায়। গা শিরশির করে। ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায়। তবুও পুলিশ তো শাস্তি দেবেই। এ রকমই যে নিয়ম।

তরকাকে ওরকম ছটফট করতে দেখে রাম সিং বলল – ও শুয়োরের বাচ্চার এখনও শিক্ষা হয় নি। এর আগে একবার হাত-পা ভেঙে দিয়েছিলাম। সেবার আবার মানবাধিকার সংগঠন এসেছিল। বাঞ্চোৎ মানবাধিকার মারাতে এসেছে, সব শালা ঢুকিয়ে দেব …। উত্তেজিত রাম সিং কনস্টেবল বিশুকে তরকার প্যান্টটা খুলে ফেলতে বলল। প্যান্ট খোলা হলে অর্ধউলঙ্গ তরকার পা দুটো সোজা দুদিকে ঠেলে ধরল সাহাবাবু আর বিশু। আর ওর পায়খানার জায়গা দিয়ে মোটা একটা লাঠি চেপে চেপে ঘুরিয়ে ঢোকাতে থাকল রাম সিং। তরকার শরীরে এক ভয়ঙ্কর উথাল-পাথাল শুরু হল। এরই মধ্যে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য প্রশ্ন শুরু হল। সে সব প্রশ্নের শব্দ কম্পাঙ্ক যত ডেসিবেলেরই হোক না কেন তরকার কানের ভেতর কোনও ছাপ রাখতে পারল না। ওর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল পাতলা টকটক পদার্থ আর গোঙানির আওয়াজ। সমাজের ভালোমানুষরা জানে পুলিশ এরকম থার্ড ডিগ্রি প্রয়োগ না করলে এ শালা দাগীদের মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোয় না । তবে তরকার দেহ, মন, মুখ আর কথা বেরোবার অবস্থায় রইল না। ও অচৈতন্য হয়ে পড়ল। এরপর পূর্ব হিসেব মত চুলের মুঠি ধরে তরকার অচৈতন্য ভারী দেহটাকে ঘসটাতে ঘসটাতে প্রথমে লকআপ থেকে বারান্দা, তারপর  দালান থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ফাঁকা উঠোন, সেখান থেকে গাড়িতে এনে তোলা হল।

[চার]

চারদিক ঘুমিয়ে থাকা রাতের অন্ধকারে ড্রাইভার সমেত মোট চারজনকে নিয়ে গাড়ি এসে থামল নির্জন হাইওয়ের ওপর। দ্রুতগতিতে গাড়িতে ঠান্ডা হাওয়া লেগে বোধহয় তরকার কিছুটা জ্ঞান ফিরেছিল। ওকে গাড়ি থেকে ধরে ধরে নামিয়ে দেওয়া হল। বলা হল চলে যেতে। অর্থাৎ ছুটি। হেফাজত থেকে মুক্তি। এসব কথা তরকা বুঝেছিল কী না কে জানে, তবে টালমাটাল অবস্থায় হাইওয়ের পাশে ঘন জঙ্গলের দিকে হাঁটতে পেরেছিল কিছুটা । হয়ত বা বুকের ভেতর প্রকৃতির ঠান্ডা হাওয়া টানবার চেষ্টা করছিল। তারপরই বিশেষ উৎস থেকে ছুটে আসা তিন-তিনটে বুলেট যা ওর মাথা আর বুক ফুঁড়ে ঢুকে গেল ভেতরে। তরকা নিঃস্পন্দ হয়ে গেলে গাছের পাতার আওয়াজ টের পাওয়া গেল, বাতাসের শব্দ শোনা গেল, সারা আকাশ জুড়ে ঝকমকে তারাদের উপস্থিতিও অনুভব করা গেল। তবে এবারের কাজ গতদিনের থেকে একটু অন্যরকম  হল । কেলেজনার দেহ যেমন ফেলে রাখা হয়েছিল এক্ষেত্রে তা আর হল না। ওকে তুলে আনার সময় যে গুটিকয় লোক চায়ের দোকানে ছিল তাদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে ডেকে এনে শাসিয়ে দেওয়া হল। তরকা নিখোঁজ হয়ে গেল।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • কোটেশন ব্লগ

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিঙ্ক

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ।