19 Mar

অন্য ধারার গল্প

লিখেছেন:অদ্রীশ বিশ্বাস


 

বাংলা ছোটগল্পের আলোচনায় অন্যধারার অথবা প্রথাবিরোধী গল্পকারদের স্থান লাভ বেশি দিনের ঘটনা নয়। বহু ছোটগল্প বিষয়ক আলোচনাগ্রন্থ দেখলে দেখা যাবে সেখানে অন্য ধারার গল্পকারদের কথা নেই। কদাচিৎ সামান্য ছুঁয়েই চলে যাওয়ার ঘটনা দু-একটি বইয়ের বৈশিষ্ট। প্রকৃতপক্ষে এই উল্লেখ অনালোচনার সমতুল্য। তাই একথা বলাই যায়, অন্যধারার গল্পকারদের ক্ষমতা প্রমাণের উদ্যোগ ও সাফল্য আজও বেশ কঠিন পরীক্ষার ব্যাপার। বিশেষত তাঁদের মধ্যে যখন কোনো একটি সাধারণ ঐক্য নেই, যার দ্বারা এঁদের লক্ষণ বা বিশেষত্বকে কঠিন প্রাচীর হিসাবে বিবেচনা করা যায়। বরং উল্টো, এঁরা এতটাই একক ও ক্ষমতায় মহিমময় যে তাঁদের বহুত্বকে স্বীকার না করে নিলে একই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করাও মুশকিল। সেই মুশকিল আসানের কোনো চেষ্টা না করে ওই বহুত্ব বা বৈচিত্রকে তুলে ধরার জন্যই হয়তো এই আলোচনা।

‘অন্যধারা’ কাকে বলে কিংবা কোনটা ‘প্রথাবিরোধী’, আর কোনটা নয়, এমন কূট প্রশ্ন উঠতেই পারে আলোচনার শুরুতে। ভাল করে তর্ক জুড়লে এর সুনির্দিষ্ট কোনো মীমাংসা যে মিলবেই এমনটাও নয়। প্রথা বিরোধিতার সাধারণ কোনো গাইডলাইন না থাকায় এ হয়ে উঠবে নানা ধরনের অভারল্যাপিং-এ ভরা এমন একটা অবস্থা, যার ভেতরে-বাইরে বহু গল্প ও গল্পকার খাপ খাওয়ানোর লড়াইতে, নাকি সহজ সহাবস্থানে মহিমান্বিত। এই পরিস্থিতি শুরু হয়েছিল বনবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ‘নরকের কীট’ (১৩৩৬) গল্প দিয়ে। বনফুলের শিক্ষক বনবিহারী মূলত হাসির গল্পের জন্যই পরিচিত ছিলেন। সামাজিক সমালোচনার একটি কূটবিন্দুরূপে শ্লীলতা ও সমসাময়িকতার সংকীর্ণতাকে ধরার জন্য ‘নরকের কীট’ রচনা করেন। বাংলা গল্পে প্রভূত পরিমাণে ইংরাজি শব্দের ব্যবহার ও কথ্যরীতির অতি সাহসী উপস্থাপনা, এই গল্পসহ বনবিহারী মুখোপাধ্যাকে সেই কালে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে। ফলে, ‘নরকের কীট’ হয়ে ওঠে উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের একটি আদি পাঠ। প্রথাবিরোধিতার সম্ভবত প্রথম গল্প।

বাংলা গল্পের চর্চাস্থল থেকে বহু দূরে থেকে, আবার অন্যধারার গল্প লিখে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা অমিয়ভূষণ মজুমদারের পক্ষে নিশ্চয় সহজ ব্যাপার ছিল না। তবু তিনি যে সেটা সফলভাবে পেরেছেন তা বোঝা যায় সিরিয়াস সাহিত্য চর্চায় আজকাল তাঁর নাম ও গল্প আলোচনার প্রথম দিকেই স্থান পায় দেখে। অমিয়ভূষণের গল্পের বৈশিষ্ট্য তাঁর উপন্যাসের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সমান্তরাল। ভাষার যে সামাজিক উপযোগিতা আছে যা তার আপাত শৃঙ্খলা ছেড়ে বা সমসাময়িকতা ছেড়ে গড়ে তোলে একটা ভিন্ন সামাজিক যুক্তি; অমিয়ভূষণ সেই ভাষায় তাঁর গল্প লেখেন। চেতনা সেই ভাষাপৃথিবীর গূঢ় রসায়ণ, অদ্ভূত আঁধার এসে গ্রাস করে সেই ‘চেতনা’ বা বাস্তবত সেই চেতনা আঁধারস্পর্শী থাকে বলে অমিয়ভূষণ তাকে খুঁড়ে দেখাবার উদ্যোগ নেন। পড়লেই দেখা যাবে অমিয়ভূষণের গল্পে কখনোই খননহীন তরল আলোর ইশারা নেই। বস্তুত, এই খননই তাঁর কাজ, মনে করেন, ‘আমার লেখালেখির উদ্দেশ্য আর কিছু না হলেও কেবল গাঁইতি হাতে খুঁড়ে যাওয়া’। (সাক্ষাৎকার, অনুভব, ১৯৮৮) একে যদি কারো কোনো মহৎ সাহিত্যের সাধারণ লক্ষণ বলে মনে হয় তাই অমিয়ভূষণ মনে করিয়ে দেন ওই একই সাক্ষাৎকারে, ‘এক কথায় সার্চিং – যার সঙ্গে জগৎ-জীবন নিরন্তর দেখা ও দেখানোর যোগ রয়েছে তা আমার কেন সবার লেখাতেই পাওয়া যাবে। সকলেই সেই কাজটা করে চলেছেন। আমার ক্ষেত্রে আলাদা হল কীভাবে, এই প্রশ্নের জবাব হল, ডায়কোটমি – এই সার্চিং -এর ডায়কোটমিকে আমি ধরি – দ্বিত্ববোধ আমার অনুসন্ধানের বিষয়।’ এই ‘অনুসন্ধান’ ও তার ‘দ্বিত্ববোধ’ যদি একই সঙ্গে চলে তাহলে সেই দুইয়ের সমাবেশে অমিয়ভূষণের জগত হয়ে ওঠে বহুত্বময়। কারণ, অনুসন্ধানে এক ধরনের স্বতই ডায়কোটমি থাকে আবার জীবনের ডায়কোটমি যুক্ত হলে তা আর দুই নয়, চারে পরিণত হয়; অর্থাৎ বহুত্বে পর্যবসিত হয়। এই বহুত্বকে অমিয়ভূষণ বলেছেন, ‘অন্তর্জ্ঞান-প্রসূত ঘটনা’। তারই টানে তিনি লিখে চলেন তাঁর ছোট গল্পগুলি। যেমন, ‘তাঁতীবউ’ গল্পে তাঁতী গোকুলের বউ এক ধরনের বেদনা বোধে আক্রান্ত হয়ে সারা গল্পে যে দ্বিধার জন্ম দিয়েছে তা শেষ পর্যন্ত তাঁতী বউয়ের সন্তানবতী হয়ে ওঠার অনিশ্চয়তায় অনেক বেশি গভীর হয়ে উঠেছে। অমিয়ভূষণ সরল আখ্যান লেখেননা বলে তাঁর গল্পও শেষ হয় না সম্ভাবনার তালিকা মিলিয়ে। এই গল্পও তাই কোনো নিশ্চিন্তিতে পরিসমাপ্ত হয় না। ‘মিস্টার ফনটি’ গল্পে সেভাবেই একজন সার্কাসের বামনের অবমানবতার সঙ্গে মানবতার যে লড়াই তা হয়ে ওঠে ডায়কোটমির চূড়ান্ত উদাহরণ। যেমন, ‘সাইমিয়া ক্যাসিয়া’ গল্পে থেনডুপ ও পেমা চরিত্রের কথনবৃত্ত থেকে তৈরি হওয়া পাহাড়ি দম্পতির লাঞ্ছনা ওইভাবেই জাতিচেতনাপ্রসূত ডায়কোটমির জন্ম দেয়। কেউ কেউ মনে করেন অমিয়ভূষণের গল্পে স্থান ও কাল শনাক্ত করা সব থেকে সহজ। দেশকালগত প্রেক্ষাপট রচনায় তাঁর আগ্রহ চিরদিন আর সেই সমস্যা মেটাতে অনেক সময় তিনি গল্পের সমাপ্তি টানেন মৃত্যু দিয়ে। মৃত্যুর পর আর কোনো সংশয় থাকে না বলে। এ আসলে তাঁর বস্তুচেতনার পুরনো বিশ্বাস, যার সামগ্রিক দর্শনে তিনি আস্থাশীল না-হলেও অংশ-সত্যে আস্থাবান। এটাই বোধহয় তাঁর গল্পের জীবন-বীক্ষা। যে সামন্ত মানসিকতাকে প্রস্তচ্ছেদ করেন তিনি কিংবা আধুনিকতাকে অনুবীক্ষণ, সেই দর্শনচেতনার মধ্যেই থাকে সত্যের অংশ স্পর্শ করে সামগ্রিকে পৌঁছানোর ঝোঁক। সবসময় সমগ্রে যে পৌঁছাতেই হবে এমন দিব্যি দেওয়া নেই বলে তাঁর গল্প সেই পৌঁছানোর ইশারাতেই শেষ হয়। পৌঁছায় না কেন এই প্রশ্ন অবান্তর হয়ে থাকে – বরং এই পৌঁছানো আর না-পৌঁছানোর ডায়কোটমি গুরুত্বপূর্ণভাবে ধরা দেয়।

কমলকুমার মজুমদার বাংলা গল্পের এক আশ্চর্য প্রতিভা, যিনি অবিশ্বাস, ভয়, সংশয়কে নিয়ে গল্প লিখলেও শেষ পর্যন্ত যেন এক ধরনের ‘আস্থা’-তে পৌঁছাতে ছেয়েছেন – মানসিক আস্থা, জীবনগত আস্থা, ঐশ্বরিক আস্থা এবং ভুবনগত আস্থা। এই শুভ-অশুভবোধ আর আস্থার অনুসন্ধান তাঁর জীবনের বোধ বলেই কমলকুমারের গল্পে এসে ধরা দেয় সেই একটি সরল রৈখিক ভারতীয় দর্শনচেতনা। যদিও তাঁর গল্পের বিষয় বা কাহিনির গতিপ্রকৃতি অনেক সময় আনপ্রেডিকটেবল। সেখানে সর্বদা এই সরল রৈখিক সিদ্ধান্তে জীবন নিরীক্ষার পরিচয় পাওয়া যাবে না। বরং অনেক জটিল তাঁর গল্পের চরিত্ররা। কাহিনিগুলি ও ভঙ্গিমাটি। আর সেই জটিলতা নিয়েই এরা স্পর্শ করতে চেয়েছে সরল ভাববস্তুটিকে বা ভারতীয় দর্শনসঞ্জাত মনটিকে।

প্রথমপর্বে কমলকুমার মাত্র কয়েকটি হলেও এমন গল্প লিখেছিলেন যা ছিল তাঁর চেনা ভাব ও ভাষার বাইরে একদম আধুনিক রীতিতে নির্মিত। ‘লালজুতা’, ‘জল’ সেই ধরনের গল্পের উদাহরণ। কিন্তু বাস্তবতাধর্মী, পরিচিত ওইসব গল্পের জগত থেকে সরে এসে তিনি রচনা করলেন অন্য একটা জগত, যার সঙ্গে বাস্তবতার সব যুক্তি মেলে না। বিশেষত প্রচলিত গল্প-বিশ্বাসের ও জীবন-বিশ্বাসের পথ না ধরে এক ধরনের ডানপন্থী দর্শনের দিক থেকে সমগ্র বাস্তবতাকে দেখার চেষ্টাটি নিশ্চয় অন্য এক ধরনের প্রাপ্তি দিল আমাদের। কমলকুমারের কথায়, ‘জাগ্রত, বিশুদ্ধ ব্রহ্মা, যাহাকে দেখিয়াই আমার রচনাকর্মের অধিত জ্ঞান চিহ্নিত হইল, খুঁজিয়া পাইল সেই বিশুদ্ধের কর্মাকর্মবিবিধ ব্যবস্থার প্রাসঙ্গিক বোধ। আমি আমাতে মুগ্ধ হইলাম,যে, এমনতরো কঠিন চেতনাও কীভাবে সামান্য মানুষের মস্তিষ্কে আসন লাভ করে’। কমলকুমারের এই ‘আত্ম’-কে স্থাপনের বিস্ময় ও প্রশান্তি অন্যদের চেয়ে তাঁকে আলাদা করতে পেরেছে।

প্রসঙ্গত ‘মতিলাল পাদরী’ গল্পের কথা মনে পড়ে। কীভাবে একটি ঝড়বৃষ্টি বর্ণনার কঠিন পরিস্থিতি ক্রমশ পাদরীর সদর্থক প্রশান্তিতে নিয়ে যায়। তত সহজ ছিল না গল্পের ক্রমস্তরগুলি। কমলকুমার পেরেছেন তাঁর আত্মকে স্থাপনের স্থির লক্ষ্যে পৌঁছাতে। ‘ফৌজ-ই বন্দুক’ একদম ভিন্ন ধরনের গল্প হলেও সেই প্রশান্তিচেতনা একই রকমভাবে কার্যকর থাকে। কার্যকর থেকেছে লৌকিকচেতনাও, যা কমলকুমারের লেখালেখির একটা মূল ভারতীয় দর্শনভূমি। ‘তাহাদের কথা’ গল্পেও সেই সাধক-পাগল ভঙ্গিতে নির্মিত শিবনাথের পায়ে বেড়ি লাগানোর অনুষঙ্গে পাখির প্রতীকী তুলনা তো সেই ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ক্যামনে আসে যায়’ বাউল তত্ত্বেরই পরিচায়ক। কমলকুমারের রচিত শিবনাথ পারে না স্বাধীন ভারতে নিজেকে মানিয়ে নিতে। স্বাধীন ভারতও পারে না, আর সেই না-পারার সুতো হয়ে থেকেছে একদিকে শৃঙ্খল, অন্যদিকে পাখি। শৃঙ্খল বাঁধতে চায়, পাখি উড়ে যেতে চায় – ভারতীয় লৌকিক দর্শনের সারকথা, ‘বাঁধবি বলে এনেছিলি বেড়ি/তার আজ এই কী ছিরি, পাখি হতে চায়/ গুরু এই ছিল উপায়/বেড়ি পাখি হতে চায়’। এই ভাবনাকে ‘গোলাপ সুন্দরী’ গল্পের বিলাসের একান্ত নিজস্ব সমস্যার ভিতর দিয়ে দেখলেও অন্তিমে এই তত্ত্বের কাছে পৌঁছানো যাবে। পৌঁছানো যাবে কমলকুমারের আশ্চর্য-ভাষাস্থাপত্যময় গল্পগুলির নানা উদাহরণকে টেনে ‘আমোদ বোষ্টুমী’ পর্যন্ত। দেখা সত্যকে কীভাবে উত্তরিত করে কমলকুমার ভ্রমের সত্যকে প্রতিস্থাপন করেন ওই লৌকিক বৃত্তের পাশে, যা গড়ে তোলে লৌকিকের সঙ্গে ভারতীয় ধ্রুপদী দর্শনের সেতু, তার জন্য ওইসব গল্পের বাবা-ছেলের সম্পর্ক কিংবা অসম নানা সম্পর্কের পরিচয়গুলি জীবন্ত উদাহরণ হয়ে ওঠে। এভাবেই কমলকুমার বহু জটিল টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে বাংলা গল্পের সমান্তরাল একটি দর্শন ভাবনার চর্চা করে যান এবং শুধু স্বতন্ত্র্য নন, দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন।

‘মহাকাব্যের ভূমিকা’, ‘স্টাডি’, ‘মুহূর্ত’, ‘সার্কাস’, ‘চর্যাপদের হরিণী’, ‘জটায়ু’, ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ প্রভৃতি গল্প লিখে দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মার্কসবাদী চিন্তার মূল যে মানুষের বাঁচার সংগ্রাম, যার রাজনৈতিক তাৎপর্যময় কাজ শ্রেণীসংগ্রাম, তাকে ফুটিয়ে তোলেন। হয়তো এমন একটি আপাত সরল বাক্যে দীপেন্দ্রনাথের রচনাকে চিহ্নিত করা আসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হবে, তবে একথা ভুল নয় যে প্রচলিত মার্কসবাদী লেখকদের ধারণায় শ্রেণীসংগ্রামের যে এক ও অপর অস্তিত্বের সংঘাতকে কখনো একক, কখনো সমষ্টির মধ্যে দিয়ে যেভাবে চিহ্নিত বা নির্মিত হয়েছে দীপেন্দ্রনাথের গল্পে তা হয়নি। তিনি শ্রেণীসংগ্রামকে অপরত্বের জায়গা থেকে দেখতে চেয়েছেন। তাই তাঁর গল্পে এমন অনেক চরিত্র আসে যরা প্রধান ধারার নন। প্রধান ধারার বাইরের বাস্তবতাকে তারা প্রতিভাত করেন। ধ্রুপদী বামপন্থার দিক থেকে নয়, অপরত্বের দিক থেকে এই নির্মাণ নিশ্চয় তাঁর গল্পের আলাদা একটা বিশেষত্ব। সবাই যখন পার্টি আর রাজনীতিকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন তখন দীপেন্দ্রনাথের এই স্বতঃস্ফূর্ত রাজনীতিবোধ তাঁকে অনেক দূর পর্যন্ত মানুষ ও জীবন পর্যালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে। তাঁর গল্পে থাকে মানুষের নৈতিকতা, নিয়মনিষ্ঠা ও সততার প্রেক্ষিতে প্রবহমান সময়ের সমালোচনা। এই সমালোচনা উত্তর-জাতীয়তাবাদী চেতনা থেকে উদ্ভূত। তাঁকে নিছক মার্কসবাদী বললে তাই ভুল হয়, বলতে হয় উত্তর -ঔপনিবেশিক বামপন্থী রাজনীতির যে দেশীয় ব্যাখ্যা, তারই দূরদর্শী ভাবুক গল্পকার। মার্কসবাদী তো বটেই, উত্তর-ঔপনিবেশিক অপরত্বের চেতনা-সম্পন্ন সেই মার্কসবাদ। সুশীল জানা, রমেশ সেন, শান্তিরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার ভেতর বহু মহত্ব থাকলেও দীপেন্দ্রনাথের এই ভাবনাবৃত্ত স্বতন্ত্র্য বলেই তিনি অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পান। আমরাও তাঁকে সেই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হই। বিশেষত, যখন পার্টির সক্রিয় সদস্য থেকেও, ‘পরিচয়’ পত্রিকা সম্পাদনা করেও তিনি ওই স্বতন্ত্র্য অর্জন করতে পেরেছিলেন।

মার্কসবাদের সূত্র ধরেই আসতে পারে দেবেশ রায়ের নাম, যিনিও একদা ‘পরিচয়’ সম্পাদনা করেছেন। দেবেশ রায়ের গল্পের তিনটি প্রাথমিক পর্বকে কোনো কোনো সমালোচক চিহ্নিত করেছেন। প্রথম পর্বের গল্প ‘দুপুর’, ‘পা’ প্রভৃতি, দ্বিতীয় পর্বে ‘কলকাতা ও গোপাল’, পশ্চাৎভূমি’-র মত গল্প আর তৃতীয় পর্যায়ভূক্ত পরবর্তী গল্পগুলি।

‘দুপুর’ কোনো প্রতীক নয়, পরিবারের কয়েকজন সদস্যর একটি দুপুরকে কেন্দ্র করে ভাবনা-অনুভূতি, আশা-আকাঙ্খা-বেদনার কথা ব্যক্ত করার কাহিনি। মূলত বর্ণনামূলক, কাব্যিকও খানিকটা – আর সাঙ্গীতিক। যেন কোনো বিরাট আকাঙ্খা থেকে নয়, এ গল্প রচিত হয়েছে কবির গভীর অনুভব থেকে। আর তাতে ধরা পড়েছে যে মানব-অনুভূতিগুলি, সেগুলিই গল্পের উপাদান হয়ে উঠেছে। এই গল্পের আগে কয়েকটি হাত পাকানোর গল্প লিখেছেন দেবেশ রায় কিন্তু এই গল্প থেকেই তাঁর প্রকৃত যাত্রা শুরু। এই গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে ‘স্মৃতিজীবী’ গল্পের – যেখানে পাঁচটি যুবক স্মৃতিচারণা করে আর শেষ হয় অনুভূতির নিবিড় বিচ্ছেদ ভাবনায়, ‘সেদিনগুলো ছিল, নেই, আসবে না’।

আশ্বিন ১৩৬৬ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘কলকাতা ও গোপাল’ থেকে দেশকাল ও শ্রেণীবোধ পূর্ণমাত্রায় সক্রিয় হতে শুরু করল। একটি যুবক, গোপাল, আত্মহত্যা করার আগের মুহূর্তগুলো নিয়ে তার যে টানাপোড়েন, সংকট আর অনিবার্য মৃত্যুর পরিণতি তা দেখিয়ে দিল শ্রেণীবোধ ও মানুষের বাঁচার চিন্তা কতটা গুরুতর হয়ে উঠতে পারে একটি সংটাপন্ন শহরের মাঝখানে। যেমন গল্প ‘ক্রীতদাস’ – একজন সুস্থ সবল যুবকের এই জগত-জীবন-সভ্যতার চাপে কিভাবে আত্মিক মৃত্যু ঘটল তার পরিচয়। যে পরিচয় ছিল ‘শ্বাসকষ্টরোধের কারণ’ গল্পে দুটি যুবকের দমবন্ধ করা অবস্থার মধ্যে দিয়ে – রাজনৈতিক সংকট আর প্রেমজ সংকটের রূপ তুলে ধরে। গোটা দেশের এই সংকটকে, সভ্যতার এই সার্বিক ভাঙনকে আঙুল তুলে দেন তিনি। এমনই আরেকটি গল্প ‘নিরস্ত্রীকরণ কেন?’। একটি ট্রেনের ভেতর বেশ কিছু যাত্রী জানতে পারল একটি নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে চোররা ওঠে। দরজা-জানালা বন্ধ ট্রেনে। বাইরে দরজায় টোকা দরজাটা খোলার। কেউ খুলতে যাচ্ছে না। হয়তো চোর, কিংবা নয়। চারজন যুবক খুলতে গেল কিন্তু অন্যরা ভাবল ওরা তাহলে ডাকাতদলের অন্তর্গত। ওদের আর দরজা খোলা হল না। দেবেশ রায় লিখেছেন, ‘আত্মরক্ষা করার মৌলিক অধিকার খাটাতে গিয়ে, মৃত্যুকে হঠাবার মৌলিক মানবিক অধিকারকে কি দরজার বাইরে ফেলে দেয়া হল।’ এই হল গল্পের রূপক বাস্তবতার প্রশ্ন। এই প্রশ্ন দেবেশ রায়ের গল্পে থাকে, যেমন, ‘উদ্বাস্তু’ গল্পতেও আছে। সত্যব্রত আর অনিমার উদ্বাস্তু জীবনকে ছাড়িয়ে এই গল্প পৌঁছে যায় সভ্যতার উদ্বাস্তু নামক এক বিশ্বচেতনার দিকে – যে বোধে আক্রান্ত ইতিহাস, ভূগোল সবকিছু। এই ধরনের গল্পে দেবেশ রায় দেশকালের স্থানীকতাকে অতিক্রম করতে চান।

আবার দেশকালের স্থানীকতায় থেকে মানুষের শ্রেণীবোধ বা শ্রেণীচেতনার উন্মেষকে ধরার চেষ্টাও আছে তাঁর ‘যুযুৎসু’ গল্পে। মণীন্দ্রনাথ দেশভাগের আগে ভদ্রলোক বলে পরিচিত ছিল। দেশভাগের পর এপারে এসে কলোনিতে বাস করতে শুরু করেছে। অতি সাধারণ দশা তার। কাজ নিয়েছে মেয়ের কলেজে – চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীর। ব্যাস, ভদ্রলোকের পরিচয় হারিয়ে গেছে। মেয়ের বয়সী সকলে ‘তুমি’ করে কথা বলে, এমনকি মেয়ের সঙ্গে কলেজের ছবিতে তাঁকে বসতে হল মেঝেতে আর মেয়ে বসল চেয়ারে। এই দ্বন্দ্বই হল যুযুৎসু।

‘দুপুর’ থেকে ‘যুযুৎসু’ পর্যন্ত দেবেশ রায়ের গল্প বিবর্তনের ছবিটা নানামুখী না-হলেও বৈচিত্রময়। তারপর আরও বৈচিত্র্য বেড়েছে এবং তিনি গল্পভাবনার ক্ষেত্রেও অনেক অন্যরকম হয়ে গেছেন। এটা প্রমাণ করে যে দেবেশ রায় গল্পকার হিসাবে সর্বদাই পরিবর্তনশীল এবং সচল। ১৯৮৫-তে প্রকাশিত ‘মুখের সত্য মিথ্যা’ গল্পটি যেমন, সুভাষ নামে একজন বাস দুর্ঘটনায় পড়ে মৃত। তার জিনসের ভিতর পা দুখানা সুমনেরই মত। সুমনও তো হতে পারে ওই পায়ের দিক থেকে! বাস্তবতার বদল ঘটে এভাবেই এই গল্পে, বদলে যায় সময় ও ইতিহাস চেতনা। কারণ, সত্য পরিবর্তিত হচ্ছে। এবার প্রমানের অপেক্ষায় সুভাষ নয়, ও সুমনই। ১৯৮৬-তে লেখা ‘জন্মপ্রজন্ম’ গল্পটি পড়লে বোঝা যায় ওই একই সংকটের মুখ বদলে গেছে যেন। এভাবেই আবর্তিত হওয়ার তত্ত্ব নির্মাণ করেন লেখক। ইতিহাসের আবর্তন, মানুষের চেতনার আবর্তন, বেঁচে  থাকার আবর্তন। ১৯৮৮-তে রচিত ‘স্বপ্ন-জাগরণে ব্রত’ গল্পে যে এপিকের বিস্তার কিংবা ‘নদীরাম জঙ্গলরাম’ গল্পের নদীর মত আখ্যানধর্মীতার ব্যবহার অথবা ‘গ্লোবালাইজেশন’ গল্পে আধুনিকতা উত্তর সময়ের জটিলতাকে বোঝার চেষ্টা করার মধ্যে রয়েছে তাঁর গল্পের সেই প্রবহমান সচল রূপ। বদলানোর এই দীর্ঘ ইতিহাস নিয়ে দেবেশ রায় আমাদের ভাষায় অন্য ধারার একজন অত্যন্ত শক্তিশালী লেখক।

এই সময়ের আরেকজন শক্তিশালী লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। যখন শুরু করেছিলেন, সেই পাঁচের দশকে, তখন ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকার মত বাম ঘরানার কাগজে ওই জাতীয় গল্প লিখেছিলেন। ‘জাদুসূর্য’, ‘সূর্যমুখী ফুল আর বিকেলের আলো’, ‘আগামী’ প্রভৃতি গল্পের সঙ্গে আজকের পরিচিত গল্পকার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের মিল বিশেষ নেই। ফলে, ওই গল্পগুলো পড়লে যে ধরনের প্রতিক্রিয়া হয় তা পরের দশকে প্রকাশিত গল্পের সঙ্গে কোনোভাবেই এক হয় না। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁর গল্পের নায়ক মূলত নিঃসঙ্গ, আত্মমুখী, চিন্তামগ্ন, দ্বিধাগ্রস্ত, অসুস্থ আর অসহায়। তিনি নিজেকে বলেন, ‘কামু-কাতর লেখক’। এই আলবেয়ার কামুর সঙ্গে মিলে যাওয়াটা প্রথম জীবনে কাকতালীয় ঘটনা। পরবর্তীকালে তিনি যখন কামু পড়েন তখন আবিষ্কার করেন ‘বিজনের রক্তমাংস’ গল্পের বিজন কিংবা ‘নিদ্রিত রাজমোহন’, ‘বিপ্লব ও রাজমোহন’ গল্পের রাজমোহনের সংকটের সঙ্গে কামুর মিল। ছয়ের দশকের গোড়ায় রচিত তাঁর দুটি বই, ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ আর ‘সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী ও অন্যান্য’ তখন বাংলা গল্পের ভোল বদলে দেয়। এই সময় বিমল কর ‘ছোটগল্প : নতুন রীতি’ নামে একটি নতুন ধরনের গল্প -আন্দোলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন; তাতেই প্রকাশিত হয় ‘বিজনের রক্তমাংস’। যদিও এই পর্যায়ে বিমল কর আর যা ছেপেছিলেন তার তুলনায় সন্দীপনের গল্পটি এত শক্তিশালী যে অন্য গল্পগুলোকে লোকে ভুলেই গেছে, এটি হয়ে গেছে মাইল ফলক।

সকালবেলা উঠে বিজন দেখল পেচ্ছাপের সঙ্গে রক্ত বের হচ্ছে। এটাই হল গল্পের অবলম্বন। তারপর সেই আতঙ্ক সঞ্চারিত হল গল্পের সর্বত্র। বিজন হয়ে উঠল ক্রম-রক্তবমনকারী সময়ের প্রতিনিধি। এছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না আর। সময় তখন উপশমের নয়, অসুস্থতার। সেই অসুস্থতার দুশ্চিন্তা নিয়েই বাকি পথ চলা – কী বিজনের, কী সন্দীপনের। এই বিজনই হয়ে গেল তাঁর আজীবন অবলম্বন নায়ক চরিত্র। উপন্যাসে, গল্পে সে নানা নামে এল, আসলে স্বয়ং সন্দীপনই এলেন। আর তিনি তো নিজেই লিখেছেন, ‘আমি ও আমার গল্প এক। যাঁরা আমাকে ভালবাসেন তাঁরা আমার গল্পকেও ভালবাসুন’। কারণ, আলাদা করে গল্পকার/লেখক সত্ত্বাটার মহত্ব বা বিশালত্ব অবশিষ্ট নেই। লেখক এখন জ্যোতির্বলয়হীন, মানুষ মাত্র। যে কোনো মানুষ, যেমন বিজন, রাজমোহন, হিরণ, সন্দীপন। আর এটাও লক্ষণীয়, তাঁর গল্পের নায়কদের নাম শেষ ‘ন’ দিয়ে। একই ভাবে ‘মীরাবাঈ’ গল্পের মীরা বউদিও আসে নানা নামে অন্যান্য লেখায়, ঘুরেফিরে।

সন্দীপন বাংলা ভাষার এমন একজন গদ্য লেখক, যিনি ওই সময় নির্মোহভাবে আধুনিক আর আধুনিক বলেই ইউরোকেন্দ্রিক। লেখায় তাঁর কোনো ট্যাবু নেই বরং আধুনিকতার বশেই ট্যাবু ভাঙা তে প্রচণ্ড আগ্রহ। ফলে, রাজনৈতিক ট্যাবুই হোক কিংবা যৌনতা-অশ্লীলতা বিষয়ক ট্যাবুই হোক, সন্দীপন সেই আধুনিক ‘কালাপাহাড়’ যে এসব তছনছ করে দিয়েই নিজের পথ বানিয়ে নেয়। ‘জাগো মসৃন ত্বক’, ‘নলিনী শাটার নামিয়ে দেয়’, ‘বনধ-এর দশদিন’, ‘পরিচারিকা আশা’, এমনই সব গল্প। নাগরিক ও রাজনৈতিক থাকাটা তাঁর সেই সময়ের গল্পের শুধু আধুনিক বৈশিষ্ট্যই নয়, সমসাময়িকও বটে। ‘অংশু সম্পর্কে দুটো-একটা কথা যা আমি জানি’-তে সেই ব্যক্তি অংশু যে মার্কসবাদী বইতে পেজ মার্ক করে পড়ে তার এক ধরনের সামাজিকরণ ঘটে। ব্যক্তি থেকে সমূহের চেতনায় পৌঁছায়। গল্প কিন্তু সমূহের হয় না, হওয়াতে চান না সন্দীপন; কারণ, বিশ্বাস করেন না।

নয়ের দশকে সন্দীপনের গল্পে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রভাব পড়েছিল। তাঁর অতি প্রিয় বিষয় মৃত্যু আর প্রেম তখন যাদুর স্পর্শে অশরীরী। ‘আমার বন্ধু পিনাকী’ গল্পে সেই মৃত্যুই যাদুবাস্তবতার ছোঁয়ায় বাস্তবের যুক্তি-বুদ্ধি-অতীত এক স্তরে এসে দাঁড়ায়। আবার উল্লেখ করা যায় ‘সোনালি ডানার ঈগল’ গল্পটি – যেখানে একটি অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পরিবারের গোপন অসম-বয়সী কামচর্চা থেকে জ্যাক দ্য রিপারের অতিবাস্তবতায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্যে সেই ইঙ্গিত অন্যভাবে থাকে। এমন বিদেশী ঢঙের বাংলা গল্প পড়ে চমকে গিয়েছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। সন্দীপনের সিদ্ধি এটাই, তিনি যতই ইউরোমস্ক হোন না কেন, শেষ পর্যন্ত গল্পগুলিকে বাংলা গল্প বলেই মনে হয়; কখনোই মনে হয় না তার গল্প বাঙালি জীবনের বাইরের ব্যাপার। আর এ রকম হওয়ার কারণ, একদিকে যদি থাকে আলবেয়ার কামু, তবে অন্যদিকে আছেন জীবনানন্দ দাশ। জীবনানন্দের কবিতা সন্দীপনের লেখাকে কম প্রাণীত করেনি, বরং বেশীই করেছে। জীবনানন্দ যেভাবে বাঙালি কবি, সন্দীপনও সেভাবেই বাঙালি গদ্যকার।

প্রশ্নগুলো যখন ওঠে তখন সেটারও একটা পারম্পর্য গড়ে ওঠে। ওই ইউরো মনস্কতার কথাই তো অব্যাহত থেকেছে উদয়ন ঘোষের লেখা সম্পর্কে। তাঁর অবনী আর শান্তনু সিরিজের গল্পগুলি পড়লে বোঝা যায় এঁদের মধ্যে কোথায় মিল রয়েছে, কোথায় বা অমিল। উদয়নের নায়করাও অনেক সময় সন্দীপনের নায়কদের মত সংকটাপন্ন কিন্তু সন্দীপনের নায়করা যখন তানিয়ে অসম্ভব সম্পৃক্ত ও সুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তখন উদয়নের নায়করা  উদাসীন, অহমিকাপ্রবণ। অনেক সময়েই তারা ‘আত্ম’ ও ‘অপ্র’-এর টানাপোড়েনে হাজির হয়। ছোট ছোট সংলাপে নিজেদের কথা বলে, যুক্তি সাজায় আবার হেরে যায়। এসবের মধ্যে থাকে উদয়ন ঘোষের নির্মোহ রচনাভঙ্গি, যার সারাংশময় গদ্য প্রচলিত বাংলা পাঠ অভিজ্ঞতায় একদম অন্য ঘটনা।

বিষয়বস্তুতে কোনো মিল নেই কিন্তু রচনাভঙ্গির মূল কথা যে নির্মোহতা তার দেখা মেলে রমানাথ রায়ের গল্পে। বরং বলা যায়, রমানাথ রায় এই নির্মোহ ব্যাপারটাকেই গল্পের ভঙ্গি শুধু নয়, বিষয়বস্তু করে নেন। তিনি বিশ্বাস করেন আবেগহীন এক ধরনের বস্তুধর্মে, যেখানে চাওয়া-পাওয়া, দেওয়া-নেওয়া, লাভ-ক্ষতি, আয়-ব্যায়ের নিরিখে প্রতিভাত হয়। বাকী সব মিথ্যাচার। মিথ্যাচারকে ধরাই রমানাথের কাজ। যাকে দেখছি তা কতটা আসল, এই প্রশ্ন অবান্তর – যা ঘটছে তা সত্য বলে তার নকল রূপও প্রতীয়মান। আসল-নকল গলাগলি করে আছে। দুই ভাই যেন। রমানাথ রায় তাঁর গল্পে এদের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। ‘শাস্ত্র বিরোধী’ নামে যে রীতির গল্প একদা ছয়ের দশকের গদ্যকারদের হাতে প্রবর্তিত, প্রচলিত হয়েছিল, সেই রীতিতেই রমানাথ রায় আজও তাঁর গল্প লিখে চলেছেন। ‘ঘর সংসার’, সেলাই মেশিন’, ‘লোলা বিয়ার খায়’, ‘বাবারা মরে না’, ‘হিরো-হিরোইন’ থেকে ‘অনুকথন’ পর্যন্ত একইভাবে সেই লিখে যাওয়া অব্যাহত রয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে সুবিমল মিশ্রর তুলনা আর কারো সঙ্গেই করা যায় না। বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে তিনি এতই স্বতন্ত্র্য ও প্রথাবিরোধী যে তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। এবং গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে নিজেকে অতিক্রম করে চলার এই প্রক্রিয়াটি জারি রেখেছেন সুবিমল। এই অতিক্রমের মধ্যে আছে প্রথাবিরোধিতা, প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, বিরোধিতার বিরোধিতা এবং নিজের বিরোধিতা – সামগ্রিকভাবে সুবিমল মিশ্র পাঠ এক নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা শুধু নয়, তার তাবৎ ধারণার শেকড়ে নির্মম কুঠারাঘাত।

সুবিমল বলেন, ‘অ্যান্টি গল্প’ – যা প্রথাগত গল্প নয় – কী ন্যারেটিভকে ভেঙে কী ফর্মকে তছনছ করে। এই ভাঙনের খেলায় তিনি কত দূর যেতে পারেন তার আশ্চর্য নমুনা সুবিমলের ইদানিংকালের বইগুলি, যেখানে কল্পিত পাঠবস্তুর সঙ্গে প্রচলিত সামাজিক পাঠবস্তুকে মিলিয়ে-গুলিয়ে তৃতীয় একটা পাঠরূপ তৈরি করা হয় এবং সেই পাঠরূপকে ছাপানো হরফের নানা আকার আকৃতিগত বদল ঘটিয়ে, ওভারল্যাপিং করে, অস্পষ্ট করে, পাতার বাইরে উপছে ফেলে, কালো কালিতে ভরিয়ে দিয়ে, পড়তে না-পারার অবস্থায় এনে ভঙ্গি-শাসিত পদ্ধতির চূড়ান্ততায় পৌঁছানো হয়। তাঁর লেখা শুধু পড়ার নয়, দেখারও। পড়তে পারার সামর্থে সুবিমল বিশ্বাসী নয়, পড়তে না-পারার অসামর্থেও তিনি সমান বিশ্বাসী। অতি তুচ্ছ থেকে গুরুতর বহু পাঠবস্তুকে এভাবেই সুবিমল পড়তে দেন আবার পড়তে দেন না। হয়তো একটা খবরের কাগজের কাটিং, বিজ্ঞাপন, কিংবা ব্রেখটের রচনাংশ অথবা পর্নোগ্রাফির অসম্পাদিত পাতা – গা ঘেঁষে শুয়ে আছে তাঁর রচনায়। পড়তে পারাটা একটা ক্রিয়া – সুবিমল দেখে নেন পাঠক কতটা যোগ্য সেই ক্রিয়া সম্পাদনে।

সাতের দশকের শুরুতে সুবিমল মিশ্র রচিত প্রথম গল্পগ্রন্থটি বের হয় – ‘হারাণ মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া বা সোনার গান্ধী মূর্তি’ (১৯৭১)। সময়টা লক্ষণীয়, বেশ কড়া বামপন্থী মনোভাবাপন্ন গল্প এগুলো। কিন্তু কখনই গোলগল্প নয়। অনেক সময় তাঁর গল্পের বিষয় দমবন্ধ করা কোনো পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতিকে সুবিমল রাজনৈতিক চেতনা দান করেন, কখনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধও দেখান-। আসলে তাঁর গল্প শুরুর দিন থেকেই বেশ শক্ত মাটিতে বড় হওয়া শিশু – অসংখ্য কাটা-পড়ার শুকনো দাগ, দরকারে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতেও জানে। অশক্ত ও ভীতু নয়। আর এটাই সুবিমলের গল্পের জোর। ‘নাঙা হাড় জেগে উঠছে’ (১৯৭৪), ‘দু-তিনটে উদোম বাচ্চা ছোটাছুটি করছে লেভেল-ক্রসিং বরাবর’ (১৯৮০), ‘বাব্বি’ (১৯৮৫), ‘আর পাইপগান এত গরম হয়ে যায় যে এর ব্যবহার ক্রমশ কমে আসছে’ (১৯৮৭) পর্যন্ত যত গল্প রচিত হয়েছে তাতে সেই জোরের বৈশিষ্ট্য অক্ষুন্ন আছে। সুবিমল ব্যবহার করেছেন উইলিয়াম বারোজের ‘কাট-আপ’ পদ্ধতি। টুকরোটুকরো করে লেখা। টানা ন্যারেটিভ নয় –টুকরো করে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ ঘটানো, নষ্ট করা। সুপরিকল্পিতভাবে সেই ছেদ মিলে যায় জঁ লুক গোদারের সিনেমার সঙ্গে। গোদারও একই রকমভাবে তাঁর কাহিনী টুকরো করেন, সামনে পিছনে করে দেন এবং দেখেন পরিচিত অভিঘাতটি কীভাবে বদলে যায়। গোদারের মত করেই সুবিমলের গল্পও শুরু হয় আকস্মিকভাবে, তাতে ধাক্কা থাকে। সেই ধাক্কাই পাঠককে আলোড়িত করে। কারণ, রচনাকর্ম এক ধরনের আদান-প্রদান ক্রিয়া। যে পাঠক তারও ভূমিকা আছে ওই অভিঘাত ধারণে। এই অভিঘাতের অবলম্বন হয়ে ওঠে কখনো পদ্য, কখনো নাট্য, আবার কখনো পোস্টার-বিজ্ঞাপন ইত্যাদি। জনপ্রিয় সাহিত্যের অথবা নিম্নবর্গীয় সাহিত্যের উপাদানকে একীভুত করেই সুবিমলের জগত নির্মাণ। ১৯৯০ সালে যখন ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে সুবিমল তখন নাম রাখেন ‘এই আমাদের সিকি-লেবু-নিংড়ানি’। অথবা ২০০১ সালের গল্পগ্রন্থটির নাম হয়ে যায় ‘কাঠ খায় আঙরা হাগে’– এই অশিষ্ট সাধনার লক্ষ্মণগুলোই আমাদের চিনিয়ে দেয় সুবিমল মিশ্রর নিজের জগৎ, বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই অ্যান্টি গল্প-উপন্যাসগুলি এবং যাবতীয় রচনাকর্ম, সাক্ষাৎকার, মতামতসহ যেন এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে নিজেই একটা প্রাতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। একথায় সুবিমলের সায় থাকবে না, কারণ তিনি নিজেকেও কাউন্টার করেন – অথচ আমরা দেখছি, সামাজিক ও সাহিত্যিকভাবে তাঁর অবস্থান বিরোধিতার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটা আমাদের আনন্দের কথা, যেহেতু এই লেখার শুরুতে আক্ষেপ করা হয়েছে যে প্রথাবিরোধী লেখার সম্পর্কে তথাকথিত প্রধান ধারার সাহিত্যচর্চায় এক ধরনের অবজ্ঞা ও অনাদর আছে; সেখান থেকে সুবিমল মিশ্রর এখানে পৌঁছানো নিশ্চয় একটা বড় ঘটনা।

সুবিমল মিশ্রতে পৌঁছে এই সমালোচনা শেষ হলেও এমন নয় যে প্রথাবিরোধী, অন্যধারার গল্পকারদের আর কোনো চিহ্ন পরবর্তিকালে দেখা জায়নি। দেখা গেছে; শুধু তাই নয়, আমাদের আলোচিত গল্পকারদের পাশাপাশি আরো অনেক অন্যধারার গল্পকার গল্প লিখেছেন। এই আলোচনার সীমিত পরিসরে তাঁদের সকলের কথা এল না। প্রতিনিধি স্থানীয় কয়েকজনকে নিয়েই আলোচনা হল। তবে, পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনেক অনুকূলে – যন্ত্রপ্রযুক্তির  স্ফুরণে যেভাবে তথ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে তাতে একজন লেখকের তথাকথিত প্রতিষ্ঠানের অনুগ্রহ না পেলেও সে নিজের জ্ঞান আহরণ ও নিজেকে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীন। ইন্টারনেট ব্যবস্থা তাকে দিয়েছে আপন ইচ্ছানুযায়ী সেই সৃষ্টিকে ব্যবহারের ক্ষমতা। কেবলমাত্র কাগজে ছাপা বন্দোবস্তের কালে এই বিকল্প রূপটা ছিল না। পাশাপাশি কাগজে ছাপার বিকল্প ব্যবস্থাও অনেক বেড়ে গেছে। অনেক ছোট-বড় কাগজ এখন চারপাশে মতামত প্রকাশের জন্য আছে। পরিস্থিতিটা একমাত্রিক – দৌরাত্মপূর্ণ নয়। এর ফলে লেখার সীমানা বেড়েছে – বিষয়গত ও ভাবনাগত বৈচিত্র, সাহস, বহুমুখিতা তৈরি হয়েছে। নতুন নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে পাঠ-অভিজ্ঞতা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সুযোগও এই সীমানা বাড়ানোর কাজে সাহায্য করছে। সব মিলে অন্যধারার লেখালিখি চর্চার সুযোগ অনেক বেশি – এবার সেই সুযোগকে ব্যবহার করে আমাদের ভাবী লেখকরা কোন দিকে যান, কী রচনা করেন, তেমন একটা বড় বদল হয় কিনা, দেখার অপেক্ষায়। মন বলছে, সে বদল হবে।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ