18 Apr

শময়িতার কাছে সীমায়িত

লিখেছেন:সুদীপ বসু


মেট্রো ধরে রবীন্দ্রসদন যাওয়া আমার সুবিধে হয় আজকাল। দমদম মেট্রো স্টেশনের লাগোয়া সন্দীপের গ্যারাজ। মোটর-বাইক রেখে দিয়ে নিশ্চিন্তে গড়িয়া পেরিয়ে অনেকদূর যাতায়াত করতে পারি।গত সপ্তাহে সন্দীপের কাছে বাইক রেখে, লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কাটছি রবীন্দ্রসদন। জীবনানন্দ সভাগৃহে “ফটোগ্রাফিচর্চা” সংস্থার একটা এগজিবিশন এবং আলোচনা সভা হচ্ছে। দেরি হয়ে গেছে অফিস থেকে বেরোতে।

লাইনটা এগোচ্ছে না কেন দেখার জন্য উঁকি মেরে দেখতে গিয়ে চোখ পড়ল পাশের কাউন্টারে। মহিলাটিকে লাইনে দাঁড়াবার আগে চেনাচেনা লাগছিল। তিনি টিকিট কাটছেন। তার দিকে আর একবার চোখ পরতেই আবার মনে হল ওনাকে কোথায় যেন দেখেছি। উনি যখন ব্যাগে কিছু একটা ঢোকাচ্ছিলেন, আমার দিকে দেখলেন, চোখে চোখ পরতেই আমার মনে পড়ে গেল। আরে! এতো আমার স্নাতকত্তোরের বান্ধবী শময়িতা শাসমল। সামান্য একটু ভারী হলেও এখনও বয়স্কা লাগছে না। শময়িতা আমাকে চিনতে পারেনি। ভ্রু কুঁচকে আমকে দেখে নেওয়ার ভঙ্গী তার প্রমাণ। কাউন্টার সামনে এসে যাওয়াতে আমি প্লাস্টিকের টোকেন কাটতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাড়াতাড়ি প্লাটফর্মে উঠে দেখলাম ট্রেন তখনো আসতে দেরি আছে প্রায় পাঁচ মিনিট। শময়িতাকে খুঁজতে এদিক ওদিক পায়চারি করছি। প্লাটফর্মের মাঝামাঝি একটা জায়গায় ওকে বসে থাকতে দেখলাম। কাউকে ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টায় আছে।ওর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি। দেখা করে পরিচয় দেব কিনা ভাবছি। আর কয়েক মিনিটের মধ্যে ট্রেন এসে যাবে। আর হয়ত কথা বলার সুযোগ পাবো না।

— কিছু মনে করবেন না।আমি অগ্নি মিত্র আর যদি ভুল না করি আপনি শময়িতা শাসমল, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট ১৯৮২ –র ব্যাচ্‌।

— ফোন থেকে চোখ তুলে আমকে দেখেই আবার ভ্রু কুঁচকে গেলো শময়িতার।

— আপনাকে তো … কি বললেন…? অগ্নি … মিত্র? অগ্নি? মানে তুমি অগ্নি? তোমাকে তো লাইন টিকিট কাটার সময় দেখলাম না? কি আশ্চর্য কেমন আছো?  কি করো? কোথায় থাকো? উঃ কতদিন পরে দেখা? আমার মা তোমার কথা প্রায় জিজ্ঞেস করতো। এমনকি মারা যাবার এক সপ্তাহ আগেও তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিলো। যাকগে ওসব কথা … আগে বলো কতদূর যাবে?

— কোন কথার উত্তর আগে দেবো? সম্ভবত পাঁচ-ছয়টা প্রশ্ন করেছো। অত গুলো প্রশ্ন করে তোমারই হাঁফ ধরে গেছে। শেষেরটা আগে বলি। আমি নন্দন চত্বরে বাংলা একদেমির জীবনানন্দ সভাগৃহে যাচ্ছি। রবীন্দ্র সদনে নেমে যাবো। তুমি কোন স্টেশনে নামবে … নেতাজী?

শময়িতা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই হুড়মুড়্‌ করে ট্রেন প্লাটফর্মে ঢুকে পড়লো। শময়িতার সঙ্গে আমিও ট্রেনের কামরায় উঠলাম। ফাঁকা ট্রেন … শ্যামবাজারের আগে ভিড় হবে না। বগির শেষের দিকে পাশের সিট্‌ নিয়ে আমরা বসলাম পাশাপাশি।

এয়ার কন্ডিশন ট্রেন বলে আওয়াজ কম। কথা বললে শোনা যাচ্ছে। শময়িতা আমার দিকে ফিরে বলল,

— আচ্ছা, আমিযে ‘নেতাজীতে’নামব তুমি কি করে বুঝলে?

— আমি আজকাল মুখ দেখে বুঝতে পারি কে কি করবে, করতে পারে, ভাবছে বা ভাবতে পারে … এই করেই তো খাচ্ছি।

— হুঁ, কলেজে পড়ার সময় এতটা চৌকস ছিলে না। তুমি একটু চুপচাপ থাকতে … বলা যায় লাজুক ছিলে। যাই হোক, বিয়ে করেছো?

— এসব কথা এখন না বলে, শোনাও তোমার কথা। তোমাদের বাড়ী হরিশ মুখার্জী রোডে পুর্ণ সিনেমার আশেপাশে এটুকু মনে আছে। তুমি এক মাত্র মেয়ে। তোমার পরিবার নিয়ে তোমার ওখানে থাকার সম্ভাবনা … ইংরাজিতে যাকে বলে ওয়াইল্ড গেস্‌ তাই করেছি …  নেতাজী মেট্রো স্টেশনটা কাছে হতে পারে। কাকতালীয় ভাবে সেটা মিলে গেছে।

— ঠিকই বলেছো, তবে পড়াশোনা ছাড়ার পরে মাঝের ত্রিশ বছর জীবন তো এক রকম কাটেনি, তাই ভাবছিলাম, তুমি কি অন্য কোন সূত্রে আমার খবর রেখেছিলে বা পেয়েছিলে, যার জন্য তুমি আমার মায়ের বাড়ীর কাছের মেট্রো স্টেশনের কথা বললে।

— না … না … আগেই বলেছি ওয়াইল্ড গেস্‌ … তোমার খবর আমি রাখতাম বা রেখেছি এটা জানলে নিশ্চয়ই তোমার ভালো লাগবে হয়ত। কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আমার হাল্কা করে মুচকি হাসি শময়িতা খেয়াল করেছে বুঝতে পারলাম। ওর ঊত্তরের অপেক্ষায় না থেকে কথাটা ঘোরাবার জন্য উচ্ছসিত হয়ে বললাম , পুরোনো বান্ধবীকে হঠাৎ দেখে দারুণ লাগছে! উফ্‌ কত দিন পরে দেখা! পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের পরে আমাদের ক্লাসের সবাই মিলে কলকাতা চিড়িয়াখানা গিয়েছিলাম… সেটাই মনে হয় শেষ দেখা। তাই কি? যাই হোক বোল এখন কেমন আছো?

— ভালো। তুমি কেমন… কোথায় থাকো?

— ভালো আছি। শ্রীরামপুরে থাকি। ত্রিশ বছর কেটে গেল ওখানে। তুমি কেমন আছো… ছেলেমেয়ে থাকলে ওদের খবর ঠিক আছে আশা করি। আমার বাড়ীতে মা আর নেহা, আমার স্ত্রী। ছেলে-মেয়েরা বিয়ে করে যে যার জায়গায় কাজ-কর্ম নিয়ে ব্যাস্ত থাকে… বছরে দু এক বার আসে… নাতি নাতনীদের পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সবসময় দেখা করতেও পারে না। শময়িতা, এবার তোমার খবর শোনাও।

— আমার আর কি? চিড়িয়াখানা বেড়ানোর পর আমাদের আর একবার দেখা হয়েছিলো। সুমিতার বিয়েতে।

–হ্যাঁ হ্যাঁ, ভুলেই গিয়েছিলাম, মনে পড়েছে।

–আমরা যারা দক্ষিণ কলকাতা থেকে গিয়েছিলাম, একটু তাড়াতাড়ি বিয়ে বাড়ী থেকে বেরোচ্ছিলাম। তোমরা একটু দেরী করে এসেছিলে। আর তুমি ধুতি পড়ে এসেছিলে। আমারা ইয়ার্কি মেরে উলু দিতে আরম্ভ করেছিলাম। বিয়ে বাড়ীর সবাই একটু চমকে গিয়েছিল … বাড়াবাড়ি হয়েছে বুঝতে পেরে আমরা ম্যানেজ করেছিলাম… তুমি একটু থতমত খেয়ে আমার দিকে চেয়ে নিষ্কৃতি চাইছিলে … আমি সে যাত্রায় বন্ধুদের আড়ালে তোমাকে কাছে ডেকে বলেছিলাম, হেসে যাও … ওরা চুপ করে যাবে। মনে পড়ছে?

— হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। সেদিন তোমার সাজটাও আমার মনে আছে। খুব ভাল লেগেছিল …সাদা শিফনের শাড়ির সঙ্গে মাননসই সজ্জায় বার বার তোমার দিকে তাকাতে দেখে, নন্দার ফাজ্‌লামি মনে পড়ছে। তুমি তো জানতে, আমাদের স্কুলে প্রার্থনা ঘরে সকাল সন্ধ্যে ধুতি পরতে হত … আর আমার ধুতি পরতে ভাল লাগত; সেদিনও পরেছিলাম। সুযোগ পেলেই এখনও ধুতি পরি।আমার অনেক খবর দিলাম। এবার তোমার পালা; তোমার খবর শোনাও।

— সুমিতার বিয়ের পরে পরে আমদের অনেকের মতো আমারও বিয়ে হয়েছিল।কলকাতাতে মা একলা থাকতো। স্বামীর অফিস কলকাতাতে। একবছরের মাথায় আমরা ভাড়া বাড়ী ছেড়ে মায়ের কাছেই থাকতে শুরু করলাম। আমার সেচ্ছাসেবী সংস্থায় কেমিস্টের কাজ। মা-শিশু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত। ছেলের বয়স যখন প্রায় দশ, ওর বাবার সামান্য জ্বর … ডেঙ্গু …  তিন দিনের মাথায় প্লেটলেট্‌স্‌ এত কমে গেল যে বাঁচানোর সুযোগ দিলো না। তারপর আমি, মা আর আমার ছেলে। পাঁচ বছর হোল ছেলে বিয়ে করেছে, কাজের খাতিরে মেলবোর্নে থাকে। মাঝে মধ্যে ছেলে আসে … নয়তো আমি যাই। এই তো গেল আমার খবর।

ট্রেন শ্যামবাজার ঢুকলো। বেশ ভিড় হয়ে উঠলেও আমাদের বক্‌বক্‌ করা থামেনি। তিন জনের সিট, একটা বাচ্চা মেয়েকে সামনে দাঁড়াতে দেখে আমি হাত বাড়িয়ে ওকে বসার জন্য ডাকতেই শময়িতা ওকে ওর বাঁ পাশে বসালো এবং একই সঙ্গে আমার কাছে ঘেঁষে বসলো। আমার অসুবিধে হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করাতে আমি ওর ডান কাঁধের ওপরে সিটের শিরায় হাত রেখে জায়গা করে দিলাম ও অসুবিধা না হওয়ার ইঙ্গিত দিলাম।আমাদের কথা থামেনি। এটা সেটা, এর-ওর খবর দেওয়া নেয়া করতে করতে খেয়াল এল ময়দান স্টেশন পার হল।

— অগ্নি, একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছে করে। যে দিন তুমি কলেজ ফেরত আমাদের বাড়িতে এসেছিলে আমার সঙ্গে , সেদিন আমার মায়ের সঙ্গে তোমার একবারই দেখা হয়েছে। প্রায় আমি সব সময়ই ছিলাম তোমাদের কাছে। তোমাকে চা করে দেবার জন্য হয়তো মিনিট পাঁচ কি সাতের জন্য পাশের রান্না ঘরে ছিলাম। তুমি আমার প্রথম পুরুষ বন্ধু নও, যে আমাদের বাড়িতে এসেছিলে। তা সত্ত্বেও আমার মা তোমার নাম ধরে, তোমার খবর জানতে আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করতো। গত বছর আশি বছরে বয়সে মা মারা গেলেন; তার এক সপ্তাহ আগেও তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছেন। এই ব্যাপারটা আমার কাছে একটা রহস্য। তুমি কি এমন আলাপ, তোমার বাইশ-তেইশ বছর বয়সে আমার পঞ্চাশ বছরের মায়ের সঙ্গে করেছিলে, যাকে কেন্দ্র করে মা তোমাকে শেষ সময়ও মনে রেখেছিলো?

— আমি সেরকম বিশেষ কিছু বলেছি বলে মনে করতে পারছি না। তবে একটা ব্যাপার এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তোমার বাবা মারা যাবার পরে তোমাকে বারো বছর বয়স থেকে ওনার মতো করে বড় করেছেন। স্নাতকোত্তর স্তরে তোমার ক্লাসে মানিয়ে নেওয়া ও পড়াশোনার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করাতে আমি উত্তরে বলেছিলাম যে, আমার বাবাও আমার আঠারো বছর বয়সে মারা গেছেন। তোমাকে একজন দৃঢ় মনের মানুষ হিসেবে দু বছর ক্লাসে দেখেছি। সবার সঙ্গে থেকেও নিজেকে আলাদা রাখতে পারতে, যে কারণে আমি তোমার বন্ধুত্বকে বিশেষ মর্যাদা দিতাম।

অ্যানাউন্স  হচ্ছে পার্কস্ট্রিট্‌ … পরের স্টেশন রবীন্দ্র সদন। আমি শময়িতাকে আমার নামার কথা বলাতে, সামান্য ক্ষুন্ন হলেও, নিজেকে সংযত করে হাসি মুখে বলল,- কথা শেষ হোল না … আমার ফোন নম্বর তোমার ফোনে নিয়ে নাও।  কবে আসছ বা কবে দেখা হবে জানিও।

— দুই মাস আগে তোমার ফোন নম্বর শ্যামশ্রী আমাকে দিয়েছে। ফোন করেছিলাম। অচেনা নম্বরের জন্য হয়ত তুমি ফোন ধরোনি।

ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে । কথা বলার সুযোগ কমে আসছে। কোন রকমে জানালাম ট্রেন থেকে নেমে ফোন করছি।  মাথা নেড়ে তাই করতে বলল।

ভীড় ঠেলে প্ল্যাটফর্মে নেমে একটু ফাঁকা হতেই  ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়া ট্রেনটাকে দেখছি। মোবাইলের ফোন ঠিকানায় শময়িতার নম্বর খুঁজে সংযোগ হতেই ওপার থেকে হাল্কা ট্রেন চলার আওয়াজ সমেত শময়িতার গলা – এটা তোমার নম্বর … সেভ্‌ করছি … প্লিজ্‌ আর একদিন দেখা করো … আমি আজ রাত্রে দশটার পরে ফোন করবো। গতকাল পর্যন্ত শময়িতা ফোন করেনি। আমার ওকে ফোন করা ঠিক হবে কিনা ভাবছি। 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ