28 Apr

রাহুল সাংকৃত্যায়ন – একটি বর্ণময় জীবন

লিখেছেন:দেবাশিষ মজুমদার


[রাহুল সাংকৃত্যায়ন ছিলেন ভারতের একজন স্বনামধন্য পর্যটক, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন শাস্ত্রে সুপণ্ডিত, মার্কসীয় শাস্ত্রে দীক্ষিত । তিনি তাঁর জীবনের ৪৫ বছর ব্যয় করেছেন বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে। তিনি বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাদাতা হিসাবেও প্রসিদ্ধ ছিলেন। বলা হয়েছে তিনি হিন্দি ভ্রমণ সাহিত্যের জনক। ভোলগা থেকে গঙ্গা তাঁর অন্যতম বিখ্যাত গ্রন্থ। বৌদ্ধ দর্শনে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অসামান্য। কাশীর পণ্ডিতমণ্ডলী তাঁকে “মহাপণ্ডিত” আখ্যায়িত করেছিলেন। এপ্রিলে, তাঁর জন্মমাসে ‘গল্পের সময়’ এর পাতায় প্রকাশ করা হল একটি বিশেষ প্রতিবেদন।লিখেছেন দেবাশিষ মজুমদার ]

রাহুল সাংকৃত্যায়ন – নামটির বৈচিত্র্য অধিকাংশ বাঙালি পাঠকমনে অভিনবত্ব আনলেও ভারতীয়, বিশেষতঃ হিন্দি সাহিত্য জগৎ-এ বহুকাল যাবৎ এই নাম স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। বলতে দ্বিধা নেই যে, অধিকাংশ বাঙালি পাঠকের সঙ্গে রাহুলজির যোগাযোগ তাঁর ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ বইটির মাধ্যমে। রাহুলজি তাঁর বৈচিত্রময় জীবনে কিন্তু ওই জাতীয় বই লিখেই ক্ষান্ত হন নি- দর্শন, ভ্রমণ, নাটক, ঐতিহাসিক প্রবন্ধ, বিজ্ঞান, রাজনীতি, উপন্যাস ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে ছিল তাঁর অগাধ বিচরণ। কিন্তু বাঙালি পাঠককুলকে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে, তাঁর রচিত সাহিত্যগুলি অধিকাংশ হিন্দিভাষায় রচিত। বাংলায় অনুদিত বই-এর সংখ্যা সেই তুলনায় যথেষ্ট কম। প্রায় অজানা রাহুলজীর জীবন কাহিনী ও কর্মকান্ডের সঙ্গে বাঙালী পাঠকবৃন্দের পরিচয় ঘটানোই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।

প্রথমেই আসি রাহুলজীর নামের বিশ্লেষনে। রাহুলজীর পিতৃদত্ত নাম ছিল কেদারনাথ পান্ডে। কিন্তু সমগ্র জীবনেই যার বৈচিত্র তাঁর নামে বৈচিত্র থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক। তাই জীবনে কোনো স্থানে যেমন বেশীদিন আটকে থাকেননি তেমনি এক নাম নিয়েও বহুদিন পরিচিত হতে চান নি। তাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে তিনি ‘পারসা মঠে’ গিয়ে সাধু হয়ে যান। সন্ন্যাস জীবনে নাম হয় রামউদর দাস বা রামউদর সাধু। তারপর রামউদরের প্রথম অক্ষর ‘রা’ নিয়ে নতুন নামের শব্দ করলেন ‘রাহুল’ আর সাধুর ‘সা’ অক্ষরকে নিজেদের সংস্কৃতি গোত্রের সঙ্গে যুক্ত করিয়ে রাখলেন ‘সাংকৃত্যায়ন’। এটাই ছিল ওনার নামগ্রহণের ইতিহাস।

রাহুলজীর জন্ম হয় ১৮৯৩ সালের ৯ই এপ্রিল উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার পানহা গ্রামে। মাতামহ রামশরন পাঠকের গৃহে তাঁর জন্ম। তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করতেন। রাহুলজীর পিতা গোবর্ধন পান্ডের  আধ্যাত্মিক জগৎ-এর প্রতি বেশী আগ্রহ ছিল। রাহুল পিতা ও মাতাকে নিজের কাছে বেশীদিন পান নি। মাত্র পয়তাল্লিশ বছর বয়সে তাঁর বাবার মৃত্যু ঘটে। মা কুলবন্তি মাত্র আঠাশ বছর বয়সে মারা যান। ফলে ছোটবেলা থেকেই তাকে মাতামহীর স্নেহে ও ভালবাসায় বড় হয়ে উঠতে হয়। চারভাই ও এক বোনের মধ্যে রাহুলজী ছিলেন জ্যৈষ্ঠ ভ্রাতা। ১৮৯৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার ফলে উর্দু ভাষার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। খুব অল্প বয়সে রাহুলের বিবাহ হলেও ওনার স্ত্রীর সঙ্গে ওই সময়ে দেখা হয়নি। এটিই ছিল ওনার প্রথম বিবাহ। স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয় ১৯৪৩ সালে।

পরিব্রাজক রাহুলজী:

খুব ছোট বয়সে থেকেই নানা দেশ দেখার নেশা তাঁকে আকর্ষন করেছে। যার ফলে তিনি মাত্র ন’বছর বয়সে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বারানসী যান। মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে কলকাতাতেও আসেন। রাহুল দ্বিতীয় বার কলকাতায় আসেন ১৯০৯ সালে। তখন তাঁর বয়স মাত্র ষোল বছর। এই সময় তিনি তামাকের  দোকানে কর্মী হিসাবে কাজ শুরুর পর অসুস্থ হয়ে হয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন।

এরপর আস্তে আস্তে রাহুলজী গতানুগতিক জীবন ছেড়ে ভ্রাম্যমান সাধুজীবনের প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে রাহুলজী সন্ন্যাসধর্ম গ্রহন করেন। সন্ন্যাস জীবনে তাঁর নাম হয় রামউদর দাস। অবশ্য সন্ন্যাস নেওয়ার অন্য একটি উদ্দেশ্য ছিল। সেটি হল সংস্কৃতে পান্ডিত্য অর্জন করা। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই সাধুদের গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাস তাঁকে সেই মোহ থেকে মুক্ত করে এবং ধীরে ধীরে চরম নিরীশরবাদী ও জড়বাদী হয়ে পড়েন। তবে সেই সময় অর্থাৎ সাধু হিসাবে ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণকালে তিনি কখনও পদব্রজে কখনও বা ট্রেনে নানা জায়গা ভ্রমণ করেন। এইগুলির মধ্যে হরিদ্বার, কেদার-বদ্রী, গঙ্গোত্রী, যমুনেত্রী উল্লেখযোগ্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে রাহুলজী তাঁর সংক্ষিপ্ত হিমালয় ভ্রমণ সমাপ্ত করেন। ১৯১৩ সালে তাঁর জ্ঞানপিপাসা তাঁকে পারসা মঠ ত্যাগ করতে বাধ্য করে। এই সময় তিনি খড়গপুর হয়ে পুরী যান। তারপর বেড়িয়ে পড়েন উত্তর ভারতের উদ্দেশে। ১৯১৪ সাল নাগাদ আবার ফিরে আসেন পারসা মঠে। তারপর আসেন আগ্রায় শিক্ষাগ্রহনের জন্য। এরপর ১৯১৫ সালে লাহোর পাড়ি দেন। লাহোরে সেই সময় আর্যসমাজীদের শক্ত ঘাটি ছিল। কিন্তু তাদের সম্পর্কে রাহুলজীর বিরূপ মনোভাবের জন্য তাঁকে কোন মঠে ঠাই দেওয়া হয় নি। রাহুলজীর জীবনে আবার পরিবর্তন আসে ১৯১৮ সালে। এরপর তিনি উর্দু ও ইংরাজী সংবাদপত্র, পত্র-পত্রিকা মারফৎ রুশ বিপ্লবের খবর পান তিনি। ১৯১৯ সালে লাহোরে জারি করা সামরিক আইনের কঠোরতা রাহুলজী প্রত্যক্ষ করেন। এই সময় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মনোভাবাপন্ন হতে থাকেন। ১৯২০ সালে তিনি বারানসী যান। সেখান থেকে বুদ্ধের পরিনির্বান স্থল, কপিলাবস্তু, লুম্বিনী প্রভৃতি স্থান ঘুরে দেখেন। নিগালিহারার পুষ্করিণীতে প্রাপ্ত অশোকের অনুশাসন তাঁকে আকৃষ্ট করে। এই সময় তাঁর মনে ভোটিয়াদের দেশে যাবার ইচ্ছা জাগে। এই সময় জনৈক নেপালী মোহান্ত শিষ্য হিসাবে তাঁকে চাইলে তিনি তাতে অসম্মতি জানান। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯২১ সালে। এই রাজনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য ১৯২১-২৩ সাল অবধি তাঁর পরিব্রাজক জীবনে ছেদ পড়ে। ১৯২৩ সালের মার্চ মাসে নেপাল যাত্রা করেন। সেখানে দেড় বছর অবস্থানের পর বহু বৌদ্ধ পণ্ডিত ও ভিক্ষুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বৌদ্ধ দর্শনে জ্ঞানলাভ করে ফিরে আসেন। ১৯২৭-১৯২৮ সালে শ্রীলঙ্কায় সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক নিযুক্ত হন; আবার ১৯২৯-৩০ সালের মধ্যেই তিনি তিব্বত পারি দেন বৌদ্ধ দর্শনের জ্ঞান আহরণের জন্য। এই সময় তাঁর তিব্বতে বসবাসের সময়কাল হল সওয়া বছর। ভ্রমণ ও জ্ঞানপিপাসা এই দুই ছিল তাঁর নিত্যসাথী। তাই তাঁকে চারবার তিব্বত ভ্রমণ করতে হয়েছিল। দ্বিতীয় বার তিব্বত যান ইংল্যান্ড ও ইউরোপ ভ্রমণ (১৯৩২-৩৩) এর শেষে ১৯৩৪ সালে। এরপর ১৯৩৫ সালে তিনি জাপান, কোরিয়া, মাঞ্চুরিয়া, সোভিয়েত দেশ ও ইরান দেশ ভ্রমণ করেন। ১৯৩৬ সালে তৃতীয় বার তিব্বত যাত্রা করেন। ১৯৩৭ আবার যান সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রথম অথবা দ্বিতীয় বার সোভিয়েত যাত্রার কোনও একসময় তিনি রাশিয়ান মহিলা লোলাকে জীবন সঙ্গিনী হিসাবে পান। এটি তাঁর জীবনে দ্বিতীয় বিবাহ (সঠিক সাল লেখকের পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয়নি)। ১৯৩৮ সালে তৃতীয় বার তিব্বত যাত্রা করেন। আবার ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল অবধি দেশীয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪৩ সালে আবার উত্তরাখণ্ডে যাত্রা শুরু করেন। ১৯৪৪ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল অবধি এই পরিব্রাজক পণ্ডিতকে সোভিয়েত রাশিয়ায় থাকতে হয় লেলিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে। কিন্তু ভ্রমণ যাকে পেয়ে বসেছে তাঁর পক্ষে থেকে এক জায়গায় বেশীদিন থাকা সম্ভব নয়। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষে ফিরে এসে ১৯৫৮ সাল অবধি ভারতে অবস্থান করেন। ১৯৪৯ সালে তাঁর যখন ষাঠের কাছাকাছি বয়স তখন কালিংপঙে আলাপ হয় কুড়ি বছর বয়সী কমলার সঙ্গে। পরিণাম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। সেটি ছিল ১৯৫০ সাল। এটি ওঁনার জীবনে তৃতীয় বিবাহ। ১৯৫৩ সালে বড় কন্যা জয়ার জন্ম হয়। এই দুই বছর পর ১৯৫৫ সালে পুত্র জেতার জন্ম হয়। এ ছাড়াও ইগর নামে তাঁর আরেক পুত্রের কথা জানা যায়। তিনি সম্ভবত ওনার দ্বিতীয় বিবাহের সন্তান। ইগরের জন্ম ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ। ১৯৫৯-৬১ সাল অবধি রাহুলজী শ্রীলঙ্কায় দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক পদ গ্রহণের জন্য শ্রীলঙ্কায় যান।  কিন্তু ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর স্মৃতিভ্রংশ হয়। ১৯৬২-৬৩ সালে তিনি সাত মাসের জন্য চিকিৎসা উপলক্ষে সোভিয়েত রাশিয়া যাত্রা করেন। এরপর দেশে ফিরে এলেও অসুস্থতা কাটেনি। ১৯৬৩ সালের ১৪ই এপ্রিল দার্জিলিং শহরের ইডেন হসপিটালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

 মহাপন্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন

মূলত জ্ঞান পিপাসাই রাহুলজীকে দেশ থেকে দেশান্তরে টেনে নিয়ে গিয়েছে। তিনি ঘুরেছেন বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে। আর বাড়িয়েছেন তাঁর জ্ঞানের ভান্ডার। রচনা করছেন এক একটি ভিন্ন স্বাদের বই। জ্ঞানার্জন শুরু হয় ছোটবেলায় মাদ্রাসার উর্দু বর্নমালার সঙ্গে পরিচয়ের মাধ্যমে। পরবর্তীকালে সাধু সঙ্গে এসে সংস্কৃতে পান্ডিত্য অর্জন করেন এবং সংস্কৃতে বেদান্ত পড়েন। তারপর বারানসির চক্রপানি ব্রহ্মচারীর মঠে বাসকালে তিনি ধ্রুপদী সংস্কৃত কাব্য চিকিৎসাশাস্ত্র ব্যাকরণ, জ্যোতির্বিদ্যার পাঠ নিতে থাকেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৭ বছর। এরপর যখন তাঁর বয়স ১৯ বছর তখন তাঁর সাথে আলাপ হল রাম অবতার শর্মার। এই সময় সন্ন্যাস ধর্ম নিয়ে দয়ানন্দ স্কুলে ভর্তি হয়ে ইংরাজী ও অঙ্কে শিক্ষা নেন। এছাড়া এই সময় ‘পারসা মঠে’ থাকাকালীন তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়তে আরম্ভ করেন। তিনি বহু হিন্দি ও সংস্কৃত পুস্তক নিয়ে পড়তেন। কারন তাঁর ধারণা ছিল গতানুগতিক শিক্ষার থেকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অনেক বেশী জরুরী। এরপর দক্ষিন ভারত পরিভ্রমণকালে তিনি তামিল ভাষায় পারদর্শিতা অর্জন করেন। এরপর ‘পারসা’ মঠে ফিরে আসার পর তাঁর সাথে আলাপ হয় ভারত সরকারের দুজন ফটোগ্রাফারের। এই সময় তিনি ফোটগ্রাফিতেও দক্ষতা অর্জন করেন। কালক্রমে এটা তাঁর নেশায় পরিণত হয়। তাছাড়া জ্ঞানবৃদ্ধির উপায় হিসাবে নেপালের আর্য সমাজী প্রচারকদের সঙ্গে ভাষণ ও বিতর্কের আসর গঠন করেন। এছাড়া ১৯১৫ সালে তিনি আগ্রার ‘আর্চ মুসাফির’ বিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে দুবছর সংস্কৃত, আরবী ভাষায় শিক্ষা নেন, এবং তিনি ইতিহাস ও বিভিন্ন ধর্মের তত্ত্বাদর্শ নিয়েও পড়াশুনো করেন। এই সময় তিনি আগ্রার ‘মুসাফির’ পত্রিকায় ও মীরাটের হিন্দি পত্রিকা ‘ভাস্কর’-এ প্রবন্ধ রচনা শুরু করেন। ১৯১৬ সালে তাঁর লাহোর যাত্রার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সংস্কৃত ভাষায় পান্ডিত্য অর্জন করা। এই সময় পাঞ্জাবি ভাষা ও সাহিত্য নিয়েও তাঁর আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। সেই সময় তিনি চিঠিপত্র ও দিনলিপি সংস্কৃত ভাষায় লিখতে শুরু করেন। ১৯২২ সালে তিনি সংস্কৃত কাব্যের খসড়া রচনা করেন। ১৯২৩-২৪ সাল নাগাদ হাজারিবাগ জেলে বসে লেখেন ‘বাইসবী সদী’ (বিংশ শতাব্দী)। রাহুলজী চিরকালই খোলাখুলি ভাষায় বক্তব্য প্রকাশের পক্ষপাতী ছিলেন। তাই তাঁকে ‘সংস্কৃত শাস্ত্রী’ পরীক্ষায় পাশ করানো হয়নি।পরবর্তীকালে চিত্রকূটের ‘কাশী ন্যায় মধ্যমা’র পরীক্ষা দেওয়ার পরেও তাঁকে পাশ করতে দেওয়া হয়নি। অবশেষে জব্বলপুরের কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা দিয়ে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মীমাংসা পরীক্ষায়’ উত্তীর্ন হন। এই সময়ে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন। ফলে বহু স্থানে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু জেলে বসেই পড়াশুনো ও লেখার কাজ চালাতেন। রাশিয়ান বিপ্লবের উপরে লেখা বহু বই এই সময় তিনি পড়ে ফেলেন। এই সময় তিনি সংস্কৃত ভাষায় একটি রাজনৈতিক ভজন রচনা করেন। এছাড়া বক্সার জেলে থাকাকালীন বজ্রভাষায় কবিতা লেখেন। এবং সংস্কৃত ভাষায় কোরান অনুবাদ করেন। এই সময় তিনি সহ-বন্দিদের বেদান্ত ও উপনিষদ শিক্ষা দিতেন। এর পর থেকেই ধীরে ধীরে তিনি ‘সাম্যবাদী আদর্শে’ বিশ্বাসী হতে থাকেন। তারপর তাঁর আগ্রহ জন্মায় বৌদ্ধ দর্শনের দিকে। এই উদ্দেশ্যে তিনি নেপাল যান এবং ফিরে এসে রাজনৈতিক কারণে জেলে বন্দী হন। তাঁকে হাজারিবাগ জেলে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেও পড়াশুনো শুরু করেন। পরবর্তীকালে রাহুলজী চারবার তিব্বতে যাত্রা করেন বৌদ্ধ দর্শনের সম্যক জ্ঞান অর্জনের জন্য। এই সময় তিনি বহু মুল্যবান গ্রন্থাদির পান্ডুলিপি ও অন্যান্য পুস্তকাদি সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। ধর্মকীর্তির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘প্রমান বার্তিক’ (যা আমাদের দেশে ছিল না) ইনিই তিব্বত থেকে নিয়ে এসে তিব্বতী ভাষা থেকে সংস্কৃত ভাষায় অনুবাদ করেন। বৌদ্ধ দর্শন সম্পর্কে তাঁর ছিল সর্বাধিক পান্ডিত্য। লেনিন গ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ও শ্রীলঙ্কার ‘কলম্বো’ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই বিষয়ে তিনি অধ্যাপনায় ও গবেষনায় নিযুক্ত ছিলেন। শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ দর্শন বিষয়ে গবেষনায় নিযুক্ত থাকার সময়  কলকাতার ‘মহাবোধি সোসাইটি’ তাঁকে নানা ভাবে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীকালে তাঁকে আবার রাজনৈতিক কারণে হাজারিবাগ ও দেউলি জেলে ২৯ মাস থাকতে হয়। এই সময় জেলে বসে লেখেন ৯০০ পৃষ্ঠাব্যপী তাঁর বিখ্যাত বই ‘ দর্শন দিগদর্শন’।

বাংলায় অনুদিত তাঁর বইগুলির সংখ্যা কুড়ির অধিক নয়। প্রতিটি বইই ভিন্ন স্বাদের। ‘ভোল্‌গা থেকে গঙ্গা’ (দুই খন্ডে), ‘মানব সমাজ’ (দুই খন্ডে), কিন্নর দেশে, ‘বহুরঙ্গী মধুপরী’ ‘নতুন মানব সমাজ’, ‘সিংহ সেনাপতি’, ‘তিব্বতে সওয়া বছর’, ‘ভবঘুড়ে শাস্ত্র’ পাঠক মহলে অধিক জনপ্রিয়। এর মধ্যে ‘ভোল্‌গা থেকে গঙ্গা’ বইটিতে আমরা পাই সমাজের বিবর্তনের ইতিহাস। অ্যাঙ্গেলসের origin of the family Private property and State গ্রন্থে বিবর্তনের যে তত্ব পাওয়া যায় তা অত্যন্ত সহজ কথায় গল্পাকারে উপাস্থাপনা করেছেন এই বইটিতে। আবার ‘দর্শন দিদ্‌গর্শন’-এ গিয়ে লেখক যখন ব্যাখ্যা করে দেখান বিভিন্ন দর্শনের বিশ্লেষনাত্বক আলোচনা তখন বিভিন্ন দর্শনের তত্ব কথা সম্পর্কে লেখকের স্বচ্ছতা চোখে পড়ে। আবার ‘বহুরঙ্গী মধুপুরী’-তে শুধু যে মুসৌরি শহরের বর্ননা আছে তা নয়, সেই সময়ে শহরের উচ্চবিত্ত থেকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটি পূর্নাঙ্গ বর্ননা আমরা পাই। অতএব বোঝা যায় রাহুলজীর মূল চর্চা ছিল জীবন। জীবনের বিভিন্ন রূপ তাঁর কলমে বার বার ফিরে এসেছে। আবার ‘সিংহ সেনাপতি’ বইতে পাই ঐতিহাসিক উপন্যাসের স্বাদ। এখানেও রাহুলজী জীবনের বিভিন্ন আস্বাদ পেয়ছেন। নদীর প্রবাহের মত জীবনের রং যে বদলাতে থাকে তা লেখক উপলব্ধি করেছেন। ইতিহাসের বিশালত্ব ছুঁয়ে গেছে তাঁর মন। এককথায় সাহিত্যের বিচারে এটি একটি অনবদ্য উপন্যাস। এই লেখকই আবার ‘কিন্নর দেশে’র মত বইতে সাবলীলভাবে কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জীবনযাত্রার বর্ননা দিতে থাকেন, আবার সেই সঙ্গে ভ্রমণার্থীরা অবশ্য পালনীয় কর্তব্যবোধে সজাগ থাকতে চান তখন মনে হয় বুঝি ভ্রমণ সাহিত্যেও লেখকের নখদর্পনে। এই ভ্রমণার্থীই আবার ‘ভবঘুরে শাস্ত্র’তে ভবঘুরেপনার জয় গান করেন।

যাই হোক, রাহুলজীর লৈখিক পটুতা যে বিভিন্ন বিষয়ের গ্রন্থ রচনায় ছিল তার প্রমাণ মেলে তাঁর গ্রন্থতালিকার দিকে চোখ বোলালে। পালি ও সংস্কৃত থেকে তাঁর অনুদিত বইয়ের সংখ্যাই প্রায় তেইশটি। এইগুলির মধ্যে বসুবন্ধুকৃত অভিধর্ম কোশ, ‘খুদ্দক পাঠ’, ‘গুন প্রভকৃত বিনয় সূত্র’, ‘মহাপরিনির্বানসূত্র’ নাম করা যেতে পারে। আবার ভোজপুরী ভাষায় নাটক রচনা করতে তিনি দ্বিধা করেন নি। এইরূপ কয়েকটি নাটকের নাম করা যেতে পারে। ‘জাপানীয়া রাছছ’, ‘ই হামার লড়াই’, ‘দেশ রচ্ছক’ ইত্যাদি। আবার রাজনীতি বিষয়ক পুস্তক রচনাতেও তিনি দক্ষতা দেখিয়েছেন। এই পুস্তকগুলির মধ্যে ‘সাম্যবাদ হী ক্যোঁ?’ ‘তুমহারী ক্ষয়’, ‘মানব কী কাহানী’র নাম উল্লেখ করে যেতে পারে। বিদেশী সাহিত্য অনুবাদেও  তাঁর পারদর্শিতার পরিচয় মেলে। এই জাতীয় পুস্তক গুলির মধ্যে ‘তুলসী রামায়ন’ (সংক্ষিপ্ত), হিন্দি লোক সাহিত্য, কমিউনিস্ট ঘোষণা (মার্কস, এঙ্গেলস) এর নাম করা যেতে পারে। তাঁর প্রিয় বিষয় ‘ বৌদ্ধ সংস্কৃতির উপর রচিত বইয়ের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ‘বুদ্ধ চর্চা’, ‘ বৌদ্ধ দর্শন’, ‘বুদ্ধ বা অনাত্মবাদ’, বিশেষ উল্লেখযোগ্য বইগুলির মধ্যে অন্যতম। আবার জীবন কথা রচনাতেও তাঁর কলম সমান চলে। ‘নয়ে ভারতকে নয়ে নেতা’, ‘সিংহল কে বীর’, ‘লেনিন’, ‘কার্ল মার্কস’, ‘মেরে অসহযোগ কে সাথীর’ মত বইগুলির নাম এখানে করা যেতে পারে। তাছাড়া সাহিত্য, উপন্যাস, ভাবশিক্ষা ইত্যাদি নানা বিষয়ের উপর তাঁর রচিত বইয়ের সংখ্যা প্রচুর। রাহুলজীর রচিত, সম্পাদিত, অনুদিত পুস্তকের সংখ্যা (প্রকাশিত, অপ্রকাশিত) সর্বাধিক দেড়শ। কিছু বাদ পড়া অস্বাভাবিক নয়। রাহুলজি চারবার  তিব্বত যাত্রায় আবিস্কার করেন ৩৬৮টির মত পুঁথি, এছাড়া ৫৫টির মত পুঁথির আলোক চিত্রও তুলে এনেছেন। এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ন দ্রব্য সামগ্রী পাটনা মিউজিয়ামে ‘রাহুল’ বিভাগে রাখা আছে।

রাজনীতিতে রাহুল সাংকৃত্যায়ন

রাহুলজীর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯২১ সালে। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে টানা যোগ থাকে ১৯২৩ সাল অবধি। অসহযোগ আন্দোলনে বক্তৃতা দান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাধুর বেশ নিয়ে সালেমপুর গমন, পারসায় রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ সৃষ্টি, ছাপরার বন্যায় দুর্গতদের সেবা প্রদান, ভোজপুরী ভাষায় ব্রিটিশ বিরোধী বক্তৃতা দানের মাধ্যমে লোকজন সঙ্ঘবদ্ধকরণ, তাঁর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ গুলির মধ্যে অন্যতম। পাশাপাশি গ্রন্থ রচনাও চলতে থাকে। বক্সার জেলে ছমাস বন্দি থাকার পর জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হন ১৯২২ সালে। কংগ্রেসের স্বরাজ পার্টির দিকে ঐ সময় তাঁর ঝোঁক একটু বেশী ছিল। এরপর সাম্যবাদী বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর সাম্যবাদীদের দিকে ঝুঁকতে থাকেন। তাঁরও কিছুকাল পর বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর মার্কসীয় দর্শনের এর অনেক সাদৃশ্য লক্ষ করেন। এই সময় থেকেই তিনি বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে মেতে ওঠেন। পরপর চারবার তিব্বত ভ্রমণ ও বৌদ্ধদর্শনের উপর পড়াশুনা শুরুর পর তিনি সেইভাবে রাজনীতিতে থাকেন নি। তবে অবশ্য ১৯৩৯ সালে কৃষক আন্দোলনে সম্পূর্নভাবে নিজেকে মগ্ন রাখেন। ১৯৪০ সালে মতিহারির কৃষক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এই সময় তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ বাতিল করা হয়। এরপরও তিনি রাজনৈতিক কারনে দেউলি ও হাজারিবাগ জেলে বন্দী থাকেন।

অন্যান্য সম্মান

রাহুলজীকে কাশী পণ্ডিত সভা ‘মহাপন্ডিত’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বিদ্যালংকার পরিবেনার শ্রীলংকা তাঁকে ‘ত্রিপিটাকার্ষ’ উপাধি প্রদান করেন বৌদ্ধদর্শনে অগাধ পান্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ। একইভাবে এলাহাবাদের হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে ‘সাহিত্য বাচস্পতি’ উপাধি দান করেন। ভাগলপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও শ্রীলংকার বিদ্যালংকার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি লিট ডিগ্রি দান করেন। ভারত সরকারও এই মহাপন্ডিতকে ‘পদ্মভূষন’ সম্মানে ভূষিত করেন।

পরিশেষে বলা যায় যে, রাহুলজীর জীবনের এই বৈচিত্র নেহাতই খামখেয়ালিপনা নয়, এতে রয়েছে গভীর জীবনবোধ ও নিষ্ঠা, যা থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হন নি কোনো সময়। যদি ওনার জীবনকে প্রথম থেকে বিচার করা যায় দেখা যাবে যে কখনও সাধু হয়ে মঠে থেকেছেন আবার কখনও সাম্যবাদী চিন্তা নিয়ে নেমে এসেছেন জীবনের মাঝে। বস্তুতপক্ষে কর্মযজ্ঞে তিনি ছিলেন অটুট। নিজের কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন নি কখনও। জ্ঞানার্জন অর্থাৎ প্রকৃত জীবনের জ্ঞান বোধহয় অর্জন করতে পেরেছিলেন। তাই জড়বাদী হিসাবে বৌদ্ধদর্শনে আকৃষ্ট হয়েও বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে সারা জীবন কাটান নি। তাই বলা যায় যে  বৌদ্ধ দর্শনের মূলতত্ত্বের রসোপলব্ধি তিনি করতে পেরেছিলেন। আবার মুক্ত চিন্তায়  এই মানুষটিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি  ছুঁতে পারে নি। তাই নিরীশ্বরবাদী হয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন আর উপলব্ধি করার চেষ্টা করলেন জীবনের অর্থ কি?

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ