23 May

গুরুদেব দয়া করো দীনজনে

লিখেছেন:বিষ্ণু বিশ্বাস


কতজন কতভাবেই যে রবি ঠাকুরকে নিয়ে ভেবেছেন, বলেছেন, লিখেছেন তার সবকিছু লেখাজোকা নেই। এত বছর পরেও থামার তো লক্ষণ নেই-ই, বরং উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। ভেবে চলেছেন, বলে চলেছেন এবং লিখে চলেছেন। হবেনা-ই বা কেন ! প্রাজ্ঞ জনেরা বলেন, এত বড় বিস্ময় আমাদের জাতীয় জীবনে আসেনি। যাঁরা বেশি প্রাজ্ঞ তাঁদের মতে আর আসবেওনা।

আমি প্রাজ্ঞ নই, অজ্ঞও নই। ওই ক্যাটাগরি না কি ডেনজারাস। এনারা রাজপথেও নেই, অন্ধকার ঘুপচিতেও নেই। এদের গতায়াত অলি – গলিতে। আমিও এদের মতো অলিগলির আলো আঁধারিতেই ঘুরি-ফিরি, এগোই পিছোই, চোখ কচলাই, জিভ কাটি। এভাবেই একদিন পুরোনো প্রেমিকাকে খুঁজে পেয়েছিলাম কানাগলির শেষ প্রান্তরে যেখানে দেওয়াল ছাড়া পিঠ ঠেকাবার অন্যকিছুই অবশিষ্ট নেই। এভাবেই একদিন আমার শ্রদ্ধেয় স্যারকে, যিনি আমাকে বেঞ্চির উপর দাঁড় করিয়ে ব্রক্ষ্মান্ড দর্শন করিয়েছিলেন, দেখেছিলাম ধুতির কোচা খুলে লটরপটর অবস্থায় অন্ধকার থেকে অন্ধকারে ঢুকে যেতে।

এসব কথা আজ থাক। বড্ড পার্সোনাল এসব বিষয় সাত কান করার মানে হয়না। আমার মোদ্দা বিষয় রবিঠাকুর – অর্থাৎ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়। সকাল থেকে কেমন একখানা পাগলা হাওয়া দিচ্ছে। অনেকদিন শুয়ে বসে জাবর কেটে কাটিয়েছি। আজ পাগলা হাওয়ায় নিজেকে কেমন ভূতগ্রস্ত মনে হচ্ছে। আমার প্রিয় কবিকে নিয়ে আজই আমাকে লিখতে হবে। লিখতেই হবে।

রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি। কবিতা লিখেই তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাহলে কি তাঁকে নিয়ে একখানা কবিতাই লিখে ফেলি সড়াৎ করে ! লিখতে বসে দেখি ব্যাপারটা অত সোজা নয়। আমার মনের কথা আগেই লিখে গেছেন মহামান্য কবিবর শ্রীযুক্ত পুরন্দর ভাট। আহা-হা, কী বেড়েই না লিখেছেন ভাট মশাই।

জাহাজ কাপ্তেন তুমি, বাকি সব মাঝি আর মাল্লা

সকলে জাঙিয়া পরা, তুমি শুধু পরে আলখাল্লা।

পৃথিবীর সব খচ্চর আর হারামিদের উদ্দেশে উৎসর্গিত এই কবিতা আমি নতুন করে উৎসর্গ করছি সেইসব ভদ্দরলোকদের প্রতি যাদের নিঃশ্বাসে রবীন্দ্রনাথ, প্রশ্বাসে রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ মেখে খান, ভেজে খান, আবার সেদ্ধও।

আমিও এই ভদ্দরলোকদের একজন। বৈশাখের দারুন দহন নিদাঘবেলায় হাঁসফাঁস করতে করতেও ট্রাফিক সিগনালে আটকা পড়ে গলে জল হয়ে যাই প্রেমে। অন্তরীক্ষ থেকে কোন জাদু স্পর্শে গৌড়মল্লার রাগে তখন ভেসে আসে রবীন্দ্রগান ‘মোর ভাবনারে কী হাওয়ায় মাতালো / দোলে মন দোলে অকারণ হরষে।’ আমার ভেজা গেঞ্জির তলা থেকে কী নিদারুণ হরষ অকারণে উঠে আসে আমি ছাড়া আর কে-ই বা তার খবর রাখে !

শুরু থেকে শুরু করি। তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় কিশলয় – এ। কিন্তু সেতো শুধু মুখ চেনা। আলাপ পরিচয় আমার ছোড়দির মাধ্যমে। এক সন্ধ্যায় বাড়ির প্রশস্ত উঠোনে খেজুর পাতার মাদুরে চিৎ হয়ে শুয়ে। আকাশে প্রকান্ড চাঁদ। আমাদের গ্রামের বাড়ির চাঁদে ভোলটেজ বেশি। চিৎ হয়ে খোলা চোখে চেয়ে আছি মানে যে চাঁদ দেখছি এমন নয়। আর বয়সটাও  তেমন নয় যে চাঁদ দেখতে গিয়ে আমি অন্য কিছু দেখে নিচ্ছি। আসলে আমার মন পড়ে আছে রান্নাঘরে। মায়ের খুন্তি নাড়ার শব্দ শুনছি আর ভাবছি কখন ডাক আসবে। রান্না ঘরের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে উঠোনময় আর আমাকে পাগলা করে দিচ্ছে।

আমি আছি নিজের তালে। আর ছোড়দি সারা উঠোনময় ঘুরেঘুরে গুনগুন করে বিদঘুটে কী একটা গাইছে। আমি শুনছিনা আবার শুনছিও। যেমন চাঁদ দেখছিনা আবার দেখছিও। গাইতে গাইতে ছোড়দি আমার পাশে মাদুরে এসে বসল।

এটা কার গান বলত ?

আমি অবলীলায় বলে দিলাম, ফকির মাস্টারের। আমার আত্মবিশ্বাসের হেতু খুবই সোজা। আমাদের গ্রামে গান অনেকেই গায়। কিন্তু গানের মাস্টার একজনই। ওই ফকির মাস্টার। গামছায় হারমোনিয়াম বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে পরবের দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে বড়দের আশীর্বাদ আর দক্ষিণা নিয়ে যেত।

ইস্‌ ভারি ক্ষমতা তোর ফকির মাস্টারের ! ওই তো গানের ছিরি ! যশোদা, মা তোর কৃষ্ণধনকে ছেড়ে দে, গোষ্ঠে নিয়ে যাই।

আমি এবার বুদ্ধি করে চাল দিলাম। তাহলে ঠিক বিকাশদার।

বিকাশদার কথায় ছোড়দি খুব নরম হয়ে গেল। আঙুল দিয়ে শাড়ির আঁচল জড়াতে জড়াতে বলল, বিকাশদা খুব ভালো কবিতা লেখে জানিস ? আমাকে কত কবিতা লিখে দিয়েছে। এই তো সেদিন আমাকে একটা চিঠিতে কী সুন্দর কবিতা লিখেছে – ‘চাঁদ উঠলে তোমার কথা পড়ে ভীষণ মনে। থাকতে ইচ্ছে করে না ছোট্ট ঘরের কোণে। এক ছুটেতে চলে যাই ওই শিয়াকুলের বনে। চাঁদের আলোয় তোমায় দেখি, খেলি তোমার সনে।’ খুব সুন্দর না?

এসব কথার উত্তরে ঘাড় নাড়াই ভালো, সেটা তখনই আমি কিছুটা কিছুটা জেনে গেছি। ছোড়দি খুব খুশি হয়ে আমার কপালে টপ করে একটা চুমু খেয়ে বলল, এসব কথা কাউকে বলবি না কিন্তু।

আমি যথারীতি ঘাড় নাড়ালেও ছোড়দি সেদিকে লক্ষ না করে হঠাৎ টেপি পাগলির মতো থম মেরে গেল। আমার তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না। আমার মনপ্রাণ কান সব রান্নাঘরের দিকে। কিন্তু ছোড়দির হাত থেকে আজ আমার নিস্তার নেই। আমার আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, এরকম গান বিকাশদাও একদিন দেখিস ঠিক লিখবে। সেদিন কত নাম হবে, কত বড় বড় গায়ক ওর গান গাইবে আর …

কী ? আর কী ?

না থাক ওসব কথা। তুই কিছু বুঝবি না। তুই তো একটা হাঁদারাম। এই গানটা কার তাই-ই তো বলতে পারলি না।

ছোড়দি আবার উঠে দাঁড়িয়ে উঠোনময় ঘুরতে ঘুরতে গাইতে লাগল – ‘যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে / চাঁদ উঠেছিল গগনে। / দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কী মহালগনে / চাঁদ উঠেছিল গগনে।’

একসময় নিজে থেকেই বলে দিল। এ গান রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের।

রবীন্দ্রনাথ ! রবীন্দ্রনাথ ! হ্যাঁ, হ্যাঁ – আমাদের কিশলয়ে আছে। কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি। বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি। গাড়ি চালায় বংশীবদন। সঙ্গে যে যায় ভাগনে মদন।

হ্যাঁ, সেই রবীন্দ্রনাথ। বড় হ – দেখবি কত লিখেছে রবীন্দ্রনাথ। এত লিখেছে এক জীবনে পড়ে শেষ করতে পারবিনে। বিকাশদাও কিন্তু এর মধ্যেই সাত – আটটা কবিতা লিখে ফেলেছে। আর দুজনের লেখার মধ্যে এত মিল ! এই চাঁদ নিয়েই ধারনা – একটু আগে তোকে তো আমাকে লেখা চিঠিতে বিকাশদার কবিতাটা শোনালাম। আর রবীন্দ্রনাথের এই গানটা – কত মিল, তাই না ?

আমি বিজ্ঞজনের মতো ঘাড় নাড়ি আবার। ছোড়দি বলল, মাঝেমাঝেই দুজনকে আমি খুব গুলিয়ে ফেলি।

ছোড়দি গুলিয়ে ফেললেও কালের কঞ্জুস হিসেবে কিছুই গুলোয়নি। ছোড়দি এখন আমাদের থেকে কত দূরে। জামাইবাবুর সঙ্গে কখনও হিল্লি, কখনও দিল্লি, কখনও সাসারাম, কখনও ত্রিবান্দ্রাম। রেলের পদস্থ অফিসারের ঘরনি হয়ে সুখে ঘরকন্না করছে। বিকাশদা লুঙি গেঞ্জি পরে সাহাদের মুদিখানায় মাল দেয়। এখন আর কবিতা লেখে কিনা কোনোদিন জিগ্যেস করিনি। আসলে করতে পারিনি।

তখন সদ্য সদ্য রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ ঘটা করে উদ্‌যাপন হয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। তারপর থেকে গ্রামেগঞ্জে সাড়ম্বরে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন শুরু হল। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা বলছি। পঁচিশে বৈশাখের সকাল থেকে আমাদের গোটা গাঁ সরগরম। বাবা – কাকারা তো ছিলই – যারা কোনোদিন ইস্কুলের মুখ দেখেনি তারাও নেমে পড়ত হৈ হৈ করে। যে প্রবল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে অষ্টপ্রহর সংকীর্তন বা গাজন মেলার প্রস্তুতিতে নেমে পড়ত, পঁচিশে বৈশাখেও তার ব্যত্যয় ছিল না। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন এক ভিন্নরকমের ধর্মাচরণ বলে মনে হত। পাটুলির সাধু কিংবা নবদ্বীপের গোঁসাইরা গ্রামে পা রাখলে দু তিন দিন ধরে উৎসব হত। কেমন করে জানি না মানুষের মনে হয়েছিল রবিঠাকুর মানুষটা আরও বড় সাধক। না হলে তাবড় তাবড় লেখাপড়া জানা ছেলে ছোকরারা অত ভক্তি করবে কেন খামোখা ?

রবীন্দ্রজয়ন্তীতে আমাদের সভাপতির পদ বাঁধা ছিল। আমাদের প্রাইমারির সতীশ মাস্টার পার্মানেন্ট অ্যান্ড লাইফ লং সভাপতি ছিলেন। প্রথম কারণ সতীশ মাস্টার সবচেয়ে বেশি চাঁদা দিতেন আর দ্বিতীয়ত কারণে অকারণে প্রায়শই তিনি রবীন্দ্রনাথ থেকে কোট করতেন। গাঁয়ের লোক হাঁ হয়ে যেত তাঁর পান্ডিত্য দেখে। অবশ্য নিন্দুক ঠিকই দু-চার পিস জুটে যেত। আড়ালে বলত, সতীশ মাস্টার আবার পড়ালেখা করল কবে যে রবীন্দ্রনাথ আউরাবে। আসলে নিজের কথাই সময় সুযোগ বুঝেই মনীষী উক্তি বলে চালিয়ে দেয়। যদি দেনও – রবীন্দ্রনাথ কবে বলেছিলেন, কোথায় বলেছিলেন, কাকে বলেছিলেন, কেন বলেছিলেন আমাদের পক্ষে খুঁজে বের করা কঠিন নয়, অসম্ভব ছিল। ন্যাড়া শুধু একবার সাহস করে বলেছিল, এই যে খুড়োমশাই আপনি বললেন, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন শরীর সুস্থ ও নীরোগ রাখতে হলে নিমের কচিপাতার রসের সরবতে কাঁচা ডিম মিশিয়ে চোঁ করে টেনে নিতে হবে – তো আপনি জানলেন কী করে ? নিশ্চয় কোনো বই – এ আছে। বইটার নাম যদি …

আছেই তো !তাবলে ভাবলি কী করে তোদের ক্লাস এইটের পাঠসংকলনে থাকবে? গোমুখ্যু কোথাকার ?

ন্যাড়াও নাছোড় – তাহলে কোথায় থাকবে ?

এদের নিয়ে দেখছি মহা জ্বালাতন ! কোথায় থাকবে ? কোথায় আবার ? তোর মুন্ডুতে তো আর থাকবে না। থাকবে রবীন্দ্র রচনাবলীতে। আঠাশখানা ইয়া ইয়া ভল্যুম। যা খুঁজে বার করগে। আমি বলব কেন কোন্‌ ভল্যুমে আছে। নিজেরা একটু গতর নাড়া।

ন্যাড়া তারপর আর কোনোদিন বেলতলায় যায়নি।

বলাবাহুল্য, আঠাশ ভল্যুমের রচনাবলীর কথা শুনে আমরাও আর বিশেষ ঘাঁটাইনা সতীশ মাস্টারকে। তার থেকে সভাপতির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মেনে নেওয়া অনেক সুবিধেজনক। গান, কবিতা পাঠ, হাস্যকৌতুকের ফাঁকে ফাঁকে সভাপতির আসনে খুচুর খুচুর করে পা নাচাতে নাচাতে মাস্টার খন্ড খন্ড মণিমুক্তো ছড়াতেন রবীন্দ্রনাথের বাণী হিসেবে। তার জন্যে অবশ্য কোনো চিরকুট কিংবা বই এর দরকার হত না। সবই তার মগজে থরে থরে সাজানো ছিল।

গান – আবৃত্তিই বেশি হত। বক্তৃতা কম ছিল। কম মানে মাত্র একখানিই। এই কর্মটি পাকাপাকিভাবে করতেন কমল জ্যাঠা। ধুতি এবং খদ্দরের পাঞ্জাবি শোভিত জ্যাঠা নিষ্ঠবান কংগ্রেসি ছিলেন। বক্তৃতাটিও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে দিতেন। প্রতি বছর একই কথা একই ভঙ্গিতে বলতেন। সেই বক্তৃতা আমাদের পুরোপুরিই কমা, সেমিকোলন সহ মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। ভঙ্গিটি ছিল অনবদ্য। থেকে থেকেই দীর্ঘস্থায়ী গ্যাপ। নিন্দুকের অভাব বঙ্গদেশে কোনোকালেই ছিল না। পরবর্তী সময়ে দুরন্ত বাগ্মী শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীকেও অনেকটা এইরকম ভঙ্গিতে বক্তৃতা করতে শুনেছি। অথচ জ্যাঠার ক্ষেত্রে কেউ কেউ বলত, সেটা নাকি ক্ষুদ্র বক্তৃতাকে বৃহৎ করার অপচেষ্টা। সে যে চেষ্টাই হোক জ্যাঠার বক্তৃতা এখনো আমার অন্তস্তলে গেঁথে আছে।

রবীন্দ্রনাথ – শুধু কবি ছিলেন না –শুধু গীতিকার ছিলেন না – শুধু গল্প লেখক ছিলেন না – শুধু নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ছিলেন না – শুধু শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না – তিনি ছিলেন – তিনি ছিলেন …

এইখানে গ্যাপটি দীর্ঘতর হত। আমরা সমস্বরে পাদপূরণ করতাম – তিনি ছিলেন বিশ্ববিবেক। বিশ্ববিবেক কী বস্তু আমরা কেউই জানিনা। প্রতিবছর শুনে শুনে আমার ধারনা হয়ে গিয়েছিল সেটি অতিশয় কিছু হবে নিশ্চয়।

আমাদের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে জ্যাঠা বলতেন, রাইট। তারপর আবার টানা শুরু করতেন।

রবীন্দ্রনাথ শুধু শান্তিনিকেতনের নন – শুধু বাংলার নন – শুধু ভারতের নন – শুধু এশিয়ার নন – শুধু পৃথিবীর নন …

এই বিপজ্জনক বাঁকের মুখে আমরা দু হাত তুলে তারস্বরে চেঁচাতাম, আর নেই জ্যাঠামশাই, আর নেই।

জ্যাঠার মুখে আবার সেই মৃদু হাসি।

তিনি বিশ্বের কবি। তিনি বিশ্বকবি।

এরপরেও আর এক কিস্তি আছে আমরা জানতাম।

তিনি শুধু শ্রমিকের নন – তিনি শুধু কৃষকের নন – তিনি শুধু কামারের নন – তিনি শুধু কুমোরের নন – তিনি শুধু ছুতোরের নন – তিনি আমার –আপনার সকলের – তিনি সর্বজনীন – তিনি…

ফিনিশিং টাচটি আমাদের। হৈ হৈ করে উঠে দাঁড়িয়ে সমস্বরে, তিনি সর্বভূতে বিরাজমান। যদিও এই ভূত শব্দটিতে আমার যথেষ্ট আপত্তি ছিল। কিন্তু ছোটদের পছন্দ – অপছন্দে বড় তথা বৃদ্ধ তথা জ্ঞানবৃদ্ধদের কী-ই বা যায় আসে।

শেষ করার আগে রবীন্দ্রনাথের বাঁধানো ছবির দিকে ফিরে দুই হাত বুকের কাছে জড়ো করে জ্যাঠা আবেগমথিত কন্ঠে গাইতেন,

ভবসাগর তারণ কারণ হে

গুরুদেব দয়া করো দীনজনে।

গান শেষে সভাপতি সতীশ মাস্টার হাততালি দিয়ে মাইক টেনে নিয়ে বলতেন, একটা অপূর্ব রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শোনালেন আমাদের সর্বজন শ্রদ্ধেয় কাকাবাবু। আমাদের তরফ থেকে তাঁকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।

ছোটবেলায় যা হয়েছে বাদ দিই। রবীন্দ্রসংগীত যে কী বিষম বস্তু এখন টের পাচ্ছি হাড়েমজ্জায়। অন্যের কথা ছেড়ে নিজের বাড়ির কথা–ই বলি। আমি দোতলার একটি ঘরে একাকী দিন কাটাই। নীচের তলায় আমার সর্বক্ষণের কাজেকম্মের দুজন মহিলা বাস করে। সন্ধের আগেই রান্নাবান্নার পাট চুকিয়ে দুই সখি খাটের উপর গুছিয়ে বসে টিভি সিরিয়াল দেখতে বসে যায়। লোমহর্ষক সেসব সিরিয়াল চলাকালীন আমি পারতপক্ষে নীচে নেমে রসভঙ্গ করতে চাই না। তবুও জরুরি প্রয়োজনে একদিন টিভি’র ঘরে আমাকে যেতে হয়েছিল। সেই গমন এবং তৎপ্রতিক্রিয়া নিয়েই আমার এবারের এপিসোড।

দুজনের একজনের বয়স কম এবং বুদ্ধিও কম। অন্যজন বেশি বয়সের এবং পাকামাথার। সিরিয়াল বোদ্ধা হিসেবে কেউই কম নয়। একদিন খাওয়াদাওয়ার পর ছাদে একটু পায়চারি সেরে সবে বিছানায় টানটান হয়েছি, নীচ থেকে প্রচন্ড চেঁচামেচির শব্দ। আমি উদভ্রান্তের মতো অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে বুঝলাম শোয়ার ঘরের বন্ধ দরজার ওপার থেকেই উত্তেজিত কন্ঠ ভেসে আসছে। অবৈধভাবে দরজায় কান পেতে যা শুনলাম তাতে খুব পুলকিত না হলেও আশ্বস্ত হলাম।

কম বুদ্ধি : রাহুলের সঙ্গে সুপর্ণার পেম হয়েচে।

পাকামাথা : মোটেই পেরেম হয়নি। একে বলে চিটিংবাজি।

না, পেম। পেম না হলে …

না, পেরেম না। তুই পেরেমের কী বুঝিস ?

আমি বুজব না, তুই বুজবি ! সারা জেবনে দুগন্ডা পেম করেচি।

তোর গুলাও পেরেম না। সব চিটিংবাজি। না হলে তোকে আজ পরের বাড়ি বাসন মাজতে হত নি।

আমার অবশ্য এবারের বিষয় পেম তথা পেরেম কিংবা চিটিংবাজি কোনোটিই নয়। আমার আজকের মক্কেল রবীন্দ্রনাথ। তাই পেম – পেরেম নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে রবীন্দ্রনাথে ফিরে আসি।

সিরিয়ালে খুব গানটান হয়। টিভির সাউন্ড এতই চড়া থাকে যে উপরের ঘরে বসেও আমার কানে আসে। কানে আসে কিন্তু কর্ণপাত করি না। সেদিন হঠাৎ একটি গান আলতো ভেসে এসে কান তো বটেই প্রাণমন জুড়িয়ে দিল। ভীমপলশ্রী রাগে নিখুঁত স্বরক্ষেপণে পুরুষ কন্ঠের রবীন্দ্রসংগীত আমাকে টেনে আনল নীচতলার সিঁড়ির মুখে। মগ্ন হয়ে শুনছি ‘বিপুল তরঙ্গ রে, বিপুল তরঙ্গ রে। সব গগন উদবেলিয়া – মগন করি অতীত অনাগত / আলোকে – উজ্জ্বল জীবনে – চঞ্চল একি আনন্দ – তরঙ্গ।’

সঙ্গত বা অসঙ্গত যে কারণেই হোক গানটি একেবারেই পছন্দ নয় কমবুদ্ধির।

কী এক ছ্যাড়াব্যাড়া গান শুরু করল, পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে শুনে।

পাকামাথা আঁতকে ওঠে। কী বললি ? ছ্যাড়াব্যাড়া ! খবরদার আর বলবি নি। দাদা শুনলে রক্ষে রাখবে নি। এসব ঠাকুরের গান। দাদা রোজ সন্ধেবেলায় হারমোনি বাজিয়ে গায় শুনতে পাসনি ?

কম বুদ্ধি বোধহয় সত্যি সত্যিই একটু ভয় পেয়েছে। নরম করে বলল, দাদা তো রবিসংগীত গায়। হাউজিং–এর ফানসিনে খুব হয়।

রবিসংগীত বলে অছেদ্দা করার কী আছে ? আরে বাবা রবিসংগীতই হল গিয়ে আসল ঠাকুরের গান।

কদিন পরে সান্ধ্যকালীন সিরিয়ালের মধ্যে আমাকে একটি জরুরি কাজে নীচে টিভির ঘরে যেতে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে তখন সিরিয়ালের নায়িকার কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছিল ‘আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইল না কেহ।’ গানের চেহারা চলন দেখে কমবুদ্ধিও বুঝে গেছে কোনটি ঠাকুরের গান আর কোনটি লারেলাপ্পা। আমাকে ঢুকতে দেখেই চোখ বন্ধ করে ভক্তি সহকারে দুই হাত সেই যে কপালে ছোঁয়াল আমি না বেরিয়ে আসা পর্যন্ত ধ্যান আর ভাঙল না।

যে যাই বলুন আর লিখুন রবি ঠাকুরের অত বড় ভক্ত আমি আর দেখিনি। এ জীবনে দেখব বলেও মনে হয় না। আমার অফিসের বড়বাবু কুসুমকোমল সমাদ্দারের কথা বলছি। অফিসে ঢুকেই প্রথমে ঝোলা ব্যাগ থেকে আগামুড়ো ছাঁটা বিবর্ণ শতচ্ছিন্ন গীতবিতান টেবিলের উপর রাখতেন। তারপর একবার, দুবার, তিনবার ডান হাতের তর্জনি দিয়ে গীতবিতান আর নিজের ললাট ক্রমান্বয়ে স্পর্শ করতেন মন্ত্রোচ্চারণের মতো বিড়বিড় করে কিছু বলতে বলতে। তারপর বাকি কাজ। জলের বোতল বের করা, মুকুন্দকে চা আনতে বলা, হাজিরা খাতায় সই করা, সেকশানের সকলের ভালোমন্দ খবর নেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপর ফাইল খুললে বড়বাবুকে আর দেখে কে ! ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে অদৃশ্য কোনো প্রতিপক্ষের উদ্দেশে এমন কিছু ঝাড়াই বাছাই করা বিশেষণ প্রয়োগ করতেন যা লিখলে বাংলা সাহিত্য নতুন করে অশুদ্ধ হওয়ার কিছু নেই। আবার কোনো কোনো ফাইল ওলটানোর সাথে সাথে কোনো অজানা ভাগ্যাহতর উদ্দেশে সহানুভূতিসূচক অভিব্যাক্তি প্রকাশ করছেন। খুচুর খুচুর করে নোট লিখছেন। মার্কার দিয়ে দাগাচ্ছেন আর বীর বিক্রমে স্বাক্ষর করে দড়াম করে পাশে রাখা বাস্কেটে ফেলছেন। আমরা আড়চোখে সবই শুনতাম দেখতাম। কিন্তু তখন কোনো কথা বলা যাবে না। মহিলা – পুরুষ কারোরই তখন রেহাই নেই। চ-কার ব-কার-এর হরকা বানে ভাসিয়ে নিয়ে যাবেন।

খান দশেক ফাইল দেখার পর গীতবিতান খুলে বসতেন। তারপর কখনো সুরে কখনো গলা খুলে, কখনো চেপে, টেবিলে দুই হাতে তাল দিতে দিতে রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। প্রতিটি গান শেষে তারিফ করতেন, আহাহা। অপূর্ব। নিজের দক্ষতাকে নাকি গানের কথা সুর ভাবকে সেটা উহ্যই থাকত।

কবিপক্ষ পড়ে গেলে তাঁর ভাবাবেগ চড়ে যেত। তখন কাউকেই রেয়াত করতেন না। আমরাও পারতপক্ষে ঘাঁটাতাম না। একবার চব্বিশে বৈশাখের বিকেলে তিনি একটি গানের সুরকে কব্জায় আনার চেষ্টা করছেন। এই গানটি আগামীকাল পাড়ার অনুষ্ঠানে পরিবেশন করার ইচ্ছা। মোটামুটি পাকড়ে ফেলেছেন কি ফেলবেন এমন সময় মিসেস প্রতিমা কারফারমা এসে বললেন, যান বড়সাহেব তলব করেছেন।

গুনগুন করতে করতেই বড়বাবু বললেন, মারিয়েছে।

মিসেস কারফারমা এসব অনেকদিন থেকেই শুনে আসছেন। তাছাড়া তিনিও কিছু কম নন, বড়সাহেবের খাস পেয়াদা। বেয়াদবি শুনবেন কেন ?

সে পরে দ্যাখা যাবে। এখন তো আগে সামলিয়ে আসুন।

সায়েব রেগে টং। লেজারের সাথে ব্রডশিট ট্যালি করছে না।

এতক্ষণে বড়বাবু গান থামিয়ে একটি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। চোখে মুখে গোটা শরীরে প্রচন্ড হতাশা।

কান্ডখানা দেখলেন। কাল পঁচিশে বৈশাখের পুণ্য দিবস। আজ বিকালবেলাতেও মানুষ তাঁকে একটু স্মরণ করবে না ! আরে বাবা, রবি ঠাকুরকেই যদি দেশ – জাতি ভুলে যায় তাহলে লেজার ব্রডশিটে মিলন হলেই বা কী আর ফাঁক হয়ে গেলেই বা কী !

ব্যাজার মুখে বড় সাহেবের ঘর থেকে ফিরে আবার গীতবিতান নিয়ে পড়লেন। আজ বড়সাহেব কেন বড়লাটও বড়বাবুকে সামলাতে পারবে বলে মনে হয় না। আবার আগের মুডে ফিরে এসেছেন। গুনগুন করতে করতেই আমার দিকে ফিরে বললেন, এই লাইনটার কথা ভাব তো একবার। পুরো ব্রক্ষ্মান্ডদর্শন হয়ে যাবে। কী – না, দিন শেষে দেখি ছাই হল সব হুতাশে হুতাশে। তোরা যে কীসব আলফাল লিখিস – কী হবে আর ওসব লিখে ? মানুষের মনের গভীর গোপনে যা যা আছে সব কিছু বানচোত লিখে দিয়ে গেছে তোদের অনেক আগেই।

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ