23 May

নজরুল ইসলাম

লিখেছেন:অন্নদাশঙ্কর রায়


পনের বছর বয়সে আমি ‘প্রবাসী’র গ্রাহক হয়ে দেখি, প্রথম সংখ্যাতেই প্রকাশিত হয়েছে দু’পঙক্তির একটি কবিতা, পৃষ্ঠার একেবারে তলায়। কবির নাম হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম। কবিতার দ্বিতীয় পঙক্তির শেষ অংশ ছিল – ‘পশবে তোর ও নাসায়।’ তারপর কেটে গেছে আশি বছর। যতদূর মনে পড়ছে, কবিতাটি ছিল হাফিজের কোনও প্রেমের কবিতার মর্মানুবাদ। এর আগে কাজী নজরুল ইসলামের অন্য কোনও রচনা দেখিনি। আমার কাছে এটাই তাঁর প্রথম পরিচয়।

বছর দুই বাদে ‘প্রবাসী’তেই পুনমুদ্রিত হয় ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘বিদ্রোহী’।

‘ বল বীর –

বল উন্নত শির,

শির নেহারি’ আমার নত শির ওই

শিখর হিমাদ্রির।’

অত দীর্ঘ কবিতা। তবু মনে রাখবার মতো। এ কবিতা আমাকে মাতিয়ে তোলে। আমি নজরুলের ভক্ত হয়ে যাই। বন্ধুমহলে এর প্যারোডি শোনা যায় –

‘আমি রোম নগরের পোপ

আমি সীতা খিলিয়ানির গোঁফ।’

সীতা খিলিয়ানি ছিলেন শান্তিনিকেতনের এক সিন্ধি ছাত্রী। এছাড়া আরও অনেক প্যারোডি বেরিয়েছিল। সবই মজাদার। যাই হোক, কাজী নজরুল একদিনেই বিখ্যাত হয়ে গেলেন। সকলেই বলত বিদ্রোহী কবি নজরুল।

কোথায় যেন এক কপি ‘ধূমকেতু’ আমার চোখে পড়ে। নজরুল সম্পাদিত সাপ্তাহিক পত্রিকা। তাতে ছিল তাঁর পুত্রশোকের কবিতা। ‘ওরে খোকা, ওরে আমার পলাতকা।’ এইটে সম্পূর্ণ অন্যরকম কবিতা।

এরপরে তাঁর ‘অগ্নিবীণা’ গ্রন্থখানি বেরোয়। আমি কিনি। সবাই কাড়াকাড়ি করে পড়ে।

আনোয়ার! আনোয়ার!

এই পর্যন্ত মনে আছে। এরও প্যারোডি বেরোয়। আর একটি কবিতার এক পঙক্তি–‘এ কি রণবাজা বাজে ঘনঘন ঝন রণ-রণ রণ ঝন-ঝন’ ইত্যাদি। এখন সব মনে পড়ছে না, কিন্তু তখন সব মুখস্ত হয়ে যায়। এটা বোধহয় ‘মহরম’ বা ‘আগমনী’র কবিতা।

এরপর কী যেন লেখেন। তঁকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর নামে ‘বসন্ত’ নামে একটি পুস্তিকা উৎসর্গ করেন।

আমি তখন পাটনা কলেজের ছাত্র। কটক থেকে পাটনায় যাওয়া আসার সময় একদিন কি দুদিন কলকাতায় থামি। কাজী নজরুল ইসলামকে প্রথম দেখি অ্যালবার্ট হল্-এ ফরাসের উপর হারমোনিয়াম নিয়ে বসে গান করতে। ‘হে ভাই চাষি ধর কষে লাঙল, হে ভাই মজুর, ধর কষে শাবল’। দূর থেকে তাঁকে দেখি। কথা বলার সুযোগ হয়নি। ‘অগ্নিবীণা’র পর তাঁর আর একখানি বই বেরোয়, ‘দোলনচাঁপা’। সেটিও কিনি। তার সুর একেবারে অন্যরকম। প্রেমের কবিতা। এরপরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারিনে। ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের শিক্ষানবিশ হয়ে বিলেত চলে যাই। সেখানে এক ছাত্রের মুখে শুনি ‘কে বিদেশী মন উদাসী বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে’। শুনলুম ওটা নাকি গজল। কাজী তখন কবিতা ছেড়ে গজল লিখছেন।

বিলেত থেকে ফিরে বহরমপুরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগ দিই। ইতিমধ্যে অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে আমার বিলেত প্রবাসকালে পত্রযোগে বন্ধুত্ব হয়েছিল। দেশে ফেরার পর তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। তাঁর বিবাহ উপলক্ষে তাঁর দাদার বাড়িতে বরযাত্রীদের মধ্যে আমিও উপস্থিত ছিলুম। সে সময় কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আমাদের আলাপ হয়। তাঁর পরনে গেরুয়া ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় – যতদূর মনে পড়ে – রুদ্রাক্ষের মালা। দেখে মনে হয় একজন সাধক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর প্রকাশক গোপালদাস মজুমদার, ডিএম লাইব্রেরির স্বত্বাধিকারী। গোপাল বলেন, কাজীর বই বেশিরভাগ মুসলমানরাই কেনে। কাজী বলেন, না, না, বেশিরভাগ হিন্দুরাই কেনে। কে একজন প্রশ্ন করেন, অন্নদাশঙ্কর আজকাল কী লেখেন। কাজী চটপট উত্তর দেন, তিনি রায় লেখেন। অচিন্ত্যর বিয়ে নিয়ে খুব হাসিতামাশা করেন। অচিন্ত্যর প্রথম বইখানির নাম ছিল ‘বেদে’। পরে তার একটি বইয়ের নাম ‘বিবাহের চেয়ে বড়’। কাজী তামাশা করে বলেন, অচিন্ত্য আগে বলত, ‘বে দে’, ‘বে দে’। বিয়ের পরে দেখে, ‘বিবাহের চেয়ে বড়’। ইঙ্গিতটা অশ্লীল। হাসাহাসি পড়ে যায়।

গোপালবাবু সেদিন আমাকে বলেন, আপনি আমাকে একখানি উপন্যাস দিন। তখন ‘বিচিত্রা’য় আমার ‘যার যেথা দেশ’ শুরু হয়েছিল। সেটা সম্পাদক উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের উপরোধে। ইতিমধ্যে ‘অসমপিকা’ লেখা হয়ে গিয়েছিল। সেটা সুধীরচন্দ্র সরকারের অনুরোধে, এরপরে আরও একখানি উপন্যাস লিখতে হবে শুনে প্রথমটায় নারাজ হই। তারপরে লিখি ‘আগুন নিয়ে খেলা’। তখনও আমার বিয়ে হয়নি। ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছ’ সপ্তাহের মধ্যে লেখা হয়ে যায় ও সঙ্গে সঙ্গে বই হয়ে বেরিয়ে যায়। তার কিছুদিনের মধ্যে আমার বিয়ে। ভাগ্যিস গোপালদাসবাবু রয়্যালটি হিসেবে কিছু টাকা দেন। সেটা বইয়ের আংটি ও শাড়ি কিনতে খরচ হয়।

কাজী নজরুলের সঙ্গে আমার এর পরে কোনওদিন দেখা হয়নি। সেদিন অচিন্ত্যর বিয়েতে আমি তাঁর সহযাত্রী হইনি। বহরমপুর ফেরার জন্য আমার তাড়া ছিল। দেখলুম তিনি রসিকপুরুষ। কিন্তু সেই সঙ্গে গেরুয়া পরা হিন্দু সাধক। তিনি হিন্দু কি মুসলমান তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। বরং দেখে মনে হল হিন্দুর ভাগটাই বেশি।

শুনেছিলুম নলিনাক্ষ সান্যালের বিয়ের সময়ও নজরুল ছিলেন বরযাত্রী। মুসলমান বলে তাঁকে আলাদা ঠাই দেওয়া হয়। তখন নলিনাক্ষ বলেন, কাজীকে আমার পাশেই বসতে দিতে হবে। না হলে আমি বসব না। তখন কাজীকে তার পাশে বসতে দেওয়া হয়। আর আপত্তি ওঠে না।

কাজীকে হিন্দু ছেলেরা কাজীদা বলত। মুসলমান বলে বাছবিচার করত না। তিনিও শ্যামাসঙ্গীত লিখতেন, লোকে তা ভালবাসত।

একবার চট্টগ্রামে কর্মরত এক হিন্দু ভদ্রলোক এসে বললেন, তিনি তারাচরণ পরমহংসের শিষ্য। তাঁর গুরুর নামে কাজী নজরুল ইসলাম একটি গান লিখে দিয়েছেন। গানটি আমাকে দেখালেন। পড়ে দেখলুম, হিন্দু সাধন মার্গের গান। যিনি লিখেছেন তিনি তন্ময় হয়ে লিখেছেন। বোঝবার উপায় নেই যে তিনি ভিন্ন ধর্মাবলম্বী।

বহুদিন পরে আমি যখন ময়মনসিংহে, একদিন দেখি যে আমার কর্মচারীদের মধ্যে কয়েকজন হিন্দু হার্মোনিয়ম নিয়ে বসেছেন। গানের কথাগুলি আমার মনে নেই। তবে ভাবটা এই যে কাজী তুমি নজরুল তুমি আরোগ্য লাভ করো। তোমার জন্য আমরা উদ্বিগ্ন। এ ঘটনাটা পার্টিশনের কিছুদিন আগেকার। আমি জানতে চাই, কাজী নজরুলের কী হয়েছে। তাঁরা বললেন যে কাজী এখন গুরুতর অসুস্থ, তাঁর মুখে কথা নেই।

পার্টিশনের পরে আমি একটি কবিতা লিখি নজরুলকে নিয়ে।

‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল।

আর সব কিছু ভাগ হয়ে গেছে

ভাগ হয়নি কো নজরুল।

এই ভুলটুকু বেঁচে থাক।

বাঙালি বলতে একজন আছে

দুর্গতি তাঁর ঘুচে যাক’।

তখনও আমার বিশ্বাস ছিল যে তিনি সেরে উঠবেন। তাঁকে সারিয়ে তোলার জন্য চেষ্টাও হয়েছিল। কাজী আবদুল ওদুদ ও রবিউদ্দিন আহমেদ তাঁকে নিয়ে ভিয়েনায় গিয়েছিলেন। ডাক্তার নাকি বলেন যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও তাঁর অবস্থার উন্নতি হয় না। একদিন কলকাতায় আমি কী একটা উপলক্ষে রবীন্দ্রসদনে গিয়েছি। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় নজরুলের পুত্রবধূ কল্যাণী কাজী এসে আমাদের পায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার কান্নার কারণ তার ভাশুর সব্যসাচী গিয়েছিল পিতার মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায়। তাকে বিমানবন্দরে আটক করে রাখা হয়। ছাড়া পাওয়ার পর সে গিয়ে দেখে মৃতদেহ গোর দেওয়া হয়ে গেছে। তাকে একমুঠো মাটি দেবারও সুযোগ দেওয়া হয়নি। আমরা তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করি। বুঝতে বাকি থাকে না যে সব্যসাচীকে তার পিতৃকৃত্য থেকে বঞ্চিত করা ইচ্ছাকৃত। কাজী নজরুল তখন আর বাঙালি নন, তিনি মুসলমান। মুস্লমানের ছেলের নাম সব্যসাচী কেন? হতে পারে বাঙালি, কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাঙালিত্বের কদর নেই যেমন মুসলমানত্বের।

এইখানে বলে রাখি যে নজরুলের স্তস্রীর নাম প্রমীলা, পুত্রদের নাম সব্যসাচী ও অনিরুদ্ধ। পুত্র বধূদেরও নাম হিন্দু, কিন্তু পদবী কাজী। এই পরিবারের প্রথা এখনও সেইরকম। হিন্দু মুসলমানের সমন্বয় এইভাবে হয়েছে।

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ