27 Jun

কুশল সংবাদ

লিখেছেন:অনিলেশ গোস্বামী


কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী বাড়ির সামনে রাস্তার ওপর হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলেন। পরের দিন পাড়ার মোড়ে হারুবাবুর সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করলেন।

শুনলাম আপনার স্ত্রী নাকি পড়ে গিয়েছেন ?

আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন।

ওঃ কি সাংঘাতিক। আমার ভায়েরাভাইকে চেনেন তো ? ঐ যে জেমস ফিন্‌লের বড়বাবু, রির্টায়ার করতে এখনো বছর দশেক। আগে এদিকেই থাকতেন। এখন কোন্নগরে নতুন ফ্ল্যাটে চলে গেছেন। বেশ বড়, তিনকামরা, বসার ঘর ছাড়া। তার বোনকেও দেখেছেন নিশ্চয়ই। বয়স খুব কম নয়, বিয়েটিয়ে করেনি যদিও… দেখতে এখনো বেশ। বিয়ে হয়ত আর করবে না।

আমি যাচ্ছি, তাড়া আছে।

দাঁড়ান, সবটা শুনে যান। বোনটা দেমাকি, কাউকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। গত সপ্তাহে একদিন দুম করে বাড়ির মধ্যেই পড়ে গেলো। আরে বাবা, পড়বে নাই বা কেন ? পড়ার আর দোষটা কি ? একদিন দেখি জানলার দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গেয়ে যাচ্ছে। কী ধরনের গান আন্দাজ করতে পারেন ?

না, কেমন করে পারব, এবার চলি।

এরপর কানের কাছে মুখটা নামিয়ে ফিসফিস করে

মশাই, সব ভালবাসার গান। বুঝুন, এই বয়সে ……

তার জন্য আপনার অসুবিধা কোথায় ? এই বলে আর দাঁড়াইনি। পা চালিয়ে চলে গেলাম।পরের দিন রবিবার। বাজার করে ফেরার পথে নীলরতন চ্যাটার্জি ওরফে নীলুবাবুর সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখেই দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখটা বেশ গম্ভীর করে খপ করে হাতটা চেপে ধরে বললেন,শুনলাম আপনার বৌ নাকি পড়ে গিয়েছেন ?

হ্যাঁ

আহা কি দুর্ভোগ। ফ্র্যাকচার ট্র্যাকচার নয়তো ? আপনি নিজে ভাল আছেন তো ?

পরপর দুটো প্রশ্নের মধ্যে কোনো যোগসূত্র খুঁজে পেলাম না। শুধু বললাম কেন আমার আবার কি হবে। দেখছেন তো ভালই আছি।

নীলুবাবু একটু মুচ্‌কি হাসলেন। একটু রহস্যময় মনে হলো। বললেন, সে তো নিশ্চয়ই। ও হ্যাঁ, সেদিন আপনার সঙ্গে রাস্তায় এক মহিলাকে দেখলাম, আত্মীয় টাত্মীয় নাকি ?

না, না, উনি আমার বান্ধবী।

বলেন কি, আপনার কি আরো অনেক ……

আজ্ঞে হ্যাঁ।

আপনার বৌ এসব জানেন ?

কেন জানবে না। এদের অনেকের সঙ্গে তারও খুব ভাব। এসব নিয়ে লেগ পুল করে, অনেক কিছু বলে।

সে ঠিক আছে। বৌ-রা ওরকম বলেই থাকে। বৌ-দের কখনো সিরিয়াসলি নেবেন না। যাক্‌ এবার বলুন উনি কবে এবং কখন পড়ে গেলেন ?

গত শনিবার রাতে।

ওরে বাবা, সাংঘাতিক সর্বনাশ।

কেন, হঠাৎ বেশি সর্বনাশ কেন ?

আবার জিজ্ঞেস করছেন কেন ? এই সামান্য ব্যাপারটা জানেন না ? একে শনিবার তার ওপর ভরা অমাবস্যা। এই সময় পড়ে যাওয়া, সর্বনাশ আর বাকিটা কি থাকলো। গতবছর ঠিক এই সময় এই যোগাযোগে আমার মাসিমা পড়ে গিয়েছিলেন। মেসোমশাই অফিসের কাজে ট্যুরে। অনেকদূর, কারগিলে, কারগিল মনে আছে তো ? যেখানে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই ……

আর সহ্য হচ্ছিল না। সুমিতা বিছানায় শোওয়া। বিকেলে এক্স রে হবে। অনেক রকম চিন্তা। কোনোরকমে নীলুবাবুর মেসোর কাহিনী অসমাপ্ত রেখে পালিয়ে গেলাম।

পালাতে চাইলেও সব সময় পালানো যায় না। “পালাবার পথ নেই, তোর যম আছে পিছে” গানটা মনে এল। বিকেলে গেলাম একটু দূরে। অ্যাম্বুলেন্সের জন্যে। এক্সরে করার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। ঐ দিকে আমার এক বন্ধু আছে, সুদীপ। রাস্তায় তার জ্যাঠামশাইকে দেখতে পেলাম। অনেকদিন রিটায়ার করে গেছেন। দীর্ঘদিন একটি বিখ্যাত কলেজে ফিজিক্‌সের অধ্যাপক ছিলেন। বেশ রাশভারী জাঁদরেল গোছের মানুষ। ওনাকে দেখেও চলে যাচ্ছিলাম। নিজেই আমাকে ডাকলেন, গম্বীর গলায়।

ওহে দাঁড়াও, শুনলাম বৌমা নাকি পড়ে গিয়েছেন ?

ঠিকই শুনেছেন।

হঠাৎ কী এমন হলো যে দুম করে পড়লেন ?

সেটা কেমন করে বলবো, এখন যাচ্ছি।

আরে যাবে তো বটেই। এক্সরে হয়েছে ? তবে যেখানে সেখানে এক্সরে করিও না। হয়ত শুনেছিলে তোমার জ্যাঠাইমা দু বছর আগে ঠিক এই সময় পড়ে গিয়েছিলেন। তবে এর পেছনে একটা মস্ত কারণ ছিল। সেদিক থেকে দেখলে বলব অল্পের ওপর দিয়েই গিয়েছিল। ফ্র্যাকচারও অবশ্য হয়েছিল। কিন্তু তার তো বাঁচার কথাই ছিল না। ঘটনাটা শোনো ……

আজ্ঞে, শুধু পড়েই গিয়েছিলেন তো। ফ্র্যাকচার, ঠিকঠিক অপারেশন নিশ্চয়ই হয়ে গেছে। কিন্তু বাঁচার কথা আসছে কেন ? আচ্ছা এবার আমায় যেতে হবে। একটু তাড়া আছে। অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছি।

আরে যাবে তো বটেই ঘটনাটা না শুনেই চলে যাবে নাকি। আরে বাবা বৌমাও পালাচ্ছেন না, তুমিও পালাচ্ছো না আর তোমার অ্যাম্বুলেন্সও পালাচ্ছে না। জ্যাঠাইমা কেন পড়ে গেলো সেই কারণটা তোমারও জানা দরকার।

আমার অবস্থা আরো করুণ হয়ে গেল। এই বৃদ্ধকে কী করে বোঝাবো জ্যাঠাইমার দু বছর আগে পড়ে যাবার কারণ বা রহস্য জানার জন্যে আমার কোন আগ্রহই নেই। উপরন্তু নিজের জরুরী প্রয়োজনে সময় নষ্ট হচ্ছে। সুমিতা বিছানায়। কিন্তু জ্যাঠামশাই নাছোড়বান্দা।

তুমি হয়তো জানো প্রতি বছর আমার বাড়িতে খুব ধুমধাম করে কালীপুজো হয়। সঙ্গে পাঁঠাবলি। পুজোটা আমি নিজেই করি, অন্য কাউকে ডাকি না কারণ এ পূজোয় সামান্য ত্রুটি হলেও গৃহস্থের সর্বনাশ হয়ে যায়। দুবছর আগে হলো কি …… ওঃ মনে পড়তেই আমার বুকটা এখনো ধক্‌ধক্‌ করছে। হাতটা দিয়ে দেখো…

এই বলে উনি নিজেই আমার হাতটা ধরে ওনার বুকে চেপে ধরলেন। আমি বললাম,বাকিটা না হয় পরে শুনবো।

উনি আমার হাতটা ধরেই থাকলেন।

ওহে আসল ঘটনাটাই তো এখনো বলিনি। তা সে বারেও পূজোর আয়োজনে কোন খামতি ছিল না। পুজো শুরু হল, বাড়ি ভর্তি লোক। কিন্তু পাঁঠাবলি দিতে গিয়েই হল অঘটন। পাঁঠাটা এক কোপে কাটা গেল না। আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম। বাড়িতে কান্নার রোল, সবাইয়ের মুখ ভয়ে চুপসে গেল। অমন একটা উৎসবের বাড়িতে হঠাৎ শ্মশানের নিস্তব্ধতা।

কেন ?

জিজ্ঞেস করছো কেন ? জানো না এই ত্রুটি দেবী ক্ষমা করে না। এই রক্তপিপাসু রেগে যাওয়ার মানে পরিবারের একজনকে খাবে, তবে সে শান্ত হবে। এরপর আমার সব কাজকর্ম মাথায় উঠলো। আমার পরিচিত বিখ্যাত এক কালীসাধক যিনি আবার সিদ্ধপুরুষ তাকে হাতে পায়ে ধরে নিয়ে এলাম। তিনি বিশেষ একটি পুজো শুরু করলেন আর আমি নিজে সাতদিন ধরে হত্যে দিলাম। তারপরে বুঝতে পারলাম দেবীর ক্রোধ প্রশমিত হল তবে একটুও শাস্তি হবে না সেটা তো হতে পারে না। তাই তোমার জ্যাঠাইমা খাট থেকে পড়ে গিয়ে পা ভাঙলেন বটে কিন্তু প্রাণে বেঁচে গেলেন।

আমি নিজে বিপদের কথা কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে গিয়ে ভাবছিলাম সারা জীবন বিজ্ঞান পড়ে এবং পড়িয়ে অধ্যাপকের এ কী পরিণতি। এই অন্ধবিশ্বাস আর মানসিক কুপমন্ডুকতার থেকে বেরিয়ে আসার আর তো বয়স নেই।

আরে তুমি মন দিয়ে শুনছো না ?

আজ্ঞে শুনছি তো। ঐ যে এক কোপে …… । তবে এবার না গেলে অ্যাম্বুলেন্সটা পাবো না।

পাবে, ঠিকই পাবে। তবে সেখানে যাবার আগে ঐ দিকে বিপত্তারিনীর মন্দিরে গিয়ে মানত করে যাও। জানো তো এ দেবী ভীষণ জাগ্রত।

মনে মনে বললাম আমি জানি না, জানতেও চাই না। আমি শুধু জ্যাঠামশায়ের নির্দেশিত পথের উল্টোদিকে তীর বেগে হাঁটতে শুরু করলাম।

কিছুক্ষণ পরে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে যখন বাড়ি ঢুকছি, পাড়ার এক দাদা দ্রুত এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো, কি হোল, সুমিতা নাকি রাস্তায় ভীষনভাবে পড়ে গিয়েছে ?

আমি বেশ চেচিয়ে বললাম। বালাই ষাট, সুমিতা পড়তে যাবে কোন দুঃখে ? তার তো কিছু হয়নি।

তবে এই অ্যাম্বুলেন্স ?

এটা নিয়ে আমারা একটু বেড়াতে যাচ্ছি। লং ড্রাইভ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ