15 Jul

নিশি দারোগার বেত্তান্ত

লিখেছেন:পূষন


ব্যাপারটা ভালো তো নয়ই, বরং বেশ সন্দেহজনক। নিশিকান্ত গড়াই এই নিয়মপুরের দারোগা হয়ে বসে আছেন দীর্ঘদিন, কম করে দশ বছর তো হবেই। এলাকায় তিনি ‘নিশি দারোগা’ বলে পরিচিত। যথার্থ নামকরণ। নিশীথের মতই গায়ের রঙ তার। মোটামুটি শীর্ণ চেহারায় ছোট্ট একটা ভুঁড়ি স্পিড-ব্রেকারের মত নাতিদীর্ঘ শরীরটার ছন্দপতন ঘটিয়েছে। মাথার সব চুল সাদা এবং কদমছাঁট দেওয়া। বেশ আমুদে,খোশমেজাজি লোক। আর হবেন না-ই বা কেন? নিয়মপুরে এতকাল তো সবই নিয়ম মতন হয়ে এসেছে, সকলেরই একেবারে নিস্তরঙ্গ জীবন। লোক কম, অপরাধও বেশী নয়। তার উপর এলাকার লোকজন বেশ শ্রদ্ধা-ভক্তি করে, মাঝেমধ্যে ভালো-মন্দ খাবার, ফল, মিষ্টি নিবেদন করে যায়। নিশি দারোগা এ’ যাবৎ তাই বেশ গড়িয়ে গড়িয়ে দিন কাটিয়েছেন।  কিন্তু ইদানীং এমন কিছু ঘটনা তার চারপাশে ঘটতে আরম্ভ করেছে যাতে তিনি বাধ্য হয়েই বেশ চিন্তিত বোধ করছেন।

নিশি দারোগার বয়স হয়েছে, দু’ মাস পরেই রিটায়ারমেন্ট। কিন্তু যত দিন এগিয়ে আসছে তত তার মনে হচ্ছে যে চাকরিটা শেষ না হলেই ভালো। ছুটি নিয়ে কি হবে? মনে তার বিস্তর আক্ষেপ। একপ্রকার জেদ করেই বিয়ে করেন নি, সংসারে আজ তার আর কেউ নেই। চিরকাল মিতব্যয়ী হয়েই কাটিয়ে দিলেন, নিতান্ত প্রয়োজন না হলে কিছুই কেনেন না। তিনি যখন শহরে ছিলেন তখন একটা দামী সানগ্লাসের উপর তার বহুদিন নজর ছিল, কিন্তু কিনছি-কিনব করে আর কেনা হয় নি। বছর ত্রিশ আগে একবার পুজোর সময় ব্লেজার বানাতে দেবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু ‘এটা না হলেও তো চলবে’ মনে করে শেষমেশ একটা সস্তা পাঞ্জাবি কিনেই শান্ত হলেন। লোভ থাকলেও সানগ্লাস বা ব্লেজারের কোনটাই আর তার পরা হল না। এখন এসবের আর বয়স নেই। আজকাল দিনের শেষে নিজের অন্ধকার শূন্য ঘর আর টাকা-ভর্তি সিন্দুক দেখে তার মন তিক্ত হয়ে যায়। এই অবস্থায় চাকরিটাই তাকে ভুলিয়ে রাখে। তবে চাকরিজীবনও যে তার খুব মসৃণ—এমনটা নয়। সুনাম, দুর্নাম দুই-ই আছে। ঘুস নেন না, জনহিতৈষী, কর্তব্যনিষ্ঠ হিসেবে তার যেমন সুপরিচিতি আছে; তেমনি অনেক ক্রিমিনালকে ধরতে না পারার বা অনেক কেসের মীমাংসা  না করতে  পারার দাগ রয়ে গেছে তার পঁয়ত্রিশ বছরের কেরিয়ারে। এসব আক্ষেপ তো ছিলই, তার উপর এখন এসে যোগ হয়েছে আরেকটা ভয়। কয়েক সপ্তাহ ধরেই নিশি দারোগার মনে হচ্ছে, ‘চাকরি শেষ? তার মানে তো এবার আমি বুড়ো! যদি মরে যাই? মরার পর কি হবে? কেমন থাকব? কোথায় যাব?… যা শালা, এত তাড়াতাড়ি মরে যাব? হায় হায়!! কিছুই তো মজা করা হল না! ওরে বাবা, মরে যাব নাকি?’ এই ভয়ঙ্কর মৃত্যুভয় তাকে একেবারে কাবু করে ফেলেছে। আগের মত তিনি আর খেতে পারেন না, ঘুম কমেছে অনেকটা, ঠাট্টা-তামাশাও অর্ধেক-এ ঠেকেছে। তাও যেটুকু সজীবতা অবশিষ্ট ছিল, সেইসব অশৈলী ঘটনাগুলো ঘটা ইস্তক সেটুকুও যাই-যাই করতে আরম্ভ করেছে।

প্রথম ঘটনাটা ঘটে দিন ছয়েক আগে। জ্যৈষ্ঠ মাস, তার উপর ভরদুপুরে লোডশেডিং। গ্রামের বসাকবাবুর দিয়ে যাওয়া ছোট একটা পাকা কাঁঠাল খেয়ে মাথায় ভেজা গামছা জড়িয়ে চোখ বুজে নিজের চেয়ারে অভ্যাসমত বসে ঝিমোচ্ছিলেন নিশি দারোগা। এমন সময় মৃদু কাশির শব্দে চোখ খুলতে হল তাকে। চোখ খুলতেই একগাল মাছি। সামনের চেয়ারে যিনি বসে আছেন তিনি নিশি দারোগার সমবয়সী হবেন, কিছু বিষয়ে চেহারারও মিল রয়েছে। ধবধবে সাদা ধুতি-কুর্তা পরনে, বাঁহাতে একটা বাঁকানো ছড়ি। কিন্তু কে এই ভদ্রলোক? এলাকার তো কেউ নন ইনি। তাহলে এই দুপুরবেলায় এলেন-ই বা কোত্থেকে? এতটা নিঃশব্দে এলেন কি করে? কেউ দেখ’ল না? হাবিলদার রামধন কি তাহলে বাইরের চেয়ারে নেই? সর্বনাশ! উগ্রবাদী নয় তো?
দারোগাবাবুর হতভম্ব পরিস্থিতিটা আন্দাজ করেই হয়ত ভদ্রলোক কিছুটা হাসলেন। তারপর স্মিত হাসি বজায় রেখে বললেন, ‘ভয় নেই রে কালু, এলে ভালোই লাগবে!’

কালু? কে কালু? কালু নামে কাউকে তো তিনি… সে কি! কালু তো নিশি দারোগার ছোটবেলার ডাকনাম ছিল। অনেকদিন কেউ ও’ নামে না ডাকায় নামটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন দারোগাবাবু। কিন্তু ঠিক মনে পড়েছে। এইবার একটু ভয় লাগল তার। এই নামের খোঁজ যে পেয়েছে সে তো মামুলি লোক নয়! এ’ নির্ঘাত উচ্চকোটির শয়তান। মতলব কি এর? না, একটু বাজিয়ে দেখতে হচ্ছে! আগন্তুকের পরিচয় জানতে চাইবেন ভাবছেন, এমন সময় বাইরে একটা দমকা হাওয়া উঠল আর তার ঠেলায় টেবিলের উপরে রাখা রুলারটা গড়িয়ে সশব্দে পড়ল মেঝের উপর। সেটাকে তুলে রাখার জন্য বসে-বসেই ঝুঁকলেন নিশি দারোগা। রুলারটাকে তুলে যথাস্থানে রেখে মাথা তোলামাত্র দেখেন, কই, সামনে তো কেউ নেই! কাঠের ফাঁকা চেয়ারটা পড়ে আছে। কি হল? তিনি কি তাহলে দিবাস্বপ্ন দেখলেন? রামধনের নাম দু’বার ডাকতেই সে সেলাম ঠুকে হাজির। নিশি দারোগা ওই লোকটার ব্যাপারে প্রশ্ন করতেই সে মাথা নেড়ে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলল যে গত দেড় ঘণ্টায় দারোগাবাবুর ঘর তো দূরস্থান পুলিশ স্টেশনের চৌহদ্দিতেই কেউ ঢোকেনি। অবশেষে ব্যাপারটাকে মনের ভ্রম বলেই মেনে নিতে হল নিশি দারোগাকে। কিন্তু ঘটনার শেষ এখানেই নয়। বাড়ি ফিরে নিজের কিছু দরকারি কাগজ বের করার জন্য তিনি যেই না আলমারি খুলেছেন অমনি ঝপ করে তাদের পুরনো একটা ফ্যামিলি অ্যালবাম তার পায়ের কাছে পড়ল। বাঙালি এই পরিস্থিতিতে যা করে, নিশিকান্তবাবুও তাই করলেন। একবার উলটে দেখলেন পাতাগুলো। হঠাৎ একটা ফটো দেখে চমকে উঠলেন তিনি। ঠিক এই লোকটাকেই তিনি দুপুরে দেখলেন না? ছবিটা দাঁড়ানো অবস্থায় তোলা, তবে চিনতে অসুবিধা নেই। কিন্তু ইনি তো নিশি দারোগার ছোট দাদু, দেহ রেখেছেন প্রায় পঞ্চান্ন বছর হল। কিন্তু চেহারার কি মিল! কাকতালীয়ভাবে পোশাকেরও সাংঘাতিক মিল রয়েছে দু’জনের মধ্যে, এমনকি এরও বাঁ হাতে রয়েছে একটা বাঁকানো ছড়ি। আশ্চর্য! এমন মিলও হয়? স্ট্রেঞ্জ!

পরের ঘটনা ঘটল দু’দিন পর। সেদিন বিকেলে কালবৈশাখী হয়ে গেছে, সাথে তুমুল বৃষ্টিও হয়েছে। ক’দিনের দাবদাহের পরে আরাম পাওয়া গেছে। ফিরতে সেদিন একটু রাত হয়ে গিয়েছিল নিশি দারোগার, একটা চুরির কেস এসে পরেছিল। এখন আবার কি রান্না করবেন তাই ভাবতে ভাবতে টর্চের আলোয় জঙ্গলের রাস্তা ধরে। এটা একটা শর্টকাট। জোলো হাওয়া দিচ্ছে চারদিক থেকে, সঙ্গে ব্যাঙের ডাক। হঠাৎই খিচুড়ি খাওয়ার ইচ্ছে হল নিশিকান্তবাবুর। শেষ কবে খিচুড়ি খেয়েছেন সেটা ভাবতে চেষ্টা করছেন এমন সময় পাশের জঙ্গল ফুঁড়ে একটা আস্ত লোক এসে তার সামনে দাঁড়াল। চমকে গিয়ে প্রথমটায় প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন নিশিকান্ত কিন্তু শেষটায় সামলে নিলেন। তারপর কাঁপা কিন্তু কড়া গলায় বললেন, ‘কে রে তুই? এভাবে আসার মানেটাই বা কি? চোর নাকি? চল, চল থানায়! ’ লোকটা নিরুত্তর। এবার টর্চের আলো লোকটার মুখে ফেলতেই একটু থমকে গেলেন নিশি দারোগা। একে তো তিনি … হ্যাঁ, এ তো নবা! নিশিকান্তবাবুর যখন কলকাতায় পোস্টিং ছিল, এই নবা ছিল তার রান্নার ঠাকুর। চার বছর কাজ করেছিল নবা। নিশিকান্তবাবুর প্রিয়পাত্র ছিল নবা, অনেক সাহায্য করেছেন তিনি তাকে। নবাও খুব মান’ত নিশিকান্তবাবুকে। সে’বার নবার গ্রামে যখন বন্যা হল তখন নিশিকান্তবাবু সাতদিনের ছুটি আর নগদ তিন হাজার টাকা দিয়ে দেশে পাঠিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু নবা আর ফেরেনি, কোন খবরও দেয়নি। কিন্তু সে তো প্রায় বছর পনের আগের ঘটনা। সেই নবা হঠাৎ এখানে এভাবে কেমন করে হাজির হল? তার ঠিকানাই বা পেল কি করে?

কিছু বলার আগেই ঝলমল করে হেসে নবা তার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল নিশিকান্তবাবুর দিকে, আর আহ্লাদিত কণ্ঠে বলল, ‘বাবু, এই নেন! গরম থাকতেই খেয়ে নিবেন কিন্তু!’ নিশিকান্তবাবু এবার তার হাতের দিকে চেয়ে দেখলেন তার হাতে রয়েছে বেশ বড় একটা টিফিনকৌটো। যন্ত্রচালিতের মত কৌটোটা নিলেন তিনি। কৌটো নেওয়ার সাথে সাথে মোড় ঘুরলো নবা, তারপরে আবার পিছন ফিরে তাকাল। গদগদ কণ্ঠে বলল, ‘বেড়ে জায়গা বটে বাবু! ওজন-টোজন, বয়স-টয়স নাই! আইসা পড়েন, দু’বেলা ভালো-মন্দ রেঁধে দিব’খনে, খাইয়েন।’ বলেই জঙ্গলের ভিতরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল নবা।

বাড়ি ফিরে অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন দারোগাবাবু। এই ঘটনাদুটো তার একেবারেই সুবিধের লাগছে না। দু’-দুটো কোইনসিডেন্স! এ’রকম আবার হয় নাকি? কিন্তু এসবেরও একটা ভালো দিক রয়েছে। গত চারদিনে একবারও মরার কথা বা মরার ভয় মনে জাগেনি নিশি দারোগার। মনটা একটু চিন্তিত হলেও আগের মত অতটা খারাপ নেই। কিন্তু এ’সবের মানে কি? অনেক ভেবেও কূল পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে তিনি যখন সেই টিফিনকৌটোটা খুললেন, তার মনটা আরও তিন ডিগ্রি বেশী খুশী হয়ে গেল। কারণ কৌটোর ভেতর রয়েছে তার অত্যন্ত পছন্দসই খিচুড়ি আর লম্বা করে কাটা দু’ খণ্ড নধর বেগুনভাজা। যাক, নবা তার পছন্দটা এখনও ভোলেনি তাহলে!

তার পরেরদিন মানে গতকাল রাতে যে ব্যাপারটা ঘটল সেটা কম অদ্ভুত নয়। নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলেন নিশি দারোগা। একদম অন্ধকার ঘর আর বালিশের পাশে ঘড়ি আর টর্চ না হলে তার ঠিক ঘুম হয় না, সেদিনও তার অন্যথা হয় নি। হঠাৎ একটা খচমচ আওয়াজে তার ঘুম ভেঙে গেল। কান খাড়া করে শব্দটা তিনি শুনলেন কয়েক মুহূর্ত, তারপর বুঝলেন যে শব্দটা তার খাটের নীচ থেকেই আসছে। টর্চটা হাতে নিয়ে উঠে বসলেন তিনি। চোর ঢুকল নাকি? কিন্তু দারোগার ঘরে চুরি করার মত বুকের পাটা কোন চোর রাখে? তাহলে … বিছানা থেকে খুব সন্তর্পণে নেমে আসলেন তিনি। শব্দটা তখনও হচ্ছে, কেউ যেন অনেক কাগজ হাতড়াচ্ছে। কিন্তু একটা ট্রাঙ্ক ছাড়া নিশি দারোগার খাটের নীচ তো পুরো সাফ। তাহলে কিসের শব্দ ওটা? নীচু হয়ে শব্দের উৎস অনুমান করে আচমকা টর্চের বোতাম টিপে দিলেন নিশিকান্তবাবু। টর্চের ব্যাটারির আয়ু অস্তাচলগামী, কিন্তু সেই ফ্যাকাশে হলদে আলোয় তিনি যা দেখলেন তাতে তিনি বিস্মিত হয়ে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে শেষে মাটিতে বসেই পড়লেন। খাটের নীচে একটা সাদা-কালো মোটা হুলো বেড়াল মহানন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে একরাশ দলা-পাকানো কাগজ নিয়ে খেলছে। বেড়ালটাকে দেখেই শিরদাঁড়াটা ঠাণ্ডা হয়ে গেল নিশিকান্তবাবুর। এ তো ভোঁদা, তার সেই ছোটবেলার প্রিয় পোষা বেড়াল! ভোঁদা তো কাগজের দলা নিয়ে এভাবেই খেলত! কিন্তু সে তো সাত বছর বয়সে গৃহত্যাগী হয়েছিল। আর ফেরেনি। মনোকষ্টে দুদিন কিছু মুখে দেন নি সেদিনের তের বছরের নিশিকান্ত। সেই ভোঁদা কোথা থেকে এল এতদিন পরে? চোখে জল এসে গেল নিশি দারোগার। ভোঁদা এসেছে তার কাছে … এতদিন বাদে… কিন্তু না, এ তো অযৌক্তিক! মন শক্ত করলেন দারোগাবাবু। কোন বেড়াল তো এভাবে অচেনা জায়গায় ফিরতে পারে না। না, না, এ নিশ্চয়ই অন্য বেড়াল, হুবহু ভোঁদার মত দেখতে। কিন্তু কিভাবে ঘরে ঢুকল ও? আর এই কাগজগুলোই বা এল কোত্থেকে? টর্চ জ্বেলে বেড়ালটার প্রতি একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন নিশি দারোগা। বেড়ালের কিন্তু হুঁশ নেই, সে খেলেই চলেছে। এইভাবে কতক্ষণ কাটল বলা কঠিন। টর্চের আলো ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে আসছে।  হাতটাও ব্যথা করছে, কিন্তু দারোগাবাবু বেড়ালটার থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। আচমকা খেলা থামিয়ে তার দিকে মুখ ঘোরালো বেড়ালটা, আর কর্কশ শব্দে বলে উঠল, ‘মাও!!’ প্রায় সাথে সাথে দারোগাবাবুর হাতের টর্চটা নিভে গেল এক সেকেন্ডের জন্য, কিন্তু পরমুহূর্তেই ফের আপনা-আপনি জ্বলে উঠল। তবে এবার টর্চের ম্লান আলোয় নিশি দারোগা স্পষ্ট দেখলেন যে তার ঝকঝকে খাটের তলাটায় তার নিজের টিনের ট্রাঙ্কটা ছাড়া আর কিচ্ছুটি নেই, একটা মিহি সুতো পর্যন্ত না।

সে’ রাত্রে আর ঘুম হল না নিশি দারোগার। মাথা-টাথা খারাপ হচ্ছে নাকি? ভীমরতি ধরেনি তো? অথবা হজমের গোলমাল? কে জানে! কিন্তু এসব যা হচ্ছে  তা তো একেবারেই ভালো কথা নয়। বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু একটা কথা ঠিক। মরার চিন্তাটা মাথা থেকে ভেগেছে এইসব উৎপাতে। আর গত ক’দিনে প্রচুর সংশয়, ধোঁয়াশা জমে থাকলেও সেদিনের সেই ভদ্রলোক আর নবার মত ওই বেড়ালটাও যে নিজস্ব ‘মাও’ সম্ভাষণে নিশি দারোগাকে কোথাও একটা যাওয়ার আমন্ত্রন জানিয়ে গেছে এ’ ব্যাপারে দারোগাবাবু পুরোপুরি নিশ্চিত।

পরদিন বিছানা ছাড়ার পর থেকেই কিন্তু মনের ভাব বদলে গেল নিশি দারোগার। কেমন একটু তন্দ্রা-তন্দ্রা ভাব, অথচ মনটা বেশ হালকা আর ভেজাভেজা লাগছে। খালি পুরনো দিনের কথা মনে পড়ছে, ভালো লাগছে বেশ। লম্বা ছুটি নিয়ে এক্ষুনি এ’সব ছেড়ে সেই সময়ে, সেই পরিসরে ফিরতে ইচ্ছে করছে। বেশ নির্ভয়, নিরুপদ্রব,শান্ত লাগছে নিজেকে। আর খালি ঘুমোতে ইচ্ছে হচ্ছে। একবার তো রামধন এসে আলতো করে কাশি পর্যন্ত দিয়ে গেছে তাকে সজাগ করতে। অন্যদিন হলে ব্যাপারটা প্রেস্টিজে লাগত, অবশ্য তেমন পরিস্থিতিই হত কিনা সন্দেহ, কিন্তু আজ ওই তুচ্ছ আওয়াজটাকে বিশেষ গায়ে মাখলেন না দারোগাবাবু। ওসব আর ভালো লাগছে না তার।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামছে। পেছনের জানলার দিকে মুখ করে চেয়ারে বসে ঢুলছিলেন নিশি দারোগা। হঠাৎ খ্যাঁকখ্যাঁক একটা হাসির শব্দে তার ঘুমের নেশা কেটে গেল। চোখ খুলতেই তিনি দেখলেন, তার জানলার সামনে একটা রোগা, কালো, কঞ্চির মত লম্বা লোক দাঁত বের করে হাসছে। তার পরিধান খুবই অদ্ভুত। এই সন্ধ্যে বেলায় তার চোখে দামী একটা সানগ্লাস, আর তার চেয়েও বিস্ময়ের ব্যাপার হল এই জ্যৈষ্ঠের গরমেও সে দিব্যি একটা সুন্দর ব্লেজার পরে হাসছে। প্রথমটা ঠিক কি করা উচিত বুঝতে পারছিলেন না দারোগাবাবু। কিন্তু শান্তভাবে লোকটাকে পাঁচ-ছ’ সেকেন্ড দেখামাত্র তার মাথায় খুন চেপে গেল। এ তো সেই সিঁধেল বোঙা! পেখমগঞ্জের সেই কুখ্যাত চোর! যাকে বহু চেষ্টা করে, তাড়া করে, ফাঁদ পেতে, আড়কাঠি লাগিয়ে দু’বছরেও ধরতে পারেন নি নিশি দারোগা। প্রতিবার শেষবেলায় নাকের ডগা দিয়ে পালাত এই বোঙা, যেত বাতাসে মিলিয়ে যেত এক লহমায়। শেষে মনে ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে ট্রান্সফার নিতে হয়েছিল দারোগাবাবুকে। সেই রাগ তার এখনও কতটা গনগনে রয়েছে আজ বছর সাতেক পরে বোঙাকে দেখেই তিনি মনে-মনে টের পাচ্ছেন। কত সাহস হয়েছে দ্যাখো বজ্জাতটার, থানার জানলায় এসে বেমালুম দাঁত কেলাচ্ছে! তাও আবার বাবু সেজে! নিশিকান্তবাবুর সেই সানগ্লাস আর ব্লেজারের জিঘাংসাটা ফের মাথা চাড়া দিয়ে উঠল বিষধর সাপের মত। না, আজ একে আর ছাড়া নেই!

–‘এই বোঙা! দাঁড়া, দাঁড়া শালা, দাঁড়া! রামধন, এই রামধন…’ হুঙ্কার ছেড়ে রুলার হাতে একলাফে চেয়ার ছেড়ে সব জড়তা কাটিয়ে উঠে পড়লেন নিশি দারোগা। বাইরে এসে দেখেন রামধন নেই। কিন্তু বোঙাকে তো ছাড়া চলে না! তাই নিজেই দৌড় দিলেন তার পিছনে। বোঙাও ছুটছে তার আগে আগে। দুপাশে জঙ্গল ভেঙে ছুটছেন তারা। ছোটা শুরু করা মাত্র নিশি দারোগা বুঝেছিলেন যে গায়ে-হাতে তার নতুন স্ফূর্তি এসেছে যেন, বয়সটা মনে হচ্ছে মেরেকেটে কুড়ি-পঁচিশ। একটুও হাঁফ ধরেনি। কিন্তু তাও তিনি বোঙাকে ধরতে পারছেন না। ছুটতে ছুটতেই হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন যে চারপাশের পরিবেশ খুবই বদলে গেছে। এই জায়গাটা তো নিয়মপুর নয়! চারপাশটা কেমন যেন গোলাপি আর সাদা-সাদা। আর কোন রঙ চোখে পড়ছে না। তবে গাছপালা, মাটি, পাথর সবই আছে। কিন্তু সব কেমন যেন অন্য রকমের। মনে হচ্ছে চেনা পৃথিবীটাকেই তিনি একটা রঙ-বেরঙের কাঁচের ভেতর থেকে দেখছেন, এটা যেন পৃথিবীর আরেকটা শেড যেটা বরাবরই আছে কিন্তু কেউ দেখতে পায় না। তবে আরও খানিকটা এগিয়ে তিনি বুঝলেন যে এই জায়গাটা পৃথিবীই নয়! এ’ কোথায় চলেছেন নিশি দারোগা? কিছুই তো তিনি বুঝতে পারছেন না। এদিকে বোঙা কিন্তু এখনও ছুটে চলেছে। সে কি তবে জায়গাটা চেনে? ভগবান জানে!

আচমকা এক জায়গায় এসে থেমে গেল বোঙা। নিশি দারোগাও তার সামনে এসে চেপে ধরলেন ব্লেজারের গলার কাছটা। জয়ীর হাসি হেসে বললেন,’এইবার? এইবার যে তোকে শ্রীঘরে যেতে হবে চাঁদু! অনেক ঘুরিয়েছিস এতদিন! এ’বেলা চল, চল শালা থানায়, চল!’ কিন্তু কোথায় থানা? নিশি দারোগার সামনে এখন একটা বাগান-ঘেরা বেশ বড় দোতলা বাড়ি। এই বাড়িটা তো তার চেনা, অ্যালবামে এর ছবি তিনি দেখেছেন। তাদের ময়মনসিংহের পৈতৃক বাড়ি। কিন্তু সে তো কবেই ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন ছেলেবেলায়। তাহলে কিভাবে এই বাড়িটা তার সামনে এসে হাজির হল? আর এ কোন পরিবেশে বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে? এর বর্ণনা করা যায় কিভাবে? এই সব গাছ, ফুল, রঙ কি পৃথিবীর কেউ দেখেছে? না, না, অসম্ভব। হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন নিশি দারোগা সেই বাড়িটার দিকে। একসময় তার হুঁশ ফিরল বোঙার কথায়, ‘ কি, কেমন দিলাম স্যার?’

কি উত্তর দেবেন নিশি দারোগা? খালি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন বোঙার উন্মোচিত দন্তরাশির দিকে। আঙুলে চশমাটাকে ফাঁসিয়ে শ্রীকৃষ্ণের সুদর্শনচক্রের মত সেটাকে এখন ঘোরাচ্ছে বোঙা। একটু পরে অবশ্য দারোগাবাবুর মনের শোচনীয় অবস্থাটা মুহূর্তে বুঝে নিয়ে বোঙা নিজেই শান্তভাবে বলল, ‘ও, নতুন তো, ভাববেন না; দু’দিনে ঠিক হয়ে যাবে। যাক গে, এইবেলা যান তো বাড়িটায়, যান। আমি আসি স্যার, কাজ আছে, বুঝলেন।’ এই বলে সে পুরনো দিনের মত চোখের সামনে প্রায় বাতাসেই মিলিয়ে গেল।

ধীর পায়ে বাড়িটার দিকে এগোতে লাগলেন নিশিকান্তবাবু। ঠিক যখন তিনি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন, সঙ্গে সঙ্গে সেটা নিঃশব্দে খুলে গেল। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নিশিকান্তবাবু অবাক হয়ে দেখলেন যে ঘরের ভেতর উজ্জ্বল ঝাড়লন্ঠন জ্বলছে আর তার নীচে খুব হাসিমুখে হেভি সেজেগুজে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার একদল চেনা-মুখ। এদের মধ্যে সেদিনের থানার সেই ভদ্রলোক (ছোটদাদু নন কি?) , নবা এমনকি নিশি দারোগার পোষা বেড়াল সেই ভোঁদা পর্যন্ত রয়েছে। আছেন তার মা, বাবা, ছোটবেলার দু’-একজন বন্ধু, পরিবারের ছোট-বড় আরও অনেকে। বাকি সকলের মুখও তিনি ফ্যামিলি অ্যালবামে দেখেছেন বলে মনে পড়ল। সকলেই তার দিকে হাসিমুখে এগিয়ে আসতে লাগলেন প্রায় একসাথে। ওঁদের দেখে নিশি দারোগার মনে হল, বহুদিন পরে তিনি আজ নিজের বাড়ি ফিরেছেন। ছোটবেলার অন্নপ্রাশনের দিনটাও হয়ত এমনই ছিল তার ……

এতসবের মধ্যে খালি একটা তুচ্ছ ব্যাপার নিশিকান্তবাবু একদম খেয়াল করতেই ভুলে গেলেন। সেটা হচ্ছে যে তার সেই চিটচিটে শরীরটা নিয়মপুরের এঁদো থানাতে সেই সন্ধ্যে থেকে বাসি কাপড়ের মতন পড়ে রয়েছে।

নিশিকান্তবাবু এখন আর একা নেই, নিশিকান্তবাবু এখন ভালোই আছেন। বাড়ির লোকের সাথে আড্ডা দিয়ে, সপরিবারে নবার হাতের তোফা রান্না খেয়ে, ভোঁদা আর বোঙার সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলে তার দিব্যি সময় কাটছে। পুরো ছুটির মেজাজ যাকে বলে! মৃত্যুভয় আর তার নেই। কিন্তু ভয় ব্যাপারটা রক্তবীজের মত, একটার শেষ থেকে আরেকটার শুরু। এখানেও তাই। খালি সে’রকমই একটা ভয় আজকাল মাঝেমধ্যে নিশি দারোগার মনে খচখচিয়ে ওঠে—

…‘এই রে, যদি জন্মে যাই? জন্মানোর পর কি হবে? কেমন থাকব? কোথায় যাব?… যা শালা, এত তাড়াতাড়ি জন্মে যাব? হায় হায়!! কিছুই তো মজা করা হল না! ওরে বাবা, ফের জন্মে যাব নাকি? ’

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ