17 Jul

অন্তর্জলি যাত্রা-প্রাণের স্পর্শ পাই প্রবাহের পথে

লিখেছেন:তন্বী মুখোপাধ্যায়


সমাজ রাজনীতির জীব আমরা। আমাদের সামাজিক সংস্কারে যা উত্তরাধিকার হিসেবে আসে, তাই আবার উত্তরপুরুষ লাভ করে। সেকারণেই বলতে পারি ‘History repeats itself ’ অন্তর্জলি যাত্রার কাহিনী বহতা জীবনের মধ্যে প্রোথিত সংস্কার সংস্কৃতি নির্ভর। প্রতীকী মানে নিয়ে উপস্থিত গঙ্গা সুরধুনী। রামপ্রসাদ থেকে রামকৃষ্ণে আমাদের বঙ্গজীবনধর্ম পুনঃপ্রকাশিত ও পুনঃপ্রসারিত হয়। গল্পের মধ্যে রয়েছে দুঃখ ব্যথার পুনঃসৃজন অথবা মাধুকরী। নতুন আধুনিক স্থান কালের ঘাটে স্বরূপতচিরপুরাতন এসে দেখা দেয়। উভয়ের আন্তরশক্তি কিভাবে সংশ্লিষ্ট হয় তা নিয়ে উপন্যাসসৃজন ছিল লেখকের লক্ষ্য। কবিতা ও গদ্য যেমন মিলেছে তেমন মিলেছে সমাজ ও ব্যক্তিচেতনা। স্থান কালকে গুরুত্ব দিতে একটি কাব্যিক পরিণতি তৈরি করা হয়েছে। লেখকের প্রশ্নাতীত শৈল্পিক বোধ মিলেছে সামাজিক সহমর্মিতার মধ্যে গিয়ে।

অন্তর্জলি যাত্রার গল্পে এক চণ্ডাল আছে। আছে এক ব্রাহ্মণদুহিতা ও অন্তর্জলি যাত্রিক ব্রাহ্মণ। গঙ্গালগ্ন শ্মশানে অতিবৃদ্ধ এই ব্রাহ্মণকে নিয়ে আসা হয়েছে। কন্যাদায়গ্রস্ত এক পিতা জ্যোতিষীর গণনার প্রভাবে নিজের অবিবাহিত কন্যাকে অন্তর্জলিতে রাখা ব্রাহ্মণের হাতে অবশেষে দান করে সংস্কারের দায়মুক্ত হলেন। সুন্দরী তরুণী যশোবতী তার স্বামীর সঙ্গে শ্মশানে পরিত্যক্ত হয় নিমেষে। সীতারামের আত্মীয়স্বজনও দায়মুক্ত হয়ে তাঁদের সাংসারিক লাভালাভের জগতে ফিরে যেতে পারেন। অথচ চণ্ডাল বৈজুনাথ এই জীবিতা নারীর বিসর্জনকে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। চণ্ডালের অন্তরে মানবতার ফল্গু বয় যশোবতীকে কেন্দ্র করে। অতিবৃদ্ধ সীতারামের সঙ্গে একটি সুন্দরী বালিকাকে জীবিত দগ্ধ করার উপায় মাত্র বজায় রেখে যাওয়া সমাজকে সে ঘৃণা করে। চণ্ডালকেও নৃশংসতর কর্মে প্রবৃত্ত করানোয় তার ঘৃণা, রোষ সৃষ্টি করে। অথচ যশোবতী যেন এই নিদারুণ পরিণতি সম্পর্কে নির্বোধ।স্বামীসঙ্গ করে যশোবতী, কখনো স্নেহে, কখনো মায়ায়, কখনো নিজের ব্যাপারে দুর্ভাবনায়। সীতারামও বাঁচার বেশিই ইচ্ছে জানায়।এমনকি মৃত্যু হলেও তার ভোগ সুখের বাসনা ব্যক্ত হয়ে থাকে জন্মান্তরের কল্পনায়। যশোবতী যেন সংস্কারের সঙ্গে বাস্তবের সাযুজ্য ঘটিয়ে ফেলে। অবশ্য শেষ রক্ষা হয় না। পূর্ণিমার ভরা কোটাল কালান্তক মুমূর্ষু বৃদ্ধকে উৎক্ষিপ্ত  করে, আর্তবৃদ্ধকে বাঁচাতে চেয়ে যশোবতীও জোয়ারে হারিয়ে যায়। ঠিক অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী। নামিয়ে আনা হয় বুঝি একটি পোয়েটিক জাস্টিস। পরের কথা পাঠকের কল্পনাগম্য – পাঠকের চেতনাই কাহিনীটিকে আত্মস্থ করবে তা জানেন লেখক। পাঠককে এই ভাষার ও জীবনবিশ্লেষণের ভ্রমণে প্রান্তে প্রান্তে ন্যস্ত হতে হবে।

আখ্যানের বাস্তবে দুটি মানুষ সমর্থ ও সক্ষম। বৃদ্ধ মুখে যাই বলুন না কেন তিনি অথর্ব্ব ও অশক্ত। তাঁকে সর্বক্ষণ নিরীক্ষণ করছে যশোবতী, অন্যপক্ষে যশোবতীকে রক্ষা করতে চায় এই নিষ্ঠুর সমাজের এক অন্য নৈসর্গিক সত্তা যেন, এখানে সে চণ্ডাল বৈজুনাথ। সতীদাহের চিতায় অগ্নিসংযোগ করে তাকে সরাসরি হত্যাকারী হতে হবে তাই বৈজুর প্রত্যয়। বিপরীতে সেই কারণেই যশোবতী পালিয়ে বাঁচলে বৈজুও রেহাই পায়। বৈজুর কোম্পানী মা গঙ্গা। তিনিই যশোবতী সীতারামকে ভাসিয়ে নিয়ে অবশেষে বৈজুকে রক্ষা করেন। সমাজের অঘনাশক গঙ্গা, ধারিনী নিসর্গ। অতি অধুনাবাদী পাঠকের মনে হয় একি একটি ইউথ্যানেসিয়ার (Euthanasia)র গল্প? নিরুপায় হতচৈয়ন্য সমাজে ফের গড়ে ওঠার এবং পরিভ্রমণ করার এ দিকটাই যদি নেই তবে তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাক। বৈজু সমাজের অন্যপথ ; সে রইল; শ্মশানও রইল। বৃদ্ধ ও যশোবতীর প্রাণ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। বৈজু এখানেও একা আর তার আছে বৈজাত্য। অপর ধারার বৈজু তাই লেখকের গল্পে শাশ্বত হয়ে থাকে। বৈজু বিদগ্ধের মতো মানবিক নয়, দৃষ্টান্ত ধার্মিক বা আধ্যাত্মিক ও নয়, অথচ তার ‘মনপুঁড়ে’।সাধারণ মানবিক হলে বৈজু পালিয়ে যেত। সে সীতারামকে প্রায় জলে ফেলে দিত, যশোবতীকেও তুলে নিয়েছে, বৈজুর প্রশ্নে ও ক্ষোভে যশোবতী আরও জোরের সঙ্গে পাতিব্রত্যই নীতি হিসাবে অবলম্বন করেছে। সেই সতীত্বকে বৈজু কিন্তু কালিমালিপ্ত করেনি, খালি আঘাতে জাগাতে চেয়েছে। যশোবতী তাকে যেখানে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছে, সেখানেই আদর্শ খুঁজে নিয়েছে। লেখক সূত্র দেবার সময় বলেছেন – ‘এই গ্রন্থের ভাববিগ্রহ রামকৃষ্ণের, ইহার কাব্যবিগ্রহ রামপ্রসাদের। রামপ্রসাদ আমাদের শুদ্ধ মন আনিয়া দেন’। বাস্তবে থাকুক শুদ্ধচিত্ত যশোবতী – সেই হল কাব্যবিগ্রহ; অন্যত্র আছে অন্তর্বাস্তবতার বয়ন – তাকে বলতে পারি ভাববিগ্রহ। কাব্য হল আঙ্গিক বা সৌষ্ঠব বজায় রাখা রচনা। রামপ্রসাদ বলেছেন যশোবতীর মতই বুঝি – ‘আমায় ছুঁয়ো না রে শমন/আমার জাত গিয়াছে/যে দিন কৃপাময়ী আমায় কৃপা করেছে।। শোন রে শমন বলি /আমার জাত কিসে গিয়াছে।/আমি ছিলেম গৃহবাসী, কেলে সর্বনাশী,/আমায় সন্ন্যাসী করেছে’। ‘ভক্তের প্রেমের শরীর ভাগবতী তনু’ তা যদি রামকৃষ্ণ বলেছেন তাতে শক্তি ও প্রেমের দ্বন্দ্বের কথাও বলা আছে, অহং নিবে গেলে শাশ্বত প্রেম শক্তি পড়ে থাকবে। তাকেই আমরা অবলোকন করি উপন্যাসের শেষে। সে একটি চক্ষুময় নৌকা। সেও আমাদের চিরকাল অবলোকন করে।

আমের ভেতরের আঁটি নিয়েই তার আম্রত্ব। ভারতবর্ষের আত্মিক অনুভবের মধ্যে আছে পুরাণ বীজ। জ্ঞান সংবেদনায় পাঠকের চোখ খুলে যায়। পাঠক জীবনের গল্প-মধ্যে পান জীবনবেদ। সত্য ও সংস্কার চিনতে পারেন। প্রথম দেখি বৈজুনাথকে – সে দার্শনিক, সে বাগ্মীও, সে তার্কিক, সে প্রেমিকও। ব্যাপ্ত জগৎ পরিচয়ে সে অন্ত্যজ। বহির্জাগতিক সত্যে আর একটি চরিত্র যশোবতীর পরিচয় – সে এক নারী। দুজনের জায়গাই সমাজের পশ্চাদভাগে, পুরোভাগে নয়। উভয়েই সমাজে অনাদৃত অর্থে এসেছে পুরাণ থেকেই। অন্তর্জলি যাত্রায় সে কথা অনেকবার বলা হল। শ্মশান যাত্রীদের একজন বৈজুকে কটাক্ষ করে বলেছে – ‘এতেক কথা শিখালে কে বটে হে’। বৈজু বাস্তবের পাঠক বলে আত্মীয়হারা বালককে লক্ষ্য করে উক্তি করে – ‘…এমন যেন শত্রুর না হয় – বলে সবাই শুরু করে, অথচ এমনি হয়’। ফলে ‘সকলেই তাহাকে শক্ত ক্রিয়া দেখিল, ইহাদের দৃষ্টিতে ভৎর্সনা ছিল। বৈজুও যখন বিধান চায় তখন লক্ষ্মীনারায়ণ বলেন –আ মর তু বেটা জাত জন্ম খোয়াবি? সরে দাঁড়া না মরণ’।  এই বৈজু রাগত সীতারামকে শ্লেষ করে – ‘দোসর! দোসর বলতে তবে বুঝি আমি। বুড়া বুজবি আমায় লিববে গো!’ জ্যোতিষী রাগে, ভয়ে বা অভ্যাসে বলেছেন – ‘ফের বেটা হারামজাদা চাঁড়াল! বড় বাড় বেড়েছে তোর … খড়ম পেটা করে আমি তোর না ভুলিয়ে দেবো … ছোট জাত’। এরকম জ্বলন্ত উত্তর প্রত্যুত্তর সামাজিক সংঘাতকে বোঝায়।

না, ব্রাহ্মণের দোসর বলে চেনানো হয়েছে যশোবতীকে, বামুনের দোসর চাঁড়াল হয় না। মিথম্স্ক্রিয়ার অভাব সেখানেও প্রচুর। সীতার মতই দুঃখিনী যশোবতী অন্যভাবে বিসর্জিত। কে বলতে পারে কে বেশি অনাদৃত? কে বেশি হিংস্রতার শিকার? যশোবতী সীতারামকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন – ‘হ্যাঁ গা আমার তরে তোমার মায়া হয়?’ অনাথা, নিঃস্ব, ভিখারী, ভাঙাকপালে, কাঙাল প্রশ্ন। পাঁচ পাঁচটি বিশেষণে যশোবতীর দৈন্য বোঝালেন লেখক! প্রেতপরিপূর্ণ যেন শ্মশান, যে শ্মশানে এসেছেন যশোবতী – ‘আতপতপ্ত পদ্মের ন্যায়, পরিক্লিষ্ট উৎপলের ন্যায়, ধূলামলিন স্বর্ণের ন্যায় যশোবতী।’ শ্মশান বর্ণনার মিত আয়োজনে উদ্রিক্ত হয় বিভীষিকা – ‘এই ক্ষণে অধিকতর ভয়ঙ্কর রহস্যময় করিয়াছিল নিকটবর্তী’ চিতা নির্বাপিত করার উদ্দেশ্যে জল নিক্ষেপের ফলে হস হস শব্দ, তৎসহ অনর্গল ধূমসারি, যাহা বিচিত্র আকারে কুণ্ডলী সৃষ্টি করত এক এক সময়ে ইহাদের অতিক্রম করিয়া অন্তর্হিত হইতেছিল। এবং অস্বস্তিকর নরবসার গন্ধ এখানে উদ্দাম’।

পঞ্চমুণ্ডিতে সতীদাহ সত্যিই হয়েছে, শয়ে শয়ে জীবন্ত স্ত্রীলোক স্বামীর চিতায় পুড়েছেন। ইতিহাসের সুযোগ নেবে উত্তরকাল? সে তবে কেমন সভ্যতা? পীড়ন, নীচতা অন্যায়কে আঘাত করছে চণ্ডাল। বলছে – ‘পাপ আবার কি পাপ শালা… তুমি শালা যত নষ্টের গোড়া, হ্যাঁ দোসর লাও শালা বুড়ো’। বৈজুনাথ সীতারামের দুর্গতিতে আগে দুঃখ পেলেও পরে সহানুভূতিশূন্য হয়েছে। কেননা সমাজের অনাচারের একমাত্র অবশিষ্ট প্রতিনিধি এখানে সীতারাম। পূণ্যতোয়া গঙ্গার কূলে ক্লীবের সামাজিক দাসত্ব মানতে হচ্ছে চণ্ডালকে; চণ্ডাল সেজন্যই বিদ্রোহী। শ্লেষ, গ্লানি, ভয় পাঠক বোধ করতে পারেন। নারী মেধযজ্ঞের ভীষণ ইতিহাস থেকে একটা আগুনের ফুলকি এসে পড়েছে – চণ্ডাল তাকে দেখেছে, সহানুভূতিতে কষ্টে চণ্ডাল ব্যর্থ চেষ্টা করেছে যশোবতীকে বাঁচানোর। মৃত্যূকে পরাস্ত করে মুমূর্ষু সীতারামও যতক্ষণ বেঁচে আছে ততক্ষণই সামাজিক পাপের প্রমাণ আছে। সমাজ তাকে পূণ্য বলে প্রমাণ করতে প্রয়াসী। এখানেই বৈজুর ক্রোধ। যশোবতীর বিয়ে দিয়ে সময়ে সময়ে সমবেত সকলেই অন্তর্ধান করে। চণ্ডালকে যশোবতী দেখেন – ‘অনেক কষ্টে বুঝিতে পারিয়াছিল উহা একটি দেহ; উহা শ্মশানের চৈত্যবৃক্ষের ন্যায়, উহা চণ্ডাল’। মূল ধারার মানবসভ্যতা থেকে লেখক সরে আসেন। প্রান্তিক জগতে চিরন্তন মানবতার সংশ্লেষ খুঁজে পেতে চান পাঠকও। কাব্য ও ভাব সমৃদ্ধ হয়।

জীবনযাপন করতে করতে পূর্বতন সংস্কার উপলব্ধি করতেই হয়। জীবনযাপন প্রথা উন্নত হয় অথচ নানা সময়ে নানা আধিপত্য তন্ত্র সমাজের নিয়ামক থাকে। উপন্যাসের নামকরণ ধরে এগিয়ে গেলে ‘যাত্রা’ শব্দটির তাৎপর্য ব্যঞ্জনায় ধরা যায়। যাত্রা মানে পর্যটন, যাত্রা মানে ভ্রমণ, গমন। ক্ষমতাবিন্যাসমত পরিভ্রাম্যমান অর্থবোধক মানবকণা। চণ্ডাল ও যশোবতী অর্থাৎ স্ত্রীলোক ব্রাহ্মণ্যপ্রথায় নির্যাতিত। স্ত্রীলোক পুরুষতন্ত্রে ক্ষমতাহীন। যশোবতীর ‘কর্ত্তা’ সেই পঙ্গু স্বামী সীতারাম। ক্ষমতায়নের নীতিকে দর্পীর বাহাস্ফোটে দেখা যাচ্ছে। এই সামাজিক বিন্যাসের রকমে সীতারামরা প্রভু বা কর্ত্তা বা ফিউডাল লর্ড যেহেতু সেহেতু তার পক্ষে বলাও সম্ভব – ‘বউ আমি আবার ঘর পাতব… ছেলে দুব’। পাঠাক লক্ষ্য করেন দুই ছেলে আছে সীতারামের তথাপি পুত্রোৎপাদনই তাঁর কর্তব্য। নির্দিষ্ট একটা বিন্যাসের জীবনযাত্রায় এরা সকলেই অংশভাগী। তবে চালচিত্র বদলায়, ধারায় পরিবর্তন আসে। ঔপনিবেশিক সমাজে নতুন পুরাতনের সংঘর্ষে আর একটা চালচিত্র সৃষ্টি হয়; আধিপত্যের ভিন্ন ছক পাতা হয়। চণ্ডাল দাস, যশোবতী সেবিকা। তারা জগদ্দল কুপ্রথার ভার ঠেলে কতটা এগোবে। উপন্যাসের মদ্যপ চণ্ডাল পারেনি, নিজের মধ্যেই আটকা পড়ে থেকেছে। মদ্যপ চণ্ডালের নরকপাল নিয়ে চলে অভিনয়। উপন্যাসের শেষ চিত্রকল্পে দুটি লিখন রয়েছে। একটি যশোবতীর সম্বন্ধে, অন্যটি সম্ভবত চণ্ডালের সম্বন্ধে। যশোবতী কিছুটা সক্রিয়, চণ্ডাল তাও নয় – সে জড়বৎ।

(১) “অল্পবয়সী ষড়ৈশ্বর্য্যশালিনী পতিপ্রাণা ‘কর্ত্তা-কর্ত্তা’ বলিয়া প্রতিমার কাটামো ছাড়িয়া জলে লাফ দিলেন। ক্রন্দন করিতে করিতে সন্তরণের বৃথা চেষ্টা করিলেন, দু’-একবার কর্তা ডাক শোনা গেল। ইহার পর শুধুমাত্র জলোচ্ছ্বাস। কেননা চাঁদ এখন লাল”।

(২) “একটিমাত্র চোখ, হেমলকে প্রতিবিম্বিত চক্ষুসদৃশ, তাঁহার দিকেই মিলন অভিসারিণী নববধূর দিকে চাহিয়াছিল, যে চক্ষু কাঠের, কারণ নৌকাগাত্রে অঙ্কিত, তাহা সিন্দুর অঙ্কিত এবং ক্রমাগত জলোচ্ছ্বাসে তাহা সিক্ত, অশ্রুপাতক্ষম, ফলে কোথাও এখনও মায়া রহিয়া গেল”।

মায়িক মানবিক জগতে রামকৃষ্ণের পথ থাকে – মানুষ কি কম গা? অমানুষের বর্বতার বলি যারা তাদের ক্ষমতাবিন্যাসের পরবর্তী সমীকরণে কিছু সহায়তা বাড়তেও পারে। অন্তর্জলি যাত্রার সীতারাম প্রভুতগর্বে কুকথাও বলেন যশোবতীকে। ঈর্ষা, ক্ষোভ, কাম,  ক্লোধ সবই এঁদের অদম্য, তবু দুষ্য নয়। ছেলেরা পিতার মৃত্যূ ত্বরান্বিত করতে চায়, তিনিও ছাড়েন না সিন্দুকের চাবি। অন্তর্জলিতে শুয়ে চাবি হৃত হলে তিনি কাঁদতে থাকেন। অথচ যশোবতীর দুঃখ সম্বন্ধে তিনি অসাড়। অন্যপক্ষে যশোবতী চণ্ডালকে আঘাত করেন, অভিশাপ দেন, এমনভাবে কামড়ে দেন যে চণ্ডালের রোম যশোবতীর মুখে চলে যায়। উপন্যাসে সময় অষ্টাদশ শতক হতে পারে, উনিশ শতকও। অষ্টাদশ শতকের রামপ্রসাদ (১৭২০-১৭৮১), উনিশ শতক শ্রীরামকৃষ্ণের (১৮৫৪-১৯৩২)। হালিশহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গঙ্গা, দক্ষিণেশ্বরের পাশ দিয়েও। আজও গঙ্গা বইছে। সমাজে আমাদের সুকৃতি দুষ্কৃতি উভয়েরই প্রতিক্রিয়া চলে।

মূলধারার সংস্কৃতিতে অবক্ষয় এসেছে মানুষকে অবমাননা করতে করতে। তখন কোনো একটা সাবকালচার মাথা তুলে তার বিদ্রোহ প্রকাশ করার স্বরলাভ করে থাকবে। একটা ক্রান্তি মুহূর্তে। তবে আমাদের সাধনা আমাদের মনন মানবপ্রেমের দিকনির্দেশিকা হয়ে দেখা দেয়। রেনেসাঁর প্রতিনিধি বলে রামকৃষ্ণও বলেন – ‘আমি তোমাদের দাসানুদাস, রেণুর রেণু’। বলেন স্ত্রীর কাছেও ঋণ থাকার কথা। ক্রমশ রদ হয় সতীদাহ, বন্ধ হয় বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, কৌলিন্যপ্রথার কোন দাঁতনখ থাকে না, অস্পৃশ্যতা ঘৃণ্য বলে উচ্চারিত হয়।

বিশ শতকে একুশ শতকেও প্রভুত্ববাদ সামন্ততন্ত্রের বেশে উপস্থিত হতে পারে। ক্ষুদ্র গোষ্টীপতির স্বার্থে অপরের স্বাধিকার হারিয়ে যায়। প্রাণ জানতেই পারে না যে কখন সে আততায়ী ক্লীবের হাতে নিহত হল! ভোগাতুর কর্ত্তব্যাকর্তব্য ভুলে যায়। এমন দিন তো ছিলই যেদিন গৃহীকে শমনের হাত থেকে বাঁচতেই সন্ন্যাস নিতে হয়েছে। দ্ব্যর্থকতা আছে, কিন্তু প্রতাপশালীর রক্তচক্ষুকে তার জন্য শাক দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে না। কর্ম আনন্দ ও প্রাণের অপচয় যেন না ঘটতেই থাকে তাই সামূহিক মানব বাঁচার ও বাঁচানোর চেষ্টা করে। সাধনার সঙ্গে বর্বতার দ্বন্দ্ব জারি থাকে।

মানবসভ্যতা একের নয়, পারস্পরিক দায়িত্ববোধের বিন্দু বিন্দুতে সিন্ধু। তাই তাতে কর্ত্তব্যবোধের পাশে নিরুপায়তাও আছে। ‘অন্তর্জলি যাত্রা’র সময় ১৯৬২। নতুন প্রাচ্য ভাবনার সমকালীন নির্মোহ মিশে তাই বিশেষ ডিসকোর্স তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য। ইমোশনের আত্মানুভব বৈষম্যের শৃঙ্খলযন্ত্রণাকে ছাড়িয়ে কি ভাবে উঠবে। জনপরম্পরায় বিশ্বাস, পরম্পরায় বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নতিতেই সামজ শ্রেষ্ঠ হয়নি; বড় হয়েছে দার্শনিক কালচারে, নির্মোহ পরশুশ্রূষায় অর্থাৎ মায়িক বন্ধনের মানবধর্মে। এই উপন্যাসে প্রথমাবধি স্তরে স্তরে বিশ্রুত হল ফুরিয়ে যাওয়ার, হারিয়ে যাওয়ার অথচ কাঁদিয়ে যাওয়ার মানুষের কথা। কথায় কথায় দ্বন্দ্বের সংশ্লেষও হয়।

লেখাটি ‘দেশকাল’ পত্রিকায় ২০১৬র ‘মে সংখ্যায় প্রকাশিত। সম্পাদক ও লেখকের অনুমতিতে ফের প্রকাশিত হল 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ