03 Sep

মানসের বোন

লিখেছেন:মৃদুল দাশগুপ্ত


হাঁটছিলাম। খান্না থেকে শ্যামবাজদার পাঁচমাথা কতোটুকুই আর পথ, সেখান থেকে বাসে উঠবো। পাঁচ মাথার মোড়ে গিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপারে বাস ধরবো, সিগন্যাল লাল হওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, দেখি স্টার্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ট্যাক্সির দরজা খুলে একটা ছেলে উঠতে উঠতে ব্যস্তসমস্ত হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে সিগন্যাল খোলা পেয়ে যেতে না পেরে পিছনের গাড়িগুলো হর্ন দিচ্ছে ড্রাইভাররা চেঁচাচ্ছে। আমাকে পেয়ে ট্যাক্সিতে উঠতে উঠতে ছেলেটা বললো দাদা প্লিজ এই প্যাকেটটা ওই মেয়েটাকে দিয়ে দেবেন … ওই যে ওই নীল শাড়ি পরা মেয়েটা … আঙুল তুলে বাগবাজার বাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণীর দিকে সে দেখালো…। ব্যাপারটা কয়েক সেকেন্ডের। ট্যাক্সিটা হুস করে খান্নার দিকে চলে গেলো, আমি দেখলাম আমার হাতে প্যাকেটটা, বাগবাজার বাটার সামনে মেয়েটা, নীল শাড়ি পরা মেয়েটা দূর থেকে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে, আমি তাকাতে সে হাত নাড়লো, সিগন্যাল লাল হতে আমি রাস্তা পার হয়ে মেয়েটার দিকে যেতে লাগলাম। আমিও ওখান থেকে টবিন রোডের বাস ধরবো।

রাস্তা পার হয়ে বাগবাজারের দিকে দুপা এগিয়েছি হঠাৎ জনা চারেক লোক আমাকে ঘিরে ধরলো। পিছন থেকে জামার কলার ধরে হ্যাঁচকা টান দিলো একজন, একজন প্যাকেটসহ হাত মুচড়ে ধরে বললো, একদম নড়বি না, বাকি দুটো লোক ধাক্কা দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে বললো, চল্ গাড়িতে ওঠ, তারা একটি থেমে থাকা পুলিশ ভ্যানের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। আমি হকচকিয়ে গেলাম, আমার মুখ দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছিলো না, ভয়ের আতঙ্কের কোনও শব্দও না। হতবাক আমি শুধু দেখলাম বাটার সামনে নীল শাড়ি পরা মেয়েটা ভিড়ের ভেতর মিলিয়ে যাচ্ছে। বাগবাজারের ওইখানটায় তখন বিকেলের রোদ পড়েছে। একটু দূর থেকেও মেয়েটার মুখ কেমন যেন মনে হতে থাকলো, চেনা চেলা।…

মুচিপাড়া থানার লকআপে অনেক রাতে আমার মনে পড়লো, মানসের বোন। আমি যখন নরেন্দ্রনাথ স্কুলে পড়তাম মানস ছিল সহপাঠী। সদ্‌চাষী পাড়ায় ওদের বাড়িতে খুব যেতাম হায়ার সেকেন্ডারি দেওয়ার বছরটায়, আমরা দুজনেই ছিলাম সুধীরবাবুর কোচিংয়ের ছাত্র।

পুলিশ  লকআপে আমাকে ভরে দেওয়ার আগে মুচিপাড়া থানায় আমাকে নিয়ে যাওয়া মাত্র একটা ঘরে ঢুকিয়েই পেটে একটা লাথি মেরে আমাকে মেঝেতে ফেলে দেওয়া হয়। তারপর মাথার চুলের মুঠি ধরে (তখন মাথায় ঝাঁকড়া চুল রাখাটা ছিল চল) মুখে ঘুষি। আমার নাক মুখ দিয়ে রক্ত বের হয়।

আমার জ্ঞান ফিরলে আমি দেখতে পাই আমাকে বসানো হয়েছে বড়োবাবুর (ওসি) ঘরে। ভিজে চুপসে হয়ে আছি জল ঢালা হয়েছিলো বলে। তখনই আমি জানতে পারি পুলিশ আমাকে ধরে এনেছে, কারণ তারা মনে করছে আমি মাদক পাচারকারী দলের লোক, কেউকেটাই একজন। সেই প্যাকেটটা ওসির টেবিলে খোলা রয়েছে, যেটাকে আমি কেক বা সন্দেশের বাক্স বলে ভেবেছিলাম, তাতে রয়েছে এল এস ড়ি। এদেশে তখনও ড্রাই নেশার জগতে হেরোইন, ব্রাউন সুগার-এর অনুপ্রবেশ ঘটেনি। এল এস ডি মারিজুয়ানা এসেছিলো ১৯৬৪-৬৫তে গয়া-কাশীতে আসা হিপিদের ঝোলাতে। আমি নরেন্দ্রনাথ স্কুল থেকে তিনটে লেটার নিয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর আমহার্স্ট স্ট্রিট সিটি কলেজে ইংরেজি অনার্স পাস করেছি, এম. এ. পড়ছি, মুচিপাড়ার ওসি বললেন তাতে কী! আপনাদের মতো ছেলে ছোকরাই তো এসব ছড়িয়ে দিচ্ছে, দলের নাম ধামগুলো জানিয়ে দিন তো। আমি কী করে কার নাম জানবো, আমি বিকেলের ঘটনাটার কথা জানালাম। ওসি বললেন ওরকম গল্প সবাই বলে।

এটা ১৯৬৯ সালের ঘটনা। তখন আমার বয়স ২১-২২। শিশু বয়সেই আমি পিতৃহারা। আমার বাবার কোনও ভাইবোন ছিলো না। বাবার দিক থেকে আমাদের তেমন কোনও আত্মীয়স্বজন ছিলো না। আমার মা একটা প্রাইমারি স্কুলে সিক্ষকতা করে তখন সবে অবসর নিয়েছেন। তখনকার দিনে স্কুলের শিক্ষকতার মাইনে তেমন ছিলো না। অভাবের সংসারে আমাকে মানুষ করেছেন। আমি কলেজে পড়ার সময় থেকেই ছাত্র পড়াতাম।

বোধ করি পুলিশ বরানগরে গোপাল লাল ঠাকুর রোডে আমাদের বাড়িতেও খোঁজখবর নিয়েছিলো। পরদিন আমার তিন ছাত্রকে নিয়ে উদ্বেগে পাগলের মোত ব্যাঙ্কশাল কোর্টে ছুটে এসেছিলো মা।

তখনকার দিনে মাদক পাচার রোধে আমাদের দেশে তেমন আইন ছিলো না। আমাকে জামিন অযোগ্য কয়েকটা ধারায় পুলিশ আদালতে তোলায় উকিল, আমারই এক ছাত্রের বাবা খুব একটা সুবিধা করতে পারলেন না। একেবারে হাতে নাতে এল এস ডির প্যাকেট সহ ধরেছে। জামিন মিলল না। প্রথমে ৭ দিন পুলিশ হেফাজতে ঠাঁই হলো আমার।

এবার আর মুচিপাড়া থানা নয়, লাল বাজারের লকআপে নিয়ে আসা হলো আমাকে। সেখানে ৭ দিনে বার তিনেক পুলিশ অফিসাররা বসালেন জেরায়। তাঁদেরও শ্যামবাজার মোড়ের ট্যাক্সির ছেলেটা, বাগবাজার বাটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীল শাড়ি মেয়েটা – সেই ঘটনার কথাই বললাম। শুধু নীল শাড়ি মেয়েটাকে মানসের বোন বলে মনে হওয়ার ঘটনা চেপে গেলাম। ট্যাক্সির ছেলেটাকে যেভাবে চিনি না, কখনও দেখিনি, সেভাবেই বললাম মেয়েটাকে চিনি না। ওঁরা কিন্তু চাপ দিচ্ছিলেন অন্য একটা বিষয়ে। সেই দিনই দমদম বিমান বন্দরে দুই বিমান যাত্রীর ব্যাগ থেকে পাওয়া গিয়েছিল মাদক, আমি দমদমি এয়ার পোর্ট থেকে শ্যামবাজার এসেছিলাম কিনা তা জানতে চাপ দিচ্ছিলেন ওঁরা। ধরা পড়া দুই বিদেশির ছবি দেখিয়ে মুখের ওপর জোরদার লাইট ফেলে ওঁরা প্রশ্ন করছিলেন. চেনেন এদের? কত টাকার ডিল হয়েছিল ? মুচিপাড়া থানার বিস্তর মারে আমার মুখ ফুলে গিয়েছিল। লালবাজার সে মুখে হাত বোলাতে বোলাতে বলছিলো, বলে ফেলো ভাই, এদের চেনো? কত টাকা, বাকিরা কোথায়?

ছবির নিগ্রো দুটোকে আমি চিনবো কী করে, আমি কাকুতি মিনতি করে, হায়ার সেকেন্ডারি ইংরেজি অনার্স, ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি এসব বলতে লাগলাম। এসব জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে বিস্তারিত বলার দরকার নেই। মানসের বোনের কথা আমি নিখুঁতভাবে চেপে যেতে পারলাম।

আবার ব্যাঙ্কশাল কোর্ট। এবার জেল হাজত। মাদক পাচারের এই মামলা আমার তরফে, অর্থাৎ বিচারাধীন আসামীর তরফে মুরোদ বেশি না থাকায় কয়েকটা শুনানিতেই নিষ্পত্তি হয়ে গেল। ৬ বছর সশ্রম জেল হয়ে গেলো আমার। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। প্রথম কয়েক দিনেই দেখলাম চোরচ্যাঁচোড়, মায় ডাকাত, সমাজবিরোধী বন্দিরা আমাদের মতো মাদক পাচারকারী (যদিও  আমি তা নই), ব্যাঙ্ক-জালিয়াতি এসব ধরনের বন্দিদের রেওয়াত করে। জেলের লাইব্রেরিতে ইংরেজি বইয়ের খোঁজ করায় কারাবন্দিদের নজরে পড়লাম। মা, ছাত্ররা প্রথম দিকে প্রতি সপ্তাহেই আসতো, বই নিয়ে। সশ্রম দণ্ড, জেলের বাগানে ফুল গাছের যত্ন আত্তি করতাম। ১৯৭০ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাস থেকে জেল উপচে পড়তে লাগলো। নতুন যারা আসতে লাগলেন, ক্রমে তারা এমন উৎসবে মেতে উঠলেন যেন চড়ুইভাতিতে এসেছেন। মাঝরাতে তারা জেল কাঁপিয়ে স্লোগান তুলতেন, নকশাল বাড়ি লালসেলাম। লোহার কারা টুটবে, লালসূর্য উঠবে। রাত দুপুরে লাল সেলাম লাল সেলাম আওয়াজে চারদিকে গাছপালায় কাক ডাকতে শুরু করে দিতো, যেন ভোর হয়ে গেছে। একদিন জেলের বাগানে দেখি শৈবালদা ঘোরাঘুরি করছেন, ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে আমার সিনিয়র ছিলেন। তাঁকে আমার সব ঘটনা বললাম। ক্রমে শৈবালদা ওদের পার্টির অনেকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন, রণবীরদা, সন্তোষ দা, ওঁরা জেলে পার্টিক্লাস নিতেন। মাঝে মাঝে আমিও গিয়ে বসতাম ওঁদের সঙ্গে। জেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে মা, দু-তিন ছাত্র মাঝে মাঝে আসত। একবার বিকেলে মা-কে দেখে মনে হলো, আরে, এত রোগা হয়ে গেছে মা, ধুকছে। ওটাই শেষ দেখা। এর তিন দিন পর জেলারঃ জীতেনবাবু মাঝরাতে ঘুম ভাঙিয়ে বললেন, আপনি কাল কোর্টে যাবেন, প্যারোল নেবেন, আপনার মা মারা গেছেন।

১২ দিনের প্যারোে বরানগরে মায়ের অন্ত্যেষ্টি, শ্রাদ্ধশান্তি ইত্যাদির সময়ই মনে হল, বরানগরের প্রতিবেশিরা, পাড়ার বন্ধুরা, মামাবাড়ির আত্মীয়স্বজনের কাছে আমি যেন অচ্ছুৎ হয়ে গেছি। যেন আমার কোনও সংক্রামক রোগ হয়েছে।

সে যাকগে ফের আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। সে বছর স্বাধীনতার দিন। জেলে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের রাতে খুব হই হই হতে লাগলো। স্লোগান উঠতে লাগলো। শহিদ বিশু লাল সেলাম, শহিদ তপাই লাল সেলাম, শম্ভু হেলা লাল সেলাম, তারক সানা লাল সেলাম, শহিদ গোপী লাল সেলাম। কাশীপুরের বীর শহিদ লাল সেলাম। কান্নাকাটিরও আওয়াজ পেলাম। পরদিন সকালে থমথমে মুখে অনেকেই বলাবলি করতে লাগলো বরানগর – কাশীপুরের বহু তরুণ-যুবককে মেরে ফেলা হয়েছে।

কী করে বুঝবো, আমার ছাত্র পরেশ, পরেশ চক্রবর্তী যে কিনা মাসে অন্তত তিনবার আসত জেলে আমার সঙ্গে দেখা করতে, সেও স্বাধীনতার দিন গলা কাটা অবস্থায় কাশীপুরে রতনবাবু ঘাটের কাছে কাদার ভেতর পড়েছিলো, আমার ছাত্র প্রবুদ্ধ আমাকে কাঁদতে কাঁদতে সে খবর জানালো জেলে, ভিজিটর্স আওয়ার্সে।ষ পরেশের বাবাই আমার মামলায় উকিল ছিলেন।

জেলে ড্রাগ অ্যাডিক্টদের নেশা ছাড়াতে একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার ছেলেরা আসতেন ফি সপ্তাহে। ১৯৭৪ সাল নাগাদ থেকে। ওই এনজিও দলটির নেতা রোহিত মনোজিতের সঙ্গে আমার ভারী আলাপ জমে গেল। উনি প্রথমে আমাকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট ধরে নিয়েছিলেন,. মাদক পাচারে জেল খাটছি বলে। আমি ওকে আমার গল্প বললাম, আমার মায়ের মৃত্যু, ছাত্র পরেশের গঙ্গাতীরে শহিদ হওয়ার ঘটনা পর্যন্ত। উনি বললেন, আপনি এটা লিখে দিন, আমাদের পত্রিকায় ছাপবো, রোহিতদের এনজিও তাদের ম্যাগাজিনে আমার লেখাটা ছেপে দিতে আমাদের জেলে বেশ চাঞ্চল্য ছড়িয়ে গেলো। রোহিতরা বেশ কিছু কপি জেলে অনেকের ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছিল।য জেলার জীতেনবাবু আমাকে ডেকে চা খাইয়ে খুব সমবেদনা প্রকাশ করলেন। শৈবালদা, সন্তোষদা, তাঁদের কমরেডরা, একজন প্রবীন কমিরেড, আমি তাঁর নাম ভুলে গেছি, তাঁরা ডেকে ডেকে আমাকে অনেক কথা বললেন। এসব দেখে, বন্দিদের মুখে মুখে শুনে চোর ডাকাতরাও আমার দিকে মায়াভরা চোখে তাকাতে থাকল। আমি দেখলাম এক কারাবন্দি ওই ম্যাগাজিন তার কয়েকজন সহকর্মীকে পড়ে শোনাচ্ছেন, আর আমার দিকে তাকাচ্ছেন। ওই দুঃসংয়ের দিনগুলোতেও জেলে আমার খাতির বেড়ে গেলো। কেটে গেলো কয়েকটা বছর।

জেলে আমার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছিলো। ছুটিছাটা, বিচারাধীন অবস্থায় কয়েকমাস জেলে থাকার ছাড়, জেলে ভালো হয়ে থাকার বোনাস – এসবের হিসেবে ৬ বছরের আগে আমার মুক্তি হয়ে গেলো। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী যেদিন পোখরানে ভারতের প্রথম পরমাণু বোমাটি ফাটালেন, জেলারের ঘরে আকাশবাণীতে সে খবরটি শুনে আমি জেলগেট পেরিয়ে ন্যাশনাল লাইব্রেরির সামনে এসে পড়লাম। মা নেই। বলতে গেলে, গুটি কয় ছাত্র ছাড়া আমার আর কেউ নেই। মানসের বোনেপ কথা মনে পড়লো আমার। এর মানে এই নয় যে মানসের বোন, কী যেন নাম তার, মনীষা তার সঙ্গে আমার কোনও ইয়ে টিয়ে ছিলো। তবু মনীষার কথাই মনে হলো, কেননা সে আমার জীবনের এই এতো বড়ো ঘটনা, এই কারাবাস, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। হয়তো তা আগোছে।

কেন জানি না, সে সময়, হয়তো অকারণেই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের তিনটি কবিতার কথা মনে এসে গেলো আমার। যেন এই মনীষাকে নিয়েই লেখা. প্রথমটি চতুর্দশপদী।

‘একটি রুমাল আমি খুঁজিতেছি বহুদিন ধরে

রুমালের খোঁজে গেছি মানসের বোনের সহিত’

দ্বিতীয়টিঃ

‘মনীষার ভালোবাসা মাহুতের চেয়ে ছিলো উঁচু’

তৃতীয়টিঃ

আজ তার ভিক্ষাই মনীষা’

এইসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে আমি ২৩০ নম্বর বাসে উঠে পড়লাম।

বরানগরে টবিনরোডে ঢুকে গোপাললাল ঠাকুর রোডে বাড়ির উদ্দেশ্যে যেতে যেতে ফের মনে হলো আমি এক সংক্রামক রোগী। তালা খুলে বাড়িতে ঢুকলাম যখন, ওপর থেকে বাড়িওয়ালা বললেন, ও আপনি! ছাড়া পেলেন, না জামি? আমি হেসে অনেক কথা বলতে চাইলাম, উনি বললেন, আমি একটু বেরোচ্ছি ভাই। আপনি বিশ্রাম করুন। কতদিনের ভাড়া বাকি, কী ব্যবস্থা হবে, আমি এসব আলোচনায় তাঁর সঙ্গে বসতে চাইছিলাম। কিন্তু তিন চারদিন ওঁর সহ্গে আর দেখাই হলো না। এই তিন চার দিন ব্যাঙ্ক ও পোস্টাফিসে খোঁজখবর নিয়ে দেখলাম আমার ও মায়ের হাজার ২০ টাকা রয়েছে, তখনকার দিনে একা মানুষের বছর দুয়েক চালানোর পক্ষে যথেষ্ট। পঞ্চমদিনে আমি বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা করে হাজার তিনের টাকা ভাড়া মেটানোয় তিনি খুশি হলেন। বললেন, এবার দেখুন, অন্য কোথাও ভাড়া পান কিনা। আমি মাস ৬ সময় চাইলাম। এরপর আমি ভদ্রকালীর দ্বারিকজঙ্গল রোডে চলে গিয়ে স্বস্তি পেলাম, এখানে আমার আর সংক্রামক রোগটি নেই। ইতিমধ্যে দেশে জরুরি অবস্থা জারি হয়ে গেলো। সেই জরুরি অবস্থায় দ্বারিকজঙ্গল রোডে একটি দুটি ছাত্র-ছাত্রী পড়িয়ে আমি বছর তিনেক যে জীবন কাটালাম তা সংগ্রামময় হলেও, দারিদ্রের নিঃসঙ্গজীবন। আমি যে ধরনের মানুষ, নিজের নিঃসঙ্গতা এবং দারিদ্র প্রকাশ্যে আনে না তারা।

এরপর আমাকে দেখা গেলো জেলা সদরে চুচড়োয় রাজনৈতিক বন্দিমুক্তির দাবিতে আন্দোলনে। ওখানেই ফের দেখা মাদক বিরোধী এনজিও-র রোহিত মনোজিতের সঙ্গে। রোহিত আমাকে একটা চাকরি দিলেন তাঁদের এনজিও-তে। ওই ম্যাগাজিনটি সম্পাদনার। বেতন স্বল্প, তবে আমার একার জীবন ছাত্র পড়িয়ে আর ম্যাগাজিনটি সম্পাদনা করে চলে যেতে লাগলো। অমৃতবাজার পত্রিকার তীর্থঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী ছিলো, সে অমৃতবাজারে আমাকে দিয়ে ফিচার লেখাত। তাতেও দক্ষিণা পেয়ে ফুর্তি হতো আমার। এসব ঘোরাঘুরিতেই ভবেশ বিশ্বাসের সঙ্গে আলাপ। অমৃতবাজার-যুগান্তর অফিসে উনি এসেছিলেন নিজের ভ্রমণ সংস্থার বিজ্ঞাপন দিতে। আমি অমৃতবাজারের রিপোর্টার মার্কাস দামের সঙ্গে কথা বলছি, ভবেশ বললেন, শুনুন ভাই একটু। ক্যান্টিনে চা খাওয়াতে খাওয়াতে ভবেশ বললেন, আমার ট্রাভেল এজেন্সি নতুন, একজন ইংরেজি বলিয়ে-কইয়ে ম্যানেজার দরকার, আসবেন ?

সাহেবি কেতাব ঝকঝকে অফিসষ থিয়েটার রোডে। বেশ ভাল বেতনই অফার করলেন ভবেশ। লেগে পড়লাম। দিব্যি চলতে লাগলো আমার। দ্বারিকজঙ্গল রোড থেকে ততদিনে উঠে এসেছি পাইকপাড়ায়। গড়িয়ার ছোটমাসি যোগাযোগ রাখতেন। মাঝে মাঝে যেতামও। মাসি বললেন, পল্টু, বিয়ে কর এবার। দেখবো মেয়ে ? ওই সময়টাতেই, আমাদের ভ্রমণ সংস্থা তখন রীতিমতো দাঁড়িয়ে গেছে। সেটা ১৯৮৫ সাল ভবেশ বললেন, ইউরোপের ৬ জনের একটা দল আসছে। দমদম থেকে দার্জিলিং যেতে চায়। আপনি নিজে যান মিস্টার চক্রবর্তী। ৬ সুইডিশকে আমি বাগডোগরা হয়ে দার্জিলিংয়ে নিয়ে তুললাম হোটেল স্নো ভিউয়ে। ৪ দিনের ট্যুর। দ্বিতীয় দিন দুপুরে ওদের বসিয়েছি লাঞ্চে হোটেলের রেস্তরাঁয়। আচমকা দেখি পাশের টেবিলটায় মনীষা, মানসের বোন! টকটকে লাল ফুল সোয়েটার গায়ে, ব্লু জিনস। এক চীনা যুবক আর এক চীনা তরুণীর সঙ্গে খেতে খেতে গল্প করছে। ওকে দেখে আমার অস্বস্তি হতে লাগলো। অক্টোবরের ঠান্ডায় আমি ঘামতে থাকলাম।

আর তখনই মনীষা, মানসের বোন আমাকে দেখে ফেললো। দেখলাম ওর কোনও অস্বস্তি হলো না। বরং ও উল্লাসিত। বেশ উচ্চস্বরে সে আমাকে দেখে বললো আরে মৈনাকদা, আপনি! উঠে এলো মনীষা আমার দিকে।

হতে পারে, অতো বছর আগে সেই শ্যামবাজার মোড়ের ট্যাক্সি, বাগবাজার বাটার সামনে তার দাঁড়িয়ে থাকা, ভিড়ে মিলিয়ে যাওয়া, আমার পুলিশের হাতে ধরা পড়া, এসব ঘটনার সময় আমাকে এক ঝলকে চিনতে পারেনি মনীষা। এমনও হতে পারে বাগবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা মনীষা ছিলো না, হয়তো আমারই ভুল হয়েছিল, সেই মেয়েটাকে মনীষার মতো দেখতে। আসলে সে মনীষা নয়।

দ্রুত এসব ভাবনা আমার মাথায় চক্কর দিতে লাগলো স্নো ভিউ হোটেলের রেস্তোরাঁয়। আমিও উঠে দাঁড়িয়ে মনীষাকে বললাম, মনীষা, কতবছর পর তোমাকে দেখলাম, মান,ের খবর কী ? কতদিন ওকেও তো দেখিনি।চীনাদের, থুড়ি ওরা চীনা নন। থাইল্যান্ডের আনুদিথ আর চুমপাইদের সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল সুইডিশদের। মনীষা বলল ভেষজ গবেষণার কাজে তারা দার্জিলিং এসেছে যাবে সিকিমেও। আনদিথ, চুমপাই ব্যাঙ্কক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উদ্ভিদ বিজ্ঞানী। তখন মনে পড়লো মনীষা উত্তরপাড়া প্যারীমোহন কলেজে বটানি পড়তো। থাই তরুণী উদ্ভিদ বিজ্ঞানীটি, চুমপাই ঘুরে ঘুরে ছবি তুলছিলো। তার অনুরোধে এক সুইডিশ আমার সঙ্গে মনীষা. চুমপাই আর আনুদিথের ছবি তুলে দিলেন। অনেকক্ষণ আড্ডা হলো ওই দুপুরে স্নো ভিউ হোটেলের লাউঞ্জে।

পরের বছর ফরাসি এক সাংস্কৃতিক দলকে দিল্লি থেকে কলকাতায় নিয়ে আসছি, দমদম এয়ারপোর্টে গোটা দলটির ভিসা-পারপোর্ট দেখিয়ে নেওয়ার পর আমি বেরিয়ে যাবো, ইমিগ্রেশন অফিসার আমাকে ডাকলেন, ইউ মিস্টার। আমি ভারতীয়, আমি কেন থেমে যাবো, ভাবতে দেখলাম বিমানবন্দর রক্ষীরা আমাকে ঘিরে ধরেছেন। তখনই ইমিগ্রেশনের ওই জায়গাটা কাচের থামে দেখলাম ওয়ান্টেড ক্রিমিনালদের নোটিশে ড্রাগ পাচারকারী হিসেবে সেই ছবিটা! মনীষা, আনুদিথ চুমপাইয়ের সঙ্গে আমার। দেখতে দেখতে এয়ারপোর্ট থানার পুলিশ এসে গেলো। সাদা পোশাকের আর উর্দিধারী পুলিশ অফিসাররা আমাকে ঠেলতে ঠেলতে বাইরে বের করে এয়ারপোর্ট থানার উদ্দেশ্যে নিয়ে চললেন। পিছনে পড়ে রইলো স্তম্ভিত হতবাক ফরাসি সাংস্কৃতিক দল। তখনও মোবাইল ফোন আসেনি। ট্রাভেল এজেন্সির বিশ্বাসকে আমি কিছুই তখন জানাতে পারলাম না।

প্রথমবার গ্রেপ্তার হয়েছিলাম যখন, তখন মাদকচালান রোধে আমাদের দেশে তেমন শক্ত পোক্ত আইন ছিলো না। কড়া আইন ১৯৮৫ সাল থেকেই চালু হয়ে গিয়েছিলো। নারকেট্রিক ড্রাগ ট্রাফিকিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট। এয়ারপোর্ট থানায় আমাকে নিয়ে যাওয়া, তারপর আদালত – এসব বিষয়ে ফের বিবরণ লেখা নিষ্প্রয়োজন। সংক্ষেপে বলি, এবার পাঁজড়ার একটা হাড় ভেঙে গেলো আমার। সেখানে ধাতব প্লেট বসানো হয়েছে। ৯ বছরের সশ্রম জেল হয়েছিলো আমার।

সেই কারাবাসও যথাসময়ে শেষ হয়ে গেছে। যাটোর্ধ্ব বয়সে আমি এখন দিব্যি আছি। মুক্ত, স্বাধীন, একলা মানুষ। আমার সেই নিঃসন্তান বিধবা মাসি মারা গিয়েছেন, আমি তখন জেলে। তিনি তাঁর গড়িয়ার বাড়িটি আমার নামে লিখে দিয়ে গেছেন। ওই বাড়িতে আমি একলা থাকি। ভ্রমণ সংস্থায় কয়েক বছর কাজ করেছিলাম, ছবি তোলা আমার নেশা। আজকাল পত্রিকার ডা. পল্লব বসুমল্লিক ‘সফর’ পত্রিকাটিতে আমাকে দিয়ে মাঝে মাঝেই ভ্রমণ কাহিনী লেখান। ভালই দক্ষিণা জোটে। নানা জায়গায় আমি ঘুরে বেড়িয়েছি, ছবি তুলেছি, সে সব লেখার, শুনেছি পাঠক পাঠিকারা কদর করেন।

এই সেদিন বিকেল বেলায় সেক্টর ফাইভে আজকাল অফিসে পল্লবকে লেখা-ছবি জমা দিয়ে বাইরে এসে উল্টোদিকের গুমটিতে চা খাচ্ছি, হঠাৎ দেখলাম মনীষা। বুড়ি হয়েছে, একটু পৃথুলা, তবে মুখটি তো ভোলবার নয়। আজকাল অফিসের পাশেই একটি বহুতল নির্মীয়মান, সবে ৫/৬ তলা গড়া হয়েছে, চারিদিকে তক্তা, লোহা লক্কর ছড়ানো, ও মা, মনীষা সে সবের ভেতরেই ঢুকে পড়লো। তারপরই দেখলাম ধীরে ধীরে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। অস্তসূর্যের রোদ পড়ছে তার চোখে মুখে।

কেমন একটা কৌতুহল হল। ভূততাড়িতের মতো রাস্তা টপকে আমিও ওই বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। নিচে তাস খেলছিল কয়েকটা লোক, মিস্ত্রিটিস্ত্রি বোধহয়। তারা বললো, কাকা, কিধার যা রহা। ক্যামেরা দেখিয়ে বললাম, এই একটু ছবি তুলবো। তারা আপত্তি করলো না।

মনীষা অনেকটা ওপরে উঠে গিয়েছিলো। মনে হলো ও ছাদের দিকে যাচ্ছে। আমি অনুসরণ করলাম। বেশ হাফ ধরে যাচ্ছিল আমার। আমি প্রায় ছাদে এসে গেছি, তখনই বিকট একটা শব্দ শুনলাম। এর পরই আমি ছাদে পৌঁছে দেখলাম, শূন্য ছাদ। তখন নিচে খুব হই হই হতে লাগলো। বিশাল ছাদে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকলাম। হঠাৎ একটা কিশোর কোত্থেকে এসে আমার দিতে হিংস্রভাবে তাকিয়ে বললো, তুমনে উস আওরত কো ধাক্কা দিয়া, খুন কিয়া। নিচ থেকে দুদ্দাড় ওপরে উঠে আসতে লাগলো, কলরব – খুন, খুন, পুলিশকো বুলাও …..

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায় on September 7, 2018

    এক নিশ্বাসে পড়ে ফেলার মত একটা সুন্দর গল্প। সাবলীল, যেন ছবি ভেসে উঠছিল চোখের সামনে। গল্পের সঙ্গে সঙ্গে তিরিশ চল্লিশ বছর অতিক্রম করলাম,মসৃন ভাবে। কোথাও হোঁচট না খেয়ে। শেষটিও অনবদ্য।

    spsarkar on September 8, 2018

    মানসের কি হল? তার ব্যপারে বোনের কাছে কিছু কথা হলো না কেন?| যাই হোক খুব সুন্দর গল্পো |সাবলীল গাতি|

    মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ