03 Sep

সাইবার ফাউন্ডেশন

লিখেছেন:বিশ্বজিৎ সাহা


একটা থ্রি-কোয়ার্টার ফেডেড জিন্স আর স্লিভলেস টিশার্ট পরে সিটি সেন্টারের সামনের রাস্তাটা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে বর্ষা। আজ বেশ গরম পড়েছে। দুপুরের পর তাই কলেজ কেটে কয়েকজন বন্ধুর সাথে সিটি সেন্টারে এসেছিলো সে। একটা এয়ার কন্ডিশনড রেস্তেরাঁতে বসে অনেকটা সময় কাটানোর পর এখন একা একা বাড়ি ফিরছে বর্ষা। এবছরই আঠারোয় পা দিয়েছে মিস্টার এন্ড মিসেস চ্যাটার্জির একমাত্র মেয়ে বর্ষা। বন্ধুরা সকলেই তার মেন্টেইনেড করা সৌন্দর্যের তারিফ করে। তার পিছনে আবার অনেকে বলে ন্যাকা। তাদের সল্টলেকের বাড়িতে একটা অটো ধরেই পৌঁছে যাওয়া যায় এখান থেকে।
অটোস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য কিছুটা রাস্তা হেঁটে যেতে হয়। বর্ষার মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। জিনসের পকেট থেকে হেডফোনটা বের করে দু’কানে গুঁজে নিলো সে। নিজের স্মার্টফোনটা থেকে জাস্টিন বিবারের একটা গান চালিয়ে সমস্ত পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো বর্ষা। কয়েক মুহূর্ত পরেই ভাইব্রেট করে উঠলো ফোনটা। পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখলো তার সোশ্যাল মিডিয়ার একাউন্টে বাইশটা নোটিফিকেশন। কাল রাতে যে পিকটা আপলোড করেছিল তাতে প্রচুর লাইক আর কমেন্টস করেছে বন্ধুরা। মনটা আরও খুশি হয়ে গেলো বর্ষার। একটার পর একটা কমেন্ট খুলে দেখে দেখে রিপ্লাই করতে শুরু করলো। রাস্তাটা পার হবার আগে একবার চোখ তুলে দেখে নিলো, বেখেয়ালে যদিও। আবার ডুবে গেলো মোবাইল ফোনে। এরপর প্রচন্ড জোরে একটা শব্দ, চারদিক অন্ধকার।

নার্সিংহোমে যখন চোখ খুললো, অনুভব করলো কোমরের নিচের অংশটা অসাড়। উঠে বসে চরম উৎকণ্ঠায় হাতড়াতে থাকলো। নিজের পা দুটো আর খুঁজে পেলো না বর্ষা। আশংকায় চিৎকার করে উঠলো সে।
ঘুম ভেঙে নিজের বিছানায় উঠে বসে সবার আগে হাত দিয়ে দেখলো যে তার পা দুটো এখনও অক্ষত আছে। কপালের ঘাম মুছে সে চুপ করে বসে রইলো কয়েক মুহূর্ত। এয়ার কন্ডিশনারটা এডজাস্ট করে বাইরের দিকে তাকালো। সকাল হয়ে গেছে। বিগত কয়েক দিনে একাধিকবার সে এই ধরণের স্বপ্ন দেখেছে। এখনও কাউকে কিছু জানায়নি। মনে মনে ভাবলো, আজ বাপি অফিস থেকে ফিরলে এই নিয়ে কথা বলবে। মায়ের তুলনায় বাপির সাথেই তার সম্পর্ক বেশি সাবলীল। বাপি তাকে অনেক ভালো বুঝতে পারে। মায়ের শাসন তার কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়। পেশা হিসাবে করে চলা স্কুল শিক্ষিকার রোলটা থেকে নীলিমা চ্যাটার্জী যেন কখনোই বাইরে বের হতে পারেন না। অথচ নিজের অফিসে জাঁদরেল বস হলেও বাড়িতে নিরীহ, শান্ত স্বভাবের মানুষ রাতুল চ্যাটার্জী।
মেয়ের কাছে সমস্ত কথা শোনার পর এক সাইক্রিয়াটিস্ট বন্ধুর পরামর্শে রাতুল যোগাযোগ করলেন সাইবার ফাউন্ডেশনের সাথে। খুব কম লোকেই এর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে। ভারতে এরা যে কাজটা এই সবে শুরু করেছে ইউরোপ এবং আমেরিকার মতন মহাদেশের বিভিন্ন দেশে কয়েক বছর আগেই তার সফল প্রয়োগ হয়ে গেছে। বাড়ি ফিরে পুরো ব্যাপারটা বর্ষাকে বুঝিয়ে বললেন রাতুল। প্রথমে আপত্তি করলেও বাপির উপর তার অগাধ বিশ্বাসের কারণে শেষ পর্যন্ত রাজি হলো বর্ষা। নীলিমার তো শুনেই জ্ঞান হারানোর মতন অবস্থা। বাবা-মেয়ে মিলে অনেক কষ্টে তাকে সামলালো।
আজ রাতুল নিজের সাথে করেই নিয়ে এসেছে বর্ষাকে। পার্ক স্ট্রিটের কাছেই একটা মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিংর ছ’তলায় উঠে ওরা দেখতে পেলো কাঁচের দরজায় নীল রঙের হরফে লেখা “সাইবার ফাউন্ডেশন”। ভিতরে ঢুকে ভিজিটর বুকে নিজেদের ডিটেইলস লেখার পর ওরা গিয়ে বসলো রিসেপশনের সামনে রাখা সোফাতে। চারদিকে দেখতে পেলো বিভিন্ন আকারের ছবি। সবকটিই মোবাইল আর কম্পিউটারের থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট। তাতে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া এবং এপ্লিকেশনের লোগো সহ নানান তথ্য দেওয়া রয়েছে। একে একে আরও দুজন এসে হাজির হলো। তারাও ভিজিটর বুকে নিজেদের ডিটেইলস লিখে সোফায় এসে বসলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই একজন রিসেপসনিস্ট এসে তাদের সকলকে একটা ফর্ম ভরার জন্য দিয়ে গেলো।
মিনিট পনেরো পর সেই রিসেপসনিস্ট ফিরে এসে ফর্মগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে বললো, এপ্লিকেন্টরা এবার আমার সাথে চলুন। বর্ষা একটু নারভাস হয়ে রাতুলের দিকে তাকালো। রাতুল তাকে উৎসাহ দিয়ে বললো, তুই যা ওনার সাথে। আমি অপেক্ষা করছি। সব ঠিক হয়ে যাবে। বর্ষার মাথায় হাত রাখলো তার বাপি। রিসেপসনিস্ট তাদের যে ঘরটায় নিয়ে গিয়ে বসলো সেখানে আগে থেকেই আরও দুজন বসে ছিল। সব মিলিয়ে পাঁচজন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। হালকা নীল রঙের পেন্ট করা এই ঘরটার দেয়ালেও বিভিন্ন ধরণের ছবি, সবই মানুষের বিভিন্ন মুহূর্তের। তাদের মধ্যে কেউ হাসছে বাঁধভাঙা উল্লাসে। কেউ আড্ডা দিচ্ছে বন্ধুদের সাথে। আবার পরিবারের সাথে সময় কাটানোর মুহূর্তে তোলা কারুর ছবি। ঘরে ঢুকে সকলেই দেখতে লাগলো ছবিগুলিকে। যত দেখছে ততই একটা অস্বস্তি যেন গ্রাস করছে তাদের মনকে। অদ্ভুত এক অনুভূতি, যেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ওদের। ঘরের তাপমাত্রা বেশ ঠান্ডা। তাও আধঘন্টা বসে থাকার পর ওরা কেমন যেন হাইপার হয়ে উঠলো। একে ওপরের সাথে দু-একটা কথা বললেও ক্রমশ বিরক্তি বোধ হচ্ছিলো ওদের সকলেরই। ইচ্ছে হচ্ছিলো দৌড়ে বেরিয়ে যেতে। কিন্তু তার উপায় নেই। দরজা বাইরে থেকে বন্ধ আর অন্য কাউকে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম তাদের কাছে নেই, এমনকি নিজের মোবাইল ফোনটাও জমা রেখে আসতে হয়েছে।
প্রায় ঘন্টাখানেক পর হঠাৎ করে উদয় হলেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। ফর্মাল শার্ট-প্যান্ট আর বাদামি রঙের ম্যাট ফিনিশ জুতোতে বেশ মার্জিত তার চেহারা। গায়ের রংটা বেশ ফর্সা, গাল ভর্তি কাঁচা পাকা ট্রিম করা দাড়ি, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। সবমিলিয়ে একটা বেশ ইম্প্রেসিভ লুক। সকলকে উদ্দেশ্য করে স্মিতহাস্যে বললেন, গুড মর্নিং বিউটিফুল লেডিজ এন্ড হ্যান্ডসাম জেন্টলমেন। কেমন আছেন আপনারা? ঘরে বসে থাকা সকলেরই বিরক্তিটা যেন একটু কাটলো। ভদ্রলোকের উপস্থিতিতে কিছু একটা ব্যাপার আছে। সকলেই একসাথে বলে উঠলো গুড মর্নিং। ভদ্রলোক নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন আমি ড: অনিরুদ্ধ সান্যাল। আমেরিকায় মায়ো ক্লিনিকে রিসার্চ ফেলো হিসাবে কাজ করি। আমার বিষয় সাইবার সাইকোলজি। কিছু ইনফরমেশন শেয়ার করার জন্যই আজ আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। তাতে আপনাদের ব্যক্তিগত জীবন হয়তো উপকৃত হতে পারে। আসলে আজকের আলোচনার বিষয়গুলি এতটাই সাধারণ যে আমরা তা নিয়ে ভাবার কথা ভাবতেই ভুলে যাই, অথচ প্রতিনিয়ত তা আমাদের সাথে ঘটে চলেছে। সময়ের অভাবে সকলের সাথে আলাদা করে কথা বলা সম্ভব হলো না। আমরা একটা জেনারেল ডিসকাশনের মাধ্যমে সেশনটা এগিয়ে নিয়ে যাব। প্রথমেই ইন্ট্রোডাকশন রাউন্ড, সাথে নিজেদের সমস্যাগুলোও সবিস্তারে বলবেন। তার আগে একটা প্রশ্ন। এখানে বসে থাকার সময় আপনারা কি কোনোরকম ডিসকম্ফোর্ট ফিল করেছেন, বিশেষ করে যখন আপনাদের কাছে কোনো গ্যাজেট ছিল না? সকলেই প্রায় একসাথে বলে উঠলো, হ্যা। ড: সান্যাল হাসলেন। বললেন, এবার তাহলে শুরু করা যাক।
হাই এভরিওয়ান! আমি জাহ্নবী রায়। বাড়ি গড়িয়ায়। বয়স ৩৮। বেসিকালি হাউস ওয়াইফ। আগে একটা কনসাল্টেন্সিতে রিক্রুটার হিসাবে কাজ করতাম। এখন সারাদিনই প্রায় একা নিজের সাথে সময় কাটাই, বাড়িতে। একমাত্র ভালোলাগার কাজ মোবাইল সার্ফিং। আর সেটাই এখন আমার কাছে এক বড় সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। বেশিরভাগ সময়েই মোবাইল ফোনটা যেন আমায় টানে। বার বার মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো নোটিফিকেশন এসেছে। আর যখন নিজের একাউন্টটা খুলি, কিভাবে যে সার্ফিং করতে করতে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায় নিজেও বুঝতে পারি না। এর পর আমার মাথায় যন্ত্রনা শুরু হয়। আমার পারিবারিক জীবন প্রচন্ড ক্ষতিগ্রস্ত। প্রথমে তো আমি বুঝতেই পারতাম না। আমার ন’বছরের মেয়ে একদিন বললো যে আমি নাকি অনেক বদলে গেছি। তার সাথে নাকি ভালো করে কথাই বলি না। সারাদিন মোবাইল ঘাঁটি। আস্তে আস্তে উপলব্ধি করলাম এই সমস্যার ব্যাপারটা। তাই এক বন্ধুর পরামর্শে এখানে আসা। একদম সামনের চেয়ারে বসে কথাগুলো বললেন আকর্ষণীয় চেহারার ভদ্রমহিলা।
পাশে বসা বছর তিরিশের সুঠাম যুবক গলা ঝেড়ে বলে উঠলো, আমি তরুণ জাভেরি। বড়বাজারে আমাদের ফ্যামিলি বিজনেস আছে। ওটাই দেখাশোনা করি। বাড়ি হাওড়ায়। মোবাইল সার্ফিং করাটা আমার একটা নেশা। কাজ করতে করতেও মাঝে মধ্যেই মোবাইল না ঘটলে আমার চলে না। বিগত কয়েকদিন ধরে কাজ করার সময় বেশ সমস্যা হচ্ছে। অনেক কিছুই ভুলে যাচ্ছি আমি। এমনকি আগের দিন কত টাকার জিনিস বিক্রি হয়েছে তাও মনে রাখতে পারছি না। ডাক্তার দেখিয়েছিলাম, তিনিই রেফার করলেন।
ড: সান্যাল এবার পাশের জনকে বলার জন্য ইশারা করলেন। শার্প চেহারার স্মার্ট ভদ্রলোক কাটা ইংরেজিতে বললেন, আমি ইন্দ্রনীল সেন। বাড়ি দমদম পার্কে। বয়স ৩৬। একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অপারেশন হেড হিসাবে কাজ করছি গত এক বছর ধরে। আমার সমস্যাটা বড্ড অদ্ভুত। প্রত্যেক দু’চার মিনিট অন্তর আমার মনে হয় আমার ফোনটা ভাইব্রেট করছে। অথচ ফোন হাতে নিয়ে দেখি সেরকম কিছুই না। বিগত বেশ কিছুদিন ধরে এটা একটা অবসেশনের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমার স্ত্রী কোথা থেকে যেন আপনাদের যোগাযোগ পেয়েছিলো।
এতক্ষন খুব মনোযোগ দিয়ে তিন জনেরই কথাগুলো শুনলেন ড: সান্যাল। এবার চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, আগে এই সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করা যাক। বাকিদেরটা তার পর শোনা যাবে। সবার আগে আপনাদের জানিয়ে রাখি যে “সাইবার ফাউন্ডেশন” কি কাজ করে। আজকের এই দ্রুতগতির পৃথিবীতে মোবাইল, ইন্টারনেট, ল্যাপটপ- আমাদের বালিশ আর কোলবালিশের জায়গা দখল করেছে। ঠিক এই কারণে যে কমপ্লিকেশনগুলো সৃষ্টি হচ্ছে সেই সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা আর কিছু প্রিভেন্টিভ মেজার বলে দেওয়াই এই সংস্থার কাজ। তবে সমস্ত ব্যাপারটাই এপ্লিকেন্টদের নিজেদের হাতে। আমরা শুধুই তাদের কিছু তথ্য দিয়ে সাহায্য করি। প্রায় ৯০% কেসে আমরা এপ্লিকেন্টদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।
এবার ড: সান্যাল প্রজেক্টরে একটা প্রেসেন্টেশন দেখিয়ে বলা শুরু করলেন। আমরা কেস টু কেস বেসিসে সমস্যাগুলি নিয়ে আলোচনা করবো। এই যে মিসেস রায়ের যে সমস্যা সেটা বিশ্বব্যাপী “ডিজিটাল কোকেন” নামে পরিচিত। অনলাইন আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা এই নাম দিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার এই আসক্তি কিন্তু মাদকাসক্তির চেয়েও ভয়ঙ্কর হতে পারে। ব্রেন স্ক্যান করে দেখা গেছে অনলাইন আসক্ত এবং মাদকাসক্তদের ক্ষেত্রে একই রকম ছবি আসে। উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্রেনের সামনের দিকের হোয়াইট ম্যাটার অংশগুলি ক্ষয়ে যায়। এই অংশই মানুষের আবেগ, মনোযোগ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। হোয়াইট ম্যাটার ক্ষয়ে যাওয়া মানে এই বিশেষ ক্ষমতাগুলির ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। মানুষের মস্তিষ্কে ডোপামিন নামক এক ধরণের কেমিকেল নিঃস্বরণ হয় প্রতিমুহূর্তে। যে কোনোও ব্যাপারে ভালো লাগার অনুভূতি এই ডোপামিন নিঃস্বরণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে মানুষ সেই মুহূর্তে আরও ভালো লাগা অনুভব করতে চায়, এবং ক্রমশ আরও বেশি। অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃস্বরণ ঘটিয়ে ভালো লাগার অনুভূতিকে সাময়িক ভাবে বাড়াতে চাওয়াই হচ্ছে আসক্তি। এর একমাত্র চিকিৎসা হচ্ছে নিজেকে ভালো লাগার সেই জিনিসটা থেকে দূরে রাখা। মাদকাসক্তদের যেমন মাদক দ্রব্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। তবে এখনো সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তদের জন্য কোনোও রিহ্যাব তৈরি হয়নি।
মি: জাভেরি, আপনার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হল মনোসংযোগের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া। গবেষণায় দেখা গেছে খুব বেশি করে যারা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন তাদের মাল্টিটাস্কিং এর ক্ষমতা অন্যদের চেয়ে কম। তাদের মনোযোগ খুবই বিক্ষিপ্ত। এর ফলে তাদের স্মৃতিশক্তিও আস্তে আস্তে কমতে শুরু করে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে। ধরুন, আপনি খুব মনোযোগ দিয়ে একটা হিসাব করছেন। হঠাৎ আপনার ফোনটা বেজে উঠলো। তখন আপনার সম্পূর্ণ একাগ্রতা নষ্ট হতে বাধ্য। তাই আস্তে আস্তে আপনাকে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার সীমাবদ্ধ করতে হবে। একাগ্রতা নিয়ে কাজ করার সময় চেষ্টা করবেন নিজের মোবাইল ফোনটাকে দূরে সরিয়ে রাখতে। খুব ইম্পরট্যান্ট না হলে কাজের সময় কল রিসিভ করা থেকেও বিরত থাকুন।
এবার আসি ইন্দ্রনীল বাবুর কেসে। ভেরি কমন, কিন্তু হাইলি আন্ডার রেটেড। আজকের দিনে যারা অতিরিক্ত মোবাইল ফোনের ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৬৯% এই বিশেষ সিম্পটম টের পেয়েছেন। তবে আপনি যেরকম ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিয়েছেন অনেকেই তা করেন না। আসলে মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরণের হ্যালুসিনেশন তৈরি করে। মনোবিজ্ঞানীরা একে বলেন, “ফ্যান্টম ভাইব্রেশন সিনড্রোম”। স্মার্টফোনের ব্যবহার আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে এতটাই প্রভাবিত করেছে যে বিনা কারণেও আমাদের মাঝে মধ্যেই মনে হয় কেউ ফোন করলো অথবা মেসেজ কিংবা হোয়াটস্যাপ। ইন্দ্রনীল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। বললেন, অফিসের কাজে আমায় স্মার্টফোন প্রতিনিয়তই ব্যবহার করতে হয়। ড: সান্যাল স্লাইডশোটা বন্ধ করে বললেন, একটাই রিকোয়েস্ট করবো। বাড়ি ফিরে অথবা রাস্তায়, যখনই কাজের বাইরে থাকবেন ওই যন্ত্রটা নিজের থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। হয়তো তাতে সাময়িক কিছু অসুবিধা হবে তবে আপনার জীবনের চেয়ে তার দাম বেশি হতে পারে না।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ড: সান্যাল বললেন, এখন আমরা একটা ব্রেক নেবো। আধ ঘন্টা পরে আবার এখানেই দেখা হবে। পার্টিসিপেন্টরা সকলেই নিজেদের চিন্তাভাবনাগুলোকে নতুন ভাবে সাজানোর একটা সুযোগ পেলো। হঠাৎই আর দেখা গেলো না ড: সান্যালকে। সকলেই যে যার মতো ফ্রেস হয়ে আবার নিজের জায়গায় এসে বসলো। নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথাবার্তায় আধঘন্টা সময় কেটে গেলো।

আবার হঠাৎই আবির্ভুত হলেন ড: সান্যাল।
সকলকে অভিবাদন জানিয়ে শুরু করলেন। বললেন, আজকের দিনে পৃথিবীর প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ বিভিন্নভাবে ইন্টারনেট, মোবাইল, কম্পিউটারের ব্যবহার করে থাকেন। তাদের মধ্যে আবার প্রায় ৭০% এর অতিরিক্ত ব্যবহার করেন। ফলস্বরূপ আমাদের শরীর এবং মনে তার গভীর প্রভাব পড়ছে। এই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ আমাদের নিজেদেরই হাতে রয়েছে। যতটা কম সম্ভব এই মাধ্যমগুলির ব্যবহারই এর একমাত্র চিকিৎসা। কথাগুলি বলে তিনি থামলেন এবং তাকালেন বর্ষার দিকে। বর্ষা পরিচয় দিয়ে স্ববিস্তারে নিজের সমস্যার কথা জানালো।
ড: সান্যাল এবার বাকি আর একজনের দিকে নির্দেশ করলেন। বছর ছাব্বিশের সুন্দরী যুবতী বললেন, আমার নাম জোনাকি ব্যানার্জী। একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়াই। বাড়ি ব্যারাকপুর। গত দু’মাস ধরে খুব ডিপ্রেশনে ভুগছি। সাইক্রিয়াটিস্ট দেখিয়েছিলাম। তিনিই একবার এখানে আসতে বললেন। সমস্যাটা খুলে বলি। ফেসবুকে এক বন্ধুর সাথে আলাপ হয়েছিল প্রায় দুবছর আগে। আসতে আসতে কথাবার্তা বাড়ে। সম্পর্কটা বেশ এগিয়েছিল। ভালোবাসতে শুরু করেছিলাম তাকে। হঠাৎ একটা ছবি দেখে সন্দেহ হয়। এক মহিলার প্রোফাইলে তার ছবি খুঁজে পাই। অনেক কষ্টে স্বীকার করে যে সে বিবাহিত। তারপরেও নিজের স্ত্রীর সম্পর্কে যাচ্ছেতাই বলে সে আমায় কনভিন্স করেছিল। আমাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ এবং শারীরিক সম্পর্কও ছিল। সে আমায় কথা দিয়েছিল যে স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়ে আমায় বিয়ে করবে। তবে বিগত কয়েক মাস ধরে সে আর আমার সাথে যোগাযোগ রাখছে না। ফেসবুকে ব্লক করে দিয়েছে। যে দুটো নম্বর দিয়েছিলো তাও ডিএক্টিভেটেড। আমি প্রচন্ড হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম। নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছি না এই কথা ভেবে যে আমার মতন একজন ম্যাচিওর্ড মানুষ কিভাবে এই ভুল করলো।  ড: সান্যাল এবার বর্ষার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার কেসটা ভেরি রেয়ার। এই ধরণের সিম্পটম দেখা যায় এক্সটেন্সিভ হ্যালুসিনেশনের ক্ষেত্রে। যখন মানুষ ক্ষতি সম্পর্কে আওয়ার থেকেও সেই কাজ করা থেকে নিজেকে বিরত করতে পারে না। নিয়মিত কাউন্সিলিং প্রয়োজন এই ক্ষেত্রে। ড: সান্যাল এতক্ষন স্থানুর মতন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এবার স্লাইডশো বন্ধ করে একটু সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললেন, আরও কিছু সাধারণ ব্যাপার বলে রাখি। শুনতে অবাক লাগলেও সোশ্যাল মিডিয়া আসলে আমাদের আরও বেশি করে আনসোশাল করে তুলছে। মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতা বহুগুন বেড়ে যাচ্ছে। গবেষণা বলছে একজন মানুষ যখন সামনাসামনি কারুর সাথে কথা বলে তখন ৩০-৪০% সময় নিজের ব্যাপারে বলে। বাকিটা অন্যের কথা শোনে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় চ্যাটিংয়ের সময় ৮০% ব্যয় করে নিজের কথা বলে। ভেবে দেখুন আত্মকেন্দ্রিকতা কতগুণ বেড়ে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় তৈরী হওয়া সম্পর্কগুলোও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কারণ ভার্চুয়াল মানুষ আর রক্ত মাংসের মানুষ এক হয় না। এছাড়াও আজকাল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ৭৯% মানুষ “সাইবার বুলিং” এর স্বীকার হন। এর ফলে তাদের মানসিক, শারীরিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি স্বীকার করতে হয়।
একটুক্ষণ থেমে ড: সান্যাল বললেন, আজকের মতন সময় শেষ। আশা করি আজকের এই আলোচনা আপনাদের ব্যক্তিগত কিছু সমস্যা সমাধানে সাহায্য করবে। তবে অভ্যেসগুলো আপনাদেরই বদলাতে হবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিজ্ঞানের ব্যবহার আমাদের করতেই হবে। তবে তার মাত্রা নির্ধারণ করাও আমাদের হাতেই রাখতে হবে। অতিরিক্ত যে কোনও কিছুরই পরিনাম খারাপ হয়। সকলকে শুভকামনা জানিয়ে বিদায় নিলাম। আপনাদের কেস হিস্ট্রি এবং প্রেস্ক্রিপশন যথাসময়ে ইমেল করে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। হঠাৎ গায়েব হয়ে গেলেন ড: সান্যাল। সকলেই অবাক হয়ে গেলো ব্যাপারটা দেখে। তাদের খেয়াল হলো ব্রেকের সময়ও এই ভাবে হঠাৎ ভ্যানিশ হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
ঘরের ভিতর ঢুকে এলেন রিসেপশনে থাকা ভদ্রমহিলা। সকলের হাতে একটা করে পার্টিসিপেশন অ্যাকনলেজমেন্ট লেটার দিয়ে বললেন, সাইবার ফাউন্ডেশনের তরফ থেকে সকলকে ধন্যবাদ। ইন্দ্রনীল সেন প্রশ্ন করলেন, ড: সান্যাল হঠাৎ কোথায় গায়েব হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা ঠিক কি বলুন তো? ভদ্রমহিলা হাসলেন। বললেন, ড: সান্যাল আসলে একটা ইমেজ। সারা পৃথিবীতে ৭২টি দেশে ২৩৯ টি জায়গায় একই সময় তিনি এই কাউন্সিলিং চালালেন। আসলে এইট ডাইমেনশনাল প্রযুক্তিতে সিমিলারিটি থিওরিকে কাজে লাগিয়ে সবকটি জায়গায় ওনার ইমেজ ফুটে ওঠে। আমেরিকায় মায়ো ক্লিনিকে বসেই প্রযুক্তির সাহায্যে তিনি এক সাথে সকলের কাছে পৌঁছে যান। উনি ইংরেজিতে কথা বললেও বিশেষ এক যন্ত্র তার কথা অটো ট্রান্সলেট করে বিভিন্ন ভাষায়। দীর্ঘ এই আলোচনার সময় ২২ জন ডাক্তারের একটা টিম কাজ করে, সাথে সাথে সমস্যাগুলো এনালাইজ করার জন্য। আপনাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তারাই তৈরী করেন। ট্রান্সলেটর যন্ত্রটি তা কনভার্ট করে দেয় ড: সান্যালের মাধ্যমে।
এই হলো সাইবার ফাউন্ডেশন। ড: সান্যালের উর্বর মস্তিষ্কের সন্তান। অনেক বড় স্কেলে সারা পৃথিবী ব্যাপি আওয়ার্নেস ছড়ানোর জন্যই এই কর্মযোগ্য।

সকলের মুখেই বিস্ময়ের ছায়া। একে ওপরের মুখ চাওয়াচায়ি করে উঠে দাঁড়ালো। বাইরে বেরিয়ে এসে বাপির সাথে যখন দেখা করলো তখনও বিস্ময়ের ঘোর লেগে আছে বর্ষার চোখে মুখে। রাতুল মেয়ের অবস্থা বুঝতে পেরে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। বেরিয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসলো দুজনে। রাতুলের মোবাইল ইমেলের নোটিফিকেশন দিলো। খুলে দেখলো বর্ষার কেস হিস্ট্রি আর কিছু এডভাইস এসেছে সাইবার ফাউন্ডেশনের আই ডি থেকে। রাস্তায় যেতে যেতে বাপিকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললো বর্ষা। এবার অবাক হবার পালা রাতুলের।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ