14 Oct

অস্তু

লিখেছেন:সিদ্ধার্থ সান্যাল


মাসে একবার এই শনিবারের কিটি পাৰ্টিটাতে  আসতে নন্দিতার বেশ ভালোই লাগে ! ঠিক করে বলতে গেলে আসবার জন্যে ও প্রায় মুখিয়ে থাকেই বলা যায় ! দক্ষিণ কলকাতার অভিজাত পাড়ার এই ‘ঘরোয়া’ নামের  আবাসনে ফ্ল্যাটভাড়া নিয়ে ওরা এসেছে মাসতিনেক হলো ! ওরা মানে নন্দিতা আর ওর স্বামী সুপ্রতিম ! তা আবাসনের নামটা যেমন ‘ঘরোয়া’ তেমনি মানুষগুলোও বেশ হাসিখুশী আর মিশুকে ! অন্তত নন্দিতার যত মহিলার সঙ্গে এতদিনে আলাপ হয়েছে তাদের তো ওর খুব ভালোই লেগেছে ! ওদের বি ব্লকের দশ বারো জন  মহিলা মিলে একটা কিটি পার্টি চালান ! তার প্রধান হচ্ছেন তিনতলার সুমনা বৌদি ! ভদ্রমহিলা হৈ হৈ করে সবসময় এ বারান্দা থেকে ও বারান্দায় কথা বলছেন আর ওঁর ছেলেদুটো  বেলাবেলি স্কুলে বেরিয়ে গেলেই ঘন্টা দুয়েকের জন্য ফ্ল্যাট ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ছেন ! এই তো দোতলায় নন্দিতার কাছে এমাসেই দু তিনবার আসা হয়ে গিয়েছে ! তা ওর তো বেশ ভালোই লাগে ! এমনিতে জামশেদপুরের মেয়ে নন্দিতার বিয়ে হলো গতবছর হায়দরাবাদের প্রবাসী ছেলে সুপ্রতীমের সঙ্গে ! কি ভাগ্য বছর না ঘুরতেই সুপ্রতিমের বদলী হলো কলকাতায় ! বাবা মার কাছাকাছি চলে আসার আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে নন্দিতার একটু চিন্তাও ছিল কলকাতার অজানা পরিবেশে একা একা সারাদিন ও সময় কাটাবে কি করে ! পড়াশোনা সবই  জামশেদপুরে হওয়ার কারণে কোলকাতা ওর কাছে এক অজানা শহরই…..চব্বিশ বছরে বোধহয় দুতিন বার দুর্গাপুজোর সময় আসা ছাড়া ! তা সে তো প্রায় না-আসাই  হোলো !

কিন্তু প্রথম মাসেই সুমনা বৌদির পাল্লায় পড়ে কিটি পার্টির মেম্বার হয়ে ব্লকের প্রায় সব মহিলাদের সঙ্গে তাড়াতাড়ি আলাপ হয়ে গেলো নন্দিতার ! বোধহয় অনেক দিন পরে কিটিতে এক নতুন সদস্য ও বয়সে নন্দিতা সকলের থেকে অনেক ছোট হওয়ার কারণে ওর দিকে সকলের নজরও থাকছে বেশী ! কারণে অকারণে নানারকম মেয়েলী পরামর্শও উড়ে আসছে ! কিটি পার্টিতে সব থেকে বেশী জোরালো কথাবার্তা বলেন দাপুটে টিচার একতলার অনুরাধাদি ! নন্দিতার মনে হয়েছে বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই ডিভোর্স  হয়ে যাওয়ার জন্যই বোধহয় ওঁকে অনুরাধাদি বলে ডাকতে পরামর্শ দিয়েছে সুমনাবৌদি !

এই তো আজ শনিবার জোরদার তর্ক চলছে একতলার অপর্ণার্বৌদির বাড়ির কিটিতে ! প্রথম রাউন্ডের চা আর স্ন্যাকসের সাথে আলোচনার বিষয়  হচ্ছে এই পশ্চিমবংগে এখন আর কেন বড়ো মাপের মানুষ জন্মাচ্ছে না ! সুমিতাবৌদি বোধহয় ইতিহাসের ছাত্রী ছিল……উত্তেজিতভাবে বললো, ‘এই বিংশ শতাব্দীতেই  দ্যাখ না, সাহিত্য, সংগীত, সিনেমা, পেন্টিং, দর্শন, ইকোনমিক্স, রাজনীতি, সমস্ত, সমস্ত বিষয়ে বিশাল বিশাল সর্বভারতীয়….না সর্বভারতীয় কেন, ওয়ার্ল্ড ক্লাস……ওয়ার্ল্ড ক্লাস নাম খুঁজে পাবি ! কিন্তু দ্যাখ গত পঞ্চাশ বছরে….যেন খরা চলছে…..এদিক ওদিক দু-একটা ছুটকো ছাটকা ছাড়া কোনো জায়েন্ট নাম বল দেখি , যে ষাটের দশকের পরে জন্মেছে ?’ নন্দিতার পাশের ফ্ল্যাটের মলিনা বৌদিদের আদি বাড়ী ছিল ঢাকায়, একটু মিন মিন করে বললো, ‘না মানে, বাংলাটা ভাগ হয়ে গিয়ে…. ওপার বাংলা….’ মলিনাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সুমিতা ঝাঁঝিয়ে উঠলো…..’কি বলতে চাচ্ছিস…ওপার বাংলায় কি এখন  মনীষীদের চাষ হচ্ছে ?’ মলিনাবৌদি আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে গেলো ! সুমিতার কথার ধরণে কেউ কেউ হেসে উঠলো ! নন্দিতা চুপচাপ শুনে যাচ্ছে, মজাও পাচ্ছে !

এবার সিরিয়াস গলায় চারতলার সুচেতা বললো, ‘অপ্রেশন…..অপ্রেশন ! পরাধীন বাংলায়, ব্রিটিশ কুশাসনের আর অপ্রেশনের জন্যেই সব প্রতিভাগুলোর বিকাশ হয়েছিল ! শুধু আমাদের বাংলা কেন…. ঐসময়ে সারা দেশের দিকে দ্যাখ তাহলেই বুঝবি ব্যাপারটা ! আরে কয়লা জিনিসটা চাপ নিয়েই হীরে হয়ে যায় এটা বুঝছিস না কেন ?’ জবাবে সুমিতা বোধহয় কিছু বলতে যাচ্ছিলো অনুরাধাদি চায়ের কাপটা সশব্দে টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীর স্বরে বললেন…..’ইন্দিরা গান্ধী’ ! সব্বাই অনুরাধাদির দিকে ঘুরে গেলো ! উনি যে এতক্ষন চুপচাপ শুনছিলেন আর তর্কে যোগদান করেননি সেটা বোধহয় এতক্ষণে সকলের খেয়াল হলো ! সবাই চোখ চাওয়াচাওয়ি করছে…..অনুরাধাদি আবার জলদগম্ভীর স্বরে  বললেন, ‘এই সব কিছুর জন্যে দায়ী ইন্দিরা গান্ধী এটা জেনে রাখ তোরা !’ সকলে চুপ, একটু বা হতচকিত ! সুমিতাই প্রথম বলে উঠলো, ‘অনুরাধাদি, এর মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী আসছেন  কোথা থেকে ! তুমি কি সেই কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের বঞ্চনার কাসুন্দি ঘাঁটতে শুরু……!’ হাতটা তুলে সুমিতাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অনুরাধাদি বললেন, ‘তোরা ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীর বাঙালী মহাজনদের নিয়ে আলোচনা করছিস আর তাদের জন্মরহস্য নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিস না !’ সুচেতা বললো, ‘মনীষীদের জন্মরহস্য…….মানে ? কি বলতে চাইছো তুমি ?’

অনুরাধাদি পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে, ‘রবীন্দ্রনাথ মহর্ষির কততম সন্তান?’ সুমিতা ঝটিতি জবাব দিলো, কেন, যারা শেষঅবধি বেঁচেবর্তে ছিল তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সবথেকে ছোট, বোধহয় তেরোতম !’ অনুরাধাদি বললেন, ‘ঠিক ! আর নেতাজী ?’ সুমিতা বললো, ‘চোদ্দজনের মধ্যে নবম !’ অনুরাধাদি বললেন, ‘বাঃ, একদম ঠিকঠাক বলছিস ! তবে শোন, শরৎচন্দ্র আর বঙ্কিম পঞ্চম, স্বামীজী ষষ্ঠ, রাজা রামমোহন, আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র আর ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব তৃতীয়, বিধান রায় পঞ্চম….. আরও বলবো ? বাবামার একমাত্র সন্তান হয়ে টিমটিম করছে ওই কেবল সত্যজিৎ রায় ! তা হবে নাই বা কেন ! বাবা সুকুমার রায়ই তো পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে দিলো পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে !’ সুচেতা একটু থতিয়ে গিয়ে বললো, ‘হ্যাঁ সবই ঠিক ! তা এর মধ্যে রহস্যটা কোথায় আর ইন্দিরা গান্ধীই বা কি করলেন ?’

অনুরাধাদি  বললেন,’বাঃ, ইতিহাস পড়াস আর ইতিহাস ভুলে যাচ্ছিস ! ইন্দিরা গান্ধী এসেই তো পার্লামেন্ট-এ বিল পাশ করিয়ে দিলেন, গর্ভপাত আইনী হয়ে গেলো ! তবে ?’ একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুরাধাদি বললেন, ‘তারপর থেকে কে জানে কতো পোটেনশিয়াল বাঙালী মনীষী হয়তো পৃথিবীর আলোই আর দেখতে পেলো না! এখন তর্ক করে আর কি হবে ! আর ওর ব্যাদড়া ছোট ছেলেটাও ছিল আরও এককাঠি সরেস ! দেশ জুড়ে জবরদস্তি এমন ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের হাওয়া তুলে দিলো যে আমাদের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালীরা এখন তিনদশক ধরে  বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত করে হাম দো হামারা এক কোরাস গেয়ে যাচ্ছে ! আর এই টিভি-টাও হয়েছে যাকে বলে একেবারে যাচ্ছেতাই…..রাত বারোটা অবধি সবকটা চ্যানেল চলছে তো চলছেই ! তার সঙ্গে নতুন যোগ দিয়েছে এই মোবাইল আর হোয়াটসআপ ! কোথায় আর কি হবে ! তবে হ্যাঁ ! এসবে  লাভ হয়েছে আমাদের মতো টিচারদের ! এই যে বিকেল পাঁচটা বাজলেই দশ পনেরোটা বাবা মার একলৌতা বাচ্চা পড়তে চলে আসছে, আমার মতো আরও পাঁচজনের কাছে যাবে সপ্তাহের সাত দিন…..টিউশনি, গান, নাচ, সাঁতার, পেন্টিং….আর এই নিয়ে তো তাদের বাবা মা-রা তো সবসময় মোমবাতির মতো গলে গলে পড়ছে ! আরে বাবা, তোরা ভেবে দ্যাখ না, ঠাকুরবাড়িতে যদি ফ্যামিলি প্ল্যানিং থাকতো তাহলে কি আমরা, রবীন্দ্রনাথ, গগনেন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী, অবনীন্দ্রনাথ, জ্যোতিরীন্দ্রনাথ, বলেন্দ্রনাথ, জ্ঞানদানন্দিনী, সরলাবালা, এদের পেতাম ? ওই আপনভোলা দার্শনিক পাগলা দ্বিজুবাবুকে নিয়েই আমাদের খুশী থাকতে হতো ! আর সত্যেন্দ্রনাথ নেই তাই জ্ঞানদানন্দিনী-ও থাকতেন না……..আমরা এখন মালকোঁচা দিয়ে শাড়ী পরে……পান চিবোতাম !’ ডিভোর্সী, নিঃসন্তান অনুরাধাদি বোধহয় দম নেবার জন্য থেমে গিয়ে একটা চিকেন পকোড়া মুখের মধ্যে ফেললেন ! সবাই  চুপ…..সাম্প্রতিককালে বাঙালীসমাজে  মনীষী-অপ্রতুলতার পক্ষে ‘ঘরোয়া’ আবাসনের মহিলা -ঘনাদার এই অকাট্য যুক্তির অভিনবত্বেই সম্ভবতঃ ! বি ব্লকের একতলার ঘরে তখন ৭২ বনমালী নস্কর লেনের চিলেকোঠার নীরবতা !

 

এখন বিকেল প্রায় ছটা বাজতে চলেছে ! পার্টি থেকে নন্দিতা ফিরে এসেছে অনেকক্ষন ! সুপ্রতিম আজ তাড়াতাড়ি অফিস থেকে আসবে….নন্দিতাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা পাকা হয়ে আছে ! গত মঙ্গলবারে ব্যাপারটা কনফার্মড  হয়ে যাবার পরে কয়েকদিন ধরে দুজনে অনেক আলোচনা করে ঠিক করেছে, এখন নয়, আরও বছর দুয়েক অপেক্ষা করা যেতেই পারে ! আনমনা হয়ে নন্দিতা এঘর ওঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে……ফ্ল্যাটের কলিং বেলটা বেজে উঠলো ! সুপ্রতিম ঘরে ঢুকে অবাক হয়ে বললো, একি তুমি এখনো তৈরী হওনি…..সাতটায় তো ডাক্তারের য়্যাপয়েন্টমেন্ট ! নন্দিতা জবাব দিলো, ‘যাবো না……তাই তৈরী হইনি !’ সুপ্রতিম একটু উদ্বিগ্ন হয়ে বললো, ‘কি হলো……শরীর ঠিক নেই…..কাল যাবে ?’ নন্দিতা জানলার ধারে সরে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘না, কালও যাবো না ! মানে, আমি যাচ্ছি না !’

সুপ্রতিম অত্যন্ত অবাক হয়ে গিয়ে বললো, ‘সেকি…….কেন ?’

‘সে তুমি বুঝবে না’, বলে নন্দিতা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো !

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ