14 Oct

চুয়াল্লিশটি গোলাপ

লিখেছেন:তাপস রায়


খবরটা পড়েই আনমনা হয়ে গেলেন  অনিরুদ্ধ।  বিবাহিত জীবনে বিচ্ছেদের ঘটনা হামেশাই ঘটছে। না পোষালে একসাথে থাকার কোনও যুক্তি নেই। কিন্তু তাই বলে এই বয়সে! এখন তো আরও বেশি করে একে অন্যকে আঁকড়ে ধরার সময়।

খবরটা দুঃখ দিলেও অনিরুদ্ধের স্মৃতি রোমন্থনের নেশাকে একটু তা দিয়ে দিল। তাঁর ও শাঁওলীর এতগুলো বছরের  সম্পর্কের স্মৃতি জমতে জমতে আজ পাহাড়। এ পাহাড়ে সুখ ও তৃপ্তির বাহারি গাছপালা যেমন আছে আবার ছোট ছোট দুঃখ ও অতৃপ্তির জংলী লতা-পাতাও আছে। সব জড়িয়ে-পেঁচিয়ে একসাথে। কিন্তু আজ অবধি কোনও অতৃপ্তিই  তাঁর বাঁ পায়ের হাঁটুর ব্যথার চেয়ে বেশি কষ্টের মনে হয়নি। ওঁদের জীবনে ব্যথাটা কি এতই প্রবল যে এই বুড়ো বয়সেও বিচ্ছেদের মামলা করতে হবে? কে জানে বাবা, হবে হয়ত।

ভাবতে ভাবতেই তাঁর আনমনা দৃষ্টি সাবান-জলের বুদ্বুদের মত কাগজের উপর ভাসতে ভাসতে টুপ করে  কাগজের তারিখটায় গিয়ে পড়ল। দেখেই লাফ দিয়ে ওঠার জোগাড়। প্রতিবেদনটা আজকের দিনেই বেরল?  ষাটোর্ধ মানুষের মধ্যে বিচ্ছেদের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। একেই বলে কো-ইনসিডেনস। আজকের তারিখটাই বা তিনি ভুলে গেলেন কী করে? কোনও বছর যা হয় না। ছি ছি!

অনুতপ্ত অনিরুদ্ধের মনে হল, দেখি তো শাঁওলীর মনে আছে কি না তারিখটা।

কাগজে মাথা লুকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ কত তারিখ যেন?”

মুহূর্তের নৈঃশব্দ্য।

“পেপারে কি লেখা নেই তারিখ, আমায় জিজ্ঞেস কোরছ!” স্বরে গাম্ভীর্য, কিন্তু তলে তলে রসের চোরা স্রোত-ও যে বইছে তা  টের পেলেন অনিরুদ্ধ।

“সে তো আছে। কিন্তু তুমি বলো, আজ কত তারিখ?” মাস্টারমশাইদের স্টাইলে যাচাই করতে চাইলেন। কাগজটা প্রজাপতির মতো পাখা মেলে আড়াল করেছে তাঁর হাসি-হাসি মুখ।

“কেন আমার জেনে কী হবে? তুমি জানো তাহলেই যথেষ্ট!”  শাঁওলী হাসি চাপতে পারেন না। ফিক করে বেরিয়ে আসে।

রান্নাঘর থেকে মুখ ভেংচিয়ে বলেন, “পেপার দেখে উনি জানতে পারলেন, আজ কত তারিখ!”

পেপারটা ফটাস করে মুখ থেকে সরিয়ে দুভাঁজ করে সেন্টার টেবিলে ফেলে দিলেন অনিরুদ্ধ। শাঁওলীর  দিকে মুখ ঘুরিয়ে সমস্ত নকল দাঁতগুলো বার করে হাসলেন।

“তোমার মনে আছে? তাহলে বলো!”

“প্লি-ই-জ, তোমার ওই দাঁতগুলো দেখিয়ো না। বুড়ো বয়সে  তারিখ-টারিখ নিয়ে বেশি পুলক ভালো না। পেপার পড়ছিলে, পেপার পড়ো।” অ্যাকোয়াগার্ড থেকে বোতলে জল ভরতে ভরতে শাঁওলী উত্তর দিলেন। প্রসঙ্গটা জিইয়ে রেখে প্রশ্ন করলেন, “তুমি বাংলা তারিখ জানতে চাইছ, না ইংরাজী?”

“ধুস! বাংলা দিয়ে আমার কী হবে? বলো না তাড়াতাড়ি। বেশি নকশা কোর না।”

“নকশা আমি করছি, না তুমি? আজ উনিশে সেপ্টেম্বর, কী হয়েছে তাতে, অ্যাঁ?” ভুরু নাচিয়ে প্রশ্ন করেন শাঁওলী। কন্ঠস্বরের গা থেকে গাম্ভীর্যের পাতলা আস্তরণটি খসে  যায়। হাসতে থাকেন। খিল-খিল কিল-কিল ধ্বনি শুনে যে কারও মনে হবে কোনো  দশ বারো বছরের বাচ্চা হাসছে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন এ হাসি কোনো পঁয়ষট্টি বছরের প্রবীণার।

বিবাহবার্ষিকী নয়,  উনিশে সেপ্টেম্বর ছিল তাঁদের রঁদেভু। হাজরার কাছে, বসুশ্রী সিনেমাহলের উলটোদিকে। ওইখানেই অপেক্ষা করছিলেন শাঁওলী। আজ থেকে পাক্কা চুয়াল্লিশ বছর আগে। অনিরুদ্ধ তখন সরকারী দপ্তরে ক্লার্কের চাকরি করতেন।

দুদিন আগে রাত ন’টার সময় পাড়ার একটি পরিচিত ছেলে বেমক্কা বাড়িতে এসে অনিরুদ্ধের হাতে একটি ছোট খাম ধরিয়ে দিয়ে বলে, “দিদি দিয়েছে, আপনাকে।”

“কী এটা? কে দিদি?” উত্তর দেওয়ার আগেই পত্রবাহক ধা। কৌতূহলের সাথে খামটি খোলেন অনিরুদ্ধ। একটা কাগজ। তাতে লেখা–অনিরুদ্ধ, এভাবে ছাড়া আমার কাছে  অন্য কোনও উপায় ছিল না। আমি আপনাকে মনে মনে ভালবাসি। জানিনা আপনি কী মনে করবেন। হয়তো ভাববেন আমি খুব খারাপ মেয়ে। আপনি আমাকে খুব তাড়াতাড়ি জানাবেন। ইতি, শাঁওলী।

শাঁওলী আবার কে? প্রথমে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন অনিরুদ্ধ।  হতবুদ্ধি ভাব কাটিয়ে  অনেক ভেবেচিন্তে উদ্ধার করেন, আচ্ছা, ওই মেয়েটি! যোগমায়াতে বিএসসি পড়ত। ভাইয়ের কাছে বই দেয়া-নেয়া সূত্রে একবার-দুবার বোধহয় বাড়িতে এসেছিল। নামটা জানা ছিল না, বা শুনে থাকলেও ভুলে গিয়েছিলেন।

একজন মেয়ে তাকে প্রস্তাব দিয়েছে। অপ্রত্যাশিত ব্যাপার। শিহরণ বয়ে যায়। কী করা উচিৎ ভেবেই পাচ্ছিলেন না। চিঠিটা পড়ে পড়ে মুখস্থই হয়ে গেল। হাসিও পেয়েছিল। তারপর একবার মার ঘরে ড্রেসিংটেবিলের আয়নায়  নিজেকে দেখেছিলেন অনিরুদ্ধ। আরে বাহ্ বছর সাতাশের এক তরুণ দাঁড়িয়ে আছে। কী ফিগার! শর্মিলা ঠাকুরের মত চিকন কোমর। রোগা রোগা হাত পা। চৌকো মত একটা মুখ। কী আছে তাঁর মধ্যে যার জন্য..?  হবে কিছু। যা তাঁর অজানা। হয়ত ওই মেয়েটিই জানে। সারারাত এপাশ-ওপাশ করেন। ভোরবেলা ঘুম আসে।

মেয়েটির মন্দ কিছু চোখে পড়েনি। এমন সুন্দরী নয় যে দেখলেই দৃষ্টি আঠার মত আটকে থাকে, তবে পরিচ্ছন্ন মুখশ্রী। লম্বাটে গড়নই বলা যায়। চুলের বেণী শিরদাঁড়ার পথ বেয়ে কোমর অবধি ঝুলে থাকতো। গায়ের রঙ শ্যামলা নয়। আবার খুব ফরসাও নয়। তবে হালের  মেয়েদের মত স্কিনের কেয়ার নিলে হয়ত ঔজ্জ্বল্য বাড়ত। ওদের বাড়িটা খুব সাধারণ। অনিরুদ্ধের বাড়ি থেকে দুশো গজের মধ্যে হবে। কী কান্ড! এত কাছাকাছি প্রেম? সে হোক। প্রেম তো সামনেওয়ালী খিড়কির চাঁদের টুকরোর সাথেও হয়। সিনেমাতেও, বাস্তবে-ও। দেখা দরকার মেয়েটির স্বভাব-চরিত্র কেমন। আর পাঁচটা চপল মেয়ের মত রাস্তায় দাঁড়িয়ে হ্যা-হ্যা করে দাঁত বার করে কোনও ছেলের সাথে কথা বলতে সে পর্যন্ত দেখা যায়নি। একই পাড়ার, তাই আসতে যেতে পথে অনেকবারই দেখা হয়েছিল। কিন্তু ডরপোক অনিরুদ্ধ  মেয়েদের দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারতেন না। মাঝে-সাঝে সুযোগ বুঝে তাকাতেন। দু’একবার মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে মনে হয়েছিল সে অনিরুদ্ধকে দেখছেই না। সিনেমার নায়িকাদের  মত উন্নাসিক ভঙ্গিতে  পাশ কাটিয়ে চলে গেছে। এহেন নায়িকা ভেতরে ভেতরে এই অনিরুদ্ধের প্রতিই দুর্বল? লোকে  বলে, মেয়েদের মন বোঝা দুষ্কর। অনিরুদ্ধের মনে হয়েছিল, কথাটার মধ্যে সারবত্তা আছে। কী করবেন, সেটাই ছিল তখনকার সমস্যা। এসব ব্যাপারে পাকা খেলুড়ে তিনি নন। অনেক ভেবে ঠিক করেন সেই পত্রবাহকের মাধ্যমেই খবর পাঠাবেন। বসুশ্রী সিনেমাহলের উলটোদিকে দেখা করবেন তিনি।

ওই দিন হেডক্লার্ককে ‘একটু পার্সোনাল কাজ আছে’ বলে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বার হন। পরেছিলেন আলমারিতে যত্নে তুলে রাখা তাঁর প্রিয় অফ-হোয়াইট কালারের শার্ট আর নস্যি কালারের বেল-বটম প্যান্ট। জুতোটাও খুব করে পালিশ করেছিলেন। বাসে করে হাজরায় নেমে হন্তদন্ত হয়ে বসুশ্রী হলের সামনে পৌঁছে যান। ওই তো দাঁড়িয়ে! হলুদ জমিনে সবুজ পাড়ের শাড়ি। বাঁ-কাঁধে ম্যাচিং করা সবুজ রঙের কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। সামনে আসতেই শাঁওলীর সলাজ হাসি। কপালে একটি  টিপ। সবুজ রঙের। দুদিন আগেই বিশ্বকর্মা পুজো গেছে। উৎসবের রেশ তখনও ছিল। কাছাকাছি কোনো রিক্সাস্ট্যান্ডে মাইকে ‘কটি পতঙ্গ’ ছবির গান বাজছিল, ‘ইয়ে শাম মসতানি মদহোশ কিয়ে যায়/ মুঝে ডোর কোয়ি খিচে তেরি অর লিয়ে যায়।’ আকাশে কয়েকটি ঘুড়িও উড়ছিল। বিকালের সূর্য   তার আরক্ত আভা ছড়িয়ে দিয়েছিল। তারই ছিটেফোঁটা পড়েছিল শাঁওলীর মুখে। ওর শরীর থেকে বাতাসে মিশে যাওয়া পারফিউমের আঘ্রাণে অনিরুদ্ধ  ক্রমশ নিজেকে হারিয়ে ফেলতে থাকেন। অনেক কষ্টে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করেন।

“আমরা কি হাঁটতে হাঁটতে কথা বলতে পারি?”

শাঁওলী মাথা নেড়ে, স্মিত বদনে সম্মতি দিয়েছিলেন। রুমাল দিয়ে মুখটা মুছতে গিয়ে অনিরুদ্ধের রুমালটা গেল মাটিতে পড়ে। আবার হাসি শাঁওলীর। এ হাসির অর্থ, ধরা পড়ে গেছেন অনিরুদ্ধ। হাঁটতে হাঁটতে ঢাকুরিয়া লেক, গড়িয়াহাট, এদিক-সেদিক। দু’বছর বাদে  বিয়ে। তারপর হঠাৎ একদিন পুটুস করে একটি পুত্র সন্তান হয়ে গেল। তারও পাঁচ বছর বাদে কুটুস করে আর একটি সন্তান। এটিও পুত্র। শাঁওলী ও তাঁর দুই সন্তান পুটুস ও কুটুসের সাথে বিয়াল্লিশ বছরের লম্বা সংসার জীবনের পথ হাঁটতে হাঁটতে অনিরুদ্ধের আজ বাঁ পাটা ব্যথা। হাঁটুর রোগ। মালাইচাকিতে কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে জানেন না। ডাক্তার দেখান নি। ভাঁজ করতে পারেন না। ভাঁজ করলে খুলতে পারেন না। বছর দেড়েক আগে  শাঁওলীর হার্টের অসুখ ধরা পড়ল। হঠাৎ একদিন বুকে অস্বস্তি, মাথা ঝিমঝিম দিয়ে জানান দিল।  সবসময়  ক্লান্তি ও অবসাদের ভাব। অনিরুদ্ধ দেরি না করে পুটুস আর কুটুসকে ফোনাফুনি করে কলকাতায়  ডেকে এনেছিলেন। ওরা দুই ভাই-ই মাকে খুব ভালবাসে। কোনও ঝুঁকি না নিয়ে মাকে ভেলোরে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ওখানকার ডাক্তার পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানাল, হাই বিপি ও কোলেস্টেরল আছে। হার্টের স্বাস্থ্য ভাল নয়। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে। তেল বা চর্বিযুক্ত খাবার একদম বন্ধ। আর টেনশন ও অ্যাংজাইটি থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকতে হবে। অনিরুদ্ধ শুনেছিলেন, মেয়েদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যেই এই রোগের প্রোব্যাবিলিটি বেশি। কেননা ছেলেরা প্রতিদিন বাইরের জগতের লক্ষটা টেনশনের মুখোমুখি হয়। হল কী না শাঁওলীর! বয়স তাদের চোখেও থাবা বসিয়েছে। দুজনের কেউই  চশমা ছাড়া কোনও কিছুই স্পষ্ট দেখেন না। কিন্তু একটি ছবি তাঁরা এখন-ও খালি চোখেই দেখতে পান। উনিশে সেপ্টেম্বর, প্রথম আলাপের ছবিটা। জলজ্যান্ত, ঝকঝকে!

ট্যাঁ করে কলিং বেলটা বাজতেই ঘোর কেটে যায় অনিরুদ্ধের। কে আসলো! শেফালি বা নিমাইয়ের মা-ই হবে। শাঁওলী ধীর পায়ে গিয়ে দরজাটা খুলে দেন। ও মা, আজ দুজনে একসাথে! ঘরে ঢুকতে না ঢুকতে শেফালির উদ্দেশ্যে শাঁওলীর কড়া বার্তা, “শোন্ শেফালি ঘরের কোণা-ঘুঁজিগুলো কিন্তু ভালো করে ঝাড় দেয়া হচ্ছে না।” শেফালি কোনও উত্তর না দিয়ে ফুল ঝাড়ুটা আনতে যায়। রান্নাঘরে ঢুকে পড়ে নিমাইয়ের মা। রান্নায় ভালই হাত। শাঁওলীর অসুখটা ধরা পড়ার পর থেকে কুটুসের জেদাজেদিতে রেখে দিয়েছেন। দু’বেলা রান্না করে। মাসে পাঁচ হাজার টাকা নেয়।

“শোনো নিমাইয়ের মা আজ মোরলা মাছ করো। আলু ঝির-ঝির করে মাছের সাথে ভালো করে একটা  মাখো-মাখো মত বানাও। তোমার কাকুর ফেভারিট। আর, আর হ্যাঁ ডাল তো করছই! ঝুড়িতে একটা লাউ কাটা আছে। ওটা দিয়ে ঘন্ট বানিয়ে দিয়ো। দ্যাখো আবার নষ্ট হয়ে গেল কী না। দুদিন ধরে তো পড়ে আছে।”

“করলা ভাজা?” নিমাইয়ের মা জিজ্ঞেস করে।

“ও হ্যাঁ! ওটা পাতে না পেলে তো তোমার কাকুর আবার গোঁসা হবে। কোরো ওটা” বলেই বেডরুমে চলে যান শাঁওলী। মশারীটা তোলা হয়নি। ক্লান্ত শরীরে ভাঁজ করেন। মশারী ও বালিশ-জোড়া বক্স খাটের পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বেডশীটটা তুলে ফেলেন। খয়েরি রঙের মোটা বেডকভারটা পেতে দিয়ে ঝাড়ু দিয়ে ঝেড়ে সমান ও টানটান করে রাখেন। তারপর শরীরটাকে টেনে টেনে ড্রয়িংরুমে নিয়ে আসেন। কোমরে দুই হাত রেখে অনিরুদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “অ্যাই বুড়ো! গ্যাসের ওষুধ খেয়েছেন আপনি?” বিয়ের পর থেকে শাশুড়ি  ও দেওরদের আড়ালে অনিরুদ্ধকে আদর করে ‘কচি’ বলে ডাকতেন। কালে কালে সেটা ‘বুড়ো’তে রুপান্তরিত।

“হ্যাঁরে বাবা খেয়েছি! দাঁড়াও! ডিস্টার্ব কোরো না। একটা ভাল খবর পড়ছি”। অনিরুদ্ধ পেপার থেকে চোখ না সরিয়ে বলেন।

“ভাল খবরই পড়বে নাকি দিদিভাইয়ের খবরটা নেবে? ক’টা বাজলো, ঘড়িটা একবার দেখেছ? জ্বরটা কমল কি না জানার দরকার নেই?”

শুনেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে যান অনিরুদ্ধ।

“আঃ” ব্যথায় ককিয়ে উঠে বাঁ হাঁটুটা খামচে ধরেন।

“লাগলো তো! কবে থেকে বলছি, ডাক্তার দেখাও। কিছুতেই শুনছ না! আমি আজই পুটুসকে বলছি”।

বিকৃত মুখভঙ্গি  করে অনিরুদ্ধ ডান হাত দিয়ে বেডরুমের দিকে ইশারা করেন। যন্ত্রণা-কাতর গলায় বলেন, “মোবাইলটা বুক-শেল্ফের উপর আছে। একটু নিয়ে আসবে? উফ কী ব্যথা!”

শাঁওলী তাড়াতাড়ি মোবাইলটা নিয়ে এসে অনিরুদ্ধের হাতে ধরিয়ে দেন। হাতে পেয়েই অনিরুদ্ধের স্বগতোক্তি, “ভুলেই গেছিলাম।”

হাঃ হাঃ করে ফাইবারের লেন্সে মুখ থেকে বাতাস ছেড়ে ফতুয়ার ধারটা দিয়ে যত্ন করে ঘষে, মুছে নেন। তারপর চশমাটা চোখে দিয়ে ভুরু কুঁচকে ফোনের কনট্যাক্ট লিস্টে চলে যান। পুটুস কোথায় গেল, পুটুস? হ্যাঁ এই তো! আঙুল দিয়ে ফোন কী-টা প্রেস করেই কানে দিয়ে মুখটা হাঁ করে থাকেন। অপেক্ষা করেন ও প্রান্ত থেকে সাড়ার।

“হ্যাঁ পুটুস, কি রে ঘুম থেকে উঠেছিস বাবা?”

ও প্রান্ত থেকে শোনা যায়, “হ্যাঁ অনেকক্ষণ।”

“কেমন আছে রে দিদিভাই? জ্বর কমেছে না কমেনি?”

“ভালো আছে। কাল রাত সাড়ে দশটার পর থেকে আর আসেনি।  তুমি কথা বলবে?”

শাঁওলী পাশে দাঁড়িয়ে উৎকর্ণ হয়ে শোনেন।

“যাক বাঁচা গেল!” স্বস্তির হাসি অনিরুদ্ধের মুখে। শাঁওলীর দিকে তাকান। চোখ টিপে জানিয়ে দেন সুখবরটা। শাঁওলীও হাসেন খুশিতে।

“বাবা তুমি নিজেই কথা বলো তোমার নাতনির সাথে। মার শরীর ঠিক আছে তো?”

“ভালো আছে তোর মা। চিন্তা করতে হবে না। দিদিভাইকে দে তাহলে একবার।”

ফোনের ও-প্রান্তে দশ বছরের তিয়াষের গলা, “হ্যালো-ও-ও”।

“গুডমর্নিং দিদি, তোমার শরীর কেমন আছে? আর জ্বর-টর নেই তো?”

“গুডমর্নিং! হ্যাঁ দাদু আমি সেরে গেছি। এখন টিভি দেখছি। ঠাম্মি কী করছে?”

“ঠাম্মি..এইতো আমার পাশে দাঁড়িয়ে। দিচ্ছি, তুমি কথা বলো দিদি।”

শাঁওলীর তর সয় না। অনিরুদ্ধ কান থেকে সরাতে না সরাতেই হাত থেকে মোবাইলটা প্রায় কেড়ে নেন।

“হ্যালো।”

হঠাৎ কাঁসরঘণ্টার শব্দ শুনতে পান অনিরুদ্ধ। কানটা ঝাঁঝাঁ করে। দুই হাত কানে দিয়ে বলেন, “আস্তে বাবা আস্তে! এ তো ডাইরেক্ট দিল্লিতে শোনা যাচ্ছে। মোবাইলের কী দরকার? সারাটা জীবন চিৎকার করে কথা বলে গেলে!”

শাঁওলী  কটমট চোখে অনিরুদ্ধের দিকে তাকালেন। ওঁর চোয়াল দেখে বোঝা যাচ্ছে উপর ও নীচের পাটির দাঁতের মধ্যে এই মুহূর্তে  কড়া সংঘর্ষ চলছে। অনিরুদ্ধ চোখটা সরিয়ে নিতেই শাঁওলী নাতনির সাথে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন, “দিদি তোর জ্বরটা কমে গেছে, আমরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আর কোনওদিন ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা জল বার করে খাবি না কেমন!” কথা বলতে বলতে হেঁটে পাশের ঘরে চলে গেলেন শাঁওলী।

“এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে শিখলো না। আরে বাবা আমিও তো শুনব না কী!” বেশ চেঁচিয়ে বললেন অনিরুদ্ধ।

শাঁওলী ঘাড় ঘুরিয়ে আবার একবার কড়া চোখে তাকালেন। কিন্তু এবারে নরম হয়ে ধীর পায়ে  ড্রয়িংরুমে ফেরত এলেন। অনিরুদ্ধের চেয়ারের পাশে দাঁড়িয়ে কথা চলল, “মা কী করছে রে দিদি? বাপিন আজ অফিস যাবে….।” শাঁওলী কথা বলতেই থাকেন। অনিরুদ্ধ মাঝে মাঝে হাতটা বাড়ান, আবার নিরাশ হয়ে নামিয়ে নেন।

“ধ্যুর দাঁড়াও তো!….তোকে না দিদি, তোর দাদুকে বলছি। দ্যাখনা, তোর সাথে কথা বলার জন্য কীরকম হ্যাংলার মত করছে।”

ফোনের ওপার থেকে খিলখিল হাসিতে প্রতিক্রিয়া জানায় তিয়াষ।

“ঠাম্মি জানো তো  কাল সানডেতে বাপিন আমায় ঘুরতে নিয়ে যাবে!”

“ও  মা  তাই? খুব মজা হবে নারে তিয়াষ,” দিদি আমার! ভাল করে থাকবি। বাপিনকে বলবি বাইরের খাবার যেন তোকে বেশি না দেয়। কোথায় যাবে রে? আগ্রা ঘুরে আয়। তাজমহল দেখিস নি তো, দেখেছিস? ও হ্যাঁ তুই যখন আড়াই বছরের ছিলি তখন তোকে নিয়ে তোর বাপিন আর তোর মা গিয়েছিল। তোর এখন মনে থাকার কথা নয়। এখন যা,  বুঝতে পারবি কী সুন্দর! আমি আর তোর দাদুও গিয়েছিলাম।”

“কবে ঠাম্মি?”

“সে বহুবছর আগের কথা–এই ধর বিয়াল্লিশ -চুয়াল্লিশ বছর, নানা বিয়াল্লিশ হবে!”

“কোথায় যাবে বাপিন এখনো  বলেনি ঠাম্মি।  বলেছে সারপ্রাইজ!”

কথা ফুরোয় না। শাঁওলীও লাটাই থেকে সুতো ছাড়তেই থাকেন। ঠাকুমা ও নাতনির সংলাপ ময়ূরপঙ্খী  ঘুড়ির মত দূর থেকে দূরে চলে যায়। অনিরুদ্ধ হাল ছেড়ে দেন। পেপারটাকে আবার মুখের সামনে নিয়ে অতি কষ্টে ধীরে ধীরে বাঁ পা-টা সামনের দিকে লম্বা করে দেন।

খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় চলে যান দুজনে। অনিরুদ্ধের কোনওদিনই দুপুরে ঘুমনোর নেশা নেই। কিন্তু একটু গড়িয়ে নেন। রিটায়ারের পর একদিনও ঘুমিয়েছেন কিনা সন্দেহ। আর শাঁওলী দুপুরে এক-দু ঘন্টার জন্য হলেও ঘুম দেবেনই। না ঘুমলে সারা সন্ধ্যা ফ্যাকাসে হয়ে থাকেন।

“চলো আজ আমরা একটু ঘুরে আসি”, গলা খাঁকারি দিয়ে অনিরুদ্ধ প্রস্তাব দেন।

শাঁওলী  খুব অবসন্নের মত বলেন, “কোন আনন্দে?”

“বারে আজকের দিনে কোথাও একটু বেড়াব না?”

“আচ্ছা তোমার এই বয়সেও ভাল লাগে এসব?” প্রশ্নটা করে শাঁওলী তাকিয়ে থাকেন অনিরুদ্ধের চোখে।

“তুমি না বরাবর আনরোম্যান্টিক!” অনিরুদ্ধ অভিমানে বালিশটা কাছে টেনে নেন।

“শোনো বুড়ো, এই বয়সে রোমান্সে কাজ নেই। শুয়ে পড়ো। হাঁটুটাকে একটু বিশ্রাম দাও। আমার শরীরটা ভাল লাগছে না। ভাল থাকলে ভেবে দেখতাম একবার।”

“চলো  না! ট্যাক্সি করে যাবখন। একটা ওলা বা উবের বুক করে নিচ্ছি।”

চোখটা গোলগোল করে হাসেন শাঁওলী। তাঁর দৃষ্টি   অনিরুদ্ধের চোখের ভিতরে ডুব দিয়ে কিছু খোঁজে। জিজ্ঞেস করেন,  “কোথায় যাবে শুনি?”

“কেন, বসুশ্রী সিনেমা হলের সামনে!”

“অ্যাই পাগলা বুড়ো, তুমি শোবে? এক্ষুনি শুয়ে পড়ো। আমার শরীর খারাপ লাগছে, বললাম তো! এই আমি শুয়ে পড়লাম, তুমি কী করবে করো।” শাঁওলী পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন।

দুই হাত মাথার পিছনে গুঁজে দিয়ে চিৎ হয়ে সিলিং ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে  অনিরুদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “তুমি যাও না যাও আমি যাচ্ছি। তুমি তো আর এই দিনটার মর্যাদা দিলে না!”

ওপাশ ফিরেই শাঁওলী জবাব দেন, “হ্যাঁ যেয়ো। নিজে তো  তারিখটা মনে রাখতে পারো না। আদিখ্যেতায় ষোলআনা! আর কথা বোল না। আমি ঘুমচ্ছি”।

অনিরুদ্ধ আর কথা বলেন না।

সিনেমা হলের উলটোদিকে জায়গাটা ভালো করে দেখতে থাকেন অনিরুদ্ধ। ওই তো ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল! এই দিকে মুখ করে। আর তিনি বোধহয় ওই সামনে থেকে এসেছিলেন। ঠিক এখানে? না কি পাঁচ হাত দূরে ওখানে? মুখে হাত দিয়ে চিন্তা করেন। দাঁড়িয়ে থাকা শাঁওলীকে কেন্দ্র করে একটি ছোট্ট বৃত্ত আঁকেন মনে মনে। কিন্তু বৃত্তের সঠিক অবস্থান নিয়ে খানিকটা ধন্দে পড়ে যান। আজ একটি হাফ-সিল্কের পাঞ্জাবি পরেছেন। হাতের কাজের নকশা করা। পুটুস গতবার পুজোয় দিয়েছিল। কিন্তু এর কাটিংটা কেমন যেন ছোকরা-ছোকরা বলে এতদিন পরেননি। আজ মন চাইল পরবেন। বেরোবার সময় শাঁওলীকে আর ডিস্টার্ব করেননি। ঘুমচ্ছে, ঘুমোক। আলমারি থেকে বার করে গায়ে গলিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন।

জায়গাটার কিছু কিছু বদল ঘটেছে। তখন মেট্রো স্টেশনটা ছিল না। পেট্রল পাম্প, হলের সামনে বাদাম ভাজা,  স্ন্যাকসের স্টল এখনও আছে।  হলের বাঁ পাশে ওই মোবাইল শপটা নতুনই হবে। আগে ওটা কিসের দোকান ছিল মনে পড়ছে না। পেট্রোল পাম্পের একধারে ফুটপাথের ধারে ওই কদমফুলের গাছটাও মনে হয় তখন ছিল না। সে কী! শাঁওলীতো বোধহয় ওই জায়গাটাতেই দাঁড়িয়েছিল এখন যেখানে  কদম গাছটা দাঁড়িয়ে।  কলকাতার বহিরঙ্গে কত বদল! তিনিও বদলে গেছেন অনেকটা। তাঁর হাঁটার ধরন বদলে গেছে। চামড়ার টান-টান ভাব আর নেই।  কীরকম ঢিলে হয়ে  গেছে! শিরদাঁড়ার সহনশক্তিও ক্রমক্ষীয়মান। বদলেছে রক্তচাপ, দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু  রোম্যান্স? সেটা মনে হয় অনেকখানি  কলকাতার হৃদয়ের  মত। খুব কম বদলায়। নাহলে ফি বছর উনিশে সেপ্টেম্বর এত পুলক আসে কোত্থেকে! চুয়াল্লিশ বছর বাদেও কেন এখানে ফিরে আসা!

পিছন থেকে ট্যাঁ-ট্যাঁ করে বিশ্রী হর্নের শব্দে সম্বিত ফেরে অনিরুদ্ধের। ঘাড়ের কাছে এসে হর্ণ দিচ্ছে!  অটোর   ড্রাইভার ডানদিকে মুখ বাড়িয়ে ঝাঁঝালো গলায় বলে, “দাদু কী দেখছেন বলুন তো ওখানে? কখন থেকে হর্ন দিচ্ছি শুনতে পাচ্ছেন না?”

অনিরুদ্ধ লজ্জা পেয়ে সরে যান। এজায়গায় একটা অটো স্ট্যান্ড হয়েছে খেয়ালই ছিল না। নাহ্, এখানে বেশিক্ষণ   দাঁড়ানো মুশকিল। কোথায় বসা যায়? এক জায়গায় চুপচাপ না বসলে শান্তিতে পুরনো  কথাগুলো ঠিক মনে করা যায় না। বাঁ পা-টা টেনে টেনে হাঁটতে  থাকেন হাজরা মোড়ের দিকে। অতি সাবধানে বাস, ট্যাক্সি, গাড়ি-ঘোড়া দেখে মোড়টা ক্রস করেন। তারপর ফুটপাথে উঠে একপাশে দাঁড়িয়ে  ভেবেচিন্তে  টুক  করে লোহার গেটটা দিয়ে যতীন দাস পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এখানে তবু একটু নিরিবিলি আছে। পার্কটা ছোট্ট, কিন্তু বেশ সাজানো। মাঝখানে একটি ঝর্ণাও আছে তবে জল নেই। ঝর্ণার গোল সিমেন্টের বেষ্টনীতে বসে পড়েন। তাঁর বয়েসী কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। সামনে হাত দশেক দূরে একটি কুকুর কুন্ডলী পাকিয়ে  নিশ্চিন্তে ঘুম দিচ্ছে। দূরে ঝুনঝুনি বাজিয়ে একটি লোক ঘটি-গরমের বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।  মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নীল সাদা রঙ করা ক্যানসার হসপিটালটা দেখা যাচ্ছে।  আশুতোষ কলেজের চার পাঁচটি ছেলে-মেয়ে একটু দূরে  কংক্রিটের গোল ছাউনিতে গোল হয়ে  আড্ডা দিচ্ছে। মাঝেমধ্যে  পটাপট সেলফিও তুলছে সবাই মিলে। কখনো বা ‘হো হো’ ‘হি হি’  হাসির  হঠাৎ-হঠাৎ এক-একটা তুফান  বয়ে যাচ্ছে। একটি ছেলে একটি মেয়ের গাল টিপে দিল! অন্য বন্ধুদের সামনেই। তাঁর সময়ে এসব ভাবা যেত না। এদের সম্পর্কগুলো ভাল না খারাপ অনিরুদ্ধের মাথায় ঢোকে না। ফষ্টিনষ্টি তিনিও করেছেন শাঁওলীর সাথে। সে  তো আড়ালে, নিভৃতে। এই বাচ্চাগুলোর খুল্লামখুল্লা মেলামেশা  অনিরুদ্ধকে  উদাস করে। এখনকার দিনকালকে তাঁর বড্ড হিংসা হয়। কালের বাতাস সমস্ত রাখ-ঢাক আবরণকে কীভাবে উড়িয়ে নিয়ে গেছে! সে সময়ে তো বাড়ি থেকে বার হওয়াই কত ঝক্কি ছিল। কত কৈফিয়ত দিতে হত। এই শাঁওলীকেই কী কম মিথ্যা বলতে হয়েছে বাড়িতে! বাড়ির সাথে কত যুদ্ধ করে তবে এক-একদিন দেখা হত তাঁদের। রাস্তাঘাটের পরিস্থিতি ছিল থমথমে। সন্ধের পর  সতর্ক হয়ে চলাফেরা না করলে বিপদ ছিল। জায়গায়-জায়গায়  বোমা, গুলি  খুন-খারাবি! হয় পুলিশ কাউকে  মারছে নয়তো কেউ পুলিশকেই মেরে দিচ্ছে। পাড়ার ভালো ছেলেটাও জেলে চলে যাচ্ছে। সে এক দিন গেছে বটে! সেদিক থেকে আজকের বাচ্চাগুলো অনেক শান্তিতে। নিশ্চিন্তে মেলামেশাতো করতে পারছে। শাঁওলীটাকে এত করে বললেন, তবু এলো না। কত ভাল লাগত যদি দুজনে আজ বসে থাকতেন এখানে!  জীবনভর দুপুরবেলা ভোঁসভোঁস করে ঘুমিয়ে গেল! একদিন না ঘুমোলে  কী হয় কে জানে! বড্ড আনরোম্যান্টিক! বিয়ের আগে ও পরে দুই-দুই চার বছর, ব্যস! তারপর খালি পুটুস আর কুটুস। বিছানায় শুয়ে কোনওদিন গলাটা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল না,  শুনছো,  ছেলেরা ঘুমিয়ে  পড়ুক, আমরা আজ দেরিতে ঘুমোবো। ওর পাশ ফিরে শোওয়াটা ভীষণ খারাপ ছিল। যতবার  ইয়ে-মত একটু হয়েছিল সব অনিরুদ্ধের ইচ্ছায়।  পুটুসের ব্যাপারটা মনে নেই কিন্তু কুটুস এলো অনিরুদ্ধেরই দাবিতে। মনে আছে রাতটা।

শাঁওলী যেন কুহেলিকায় ঢাকা।  সবকিছু দেখা যায় না। ও যে তাঁকে ভালবাসেনা তা নয়। তাঁর সব খেয়াল রাখে। পছন্দ অপছন্দ সব তাঁর মুখস্থ। কিন্তু তবু সে আনরোম্যান্টিকই বলতে হবে।

পুটুস যেদিন হল সেদিনটা খুব মনে পড়ে। বিকেলে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন। ওকে শাঁওলীর কোলে দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কী ছোট্ট ছোট্ট হাত পা! মায়ের কোলে সাদা কাপড়ে জড়ানো একটি ছোট্ট শিশু। তাঁর নিজের সন্তান। তিনি বাবা হয়েছেন! জানুয়ারীর শীতে জন্ম। ওর জন্য কুট্টি কুট্টি কয়েকটি গরম জামা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন। অত ছোট পোশাকও  আবার মানুষের হয়!

কুটুসকে পাঁচ বছর বাদে দেখতে গিয়ে তো হাসি পেয়ে যায় তাঁর। এ যে দাদার ডুপ্লিকেট!

সেই পুটুস আর কুটুস আজ দাঁড়িয়ে গেছে, দুজনেই ইঞ্জিনিয়ার। মোটা মাইনের চাকরি করে।  বিরাট নিশ্চিন্তি! পুরোটাই শাঁওলীর ক্রেডিট! ওদের পড়াশোনার ব্যাপারে সবসময় ওঁর নজর ছিল। কম টেনশন ছিল না। এই জন্যই বোধহয়…! বুক ফুঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে অনিরুদ্ধের।  সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটাও তাঁর দিকে একবার তাকিয়ে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে গেল।  এমনভাবে তাকালো যেন বলতে চাইল, পাবলিক প্লেসে এত জোরে  দীর্ঘনিঃশ্বাস!

অসুখটা ধরা পড়ার পর থেকে অনিরুদ্ধ চাইছিলেন শাঁওলী কুটুসের কাছে থাকুক। ছোট বৌমা ডাক্তার। ওঁর দেখভালটা ভাল হত।  তাছাড়া বোম্বেতে কত বড় বড় হাসপাতাল। শাঁওলীর  কখন কী হয়ে যায়,  অনিরুদ্ধ কী করে সামলাবেন। একে তো হাঁটুর ব্যথা তার উপর সারাক্ষণ গ্যাসের প্রবলেম। মেজাজটাই সপ্তমে চড়ে থাকে।  হাঁটুর  জন্য শাঁওলী তাকে কত বার বলেছে, ডাক্তার দেখাও। ইচ্ছা করে না। দেখালেই হাজার গন্ডা টেস্ট, এক্সরে, ফিজিওথেরাপি। টাকার শ্রাদ্ধ!

ইস! শাঁওলী যদি রাজী হত প্রস্তাবে! মনে পড়ে গেল গত পুজোয় বাড়ি আলো করে ওরা  এসেছিল। দুই ভাই  কত আগ্রহ দেখালো! শলা-পরামর্শ করে একসাথে প্রস্তাব দিল — তিনি থাকবেন দিল্লিতে পুটুসের কাছে আর শাঁওলী থাকবে কুটুসের কাছে, বোম্বেতে। আনন্দে মনটা ভরে উঠেছিল অনিরুদ্ধের। কিন্তু তিনি কিছু বলার আগেই শাঁওলী এক কথায় উড়িয়ে দিল।

“শোন বাবা, তোরা তোদের মত থাক। আমাদের বুড়ো-বুড়ির জন্য চিন্তা করিস না। ফোনে তো ঘণ্টায় ঘণ্টায় কথা হচ্ছেই। তা ছাড়া এই বুড়োটাকে আমি ছাড়া আর কেউই সামলাতে পারবে না। ওঁর এটা-সেটা ফ্যাচাং। বাড়িটারই বা কী হবে?”

কুটুস একবার তুলল ওর মায়ের শরীরের প্রসঙ্গ, “কিন্তু মা তোমার শরীর খারাপ। রেগুলার চেক-আপ, মেডিসিন নেয়ার  ব্যাপার আছে। বাবার বয়স হয়েছে, নিজেরই প্রবলেম …” কুটুসটা ঠিক তাঁর মনের কথাটাই ধরেছিল, কিন্তু শাঁওলী  থামিয়ে দিল।

“যদি খবর পাস আমার শরীর খুব খারাপ, ফ্লাইট তো আছে!  দু’তিন ঘণ্টার মধ্যে চলে আসবি, ব্যস। চিন্তা করতে হবে না। ভালই থাকব। ওষুধ তো নিয়মিত খাচ্ছি না কি?”

শাওলীর এই এক রোগ! ও যা ভালো বুঝবে সেটাই ঠিক। জীবনে বৈচিত্র্যেরও যে প্রয়োজন কে বোঝাবে! বেশ হত  দুজন দুদিকে থাকলে! ছেলেরা তো দুজনেই তাদের ভালবাসে! অসুবিধা কী ছিল?

খবরের কাগজে আজকের প্রতিবেদনটার কথা মাথায় এল। শাঁওলীর সাথে সিলভার-সেপারেশনে চলে গেলে কেমন হয়? তখন ঠ্যালা বুঝবে!  তাহলে ও বাধ্য হয়ে কুটুসের কাছে চলে যাবে। আর অনিরুদ্ধও স্বাধীনভাবে পুটুসের কাছে গিয়ে থাকবেন। বড় বৌমা খুবই ভালো। নম্র, ভদ্র ও শিক্ষিত। অনিরুদ্ধকে কত মিষ্টি করে বাবা বলে ডাকে। একটা মেয়ের বাবা বলে ডাক শোনার বড় সাধ ছিল তাঁর।

নাঃ,  বড্ড ছাইপাঁশ ভাবনা আসছে।  শাঁওলীকে ছেড়ে সত্যিই কি তিনি থাকতে পারবেন? মিছিমিছি হোক আর সত্যি,  ওঁকে  আইনত বিচ্ছেদ করার কথা মাথায় আনাও পাপ।  তা-ও আবার এমন একটি দিনে! অনিরুদ্ধ সন্তপ্ত মন নিয়ে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। এলোমেলো  ভাবনার মধ্যেও উনিশে সেপ্টেম্বর তাঁর পিছু ছাড়ে না। মাছির মত ভন ভন করে মনের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। ভাবেন, আজ শাঁওলীকে খুশী করতে হবে। এই পাঞ্জাবিটা যখন পরেছিলেন শাঁওলী দেখেনি। যখন বাড়ি ফিরবেন অবাক হয়ে যাবে। দেখে আনন্দ পাবে।  অনেকদিন বলেছিল,   তুমি পুটুসের দেয়া পাঞ্জাবিটা পরো না কেন।

হঠাৎ কী মনে হয়, অনিরুদ্ধ বাঁ হাতের কব্জিটা চোখের সামনে তুলে  চোখ কুঁচকে ঘড়ি দেখেন। ছটা বাজে! ফিরতে হবে। কলেজের বাচ্চাগুলোও চলে গেছে। উঠে পড়েন অনিরুদ্ধ। কয়েক পা হেঁটেই হাজরা মোড়ে চলে আসেন। ফুল নিয়ে বসেছে একজায়গায়। ইউরেকা!  একটা ভালো আইডিয়া এসেছে! দাঁড়িয়ে যান। ভুরু কুঁচকে ফুল দেখেন। গোলাপ, রজনীগন্ধা, বেলফুল, গাঁদা। গাঁদাফুল চলবে না। রজনীগন্ধাও আজকাল চলে না। বড্ড সেকেলে। গোলাপ চিরনতুন, শাশ্বত তার আবেদন!

“ভাইটি, গোলাপ কত করে?”

ফুলওয়ালা উত্তর দেয়, “দশ টাকা পিস।”

“আমাকে এখান থেকে চুয়াল্লিশটি দাও”। অনিরুদ্ধ হাত দিয়ে একধারে রাখা গোলাপের কুঁড়িগুলোকে দেখিয়ে দেন।

চুয়াল্লিশ শব্দটা শুনে ফুলওয়ালা একটু তাকায় অনিরুদ্ধের মুখে এমনভাবে যেন  তেত্রিশ বা চুয়াল্লিশের মত সংখ্যা কোনো খরিদ্দারের মুখে প্রথম শুনল সে।

“দাদু ওগুলো কিন্তু বারো টাকা পিস।”

“তুমি যে বললে দশ টাকা।”

“আমি এগুলোর কথা বলেছি”,  দোকানদার অন্যদিকে রাখা ফুলগুলো দেখায়।

“অ! এগুলো নেতিয়ে পড়েছে ভাই।  চলবে না। তুমি ওগুলোই দাও। দশ করেই দাও গো ভাইটি! চুয়াল্লিশটা তো নিচ্ছি।”

“পঞ্চাশটা নিন, দশ করে হয়ে যাবে।”

“আরে ধুর! আমার লাগবে চুয়াল্লিশ, পঞ্চাশ নিয়ে আমি কী করব? তুমি দিতে হলে দাও না!”

দোকানদার কী একটা ভেবে রাজী হয়ে যায়।

এক, দুই, তিন…গুনে গুনে চুয়াল্লিশটি গোলাপের কুঁড়ি সুতলি দিয়ে বেঁধে-সেধে,  ডাটি গুলোর তলার দিকের কাঁটাগুলো ছুরি দিয়ে চেঁছে ফুল-বিক্রেতা অনিরুদ্ধের হাতে ধরিয়ে দেয়। পয়সা মিটিয়ে অনিরুদ্ধ অপেক্ষা করেন একটা বাসের জন্য।  বাসস্টপে দাঁড়িয়ে হঠাৎ দেখেন তাঁর রুটের  একটি  বাস আসছে। ফাঁকাই। প্রবীণ নাগরিক হওয়ায় একটি সিটও পেয়ে যান জানালার ধারে। গোলাপের গোছাটাকে পরম যত্নে বুকের বাঁ দিকে ধরে তিনি জানালা দিয়ে দেখতে থাকেন বাইরের দৃশ্য। বাসটা বসুশ্রী সিনেমা হল ক্রস করে।  ঘাড় ঘুরিয়ে চকিতে ফিরে তাকান অনিরুদ্ধ। আর দেখা যাচ্ছে না। বহুদিন বাদে এদিকটায় আসা হলো তাঁর। সবই চেনা অথচ তার মধ্যেও কেমন যেন নতুনত্বের পরশ লেগে আছে। কলকাতার ব্যস্ত সন্ধ্যার চেনা-অচেনা ছবি ডিজিটাল অ্যালবামে স্লাইড শোয়ের মত সরে সরে যেতে থাকে।  তাঁর বাসও ক্রমেই এগিয়ে যেতে থাকে। নেতাজীনগর গাছতলা মোড় থেকে বাঁ দিকে টার্ণ নেয়। আর পাঁচ মিনিট। তারপর এই গোলাপের তোড়াটা শাঁওলীর হাতে তুলে দেবেন। সাতটা কুড়ি! তার মানে নিমাইয়ের মা এতক্ষণে রাতের রান্না করতে এসে গেছে। আড়ালে দিতে হবে। নইলে  কেলেঙ্কারি! শাঁওলী কী রিঅ্যাক্ট করবে কে জানে। হয়ত খুব খুশি হবে। হাসবে দাঁত বার করে। আবার না-ও হাসতে পারে। হয়ত বলবে ‘পাগল বুড়ো!’ বলুক গে। তবু দিতে হবে। জীবনের পথটা ফুরিয়ে আসছে তাঁদের। দিগন্ত খুব কাছে। এ সুযোগ আর বার বার আসবে না। চৌত্রিশ বছর আগে এভাবেই দশটা গোলাপ দিয়েছিলেন। শাঁওলী মুখ বাঁকিয়ে প্যাঁক মতো  দিয়েছিল। কিন্তু তিনি শিওর ছিলেন, মনে মনে ও খুশি হয়েছিল। ও এরকমই। ধাঁধা!  আজকের কেসটা দেখতে হবে, কী হয়! ফোনটা বাজছে। পকেট থেকে বার করেন। চোখ কুঁচকে দেখেন। অনেক কষ্টে ঠাহর করতে পারেন,  শাঁওলী করছে। স্টপ এসে গেছে। ফোন ধরার সময় নেই। বাস থেকে নেমে পড়লেন। হাঁটতে গিয়ে মনে হচ্ছে বাঁ পায়ের ব্যাথাটা যেন আজ আর একদমই নেই। খুশিতে পা-টাকে একটু ঝাঁকিয়ে নিলেন। গোলাপের গোছাটা আড়াল করে রেখেছেন। রাস্তায় পরিচিতরা দেখলে যা-তা ভাবতে পারে। গায়ে বাচ্চাদের মত পাঞ্জাবি!  হাতে গোলাপ!  নাহ্ তাড়াতাড়ি বাড়িতে না ঢোকা অবধি স্বস্তি পাওয়া যাচ্ছে না। পা চালান।  আবার কে ফোন করছে? ও, কুটুস! ফোনটা রিসিভ করেন। ওপার থেকে কথাগুলো শুনতে পাচ্ছেন না। রাস্তায় আজকাল এত হইচই-চিৎকার! ভাল লাগে না। কেটে দেন। বাড়িতে গিয়ে করবেন। প্রায় এসেই তো গেছেন! আবার কে ফোন করছে রে বাবা! শাঁওলী ফের করছে। উফ্! একদিন একটু বেরিয়েও শান্তি নেই। নিজে তো গেল না। ঘুম থেকে উঠে ওনার এখন মনে পড়েছে, বুড়োটা কোথায় গেল।  বুড়ো হারিয়ে গেছে। আর পাবে না! আরে বাবা কলকাতা শহর চষে-চষে তাঁর জীবন কেটে গেল। শাঁওলী তাঁকে বাচ্চা ছেলে ভাবছে। ফোনটা ধরলেন না। দশ গজ দূরে ডান দিকের গলিটায় গেলেই  তাঁদের বাড়ি। গলির মধ্যে ঢুকে পড়লেন। কয়েক পা এগোতেই তাঁর হলুদ রঙের ছোট বাড়িটা দেখা যাচ্ছে। দুজন মহিলাকে দেখতে পাচ্ছেন সামনে। কারা ওরা? ল্যাম্পপোস্টের নিভু-নিভু আলোয় ভাল করে দেখাও যায় না ছাই! চশমাটাকে ডান হাতের তর্জনী ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে আলতো করে ধরে চোখের সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করে, ভুরু কুঁচকে, মাথাটা ইষৎ উঁচু করে ঠাহর করার চেষ্টা করেন। গেটের কাছে নিমাইয়ের মা না? হ্যাঁ তাই তো। মিত্র বাবুর বৌমা আবার তাদের বাড়ির সামনে কী করছে! পদক্ষেপ দ্রুত হল অনিরুদ্ধের। বুকের মধ্যে ধরা গোলাপের তোড়াটাকে কায়দা করে আড়াল করলেন। নিমাইয়ের মা কয়েক পা এগিয়ে এল।

“কাকিমার ফোন  থেকে তখন থেকে আপনাকে করছি, টের  পাননি?  বড়দা ছোড়দা ফোন করেনি?”

নিমাইয়ের মা মুখটা ওর’ম করে আছে কেন? ওর গলাটা কীর’ম কীর’ম লাগছে! ফোনটা আবার বাজছে। দেখার মত মন নেই অনিরুদ্ধের।

“কী হয়েছে নিমাইয়ের মা?” অনিরুদ্ধের গলাটা কেঁপে গেল।

“কাকু যান ভেতরে..” নিমাইয়ের মা শাড়ির আঁচলটা টেনে নিজের ঠোঁটে চেপে ধরল। একটা কুঁক করে শব্দ বেরিয়ে এল। আঁচলে ঢাকা গেল না কান্না।

অনিরুদ্ধ দাঁড়িয়ে পড়লেন। পা  নড়ে গেল। মনে হল এক লহমায় তাঁর পৃথিবী  ঘন কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। হাত-পায়ে অসাড় হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। গোলাপের কুঁড়িগুলো হাতের শিথিল বন্ধন  থেকে মুক্তি পেয়ে  রাস্তায় ছড়িয়ে গেল। আর একবার মনে হল, শাঁওলী ভীষণ আনরোম্যান্টিক। মিত্রবাবুর বৌমা কাছে এসে ধরে ফেললেন অনিরুদ্ধকে। জড়িয়ে ধরে নিয়ে যেতে চাইলেন ভেতরে। অনিরুদ্ধ ওর কাঁধে ভর দিয়ে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। পিছনে পড়ে রইল চুয়াল্লিশটি গোলাপ। নিভু-নিভু আলোতেও অপ্রতিরোধ্য তার রঙের বাহার।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ