14 Oct

সামন্তবাড়ির পাখি

লিখেছেন:পূষন


[১]

শীতের পড়ন্ত বেলা। বেলা প্রায় তিনটে। সোনার রঙের একটা আলো সামনে পেয়ারা,কৃষ্ণচূড়া আরও নানান সব ছোট-বড়  গাছের ফাঁক দিয়ে গলে এসে পরেছে শতবর্ষ পুরনো সামন্তবাড়ির আঙিনায়।

নারায়ণ সামন্ত দাওয়ায় বসে এই বাড়ির দলিল আর প্ল্যান পর্যবেক্ষণে প্রচণ্ড ব্যস্ত। এমন সময় এসে হাজির তার জ্ঞাতিভাই হরিহর।  জ্ঞাতিভাই হলে কি হবে, দুজনের স্বভাবের মধ্যে বিশাল পার্থক্য। নারায়ণ সামন্ত সাংঘাতিক বিষয়ী লোক, বাড়ির প্রতিটা ইটের ওজন তার জানা। ওদিকে হরিহর সামন্ত  মোটামুটি সদাশয় মানুষ, শাস্ত্রপাঠ আর  নানারকম পড়াশোনা করেই প্রায় জীবন কাটিয়ে দিলেন।  দুজনেরই বয়স হয়েছে,  কিন্তু বৃদ্ধ এদের কেউই নন।

হরিহর যে এসেছেন, এটা টেরই পান নি নারায়ণ। তিনি প্রায় দলিলের ভিতরেই ঢুকে পড়েছেন একপ্রকারে। শেষে মুখ খুললেন হরিহর  নিজেই, “বলি, দেখছ কি এত মন দিয়ে?”

প্রত্যুত্তরে খুব আনমনাভাবে খালি একটা “উম” বললেন নারায়ণ সামন্ত, তার মিনিট দুই পরে মুখ তুলে বললেন, “ও, তুমি!… আর ব’ল না! সামনের রাস্তার পুরোটাই নাকি ওই খগেনের পো’র! বললেই হ’ল!! এই দে’খ, এখানে পরিস্কার দেখাচ্ছে..”

নারায়ণকে কথা শেষ করতে না দিয়েই হরিহর বলে উঠলেন, “তুমি পারও বটে দাদা!  তুচ্ছ কারণে ঝগড়া না করলেই কি নয় লোকের সাথে?”

আকাশ থেকে পড়লেন নারায়ণ সামন্ত, “তুচ্ছ ব্যাপার?? কেউ তোমার কেনা হকের জমিকে নিজের বলে বেমালুম চালিয়ে দিচ্ছে, এমনকী তোমার সাথেই এসে রোজ তম্বি করছে,  আর তুমি বলছ এটা তুচ্ছ ব্যাপার!!”

সামান্য মাথা দুলিয়ে মৃদু হাসলেন হরিহর, বললেন, “তত্ত্বমসি।”

এবার চটলেন নারায়ণ সামন্ত। রাগে গরগর করতে করতে বললেন,”ওই যে,  আবার!! আবার ওইসব   আমসত্ত্ব-টামসত্ত্ব বলতে শুরু করেছে!! সেই…সারাজীবন তো বাপের হোটেলেই চালিয়ে দিলে… কাজ তো কিছু করতে হল না, তাই টের পেলে না!! খালি বড়-বড় বাত!”

একটু হেসে হরিহর বললেন, “সেই… তা তুমি কি করলে?”

রাগ আরও বাড়ল নারায়ণের, বললেন,”দেখলাম! দেখলাম যে সারাজীবন কিছু না করে খালি বই নিয়ে বসে থেকে একটা লোক কতটা নির্লজ্জভাবে বাপের টাকায় দিন কাটিয়ে গেল স্রেফ বাতেল্লা মেরে! কোন দায়িত্ব নিলে না, সঞ্চয় করলে না, এমনকী….”

এমন সময় সামনের পেয়ারা গাছের ভেতর থেকে একটা পাখি অদ্ভুত স্বরে ডেকে উঠল, “ভুউউউল, ভুউউউল…”

দুই ভাই একসাথে সেই দিকে তাকালেন। একসময় পেয়ারা গাছটার দিকে চোখ রেখে  কপালে জোড়-হাত ঠেকালেন হরিহর, আর  নারায়ণ নিজের ডান হাতে একখানা ঢিল তুললেন মাটি থেকে।

এখানে একটা কথা বলার আছে। এই সামন্ত বংশের একজন, হিসেব করলে নারায়ণ সামন্তদের ঊর্ধতন পঞ্চম পুরুষ, নাম সদানন্দ সামন্ত, নাকি মস্ত এক কেউ-কেটা ছিলেন। এই বাড়িও তার তৈরী। অনেকে তাকে বলেন, বিজ্ঞানী বা ম্যাজিশিয়ান;আবার অনেকে বলেন,যোগী অথবা সিদ্ধপুরুষ। তার নাকি বিশাল সমস্ত ক্ষমতা ছিল, অনেকে নানান অলৌকিক কাণ্ড করতেও তাকে দেখেছেন তার জীবদ্দশায়। তিনি নাকি অমরত্বের কৌশলও জানতেন। একদিন তার মৃত্যু হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু জনশ্রুতি আছে যে ওই অমরত্বের মন্তর খাটিয়েই সদানন্দ সামন্ত নাকি এক পাখির বেশে এই বংশভিটের রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন সেই থেকে। সামন্তরাও এটা বিশ্বাস করেন (ব্যতিক্রম, নারায়ণ সামন্ত)।এই নাকি সেই পাখি। কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, এর খালি ডাক শোনা যায়, আর এক-এক সময়ে এক-এক রকমের সেই ডাক। কেউ কথা বলে ওঠে যেন, জবাব দেয়। কিন্তু চোখে কেউ একে দেখে না। একবার খালি নাকি দেখেছিলেন নারায়ণের মা মোক্ষদা সামন্ত, তার শেষশয্যায়। সে আরেক ঘটনা।

সে’বার উঠোনে খাটিয়া পেতে শেষ শয্যা নিয়েছেন মোক্ষদা  সামন্ত। তার পায়ের দিকেই ছিল সেই প্রকাণ্ড পেয়ারাগাছটা। মোক্ষদা  দেবীর শয্যার পাশে রয়েছেন নারায়ণ, হরিহর আরও অনেকে। সবারই চোখে জল, খালি গুম মেরে আছেন নারায়ণ।ওসব কান্নাকাটি তার পুরুষত্বে বাধে।  এতক্ষণ চোখ বন্ধ ছিল মোক্ষদা  দেবীর।  আচমকা চোখ খুললেন তিনি। সবাই ঝুঁকে পড়ল, কিছু বলবেন কি? এমন সময় সেই পেয়ারা গাছটার ডালপালার ভেতর থেকে ডেকে উঠল পাখিটা, “চলে আয়য়…চলে আয়য়..”। কয়েক মূহুর্ত ঘোলাটে  একটা শূন্যদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন মোক্ষদা, তারপর ছেলে নারায়ণের হাত ধরে বললেন, ” ওই দ্যাখ নারু, দ্যাখ পাখিটা এসেছে!দ্যাখ, কি সুন্দর নীল আর হলুদ রঙ দ্যাখ! লেজটা কী লাল!! দেখছিস বাবা, ওই তো !  দ্যাখ…দেখছিস বাবা?… ” ব্যস,এরপর আর কখনও  কিছু বলতে পারেন নি মোক্ষদা দেবী। পাখিটাকেও আর কেউ দেখতে পায় নি। সেদিনও না, আজও না।

দুজনেই খানিকটা সময় নিলেন ফিরে আসতে। পাখির দেখা না পেয়ে ঢিলটা মাটিতেই ফেলে দিলেন নারায়ণ। এবার কথা শুরু করলেন হরিহর, “তুমি যে এত টাকা-জমি-বাড়ি, সংসার করলে তাতে কি লাভ হল? সারাজীবন পয়সা-পয়সা করলে, এখন শেষবেলাতেও সেই পয়সা-পয়সা কর’ছ! তাহলে..”

বেশ গলা চড়ালেন নারায়ণ, ” হ্যাঁ ,  করি আমি পয়সা-পয়সা! বেশ করি! আমার পয়সা না থাকলে তোমরা,  এই সামন্তবাড়ি কোথায় যেত হে! তুমি যে  ওই বইগুলো পড়ে বাতেল্লা মা’র না, ওগুলো কিনতেও টাকা লাগে। কোন দোকানে গিয়ে চারটে শ্লোক বললে কেউ তোমায় ওই বইগুলো দেবে না।  জগতের কোন আনন্দই পয়সা ছাড়া মেলে না, এই আমি বলে রাখলাম।”

হরিহরও দমার পাত্র নন, তিনি বললেন, ” সেটা ব্যবহারিক বাস্তবতার নিরিখে সত্য, কিন্তু আসল যে আনন্দ, মানে সচ্চিদানন্দ, সেটার সাথে এর কোন যোগ নেই। ”

— “ব্যবহারিক বাস্তব মানে? বাস্তব তো বাস্তব। তার আবার ভাগ কিসের?”

—” ওই তো! জীবনে খালি টাকাই চিনলে, টাকাই জানলে! আসলে বাস্তবের তিন ধাপ। প্রথমে ব্যবহারিক, মানে এই এখন আমরা যেখানে বা যেভাবে আছি, সেটা। এছাড়াও..”

—“আরে রা’খ,  রা’খ। ও সব হল গিয়ে সব কুঁড়ে আর গরীবদের সান্ত্বনা।”

—” তুমি বললে তো হবে না!  মাণ্ডুক্যোপনিষদে আছে…”

—“আরে ধুর ধুর!!”

সানন্দে জীবন কাটাবার জন্য কোন পথ মানুষের নেওয়া উচিত,  আসলে কিসের সাধনায় মন দেওয়া লাভজনক এবং আপাতত  তাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে কে বেশী আনন্দে আছে(অবশ্যই অন্যের তুলনায়)—-এই নিয়ে  যখন এই দুজনের বিবাদ খুব বেড়ে প্রায় চরমে গিয়ে ঠেক’ল, তখন সেই পেয়ারা গাছের ভিতর থেকে আরেকবার শব্দ উঠল, এবার কিন্তু বেশ জোরে, ” নেতি…নেতি।”

এইবার দুই ভাই একটু চমকালেন।তারপর স্তব্ধ হয়ে কি যেন ভাবলেন কিছুক্ষণ।সহসা একটা হাওয়া দি’ল আর সেই হাওয়ায় দ্রুতলয়ে নড়ে উঠল সেই পেয়ারা গাছটার সমস্ত শাখা-প্রশাখা। কি একটা যেন ছেড়ে চলে গেল গাছটাকে! একটা চাপা হাসির শব্দ উঠল হাওয়ার ভিতর।  দুজনে পুরো ব্যাপারটা দেখলেন হাঁ করে। মুখ দিয়ে কোন কথা বেরলো না কার।  মিনিটখানেক বাদে সব আবার আগের মত স্থির হলে দুজনেই উঠে “নাহ, যাই” বলে যে যার ঘরে ফিরে গেলেন সেই দিনের মত।

ঘরে গিয়ে নারায়ণ ভাবলেন,” এসব কিসের আওয়াজ হয় গাছটা থেকে?… পাখি? এভাবে কোন পাখি কি ডাকতে পারে?…  না, না … ওই গাছটাই এইবার কেটে দেব!! যত্তসব জ্বালাতন!”

হরিহর কি ভেবেছিলেন ঠিক জানা নেই, খোঁচা-খোঁচা  অনুস্বার-বিসর্গের প্রাদুর্ভাব খুব বেশী ছিল তার চিন্তায়।  খুব একটা কাছে যাওয়া যায়নি।

 

[২]

প্রিন্সেপ ঘাটের অপেক্ষাকৃত নির্জন এলাকার একখানা  বেঞ্চে একা বসে আছে অমিত। দৃশ্যটা বেশ বিরল  পটভূমির নিরিখে। কিন্তু এটাই সত্যি অমিতের জীবনে। মাঝেমাঝেই সে  তাদের আড়িয়াদহের ভাড়া-বাড়ি থেকে আসে এখানে বিকেলের দিকে। এসে বসে, হাওয়া খায়, আর নিজের চারপাশটা দেখে ভাবে, জীবনে সে কিছুই করতে পার’ল না!! লেখাপড়া করলেও ভালো চাকরি হল না, ছোটখাটো কাজ করেও শান্তি নেই। এদিকে দিনও চলে যাচ্ছ,  তার বয়স এখন ঊনত্রিশ। নিদেনপক্ষে মন ভোলাবার মত  দু’জন বন্ধু বা অন্তত একটা গার্লফ্রেণ্ড অবধি এতদিনে তার কপালে জুট’ল না। ছি ছি, বংশের কুলাঙ্গার বোধহয় একেই বলে!

এখানে এসেও এক-একবার তার মনে হয়েছে, কি হবে এমন জীবনের? রেখে কি লাভ একে? এই তো সামনে বহতা নদী,  এই বিশাল গঙ্গাও কি তাকে ফিরিয়ে দেবে? কিন্তু মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হলেও সে আত্মহননের পথ নিতে পারেনি বাড়ির কথা ভেবে, বাড়ির লোকের কথা ভেবে। কিন্তু এখন তারাও মুখ ফিরিয়ে নেয়।তাই এই পৃথিবীতে থাকার জন্য  আর কোন বড় টান অনুভব করে না অমিত আজকাল।

সবার অলক্ষ্যে কাজ সারার পক্ষে এই জায়গাটা ভাল।  আশেপাশের সবাই ব্যস্ত। কিন্তু জলে ঝাঁপ দিলে চাপ আছে। সেজন্য পকেটে করে এক শিশি বিষ নিয়ে এসেছে আজ অমিত। মন শক্ত করে একবার খেয়ে ফেললেই হল, আর চিন্তার সুযোগ নেই। আর পাশের যদি কেউ দেখেও ফেলে পরে, ভাববে ঘুমাচ্ছে। এমনিতেই তো  ঘুম-কাতুড়ে, অলস এইসব উপাধি সে পেয়েই বসে আছে। তাকে দেখলেই নাকি অপদার্থ মনে হয়! অতএব,একদম  পারফেক্ট প্ল্যান।

কিন্তু ঝামেলা হল শিশির তরলটা গলায় ঢালার সময়। আজ  যতবারই সে শিশি খুলতে যায় ততবারই তার কানে সাংঘাতিক সুড়সুড়ি মিশ্রিত চুলকানির ঝড় ওঠে ।  এক নয়, একদম দুটো কানেই। শিশি বন্ধ করলে চুলকানি কমে, কিন্তু অসামান্য সুড়সুড়িটা আজ যেন কিচ্ছুতেই যাচ্ছে না।  বহুবার বহুভাবে চুলকেও কোন লাভ হয় নি। সময় এগিয়ে চলে, বিকেল গড়িয়ে এখন গোধূলি সমাগতা। গোলাপী রঙের মেঘ ছড়িয়ে রয়েছে সমস্ত আকাশ জুড়ে। চারদিকে সুসজ্জিত সব ছেলেমেয়ে, প্রাণখোলা  উথালপাথাল হাওয়া।পৃথিবীবিমুখ কোন কিছুই যেন নেই এখানে। একমাত্র  অমিত ছাড়া। অমিত কি তবে ভুল ভাবছে?…

না, এভাবে বেশীক্ষণ বসে থাকলে তার আর কাজ হবে না। কান যতই চুলকাক, আর থামবে না অমিত। কিন্তু শিশির ঢাকনা খুলতেই চুলকানির মাত্রা বেড়ে গেল সাংঘাতিকভাবে। দুই কান দিয়ে হু হু করে কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ঢুকছে  যেন। কিন্তু ওসব গায়ে মাখলে চলবে না। কানের যন্ত্রণা অগ্রাহ্য করে শিশির ঢাকনা খুলে ফেলল অমিত। চোখ বন্ধ করে শক্ত করল মন। মায়ের মুখ মনে পড়ল একবার। কিন্তু  আজ সে নিরূপায়, লোকের খোটা সে আর শুনতে পারছে না।বেঁচে থাকার কোন উদ্দ্যেশ্য আর নেই তার কাছে। শিশিটা মুখের কাছে নিয়ে গেল অমিত, কিন্তু বিষটা খেতে আর পারল না।শিশিটা মুখের কাছে নিতেই হঠাৎ তার কানে এল এক বাঁশির শব্দ। দারুণ সুরটা। ছোটবেলায় খুব বাঁশির সখ অমিতের। কিন্তু ইচ্ছে হলেও কোনদিন একটা ভালো মানের বাঁশি শেখা বা কেনা হয় নি। প্রথমে পড়াশোনার চাপে, পরে চাকরির চিন্তায়। কিন্তু টানটা যে অমলিন আছে তা আজ এই শেষের দিনেও ফের টের পেল অমিত।   চলে যাওয়ার আগে একবার সে এত সুন্দর যে বাঁশি বাজাচ্ছে তাকে চোখে দেখে যাবে না? না, সে দেখবেই একবার। জিন্সের পিছনের পকেটে শিশিটা ভরে উঠে পড়ল অমিত।

সুরটাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল অমিত। বাবুঘাটের দিকে মিনিটখানেক এগিয়ে যেতেই  কয়েকটা বেশ বড়-বড় গাছ দিয়ে ঘেরা একটা ছায়াঘন জায়গায় গিয়ে বাঁশিওয়ালার দেখা পেল সে।

বেশ বয়স্ক লোক,  খাটো ধুতি আর ময়লা শার্ট পরা। মাথায় সাদা চুল, গলায় একটা গামছা। একমনে একটা ছোট আর বেশ সরু-পাতলা  এক বাঁশি বাজাচ্ছে একটা শতরঞ্চির মত কিছুর উপর বসে। মুখে তার বেশ একটা সন্তোষের আলো লেগে আছে।  অমিত লক্ষ্য করল ওই শতরঞ্চির উপরে বেশ কিছু পয়সা, নোট জমা হয়েছে। বোঝাই যায়,  লোকেরা দিয়েছে। লোকটা তবে ভিখারি! তা হবে। কিন্তু হঠাৎ কি যে হল, বাঁশিটা কেনার ইচ্ছে হল অমিতের। জীবনের এই একটা কাজ, এই একটা সখ অন্তত সে পূরণ করে যেতে চায় চলে যাওয়ার আগে। হয়ত, ইচ্ছে ছিল ওই বাজানোর আনন্দটা কেনার। তা সে যাই হোক, নিজের কাছে বেশী টাকা নেই, কি দিয়ে কিনতে চাইবে ওই বাঁশিখানা? আচমকা তার নজর গেল তার ডানহাতের মধ্যমায় জড়ানো সোনার আংটিটার দিকে। এটা দিয়েই নাহয় কিনবে বাঁশিটাকে। বাজাতে না পারুক অন্তত কেনার সখটা তো মিটবে…..   দেবে না লোকটা?… আলবাত  দেবে। ওই আংটির দাম এখন কম করে হাজার তিন তো বটেই। একজন ভিখিরির পক্ষে এ তো অনেক টাকা!

ডানহাতের তালুতে আংটিটা নিয়ে লোকটাকে দেখিয়ে নিজের প্রস্তাবটা সরাসরি দিয়েই ফেলল অমিত, ” এটার বদলে ওই বাঁশিটা আমায় দেবেন?”

লোকটা মুখ তুলে তাকালো অমিতের দিকে। তারপর স্মিত হেসে বলল, ” না।”

অমিতের এমনিতেই মাথার ঠিক নেই। তার মধ্যে এই “না” শুনে তার মাথা একটু গরম হয়ে গেল। একটু অসহিষ্ণু গলাতেই সে বলল,” কেন? সোনার আংটি এটা, সোনার! অনেক দাম, বুঝলেন?”

আবার হাস’ল লোকটা, তারপর এমন একটা কথা বলল যেটার জন্য একদম তৈরি ছিল না অমিত। বলল,”তোমার  থেকে বেশী?”

চমকে গেল অমিত। বলে কি এ? কিন্তু প্রারম্ভিক ধাক্কা সামলে নিয়ে জবাব দিল সে,” কেন দেবেন না?  এই টাকার কিছুটা দিয়ে নাহয় একটা নতুন বাঁশি নেবেন! বাকীটা আপনার লাভ। কি, দেবেন তো এবার নাকি?”

এবার লোকটা বলল,”না খোকাবাবু , এই বাঁশি আমি দেব না।”

এতটাই আশ্চর্য হয়ে গেল অমিত যে লোকটার করা ‘খোকাবাবু’ সম্ভাষণটা তার যেন কানেই গেল না। কি আছে ওই বাঁশিটায় যে লোকটা এত টাকার বিনিময়েও দেবে না ওটা? ব্যাপার কি?

লোকটা যেন বুঝল অমিতের মনের কথা। তারপর সোজা অমিতের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,” খোকাবাবু,  আমি এই বাঁশিটা বাজাই বহুদিন ধরে, শুনে লোকে খুশি হয়ে যা পারে দেয়। শুরু থেকে টাকা কামাবো বলে বাঁশিটাকে তো  আমি বাজাই নি।  এখন লোকের থেকে টাকা নেব বলে যদি অন্য বাঁশি আনি, তার সুর কি আর এর মত এত মিঠে হবে বাবা?”

মুখ থেকে কোন শব্দ বেরলো না অমিতের। কি বলছে এ? এ কে? এ কি কোন ভিখিরির কথা?

ফের কথা বলল লোকটা,” তবে হ্যাঁ, তুমি যদি আমাকে তোমার পিছনের  ওই  গাছটার চারটে পাতা এনে দাও, তাহলে এই বাঁশি তোমার। কি দেবে?”

চারটে পাতা? হাজার টাকার বদলে চারটে পাতা? পাগলা নাকি লোকটা? তাই হবে। কিন্তু  কোন গাছের পাতা?  কোন গাছের? পেছন ফিরল অমিত। দেখল, পেছনে একদল দেবদারু গাছ রয়েছে।

“এদের মধ্যে কোনটার পা….” কথা বলতে বলতে লোকটার দিকে ফিরে তাকালো অমিত। কিন্তু তার কথা শেষ হল না। কারণ, তার সামনে থেকে শতরঞ্চি, টাকা এমনকী গোটা লোকটা অবধি স্রেফ হাওয়া হয়ে গেছে! কিচ্ছু নেই! না, খালি সরু বাঁশিটা পড়ে রয়েছে খটখটে মেঝের উপরে। এ কি হল? সে কি পাগল হয়ে গেল? সে যাই হোক,  বাঁশিটা তো আছে!  ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে বাঁশিটা তুলে নিল অমিত। কিন্তু বাঁশিটা তোলার সময় সে লক্ষ্যই করল না যে ওটার পাশে ছোট্ট একটা হলুদ-নীল রঙের পাখির পালক পড়ে রয়েছে।

বাঁশিটা নিয়ে কি মনে হওয়ায় অমিত ফুঁ দিল তাতে। কী আশ্চর্য সুর বেরলো বাঁশের বাঁশি থেকে!  অবাক হয়ে গেল অমিত। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল হাতের বাঁশিটার দিকে। তারপরে জিন্সের পকেটে সেটাকে ঢুকিয়ে রাখতে গেল। কিন্তু কিসে যেন বাধা পাচ্ছে বাঁশিটা, পকেটে ঢুকছে না ভালো করে। কিসের সেই বাধা দেখতে পকেটে হাত দিতেই বেরিয়ে এল সেই বিষের শিশিখানা। ওটাকে নিজের হাতে রাখলো অমিত। বাঁশিটা এইবার তার পকেটে ঠিকঠাক ঢুকে গেল ।

হাতে শিশিটা নিয়ে সামান্য উঁচু করে দেখতে লাগল অমিত। এটাকে নিয়ে কি করা এবার? বাড়ি নিয়ে যাওয়া তো অসম্ভব,  কারোর নজরে পড়তে পারে।  আজ সে ঠিক করেছে যে বাঁশিটা বাজিয়ে দেখবে। আর শিশিটা নিয়ে আরেকবার না হয় কাল….

ভাবতে না ভাবতেই কোথা থেকে কি একটা এসে যেন ঝাপটা মারল অমিতের ডানহাতে, আর চমকে যাওয়ায় তার সেই হাত থেকে মাটিতে পড়ে ঝনাৎ শব্দ করে চুরমার হয়ে গেল সেই বিষের শিশিটা।  কিসে ঝাপটা মারল দেখবার জন্য মুখ তুলতেই অমিত দেখল, তার সামনের গঙ্গার দিকে ক্রমশ উড়ে যাচ্ছে এক অদ্ভুতদর্শন পাখি। হলুদ আর নীল রঙের তার পালক, লেজখানা তার টুকটুকে লাল।তাকিয়ে থাকলো অমিত ওর দিকে।  এমন পাখিও হয়? আগে কখনও দেখেনি অমিত। এটাই কি ঝাপটা মেরেছিল? হতে পারে। হঠাৎ অমিতের উদ্দ্যেশ্যেই যেন একটা ডাক দিল পাখিটা, “যা…যা…যা..”। কি বলবে অমিত? এবারেও খালি হাঁ করে তাকিয়ে রইল সে পাখিটার উড়ে যাওয়ার দিকে। ওই যে উড়ে যাচ্ছে…ওই যে..ওই যে….

পাখিটা নদীর ওই পাড়ের কোথাও একটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে এলে পরে হঠাৎই একটা কথা মনে পড়ে গেল অমিতের। নীল-হলুদ পালক, লাল রঙের লেজ… আরে তাই তো! খুব ছোটবেলায় এরকম এক পাখির কথা সে তো শুনেছিল হরিমামার কাছে। অমিতের হরিমামা, মানে হরিহর সামন্ত তাকে একবার বলেছিলেন যে এরকম একটা পাখি নাকি তাদের বাড়ির পেয়ারাগাছে থাকত, আর মাঝে মাঝে অদ্ভুত স্বরে ডাক’ত! এই কি তবে সেই পাখি? নাকি ওই জাতের আরও পাখি সত্যিই আছে?…. কে জানে….

…. আচ্ছা, কি হবে এই বাঁশিটা দিয়ে? কি হবে?…  বাজিয়েই দেখা যাক না!..জীবনে লাভের আশায় কত ফালতু কাজই তো করা হল!….

… তাও… কি হবে এই বাঁশিখানা দিয়ে?… উঁহু , কি কি হবে?….  কেউ কি বলতে পারে?…

 

[২.ক]

ওদিকে অমিত ঘাটের যে বেঞ্চটায় শুরুতে এসে বসেছিল তাতে এখনও ঠায় বসে আছেন দুই জন  ছায়ামূর্তি।  নারায়ণ সামন্ত আর হরিহর সামন্ত। এখন দুজনেরই চোখ ওই উড়ন্ত পাখিটার দিকে। প্রথম মুখ খুললেন নারায়ণ, বললেন,” এল ঠিকই… তবে আরেকটু আগে আসলেও পারত! ” তারপর গা ঝাড়া দিয়ে ভাই-এর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতে লাগলেন, ” যাক, বাচানো গেল তবে! কি ব’ল!আরে এতক্ষণ ধরে ছেলেটার কানে ব্যবসার এত উপায়, এত ফন্দি বললাম ; তাই না ওর হুশ হল! যতবার বিষ খেতে যায় ততবার শুধু এই আমি বারবার কানের কাছে গিয়ে অনর্গল না বকলে ছেলেটা তো বেঘোরে মরত হে! এই হয়…বড়দের কথা শুনতে হয়, শুনতে হয়!”

এবার বেঞ্চের ডানপাশ থেকে হরিহর বললেন, “ওহ! আমিও কি আর কম বোঝালাম ওকে দাদা! মুখে থুতু উঠে গেল ওর ডানকানে বকতে বকতে! বেদান্তের এই অংশটা ক’দিন  আগে যদি ওকে  বোঝাতাম তাহলে ব্যাপারটা এতটা…”

—“তুমি আবার কি বোঝালে ওকে ? তোমার একটা কথা ও শুনেছে নাকি? কবে মরে’ছ  মনে আছে তো? তের বছর, তের বছর হবে সামনের চৈত্রমাসে! তা মরার এত বছর পরে কেউ আর অন্য জীবিত কাউকে নিজের কথা শোনাতে পারে? নাকি দেখা দিতে পারে? ম্যাক্সিমাম চার বছর সেটা হয়, মনে নেই নাকি?”

—“সেই, সেই… তা তোমার  মৃত্যুর তো আঠারো বছর পূর্ণ হল  গত পরশু। সেই বেলা?”

—” তুমি বেশী ব’ক  না তো!  সারা জীবন বাতেল্লা মেরেছ, এখনও মারছ!”

—“তুমি নিজেই বললে চার বছর, আমি তো বলি নি। এখন আমার নামে দোষ! তাছাড়া ওরকম কোন নিয়মই নেই। পুরোটাই হল গিয়ে তোমার ইচ্ছাশক্তির জোর।  বুঝলে?     ”

—” আরে ধুর, তুমি থা’ম তো দেখি!  জানো না কিছু…”

—” কিন্তু না… শাস্ত্রে বলেছে…”

—“চুপ!একদম চুপ বলে দিলাম কিন্তু…”

প্রিন্সেপ ঘাটের আরও রঙিন আর জীবনমুখী বিচিত্র সব কোলাহলে তাদের বাকী কথা আর শোনা গেল না।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ