29 Dec

অন্তঃসলিলা

লিখেছেন:সাবিত্রী রায়


বহুদিন পরে দেবব্রত আজ আবার ধীরে ধীরে পা চালায় কফি হাউসের দিকে। ঝাড়াপোঁছা ঝকঝকে পরিচিত সিঁড়িটার মাথায় পা দিতে না দিতেই ভিতর হতে প্রসন্ন চোখে আহ্বান আসে, “এই যে দেবব্রত। খবর কি। আজকাল যে তোমার দেখাই পাওয়া যায় না।”

একটা চেয়ার মৃদু ঠেলে দেয় পুরানো লেখকবন্ধু, শিবনারায়ণ ব্যানার্জী। “তারপর, তোমাদের কাগজের কদ্দুর। নূতন কোনও বই বের হচ্ছে নাকি রাধারাণী থেকে।” শিবনারায়ণ জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়।

“একটা নূতন কনট্রাক্ট হচ্ছে শীগগীরই – শকুন্তলা দেবীর উপন্যাস।”

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ঠাট্টার সুরে বলে শিবনারায়ণ, “মেয়েদের লেখা আবার উপন্যাস! নির্ঘাত ‘লস’ দিতে হবে রাধারাণী পাবলিসারকে। তাছাড়া আনকোরাও নিশ্চয়ই, নাম তো শুনিনি কখনও।”

“ওঁর তো আরও খান দুই বই বেরিয়েছে ছোটগল্পের।”

“ও আবার গল্প নাকি। টেকনিকের কোনও বৈশিষ্ট্য আছে তাতে?”

দেবব্রত দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দেয়, “একমাত্র টেকনিকটুকুই তো গল্পের প্রাণ নয় – আত্মাও নয়।”

এবার তর্ক শুরু হয়। শকুন্তলা সেন কোন অতলে ডুবে যায় তর্কের জোর ঘুর্ণিপাকে। একেবারে উপকথা রূপকথার যুগ হতে আটচল্লিশ মাসের পুজো সংখ্যায় এসে ভেড়ে তর্কের পালতোলা তরী।

আরও জনা-দুই বন্ধু এসে বসে ছোট্ট টেবিলটি ঘিরে। বেয়ারা নূতন করে কফি দিয়ে গিয়েছে দ্বিতীয়বার। ধোঁয়া উড়ছে। কফির বাষ্পীয় উগ্র গন্ধ ধোঁয়ার সাথে মিশেছে সিগারেটের কড়াগন্ধ, বাষ্পহীন ধোঁয়ার কুণ্ডলী।

কাচের বড় বড় জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে মেঘলা আকাশের বেশ খানিকটা বড় অংশ। হাওটাও ভেজা ভেজা। বলা চলে, প্রায় কণ্টিনেণ্টাল পরিবেশ। তর্ক তীব্র হয়ে উঠছে।

শিবেশ রায় সিগারেটের ছাইটুকু টোকা দিয়ে ঝেড়ে ফেলে শেষ টান দিয়ে নেয়। তারপর প্রথম কথা বলে এতক্ষণ পর, “তবে আশার কথা এই যে, আজকাল সাহিত্যিকদের কর্তব্যের প্রতি দৃষ্টি পড়েছে। কলমে কালী যখন আছে লিখে যাই যা খুশি – এ স্বেচ্ছাচারিতার যুগ কেটে যাচ্ছে। এইতো সেদিন ৩১/এ-তে বেশ একটা ভাল আলোচনা হল। ছোটগল্প লেখার কায়দা সম্বন্ধে একটি সুন্দর কথা বলেছেন আমাদের সাহিত্যিক মহারাজ। লেখার মস্ত একটা প্রয়োজনীয় কায়দাই হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো ছেঁটে ফেলতে শেখা।”

“অতি ঠিক কথা। আগাছা নিড়ান না দিলে ফুলচারার সৌন্দর্যই আড়াল হয়ে যায় বাজে গাছের চাপে।”

আরও একজন ঘরে ঢোকে। রঞ্জন রায় ডাক দেয়, “এই যে প্রফেসার, দূরে দূরে কেন। তোমার বৌ তো এনতার লিখছে হে। এরকম ঘষতে ঘষতেই হাত পেকে যাবে।”

দেবব্রত লজ্জিত বোধ করে শকুন্তলা সম্বন্ধে এ ধরনের উক্তিতে। শকুন্তলার লেখার একজন উৎসাহী পাঠক সে। ব্যথিত হয় সে এতটা রূঢ় মন্তব্যে।

সাহিত্যিকদের কফির আসর শেষ হয়। রাস্তায় নেমে পড়ে সবাই। প্রফেসার যায় না – কারও জন্য অপেক্ষা করছে। দেবব্রতও উঠে না – বসে বসে সিগারেট পোড়ায়। চোখের সামনে বিচিত্র মানুষের বিচিত্র বেশভুষা, হাসি ও চিন্তার রেখা আলতোভাবে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় সিগারেটের ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে। এও এক ধরনের রঙ্গমঞ্চই। হালকা সবুজ রংয়ের দেওয়ালে দেওয়ালে সুন্দর ছবি আঁকা – শাখায় শাখায় কুজনরত বিহঙ্গ বিহঙ্গী। ঘরভর্তি সাজান চক্‌চকে চেয়ার টেবিল – উর্দিপরা মানুষের ত্রস্ত ছুটোছুটি।

নূতন আরেকটি দল এসে দখল করছে সাহিত্যিকদের পরিত্যক্ত চেয়ারগুলি। উগ্র এসেন্সের গন্ধ।

একটা মোহময় রেশ বিস্তার করছে দেবব্রতর চিন্তামগ্ন মনে। সাহিত্যিকদের কথাই ভাবছে সে। বয় এসে শূন্য পেয়ালা-পিরিচগুলি সরিয়ে নিয়ে যায়। চমক ভাঙে দেবব্রতর – এবার উঠতে হয়।

প্রফেসারও বেরিয়ে আসে একসঙ্গে।

“নমস্কার। কাল কিন্তু আপনার বাড়ীতে যাচ্ছি। একটা লেখা দেবার কথা আছে এ বারের সংখ্যায়।”

ঠিকানাটা আবার একটু মিলিয়ে নেয়।

পরের দিন ঠিকানা পকেটে নিয়ে বের হয় শকুন্তলার লেখা আনতে। ঘুরতে ঘুরতে সরু একটা আবছা অন্ধকার গলির ভিতরে এসে পড়ে। এই রাস্তাই কি ? রোয়াকে বসা একটি লোকের কাছে একটু খোঁজ নেয়। এই গলিই। দেবব্রত এগিয়ে চলে। একটু অসর্তক হয়ে হাঁটলেই গায়ের জামাটার ছোঁওয়া লেগে যায় দুপাশের বাড়ীর দেওয়ালে। অসাবধানী পানের পিকের দাগে নানা আকারের চিত্র আঁকা দেওয়ালে দেওয়ালে। কোথায়ও বা সর্দি-বসা পাকা পাকা কফ লেগে আছে।

দেবব্রত চোখ বুলিয়ে চলে বাড়ীর নম্বরগুলিতে। মনটা বেশ কিছু দমে গিয়েছে এরই মধ্যে – এই গলিতে শকুন্তলা দেবীর আস্তানা!

একটা বহু পুরানো আমলের স্যাঁতস্যাঁতে বাড়ী সম্মুখে রেখে হঠাৎ থেমে গিয়েছে অপরিসর গলিটা। দেবব্রতকেও থামতে হয় অগত্যা। চোখের সামনেই জ্বলজ্বল করচে নম্বরটা – ৮/৭বি। এই বাড়ীতেই থাকেন শকুন্তলা দেবী, নবীনা লেখিকা। শকুন্তলাকে দেখে নাই সে। চেহারাটা দেখে নাই, কিন্তু ভিতরটা দেখা হয়ে গিয়েছে। এত ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত মানুষ দশ বছরের পরিচয়েও হয় না। শ্রদ্ধা করে সে শকুন্তলা দেবীকে।

ভিতর হতে দুয়ারের খিলটা খুলে যায়। মস্ত এক শব্দ করে একটি মেয়ে মানুষ বের হয়ে আসে, কতকগুলি তরকারির খোসা আর কুচো চিংড়ির আঁশ এনে ঢেলে দিয়ে যায় গলির একধারে। ভিতরে ঢুকবার সময় লক্ষ্য করে দেবব্রতকে।

“কাকে চাই?”

“শকুন্তলা দেবী থাকেন এ বাড়ীতে?”

“ঐ দিকের বারান্দা ঘুরে সোজা চলে যান।”

নির্দেশ মত সোজাই চলে আসে সে। আবার একটা ভেজান দুয়ারের সামনে এসে আটকে যায়। একটু ইতস্তত করে কড়া নাড়ে।

বছর সাতেকের একটি ফ্রকপরা মেয়ে বের হয়ে আসে – “বাবা তো পড়াতে গেছেন। বসবেন কি একটু?”

“শকুন্তলা দেবী আছেন?”

“মা রান্না করছেন। আপনি ভিতরে এসে বসুন।”

ভিতরে ঢুকে একেবারেই দমে যায় দেবব্রত। আধো অন্ধকার ঘরখানার মাঝখান দিয়ে একটা প্রশস্ত পর্দা টানান – পার্টিসনের কাজ করা উদ্দেশ্য। আরেক দিকে দুইখানা তক্তপোশ জোড়া দেওয়া। তার উপর রাত্রির শয্যা গোছান রয়েছে – রং ওঠা একটা পুরু সুজনী দিয়ে ঢাকা। স্তূপীকৃত বালিশের বিপুল উচ্চতা বড় বেশী স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিচ্ছে যেন এ বাড়ীর জনসংখ্যা। একপাশে একটি নবজাত শিশুর শয্যা – ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালিশ কাঁথা অয়েল ক্লথ। দেওয়ালে টানান অসংখ্য দেবদেবীর আর গুরুদেবের ছবি। উপরে জানালার তাকে তাকে বই খাতাপত্র, পুরানো পত্রিকার পাঁজা।

মেয়েটি ঘুরে আসে, “ওকি আপনি দাঁড়িয়েই আছেন। বসুন না লক্ষ্মীটি। মা এক্ষুনি আসবেন। পত্রিকা এনে দেবো?”

ছোট্ট মেয়েটির কথার আপন-করা-সুরে অনেকখানি হালকা হয়ে যায় মন। দেবব্রত তাকিয়ে দেখে, অপরিমিত যত্নে বেড়ে ওঠা কৃশ একটি চোট্ট মেয়ে – কিন্তু সুস্থ একটি প্রাণ রয়েছে উজ্জ্বল চোখদুটিতে।

পর্দার ওপাশের প্রতিটি কথাই স্পষ্ট শোনা যায় এ পাশে। আধাবয়সী মহিলাদের পরচর্চা – খানিকটা কুৎসা। ওপাশ হতে ডাক আসে “খুকী।”

“যাই ঠাকুর মা।” মেয়ে ছুটে চলে যায়। দেবব্রত অগত্যা পড়া-পত্রিকাখানাতেই চোখ বুলাতে থাকে। কিন্তু পর্দার আড়ালের কর্কশ কথাগুলিই কানে এসে ঘা মারতে থাকে বারে বারে। “মেয়েটাকে একটু ধর দেখি, চালগুলো ঝেড়ে নি।”

পার্শ্বস্থিতা আত্মীয়ার নিকট মনের কিছু তিক্ততাও ঝেড়ে ফেলে বর্ষীয়সী মহিলা চাল ঝাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, “আগের মত কি আর ঝাড়তে পারি। কিন্তু কি করবো – রেশনের চাল। একে তো কাঁকড়, তার উপর পাঁচমিশালী।” সমবেদনা জানায় পার্শ্ববর্তিনী – “তোমার কি আর এখনও সংসারের কাজকর্ম করার বয়স আছে। এখন পুজো সন্ধ্যা নিয়ে দিন কাটাবার সময়।”

“অমন ভাগ্যিই কিনা। এখন মরতে পারলেই একমাত্র শান্তি।” অদৃষ্টকে বারে বারে ধিক্কার জানায় –

পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকে শকুন্তলা, “আপনাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি।” লজ্জিত সুরে বলে সে, “কিন্তু লেখাটা তো টুকে রাখতে পারিনি। আপনি বরং একটু দেখে যান – কষ্ট করে এলেনই যখন।”

শকুন্তলা জানালার উপরের তাক হতে একপাঁজা পুরানো রং ধরা খাতা টেনে নামিয়ে একমনে খুঁজতে থাকে সদ্য লেখা গল্পটি। দেবব্রতর চোখ পড়ে একবার শকুন্তলার হাতের দিকে – সবেমাত্র মশলা পিষে এল, তারই চিহ্ন হলুদ রং-ধরা হাত দু’খানায়।

পর্দার ওপাশে শিশু কণ্ঠে কান্না শুরু হয়। কান্নাটা ক্রমেই চিৎকারে পরিণত হতে থাকে। মনে হয় যেন এখনই বুঝি লাঙ্গস ছিঁড়ে যাবে। মৃদু অধৈর্যের সাথে নীচু গলায় বলে শকুন্তলা, “পুড়িয়েই ফেললো নাকি ওরা উনুন ধরাতে?”

ওদিকে পর্দার ওপাশ হতে চাপা গলার কড়া ঝাঁজ এসে ধাক্কা খায় পর্দার গায়ে, “ডাক না তোর মাকে। মেয়েটা চেঁচিয়ে গলা ফেটে মরছে – কানেও কি যায় না। ছেলেপুলের মায়ের কি আর দিনরাত কলম নিয়ে বসে থাকলে চলে।” একটু স্বর নামিয়ে যেন স্বগতোক্তি করে মহিলাটি, “বিদ্বান ছেলের বিদুষী বৌ। যত জ্বালা হয়েছে আমার।” নীচু গলায় বলা হলেও সবটুকু কথাই শোনা যায় পর্দার এপাশেও। একটা থমথমে চাপা শ্লেষে ভরে থাকে কোঠাখানা। দেবব্রত নিমেষের জন্য একটু তাকায় শকুন্তলার দিকে – একটা লজ্জার কালিমায় ছায়াচ্ছন্ন করে ফেলেছে মুখখানা।

একটি অপ্রস্তুতের মত বলে ফেলে সে, “আমি না হয়, আরেক দিন এসে নিয়ে যাব।”

“এইতো পেয়েছি। আপনাকে কষ্ট করে পড়তে হবে। এখানে-ওখানে ছড়ান রয়েছে লেখাটা।”

খাতাখানা এগিয়ে দিয়ে চলে যায় সে। শিশুর কান্না তবু থামে না। আবার সেই একই ঝাঁজালো কণ্ঠস্বর, “বাবা মেয়ের কান্নায় তো আর পারি না। এক মেয়ে জন্মেছে, তায় রোগই ছাড়ে না। আর রোগ ছাড়বেই বা কি করে। এমন স্যাঁতস্যাঁতে বাড়ীতে ভাল মানুষেরও রোগ ধরে যায়। রোগের বংশও নেই।”

দেবব্রত খাতাখানায় মন দেয়। পাঁচ বছর আগেকার পাঠ্যাবস্থার প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা – রোমান ইতিহাসের ক্লাস নোট … ক্রীতদাস বিদ্রোহ … জুলিয়াস সিজারের হত্যা।

তারপরে নূতন লিখতে শেখা বড় বড় অক্ষরে প্রথম পাঠ – “সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি।”

সবশেষে শুরু হয় গল্পের আরম্ভ – “ময়দানের দিকে এগিয়ে চলেছে হাজার হাজার মানুষের মিছিল।”

দেবব্রত মন গুছিয়ে আনে গল্পে। বেশ বড় গল্প।

“চা, কাকু।” ছোট্ট মেয়েটি চায়ের পেয়ালা রেখে যায় চৌকির উপরে। মিষ্টি হাসির অজস্রতা কচি চোখে। যেন একটি সোনালী রোদের রেখা জোর করেই ঢুকে পড়েছে এ আবদ্ধ ঘরে। ওপাশে আবার অদৃষ্টকে কশাঘাত শুরু হয়ে যায়। “ডাল বুঝি পোড়া লাগলো। কি যে আমার বরাত। তোর মা বুঝি গেছে কলতলায় মেয়ের কাঁথা কাচতে। ডাক দে খুকী।” সঙ্গে সঙ্গে এক ঝলক পোড়া গন্ধ উড়ে আসে।

“কাঁথা কাচতে একটু পরে গেলে চলে না?” পার্শ্ববর্তিনী মৃদু মন্তব্য করে।

“ না গিয়েই বা করবে কি।একটু বেলা হতে না হতেই যা ভীর লেগে যায় কলতলায়। এক বাড়িতে সাত ভাড়াটে। একখানা মাত্র ঘর, চল্লিশ টাকা ভাড়া। এই তো এরা সব খেয়ে গেলে এই ঘরটুকুকে ধুইয়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে বসাবে আমার রান্না। তারপর রাত্রিতে আবার এর উপরই বিছানা পড়বে। এইটুকু ঘরে মানুষতো আর কম না। হারানের ছেলেরাও তো এখান থেকেই পড়ে।

“তোমার তো তবু বৌ-ই রান্নাটুকু করে দেয়।” পার্শ্ববর্তিনীর মনের জমানো খেদ বের হয়ে পড়ে হঠাৎ। কিন্তু গৃহস্বামিনী খুশি হয় না তার কথায়। অপ্রসন্ন সুরে বলে, “আমি তো বলি বৌকে, তোমার লেখাপড়ার ব্যাঘাত হয়, আমার আতপ চালটুকু আমিই ফুটিয়ে নেই। আমরা মূর্খ মানুষ, আমাদের তো আর সময়ের মূল্য নেই তাদের মত।”

বিদ্বেষ চুয়ান প্রতিটি উচ্চারণে ধরা পড়ে অনুচ্চারিত বহু অনুযোগ।

দেবব্রত কানাভাঙ্গা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দেয় সন্তপর্ণে। ভিতর হতে আবার ডাক শোনা যায়, “খুকী তোর কাকার আসনটা পেতে দিয়ে যা।”

এইমাত্র স্নান করে আসা অল্প বয়সের এক ভদ্রলোক একবার পর্দা সরিয়ে একটু দেখে যায় আগন্তুককে। একটা অর্থভরা হাসির কণা চোখের কোণায়।

ওদিকে তদারক শুরু হয় ভিতরে, “কি রে সুকু, চচ্চরীটা কেমন হয়েছে। দেখতে তো তেমন ভাল মনে হচ্ছে না। ভাল আর হয়ই বা কি করে – রান্নার কি আর মন থাকে -”

তদারককারিনী ডাক দেয়, “ও খুকী, তোর মাকে বল, আর চারটি ভাত নিয়ে আসতে।”

ভাত নিয়ে প্রবেশ করে বধূ। শাড়ীর মৃদু শব্দ একটু। “কি বৌদি, গল্প লিখতে গিয়ে নিজেই আবার গল্পের নায়িকা হয়ে পড়ো না যেন।” বিষ-ঝরা রসিকতা। দেবর সম্পর্ক যখন রহস্য করার অধিকার তো আছে। অপর পক্ষ নিরুত্তর। পর্দার এ পাশের ভদ্রলোকের উপস্থিতিটাই হয়তো বিঁধছে তাকে।

অস্বস্তি বোধ করে দেবব্রত। গল্পটি পড়া শেষ হয়ে গিয়েছে। গল্পের বলিষ্ঠ ইঙ্গিতময় রেশটুকু বারে বারে হোঁচট খায় লেখিকার পর্দার আড়ালের এ কুটিল ইঙ্গিতে।

প্রফেসার সেন ঘরে ফেরে টিউসান সেরে, হাতে একটি বাজারের থলি।

এতক্ষণে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে দেবব্রত।

“নমস্কার। অনেকক্ষণ যাবৎ এসেছেন?” ঘামে ভিজে যাওয়া গায়ের সার্টটি অতি যত্নের সাথে খুলতে খুলতে বলে, “আমার আবার কলেজের সময় হয়ে এল। কিছু মনে করবেন না, আমি স্নানটা সেরে আসি।” দড়িতে ঝুলান একরাশ জামা কাপড়ের ভিতর হতে খুঁজে বের করে ধুতীখানা।

“আমিও এখন যাব।” হাতের খাতাখানা দেখিয়ে বলে, “এ গল্পটি রবীন্দ্র সংখ্যায় ছাপাতে চাই। আপনি নিশ্চয়ই পড়েছেন -” মুখের কথা শেষ না হতেই উত্তর দেয় প্রফেসার, “গল্পটল্প পড়ার কি ফুরসৎ আছে।”

খুকী তেলের বাটি দিয়ে যায়। মাথায় তেল ডল্‌তে ডল্‌তে বলে, “এককালে ছিল ওসব সাহিত্য টাহিত্যের উৎসাহ। এখন কলেজ আর টিউসান। আর আছে কালোবাজারে ছুটোছুটি।” প্রফেসার চলে যায় স্নান সারতে।

ওপাশে প্রফেসারের গলা শোনা যায়, “ডাক্তার বাড়ী যাওয়ার সময় আর হল না। দেখি রাত্রিতে যদি পারি।”

“কিন্তু জ্বর তো বেড়েছে – কফও আছে বুকে,” শিশুর মায়ের উদ্বিগ্ন উত্তরটুকুও কানে আসে।

শকুন্তলা ঘরে ঢোকে – কোলে কাঁথায় জড়ান রুগ্ন শিশুটির চোখে জ্বরের ঘুম।

ভাল করে লক্ষ্য করে দেবব্রত শকুন্তলার মুখের দিকে। গভীর বেদনার ছায়া চোখের গভীরে।

মমতায় ভিজে ওঠে মনটা – কি চিন্তা করে বলে সে, “খাতাখানি নিয়ে যাই, টুকে নেবার ব্যবস্থা আমি করবো।”

এ ঐকান্তিকতার স্পর্শে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে চোখদুটি – অসংখ্য ধন্যবাদ সে চোখে। একটু সংকোচের সাথে বলে, “আমি একবার চোখ বুলিয়ে দিচ্ছি তাড়াতাড়ি। আমারই উচিত ছিল লেখাটা ঠিক করে রাখা। কিন্তু মেয়ের জ্বর হয়ে পড়ায় আর পেরে উঠিনি।”

দেবব্রত অপেক্ষা করে। বসে বসে নতমুখে দেখে সে ঘরের মেঝেটা – বহুস্থানে সিমেন্টই উঠে গিয়েছে। দেওয়াল হতে সর্বক্ষণের জন্য একটা ভ্যাপসা গন্ধ বের হয়ে আসছে। আরেকটি ছেলে ঘরে ঢোকে। দেবব্রত চেনে তাকে – শকুন্তলার ভাই সুব্রত। কোনও ভূমিকা না করেই বলে সে, “দিদি তুমি যে কিছু টাকা দেবে বলেছিলে আমাদের সেটা আজ পেলে উপকার হয়।”

এক মুহূর্তে ম্লান হয়ে যায় শকুন্তলার মুখখানা। অপরাধীর সুরে বলে, “টাকা তো দেব বলেছিলাম। ভেবেছিলাম – গতবারের লেখাটা দিয়ে বুঝি কিছু টাকা পাব। কিন্তু আমাদের মত নূতন হাতের লেখা নাকি কাগজে ছাপানটাই যথেষ্ট মূল্য দেওয়া।”

দেবব্রত তাকিয়ে দেখে আবার একটু লেখিকাকে। দুই হাতে দুই গাছা শাঁখের চুড়ি, পরিধানে মিলের মোটা শাড়ী – আভরণহীন কানের দুই পাশে চূর্ণ কুন্তল। “দশটি টাকাও দিতে পারবে না? আমি ওদের আশা দিয়ে এসেছি – দিদির কাছে ঠিক পাব – কথা যখন দিয়েছে সে।” ব্যথিত সুরে বলে সুব্রত। “অরুণদা যে থাইসিস নিয়ে বেরিয়েছিলেন জেল থেকে তোমাকে বলিনি কি? ইমিডিয়েটলি তাকে স্যানিটোরিয়ামে পাঠান দরকার চাঁদা তুলে।” শকুন্তলার বিবর্ণ, মৌনী মুখের দিকে তাকায় দেবব্রত। ভাষাহীন বেদনার নীরব আর্তনাদে বুঝি ছিঁড়ে পড়ছে কোমল আত্মা। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ান একজন অ-দেখা কর্মীর প্রাণের মমতায় আর, স্নেহের ভাইয়ের আশাভঙ্গের ব্যথায় বিদীর্ণ দৃষ্টি। – তবু দশটি টাকাও দেবার শক্তি নেই তার!

অনুমান করে দেবব্রত হয়তো আরও কত বাকি টাকার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বাড়ীওয়ালা, দুধওয়ালা, হয়তো বা ধার দেওয়া বন্ধুরাও।

সুব্রত চলে যায় ম্লান মুখে।

দেবব্রতও উঠে পড়ে। আবার সেই অপ্রশস্ত নোংরা গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তন্ময় হয়ে ভাবে দেবব্রত, এই মধ্যবিত্ত সংগ্রামের আড়ালেই কি বয়ে চলেছে লেখিকার জীবনের অন্তঃসলিলা প্রাণের প্রবাহ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ