29 Dec

বোঝা

লিখেছেন:বাণী রায়


পরীক্ষার হলে বসবার যুগ শেষ হয়ে যাবার পরে এমন করে আর কারুর প্রশ্নের জবাব দিতে হয়নি। প্রশ্নতালিকার সহজ-শক্ত বেছে নিয়ে উত্তরের সুযোগ পাইনি। কফি হাউসের দোতলার বারান্দার মুখোমুখি বসে মূর্ত্তিমতী কৌতুহলের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে নিজের অবিমৃষ্যকারিতায় অনুশোচনার অন্ত ছিল না।

আমার মধ্যে কেমন একটা খেলো সামাজিকতার আধিক্য আছে দেখেছি। হঠাৎ পথে চেনা-লোক কুড়িয়ে তাকে নিয়ে অযথা সময় কর্ত্তন করি। গায়ে পড়ে অন্তরঙ্গ হই, হৃদ্যতায় যেন মাখনের মত গলে পড়ি। সামাজিকতার রুচীতে তুলে নিলেই ধন্য হবো। কি করে টম-ডিক-হ্যারীর সঙ্গে টম-ডিক-হ্যারী হতে পারব ক্ষণকালের জন্যও, এই আমার দুরন্ত সাধনা। তারপরে হয়তো টম-ডিক-হ্যারী থাকবে পথে পড়ে, দৃষ্টির অগোচর হওয়া মাত্র ভুলে যাব আমি। তবু, দেখা হওয়া মাত্র মাতামাতির শেষ থাকে না।

জনতা-কণ্টকিত শ্যামবাজারগামী বাস থেকে নামলাম কলেজ স্ট্রীটে। সেই কলেজ স্ট্রীট! প্রতিভার পলাশী প্রাঙ্গন। কত প্রতিভা জীবিত থাকে, কত প্রতিভার দিনমণি অস্তমিত হল পাঠকের চাওয়া-না-চাওয়ার মানদণ্ডে। প্রতিভা দুশো থেকে আটশো পাতায় বাঁধা পড়ে প্রকাশকের ঝকঝকে কাউণ্টারে হাহাকার করতে থাকে –

“শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণেক হেসে.

আমার সোনার ধান কুলেতে এসে”-

এইখানে আপাতদৃষ্টিতে নির্লিপ্ত ক্রেতা খোঁজে নিত্য-নূতন আবিষ্কার। সার্কাসের অ্যাক্রোবাটের মত প্রতিমুহূর্তে যে লোক যত দড়ির খেলা দেখাতে পারেন তাঁর তত জয়। জনমানস চায় মারাত্মক খেলা। ‘Slow but steady wins the race’ – অন্তত কলেজ স্ট্রীটের মত নয়।

একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম হঠাৎ কে যেন কনুইয়ের খোঁচা দিতে দিতে বলে উঠল, “এই এই!”

চেয়ে দেখি একদা সহপাঠিনী রাধারাণী স্বয়ং! বহু দিন পরে দেখা। সরস কোনদিনই ছিল না রাধা, এখন ভাঁটির টানে অনুর্ব্বর কঙ্করক্ষেত্রে পরিগণিত হয়েছে। এক হাতে বিস্তর বইখাতা ধরা, অন্য হাতে রঙীন দড়ির পরিপূর্ণ থলে ঝুলছে। অগত্যা কনুইর সাহায্য ভিন্ন উপায় নেই ওর। এতই বোঝার ভারে ভারাক্রান্ত ও।

চুল টেনে বাঁধা, ভ্রূকুঞ্চিত চক্ষে মোটা কালো ফ্রেমের গোল চশমা। লাট-পাট সাদা মিলের শাড়ী, নীল খদ্দরের জামা, পায়ে বাদামী চটী। অতি-ভব্য, সংযত-বন্ধন, শাসিত দিনযাত্রার ছাপ মুখে-চোখে। এই সব মেয়েরাই ভদ্রমহিলা নামের যোগ্য। পথে ঘাটে এদের লোক পথ ছেড়ে না দিলেও অবশ্যই শীষ দিয়ে অভ্যর্থনা করে না। বালিকা বিদ্যালয় এদেরই পত্রপাঠ নিয়োগ করে। সন্দিগ্ধা পত্নী এমন মহিলাকেই পুত্রকন্যার গৃহশিক্ষয়িত্রী বহাল করেন স্বচ্ছন্দচিত্তে। পাত্র পছন্দ করুক না করুক, পাত্রের পিতামহী এদের যোগ্যতা স্বীকার করে নেন। এক কথায় এরা যে ভদ্রঘরের মেয়ে সে বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না।

সার্চ্চলাইটের তীব্রতায় চশমার কাঁচ দুটি আমার প্রতি নিবদ্ধ রইল। অপ্রতিভ হয়ে উঠলাম, বললাম, “অনেকদিন পরে দেখা হল। ভাল আছ তো ?”

আমার আপাদমস্তক চোখ বোলাতে বোলাতে রাধা বলল, “হ্যাঁ, বি-এ পাশ করবার পরে আর দেখা হয়নি। তা, তুমি তো বেশ ভালই আছ, দেখতে পাচ্ছি।”

মরমে মরে গেলাম। রাধার অতি-ভদ্র বেশভূষার পাশে আমার স্যামন-পিঙ্ক ক্রেপ্‌-ডি-সিন্‌ শাড়ী, জর্জ্জেটের কাঠগোলাপ জামা যেন আমাকে উপহাস করে উঠলঃ একবয়সী তোমরা। দেখ তো ওর দিকে, আবার নিজের দিকেও দেখ। পড়ে মরতে বুড়ো বয়সে সিনেমা তারকার সাজ কেন? বলি, লিপস্টিক মাখাই বা ছাড়বে কবে? কলেজ স্ট্রীটে তুমি কতটা বেমানান, জানো কি?

ভাবলাম, সত্যই তো। কিন্তু, এসব বেশভূষায় এত অভ্যস্ত আমি যে অভাবে মন খারাপ হয়ে যায়। জুতো ব্যবহারের মত এসেন্স ব্যবহার মজ্জাগত হয়ে গেছে। নাঃ, নিজেকে সংশোধন করা উচিত।

আপাপতঃ রাধার দৃষ্টিবাণ এড়াতে হৃদ্যতায় বিগলিত হয়ে উঠলাম। শ্রম-কঠোর – ঘর্ম্মাক্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ফেললাম, “এতদিন পরে দেখা। এত ভিড়ের মধ্যে কি কথা হয়? খুব ক্লান্ত দেখছি তোমাকে। এস না কফি হাউসে।”

“স্কুলে পড়িয়ে স্কুল থেকে ফিরছি সোজা। তা, ওখানে কি যাওয়া উচিত?” সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে রাধা আমার দিকে তাকাল।

রাধার বাধা অনুভব করে বললাম, “আরে, সে ওপাড়ার কফি হাউস। এখানে শুধু মাত্র ছাত্রী আর সাহিত্যিকের ভিড়। তাছাড়া, যাচ্ছ তো আমার সঙ্গে। আমি নিশ্চয়ই তোমার কাছে পরপুরুষ নই।”

রাধা কাষ্ঠ হাসি হেসে বলল, “তবে চল, এত করে বলছ যখন।” রাস্তা পার হতে হতে নিজের মনকেই প্রবোধ ছলে যেন সে বিড়বিড় করে বলল, “আর, যখন এতদিন পরে দেখা।”

তারপরে রাধার প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে জর্জ্জরিত হয়ে ভাবলাম এ কাজ না করলেই হত। ওর অনিচ্ছাকৃত সূত্র ধরে যদি ওকে বোঝাতাম, কফি হাউসে গো লোথারিয়ো আর ডন জুয়ানেরা গলাগলি করে বসে থাকে। বেকী শার্প আর অ্যাম্বার অহরহ চলাফেরা করে। তাহলে রাধা ভয় পেত, আমিও নিমন্ত্রণের দায় এড়িয়ে যেতাম। মুখোমুখি টেবলে বসে রাধার সন্ধানী দষ্টি ও প্রশ্নসায়কে আমি সম্পূর্ণ বিদ্ধ হলাম। দেখা হওয়া মাত্র মরমে মরে গিয়েছিলাম। এখন আমার অন্তিম-শয্যা আস্তৃত হল।

প্রথমে প্রশ্ন করল রাধা, “এখন কি করছ?”

অনিচ্ছাকৃত সত্ত্বেও উত্তর দিতে হল, “কিছুই না।”

“জীবনের উদ্দেশ্য কি তোমার? কি করবে?”

সবিনয়ে আবার নেতিবাচক উত্তর দিলাম। রাধা সবিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। তার বিস্মিত দৃষ্টির সম্মুখে আমার জীবনের সম্পূর্ণ অসারতা দেখতে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠলাম।

কফি শেষ করে রাধা চাঙা হয়ে আবার প্রশ্নজাল বিস্তার করল। প্রকৃতপক্ষে, আমার বয়স ছাড়া ও সব কিছুই জিজ্ঞাসা করল। বয়সটা জানা ছিল বলেই কি. অথবা তাহলে ওর নিজের বয়স নিয়ে টানাটানি চলবে চিন্তায় ও নিরস্ত হল জানি না। নিজের বাসা জানাল রাধা আমেরিকার প্রেসিডেন্টার গাম্ভীর্য্যে। বি.এ. পাশ করে ওর স্কুলে কাজ নিতে হয়েছিল পিতার অসুস্থতার জন্য। এবারে ছুটি নিয়ে বি.টি. পাশ করেছে ভবিষ্যতে উন্নতির আশায়। বি.টি. পাশ করে মাইনে কিছু বাড়লেও রাধার আশা অনেক। এম. এ. পাশ করে কলেজে কাজ নিলে ভাল হবে বিবেচনায় আজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল খোঁজখবরে। স্কুলের পর এসেছে শ্যামবাজার থেকে কলেট স্ট্রীটে, ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বেশ। আমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালই লাগছে। একঘেয়ে কাজ আর কর্ত্তব্যপালনে বাঁধা রাধা। ছোট বোন আছে বাড়িতে, বাবা নামমাত্র পেনসনে রিটায়ার করেছেন। ভাইটি ছোট। দায়িত্ব অনেক রাধার। গোঁড়া বাড়ীর মেয়ে হলেও জীবিকার খোঁজে পথে নামতে হয়েছে। আমাকে সগর্ব্বে খবর দিল, ব্যাঙ্কেও কিছু জমাতে পারা গেছে। তবে, রাধার লক্ষ্য বহু উর্দ্ধে – উন্নতি তার আদর্শ, নিজের শক্তির বলে। মনে হল রবীন্দ্রনাথ বোধহয় এদেরই কল্পনায় লিখেছিলেনঃ

“নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার

কেন নাহি দিবে অধিকার -”

আদর্শ নারী রাধা। গৃহে বৃদ্ধ মাতাপিতার সেবা, গৃহকর্ম্ম সবি সে করে। ছোট ভাইবোনের শিক্ষার দায়িত্বও তারি উপরে। পরিহাস করে বললাম, “রাধার কৃষ্ণটি এলেই এখন ভালো হয়।”

পরকলার ঝকমকে লক্ষ্য আমার দিকে ফেলে রাধা বলে উঠল, “ও কি কথা বলছ? আমি বিয়ে করলে সংসার চলবে কি করে? আমার ওপরে কত ভার!”

সঙ্কুচিত হয়ে গেলাম রাধার কর্ত্তব্যময়ী মূর্ত্তির সম্মুখে। নিজের প্রজাপতি জীবন হীন মনে হল। নিজে আছি নিজেকে নিয়ে, আর রাধা বাঁচছে অন্যের প্রয়োজনে। স্থির করলাম, একটা ভদ্রগোছের কাজ করবার চেষ্টা করব, বেকার সাহিত্যচর্চ্চা ছেড়ে।

রাধা রুমালে মুখ মুছে বলল, “বরঞ্চ, ছোট বোনটার বিয়ে পাত্র ভাল পেলে দিতে পারি। দাও না, একটা দেখে-শুনে।”

“পাত্র কোথায় পাব?”

আমার দিকে অবজ্ঞাসূচক দৃষ্টি হেনে রাধা বলল, “কেন? তুমি কি ছেলেদের সঙ্গে মেশো না? শুনি সাহিত্যিকেরা অবাধ মেলামেশার ভক্ত।”

রাধার কণ্ঠস্বরে ‘সাহিত্যিকেরা’ ক্রিমিনাল বনে গেলেন। স্বজাতির লজ্জায় বিষণ্ণ কণ্ঠে বললাম, “যাঁদের সঙ্গে মিশি তাঁরা তো বোনের পাত্র হিসাবে লোভনীয় নয়। তা, তুমি কাজকর্ম্ম করছ. তুমিও কি কথাবার্ত্তা বন্ধ করে থাক নাকি পুরুষজাতির সঙ্গে?”

রাধার মাথা ইঞ্চিখানেক উচ্চ হয়ে উঠল, “আমি পারতপক্ষে কারুর সঙ্গে কথাটিও কই না। আমার নামে এ পর্য্যন্ত একটা কথাও কেউ বলতে পারেনি।”

ম্রিয়মান হয়ে উঠলাম, কারণ আমার নামে একটা ছেড়ে একশোটা কথা যে লোকে বলে বেড়ায় তা আমি জানি। কারণ না জানলেও, ঘটনাটা জানা আছে। মাথা নামিয়ে বিলটা মিটিয়ে দিলাম।

রাধা হাতের ঘড়িটার দিকে চেয়ে বললে, “ওঃ, কত বেলা হয়ে গেল! বাড়ী গিয়ে দেখব মা রান্নাঘরে ঢুকে বসে আছেন।”

“কেন, মা রান্না করেন না? তুমি তো বাইরের কাজ করো।” তিরস্কারপূর্ণ দৃষ্টি আমার দিকে হেনে রাধা উত্তর দিল, “মা কি দু’বেলাই আমার জন্য রাঁধবেন? শরীর খারাপ ওঁর। রাঁধবার লোক যতদিন না রাখতে পারি, নিজেই একবেলা রান্না করি।”

“তোমার বোন তো পারে?”

“বেশ তুমি! আমি থাকতে ও রাঁধবে কি? পড়াশুনো নেই ওর?” নিজের স্বার্থপরতায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম। ক্রমেই রাধার পাশে নিজেকে ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। সুযোগ পেয়ে উঠে দাঁড়ালাম সম্পূর্ণ বিলীন হ’বার পূর্ব্বেই পালাই। বললাম, “যাই এবার। তোমার অনেকটা সময় নষ্ট হল। কাজের লোক তুমি।”

রাধাও উঠে দাঁড়াল, “আজ কাজ হবে না। মাসকাবারের টাকাটা পেয়ে জিনসপত্রও কিছু কিনতে কিনতে দেরী হয়ে গেল এমনিই। তুমি এখন যাবে কোথায়?”

অনেক জায়গা ছিল যাবার। বল্লেই রাধার প্রশ্নবাণ বর্ষিত হবে আশঙ্কায় রাধার হাতের পূর্ণ থলিটার দিকে চেয়ে প্রথমেই যা মনে এল, স্বচ্ছন্দে বলে দিলাম, “আমারও কটা জিনিস কেনবার আছে। নিউমার্কেটে যাব ভাবছি একবার।”

রাধা বলল, “আমি বহুকাল নিউ মার্কেটে যাই না। না হয় চলো তোমার সঙ্গে আজ যাওয়া যাক। বোনের জন্যে না হয় তোমার মত দুটো পাশ চিরুণী কিনে নেব। অনেক দিন ধরে চাইছে বেচারী।”

ব্যাকুলভাবে বললাম, “তোমার সময় নষ্ট হবে না? অত কাজ বলছিলে।”

একটু ভেবে রাধা বলল, “আজকের দিনটা এমনি গেল যে ভাই-বোন দুটোকে বাড়ী ফিরে পড়া বলে দেবেন। আজ ক’টা জামা সেলাই করবার ছিল, তা থাক। মা রান্নাঘর থেকে আর বেরোতে চাইবেন না। যাই তোমার সঙ্গেই। এতদিন পরে দেখা হল। তুমি তো চিরকালই কাজ পণ্ড করবার পাণ্ডা!”

কুকুরের মত রাধার পেছনে পেছনে ট্রামে উঠে বসলাম। পথে রাধা কামানের গোলা বর্ষণের মত প্রশ্ন বর্ষণে আমাকে হয়রান করে তুলল। তার জীবনের সঙ্গে আমার জীবনের প্রভেদ এতই বেশী, আমার উদ্দেশ্যহীন জীবনকে বুঝবার তার এতই অক্ষমতা, যে কৌতুহল তার পক্ষে স্বাভাবিক। রাধা নিজের ভবিষ্যতের কথাও বলল – ব্লেমলেস লাইফের স্বর্ণচিত্র একখানি। বিবাহের কথা যে সে একেবারে না ভাবে তা নয়। ছোট ভাই মানুষ হলে তবে রাধার ছুটি। রাধার ভাই প্রবেশিকার ছাত্র। তার মানুষ হতে হতে রাধার আদৌ ও ভাবনার ক্ষেত্র থাকবে না, চিন্তা করে নিরস্ত হলাম। রাধা আরও জানাল এম.এ. প্রাইভেট পড়ে পাশ করবার পরে কলেজে কাজ নেবে ও। ভাইকে গাড়ী চালানো শিখিয়ে একখানা ছোট সেকেণ্ডহ্যাণ্ড গাড়ী যদি কোনমতে কিস্তিবন্দীতে কেনা যায়, তাহলেই রাধার সর্ব্বোত্তম আকাঙ্খা পূর্ণ হবে। সর্ব্বদা ট্রামে বাসে দৌড়াদৌড়ি করা বড় কষ্টকর, যে-সে গায়ের সঙ্গে গা লাগায়।

কত বছর পরে রাধার উচ্চাকাঙ্খা বাহনরূপ-পর্ব্বত লঙ্ঘন করবে জানি না। আপাততঃ তো গতি তার খঞ্জ।

নিউ মার্কেটে রাধা একটু বিমনা হয়ে পড়ল, “সত্যি বলতে কি, এখানে এলেই জিনিসপত্র কিনতে ইচ্ছা করে।”

রাধার স্বীকারোক্তিতে সচকিত হয়ে তার দিকে তাকালাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন তরুণী সাজ ও হাসির ঝলক তুলে মোড়ের দোকান থেকে এগিয়ে এল আমাদের দিকে।

বজ্রাহত ব্যক্তির মত রাধা ফিস্ ফিস্ করে জানাল, “আরে, এ যে সুমিতা!”

সুমিতাই বটে। কাঁধ পর্য্যন্ত কাটা চুল শ্যাম্পুস্ফীত। কোমর উদঘাটিত চোলি জামায়। নখে, ঠোঁটে, গালে লালে-লাল। ভুরু আঁকা। দেহের গঠন সরবে হাল্কা সিফনের নীচ থেকে অস্তিত্ব জাহির করছে। বি.এ. ক্লাসের সুমিতার সঙ্গে এ সুমিতার অনেক প্রভেদ।

পাশে সুবেশ তরুণ, গায়ে গা লাগিয়ে। সুমিতা আমাদের জড়িয়ে ধরল, “চিনতে পারছিস না?”

রাধা ক্ষীণস্বরে বলল, “তুমি না কাজ কর কি”-

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, করি তো। তাই কি?” হাতের ও কানের হীরক ঝল্‌সে উঠল সুমিতার, “ভারী কাজ! ছেড়ে দেব ভাবছি।”

সুমিতার সম্পর্কে সব তথ্য আমরা জানতাম। ইতিপূর্ব্বে আজ রাধাও জানিয়েছিল সুমিতা অধঃপতনের শেষ সীমায় গেছে, ওর চেয়ে সুমিতার মরণ মঙ্গল। এখন অতর্কিত ভাবে মুখোমুখি সুমিতার সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়ায় অস্বস্তি বোধ করলাম। বিশেষতঃ রাধার চরিত্রয় কঠোরতা স্মরণ করে।

আমার গা থেকে মাথায় চোখ বুলিয়ে সুমিতা বলে উঠলঃ “হ্যালো, খুব তো গরম গরম লেখ। নিজে এমন নরম কেন? চুলগুলো অমন বিশ্রীভাবে রেখেছ কেন? কেটে ফেল না আমার মত। It would at least give you a modern look. এখন ক্রেপ-ডি-সিন্? Horrible.” রাধার বিষয়ে সজ্জার উপদেশ সুমিতা অপাত্রে ন্যস্ত করল না। দ্বিতীয়বার মরমে মরে গেলাম। পাশাপাশি আয়নায় ছায়া পড়েছে দোকানে। ‘পিতার হোটেলে’ যথেচ্ছ আহারের ফলে দেহ স্থূল। অবিরত শুয়ে-বসে লেখাপড়ার ফলে মধ্য-বয়সসুলভ মেদ-ভারে পীড়িত আমি। পাশের তরুণীটি যেন ছিপছিপে কঞ্চি। চলন-বলনে কোথাও ভার নেই ওর। আশ্চর্য্য, অধঃপতন কিন্তু সুমিতাকে চমৎকার মানিয়েছে। রূপ ছিল না যার, আজ সে রাতারাতি রূপসী হয়ে উঠেছে। শুধু ধার করা নয়; চোখের দীপ্তি, হাসির উজ্জ্বলতা, দেহের সুষমা তো অকৃত্রিম।

রাধার সঙ্গে সুমিতার তুলনা চলে না। নিজের কর্ত্তব্যপালনে রাধার সান্ত্বনা আছে। আমার সান্ত্বনা কোথায়? রাধা এক প্রত্যন্তদেশে, সুমিতা অন্য এক প্রত্যন্তদেশে। দুজনের মধ্যে ত্রিশঙ্কু আমি। হায়, হায়!

সুমিতা আমাদের হাত ধরে টানল, “এস না, কোথাও আইসক্রীম খাই। এতদিন পরে দেখা হ’ল। রজট্‌, শোন এঁরা আমার কলেজবন্ধু।”

রজত নামধারী ভদ্রলোক নমস্কার করলেন এগিয়ে। সুদর্শন যুবক, সুমিতার প্রতি তদ্‌গত, সহজেই বোঝা যায়।

আমাদের কিছুতে আইসক্রীমে রাজী করাতে না পেরে সুমিতা শেষে বলল, “কোথায় যাবে? চল, ড্রপ করে দি।”

“গাড়ী কিনেছ নাকি?” রাধা আর্ত্তনাদের মত সুরে জিজ্ঞাসা করল।

“হ্যাঁ, তা আমি না কিনলেও বলতে গেলে আমারি। এস না।”

কুলী ঝুড়িভর্ত্তি জিনিসপত্র নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমি অক্ষমতা জানালাম, “আমাদের কাজ আছে।”

“ও, তোমরা যে কাজের লোক, ভুলেই গিয়েছিলাম। আমি অকেজো মানুষ, কাজের ধার ধারিনে। এসো রজট্।” রজতের হাত ধরে টেনে ক্ষিপ্র-গমনে সুমিতা রওনা হ’ল, পেছনে বোঝা নিয়ে কুলী।

রুদ্ধস্বরে রাধা বলল, “সুমিতা গরীবের মেয়ে ছিল। এত টাকা হ’ল কেমন করে ওর?”

“কেমন করে মেয়েদের টাকা হতে পারে, তা তো তুমি জান, রাধা। নির্লজ্জের একশেষ! তোমাকে যা নিজে অর্জ্জন করে নিতে হচ্ছে ও তা উপহার পাচ্ছে।”

দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে অপ্রত্যাশিতভাবে রাধা বলে উঠল, “কে বলবে আমাদের বয়সী? দেখে দশ বছরের ছোট মনে হয় না?”

নিঃশব্দে দু’জনে বেরিয়ে এলাম বাজার থেকে।

“তাহ’লে যাই রাধা। বাস আসছে। তোমার রূট তো উল্টো দিকে।”

রাধা পরিপূর্ণ ঝোলা সামলে সম্মতি দিল। বিদায় জ্ঞাপন করে উঠে বসলাম বাসে। ওপাশ দিয়ে সুমিতার ঝকঝকে গাড়ী ছুটে চলে গেল পালকের মত।

রাধা মাথা উঁচু করে রাস্তায় ট্রামের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল। ধীরে যাবে সে-ও ভাল, বাসের সার্ব্বজনীন ঠেলাঠেলি ওর অসহ্য। কত বোঝা ওর হাতে। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হ’বে কে জানে? সুমিতার নিমন্ত্রণ নিলে ভাল করত রাধা।

বাস ছেড়ে দিল। চলে যেতে যেতে রাধার কথাই আবার ভাবলাম। সৎচরিত্রের বোঝা শেষ পর্য্যন্ত টেনে রাধা চলতে পারবে তো?

( বানান অপরিবর্তিত)

Tags:

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ