29 Dec

শীত বিষয়ক একটি গল্প

লিখেছেন:সমীর ঘোষ


বড়দিন, বর্ষশেষ আর ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে ইন্টারনেটে বিভিন্ন শপিং সাইটে ছাড়ের ছড়াছড়ি। কেউ পঞ্চাশ শতাংশ ছাড় দেয় তো কেউ দুটো কিনলে সত্তর। কেউ আবার বলছে যদি লাকি হন তাহলে হানড্রেড পারসেন্ট ক্যাশব্যাক – অর্থাৎ পুরোটাই ফ্রি। নেট দুনিয়া জুড়ে এ এক আজব দোকানদারি। কে লাভ করছে, কার ক্ষতি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারে না আলোকপর্ণা। আগে থেকেই শপিংমলের পাশাপাশি কম্পিউটার আর ট্যাবলেটে মগ্ন হয়ে কেনাকাটি করত ও। গুড্ডু হওয়ার পর সেটা আরও বেড়েছে। সিদ্ধার্থকে বিজনেস সামলাতে হয়। হাজারো ক্লায়েন্ট, প্রতিদিন মিটিং-এর সারি। দু-বছর বয়সী ফুটফুটে একরত্তিটাকে সঙ্গ দেওয়ার সময় নেই ওর। ফলে কেনাকাটি থেকে ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করা – একা হাতে আলোকপর্ণাকেই সামলাতে হয় সব। বাড়িতে সিদ্ধার্থর মা ছটফটে নাতি পেয়ে খুশিতে গদ্গদ হলেও বাচ্চা সামলাতে পারেন না কোনোভাবেই। তাই গুড্ডুর জন্য রাখা হয়েছে কমবয়সী মণিকাকে। রান্নার লোক আর কাজের লোক সকালটা সামলে দেওয়ার পর বেলা ন’টা নাগাদ চলে আসে মণিকা। সিদ্ধার্থ আর আলোকপর্ণা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর সে-ই সারাদিন দুষ্টুটাকে সামলায়।

আলোকপর্ণার অফিস ডালহৌসি পাড়ায়। সকালে সিদ্ধার্থ নামিয়ে দিয়ে গেলেও সন্ধ্যেবেলায় বাসে বা ট্যাক্সিতেই ফেরে সে। কনসালটেন্সি ফার্মের চাকরি। অফিস থেকে সাড়ে ছ’টা নাগাদ বেরিয়ে টুকটাক কেনাকাটা সেরে ফিরে যায় যোধপুর পার্কের বাড়িতে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি শীত পড়তেই ইন্টারনেটে গুড্ডুর জন্য বেশ কয়েকটা শীত পোশাক কিনে ফেলেছে আলোকপর্ণা। শুধু গুড্ডু নয়, ধর্মতলার ফুটপাথে শুয়ে থাকা পুঁচকে ছেলেটার জন্যও কিনে নিয়েছে একটা গরমের পোশাক। প্রতিদিন অফিস যাওয়া-আসার সময় হালকা একটা দুটো জামা পরে ওকে শুয়ে থাকতে দেখে। গুড্ডুরই বয়সী। বাচ্চাটাকে সামনে শুইয়ে রেখেই ভিক্ষে করে ওর মা। আগে ওখানে একটা বাদামওলা বসত। দিনরাত প্লাস্টিকে শুয়ে থাকা বাচ্চাটার জন্য আলোকপর্ণার কষ্ট হয়। ডিসেম্বরের ঠাণ্ডা হাওয়া লেগে বাচ্চাটার বুকে সর্দি বসেছে। শুয়ে শুয়েই ও হাঁপায়। ওর চিকিৎসা দরকার, বেশ বুঝতে পারে আলোকপর্ণা। একদিন ওর মা’কে গিয়ে বলেই ফেলে – ডাক্তার দেখাও না কেন বাচ্চাটাকে? ওর বাবা নেই?

বাবা থাকার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয় না মহিলা। বলে ডাক্তার দেখাবার পয়সা কোথায় দিদি? খাবার পয়সাই ওঠে না। বাচ্চাটাকে নিয়ে এমন নিরাসক্ত ভাব দেখে মাথা গরম হয়ে যায় ওর। ভাবে পুলিশ ডেকে এর একটা বিহিত করে। শিশুদের কষ্ট দেওয়ার অধিকার কারও নেই। তারপর পঞ্চাশ টাকার একটা নোট এগিয়ে দিয়ে বলে হাসপাতালে গিয়ে বিনে পয়সায় ডাক্তার দেখিও। আর এই টাকায় কিছু খাবার কিনে দিও ওকে।

শীত পড়তেই দু বছরের গুড্ডুর ভালো থাকার জন্য কত কাণ্ডই না করছে সিদ্ধার্থ আর আলোকপর্ণা। শীতপোশাক তো আছেই, আনা হয়েছে রুম হিটার। প্রতিদিন ভিটামিন দেওয়া তেল মাখিয়ে কুসুম কুসুম গরম জলে চান করানো হয় ওকে। খাওয়ানো হয় হেলথ টনিক। তাতেও ভয় দূর হয় না। কখন ঠাণ্ডা লেগে যায়। ফুটপাথের বাচ্চাটার জন্য সবসময় শঙ্কায় থাকে আলোকপর্ণা। অফিসের কমলাদি বললেন – তুই অহেতুক এত চিন্তা করিস। আসলে সিস্টেমটাই এরকম। দেখবি এরকম করেই একদিন বড় হয়ে যাবে ওরা। তারপর তোর ব্যাগ ধরেই টানাটানি করবে। ফালতু চিন্তা করে করবি কী?

তবু আশ্বস্ত হতে পারে না আলোকপর্ণা। সমুদ্রের জলে ভেসে ছোট্ট আয়লানের দেহ খবরের কাগজে দেখে মুষড়ে পড়েছিল ও। সিরিয়ায় শিশুদের উপর আই এস জঙ্গিদের অত্যাচারের মাত্রা দেখে গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত। কিন্তু এই কলকাতায় কী নিরাপদে আছে শিশুরা? আগে এসব ভাবনা মাথায় আসত না। রাস্তায় কত শিশুই তো এলেবেলে হয়ে খেলা করে, ধুলো বালি মেখে জটপড়া চুলে বেওয়ারিশ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। আলোকপর্ণা তাকিয়েও দেখেনি এতদিন। কিন্তু গুড্ডু হওয়ার পরই এসব দিকে চোখ চলে যায় ওর।

ধর্মতলার ফুটপাথের বাচ্চাটা আর ওর মাকে ক’দিন ধরেই দেখতে পাচ্ছে না আলোকপর্ণা। এর আগে গুড্ডুর বাতিল হওয়া কয়েকটা জামা মা টাকে দিয়েছিল ও। এবার ইন্টারনেটে বাচ্চাটার জামা কিনতেই অফিসের কলিগ সমরেশদা সাবধানবাণী শুনিয়ে দিয়েছে। বলেছে কোনও জামাই বাচ্চাটার গায়ে উঠবে না। তোমার মতো সারাদিন অনেকেই জামাকাপড়, পয়সা দেয় ওদের। সব বিভিন্ন হাত ঘুরে চলে যায় অন্যত্র, সেকেণ্ড হ্যাণ্ড বাজারে। বাচ্চাটাই তো ওদের অ্যাসেট।

মানুষকে এত খারাপ ভাবতে পারে না আলোকপর্ণা। নিজের সন্তানকে জামা পরতে না দিয়ে তা বাজারে বিক্রি করে দেবে? কেমন যেন বিশ্বাস হয় না।

ছুটি হতেই ইন্টারনেট শপিং-এ ডেলিভারি পাওয়া জামাকাপড়গুলো হাতে নিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে রওনা হল আলোকপর্ণা। এটা ওটা কেনাকাটির পর ধর্মতলামুখী হতেই দেখল ফুটপাথের ওই মা’টাকে। ক’দিন ধরে নির্দিষ্ট জায়গায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না ওকে। সামনে বিছোনো প্লাস্টিকে হালকা জামা পরে কুঁকড়ে শুয়ে আছে একটা বাচ্চা। যেন গরিব বলে সোয়েটার জোটেনি। কিন্তু এ কে? এ তো গুড্ডুর বয়সী সেই বাচ্চাটা নয়। তাহলে পুঁচকেটা গেল কোথায়? শরীর খারাপ? হাসপাতালে ভর্তি হয় নি তো? এই বাচ্চাটা কে? এ কী ওর দিদি?

আলোকপর্ণাকে দেখেই চমকে গেল ফুটপাথের মা। তোমার ওই বাচ্চাটা কোথায়? – এমন প্রশ্ন করে একটু চেপে ধরতেই বেরিয়ে এল ভয়ঙ্কর এক তথ্য। জানা গেল কোনও একটা জায়গা থেকে নিয়ে আসা আগের বাচ্চাটা ঠাণ্ডা লেগে মারা গেছে সাতদিন আগেই। তাই একটু বড় অন্য একটা বাচ্চা নিয়ে আলাদা জায়গায় ভিক্ষে করতে বসেছে ওই মহিলা। যারা এদের সাপ্লাই দেয় তারা বলেছে আর বাচ্চা দেবে না। এটাই শেষ। ওর কোলে নাকি বাচ্চা টেঁকে না।

হঠাৎ শরীরে কাঁপুনি শুরু হল আলোকপর্ণার। মোবাইল থেকে কাঁপা কাঁপা হাতে ফোন করল বাড়িতে। মণিকা ফোন ধরতেই জানতে চাইল গুড্ডু কেমন আছে?

দূরন্ত নাতি ঠাকুমাকে নাজেহাল করে দিচ্ছে এমন সুখবর দিয়েই বৌদিকে আর গুড্ডুর সোয়াটার কিনতে বারণ করে দিল মণিকা। ঠাণ্ডা পড়েছে বলে আশপাশের বাড়ি থেকে গুড্ডুর জন্য প্রায় প্রতিদিনই আসছে শীতের পোশাক। যেমন আজই হাজির হয়েছে দুটো। এই নিয়ে ডিসেম্বরেই দশটা নতুন শীতের পোশাক হয়ে গেল গুড্ডুর।

ছেলের ভালো থাকার খবরেও অস্বস্তি কাটল না আলোকপর্ণার। আলো ঝলমল ধর্মতলা চত্বর জুড়ে বিকোচ্ছে কানচাপা, মাথার টুপি, সোয়েটার, জ্যাকেট, পা-মোজা কত কিছু। চাদরে কান, মাথা, চাপা দেওয়া সত্ত্বেও হঠাৎ খুব শীত করতে লাগল ওর। হাতে তখনও ধরা রয়েছে গুড্ডু আর ফুটপাথের শিশুটার জন্য ইন্টারনেটে কেনা দুটো সোয়েটারের প্যাকেট।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ