19 Apr

বিষ কেনার পয়সা নেই

লিখেছেন:অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়


সৌম্য,

একদিন তোমাকে যে নামে ডাকতাম আজ শেষবারের মতো সেই নামেই সম্বোধন করছি, যদিও নামটা আমার কাছে পীড়াদায়ক ও মৃত। হয়তো আমার এ চিঠি তোমার কাছে পৌঁছবে না কোনদিন, কিংবা চরম অবজ্ঞায় ছিঁড়ে ফেলে‍ দেবে তুমি পথের ধুলোয়। তবু লিখছি, না তেমার কোন অনুকম্পার আশায় নয়। তোমার অনেক কাজ এখন, তুমি বিধায়ক হতে যাচ্ছো। চতুর্দিকে তোমার জয়গান।

আমার ছেলে দেবব্রতর বয়স এখন আট। দয়া করে ‘মিশন’ তাকে নিয়ে নিয়েছে – তার সব দায়িত্ব নিয়েছে। তাই আমার ছুটি।

যখন সকলে আমার মৃত্যু কামনা করেছে তখন মরিনি, তোমার মতো পুরুষের কাছে হেরে যেতে হবে বলে। যে ছবিগুলো আমাকে প্রেরণা দিয়েছে প্রতিশোধ নিতে, আজ সেগুলো বড় উজ্জ্বল হয়ে চোখের সামনে ভাসছে, যেমন প্রদীপ নেভার আগে বেশী উজ্জ্বল হয়।

‘‘তুমি কার কাছে আবৃত্তি শেখো?’’ আমাকে তোমার প্রথম প্রশ্ন – কলেজে রিইউনিয়নে আমার ‘আফ্রিকা’ আবৃত্তির পর। কারুর কাছে শিখিনি জেনে তুমি কি অবাক হয়েছিলে সত্যি?

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরবিারের মেয়ে আমি। যা সামান্য কিছু টিফিন করে দিতো তাই আড়ালে গিয়ে খেতাম। হঠাৎ একদিন সেখানে তুমি গিয়ে হাজির। বড়ই লজ্জা. পড়েছিলুম দুটো রুটি আর আলু চচ্চড়ির বাক্সটা খুলে। পরে জেনেছিলুম তোমার সেটুকুও জোটেনা। ক্লাসের মেধাবী ছাত্র তুমি, অথচ গরীব তাই একটু অনুকম্পা দেগেছিল তোমার ওপর। পরে ‘‘আমার টিফিন’’টা ‘‘আমাদের টিফিনে’’ রূপান্তরিত হয়েছিল। টিফিন নিয়ে কাড়াকাড়ির ছবিগুলোর মূল্য আজ একেবারে শূন্য।

আমার আর কোন ভাই-বোন ছিল না, ছলিনা বাবার জমানো টাকা – যা দিয়ে বাবা আমার বিয়ে দিতে পারতো। কিন্তু ববড় হবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতো – পাছে আমার কোন বদনাম হয়। ছেলে বন্ধু আমার তাই কেউ ছিল না। তুমি আমার বন্ধু হবার পরেও আমি বাড়িতে জানাইনি। তুমি তবু আমাদের বাড়ি এসেছো, মা’র সঙ্গে আলাপ করেছ। বাবা জানতে পেরে আমাকে সাবধান করেছিল, মোলামেশা কমাতে বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে উল্টোটা ঘটেছিল। তা’না ঘটলে নিয়তি কি আজ আমাকে এখানে আনতে পারতো? আমি যে ধীরে ধীরে তোমা. আমার সব কিছু সমর্পণ করে বসে ছিলুম। তুমি সেটা ভালই জানতে, তাই সর্বস্ব গ্রহণ করতে দ্বিধা করোনি। আমি জানতাম আমাকে বিয়ে করার সাধ্য তোমার ছিল না, তবে কেন নিঃস্ব হলুম? মেয়েরা ভালবাসলে বোধহয় পরিণামের চিন্তা করে না।

তোমাদের বাসাতেও নিয়ে গেছ আমাকে। মাসীমা – মানে তোমার বিধবা মা’কে দেখে খুব কষ্ট হয়েছিল। যেন পাথরের মূর্তি – দুঃখের যন্ত্রণার …… ছবি। সেদিন তোমাকে চিনিনি, তাই তোমার মায়ের নির্লিপ্তভাব কেন বুঝিনি। পরে বুঝেছি। সেদিন উনি বলেছিলেন ‘‘……… ও তপু তোমার বন্ধু হয়েছে, দেখো ক’দিন বন্ধুত্ব বজায় রাখে…..।‘’ সেদিন কথাটাকে গুরুত্ব দিইনি কারণ তপন দত্ত তখন আমার কাছে সৌম্য – সুন্দর।

কলেজে মেধাবী ছাত্র, ইউনিয়নের লীডার তায় সুদর্শন। তাই তোমার আমার ঘনিষ্ঠিতায় অনেক মেয়ের ঈর্ষার পাত্রী হয়ে তখন গর্ববোধ করতাম। সেদিনের সেই ছবিটা। ছন্দা, দীপা আর শুভা আমাকে পাশ কাটিয়ে যাবার সময় বেশ জোরেই ছন্দা বললো – ‘‘তপনের choiceটা দেখ – একটা বাঁদরীকে কি দেখে পছন্দ করলো?’’ মনে পড়ে আমি এই কথা শুনে এতো উচ্চস্বরে হেসে উঠেছিলাম যে ছুটির সময় সবাই যেতে যেতে থমকে গিয়েছিলো আর ছন্দা তাড়াতাড়ি নিজেদের গাড়ীতে উঠে বসেছিল।

তুমি খুব বকবক করতে কিন্তু তোমার অনেক খবর কেউ জানতো না। আমার মতো সবাই ভাবতো ‘‘কি দিলখোলা ছেলেটা’’। কিন্তু তুমি হিসেব করে বকবক করতে। হয়তো আমার নিয়তির লিখন ছিল বলেই তোমার মতো বাস্তববাদীরও এক লহমার ভুলে দেবব্রত এসে হাজির হলো। তুমি নিজেকে clean প্রতিপন্ন করতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিঁড়ে দেশে চলে গেলে। ভাগ্য কাকে বলে! ঠিক তখন তোমার কাকা মৃত্যুশয্যায়।

তোমার মা’কেও তুমি খুব কম চিঠি দিতে, তাতে আমার সম্বন্ধে কোন কথাই থাকতো না। আমি যখন বুঝলাম আর গোপন করা আমার আয়ত্বের বাইরে, তোমায় প্রতি সপ্তাহে চিঠি দিয়েছি আর চাতকের মতো আশার একবিন্দু নীরের জন্যে পল-অনুপল গুনেছি – কিন্তু তুমি নিরুত্তর। বাড়িতে মা’কে সব জানালাম। মা থেকে বাবা জানলো। বাড়িতে ‘‘গলার দড়ি’’ আর ‘‘নদীর জল’’ দেখিয়ে দিলো। তোমার মা’র পা ধরে সব জানালাম। হ্যাঁ, তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, কিন্তু অত্রমতা জানালেন তোমাকে বাধ্য করতে।

দুটো দিন-রাত পথে পথে কাটিয়েছি, বুঝেছি যাদের কিছু নেই, এই তথাকথিত সভ্য জগতের পথও তাদের কাছে কতো বীভৎস। শ্বাপদ থেকেও মানুষ কতো লোভী, না, না রোজনামচা লিখতে বসিনি, মাত্র গুটিকয় ঘটনার ছবি মাত্র। আমার হাতেও সময় বেশী নেই।

কোলকাতা থেকে পুরুলিয়া। দয়ালু মাধব মিশ্র আর তাঁর স্ত্রীর ঔদার্য্যে দেবব্রত জন্ম নিল। ঝি-গিরি করেও তাকে প্রাইমারী শিক্ষা দিয়েছি। কিন্তু নিয়তি আবার থাবা বসালো। মাধববাবু দেহ রাখলেন, তাঁর স্ত্রী সম্পত্তি বিক্রি করে ভাই-এর কাছে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। আমাদের পুরুলিয়া থাকার দিন শেষ হলো। ছেলেটার জলভরা চোখদুটোই শুধু পীড়া দিচ্ছে। দেবব্রত যেন সন্ন্যাসী হয়ে সমস্ত নারীজাতিকে মা ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারে, সেই শিক্ষা দিতে ‘মিশন’কে বিশেষ অনুরোদ করেছি, এটাই তোমার বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে আমার প্রতিশোধযধের সুচিন্তিত পথ। মিশনকে সব জানিয়েছি। না, তোমার ভয় নোই, তোমাকে জড়াইনি – কেবল তার বাবার নামটুকু লেখা হয়েছে – সৌঁম্য দত্ত। বুঝতে পারছো সৌম্য নামটা কেন মৃত। আর ছেলের নাম দেবব্রত রেখেছি এই আশায় যে, সে একদিন তার রিক্তা মায়ের অভিলাস পূরণ করে ‘‘ভীম’’ হবে।

ভৈরবদা’র কাছে তোমার গুণপনার অনেক গল্প শুনেছি। ভাবছো ভৈরবদা’র সঙ্গে আমার পরিচয়হলো কি করে? আরও আশ্চর্য্য হবে নিশ্চয় যদি জানতে পারো আমি বেশ কটা রাত কাটিয়েছি তোমাদের বাড়িতে। না, তখন তুমি আর দেশে যাওনা, কোলকাতায় বাড়ি করেছ, বিয়েকরেছ আবার ব্যবসা করছো তা’ বছর ২/৩ আগে। জানি তোমার মা বা ভৈরবদা কেউ আর নেই তাই তোমার রোষের শিকার তারা হবে না।

তোমার কাকা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন তাঁর একমাত্র বিলাত প্রবাসী সন্তানকে খবর দিয়েছি বলেও দাওনি, কারণ তোমার Plan ঠিক করে নিয়েছিলে। উকিলকে বশ করে একটা দানপত্র লিখেছিলে তাঁর সব সম্পত্তি তিনি দান করে গেলেন তোমাকে, কিন্তু ভৈরবদা শুেছিলো উকিলবাবু পড়েছিলেন সম্পত্তির ২ আনা মাত্র তিনি দান করলেন বলে এবং তাই তিনি সই দেন কোনরকমে – তাঁর চোখে ধেখে পড়বার অবস্থা তখন ছিলো না। ভাইকে খবর দিলে কাকা মরার পর। ভাইকে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে বিলেতে ফেরৎ পাঠিয়েছিলে শ্রাদ্ধের পরই। তোমার ভাই নাকি বলেছিলো, ‘‘অপু, তুই এই তঞ্চকতা করলি কেন? আমি তো আর আসবোনা ফিরে জানতিসই, আমিই লিখে দিতাম তোদের।‘’ কিন্তু politicianরা সম্ভাবনায় বিশ্বাস করে না., sure হতে চায়; তাই না? কেবল বাড়িটা রেখে সব জমিজমা তুমি বেচে কোলকাতায় বাড়ি করলে। কাকার বিশ্বস্ত চাকর ভৈরবদা’ আর তোমার মা পড়ে রইলো দেশের বাড়িতে সামান্য কিছু Money order-এর আশায় দিন গুনে। আগে যেমন তোমরা কোলকাতায় থাকতে। বেচারী মাসীমা – ছেলের বউ তাঁকে ১৫ দিনও সহ্য করতে পারেনি।

রাজনীতিতেও ভোল পাল্টেছো। শাসক দলের তুমি এখন একজন ‘লীডার’ – হাতে মাথা কাটার ক্ষমতা নাকি!

বলতে পারো লীডার, এই মৃত সৌম্যদের থেকে তপন দত্তরা বের হয়, না তপন দত্তদের মায়ায়সৌম্যরা সৃষ্ট হয়?

ইচ্ছে করলে তোমার সুখের সংসারে আমি আগুন লাগাতে পারতাম, কিন্তু না, ঘৃণায় তোমার মুখ দর্শন করতে পারিনি। তোমার বাড়ি গেছিলাম তোমার মা’র খবর নিতে, তাঁকেও বড় দুঃখী বলে জানতাম তাই।

ভেবেছিলুম এক শিশি ‘ফলিডল’ কিনবো কিন্তু শেষ সম্বল ১ টাকা ২০ পয়সায় তাও পাওয়া যা না, তাই একটা পাঁউরুটি কিনে নিয়েছি, রেলের লাইনে যেতে কোন পয়সা লাগে না। রুটিটা পেটে থাকলে ‘‘পোষ্ট মর্টেম হলে, না খেতে পেয়েমরেছি এটা প্রমাণ করা যাবে না; মনের জোরও বাড়বে নিশ্চয়, যদিও ইঞ্জিনের শব্দের থেকেও বহু জোর শব্দ আমার কানে গত আট বছর ধরে আছড়াচ্ছে। নামটার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীর মন ঘৃণায় কুঁকড়ে যায় – আমার মৃত্যুর মাঝ দিয়েই ওই নামটারও পূর্ণ মৃত্যু হবে, তাই আমি বড় ব্যগ্র। সময় নেই।

 

দেবব্রতর মা।

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ