19 Apr

হালখাতা

লিখেছেন:তপন মোদক


মাস খানেক আগে সত্যর সঙ্গে দেখা । সত্য আমার ছোট বেলার বন্ধু । স্কুলের । স্কুল থেকে বেরনোর পর সত্য হারিয়ে যায় । স্কুলের পর আমার জীবন – কলেজ ইউনিভার্সিটি হয়ে চাকরি । গড়পড়তা সরলরেখার জীবন । সেও প্রায় শেষ হতে চলল । প্রাইমারি স্কুলের একঝাঁক সহপাঠী । তাদের কাউকেই আজ আর চিনতে পারবো বলে মনে হয় না । হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের অনেক সহপাঠীদের রাস্তায় হঠাৎ দেখলে চিনতে পারি – অনেকের নামও মনে আছে । যেমন সত্য । ওরা পেশায় দর্জি । পারিবারিক ব্যবসা । আমাদের অঞ্চলের একটা কলোনীতে থাকত । অধুনা বাঙ্গলাদেশের বরিশাল থেকে বাঙলা ভাগের সময় এ দেশে এসেছিল । স্কুলে সত্যর কাছ থেকে রানাঘাটের কুপার্স ক্যাম্পের অনেক গল্প শুনেছি । আমরা সেই সময় কলোনীর মানুষদের “বাঙ্গাল” বলে বেশ হেয় করতাম । কত রকমের ছড়া মুখে মুখে বানানো হত । সত্য এ সব শুনতো আর মিটমিট করে হাসতো । কলোনীর অন্যান্য ছেলেরা বেশ রেগে যেত ।   ছোটখাটো মারপিট প্রায়ই লেগে থাকতো ।   কিন্তু সত্য ব্যতিক্রম । আমি বলতাম, তুই রাগিস না কেন । ও সেই হাসি মুখেই বলত, আরে ঘটিরাই তো আমাগো বাবার দোকানের খরিদ্দার । তোদের ওপর গোঁসা করলে আমগো হাঁড়ি চড়বে না  ।  এখন বুঝি,  ব্যবসার প্রথম পাঠ ওর হয়ে গেছিল । তবুও সত্য একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠতে পারেনি । অবশ্য সে সব অনেক পরের কথা । আমাদের স্কুল থেকে হায়ার সেকান্ডারি পরিক্ষার্থী ছিলাম বিজ্ঞান, কলা আর বাণিজ্য বিভাগ মিলিয়ে প্রায় দুশ জন । আমি মাঝে মাঝে সেই সময়ে ফিরে গিয়ে তাদের মুখগুলো মনে করার চেষ্টা করি । আর সেই মুখগুলো দেখে ভবিষ্যত সম্ভাবনার কথা চিন্তা করি । এটা আমার একটা প্রিয় খেলা । যেমন সায়েন্সে ছিল সুপ্রতিম । ও যে ভবিষ্যতে একজন বড় ডাক্তার হবে এ ব্যাপারে আমাদের মনে কোনও দ্বিধা ছিল না । কিন্তু সুপ্রতিম ডাক্তার হতে পারেনি । হায়ার সেকান্ডারি পরিক্ষার পর কোথায় যে হারিয়ে গেল । অনেকদিন বাদে ওকে ওর বাবার ওষুধের দোকানে বসতে দেখলাম । ততদিনে ওর বাবা গত হয়েছেন । একটা প্রায় না-চলা ওষুধের দোকানে একটা টুলের ওপর বসে যখন একটার পর একটা বিড়ি খেয়ে যায় তখন মেলাতে বেশ কষ্ট হয় । সুনির্মল ছিল একটা লোচ্চা ছেলে । যত রকমের খারাপ নেশা করা থেকে নুন শোয়ে নোংরা সিনেমা দেখা ওর কাছে ছিল জল ভাতের মত । আমরা কেউ স্বপ্নেও ভাবি নি ও আমেরিকায় একটা বড় চাকরী নিয়ে কোটি কোটি ডলারের ওপর বসে থাকবে । মাঝে মাঝে দেশে আসলে সেই ঝনঝনানি বেশ শুনতে পাই । কিন্তু আমাদের ভাবনা অনুযায়ী সত্য একজন দর্জিই হয়েছিল । আমি তখন কলেজের প্রায় প্রথম দিকে । ওদের দোকানের সামনে দেখি সত্য খুব চেঁচাচ্ছে আর পাবলিক মজা দেখছে ।পাড়ার বখাটে ছেলেরা ওর দোকানের সামনে “অর্ডার ক্লোসড” লিখে সেঁটে দিয়েছে । দুর্গাপুজোর মাসখানেক আগের কথা । তখন চালু দর্জির দোকানে পুজোর মাস দুয়েক আগে অর্ডার না দিলে পুজোর সময় নতুন জামা  প্যান্ট আর পরা হত না । চালু দর্জির দোকানে এটাই ছিল চিত্র । এখন এই ব্রাণ্ডেড প্যান্ট জামার যুগে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে না । এখন চালু দোকানেও “অর্ডার ক্লোসড” বিজ্ঞপ্তি ঝুলতে দেখি না । সেই সময়ে অর্থাৎ সত্যর বাবার আমলে ওদের দোকানে নতুন জামা প্যান্টের অর্ডার পড়তো বলে মনে হয় না ।আমার বাবা ওদের দোকানে লুঙ্গি সেলাই করাতে যেত । মুলতঃ বালিশের ওয়ার বা লেপের ওয়ার তৈরি করার কাজ ওদের দোকানে টুকটাক হত । কিন্তু ওদের দোকানে কেউ জামা প্যান্টের অর্ডার দিয়েছে এমনটা চোখে পড়ে নি । সেটা ওদের দোকানের হত দরিদ্র চেহারা দেখে না ওর বাবাকে দেখে তা আজ বলতে পারবো না । পাড়ার ছেলেদের এই রসিকতা সত্য মেনে নিতে পারে নি । দোকানের বা বাবার এই অপমান    ওর বুকে বেজেছিল । আমি খানিকটা দূর থেকেও সত্যর চোখে জল দেখেছিলাম । এরকম ছোটো খাটো মজা সে সময় লেগেই থাকত । আমিও তা থেকে আলাদা ছিলাম না । তবে সত্যর পিছনে কখনো লেগেছি মনে পড়ে না । তখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ি । নিতাই একদিন বলল, আজ গৌরাঙ্গ কোস্তা ফুটে গেল । নিতাই আমার স্কুলের বন্ধু । উচ্চ-মাধ্যমিকে তিনটে বিষয়ে ব্যাক পেয়ে পড়াশোনার ইতি টানে । আমি বললাম, গৌরাঙ্গ কোস্তাটা আবার কে । নিতাই খুব হাসতে লাগল । বলল, আরে সত্য কোস্তার বাবা । ঐ সময় আমাদের অঞ্চলে সবচেয়ে চালু দর্জির দোকান ছিল “কোস্তা টেলার্স” । তার মালিক ছিল একজন অতি বৃদ্ধ মুসলমান । তাকে সবাই মাষ্টার বলত ।    কেউ কেউ “কোস্তা সাহেব”ও বলত । আমি বুঝলাম নিতাই দর্জির প্রতিশব্দে কোস্তা কথাটা ব্যবহার করেছে । আমিও হাসতে লাগলাম । এখন তার জন্য খুব খারাপ লাগে । তবে আমি সত্যকে একদম ভুলতে পারিনি তার একটা অন্য কারণও ছিল । উচ্চ-মাধ্যমিক পাশ করে তখন কলেজে পড়ছি ।সেই “অর্ডার ক্লোসড” ঘটনার মাস ছয়েক পরের ঘটনা । একদিন সাতসকালে সত্য আমাদের বাড়ি এল । মুখে সেই সলজ্জ হাসি । বলল, মেসোমশাই’এর কাছে এসেছি । সত্য ওদের দোকানটা আবার নতুন করে সাজিয়ে গুছিয়ে নতুন করে চালু করতে চায় । আগামী পয়লা বৈশাখ । ওর বাবা তখনও বেঁচে । আমাকে বলল, দুটো নতুন মেশিন কিনেছি – একজন লোকও রেখেছি – আর আমিও বছর খানেক কলকাতার একজন নাম করা  ওস্তাদের কাছে ট্রেনিং নিয়েছি । তারপর বলল, বাবাও বলল এবার তুই ব্যাবসাটা দেখ – আমি তো তোর মত পড়াশোনা করতে পারলাম না – যদি মন চায় এবার পুজোয় তোর জামা প্যান্টের অর্ডারটা আমায় দিস – দেখবি খারাপ করব না । তখন আমাদের দর্জির দোকানে জামা প্যান্টঁ বানানোর মত অবস্থা ছিল না । যখন হল- ততদিনে আমরা কলকাতামুখী হয়ে গেছি । ইতিমধ্যে আমার বাবা এসে গেছে । সত্য বাবাকে প্রণাম করে একটা কার্ড ধরাল । বলল, আগামী পয়লা বৈশাখ “জয় গৌর নিতাই টেলার্স”এর হালখাতা , আপনাকে বাবা  যেতে বলেছেন । বাবা কপালটা একটু কুঁচকে কার্ডটা নিয়ে বলল, তোমাদের দোকানের হালখাতা ! তা আমি তো ধার বাকিতে তোমাদের দোকানে কিছু সেলাই করাই নি । সত্য জিভ কেটে কানে হাত দিয়ে বলল, ছি ছি, একি বলছেন মেসোমশাই , আসলে দোকানটা নতুন করে সাজালাম তো – তাই এলাকার সব সজ্জন লোকেদের বলছি । বাবা ছোড়নেবালা নয় । মজা করেই বলল, আমি তো তোমাদের এলাকার লোক নই আর সজ্জন বলতে যা বোঝায় ,   তা তো আমি নই বাপু । সত্য সেই লাজুক ভঙ্গীতে বলল, সে সব আমি জানিনা মেসোমশাই , আপনাকে যেতে হবে । আমাকে বলল তোকেও যেতে  হবে কিন্তু, তোর তো পয়লা বৈশাখ কলেজের ছুটি থাকে ।

 

পয়লা বৈশাখ বিকালে বাবা আর আমি ওদের দোকানে    নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলাম । সত্য পাজামা পাঞ্জাবী পড়ে একই রকম সলজ্জ হাসি নিয়ে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে । যেতেই সত্যর বাবা আমার বাবাকে জড়িয়ে ধরে দোকানের   ভেতর নিয়ে গেলেন । আমাকেও আপ্যায়ন করলেন । দুটো নতুন সেলাই মেশিনে ফুলের মালা দিয়ে সাজানো । সত্যর এক মামা গদিতে বসেছেন । একটা তক্তপোষে সাদা চাদর পাতা । একটা কাঠের বাক্স । তার ওপরে একটা মোটা লাল খাতা – সেটা সাদা সুতো দিয়ে বাঁধা ।ভেতর থেকে সম্ভবত  সত্যর বোন দু গ্লাস শরবৎ দিয়ে গেল । সত্যর বাবা বললেন, খাও বাবা – বাতাসার শরবৎ । আমাদের বরিশালে এর খুব চল ছিল । বাপ-ঠাকুর্দাকেও দেখেছি হালখাতার দিন বাতাসার পানা হবেই – এতে নাকি গৃহস্থর সুখ সমৃদ্ধি বাড়ে – অতিথিরও কল্যাণ হয় । বাবা বলল, গৌরাঙ্গবাবু আপনাদের বরিশালের দোকান কেমন চলত । সে আর কি কমু দাদা, একই হাল- ধার বাকিতেই কেউ কোনও দিন সুখের মুখ দেখিনি, সত্যর বাবা বলে চলে ।ধার বাকি যদি সব আদায় হত এতদিন চারাচাকা হাঁকায়ে ঘুরতাম । ওই সময় দর্জির দোকানে কেউ ধারে জামা প্যান্ট বা অন্য কিছু সেলাই করাতো বলে শুনিনি । মুদি খানার দোকানে বা চালের দোকানে একটা মাসকাবারি খাতা প্রায় সবারই থাকত । কয়লা বা কেরোসিনের দোকানেও দেখেছি কেউ কেউ ধারে মাল নিত । কিন্তু দর্জির দোকানে – কখনও দেখিনি । বাবাও বিস্মিত হয়ে বলল, সে কি গৌরাঙ্গ বাবু – ধারে সেলাই – এখানে । সত্যর বাবা খুব লজ্জা পেয়ে বলল, – না না – এখানে আপনারা হলেন সব সজ্জন মানুষ – আমি সেই পিরোজপুরে আমাদের ঝিঙ্গাখালি গ্রামের দোকানের কথা বলছি । কথাবার্তায় জানতে পারলাম বরিশালে সত্যদের যে আদি দোকান ছিল সেই দোকানের কথা বলা হচ্ছে । সত্যরা এখানে আসার পর কথার মধ্যে বাংলাদেশী টান আস্তে আস্তে কমে গেলেও ওর বাবার কথার মধ্যে মাঝে মাঝে বরিশালি বাংলা ঝিলিক মারছিল । হঠাৎ সত্যর বাবা বলে উঠলেন, দেহেন দেহেন আমাগো জাবদাটা দেহেন – অহে সম্বুন্ধি দাদারে জাবদাখানা দেহাও তো । সত্যর মামা সেই মোটা লাল রঙের খাতাটা বাবার হাতে তুলে দিলেন। বাবা বেশ মজা করে খাতাটা দেখতে লাগল । আমিও বাবার পাশ থেকে উঁকি মেরে খাতাটা দেখতে লাগলাম ।খাতাটা নতুন । বেশ সুন্দর হস্তাক্ষরে লেখা ।  বাবা পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলে উঠল ওরে বাবা, সেই ১২৬৯ সাল থেকে হিসেব – মানে – দাঁড়ান দাঁড়ান বোধ হয় বাংলা সাল – গৌরাঙ্গ বাবু এ তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের কথা – মানে কত বছর আগে – তা ধরুন প্রায় একশ বারো তেরো বছর আগের কথা । তা তো হবেই দাদা, এ আমাদের পাঁচ পুরুষের ব্যবসা – এই সত্যকে ধরে ছয় পুরুষে পড়ল, সত্যর বাবা আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন । বাবা বাধা দিয়ে বলে উঠল, কিন্তু এত বছর আগের কথা হলেও হাতের লেখাটা তো নতুন । সেটাই তো নিয়ম দাদা – প্রতি হালখাতায় নতুন জাবদায় আগের বছরের জের টেনে কাজ শুরু করতে হয়, সত্যর বাবা বেশ সপ্রতিভ ভাবে উত্তরটা দিলেন । আমি তখনই ভাবতে লাগলাম সেই একশ তের বছর ধরে প্রতি বছর আগের বছরের জের টেনে খাতা খোলা হচ্ছে । ভাবা যায় না । ধন্যি ছেলের অধ্যিবসায় । বাবার মনেও নিশ্চয়ই একই ভাবনা চলছিল ।বাবা বলল, কে জের টেনেছে – আর বেশ ভাল হাতের লেখা । সত্যর মামা দেখলাম বেশ নড়ে চড়ে বসল । সত্যর বাবা বললেন, ওই সম্বুন্ধির কাজ – দিদির বাড়ি বসে বসে ভাত খাবে – বললাম এ কাজটা করে দাও সম্বুন্ধি – তা ও বেশ যত্ন করেই করেছে – হাতের লেখাটাও পরিষ্কার – কি বলেন । বাবা এক দুঁদে সাংবাদিকের মত প্রশ্ন করে যাচ্ছে । বলল,  এ সব পয়সা কি আপনি পাবার আশা করেন গৌরাঙ্গ বাবু – এরা তো সব কবেই মরে ভূত হয়ে গেছে – প্রথম নামটা দেখছি – শ্রী মথুর মোহন ঘোষ, তারিখ -১৫ই শ্রাবণ ১২৬৯, এক আনা দু পয়সা এক পাই – মানে ছ পয়সা । বাবা আমাকে বলল,  এই হিসাবটা জানিস তো – তখন পয়সার হিসেব – চার পয়সায় এক আনা – আর ষোল আনায় এক টাকা – মানে চৌষট্টি পয়সায় এক টাকা –  আবার তিন পাই’তে এক পয়সা । সত্যর বাবাকে বলল, তা এই মথুর বাবু তো কবেই ঈশ্বরেরও ঈশ্বরের হয়ে গেছেন – আর ধরুণ স্বর্গ থেকেও যদি মিটিয়ে দেন – তাহলে এই ছ’পয়সা আর এক পাই’এ  আপনার কি সুসার হবে গৌরাঙ্গ বাবু । গৌরাঙ্গ বাবু এই কঠিন প্রশ্নের সামনে একটুও না ঘাবড়ে উত্তর দিলেন, আশায় বাঁচে চাষা – ব্যবসাদারদেরও আশা করতে হয় – আর এ সব তো হিসাবের টাকা – আমি তো ফেলে দিতে পারি না – আমার বাপ কে তার বাপ পিতৃপুরুষসূত্রে দিয়ে গেছেন – ঐ যে প্রথম পাতায় একদম শেষের দিকে দেখুন – ধরণীধর গুপ্ত- পাওনা এক টাকা সাত আনা তিন পয়সা – ওদের বংশধরদের কলকাতার ভবানীপুরে তিন পুরুষের বাস – বছর দুয়েক আগে এই সত্যটারে নিয়ে খুঁজে খুঁজে ওদের বাড়ি গেছলাম – তারা তো নিজের বাপের নামই মনে রাখতে পারে না – তা ঠাকুর্দার বাপের নাম মনে রাখবে কি করে – তা ওদের দরকার নেই তাই মনে রাখে না – কিন্তু আমার তো তা হলে চলবে না – আমাকে মনে রাখতেই হয় – আর তার জের টেনে নিয়ে যাচ্ছি এত বছর – হিসেবের ব্যাপার তো দাদা , আপনি কি বলেন । বাবা আর কি বলবে । আমরা দুজনেই কিছুক্ষণ গৌরাঙ্গ বাবুর দিকে তাকিয়ে থাকলাম । ভিতর থেকে সম্ভবত সত্যর মা বলে উঠলেন, খালি গালগল্প করলেই হবে – কহন থিকা ভদ্রলোককে দাঁড় করাইয়া রাখছ  খাইতে দিবা না । এতে সত্যর বাবা বেশ লজ্জা পেয়ে যান, দেখুন দেখি – এই সত্য যা নিয়ে আয় । এরপর দুটো প্লেটে নারকেল নাড়ু , নিমকি আর মালপোয়া বেশ যত্ন করে সাজিয়ে আমাদের দেওয়া হয়েছিল । বাবা খেয়েছিল কিনা মনে নেই – আমি পুরোটাই সাঁটিয়েছিলাম ।

 

যে কথা হচ্ছিল । মাস খানেক আগে সত্যকে দেখলাম । ডাক্তারের নির্দেশ মত মধুমেহ রোগের প্রতিকারের জন্য প্রাতঃভ্রমণ শুরূ করেছি । আমাদের বাড়ির পিছনের রাস্তা ধরে অনেকদিন যাওয়া হয়নি । সব ব্যাপারেই এখন আমরা কলকাতামুখী । বাড়ির পিছনের রাস্তা ধরে মাইল দুয়েক গেলেই হাই রোড । আধা শহর আধা গ্রামের মধ্য দিয়ে রাস্তা । অনেক পরিবর্তন । আগের স্মৃতির সঙ্গে মেলাতেই পারছি না । হাইওয়েতে পরিচিত অপরিচিত অনেক স্বাস্থ্যান্বেষীর ভিড় । একদম অন্যরকম জগৎ । ভোরের ফুরফুরে হাওয়ায় দারুণ লাগছে । আরও আগে প্রাতঃভ্রমণ শুরু করলে বেশ হত । একজনকে দেখলাম একটা পা  সোজা করে হাতে লাঠি নিয়ে হাঁটছে । কাছাকাছি হতে দেখলাম সত্য । চেনা খুব মুস্কিল । কে বলবে আমরা সমবয়সী । আমার চেয়ে অন্তত দশ বছরের বড় বলাই যেতে পারে । আমি বললাম, সত্য না । ও কেমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল । মনে হল চিনতে পারেনি । পরে ভুল ভাঙ্গল । কেমন ঘ্যারঘেরে গলায় বলল, কাল থেকে তোকে দেখছি – সেরিব্রাল – টিবি না সুগার ,    ও তোদের তো   আবার আর একটা রোগ হয় হাইপারটেনসান । আমি মনে মনে হেসে উঠলাম । বললাম, কোনটাই নয় – এই সামান্য সুগার দেখা দিয়েছে –  তা তোর ব্যাপার কি – এই অবস্থা কেন । বলল চ বসি – ওই দোকানটা ভাল চিনি ছাড়া চা করে, বলে লাঠি তুলে হাইওয়ের ওপারের একটা দোকানের দিকে দেখাল ।    চায়ের দোকানে বসে ওর বৃত্তান্ত শুনলাম । বছর খানেক আগে ওর একটা স্ট্রোক হয় । সেরিব্রাল । মাস খানেক হাসপাতালে কাটিয়ে বাড়িতে প্রায় মাস ছয়েক ফিজিওথেরাপি  করে এখন উঠে দাঁড়িয়েছে । ডান দিকটা প্যারালাইসিস হয়ে গেছল । পুরো সুস্থ হতে দেরী আছে । আমি বললাম , ব্যাবসাপত্তর – তোদের দোকান । সত্য বলল, তুই তো আর এলি না কোনও দিন – সে সব কথা অন্য একদিন হবে – আসছিস তো । এই পর্যন্ত সে দিনের মত ইতি । সত্য আর ভাঙ্গল না । সত্য আগের সব স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে চা শেষ করে উঠে পড়ল । বলল, চায়ের দাম দিস না – মদনের সঙ্গে আমার মাসকাবারী আছে । দিনটা ছিল রবিবার । অফিস নেই । বাড়ি ফিরে বাজারটা কোনও রকমে রেখে স্কুটার নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম । যে অঞ্চলে সত্যদের “জয় গৌর নিতাই টেলার্স” সেখান দিয়ে অনেক দিন যাওয়া হয় নি । গেলেও ওদের দোকানটা চোখে পড়ে নি । আমি কলেজে পড়ার সময়ই ওদের বাড়িসংলগ্ন   দোকানটি শহরের অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত করা হয় । এখনও নিশ্চয় ছ’পুরুষের দোকান বন্ধ হয়ে যায় নি । জায়গাটা শহরের কেন্দ্রবিন্দু থেকে একটু দূরে । উন্নয়নের ধাক্কায় অন্যান্য অঞ্চলের পরিবর্তন ঘটলেও কোন এক অজ্ঞাত কারণে ওই অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে আছে । স্কুটার দাঁড় করিয়ে দেখলাম সেই “জয় গৌর নিতাই টেলার্স” এখনও আছে তবে অনেক ছোট হয়ে গেছে । প্রায় অর্ধেক । সাইনবোর্ডটা আছে তবে বিবর্ণ হয়ে গেছে । বাকি অর্ধেক জায়গায় অন্য একটা টেলারিং’এর দোকান । নামটাও বেশ মডার্ণ । “নিডল এণ্ড সিজার্স” । একদম ঝাঁ চকচকে । পাশাপাশি লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ব্যাপারটা জানা যেত । পাশের গলিতেই স্কুলের সহপাঠী রেজাউলের বাড়ি । কিন্তু কৌতূহল চাপা দিয়ে বাকিটা সত্যর মুখ থেকে জানার জন্য রেখে দিলাম ।

 

পরের দিন আবার সত্যর সঙ্গে দেখা । যদিও আজ আমার সময় কম । অফিস আছে । সোজা বিষয়ে ঢুকে গেলাম, ব্যবসার খবর বল – দোকান কেমন চলছে । আর ব্যবসা – অভিশাপ – বুঝলি অভিশাপ – আমাদের বংশের ওপর – পিতৃপুরুষের অভিশাপ বয়ে নিয়ে চলেছি , বলেই  বিকৃত কণ্ঠস্বরে সত্য হাসতে লাগল । তারপর কেশে দম আটকে সে এক বাজে ব্যাপার । চায়ের দোকান থেকে জল নিয়ে ওকে খাওয়ালাম । একটু ধাতস্থ হতে বলল, কাল রাত থেকে ডায়লগটা ভেবে রেখেছি – কেমন নাটকের মত হয়ে গেল না ।  সত্য বলেই চলল, তবে কি জানিস- যারা নাটক লেখে – কারো না কারো জীবনের গল্পতো সেটা –  বানিয়ে তো কিছু হয় না । বুঝলাম, না পেতে পেতে – দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে সত্য একটা চরম সত্যে উপনীত হয়েছে – একটা দর্শন ।বলল,  আমি তো তোর মত লেখাপড়া করে একটা চাকরী নিয়ে একটা অন্যরকম জীবন পেতেই পারতাম – আমাদের কলোনীর দিকে দেখ – যাদের কিচ্ছু ছিল না – তারা আজ গাড়ী বাড়ি করে দাঁড়িয়ে গেছে – ছেলেপুলেরা একেবারে ঝকঝকে – কি সুন্দর – তাকালে চোখ ফেরানো যায় না – আর আমি শালা ওই বাপ-ঠাকুর্দার ব্যবসা নিয়ে বসে আছি –  আর ওই শালার  জাবদা খাতা –  খালি জের টেনে যাও । আমি বাধা দিয়ে বললাম, না টানলেই পারিস – একবার না টেনেই দেখ না – কি হয় । ও আমার কথাকে পাত্তা না দিয়ে বলেই চলে, পাক্কা ছ’মাস লেগেছে জানিস – রাত জেগে জেগে বলে গেছি আর বড় ব্যাটা লিখেছে – ওই বড় ব্যাটার ওপরও অভিশাপ লেগেছে – আর কত পুরুষ টানতে হবে কে জানে । এবার সত্য একটু দম নেয় । অফিস আজকের মত শিকেয় উঠেছে । মাঝপথে চলে যাওয়াও  ঠিক হবে না ।   তাছাড়া আমারও আগ্রহ বাড়ছে । সত্যকে একজন মহাকাব্যিক চরিত্র বলে মনে হচ্ছে – যে তার পিতৃপুরুষের অভিশাপের বোঝা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে । বেলা হয়ে গেছে ।    রোদের তেজ বাড়ছে । সত্যর থামার লক্ষণ নেই । আমার চোখে চোখ রেখে বলল, তুই অভিশাপ মানিস – পূর্ব জন্মের পাপ । আমার উত্তরের প্রত্যাশা না করে বলল, না হলে আমার দু ছেলেই এই লাইনেই কেন রয়ে গেল – ছোট ব্যাটা লেখাপড়ায় বেশ ভাল ছিল বুঝলি – কি যে মতিগতি হল – কলেজে পড়তে পড়তে এক হাড়-হাভাতেকে বিয়ে করে নিয়ে এল – ঘরে অজাত কুজাত ঢুকলে কি হয় – হাঁড়ি আলাদা হয়ে গেল – শেষে দোকানটাও দুভাগ করে দিতে হল- তবে মিথ্যে বলব না কলকাতা থেকে কারিগর রেখে দোকানটা বেশ ভালই চালাচ্ছে । আমি এবার সুযোগ পেয়ে গেলাম । বললাম, ও নিশ্চয় তোর জাবদা খাতা নেয় নি । পাগল – নামটাও নেয় নি – ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে ইলেকট্রিক মেশিন লাগিয়েছে – তুই একবার গিয়ে দেখিস – এখন শুনছি ফ্লাট বুক করেছে – আমাদের সঙ্গে আর থাকবে না, সত্যর দীর্ঘশ্বাস ঝরে ঝরে পড়ে । আমি বললাম, অভিশাপের ব্যাপারটা তাহলে ঠিক নয় – তুইও দোকানটার নাম চেঞ্জ করে নে – আর হালখাতা-টাতা মাথায় ঠেকিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে দে – দেখবি অভিশাপ কেটে গেছে ।এর পর আরও কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা আওড়াতে যাচ্ছিলাম । সত্য উঠে পড়ল । বলল, তোর দেরী হয়ে যাচ্ছে – বাড়ি যা ।

 

এই সাক্ষাতের ঠিক দশ দিন পর সত্যর কাছ থেকে নিমন্ত্রণটা এল ।    সামনেই পয়লা বৈশাখ । এর মধ্যে সত্যর সঙ্গে দেখা হয়েছে – কিন্তু কেন জানিনা এড়িয়ে গেছে । আজ নিজে থেকেই লাঠি ঠুকতে ঠুকতে হাসিমুখে এগিয়ে এল । বলল, চ চা খাই । বলল, জানি আমার ওপর তুই রাগ করেছিস – তুই তো আমার ছোটবেলার বন্ধু – আর কে না জানে – ছোটবেলার বন্ধুর ওপর রাগ করতে নেই । আমি হেসে ফেললাম । ও উৎসাহ পেয়ে বলল, সামনের রবিবার আমার দোকানের হালখাতা – একবার গিয়ে দাঁড়াস – পারলে একটা আধটা অর্ডার দিস – বড় ব্যাটাটা একটু উৎসাহ পাবে বুঝলি । আমি বললাম, সেই হালখাতা । আছে – বলল, না রেখে উপায় নেই বুঝলি – বছর পাঁচেক আগে ভেবেছিলাম এবার আর হালখাতাটা করব না – কিছু না হলেও একটা খরচা তো আছে – এদিকে কাজকম্ম কম – তো তুই বললে বিশ্বাস করবি না – রাতে বাবা স্বপ্ন দিলেন – বাবা – সঙ্গে আরও পাঁচ-ছ’জন লোক – আমাদের পূর্বপুরুষ হবে হয়তো – কি ক্রুদ্ধ মূর্তি –    পারলাম নারে ।   সত্য মাথা নীচু করে খানিকক্ষণ বসে রইল । তারপর বলল, এবার বড়ব্যাটা চৈত্র সেলের অনেকগুলো অর্ডার পেয়েছে বুঝলি – সায়া তৈরির – সেই থেকেই হালখাতাটা একটু বড় করে করার ইচ্ছা আর কি । আমার কোনও কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না । উঠে পড়ার সময় সত্যকে শুধু বললাম,  যাব -পয়লা বৈশাখ যাব – নিশ্চয়ই যাবো ।

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ