03 Jul

মুদ্রারাক্ষস রহস্য

লিখেছেন:পবিত্র চক্রবর্তী


ভদ্রলোককে দেখে বঙ্গবাসী মনে হওয়ার কোন কারণই নেই । তবে কষের দুই কোণায় ঈষৎ কমলা পানের পিকের দাগ আর কথায় কথায় জয় জগন্নাথ শুনে এক সময় যখন টুটুন ধরেই নিয়েছিল আগত ব্যাক্তি ওড়িয়া । ঠিক তখনই কাঠ বাঙাল ভাষা , “ ছ্যার আমাগো ক্লাবের বয়স হইল গিয়া ত্রিশ , আমরা হক্কলে মিলে ঠিক করেছি আপনাদের যেতেই হইব ।“ খানিক থেমে একটা খাম এগিয়ে দিলেন । ওড়িয়া ভাষায় নিমন্ত্রণ পত্র । মামা হেসে বলল , “ তা আপনিই পড়েই দিন না ।“

খানিকটা মোটা কার্ড খুলে , নাকের উপর রিডিং গ্লাস চাপিয়ে পড়তে থাকলেন ,

মাননীয় স্যার / মেডাম ,

ড্রামা মুদ্রারাক্ষস অনুষ্ঠিত হেবাইকু যাইছি , কোনার্ক মন্দিররে আসন্তা ১৫-০৪-১৯ তারিখ ঠিক সন্ধ্যা ৬ ঘটিকারে । আপনঙ্কু হার্দিক আমন্ত্রণ জনাই ।

 

আপনার

তপু বটব্যাল ।

তপু বটব্যাল কথাটা বলেই নিজের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হাসলেন । মামাও ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করল । ভদ্রলোক কথার খেই ধরেই বললেন , “ আমাগো নাম হইল তপব্রত বটব্যাল । বন্ধুরা তপুই কয় ।“

লম্বা শ্বাস নিয়ে এবারে মামা মুখ খোলে , “ ঐতিহাসিক নাটক তো ! আশাকরি ভালোই হবে । ঠিক আছে যাওয়া যাবে ।“

তপুবাবু মামার গল্পের ভক্ত । মাঝে মধ্যে এখানে ওখানে ডাক পরে । মামা বলে , “খারাপ কী বল ? পকেটে কিছু তো আসে , নইলে বই বেচে কটা টাকাই বা আসে  ? পাঠক আর কই ! সব তো পি ডি এফ ।“

বাংলা নববর্ষের ছাপ এখানে তেমন একটা না পরলেও প্রবাসী বাঙালীরা বেশ ভালো মতই অনুষ্ঠান করে । মামা ট্রেনে যেতে যেতে বলছিল , “ একবার বুঝলি বাইরে গেছি প্রবাসী বাঙালীদের অনুষ্ঠানে ; তা সেখানে গুটিকয় বাচ্চাকে একটু খুঁচিয়ে বুঝেছিলাম ঘরের বাইরে বাঙালী নিজেদের বাঙালী পরিচয় দিতে পিছ পা হয় না । এই চা ভাইই…।”

টুটুন চা নিল না । ট্রেনে মখ চালাতে অত ভালো লাগে না । কথাটা ভুল বলে নি । টুটুনও পুনায় থাকার দৌলতে একই জিনিষ মনে হয়েছে । ট্রেন ঘন্টা দুই লেট করে পুরীতে থামল । ভুবনেশ্বরে না গিয়ে মামার ইচ্ছা একদিন এখানে থেকে বাকী দিন দুই চন্দ্রভাগার তীরে কাটানো ।

ষ্টেশনে কেউ রিসিভ করতে আসে নি দেখে মামার দিকে তাকাতেই “ নে নে পা চালা , একটা অটো ধর তুই । হাঁ করে কী দেখছিস , আমিই আসতে বারণ করেছি ।“

কাকাতুয়া রোডের শেষে  জিভে গজার পসার । গজায় কামড় লাগিয়ে ফুরফুরে হাওয়া খেতে খেতে সন্ধ্যা আরতি দেখার মজাই আলাদা । রিতমা কখনো আসে নি এদিকে । ওরা দেখেছে আরব সাগর । কথাটা মনে হতেই পকেট থেকে মোবাইল বার করে । খানিক পরেই “ ধুর “ বলে মুখ কোঁচকায় টুটুন । মামা গুন গুন করে গান করে ওঠে …

“ সখী ভাবনা কারে বলে

সখী যাতনা কারে বলে

তোমরা যে বল…”

“ দেখো ইয়ার্কি মেরো না বলছি , নিজের থাকলে বুঝতে …”

“ নিজের থাকলে বুঝতাম, মানে ! দাঁড়া দাঁড়া ক্লিয়ার কর তো ! প্রেম ট্রেম নাকী ?”

“ ধুর যাও …” প্যান্টের বালি ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে পরে টুটুন । মামা হাতটা ধরে টুটুনকে কাছে ডেকে বলে “ একটা গোপন কথা বলি শোন , এই আমরা যারা লেখালেখি করি তাদের প্রেম না তোদের মত একটা নয় , আগুন্তি…হা হা ।“

রাতে তপুবাবু ফোন করে জেনে নিলেন সব ঠিকঠাক আছে কিনা । মামা বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে বলল ,” কাল ৬ টায় গাড়ী আসবে ,উঠে পরিস । ও হ্যাঁ রিতমাকে গুড নাইট বলিস ।“

দুপুরের খানিক আগেই তবুবাবুর পাঠিয়ে দেওয়া স্যান্ট্রোতে করে হাজির লোটাস ইকো রিসোর্টে , আসাধারন পরিবেশ । খানিক দূরেই চন্দ্রভাগা সি বিচ । আর মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরেই সূর্য মন্দির , শাম্বর উপাসানা স্থল ।

“ শাম্ব কে মামা ? “ ভ্রূ কুঁচকিয়ে টুটুন প্রশ্ন করে ।

“ কৃষ্ণের ছেলে । বাবা ষোড়শ সখীদের নিয়ে ওই চন্দ্রভাগা নদীতে স্নান করছিলেন । বাবার কীর্তি দেখে ছেলে খেপে লাল , ইতিমধ্যে বাবাও দেখে ফেলেন আর দুম করে দিয়ে বসলেন অভিশাপ । শেষে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত ছেলে সূর্যের উপাসনা করেন এখানে, “ মামা এক নিঃশ্বাসে বলে গেল গল্প ।

দুপুরের খাওয়ার পর মামা চুপ করে কী বেশ ভাবতে বসল । জিজ্ঞেস করতেই উত্তর এল , “ ও কিছু না চানক্যের কথা ভাবছিলাম , নাটক শুরু হওয়ার আগে কিছু তো বলতে হবে ।“

বিকেলে তবুবাবু পান চিবোতে চিবোতে লম্বা করে জিভ কেটে  , “ এক্কেবারে সরি ছ্যার । বুজলেন তো নানা ঝামেলায় নাকাচবানি খাইতাসি , চলেন গাড়ী আনসি যেতে যেতে কথা হইবো গিয়া ” কথাটা শেষ করেই সামনের সোফায় বসে পরলেন ।

ঠিক তখনই রুমে ফোন এল । অচেনা গলা , “ হেলেনা কিন্তু বড্ড ঝামেলা করেছিল , আমিত্রোখাতেস কিন্তু প্রতিশোধ নিতে ভোলে নি , ইতিহাস সব লিখে রাখি নি …” মামা কিছু কথা বলার আগেই ফোনের ওপাশ থেকে টুঁ টুঁ করে কেটে দেওয়ার শব্দ আসলো ।

মামার মুখের ভঙ্গী দেখে তপু বাবু উঠে পরে মামার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ কী হইসে ? কেডা ফোন করলো আপনেরে ?“

টুটুন শুয়েই ছিল ,কাত হয়ে মামার দিকে চোখ নাচিয়ে ব্যাপারটা জানতে চাইল । কাঁধ ঝাঁকিয়ে মামা “ ধুর ধুর আজে বাজে কল । যাক গে তুই এখনো তৈরী হস নি । ল্যাদ না খেয়ে উঠে পর ।“

তপু বাবু বেশ করিতকর্মা লোক । সন্ধ্যের অন্ধকার আরো খানিকটা জাঁকিয়ে পরতেই সামনের নাট মঞ্চে হলদেটে লাইটের আভা চারিদিকে ছড়িয়ে পরেছে । মিসেস উপাসনা বটব্যাল মানে তবু বাবুর স্ত্রী সমগ্র অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন । নাটমঞ্চের পিছনে অস্থায়ী গ্রিনরুম । মামাকে অভ্যর্থনা করে নিলেন । সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়ে মঞ্চের সামনে আমার পাশে বসে পড়ল । মামার পাশে তবু বাবু , ওড়িশা পুলিশের ডি জি সস্ত্রীক অনুপ গোয়েল ।

একে একে মঞ্চে হাল্কা গোলাপি আভা ছাড়া সমস্ত আলো নিভে গেল । উইংস খুলছে ক্রমশ । ব্যাক স্টেজ থেকে খটাখট হাজারটা ঘোড়ার খুরের শব্দ । হাতির ডাক । টুটুনের সামনে যেন আলো আর শব্দের এক মায়াবী মিশ্রণ । হঠাৎ আলোটা একটু বেশী জ্বলেই নিভে গেল । মঞ্চের পিছনে সাদা পর্দায় একে একে পুড়ছে চিতা আর কান্নার হাহাকার । গুরুগম্ভীর পরিবেশে আরও গম্ভীর ভাবে ভাষ্য – অবশেষে হিমালয়ের রাজা তিনিও আর রইলেন না । হাঁ ঈশ্বর এ কী প্রহেলিকা !

রাজমহিষী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন । তাঁর বস্ত্রের অঞ্চল আজ ভূলুণ্ঠিত , কেশরাশি পুষ্প বিহীন । স্পট লাইটের সামনে মহিষী । অদূরেই মাথা হেঁট করে রাক্ষস আর নব নিযুক্ত রাজা মলয়কেতু ।

“  অধীশ্বর পর্বতেশ্বরের মৃত্যুর চিতা হয়তো নিভে গেছে মলয়কেতু কিন্তু ভুলে গেছো তাঁর স্নেহ ,তাঁর অবদান ! ছিঃ ছিঃ নির্লজ্জ মলয়কেতু ! আমিও বোকা তাই রাজার মত আমিও বিশ্বাস করে নিয়েছিলাম …কাপুরুষ ! “ মহিষীর গলার তেজে সমগ্র পরিবেশ থমথমে । দর্শক নির্বাক । টুটুন মামার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল , “ তুমি জানো এই মুদ্রারাক্ষস গল্পটা ?”

মামা মাথাটা ঝুঁকিয়ে ঠোঁট দুটো আড়াল করে জবাব দিল , “ গ্র্যাজুয়েশনে সংস্কৃত ছিল রে , দ্যাখ কি হয় ।“

মলয়কেতু স্টেজের এক দিকে সরে এসে মহিষীর কাছে হাতজোড় করে বললেন , “ আমি চরণের দাস হিসাবেই থাকবো এই রাজত্বে । মহারাজ পর্বতেশ্বরের হত্যার জন্য আমাকে দায়ী করবেন না । রাক্ষসও জানে আমি ঘটনা সম্পর্কে অবগত ছিলাম না । আমি তখন কলিঙ্গ বিজয়ের স্বপ্ন দেখছিলাম …।“

টুটুন উসখুস করছে দেখে মামা ওর দিকে তাকায় । বুঝতে পারলো টুটুন নাটক দেখার চেয়ে একটু ঘুরে দেখতে চায় । মামা চোখ নাচিয়ে যেতে বলে ।

গুটিগুটি পায়ে সূর্য মন্দির ছেড়ে সামনের পিচ ঢালা রাস্তা পার করলেই সি বীচ । আছড়ে পড়ছে একের পর এক ঢেউ । মাথায় ফসফরাসে মুকুট । দূর থেকে ভেসে আসছে নাটকের টুকরো টুকরো কথা …।

“ অভিশাপ দিলাম চাণক্য তোর মৃত্যু হবে অপঘাতে…।“ রাজ মহিষীর হাহাকার আর সমুদ্রের গর্জন মিলেমিশে এক ।

টুটুন ফিরে আসার জন্য পা বাড়ায় কিন্তু কিছুটা ভিতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ায় । কী হল ! তপুবাবু হনহন করে গেটের দিকে এগিয়ে আসছেন । টুটুনকে দেখে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন , “ সব্বনাশ হইলো গিয়া , চাণক্যের মুখে অ্যাসিড লেগেছে …।“

“ মানে !” টুটুনের গলায় ততধিক বিস্ময় ।

সামনের দিকে আরেকটু যেতেই ঘাসের লনটা পেরোতেই খেয়াল করে মামা এগিয়ে আসছে ।

রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে রাত ৩ টে । ঘরে ঢুকেই মামা জামাকাপড় চেঞ্জ না করেই বিছানার পাশে রিডিং লাইটে ছোট্ট একটা প্যাড হাতে নিয়ে কী বেশ আঁকিবুঁকি কাটতে বসে গেল । সামনেই টুটুন দাঁড়িয়ে । মামার যদিও ভ্রূক্ষেপ নেই । বেশ খানিকক্ষণ পর একটা ছোট্ট দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে জিজ্ঞাসা করল , “ ওহ তুই ! হুম কী বলবি বল ?”

“ আমি তো কিছুই বুঝলাম না মামা , কী থেকে কী হয়ে গেল !” খানিকটা আমতা আমতা করে টুটুন বলে । মামা বোঝে টুটুনের মধ্যে অদ্ভুত একটা কৌতূহল চলছে । কিন্তু এখনও নিজেই কিছুই বুঝে উঠতে পারে নি প্রায় । কেবল কয়েকটা যোগসূত্র জোড়াতালি মারা হচ্ছে ।

কিছুটা সময় ওর দিকে তাকিয়ে মামা বলল , “ বাদ দে তো । এ এক অদ্ভুত জ্বালা ! যেখানেই যাও সেখানেই কিছু না কিছু ঘটবেই । তুই শুয়ে পর ভোর হতে চলল ।“ এ এক প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত না জানানোর । বাধ্য হয়েই পোশাক পরিবর্তন করে মামার ঠিক পাশেই পিঠ টানটান করে শুয়ে পরতেই হাজারটা ঘুম চোখের পাতাকে ভারী করে তুলল ।

মামা শুয়ে আছে ঠিকই কিন্তু মাথার মধ্যে কয়েকটা কথা কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে । বিছানা থেকে উঠে একটু এগোতেই রুম থেকে বেরোনোর দরজা । আস্তে করে খুলে বেরোতেই এক ঝলক ফুরফুরে হাওয়া । সামনেই সবুজ লনটা এখন কালচে , পূবের আকাশ হাল্কা লাল । একটু এগোলেই কাঠের কারুকার্য করা বেঞ্চের একটাতে বসল ।

সমুদ্রের হাওয়া আর ঊষার ছোঁয়ায় হাল্কা শীত শীত লাগছে । অজান্তেই পাঞ্জাবীর পকেটে হাত গলাতেই শক্ত মত কি বেশ লাগলো ! বার করে দেখলো – কাঁচের সিরিঞ্জ !ইস একদমই ভুলে গেছিলো এটা । নিজেই মনে মনে গাল পারতে থাকে ।

গত সন্ধ্যায় দুর্ঘটনার পর ষ্টেজের  সামনে যেখানে সাউন্ড লাইটের সরঞ্জাম রাখা ছিল সেখানেই এই সিরিঞ্জ কুড়িয়ে পেয়েছিল । প্রকৃতির রোমাঞ্চ মাথায় উঠে গেছে , তবে কী এটাতেই ছিল ! কিন্তু …,নাহ …আবার প্রশ্নগুলো সাজাতে হবে । মামা দ্রুত ঘরের দিকে পা বাড়ায় ।

সকাল আটটায় কে জানতো যে আরেকটা ভয়ঙ্কর খবর ওঁত পেতে আছে ! সবে বার দুয়েক চায়ে চুমুক দিয়েছে মামা , বিছানায় কম্বলটা নিয়ে আলস্যের আড়মোড়া ভাঙছে টুটুন আর ঠিক তখনই…

“ হুম …। সেকী কখন হল ? আপনি আসছেন ? আসুন আসুন…হ্যাঁ  হ্যাঁ ঘরেই আছি “ কথাটা শেষ করে মামা আরেকবার চুমুক দিয়ে কাপটা পাশের টেবিলে রেখে দিল । মামার ভাঙা কথাতেই টুটুন বিছানায় উঠে বসেছে । চোখেমুখে কৌতূহল ।

“ তুই ফ্রেস হয়ে আয় । আর চট করে ব্রেকফাস্ট সার , আমি রুম সার্ভিসকে বলে রাখছি “ মামা এক শ্বাসে কথাটা বলে গেল ।

ব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে টুটুন প্রশ্ন সুলভ মুখ করতেই দরজায় টিং করে বেলের আওয়াজ ।

দরজা খুলতে যাওয়ার আগে মামা খানিক চুপ করে দাঁড়িয়ে বলল , “ নিশ্চয় তপু বাবু । ‘ বোনডা ‘ ভাস্কর্য উধাও …বুঝলি ।“ না, কিছুই বুঝতে পারে নি টুটুন । সবই যে মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে ।

অনুমান যথার্থ । তপু বাবুর চেহারা একরাতেই যা তা অবস্থা । ভদ্রলোক মনে হয় কাল সন্ধ্যের পোশাক এখনও পরে আছেন । প্যান্টের উপরে জামার কিছুটা অংশ ঝুলে আছে । ঘরে ঢুকেই ধপ করে সোফায় বসে পরে মামাকে বললেন , “ ছ্যার , এক কাপ চা খাওয়াইতে পারেন ?”

মামার মুখোমুখি চেয়ারে তপু বাবু নিঃশব্দে চা খাচ্ছেন আর নিজের মনেই বিড়বিড় করে কিসের হিসেব করে যাচ্ছেন । মামা এবার ওর দিকে তাকিয়ে গলা ঝেড়ে জিজ্ঞাসা করল , “ বলুন হয়েছেটা কী ? বাই দ্য ওয়ে মিঃ গোয়েল কিছু কী ব্যবস্থা করলেন ?”

মৌনতা ভেঙে চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে উত্তর দিলেন তপুবাবু , “ বিশ্বাস করেন মশাই , এমনটা হইব বুঝলে কামই করতাম না এসব নিয়া । অ্যাসিড মারা , মূর্তি চুরি…।“ আবার চুপ করলেন তপুবাবু ।

মামা শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো ,” কোন হুমকি বা অন্য কিছু ?”

“ ছ্যার কপাল ! মন্দিরের একটা রাক্ষসের মূর্তি ধরেও টানাটানি করেছিল কিন্তু ভাইগ্য ভালো নিতে পারি নি ওডা । ভাবলাম ভালো একটা অনুষ্ঠান করবো ! তা তো হলই না বরং কানাঘুষা শুনতাছি আমি নাকী এসবের পান্ডা …” গলায় একরাশ হতাশা ,শেষের দিকে প্রায় কেঁদে ফেলেন আর কী ।

সূর্য মন্দিরের ইতিহাস কম বেশী সকলেরই জানা , সুতরাং সে কথা না হয় পরেই বলব । তবে তপুবাবুকে নিয়ে মামা আর টুটুন যখন কোনার্ক মন্দিরে পৌঁছালো তখন চারিদিকে পুলিশে ছয়লাপ । আজ সাধারণ টুরিস্টদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে মন্দির । মামা যেহেতু এই ঘটনার সাথে খানিকটা জড়িয়ে আছে আর যেহেতু মামার পরিচয় প্রশাসনিক মহলে অনেকেই জানেন তাই টুটুনদের ঘটনা স্থলে হাজির হতে কোন অসুবিধা হল না ।

মিঃ গোয়েল মামাকে দেখেই কাছে এগিয়ে এলেন , করমর্দন করে আঙুল দিয়ে মন্দিরের  একটা জায়গা দেখিয়ে বললেন , “ সি দ্যাট স্পট , রাক্ষস মূর্তিটা হেলে আছে । “ বেশ উঁচু জায়গায় আছে সেটা । মামা একজনের কাজ থেকে দূরবীন নিয়ে ভালো করে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলো , “ জাস্ট অপূর্ব । অসাধারণ ছোট্ট একটা রাক্ষসের মাথাকে আরেক রাক্ষস ধ্বংস করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিল ।“

মিঃ গোয়েল মামার কথায় সমর্থন করে মাথা দুলিয়ে বললেন , “ আমরা কাল রাত থেকে সমস্ত টুরিস্টদের কোনার্ক ছেড়ে না যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছি । কারনটা নিশ্চয় শুনেইছেন ।“

“ কাউকে সন্দেহ করলেন ?”

“ নাহ ! এখনো কিছু করতে পারে নি তবে আমার ধারণা চোর বোনডা মূর্তি নিয়ে বেশিদূর যেতে পারে নি ।“ গোয়েলের গলায় খানিক আত্মবিশ্বাস ।

“ দেখুন , আপনারা পুলিশ , আপনাদের ক্ষমতা আমার থেকে অনেকটাই বেশী । যদি বলেন…”

“ অফকোর্স উই নিড ইউর হেল্প স্যার ।“

“ বেশ  আজ আপনারা আজ সন্ধ্যের চা’টা রিসোর্টে বসেই খান , নিমন্ত্রণ করে গেলাম । তপু বাবু আপনার কলাকুশলী মোট কতজন ছিলেন ?” মামা গোয়েলকে বলেই বাকী প্রশ্নটা তপুবাবুর দিকে ছুঁড়ে দিলো ।

“ আইজ্ঞা ছ্যার , মূল চরিত্র পাঁচ জন আর বাকী থাইকলো তিনটা পার্শ্ব চরিত্র ।“ কর গুনে তপু বাবু হিসেব দিলেন ।

“ আচ্ছা । এক কাজ করুন পার্শ্ব চরিত্রগুলো বাদ দিয়ে বাকীদের নিয়ে চলে আসবেন ।“ মামা হাঁটা লাগিয়েছে এরই মধ্যে । কিছুটা যেতেই আবার থেমে পিছনে ঘুরে একটু উঁচু গলায় বলল , “ আরে স্যরি স্যরি ম্যাডামকেও আনবেন কিন্তু । চাণক্য হসপিটালে , সুতরাং ওনাকে বাদ দিতে পারেন ।“

আট কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে বেশী সময় লাগে না । মামা টুটুনকে নামিয়ে বলল , “ শোন তুই রেস্ট নে , আমি আসছি ঘন্টা খানেকের মধ্যেই ।“ গাড়ী ছেড়ে দিয়েছে টুটুনকে নামিয়ে । টুটুন কিছুটা দৌড়ে যায় । বাধ্য হয়েই গাড়ী থামিয়ে জানলা থেকে মুখ বারিয়ে মামা বলে , “ আসছি রে বাবা , ভুবনেশ্বরে যাবো আর আসবো  ।“

জব্বর খিদে পেয়ে গেছে । রুমে একা । টুক করে এই ফাঁকে রিতমাকে ফোন করে গত রাতে পুরো বিষয়টা জানালো । ঘড়ির কাঁটা তখন আড়াইটা ছুঁয়েছে । ইতিমধ্যে রুম সার্ভিস দুপুরের খাবার নামিয়ে গেছে । মামা নেই অগত্যা টুটুন নিজেই খেতে বসে গেল । বেশ রান্না । হঠাৎ খেতেই খেতেই টুটুন খাওয়ার স্পিড বাড়িয়ে দিল । হাতটা ধুয়ে রিসোর্টের রিসেপশনে গিয়ে দাঁড়ালো । শান্ত পরিবেশ । বাগানে মালী যত্ন নিচ্ছে । বয়স ভালোই । টুটুন সেই দিকেই পা বাড়ায় ।

“ আপনি এই এলাকায় অনেকদিন আছেন তাই না ?” বৃদ্ধ টুটুনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে । খানিক পরে খুরপিটা পাশে রেখে আকারে ইঙ্গিতে বোঝালেন , অনেক বছর , ছোট্ট থেকে ।

যাহ বাব্বা ! এভাবে কী ভাবে চালাবো ! টুটুন মনে মনে ভাবে । লোকটা বাংলা বুঝলেও বলতে পারে না । কিন্তু একে যে খুবই দরকার ।

আবার জিজ্ঞেস করে , “ দাদাই বোনডা কী ?” টুটুনের এই প্রশ্নে বুড়ো কাঁচাপাকা খসখসে দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলেন , “ বন্দ , বন্দ হেলা পুরুনা সংস্ক্রুতি…।“ খানিকটা হেসে আবার পাকা ভ্রূ নাচিয়ে বলেন , “ ৫ নং ধাপরে অছি তা মূর্তি ।“

ওড়িয়া জানেই না টুটুন । তবে যেহেতু বাংলার কাছাকাছি তাই বুঝতে খুব একটা অসুবিধা হল না বোনডা রহস্যটা । কিন্তু বোনডা যদি প্রাচীন আদিবাসী হয়েই থাকে তার সাথে মন্দিরের মূর্তির কী সম্পর্ক ? কী রকম সেই মূর্তি আর পাঁচ নং ধাপ …? টুটুন চুপচাপ মাটির দিকে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বুড়ো এবার নিজেই সামনের কলে হাত ধুয়ে কাঁধের গামছায় হাত মুছতে মুছতে বললেন , “ বাবু ,যেমানে আজিভা , মা হেবা পরে , রুগ হাতরে বাঁচিবা পাঁই নিয়ারে ঠিয়া হুয়ন্তি…।”

বোঝো ঠ্যালা , কথাগুলো যে মাথার উপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে জেট বিমানের মত পেরিয়ে গেল । বুড়ো বুঝলেন টুটুন বিষয়টা হজম করতে পারে নি , তাই কাকে যেন ডাক দিলেন । খানিক পরেই একটা টুটুনের বয়সী ছেলে আসতেই বুড়ো ওটাই রিপিট করলেন । ছেলেটি হেসে পরিষ্কার বাঙলায় বলল , “ উনি বলতে চাইছেন বোনডা সম্প্রদায়ের মেয়েরা মা হওয়ার সময় আগুনের উপর দাঁড়িয়ে রোগ সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করেন । মূর্তিটা ঠিক সেইরকমই ।“

টুটুন দুজনকেই ছোট্ট করে “ থ্যাংকস ” জানিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায় । রিস্টওয়াচে তখন তিনটে । মামার নামগন্ধ নেই । বিছানায় শুয়ে পাঁচ নং ধাপ নিয়ে চিন্তা করতে করতে ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো কোনার্ক মন্দিরের ছবির দিকে চোখ আটকে যায় । খানিকটা উঠে বসে । সামনেই প্যাড আর পেন ।

“ ও গড ! পুরো জ্যামিতিক চিহ্ন , ত্রিভূজ ! সমগ্র মন্দির একটা ত্রিভূজ । যার পাঁচ নং ধাপে ওই মূর্তি , যা নিয়ে গেছে আর একটা চুরি হয়েছে !”

চন্দ্রভাগা বীচে এখন রঙের খেলা । আকাশ পরিষ্কার । অস্তগামী সূর্যের সাতটা রঙ সমুদ্রের জলে গুলে যে প্রতিবিম্ভ তৈরী করেছে সেই তুলির আঁচড় কোন মানব শিল্পীর পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব ।

রুমের দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা সাড়ে ছ’টা ছুঁইছুঁই । ক্লিচ্‌ করে  দরজার নবটা ঘুরিয়ে মামা ঘরে ঢুকতেই টুটুন অভিযোগ নামা নিয়ে হাজির । কিন্তু বলতে পারলো না।এপ্রিলে বেশ গরম এখানে । এ সিটা আছে এই যা রক্ষে । ঘামে জবজবে পাঞ্জাবীটা খুলে সোফার একদিকে টান মেরে ফেলে দিল । টুটুন সেটা তুলে ব্যালকোনিতে রেখে যেতে গিয়ে আড় চোখে দেখলো , মামা ফোন করে চা আর কিছু স্ন্যাক্সের অর্ডার দিচ্ছে । টুটুনের দিকে তাকাতেই ও ঘাড় নাড়িয়ে “না” বলে বেড়িয়ে গেল । এটুকু বুঝলো দুপুরে আজ দানাপানি পরেনি ।

সন্ধ্যে সাতটা । মামা পুরনো মেজাজে ফিরে এসেছে । অ্যাটিটিউড টুটুনের না পসন্দ । মামা জানে সেটা । তাই ভাগনেকে না তেল মারলে চলে । একটাই আদরের আবদারের পাত্র ।

“ খুব খিদে পেয়ে গেছিল রে , বুঝিসই তো “ মামার গলায় আদর ঝরে পড়ছে ।

টুটুন বেশী ভাও না খেয়ে সরাসরি বলল, “ জানো , মনে হচ্ছে ধরে ফেলেছি কে হাতিয়েছে ওই বানডোর মূর্তি । যদিও বানডো স্থানীয় নাম , মূর্তির নাম অন্য কিছু হতে পারে ।“

উত্তেজিত একদমই হল না মামা । কেবল , “ বটে , ধরেই ফেললি একেবারে !” বলে মুচকি হাসলো ।

খানিকটা রেগে টুটুন বলল , “ জেলাসি হচ্ছে বুঝি !ওই তপুবাবুর মধ্যেই গলদ । ভদ্রলোকের ভাবটা এমন…”

“ যাক গে তুই পরিষ্কার জামা পর একটা , ট্রাউজার যেমন আছে থাক । ওদের আসার সময় হয়ে এলো “ টুটুনের কথায় গুরুত্ব না দিয়ে মামা বলে উঠলো ।

সাতটা পঁচিশ । একে একে মিঃ অ্যান্ড মিসেস বটব্যাল , ইতিহাসের চার চরিত্র আর মিঃ গোয়েল হাজির । আরেকটি চরিত্র আপাতত হসপিটালে । বোঝার সুবিধার জন্য ইতিহাসে লেখা নামগুলো এখানে রাখা হল ।

রুম সার্ভিসকে ফোন করে মামা কয়েকটা এক্সট্রা চেয়ার , চায়ের অর্ডার দিল । টুটুন খাটেই পা গুটিয়ে বসল , এখানেই বসাই ভাল । আজ তো আসল নাটকের মজা হবে । খানিক পরে চেয়ার সকলে হাতে হাতে গুছিয়ে বসে পড়লেন ।

মামা আবহাওয়া হাল্কা করার জন্য বললেন , “ যাদের ধূমপান করার অভ্যাস তাড়া স্বচ্ছন্দে করতে পারেন , যদিও তা খারাপ । যাক , আসল কথায় আসি । দেখুন আমি যে গোয়েন্দা নই তা আপনারা হয়তো জানেনই । সাহিত্য ভালোবাসি । আর সেই ভালবাসা থেকে কিছু আলগা যোগসূত্রকে বাঁধার চেষ্টা করি কেবল । আজও তাই করবো । বাকীটা না হয় সামলাবেন মিঃ গোয়েল অফিসিয়ালি ।“

অনেকক্ষণ উসখুস করছিলেন তবুবাবু , উত্তেজনায় হার মেনে বলেই দিলেন , “ ছ্যার আপনাগো কাম কী হয়ে গেসে নাকী অ্যাঁ…?”

মামা টেবিলের পাশে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে , “ এক্সকিউজ মি “ বলে ঘরের বাইরে বেড়িয়ে গেল । মামার এই আচরণে বাকীদের মত টুটুনও অবাক ।

মিনিট চারেক পর আবার ঘরে ঢুকে মামা বলল , “ সরি সরি , অভ্যাস জিনিষটা ভালো আবার খারাপও বলতে পারেন । সিগারেট…।হ্যাঁ ,তপু বাবু আমার অনুমান ভিত্তিক কাজ শেষ । তবে সব বলার আগে আপনাকে কটা প্রশ্ন করবো ।“

সকলের দৃষ্টি এখন তপুবাবুর দিকে । মিসেসে বটব্যাল নিজের হাসব্যান্ডকে যেন গিলে খাবেন এমন চাহনি । মামার দৃষ্টি এড়ালো না বিষয়টা ।

“ আরে ম্যাডাম রিল্যাক্স , জাস্ট কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন আর কী । তা মিঃ বটব্যাল মুদ্রারাক্ষস কনসেপ্ট কার মাথায় আসে আর কবে আসে ?”

“ ওর কথা বাদ দিন , আমিই বলছি গত দুর্গা পুজোর পর পরই । কনসেপ্ট চাণক্যেরই ছিল ।“ মিসেস বটব্যাল উত্তর দিলেন ।

“ বেশ তাহলে আপনাকেই প্রশ্ন করি ওর বদলে । কেন ওই নাটকটাই , আরও তো অনেক ছিল ?”

আমতা আমতা করে মিসেস বটব্যাল বললেন , “ দেখুন আমরা মোটামুটি সকলেই সার্ভিস হোল্ডার । ভাববার ওত সময়ও নেই । চাণক্য অ্যামেচার থিয়েটারে যুক্ত ।ওই বলল , দারুন হবে প্রাচীন এই সংস্কৃত নাটকটা করলে ।“

“ বেশ , তাহলে একটা বিষয় ক্লিয়ার যে চাণক্যের কথা মতই পুরোটা হয়েছে আর আপনারা সহযোগিতা করেছেন সকলে ।“ মামা হাতে চায়ের কাপটা ধরে বলল ।

রুমের ঠিক কোণার দিকে বসেছিলেন ছিপছিপে এক ভদ্রলোক । মোটামুটি সুন্দর দোহারা স্বাস্থ্য । এখানে নাম বিন্দুসার । ভদ্রলোক বাঙালী । কলেজের স্টুডেন্টের মত হাত তুলে ছিলেন । মামা ওনার দিকে তাকাতেই দুজনেই হেসে উঠলেন ।

“ আরে বলুন বলুন ,এটা ঘরোয়া আলোচনা ছাড়া আর কিছুই নয় “ মামা ভদ্রলোকের দুহাত ধরে বিনম্র ভঙ্গীতে বলল ।

“ চাণক্যের সাথে আমিও নাটকের বিষয়টায় ছিলাম । মূলত স্ক্রিপটিং-এ । নাটক আমিও ভালোবাসি কিনা ।“

“ কিন্তু একটা বিষয় মূল মুদ্রারাক্ষস  আপনারা কেউই যে অনুসরণ করেন নি এটা সিউর । কী তাই তো ?” মামা ভ্রূ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন । বিন্দুসার তাতে সায় দিলেন ।

কথোপকথনের মাঝে মিঃ গোয়েল বলে উঠলেন , “ স্যার একটু যদি তাড়াতাড়ি সারতেন ভালো হত …মুখ্যমন্ত্রীর সাথে এ বিষয়েই আজ রাতে মিটিং আছে , উনিও চিন্তিত ।“

মামা নিজের হাতঘড়ি দেখে বললেন , “ স্যার তিরিশটা মিনিট সময় নেব…প্লিজ ।“ গোয়েল হাতের ইশারায় এগিয়ে যেতে বললেন মূল আলোচনায় ।

ব্যাপারটা জমে উঠছে দেখে সকলের অনুমতি নিয়ে আরেক প্রস্থ চায়ের অর্ডার দিল ।

মামা বেশ করে চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা নিঃশব্দে টেবিলটার উপর রেখে টুটুনের দিকে তাকিয়ে বলল , “ তোর সেন্স অফ হিউমার আছে বলতে হয় ভাগ্নে । যাইহোক মদ্যা কথায় আসি । গতকালকের ঘটনা হিসাব মত দুটি , যা আপনারা সকলেই জানেন । কিন্তু মোটিভ আলাদা । কাকতালীয় ভাবে একই দিনে প্রায় একই সময়ে হল  ! সত্যি বিস্ময়কর !”

মিঃ গোয়েল মাঝে থামিয়ে বললেন , “ নাও তো হতে পারে ? উদ্দেশ্য এক কিন্তু প্রসেস দুরকম …”

“ এক্সাটলি মিঃ গোয়েল । দ্বিতীয় ধারনাটার প্রমান না থাকলেও …। মিঃ বটব্যাল গতকাল দুপুরে যখন আপনি রিসিভ করতে আসেন তখন একটা ফোন এসেছিল মনে আছে …ওটা কিন্তু আমাকে নয় আপনাকেই করেছিল । হয়তো আগাম সতর্কতা ।“

তপুবাবু , “ কী কইতাসেন ছ্যার আমাগো…আমারে তো আপনে কন নি !“ অদ্ভুত গলায় বলে ওঠেন ।

“ হুম আমিও প্রথমে বুঝতে পারি নি । বলতে পারেন আজ দুপুরের পর বুঝলাম । হেলেনা হল চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের দ্বিতীয় স্ত্রী , অ্যালেকজান্ডারের কন্যা । যদিও আপনাদের নাটকে তিনি নেই । আরেকজনও কিন্তু নেই , মানে যাকে আপনারা তেমন গুরুত্বই দেন নি বা তার কথা বলেনও নি ।“

মহিষী ( নাটকের নামানুসারে ) বলে উঠলেন , “ অম্বালিকা , মানে নাটকের দুর্ধরা ।”

মামা লাফিয়ে উঠলেন হাতে তালি দিয়ে , “ কারেক্ট । গতকাল আমরা নাটকটার কিছুটা অংশ দেখেছি মাত্র । মঞ্চে যখন ভাষণ দিতে উঠি তখন দেখেছিলাম ওকে গ্রীনরুমে । ওনাকে আনেন নি কেন ?” তপু বাবুর দিকে তাকিয়ে শেষের দিকের মামার প্রশ্নটা বেশ তীব্র হল ।

“ ইয়ে মানে উনি চাণক্যের স্ত্রী , এই সময়ে হস্পিটালে…মানে তাই “ কোন মতে কথাটা শেষ করে সামনেই রাখা গ্লাস থেকে জল খেলেন ।

মামা পুনরায় বিন্দুসারের দিকে তাকিয়ে বলল , “ আপনিই তো অমিত্রোখাতেস , যতদূর ইতিহাস জানি । আর হিসাব বলছে বিন্দুসার মাতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিয়েই থাকতে পারেন …।”

ভদ্রলোক খানিক চুপ থেকে বলে উঠলেন রাগত স্বরে , “ সেটা ইতিহাস আর এটা অভিনয় আর তাছাড়া আমি বিন্দুসারও নই । সুতরাং আপনার যুক্তি ভুলভাল ।“

মামা চশমার ফাঁক দিয়ে খানিকক্ষণ ওর দিকেতাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল , “ আমি কী আপনাকে ব্যাক্তিগত ভাবে কিছু বলেছি নাকি ? আচ্ছা আপনি তো স্ক্রিপ্টও লিখেছেন তাই না , এটা দেখে বলুন তো …” কথাটা শেষ করেই মামা একটা ছেঁড়া কাগজের টুকরো দিল ।

বিন্দুসার হাত বাড়িয়ে একটু জোরে পড়তে লাগলেন , “ হেলেনায়াঃ কপটেন প্রবন্ধেন /

অমিত্রাখাতেসঃ জাতঃ চিন্তামগ্নঃ ।/চুম্বনেন কম্পিষ্যতে শিখী ,/প্রস্তরৌ চ হরিষ্যেতে …।।“

পড়া শেষ করে মামার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন । ঘরের বাকী সদস্যরাও পাথরের মত নিশ্চল । নিস্তব্ধতা ভেঙে মামা বললে , “ আমিই বলি এর অর্থ হেলেনার ছলনায় অমিত্রোখাতেস চিন্তামগ্ন আর শিখী অর্থাৎ এখানে চাণক্যের কথাই বলা হয়েছে । তাকে  চুম্বন খাবে । শেষেরটা মারাত্মক – দুটি পাথর হারাবে ।“

মিঃ গোয়েল মামার দিকে তাকিয়ে বললেন , “ একটু সহজে বলুন , বেশী সময় নেই …প্লিজ ।“

বোঝা যাচ্ছিল ভদ্রলোকের ষোল আনা ইচ্ছা থাকার কিন্তু ঘড়ির কাঁটা থামছে না । মামা চোখটা একটু ছোট করে ওনাকে আরেকটু অপেক্ষা করার অনুরোধ করে আবার শুরু করল ,” ব্যাপারটা আমিও ভেবেছিলাম নাটকের অংশ কিন্তু পুরো নাটক বাংলাতে হওয়া সত্ত্বেও মহিষীর মুখে সংস্কৃত ডায়লগ কেন দিলেন ? দুর্ঘটনার পর আমি দুটি জিনিষ ওখানে খুঁজে পাই , কাঁচের সিরিঞ্জ আর  ডায়লগের ছেঁড়া এই অংশ । তবে কী দ্বিতীয় ঘটনার ইঙ্গিত ছিল ওই ডায়লগের মধ্যেই ?”

মিঃ গোয়েল আর থাকতে না পেরে বিন্দুসারের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁত চিপে জানতে চাইলেন , “ টেল মি দ্য ট্রুথ । আই সে “ শেষের দিকে ওনার আওয়াজ ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে । মামা এতক্ষণ পর চেয়ারে বসে ।

বিন্দুসার , চাণক্য আর দুর্ধরাকে আটক করেছেন ওড়িশা পুলিশ । সেদিন রাতে মিঃ গোয়েল মুখ্যমন্ত্রীর কাছে বিশদে জানান ঘটনা । সুতরাং ওনার অনুমতিতে শেষ অবধি থেকে গেছিলেন । সেদিন আকস্মিক লাইট অফ করে দেওয়ার পরিকল্পনা চাণক্যেরই ছিল । মঞ্চের লাইট অফ হওয়ার  সুযোগে গ্রীনরুম থেকে বেরিয়ে দুর্ধরা কাঁচের সিরিঞ্জে অ্যাসিড মারেন । প্রশ্ন হল চাণক্যকে অ্যাসিড মারার কারণ কী ছিল ?

টুটুন মামার মুখের দিকে তাকায় । মামা বলে , “ ওরে প্রেম বুঝলি হাঁদা প্রেম । তাই তো আর প্রেমই করলাম না । বিন্দুসার কলেজ লাইফ থেকেই দুর্ধরাকে ভালোবাসতো কিন্তু চাণক্য পড়াশোনায় চৌখস । তিন জনেরই ছিল ভারতীয় ইতিহাসে ঝোঁক । পড়ার শেষে দুর্ধরা আর চাণক্য পয়সার জোরে আরও পড়তে বিদেশে পাড়ি দেয় । সময়ের সাথে ভুলতে বসে বিন্দুসারকে ।“

“ তারপর তপুবাবু নাটকের এই ব্যবস্থা করেন । বেঙ্গলী ক্লাবের মেম্বার ছিল প্রত্যেকেই । পুরনো প্রেমিকাকে দেখে নানা ফন্দি এঁটেও কিছুই করে উঠতে পারছিলেন না ।  নাটক সেই প্রতিশোধ নেওয়ার রাস্তা খুলে দেয় , তাই তো মামু ?” টুটুন মামার কথার খেই ধরে বলে বাকীটা ।

পিঠ চাপড়ে মামা বলে , “ লাভ্লি শট , একদম ঠিক । এক ঢিলে তিনটে পাখি মারা আর কী ? বিদেশে পড়ে এসে চাণক্যের মাথায় দুটি নেশা চাপে , নাটক আর ব্যাবসা । আমি ভুবনেশ্বরে খোঁজ নিয়ে সেদিন জেনেছিলাম বিশাল লোকসান আর ধারে ডুবে আছে তার কোম্পানি …”

“ আমি বলি আমি বলি “ বলে টুটুন মামাকে থামিয়ে দেয় ।

“ বেশ বল , মিলিয়ে দেখি ।“

“ কোম্পানির খবর জানতেন বিন্দুসার , তিনিই এর হাত থেকে বাঁচার জন্য লোভ দেখায় মূর্তি চুরি করার । স্বভাবতই ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো ধরেই বাঁচতে চান । প্ল্যানও করেন । সবথেকে বড় কথা নাটকের ডায়লগেই চাণক্যের লোকদের খবর যেত কী করা হবে এখন । সন্দেহ করার কথাই নয় । এদিকে চট করে পরের বউকে নিয়ে পালানো অশোভন তাই অ্যাসিড দিয়ে মুখ পুড়িয়ে ডিভোর্স করানোর রাস্তা সহজ করে ফেলেন বিন্দুসার আর দুর্ধরা । “

“ সাব্বাস , পারফেক্ট । সন্দেহ গিয়ে পরেছিল নির্দোষ মহিষী আর রাক্ষসের উপর কারণ মহিষীর মুখেই ছিল ওই ডায়লগ ।“

কিছুদিন পর বর্ধমানের ঠিকানায় ওড়িশা সরকারের তরফ থেকে আমন্ত্রণ আসে আর এটাও জানানো হয় দুর্ধরার ঘরেই বানডো মূর্তি পাওয়া গেছে । যদিও এই খবরটা কয়েকদিন আগেই সব খবরের কাগজে ফলাও করে বেড়িয়ে গেছিলো ।।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ