03 Jul

সরস্বতীর ‘স্টেনোগ্রাফার’

লিখেছেন:অরিন্দম


ঠাকুরমা বলতেন, ‘মেয়েদের লেখাপড়া শেখা মানেই হাল ফ্যাশানি হয়ে ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে মুরুব্বি মেরে কাপ্তানি করা।’ যৌথ পরিবারে প্রথম শৈশবে এই আপ্তবাক্যই শুনেছেন তিনি। বাড়ির ছেলেদের স্কুলে যাওয়ার পাট থাকলেও ঘরকন্নার বাইরে মেয়েদেরও যে একখানা নিরালা জগৎ থাকা দরকার এমনটা মানতেন না হরেন্দ্রনাথ গুপ্তের মা। হরেন্দ্রনাথ ছিলেন শিল্পী। তখনকার বিখ্যাত সি ল্যাজারাস কোম্পানির ডিজাইনারের চাকরির পাশাপাশি ‘ভারতবর্ষ’,’মানসী ও মর্মবাণী’ পত্রিকায় ছবি আঁকতেন। বাড়ির প্রতিটি আসবাব পালিশ করা থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ে কাঠের ছোটখাটো সূক্ষ্ম জিনিস তৈরিতেও দক্ষ ছিলেন হরেন্দ্রনাথ। অন্যদিকে স্ত্রীর ছিল বই পড়ার নেশা। নেশা না বলে তাঁকে গ্রন্থকীট বলাই শ্রেয়। যৌথ সংসারে হাজার দায়, ফাই-ফরমায়েশের ভিতর বই মুখে বসে থাকা মেজোবউকে হরেন্দ্রনাথের মা ভাল চোখে দেখতেন না বলাই বাহুল্য। স্ত্রী-র বই পড়ার কারণে একান্নবর্তী পরিবার থেকে বেরিয়ে বাসা বদল করেছিলেন হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত।

আশাপূর্ণা দেবী মায়ের থেকেই পেয়েছিলেন বই পড়ার অভ্যাস। বাড়ির উঁচু জানলায় ডানপিটে মেয়েকে বই হাতে দিয়ে বসিয়ে রাখতেন মা। হাতে-পায়ে দস্যু ঠাকুরমার থেকে ‘ছিষ্টিছাড়া’ তকমা পাওয়া মেয়ে বই হাতে পেলেই নিমেষে শান্ত। নাওয়া-খাওয়াও বেভুল তখন।

-‘এখানের আকাশটায় কী নীল আর কত্ত বড়!’ বাসাবদলের পর এক দৌড়ে নতুন বাড়ির ছাদে এসে বোনকে বলেছিলেন বালিকা আশাপূর্ণা। কিন্তু সিঁড়ির দরজায় তালা পড়ে গিয়েছিল ছাদ ন্যাড়া হওয়ার জন্য। অগত্যা জানলায় উঁকি-ঝুঁকি দিয়েই উত্তর কলাকাতার সকাল-দুপুর-বিকেলের জীবনস্রোত অনুভব করতেন মনে মনে। আঁতুড় ঘরে ছোট ভাইকে জন্ম দিয়েছেন আশাপূর্ণার মা। আর বালিকা আশাপূর্ণা সেই আঁতুড় ঘরের বাইরে বসে মাকে বই পড়ে শোনাচ্ছেন, সন্তান জন্মানোর কারণে মা যে ছোট্ট ঘরে বন্দি রয়েছেন কিছুদিনের জন্য। অথচ মায়ের কাছে বই পড়া ভাত-রুটির মতোই অপরিহার্য। এইটুকু মেয়ে ‘বড়দের বই’ পড়ছে জেনে লোকজন আঁতকে উঠত যখন, তাঁর মায়ের একটিই উত্তর ছিল, -‘বই পড়ে কেউ খারাপ হয় না।’
দাদাদের সঙ্গে ক্যারাম, মার্বেল গুলি খেলার পাশাপাশি বড় বড় কবিতা মুখস্থ করাও একরকম খেলায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল আশাপূর্ণার। ‘গান্ধারীর আবেদন’, ‘কর্ণ কুন্তী সংবাদ’, ‘বিদায় অভিশাপ’ ছাড়াও দ্বিজেন্দ্রলাল, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত গড়গড়িয়ে বলতে পারতেন। সব রকমের বই পড়ার জন্য মায়ের কাছ থেকে নিষেধ নয়, প্রশ্রয়ই পেয়েছেন আশাপূর্ণা।

ছোট বোন সম্পূর্ণা ও নিজের নাম সই করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে চিঠি লিখে ফেলেছিলেন আশাপূর্ণা। চিঠির বিষয়বস্তু? কিচ্ছু না, তাতে স্রেফ লেখা ছিল, ‘নিজের হাতে নাম লিখে আমাদের একখানি চিঠি দেবেন।’ আসলে রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়তে পড়তেই এই খেয়াল। অথচ চিঠি পাঠিয়েও স্বস্তি নেই, কবি কী উত্তর দেবেন আদৌ! আবার বাড়িতে ছোট মেয়ের নামে চিঠি এলেও বকাঝকা খাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু আশ্চর্য, রবীন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন দুই বোনের নাম লিখে একটি চিঠি।  আশাপূর্ণা সেই চিঠি নিয়ে ছুটলেন রান্নাঘরে মায়ের কাছে, উনুনের ধোঁয়ার ভিতরেই মা দেখলেন চিঠির সেই হস্তাক্ষর। আর মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোরা পারলি। আমি শুধু স্বপ্নই দেখেছি।’

পড়া পড়া খেলার ভিতর দিয়েই তেরো বছর বয়সে ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় কবিতা পাঠিয়েছিলেন আশাপূর্ণা, কবিতার নাম — ‘বাইরের ডাক’। আবারও এক আশ্চর্য ঘটনা, সেই কবিতা ছাপা তো হলই, উপরন্তু ওই পত্রিকায় আবারও লেখার আমন্ত্রণ এসে গেল সম্পাদকের তরফ থেকে। তবে এবার কবিতা নয়, গল্পের আবদার। এরপর ‘শিশুসাথী’ পত্রিকাতেই প্রকাশিত হল কিশোরী আশাপূর্ণার প্রথম গল্প — ‘পাশাপাশি’।

নিজের ছোটবেলা বা লেখার প্রসঙ্গে আশাপূর্ণা কী বলেছেন, সেই কথা তাঁর জবানিতেই শুনি — “আত্মজীবনী লেখার মতো কোনও ঘটনা নেই আমার জীবনে। এত সাধারণ জীবন থেকে আত্মজীবনী লেখা যায় এটা আমি মনে করি না। আমরা আটটি ভাইবোন ছিলাম। ছিল অত্যন্ত সাধারণ জীবন। দাদারা লেখাপড়া শিখেছেন, আমাদের মেয়েদের বারো বছর বয়স থেকে বাড়ির কট্টর নিয়মে বাইরে বেরনো বন্ধ। মা বললেন, ‘এবারটা পুজো দেখতে যাচ্ছ, দেখে নাও, সামনের বছর থেকে আর যেতে পারবে না। বড় হয়েছ।’ ভেবে দেখেছি — যদি খুব গরিবের মেয়ে হতাম বা খুব বিশিষ্ট কোনও বড়লোকের মেয়ে হতাম তাহলেও বা কিছু লেখার উপাদান পাওয়া যেত। দুঃখ-দুর্দশা-অভাব, অথবা ঐশ্বর্যের ঝলক। সেদিক দিয়ে কিছুই নেই। স্রেফ মধ্যবিত্ত ব্যাপার। মধ্যচিত্ত’ও। বিদ্যের দৌড় তো কেবলমাত্র মাতৃভাষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শুধু আমার বাবা ছবি আঁকতেন আর মার ছিল অত্যাধিক সাহিত্যপ্রীতি। সেই হেতুই হয়তো আমাদের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের মানসিকতার কিছু তফাৎ ছিল। এ নিয়ে আত্মজীবনী লেখা চলে না।”

সালটা কত মনে নেই ১৯৮৭/৮৮ হবে। বয়স তখন বছর ছয়-টয়। সবে অক্ষরজ্ঞান হয়েছে। বাড়িতে আলমারির সঙ্গে পুরনো ট্রাঙ্ক ছিল একটি। মা যখন সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকত তখন সেই ট্রাঙ্কের জিনিসপত্র ঘেঁটে দেখার খেলা ছিল আমার। আশপাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসত রেডিওর ভাঙা গান। সেই টুকরো টুকরো সুর কানে আসত আর নিত্যদিনের অভ্যেসে জানতাম এবার গল্প শোনাতে শোনাতে এক গাল দু’গাল করে ভাত খাওয়াবে মা। এলোমেলো করে দেওয়া ট্রাঙ্কের জিনিসগুলিও আবার হাসিমুখে গুছিয়ে রেখে দেবে। চুমকি বসানো লাল ওড়না, বাটিকের ছোট্ট একখানা চাদর, ভেলভেটের বটুয়া, গোল মতো হাত আয়না আর দুটি বই থাকত ওই ট্রাঙ্কে। বই দুটির মধ্যে একটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মৃণালিনী’ আর অপরটি ‘যোগ-বিয়োগ’, আশাপূর্ণা দেবীর লেখা। দুটিই মায়ের বিয়েতে পাওয়া উপহার। বঙ্কিমচন্দ্রের বইটির প্রচ্ছদ ছিল রানি রঙের। আশাপূর্ণার বইয়ের প্রচ্ছদে ফিরোজা আর নীল রঙে নারী-পুরুষের অবয়ব। ছোটদের রামায়ণ বা মহাভারতের মতো কেন ছবি নেই এই বইগুলির ভিতর আমি খুব জানতে চাইতাম মায়ের কাছে। আর মা উত্তরে বলত, ‘বড় হলে যখন পড়বি, তখন দেখবি এই অক্ষরগুলোই ছবি হয়ে যাবে পড়তে পড়তে’। অবাক হতাম, রং ছাড়া অক্ষর আবার ছবি হয় কেমন করে! কিন্তু কেন জানা নেই ‘যোগ-বিয়োগ’ বইটি দেখতে খুব ভাল লাগত আমার। ছোটবেলায় কিছু না বুঝেই ওই বইটির পাতা উল্টে-পাল্টে  পড়ুয়ার ভাব করতাম। আশাপূর্ণা দেবী বানান ঠিক মতো পড়তেও পারতাম না তখন, মা বানান করে পড়ে দিয়েছিল। আমার জীবনে প্রথম কোনও সাহিত্যিকের নামের সঙ্গে পরিচয় বলতে আশাপূর্ণা দেবীর কথাই মনে পড়ে। আর জানা নেই কেন ‘যোগ-বিয়োগ’ বইটির অনুষঙ্গে আশাপূর্ণা দেবীকেও মনে হত আমার মা। হয়তো বইটি মায়ের বিয়েতে পাওয়া উপহার বলেই!

২০০১ সাল থেকে টানা ন-দশ বছর আমাদের এই মফস্বলের একটি পাঠাগারে বিকেলগুলি কাটত আমার। রোজ বিকেলে ‘নেতাজী পাঠাগার’- এর অজস্র বই আর বেশ কিছু মানুষের সঙ্গ পেয়েছি কৈশোর ফুরিয়ে যাওয়া দিনগুলিতে। ওখানে এমন অনেক ‘পাঠক’-কে দেখেছি যাঁদের প্রকৃত অর্থেই খুব পণ্ডিত বলতে হয়। পাশ্চাত্য সাহিত্যের  বিখ্যাত বিখ্যাত ক্ল্যাসিক তাঁদের নখদর্পণে। এবং তাঁরা বাংলা সাহিত্যের বিপুল ভাণ্ডারেও আকণ্ঠ ডুবে আছেন বলা যায়। আমি নিজের হাতে পাঠকের পছন্দ অনুযায়ী ভাল লেখাটি দিতে চেষ্টা করতাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, যাঁদের কথা বললাম সেই সব তথাকথিত ‘পণ্ডিত পাঠক’রা আশাপূর্ণা দেবীর লেখার কথায় অদ্ভুত ভাবে শিউরে উঠতেন। ওনার লেখা সম্পর্কে তাঁরা বলতেন, ‘বড় মেয়েলি লেখা, কেবল সংসারের প্যানপ্যানানি আর কূটকচালি…গভীরতা নেই।’ কথাটা শুনে আমার মজা লাগত। ছোট ছিলাম বয়সে, সাহিত্য ভালবাসতে শুরু করেছি। তাঁদের সঙ্গে তর্ক করার যোগ্যতাই বা কোথায়! তখন ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ পেরিয়ে একের পর এক আশাপূর্ণার অনেক অনেক ছোট গল্পের সঙ্গে আমার পরিচয় হতে থাকছে বই পড়তে ভালবাসার সুবাদে। কথা দেওয়া বা কথা রাখার মাঝে কত ‘প্রতিশ্রুতি’ যে মিথ্যা হয়ে যায় সেই শেখাটাও তো কম শেখা নয়। কেবল একটি কথা আমি আজও অনেক ‘শিক্ষিত’ এবং অসম্ভব ‘সাহিত্যপ্রেমী’ আর ‘পণ্ডিত’ পাঠকদের কাছ থেকে শুনতে পাই, – ‘…’মেয়েছেলে’-দের লেখা পড়ি না। মেয়েদের লেখা খুব পাতি…’ আমার তাঁদের প্রতি করুণা হয়। ‘পুরুষ’ সাহিত্যিক যখন তাঁর লেখায় সংসার জীবনের কথা লেখেন, কই তখন তো কোনও পাঠক বলেন না, – ‘সংসারের প্যানপ্যানানি আর কূটকচালি’! মানুষের জীবন, যাপন প্রণালী এই নিয়েই তো সাহিত্য। সাহিত্যিকের কোনো লিঙ্গ হয় কী! প্রকাশ আলাদা হতে পারে কিন্তু মূল জায়গা তো তাঁর বিশ্লেষণ, দর্শন, ভাবনা — আমার সামান্য বুদ্ধিতে এটুকুই বুঝি।

আশাপূর্ণা দেবীর ছোট গল্পের কথাই যদি বলি তারও একটি দীর্ঘ তালিকা হয়ে যাবে। যেমন একটি গল্পের কথা মনে পড়ছে, এক দম্পতি ভাড়া থাকার জন্য বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে হয়রান। শেষ পর্যন্ত পছন্দসই বাড়ি পাওয়াও গেল একটি কিন্তু ভাড়া সাধ্যের বাইরে। ভাড়া থাকার পাকা কথা বলতে গিয়ে স্বামী ভদ্রলোকের সঙ্গে বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের স্ত্রীর দেখা। তারা দুজনেই পূর্ব পরিচতই কেবল নয়, এক সময়ের প্রেমিক-প্রেমিকাও বটে। প্রাথমিক উচ্ছাস কেটে যাওয়ার পর পুরনো সম্পর্কের জের টেনেই বাড়ি ভাড়া কিছুটা কম করার কথা বলে পূর্ব প্রেমিক ভদ্রলোকটি। কিন্তু বাড়িওয়ালা ভদ্রলোকের স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে একটি কথায় বুঝিয়ে দিল কেন সে তাকে বিয়ে না করে বাড়িওয়ালা ভদ্রলোককে নির্বাচন করেছিল পাত্র হিসেবে।

বাড়িতে পিসিমার কর্তৃত্ব। ভাইপো বিয়ের পরেই নতুন বউকে দিল্লি নিয়ে ফিরতে চায়। পিসিমার ঘোর আপত্তি। ভাইপোও অনড়। নিজের অধিকারের দাপট কমে যাওয়ার জন্য নতুন বউটির প্রতি ভিতরে ভিতরে পিসিমার ঈর্ষা কী নির্মম ভাবে বলতে পেরেছেন আশাপূর্ণা।

অথবা অল্পবয়সী বিধবা মেয়েকে ধর্মান্ধ অশিক্ষিত মা অন্য পুরুষের সঙ্গে চলে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছে যাতে তার মতো গলগ্রহ, পরাশ্রয়ী হয়ে মেয়েকে না সারাজীবন কাটাতে হয়।

এই সমস্ত গল্পই আশাপূর্ণা দেবী লিখেছিলেন। মেয়েলি লেখা!!! হবেও বা! এই গল্পগুলি ভাবায় না! হতবাক করে না! ভাবতে বাধ্য করে না যিনি এভাবে বিষয়গুলি ভাবছেন, লিখছেন তিনি কতদূর পর্যন্ত দেখতে পেতেন তাঁর আটপৌরে জানলার বাইরে তাকিয়ে! এই প্রসঙ্গেও আবার আশাপূর্ণা দেবীর একটি কথা মনে পড়ছে। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,”…’যা হয়’ তাই আমি লিখি, আর পরে ভাবতে চেষ্টা করি, ‘কেন এমন হয়?’ আমি কখনও এইটা ‘হওয়া উচিত’ একথা মনে করে কিছু লিখিনি। জানি ‘কী হয়’ সেটাই বলবার। ‘উচিত’ বলবার আমি কে?…”

আশাপূর্ণা দেবীর লেখা পড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র, সজনীকান্ত সেন প্রমুখেরা প্রথম দিকে মনে করতেন কোনও পুরুষ বুঝি ছদ্মনামে এই লেখাগুলি লেখেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সভা-অনুষ্ঠানে তাঁদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আশাপূর্ণা দেবী হেসে বলতেন, -‘কেন মশাই, ছেলেদের কলমই কেবল বলিষ্ঠ হতে পারে!’

নেতাজী পাঠাগার-এর কথায় আর একজনের কথা মনে পড়ে গেল। চিত্তরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। আমি ডাকতাম চিত্ত জ্যেঠু বলে। উনি ছোটগল্প পড়তে অসম্ভব ভালবাসতেন। কোনও ছোটগল্প পড়লেই উনি আলোচনা করতেন। এত নিখুঁত ব্যাখ্যা করতেন যে গল্পটি পড়া না থাকলেও মনে হত পরিচিত গল্প।  আশাপূর্ণা দেবীর ছোটগল্পের কথা খুব বলতেন চিত্তজ্যেঠু। ‘টেক্কা’ নামের একটি গল্পের কথা খুব শুনতাম ওঁর কাছে। শুধু শ্লেষ নয়, আশাপূর্ণার লেখার মধ্যে যে রসবোধ তার নিদর্শন হয়ে রয়েছে ‘টেক্কা’ গল্পটি।

তাঁর লেখা ও সাহিত্যজীবন নিয়ে কথা প্রসঙ্গে তিনি নিজেকে বলেছিলেন সরস্বতীর ‘স্টেনোগ্রাফার’।  আশাপূর্ণা দেবীর সেই সাক্ষাৎকারের শেষ অংশটুকু ভাগ করে নিলাম সকলের সঙ্গে —  “সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসাবে যে সব পুরস্কার পেয়েছি সে অনেকসময় আমার আশার অতীত। তবু পাঠকের ভালবাসাই আমার কাছে কল্পনার অতীত হয়েছে। কখনও ভাবিনি পাঠকদের কাছ থেকে এত ভালবাসা পাওয়া যায়। তাদের মনে আমার জন্য এত ভালবাসা সঞ্চিত আছে। যখনই যেখানে যে কোনও সময়ে দেখা হয় বা যোগাযোগ হয় অভিভূত হয়ে যাই তাদের ভালবাসা দেখে। শুনলে হয়তো হাসবে — এক একজন আমাকে দেখে কেঁদেই ফেলেছেন। বলেছেন, ‘আপনাকে যে চোখে দেখব কখনও ভাবিনি।’ শুনে লজ্জাই হয়। হেসে বলি, ‘কেন বাপু? আমি তো কলকাতায় জন্মেছি, কলকাতায় এতকাল আছি। দেখলেই হত।’ তবে একথা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, সব ভালবাসাই ঈশ্বরের কাছ থেকে আসে। জীবনের ক্ষয়ক্ষতি ছাপিয়েও মন ভরে আছে পূর্ণতার স্বাদে। তুমি ‘শেষ কথাটি’ জানতে চাইছ? ‘শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে? প্রথম দিকে লেখার জগৎ মনে বিশেষ জায়গা নেয় বলেই হয়তো বক্তব্য জোরালো হয়। ক্রমশই সেটা যেন অভ্যস্ত কাজের মতো হয়ে দাঁড়ায়। তবু বলার কথা থাকে নিশ্চয়ই। সর্বদাই তো নতুন কথার ঢেউ। মনটা তো থেমে থাকে না। এক এক সময় মনে হয় যেন আমি লিখি না, কেউ আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নেয়। তাই বলি, আমি মা সরস্বতীর ‘স্টেনোগ্রাফার’।”

ঋণ —  আশাপূর্ণা দেবী — সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, চিত্রা দেব // ‘দেশ’ — ০২/০২/১৯৯১ সংখ্যা থেকে।
আর এক আশাপূর্ণা (মিত্র ও ঘোষ)। 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ