27 Aug

প্রাতভ্রমণ

লিখেছেন:সুদর্শন ব্রহ্মচারী


পথে নামলেই নতুন কিছু দেখি । হাঁটতে হাঁটতে কুলিকের দিকে যাচ্ছি । অর্জুন, কদম, জারুল, হিজলের ফাঁকে ফাঁকে হাঁটি । বসতির পরে খেলার মাঠ ; তারপর ফাঁকা মাঠ । রাস্তাটা উত্তর দিকে যেতে যেতে হঠাত পশ্চিম দিকে ঘুরে গেছে । বাঁদিকে বাবলা, শিরিষ অর্জুনের ছায়ায় ছোট্ট দীঘি শুয়ে আছে । ডানদিকের মাঠ আলে আলে ভাগ হয়ে পূবদিকে উঠে গেছে ।

দু দিনের বৃষ্টিতেই ধান রোয়া শুরু হয়েছে । বর্ষার জল সাঁকোর নীচ দিয়ে দক্ষিন পশ্চিমদিকে গড়িয়ে যায় । উদয়পুরের রাই সূর্য ওঠার আগেই এক পন বিচনের আঁটি নিয়ে এসেছে । তার ক্ষেতে তিন কড়া জল । জমির গড়ন দেখেই সে উত্তরপূর্ব কোণে ধান রুইতে শুরু করেছে । তার বাঁ হাতে এক গোছা চারা । ডান হাত দিয়ে সে ডাইনে বাঁয়ে খপখপ করে চটপট চারা বসিয়েই চলেছে । তাতেই তার শরীরটাও প্রতি মূহুর্তে দোল খাচ্ছে । আমার তো দৃশ্যটা দেখেই মন দুলছে । তার কোমরে সবুজ পাড়ের হলুদ শাড়িটা গোল ঢাকনার মতো ঘিরে আছে । সত্যি, তাকে দেখলে যে কারও মনে হবে, একটা নিতম্ব দুটো পায়ে ভর দিয়ে নাচছে । আসলে সে তো সামনে ঝুঁকে ঝুঁকে ধানের চারা পুঁতছে – তার চোখে নিশ্চয়ই পাকা ধানের স্বপ্ন, লেবু সবুজ মাঠ, হৈমন্তী মাঠে ভাতের গন্ধ আর  সোনালী আগুন । বড় আশা করে সে ধান পুঁতছে । গরীবের নজর তো শুধু কর্মফলেই । কী বল ?

পথের উপর একটা লোক, যদিও পরণে নোংরা ছেঁড়া কাপড়, তবুও সে বাঁ হাতটা কোমরের পিছনে রেখে রাজার মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকছে । তার গায়ে বিচ্ছিরি গন্ধ । তাই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম । বাঁ দিকে মোড় নিয়ে পশ্চিম দিকে চলেছি । গানের সুর ভেসে আসছে । আমি গুনগুন করতে করতে নদির দিকে এগিয়ে চলেছি । সুন্দর হাওয়া । হঠাত মনে হল পিছনের দৃশ্যটা আরেকবার দেখি । পিছন ফিরে দেখি চারপাশ থেকে ডজন খানেক সাদা বক উড়ে এসে রাইকে ঘিরে ফেলছে । তার মাথার ওপর লাল সূর্য ফুটছে । আমি সত্যিই মোহিত । রাই কোন দিকে না তাকিয়ে দু পায়ে ভর দিয়ে এদিক ওদিক দোল খাচ্ছে । আর সেই লোকটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে । তাই দেখে আমার কেন যেন অস্বস্তি হল । আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম ।

গান ভেসে আসছে, ‘পাগল মন রে, মন কেন কথা বলে ?’ একটা দৃশ্য মনে পড়ছে, ছোটবেলায় দেখা । ক্ষ্যাপা বাউল মাঠের আলে আলে হাঁটছে আর তার ক্ষেপি পিছন পিছন দৌড়চ্ছে । বাঁশের সাঁকো পেরিয়েই দেখি দুটো লোক গলা সাধছে । একজন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইছে, আর একজন দোতারায় সুর তুলে গলা মিলিয়েছে । আমি গান শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছি । বাঁদিকের ক্ষেতে এক দম্পতি ভিন্ডি তুলছে । পাশের জমিতে কচি ধান গাছ । তার পিছনে ভূট্টার ক্ষেত । দক্ষিণের হাওয়ায় ভূট্টা গাছেরা শুশুদের মতো নাচানাচি করছে । রাস্তার ডানদিকে লংকার চাষ । এক ঝাঁক টিয়া উড়ে এসে ছোঁ মেরে পাকা লংকা তুলে নিয়ে গেল । চারপাশ থেকে সুন্দর গন্ধ ছুটে আসছে । বুক ভরে শ্বাস নিয়ে দু হাত ছড়িয়ে দিলাম । লংকা ক্ষেতের পিছনে লাল রঙের মেয়ে পাখি তাড়াচ্ছে । এত কিছুর সংগে গানওলাদের আওয়াজ মিশে অনবদ্য এক পরিবেশ উপহার দিল, আমি ন যযৌ ন তস্থৌ । ঘাড় আর আর কোমরের ব্যায়াম করতে করতে দু চারবার লাফালাফি করে চাঙ্গা হয়ে উঠছি । ইচ্ছে করছে এখনি জঙ্গলে না গিয়ে গানওলাদের সাথে আলাপ করি । গুটি গুটি পায়ে পিছিয়ে এলাম । রাই কাজ করেই চলেছে । পথের ধারের সেই লোকটা শূন্য ছায়া ফেলে চলেই গেছে । আমি খুশী হলাম । দীর্ঘশ্বাস ফেলে গানওলাদের পাশটিতে বসলাম । সবুজ ঘাস, নরম মাটি । মাটির মানুষদের সাথেই আলাপ করছি, অন্য রকম গর্ব । হারমোনিয়াম বাজাচ্ছে আব্দুল ঘাটার মোহিনী রায় । সে কীর্তনের আসরে কিংবা লোকসঙ্গীতের অনুষ্ঠানে হারমোনিয়াম বাজিয়ে কিছু রোজগার করে । আর উদয়পুরের তলেন দাস তার কাছে গান শিখছে । তলেন আগে লরি চালাত । মাস কয়েক আগে দুর্ঘটনায় তার পা দুটো জখম হয়েছে । তাই ভাবছে বাস স্ট্যান্ডে চায়ের দোকান দেবে । জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই গ্রামে আর ক’জনই বা খদ্দের পাবে ?’

-‘তাই তো দোতারা শিখছি,’ তলেন বলল, ‘দোকানদারির ফাঁকে ফাঁকে বাজাব, সময়টা কেটে যাবে ।’

-‘মনও ভালো থাকবে,’ মোহিনী বলছে ।

তলেন তো বুঝতেই দিচ্ছে না যে, সে আর আগের মতো নেই । বাঁশের ক্রাচই তার ভরসা । মোহিনী বলছে, ‘ও তো ছোট থেকেই বাঁশি বাজায় ; তাল সুর বোঝে । তাই সময় লাগবে না ।’ তলেনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি যে আর আগের মতো ছোটাছুটি করতে পারছ না সে জন্য কষ্ট হয় না ?’ তলেন বড় আশাবাদী । সে বলল, ‘ক’টা গান তুলে নিই, দেখবেন, সামনের বছর প্রোগ্রাম করব ।’ তার সারল্য আমাকে অবাক করছে । আমি শান্তিনিকেতনের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো বাউলদের কথাই ভাবছি । তলেন যদি সেখানে পৌঁছে যায়, তবে তো হিল্লে হয়ে যাবেই । তাকে বললাম, ‘ভেক না ধরলে যে চলবে না ?’

-দাদা, সে আমি ঠিক করে নিয়েছি ।

-কী রকম ?

-‘নাম ঠিক করে ফেলেছে, খঞ্জদাস বাউল,’ মোহিনী বলল । তলেন হাসছে ।

আমার ভাল লাগছে যে তারা স্বপ্ন দেখে । ইচ্ছে করছে তাদের সাথে আরও আরও গল্প করি । নদির দিকে আর যেতে ইচ্ছে করছে না । মনে মনে অর্জুন, জারুল, হিজলদের বিদায় জানিয়ে দিলাম । তারা আব্দুল ঘাটার দিকে চলল । আমি ফিরতে শুরু করলাম ।

লোকজনের যাতায়াত শুরু হয়েছে । চারপাশে কাজ কাজ ভাব । রাইয়ের জমিটা ডাকছে । কাছে গিয়ে দেখি সে তো চুপ করে বসে আছে । থমকে দাঁড়ালাম । শুন্য ক্ষেত, ক্ষেতটা কাঁপতে কাঁপতে মাঠের শেষে ঘন কৃষ্ণ দিগন্তে উঠে গেছে । আমার পায়ের কাছে কচি কচি সাদা ফুল, সবুজ আগাছা আর কচু পাতা । ঘোলা জলে মেঘলা আকাশ । মধ্যিখানে সূর্যটা চাঁদের মতো হাসছে । ধানের চারাদের মাঝে রূপোলী ছটা ছড়িয়ে পড়েছে । সারা মাঠটাকেই আমার অন্তরে টেনে নিয়ে লাল ছাতার নীচে বসিয়ে দিলাম । লেবু সবুজ ধানের চারা ছুঁয়ে ছুঁয়ে রাই ছুটে বেড়াচ্ছে । আমি আনমনে দক্ষিণদিকে হাঁটছি । আমার হৃদয়ে ঝুমঝুম বাজনা বাজছে । আমিও বদলে যাচ্ছি ।

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ