03 Oct

আদিদেব রুদ্রর আবির্ভাব

লিখেছেন:পূষন


[১]

জীবনের কোন ঘটনা যে কার সাথে দেখা করিয়ে দেয়, আর কোন দেখা-হওয়া যে কি বহন করে আনে — আগের থেকে তার কিছুই বলা যায় না। অনেকসময় বিস্তর প্ল্যান করেও গুরুত্বপূর্ণ লোকের সাথে দেখা করা হয় না, অথবা দেখা হলেও লাভের লাভ কিছুই ঘটে না। আবার পক্ষান্তরে, কোন অপরিকল্পিত মুহূর্ত কখনও কখনও এমন কিছু লোকের দেখা পাইয়ে দেয় যারা পরবর্তী সময়ে আমাদের জীবনে গভীর দাগ রেখে যান। আজ তেমনই একজনের সাথে আমার দেখা হওয়ার গল্প বলব যার সাথে দেখা হওয়ার সম্ভাবনার কথা পর্যন্ত আমি কোনদিনই ভাবিনি, কিন্তু আজ দেখাটা ঘটে যাওয়ার জন্য আমি বিন্দুমাত্র অনুযোগী ন’ই।

বছর দুই আগের কথা। সেদিন রাতে বন্ধুর জন্মদিনের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে বাড়ি ফিরছি। খেতে সময় পাইনি, তাই বন্ধুর দেওয়া টিফিনকৌটোয় ভরে নেমন্ততন্নবাড়ির খাবার হাতে নিয়ে চলেছি। কর্ডলাইনের ট্রেন থেকে তুলনামূলক ছোটখাটো জংশন স্টেশনে যখন নামলাম তখন রাত প্রায় দশটা বেজে গিয়েছে। হাতে খাবারের প্যাকেট, তার উপর রাত বেশী হওয়ায় আর শরীরের উপর ধকল যাওয়ায় বেশ ক্লান্ত লাগছে। তাছাড়া কিচুক্ষণ আগে থেকেই ঘাড়ে একটা ব্যথা টের পাচ্ছি। সকালে বা দুপুরের দিকে ব্যথাটা ছিল না; বন্ধুর বাড়ি থেকে বেরোবার পরেই প্রথম অনুভব করেছিলাম। এখন একটু বাড়তির দিকে। মনে হয়, ট্রেনে-বাসে ওঠা-নামার সময় বা অন্য কিছু করার সময়ে হ্যাঁচকা টান লেগে সামান্য মাসল-পুল জাতীয় কিছু হয়ে থাকবে। বাড়ি ফিরে মলম লাগাতে হবে।

ট্রেন থেকেনেমে কয়েক পা সবে গিয়েছি এমন সময়দুর্যোগ। টিটি। ভাগ্যিস এই অবধি রিটার্ন টিকিট ছিল তাই রক্ষা, নইলে ফাইন ভরতে হত। সম্মানহানি তো আলাদা। অদ্ভুত লাগল। এতরাত্রে কোন স্টেশনেই সচরাচর টিটি থাকে না, আর অন্য সময় থাকলেও আজ অবধি আমায় তারা কখনও সন্দেহ করেনি। যাই হোক, টিটিকে টিকিট দেখিয়ে নিয়ে এগোতে এগোতে ভাবলাম, আজ কপাল ঠিক নেই, বাড়ি অবধি টিকিট না করে ফের ট্রেনে চড়া ঠিক হবে না।

টিকিট কাটতে গিয়ে আরেক সমস্যা। ওয়ালেট খুলে দেখি, খুচরো নেই। আমার সম্মুখবর্তী একমাত্র অ্যাকটিভ কাউন্টারে যে বয়স্ক লোকটি বসে রয়েছেন তিনি অত্যন্ত দুর্মুখ, অনেক বাকবিতণ্ডার পরেও তিনি পাঁচ টাকার টিকিটের জন্য আমায় একশ’ টাকার চেঞ্জ দিতে কোনভাবেই রাজি হলেন না। মেজাজ চড়িয়ে বললেন, ‘খুচরো নেই তো আমি কি করব? আমার কাছেও নেই! আমি কার কাছে চাইব?’

শহুরে জীবনের নিরিখে রাত খুব বেশী না হলেও ছুটির দিন হওয়ায় প্ল্যাটফর্মের দোকানগুলোর অধিকাংশ আগেভাগেই ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়েছে। যে কয়টা খোলা রয়েছে তাদের থেকেও এই ‘খুচরো-সঙ্কট’-এর সুরাহা হল না। দিনটা যে আমার জন্য বিশেষ সুবিধার নয়— এটা বুঝতে আমার আর বাকী ছিল না। মনে মনে গজগজ করতে করতে টাকা ভাঙানোর জন্য এবার আমায় প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে রাস্তায় নামতে হল।

রাস্তায় নেমে বুঝলাম, এখানে কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা পুরো ভেজা। ধুলো এবং পাথরকণার সাথে বৃষ্টির অপর্যাপ্ত জল মিশে লঘু পোস্তবাটার মত একটা থকথকে কাদামিশ্র তৈরী হয়ে গোটা রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। লাইটপোস্টের হলদে আলোগুলো সেই প্যাচপ্যাচে মিশ্রণে প্রতিফলিত হয়ে অপরিষ্কার রাস্তার দু’পাশের বন্ধ দোকানগুলোর সামনের জমাট অন্ধকারকে আরও প্রকট করে তুলেছে। পথে লোক বিশেষ নেই। দু’-একটা সাইকেল, রিক্সা মাঝে মাঝে যাতায়াত করছে। তবে ঊর্ধ্বলাঙ্গুল প্রফুল্লিত কুকুরের কোন অভাব নেই। মানুষের পরে পৃথিবীর উপর এদেরই তো অধিকার! এই অবস্থায় আমি অচেনা রাস্তা ধরে এগোতে লাগলাম মোটামুটি পছন্দসই জিনিসের একটা দোকানের খোঁজে। সামান্য কিছু কিনে টাকাটা ভাঙিয়ে নিতে হবে।

যেক’টা খোলা দোকান চোখে পড়ল, সবই হচ্ছে সিগারেট-বিড়ির গুমটি। নেশা আমার নেই, তাই ওখানে বিশেষ লাভ হবে না। এগোতে লাগলাম। মিনিট দুই হেঁটেও কোন ভালো দোকান পাওয়া গেল না। কি জায়গা রে বাবা! খাবার বা কোল্ডড্রিংকসের দোকান পর্যন্ত নেই! এদিকে কয়েকটা কুকুর আমার হাতের প্যাকেটের সুগন্ধে আকৃষ্ট হয়ে সামান্য দূরত্ব বজায় রাখতে রাখতে ধীর গতিতে আমার পিছু নিয়েছে। কয়েকটা আবার মাঝেমধ্যে চাপা ডাক ছেড়ে নিজেদের উপস্থিতিও জানাচ্ছে। ব্যাপারটা নজর এড়ালো না। বুঝলাম, ওই দূরত্বটা সাইলেন্ট হুমকি ছাড়া আর কিছু নয় আর বেশীক্ষণ এভাবে ঘোরা মোটেই ভালো কথা নয়। রাস্তার কুকুর বড় পাঁজি জিনিস। এদের আমি পাতি আলুসেদ্ধ খাওয়া নিয়েও রক্তারক্তি করতে দেখেছি। আর এ তো …

আরও আন্দাজ এক মিনিট যাওয়ার পরে পরপর দুটো লাইটপোস্টের মধ্যবর্তী প্রায়ান্ধকার স্থানে একটা জাঁদরেল বটগাছ চোখে পড়ল। একটা পোড়ো দালানের একখানা দেওয়ালকে আধখানা ধসিয়ে দিয়ে সেই গাছটা নিজের রাজত্ব কায়েম করেছে। গাছের বয়স আন্দাজ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর। প্রচুর ডালপালা। অসংখ্য ঝুরিগুলো নেমে এসেছে কান্ডের মাঝপথ অবধি। প্রকাণ্ড মূলতন্ত্রকে বেষ্ঠন করে একটা বেদী বানানো হয়েছিল কোন এক সময়ে, সেটারও একদিক ভেঙে গেছে। গাছের গোড়ায় বেশ কিছু পুজোর ঘট আর লাল শালুর বাঁধন দেখলে বোঝা যায়, অনেকের মান্যতাভাজন এই গাছ। গাছের নিম্নভাগের বেদীটা যেখান দিয়ে ভাঙা ঠিক তার পর থেকেই একখানা বন্ধ দোকানের পাশে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একখানা কঞ্চি আর ত্রিপলজাতীয় কাপড় দিয়ে তৈরী অস্থায়ীপ্রকৃতির খোপচা চোখে পড়ল আমার। আরেকটু কাছে গিয়ে দেখলাম, দোকানই বটে কিন্তু দোকানের শ্রেণীবিভাজনে বৈদিক বর্ণাশ্রমপ্রথা প্রযোজ্য হলে এটা মেরেকেটে শূদ্রবর্ণের তকমা লাভ করতে পারত। অত্যন্ত ছোট, অপরিষ্কার এই গুমটিটায় বৈদ্যুতিক আলো পর্যন্ত নেই। তার পরিবর্তে বেশ মোটা দু’খানা মোমবাতি জ্বলছে সামনের দিকে।দোকানের ভিতরের জিনিস বলতে কিছু চকচকে সস্তা আংটি, কাচের পুঁতি আর রুদ্রাক্ষের মালা, বেশ কিছু মূলসমেত লতাপাতা, ছোট মাপের আয়না, দেবদেবীর পোস্টকার্ডসাইজ ছবি, ধূপকাঠি — শুধু এইসব। দোকানের মেঝের একপাশে বসে আছে একটা অদ্ভুতদর্শন লোক। অন্ধকারে তার শরীরের অর্ধেকটা ঢাকা পড়ে গেছে। তবে তার ঊর্ধ্বাঙ্গেযে লাল রঙের একটা উত্তরীয় এবং মাথায় যে ক্যাঁচাপাকা বাবরি চুল — এটুকু বুঝতে অসুবিধা হয় না। বটগাছের অন্ধকার আর মোমের অনুজ্জ্বল আলোয় তৈরী আধিভৌতিক পরিবেশে ওইভাবে বসে থাকা মূর্তিটাকে দেখে বেশ গা ছমছম করে উঠল। রসুলপুরের নদীর তীরবর্তী জঙ্গলে কপালকুণ্ডলার সেই কাপালিক হয়ত খানিকটা এইভাবেই ধ্যান করে থাকবে।

আরও একটু এগোতেই দেখতে পেলাম, চোখ বন্ধ করে বসে আছে লোকটা। নজরে এল, লোকটার কপালে লাল সিঁদুর বা ওইজাতীয় কিছুর তিলক রয়েছে। ভাবলাম, ভালোই। ঢং করার আয়োজন আর গেট-আপটা মন্দ নয়। মনে মনে সামান্য হেসে এগোতে যাব এমন সময় পাশ থেকে লোকটা তার বসার ভঙ্গি কিছুমাত্র না বদলে গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘নোটে হবে, নাকি কয়েন-ই চাই?’

ধারেকাছে বাজ পড়ল যেন। চমকে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। আমায় বলছে নাকি লোকটা? কিন্তু আমি তো কিছু বলিনি। কি বলব, বা আদৌ কিছু বলব কিনা ভাবছি এর মধ্যে লোকটা চোখ খুলে আমার দিকে তাকাল। মোমের আলোয় চকচক করে উঠল তার চোখজোড়া। কিন্তু কি যেন বলতে গিয়ে থেমে গেল লোকটা। ঠোঁট সামান্য ফাঁক রেখেই আমার দিকে, না কতকটা যেন আমার ডানকানের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকল সে। কয়েক সেকেন্ড বাদেই খানিকটা ঘোর কাটার মত করে মাথা নেড়ে সে বলল, ‘হুম! বেশ … তা, বলছি যে তোমার পুরো টাকা তো ভাঙিয়ে দিতে পারব না বাবা! কিন্তু পাঁচ টাকা দিচ্ছি, নিয়ে যাও। রাজী?’

আমি তো প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেলাম। এ কি করে জানল যে আমার পাঁচ টাকার দরকার? বেশ ভয় হল। বইতে পড়েছি যে ভূতের নাকি ছায়া পড়ে না। কিন্তু এই লোকের তো বেশ কালো একখানা ছায়া চোখে পড়ছে দোকানের পিছনের ত্রিপলখানায়। পা দুটোও ঠিকঠাক, উলটো নয়। তবে? কে এই লোকটা? আগে কোনদিন তো দেখিনি …

— ‘কি ভাবছ? নেবে টাকাটা?’

কি বলব ভেবে পেলাম না। লোকটা আমার ইতস্ততভাব দেখে সামান্য হাসল। তারপর একটা পাঁচটাকার কয়েন হাতে ধরে আমার দিকে এগিয়ে দিল। আমিও যন্ত্রচালিতভাবে নিজের ডানহাতটা এগিয়ে দিলাম। ঘাড়ের যন্ত্রণাটা ফের টং করে নড়ে উঠল যেন। হাতটা বাড়াতে গিয়েই হয়ত টান লেগে থাকবে। লোকটা আবার আমার কানের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে টাকাটা হস্তান্তর করে দিল। কয়েনখানাআমার হাতে আসার পরেই বললাম, ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। খুব উপকার করলেন। আসলে হয়েছে কি…’

— ‘দাঁড়াও!’

ফের থতমত খেয়ে গেলাম। লোকটার গলার স্বরে ওজন আছে বলতে হবে। বাজখাই বলা যাবে না, আবার সাধারণও বলা যাবে না। বহুদূরে মেঘ ডাকলে যেমন শোনায় অনেকটা যেন সেরকম। এইরকম গলা ‘দাঁড়াও’ বললে দাঁড়াতে হয় বৈকি। লোকটা দোকানের ভেতর থেকে কি একটা চ্যাপ্টা চৌকো জিনিস তুলে এনে অস্পষ্টভাবে কিছু বিড়বিড় করতে করতে সেটাকে একটুকরো কাগজ দিয়ে মুড়তে লাগল। মোড়া শেষ হলে সে জিনিসটা এনে আমার হাতে দিল। তারপর থমথমে কণ্ঠে বলল, ‘এটাও নিয়ে যাও। চিন্তা নেই, দাম দিতে হবে না। খালি তিনরাতের মধ্যে এখানে এসে আমাকে ওটাফেরত দিয়ে গেলেই হবে। যে অবস্থায় থাকবে, সেই অবস্থাতেই ফেরত দেবে। ভেঙেটেঙে গেলেও কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু অবশ্যই দিয়ে যাবে। আর হ্যাঁ,আজ ঘরে ঢোকার আগে একবার এটার মোড়ক খুলে এটাকে ভালো করে দেখে নিও। মনে রেখ, ঘরে ঢোকার আগে; পরে নয়। ভুলে যেও না। ভুল করলে বিপদে পড়বে। ভয়ানক বিপদ।’

আমি তো কিছুই বুঝলাম না। পাগল নাকি? পাঁচটা টাকাও দিল, আবার দোকানের একখানা জিনিসও গায়ে-পড়ে দিয়ে দিচ্ছে … অথচ আমরা পরস্পরকে এর আগে কোনদিন দেখিইনি। আমি যদি আর না আসি? পাঁচ টাকার কোন দাম নেই, নাকি আমি ভিখারি? এত পয়সা থাকলে এই গুমটিতে কেন বসে আ’ছ বাপু সঙ সেজে?

লোকটা যেন মনের কথা জানে। বলে উঠল, ‘ঘরে ঢোকার আগে। এবং তিনরাতের ভিতর ফেরত। মনে থাকে যেন। নচেৎ সর্বনাশ। আর শোনো, ভেবো না যে দান করছি। জিনিসটা ফেরত দিতে আসার সময় টাকাটাও সাথে করে নিয়ে এসো। আমি এখানেই থাকব। ঠিক আছে? … নাও, যাও এবার। আর দেরী ক’র না।যাও।’

আমি কয়েনখানাকে ব্যাকপকেটে চালান করে নিলাম। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে শুধু ‘আচ্ছা’ বলে সজোরে উল্টোদিকে হাঁটা লাগালাম। টাকা যে জুটেছে সেটাই বাপের ভাগ্য। আর দাঁড়ানোর কোনো মানে হয় না। আর তাছাড়া বলতে দ্বিধা নেই, একটু ভয়ই পেয়েছি। পিছন ফেরার সাহস জোটাতে পারলাম না। প্ল্যাটফর্মে গিয়ে তবে থামলাম।দিনটা সত্যিই বেশ খারাপ।

ট্রেনও সামান্য লেট করল। প্রায় রাত সাড়ে এগারোটার কাছাকাছি বাড়ির সামনে পৌঁছালাম। তাজ্জব ব্যাপার। গলির মুখে শুয়ে থাকা আমার পরিচিত কুকুরগুলোও দেখি আমারদিকে রাগী চোখে তাকিয়ে মৃদুস্বরে ভুকভুক করছে। এরা তো দিনরাত আমায় দেখে; নিয়মিত বিস্কুট খায়।রাতকানা? কুকুর রাতকানা … ভেবেই কেমন লাগল।

ওদের অগ্রাহ্য করেবাড়ির দরজার তালা খুলতে যাব এমন সময় একটা হাওয়া দিল। হাওয়ার ভিতর দিয়ে কে যেন বলে উঠল, ‘ঢোকার আগে … আগে …’। আমার মাথার চুলগুলো এক লহমায় কড়া মাঞ্জা দেওয়া সুতোর মত টানটান হয়ে গেল। তাই তো! ভুলেই গিয়েছিলাম। কিন্তু … কি আছে ওতে? আর দেখেই বা হবে কি? পরক্ষণেই মনে হল, লোকটা বলেছিল না দেখলে ভয়ানক বিপদ হবে। সেটাও ভাবতে হয়। তাছাড়া কিছু না জেনেই লোকটা আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছিল। এইরকম লোক কোনমতেই সাধারণ লোক নয়। আর তাছাড়া দেখে যদি কিছু না-ই হয়, তো দেখতে দোষ কি? দেখাই যাক!

বাঁহাত দিয়ে পকেট থেকে বের করলাম জিনিসটাকে। ফের ঘাড়ের ব্যথাটা সজোরে টনটন করে উঠল। হাত নাড়লেই দেখছি বাড়ে ব্যথাটা! যাই হোক, কোনমতে বের করলাম জিনিসটা। তারপর আঙুলের কয়েকটা খোঁচাতেই কাগজের মোড়কটা খুলে গেল।

একটা মামুলি আয়না! বেতের ফ্রেমে আঁটা তিন বাই তিন ইঞ্চির খেলো একটা আয়না। বাবা! এর জন্য এত ঢং! ঘাড়ের যন্ত্রণা বেড়ে গেছে অনেকটা। ঘরে গিয়েই মলম লাগাতে হবে। আর সময় নষ্ট করা যাচ্ছে না। লোকটার বলা কথা রক্ষা করতে আর দেরী না করাই ভালো। অতএব সামান্য মাথা নেড়ে আয়নাটা মুখের সামনে ধরলাম।আর তারপরেই একটা কান্ড ঘটল।

বাড়ির সামনে বিশেষ আলো ছিল না। খুব পরিষ্কারভাবে কিছু দেখা গেল না। খালি মনে হল, মুখের সামনে ধরতেই আয়নার কাচটা একটু একটু রং বদলাতে লাগল। দেখতে দেখতে কাচটাপ্রথমে ঘোলা, তারপর বাদামী, তারপর আরও বাদামী, আরও বাদামি আর সবশেষে কুচকুচে কালো হয়ে গেল। পুরো প্রক্রিয়াটা এত দ্রুত হল যে আমার চোখের পাতা পড়ল না। এরপর আমি খোলা চোখে দেখলাম এবং অনুভব করলাম, কুচকুচে কালো হয়ে যাওয়ার পরেই আয়নার কাচটা যেন কাঁপতে লাগল। বন্ধ দরজার এপারে থাকলে এবং সেই দরজার অন্যপার থেকে কেউ বা কারা তাতে নিঃশব্দ অথচ সজোরে ঠেলা মারতে থাকলে দরজা যেভাবে কাঁপে – এ যেন অনেকটা সেইরকম। আমি হাঁ করে ব্যাপারটা দেখতে লাগলাম। মনে কিহয়-কিহয় ভাব। ঘাড়টা যন্ত্রণায় ছিড়ে পড়ছে যেন! এমন সময় আরেকটা হাওয়া উঠল। তবে এবার উলটো দিক থেকে। এটার জোর অনেক বেশী। চারপাশে তাকাতেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। আকাশ পুরো সাফ, তারা ফুটে আছে। এবং তার চেয়েও বড় কথা, আশেপাশের বাড়িগুলোর গাছপালার একটা পাতাও তো নড়ছে না! চাপা ঝড়টা যেন শুধু আমার চারপাশেই চলছে। এ তো অসম্ভব! সহসা গ্রহণের সময় চাঁদের উপর যেভাবে ছায়া এসে পড়ে, একসময় একটা আবছায়ার টুকরো কোথা থেকে এসে যেন ঠিক সেইভাবে আয়নাটার কালো কাচের উপর পড়ল। আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ অথচ তীক্ষ্ণ একখানা ‘কড়কড় কড়াৎ’ শব্দ করে কাচটার মাঝখান দিয়ে লম্বা একখানা ফাটল দেখা গেল। ফাটল ধরার সাথে সাথে সেই ছায়ার টুকরোটা কাচের উপরেই মিলিয়ে গেল। আর আয়নার কাচখানাও কালো থেকে গাঢ় বাদামী, একটু ফিকে বাদামী, আরও ফিকে বাদামী, ঘোলা হতে হতে ফের সাদা কাচে পরিণত হল। সেটার ভিতরকার কাঁপুনিও থেমে গেল এক নিমেষে। সেই হাওয়াও মুহূর্তের মধ্যে পুরো বন্ধ। কিন্তু চুলের মত সরু সেই ফাটলটা কিন্তু গেল না। তবে আরও কিছুটা সরু হয়ে আয়নার বুকের ঠিক মাঝবরাবর সেটা থেকেই গেল।

আমি ঘামে প্রায় স্নান করে ফেলেছি ইতিমধ্যে। আয়নাটা স্বাভাবিক হলে আমি কোনমতে তালাটা খুলে ঘরে ঢুকলাম। কাঁপা হাতে হরের আলো জ্বালালাম। বাইরের ব্যাপারটা যে কি হল, এখনও কিছুই বোঝা গেল না। যদিও আমার ব্যক্তিগতভাবে কোন বদল তো বুঝতে পারছি না। কিন্তু কাচের ওই রঙ পালটানো, কম্পন, ফাটল ধরা, ছায়ার আবির্ভাব আর অবলুপ্তি — এগুলো তবে কি ছিল?

আমার আসার শব্দে পোষা বেড়ালটা দেখি চেয়ারে ঘুম ভেঙে উঠে বসে প্রথমে একটা প্রকাণ্ড হাই তুলল আর তারপর কান ঝাড়া দিয়ে ডাক দিল, ‘টিউ!’ ও এভাবেই ডাকে। এটা খুবই স্বাভাবিক। আমিও স্বভাবমত উত্তর দিলাম, ‘টিউ টিউ’।দরজা খোলার আওয়াজ আর আমার গলা পেয়েই হয়ত মা’র ঘুম ভেঙেছে। বিরক্ত গলায় মা বলল, ‘এসেছিস?… বাবা, এত রাত করলি? বারবার বললাম, যাচ্ছিস যা, কিন্তু বেশী রাত করবি না। কিছুই শুনতে চাস না আজকাল। ভাদ্র মাসের অমাবস্যার দিন। বেশী রাতে এসব দিনে রাস্তায় থাকতে নেই…’

ঘরের চেনা পরিবেশে ফিরে এসে সামান্য স্বস্তি পেলেও সেই ক্ষণে মা’র কোন কথাই আমার ঠিক কানে ঢুকল না। খালি ‘হু’ আর ‘আচ্ছা’ মিশ্রিত উত্তর দিয়ে খাবারের প্যাকেটটা ফ্রিজে রেখে, হাতে-মুখে-ঘাড়ে জল দিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। যেতে যেতে অবশ্য বললাম, ‘আমি শুতে গেলাম। কিছু খাব না, খেয়ে এসেছি।‘ মা আবার কিছু বলল। কি বলল সে নিজেই জানে।

শোওয়ার ঘরে গিয়ে জমাকাপড় পালটাতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমার প্যান্টের পিছনের পকেটের তলানিতে একখানা পাঁচ টাকার কয়েন পড়ে আছে। এটা কি তবে সেই লোকটার দেওয়া কয়েনটা? রাতের অন্ধকারে ভালো করে দেখিনি, কিন্তু যেটুকু মনে পড়ছে সেই কয়েনটা কতকটা এরকমই দেখতে ছিল। অশোকস্তম্ভের কাছে একটা হলদেটে ছাপ। কিন্তু তাহলে আমি পিছনের পকেট থেকে বের-করে-আনা কোন পয়সা দিয়ে ট্রেনের টিকিট কাটলাম? আমার কাছে তো আর কোন পাঁচ টাকার কয়েন ছিল না। থাকলে আমি টাকা ভাঙানোর জন্য ওভাবে রাস্তায় ঘুরতাম না। এই টাকাটা এল কোথা থেকে? প্রথমবার টিকিট কাটতে গিয়েই আমি সব পকেট, ওয়ালেটের সব ক’টা চেম্বার তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখেছি — দুটো একটাকার কয়েন শুধু ছিল। এখন ফের চেক করে দেখলাম, সে’দুটো এখনও ওয়ালেটের কোণায় পড়ে আছে। তবে? … যাক গে! আমারই ভুল হবে! এটা আগেই হয়ত ছিল, হাতে আসেনি। কপালের দুর্ভোগ আরকি।

বিছানায় শুয়ে নাইট ল্যাম্পের মৃদু এবং অনুজ্জ্বল আলোয় পুরো বিষয়টা ভাবলাম গোড়া থেকে। কিন্তু ওই লোকটা কে, কিভাবে আমার মনের কথা জানল, আয়নার রহস্যই বা কি — কিছুই পরিষ্কার হল না। ব্যাপারটা মোটেও ভালো হল না। তবে একটা পজিটিভ জিনিস হয়েছে এতক্ষণে। ঘাড়ের ব্যথাটা আর তেমন টের পাচ্ছি না। তিনরাত বলেছে লোকটা। মনে মনে ঠিক করলাম, কোন দরকার নেই, কালকে সকালে গিয়েই আমি আয়নাটা দিয়ে আসব ওই লোকটাকে। এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেই জানি না।

[২]

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল বেশ দেরীতে। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, মা ফ্রিজ সাফ করাচ্ছে। আমায় দেখে বলল, ‘বাপ রে! কি এনেছিলি প্যাকেট করে? পুরো পচে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে! প্যাকেট ধরে ফেলে দিয়েছি। সারা ফ্রিজে গন্ধ হয়ে গেছে। রাম রাম! এমন খাবার কেউ দেয়? ছি! তাও কিনা এত পুরনো বন্ধু …’

মাকে ভুলভাল বুঝিয়ে আয়নাটা কাগজে মুড়ে পকেটস্থ করে রওনা দিলাম সেই লোকটার উদ্দেশ্যে। আজ বৃষ্টি না হলেও জমাট মেঘ করে আছে। দুই ঘন্টা বাদে যখন সেই জংশন স্টেশনে পৌছালাম তখন দুপুর দেড়টার মত হবে। হন্তদন্ত করে সেই বটগাছের নীচে গিয়ে দেখি বাঁশের বেড়াটাইপের একটা জিনিস দিয়ে গুমটি বন্ধ করা আছে। কাল রাত্রে যেটা বন্ধ ছিল আজ পাশের সেইঅন্য দোকানটাকে খোলা দেখে সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, বলছি যে পাশের এই গুমটিতে যিনি বসেন তিনি আজ আসেননি?’

কমবয়সী দোকানদার আমায় একবার দেখে নিয়ে বলল, ‘কে? আদিদার কথা বলছেন?’

আমি নাম জানি না। তাই কালকের সেই লোকটার চেহারার মোটামুটি বর্ণনা দিলাম। দোকানদার বলল, ‘হু, উনিই আদিদা।সন্ধ্যার পরে আসেন। তাও রোজ আসেন না। নিজের খেয়াল মত আসেন। আর আজ আসবেন কিনা সেটাও জানি না, মানে বলতে পারব না।’

আমি চিন্তায় পড়লাম। এতটা এসে ফিরে যাব? ইস, আবার আসতে হবে! তাছাড়া মনের অস্বস্তিটাও কমছে না। দেখা পেলে কিছু প্রশ্ন করা যেত। আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে দোকানদার এবার বলল, “কোন জরুরী দরকার থাকলে ওনার বাড়িতেই চলে যান না! হেঁটে দুই মিনিট। রাস্তার উল্টোদিকের ওই যে গলিটা দেখছেন, ওটা ধরে ডান-ডান-বাঁ। তিননম্বর একতলা লালরঙের ঘর। দেখবেন, নাম লেখা আছে ‘আদিধাম’। দিনের এইসময় খুব একটা বেরোন না, এখন মনে হয় বাড়িতেই আছেন।”

রাতের দিকে ফের এখানে আসা সম্ভব হবে না। সুতরাং, দোকানদারের বলে দেওয়া রাস্তা ধরেই এগোতে লাগলাম। সরু গলিপথ বেয়ে ঠিক দুইবার ডান আর একবার বাঁ টার্ন নেওয়ার পরে সত্যি সত্যিই একটা অনুজ্জ্বল লাল রঙের একতলা বাড়ির সামনে উপস্থিত হলাম। বেশ পুরোনো বাড়ি। দেওয়ালের কয়েকটা জায়গার পলেস্তারা খসে গিয়েছে। কালচে ছোপ চোখে পড়ল কিছু অংশে।কোন কোন জায়গায় আবার শ্যাওলা ধরেছে। বহুদিন যে রঙ করা হয়নি সেটা দেখেই বোঝা যায়। তবে শুধু এই বাড়িটাকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই, আশেপাশের বাড়িগুলোরও কম-বেশী এক অবস্থা। পুরো এলাকাটাই কেমন যেন পুরোনো আর শ্রীহীন। নতুন বাড়ি একটাও নজরে এল না।

সামান্য ইতস্তত করে বাড়িটার কাছে এগিয়ে গেলাম। পুরনো কাঠের দরজার পাশের দেওয়ালে ছোট্ট একটা নেমপ্লেট টাঙানো রয়েছে। তাতে প্রথমে বড়-বড় করে লেখা — ‘ আদিধাম’, আর তার নীচে সামান্য ছোট হরফে লেখা আছে — ‘বিপদে পড়িলে আসুন’। পাশে একটা লতানো গাছ দেওয়াল বেয়ে উঠে গেছে। হলুদ রঙের দুটো ফুলও চোখে পড়ল। তবে কি গাছ সেটা বুঝলাম না। যেমন অদ্ভুত বাড়ির নাম তেমনি তার ডেস্ক্রিপশান। বাড়িটা সেকেলে হলেও একটা কলিং বেলের সুইচ চোখে পড়ল। এবার আর না ভেবে টিপে দিলাম সুইচটাকে। সাথে সাথে ওপারে বেল বেজে উঠল। একটা খনখনে আর সরু গলায় কে যেন বলে উঠল, ‘ আসছি, আসছি।’

আমি কি কি বলব সেটা মনে মনে সাজাতে লাগলাম। কয়েক সেকেন্ড পরে দরজা খুলে গেল। দেখলাম, দরজার ওপারে একজন বেঁটেখাটো চেহারার চাকরগোছের লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে। অপরিচিত মুখ দেখে সে প্রথমে সামান্য সংকুচিত হল, কিন্তু সামান্য বাদেই প্রস্তুত হয়ে বলল, ‘ কাকে চাই?’

বললাম,’ আদিবাবু বাড়ি আছেন কি? একটু ডেকে দেবেন?’

লোকটা বলল,’ আছেন। ভিতরে এসে বসুন।আমি বাবুকে ডেকে দিচ্ছি।’

আমি ঢুকলাম। আলো-আঁধারি মেশানো ছোট একটা গলির মত অঞ্চল পার হয়ে বাড়ির মূল অংশে গিয়ে পড়লাম। আমায় বাড়ির সামনের ঘরের একটা চেয়ারে বসতে দিয়ে লোকটা পর্দা সরিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। চেয়ারে বসে আমি ঘর দেখতে লাগলাম। একটা বহু পুরোনো কাঠের আলমারি, বহু যুগের ময়লা জমা একখানা পেন্ডুলাম ওয়ালক্লক, তিনখানা বেতের চেয়ার, একটা ছোট কাঠের টেবিল এবং দেওয়ালে ঝুলন্ত মা কালীর বেশ বড় একটা বাঁধানো ছবি — ঘরের জিনিস বলতে এই। দেওয়ালে সামান্য ঝুলকালি রয়েছে, লোহার শিক-বসানো জানালাটা খোলা থাকলেও এই দুপুরবেলাতে ঘরের ভিতরে আলোও খুব বেশী নয়। মনে হয়, দেওয়াল ময়লা হওয়া এর অন্যতম কারণ। পুরোনো সিলিং ফ্যানখানার গতিও মন্থর। এই বাড়ির মালিকের আর্থিক স্থিতি যে খুব সচ্ছল নয় এটা যেন ঘরের প্রতিটা জিনিসে লেখা রয়েছে। চাকর আছে — এটা কিন্তু বেশ বিস্ময়কর।

“আয়নাখানা এনে’ছ তো?”

সেই গম্ভীর গলার স্বর। চমকে উঠে নিজের ডানপাশে তাকালাম। দেখলাম, যে পথে সেই চাকরটি গিয়েছিল সেই রাস্তা ধরেই আমার অমনোযোগের রন্ধ্র দিয়ে ঘরের মধ্যে কখন যেন হাজির হয়েছে গতরাতের সেই ব্যক্তি। সেই টান চেহারা, সেই কাচাপাকা বাবরি চুল। এখন অবশ্য তার পরনে কালো ঢলঢলে পাঞ্জাবি আর সবুজ লুঙ্গি। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা, কপালে অস্পষ্ট একখানা লাল তিলকের চিহ্ন। লোকটার চোখের নীচে বেশ পুরু কালি দেখতে পেলাম।মনে হয় রাতে বিশেষ ঘুমোন না। এটা অবশ্য আমি কাল দেখিনি, মানে লক্ষ্য করিনি। কিন্তু বলতেই হবে, এ লোকের ব্যক্তিত্বই আলাদা মাপের। আমায় তাকিয়ে থাকতে দেখে একটু হেসে লোকটা বলল, “তুমি যে আসবে এ আমার জানা ছিল। আচ্ছা, এবার তাহলে ওটা দাও।ওটার কাজ তো শেষ।”

আমি ‘হ্যাঁ, দিচ্ছি’ বলে পকেট থেকে সেই কাগজ-মোড়া আয়নাটা বের করে আদিবাবুর হাতে দিলাম। ভদ্রলোক আয়নাটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। আমি সাফাইয়ের সুরে বললাম, ‘আচ্ছা, ওই ফাটলটা কিন্তু আপনা-আপনি হয়েছে। আমি কিন্তু…’

— ‘জানি। এটা ওর কাজেরই অংশ।’

ভদ্রলোকের চোখ এখনও আয়নার উপর। বেশী কথা না বলাই ভালো, কিন্তু একটা প্রশ্ন একে না করলে আমার চলবে না। একটু গলা ঝেড়ে তাই সেটা করেই ফেললাম, ” বলছি স্যার …”

— ” আদিদেব রুদ্র। আদিবাবু বলতে পা’র।”

একটু থেমে আমি বললাম, ” বেশ, আদিবাবু, আপনি কি একটা কাজের কথা বলছিলেন। কি কাজ এই আয়নাটার? আর এটা আপনি আমায় কাল…”

— ” আরে দাঁড়াও, সব বলছি। কিন্তু তার আগে, একটা ম্যাজিক দেখো। ব’স একটু, আসছি।”

আয়না হাতে নিয়ে ফের পাশের ঘরে চলে গেল আদিবাবু। আমি ভাবলাম, কি ম্যাজিক দেখাবে লোকটা? যা-ই দেখাক, শেষমেশ পাগল-ছাগল না হলেই হল।

হাতে একটা ছোট পিতলের বালতি নিয়ে একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন আদিদেব রুদ্র। সামনের টেবিলের উপর বালতিটা রেখে আরেকটা বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে আমার মুখোমুখি বসলেন ভদ্রলোক। আমি ততক্ষণে  একটু ঘাড় উঁচিয়ে দেখে ফেলেছি যে বালতির ভেতর সাধারণ জল রাখা আছে। ঠিকঠাক বসার পর ডানহাতের তালুতে কিছুটা জল বালতি থেকে তুলে নিয়ে লোকটা দুই চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করতে লাগল।কয়েক সেকেন্ড বাদে তার ঠোঁটজোড়া স্তব্ধ হল।চোখ খুলল লোকটা। তারপর হাতের জলটা ঢেলে দিল সেই বালতির ভিতর। তারপর ডানহাতেই আয়নাখানা ধরে আমার দিকে মৃদু হাসিমুখে তাকাল লোকটা। বলল, ” আয়নাটায় তো ফাটলধরেছে, তাই না?”

আমি ঘাড় নেড়ে বোঝালাম যে হ্যাঁ, ধরেছে।লোকটা দাঁত বের করে বলল, “আচ্ছা। এইবার দে’খ তো!” বলামাত্র সে আয়নাটা বালতির জলে চুবিয়ে দিল এবং ফের চোখ বুজে বিড়বিড় করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ড বাদে চোখ খুলে আয়নাটা জল থেকে তুলে নিয়ে নিজের জামায় ঘষে আমার চোখের সামনে তুলে ধরল লোকটা। তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, ” কি,ফাটল আছে, না নেই?”

আয়নাটা দেখে এবার আমি তাজ্জব বনে গেলাম। চকচক করছে আয়নাটা। কোথাও কোনোরকমের কোনো ফাটল দূরস্থান, একটা কোনো ছাপ বা দাগ পর্যন্ত নেই! কিভাবে? আজ সকালেও ওটায় আমি সরু ফাটল দেখেছি। ভুল হওয়ার কোনো চান্স নেই। তবে?

আমার হতচকিত ভাবটা আন্দাজ করে বাচ্চাদের মত খিলখিল করে হেসে উঠল লোকটা। তারপর হাসি একটু কমিয়ে বলল, ” ম্যাজিক!”

এবার একটু বিরক্ত লাগল। আর হেঁয়ালি ভালো লাগছে না। ভাবলাম, আর অপেক্ষার দরকার নেই, কাল রাতের ঘটনাগুলোর সোজাসুজি ব্যাখ্যা চেয়ে ফেলা দরকার। মনে মনে ভাবজগতের জড়তা কাটিয়ে নিয়ে বললাম, ‘আচ্ছা, কাল রাতে যা সব হল সেসবের মানে কি? আপনি কিভাবে জানলেন যে আমার খুচরো টাকার দরকার? টাকাটা দিলেনই বা কেন? তার উপর এই আয়না …’

আমার কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে আদিদেব বলে উঠল, ‘তুমি পিশাচে বিশ্বাস কর?’

আমি একটু থমকে গেলাম। এই প্রশ্নের উত্তর একটু ভেবে দেওয়া দরকার। ভূত-প্রেত কোনোদিন দেখিনি, কিন্তু তারা যে নেই-ই একথা জোর দিয়েও বলতে পারি না। কেননা আমি যা দেখেছি তার বাইরেও জগতে অনেক জিনিস আছে। বললাম সে’কথা। সামান্য মাথা দোলাল লোকটা। তারপর বলল, ‘তুমি ভাগ্যবান, তাই দেখতে পাও না। কিন্তু আমি পাই।’

বলে কি? পিশাচ দেখতে পায়? বিস্ময় অপরিচয়ের যাবতীয় সঙ্কোচ এক পলকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বললাম, ‘আপনি পিশাচ দেখতে পান? মানে সত্যিকারের ভূত?’

— ‘হ্যাঁ, পাই।‘

— ‘বাপ রে! শেষ কবে দেখেছেন? কোথায় দেখেছেন?’

— ‘কাল রাতে। তোমার ঘাড়ের উপরে।‘

আমি আকাশ থেকে পড়লাম যেন। এ কেমন কথা? আমার ঘাড়ে কাল রাত্রে পিশাচ বা ভূত বসেছিল? আমি জানতে পারিনি? সেটা আবার উনি দেখতেও পেয়েছেন? মাতাল নাকি বদ্ধ উন্মাদ?

লোকটা আমার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে বলে চলল, ‘কালকের ঘটনা ব্যাখ্যা করার আগে তোমায় আমার অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয়টা দিয়ে রাখি। আমার নাম তো তোমায় বলেছি, আদিদেব রুদ্র। কিন্তু যেটা বলিনি সেটা হচ্ছে আমার কিছু বিশেষ ক্ষমতা আছে। সেগুলোর একটা হচ্ছে যে আমি ভূত-প্রেত দেখতে পাই, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। তাছাড়া আরও কিছু আছে। এগুলো পুরোপুরি আপনা থেকে পেয়েছি তা বলব না। কিছুটা ভগবান দিয়ে পাঠিয়েছেন, কিছুটা বংশের ধারা বলতে পার আর বেশীরভাগটা পেয়েছি সব গুরুদেবদের কাছ থেকে। ছোটবেলায় একবার ম্যাজিক দেখেছিলাম রথের মেলায়।সেই থেকে ম্যাজিকের নেশা আমায় পেয়ে বসল। প্রবল ইচ্ছে হল ম্যাজিশিয়ান হব। কিন্তু শিখব কার কাছে? সেই সময় ইন্টারনেট ছিল না যে চাইলেই যে কোনো জিনিস শিখে ফেলা যাবে। তারপর অনেক খুঁজে একজনের হদিশ পেলাম তাও প্রায় তিরিশ মাইল দূরের এক গ্রামে। তারপর সেখানে গিয়ে তো আরেক ব্যাপার …’

হঠাৎ কথা থামিয়ে দিল লোকটা। আমি তো হাঁ করে কথা শুনছি। আমার দিকে তাকিয়ে একটু মাথা নাড়িয়ে লোকটা বলল, ‘না, কথা ঘুরে যাচ্ছে। এসব অন্য গল্প। পরে কখনও শোনাব। তবে যা বলছিলাম, সেই ম্যাজিক থেকেই শুরু। তারপর কয়েক বছর বাদে এক তান্ত্রিক সন্ন্যাসীর দেখা পাই। তিনিই আমার প্রথম গুরু।এরপর অনেক ঘাটের জল খেয়েছি। দীর্ঘ তেইশ বছরে অনেক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এইসব করেই কিছু ক্ষমতা পেয়েছি। তাছাড়া শুনেছি আমার বাবার এক জ্যাঠাও নাকি গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী ছিলেন। কিন্তু সত্যিকারের সাধক আমি হতে পারিনি।কিছুকাল পরে মায়ার বশে পড়ে সংসারী হতে হয়। সেই থেকে ওই সামান্য দোকান। এই বাড়িটাও। অবশ্য গ্রামে পৈতৃক জমিও রয়েছে সামান্য। কিন্তু সেসবের মূল্য আজ আর খুব বেশী মনে হয় না। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, দৈবহস্তক্ষেপে সেই মায়ার বন্ধনও টিকল না। কিন্তু দোকানটা থেকে গেল। লোকে বিপদে পড়লে তার প্রতিকার করার চেষ্টা করি। সফল হলে পয়সা।… তা যাক গে সেসব, কাল রাতের কথায় আসি।

কাল রাতে তুমি যখন আমার কাছ দিয়ে যাচ্ছ, তখনই আমি সংকেত পাই যে তোমার খুব খুচরো টাকার দরকার আর তুমি টাকা ভাঙানোর জন্য পথে ঘুরছ। কিভাবে সংকেত পেলাম সেটা জিজ্ঞাসা কর না, প্রথম আলাপেই বলা বারণ। কিন্তু চোখ খুলে তোমার দিকে তাকাতেই আমার মাথা ঘুরে গেল। দেখলাম, তোমার গলার দুইপাশে দুই ঠ্যাং ঝুলিয়ে এক পিশাচ বসে রয়েছে এবং শুধু বসেই নেই, তার কালো রঙের বিশাল জিভ বের করে তোমার হাতে ঝুলে থাকা খাবারের কৌটোটাকে ভালো করে চাটছে। বীভৎস মূর্তি সেই পিশাচের, বর্ণনা করে ভয় দেখাব না। আমি এরকম আগেও দেখেছি, তাই ভিরমি খাই নি। কয়েক পলক সেটার দিকে দেখেই বুঝলাম, আমিষ খাবারের লোভেই এ তোমার ঘাড়ে চেপেছে। এইসব নীচুতলার পিশাচ হচ্ছে নরকের ভৃত্যস্থানীয় জীব। নীচ প্রকৃতির লোকেরা, জীবিতকালে যাদের মনে ষড়রিপুর বিশাল আধিপত্য ছিল, তারা মরার পরে এই ধরনের পিশাচে পরিণত হয়ে নরকে যায় এবং সেখানকার উচ্চকোটির পিশাচদের দাস হয়ে থাকে।কিন্তু বাসনা এদের ভরপুর থাকে। কাল রাতে ছিল ঘোর অমাবস্যা। এইসব তিথিতে নরক আর আমাদের মর্ত্যলোকের ব্যবধান কমে আসে। সেই সুযোগে এইসব পিশাচরা দেহসুখ ভোগ করার জন্য আমাদের জীবিতলোকে অনুপ্রবেশ করে এবং লোভের প্রকৃতি অনুসারে শিকার তল্লাশ করে। এই পিশাচটাও সেভাবেই তোমায় পেয়ে ঘাড়ে চেপে বসেছে। খাবারের দিকে সে এতটাই আকৃষ্ট ছিল যে আমায় সে লক্ষ্যই করে নি। ওর উদ্দ্যেশ্য ছিল যেই তুমি ঘরে ঢোকামাত্রই সে তোমার ঘাড় মটকে দেবে। তারপর তোমার শরীরে বাসা বেঁধে ওই খাবার খেয়ে নিজের লোভ শান্ত করবে। খাওয়ার পরে কিছুকাল ওই শরীরের সাহায্যে অন্যান্য বাসনা মেটাবে আর সব ইচ্ছে মিটলে দেহ ছেড়ে নিজের ডেরায় ফিরে যাবে অথবা অন্য শরীর খুঁজতে বের হবে। আমি ব্যাপার বুঝে তোমার হাতে একটা কয়েন দিয়ে দিই এবং ওই আয়নাটাও দিই। ওই কয়েনটা যতক্ষণ থাকবে ওই পিশাচ তোমার মারাত্মক কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’

আদিদেব দম নেওয়ার জন্য থামল। কিন্তু আমি থামতে দেব না। বললাম, ‘আর আয়নাটা?ওটা দেয়েছিলেন কেন?’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আদিদেব রুদ্র বলল, ‘ওটা সাধারণ আয়না নয়। দেখতে আয়না হলেও গুরুদত্ত মন্ত্রের জোরে ওটাকে আমি ইহলোক আর পরলোকের একটা একমুখী দরজা বানিয়ে দিয়েছিলাম।পরলোক থেকে পলাতক বা গতি হয়নি এমন কোন বিদেহী আত্মা যদি ওটায় নিজের মুখ দেখে ফেলে তাহলে ওই দরজা খুলে যাবে এবং পরপারে দাঁড়িয়ে থাকা আত্মারা ওই আত্মাকে ভিতরে টেনে নিতে বাধ্য। পরের আনন্দ ওরাও সহ্য করতে পারেনা। এককালে মানুষ ছিল কিনা!আর একবার আত্মা ওই দরজা দিয়ে ঢুকে গেলে আর সে তিনরাত্রি আর বেরোতে পারে না। ঘরে ঢোকার সাথে সাথে পিশাচ তোমায় মারতে পারে— এমন আশঙ্কা করেছিলাম। তাই বলেছিলাম যে ঘরে ঢোকার আগে আয়নার দিকে তাকাতে। তুমি আয়নার দিকে তাকালে তোমার ঘাড়ে বসা সেই পিশাচও আয়নায় নিজেকে দেখে ফেলবে। দেখে ফেলার পরেও সে পালাতে পারবে না। কারণ সে খাবারের লোভে বদ্ধ। রিপুবদ্ধ জীব বিপদেও বন্ধন কাটেতে জানে না। তাই গতরাতে পিশাচ আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পেতেই ওই দরজা খোলার সময় আয়নার ফাটলটা ধরেছিল। তবে সবসময় দরজা অবশ্য পুরোপুরি, যাকে বলে খাপে-খাপে বন্ধ হয় না। এই যেমন তোমার আজ সকালে দেখা সরু ফাটলটা। দরজা দিয়ে কেউ যে গেছে সেটার ছাপ থেকে যায়। তিনরাতের ভিতর বিশেষ মন্ত্রপূত গঙ্গাজলে ওই আয়না পুনঃশোধিত করলে আবার আয়না আগের মত হয়ে যায়। পিশাচের ফেরার রাস্তা চিরকালের মত বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যতক্ষণ তা না হচ্ছে, নতুন প্রেত সামনে আসলেও দরজা আর খুলবে না। এই বালতিতে যে জল আছে সেটা কি জল সেটা নিশ্চই আর জানতে চাইবে না।’

লোকটা এবার থামল। আমি এখনও ঘোর কাটাতে পারিনি। মনের ভিতর কিছুক্ষণ হাতড়ে নিয়ে একটা প্রশ্ন করলাম, ‘কিন্তু… আমি যদি তিনরাতের ভিতর ওই আয়নাটা না দিতাম?’

আদিদেব এইবার থমথমে গলায় বলল, ‘তিনরাতের মেয়াদ পার হওয়ার সাথে সাথে ওই আয়নার দরজা আবার সেই করু ফাটলের রাস্তা ধরে খুলে যেত। তারপর দুটো ঘটনার মধ্যে যে কোন একটা ঘটতে পারত। হয় সেই পিশাচ আবার বেরিয়ে এসে তোমায় আক্রমণ করত, অথবা ওই আয়না নিজেই তোমায় জীবন্ত গিলে ফেলে মৃতের দেশে পাঠিয়ে দিত। তবে যেটাই হোক, তোমার ভয়াবহ মৃত্যু নিশ্চিত ছিল।’

আমি গুম হয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। কি সাংঘাতিক ব্যাপার! ভাগ্যিস খুচরো ছিল না! ভাগ্যিস সেই কাউন্টারের বুড়ো টাকা ভাঙিয়ে দিতে রাজী হয় নি! না হলে তো…আচমকা আরেকটা জিনিস মাথায় এল। আরে, কাল রাতের ঘাড়ে ব্যথা হওয়ার কারণ কি তবে এ-ই? বাপ রে! ভাবা যায় না। এরকমও হয়? নাকি লোকটা বানিয়ে গল্প বলছে? কিন্তু তাতে এর লাভ কি? বাড়তি পয়সা-টয়সা কিছু …

আচমকা আদিদেব বলল, ‘তবে যাই হোক, আয়নার কাজ শেষ। তোমারও আর ভয়ের কোন কারণ নেই। এখন তোমার কাছে দুটো অনুরোধ আছে।বলি?‘

অনুরোধ? এই রে! বললাম, ‘বলুন।‘

— ‘প্রথম অনুরোধ হচ্ছে, আমার পাঁচ টাকার ধারটা মিটিয়ে দাও। টাকার খুব অভাব চলছে, বুঝলে! আর সেকেন্ড অনুরোধ হচ্ছে, মাঝে মধ্যে সময় পেলে এস, জমিয়ে গল্প করা যাবে। এই বাড়িতে কাজ ছাড়া খুব-একটা কেউ আসে না। গল্প করার লোক আসলে মন্দ হয় না… সে তো পরের কথা; আপাতত প্রথম অনুরোধটা অন্তত রাখো।’

আমি আর কি বলব। পকেটে হাত দিয়ে কাল রাতে জামা পালটানোর সময়ে আবিষ্কৃত সেই পাঁচটাকার কয়েনটা কাঠের টেবিলটার উপর রাখলাম। সেটা রাখতেই আমার মনে একটা প্রশ্ন চলে এল। করেই ফেললাম।

— ‘কাল আপনি আমায় একটা কয়েন দিয়েছিলেন। আমি নিশ্চিত যে তার আগে আমার কাছে আর কোন পাঁচটাকার কয়েন ছিল না। আপনার দেওয়া টাকা দিয়ে আমি ট্রেনের টিকিট কেটেছিলাম। তাহলে এটা কোথা থেকে এল বলতে পারেন? নাকি আপনি দুটো কয়েন দিয়েছিলেন, আর ভুলটা আমার?’

লোকটা আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসিটা এখন বেশ গা-শিরশিরে মনে হল। হাসি থামলে সে বলল, ‘তোমার ওই পকেটে এখন আর কোন কয়েন আছে?’

— ‘না। এটাই ছিল। বাকী সব ওয়ালেটে।’

— ‘বেশ। মেনে নিলাম। কিন্তু তাও একবার দেখে নাও।’

আমি হাত দিলাম ব্যাকপকেটের ভিতর। কিন্তু হাত দিতেই বুঝলাম সেটা খালি নয়, একটা পয়সা হাতে ঠেকছে। হাতে করে সেটাকে চোখের সামনে আনতেই দেখি সেটা একটা পাঁচটাকার কয়েন। আর সেটার উল্টোদিকের অশোকস্তম্ভের কাছেও একটা হলদেটে ছাপ।

আমি হাঁ করে কয়েনখানার দিকে তাকিইয়ে রইলাম। একটু আগে যে কয়েনখানা টেবিলের উপর রেখেছি এটাও হুবহু সেটার মত দেখতে। কালরাতের কয়েনখানার যমজভাই যেন এরা। হঠাৎ আদিদেবের সকৌতুক গলা শোনা গেল, ‘আরে দেখছ কি? গরীবের পাঁচটা টাকা এবার ফেরত দাও বাবা! নইলে গরীবের চলবে কিভাবে বল তো? বাজারে এখনও কত ধার-বাকী … ’

‘টেবিলে রাখলা…’ বলতে গিয়ে থেমে গেলাম। ততক্ষণে টেবিলের উপর আমার চোখ চলে গেছে। দেখলাম, যেখানে কয়েক সেকেন্ড আগে আমি পয়সাটা রেখেছি, পয়সাটা সেখানে আর নেই! কিভাবে জানি সেটা প্রথমে আমার পকেটে আর আমার ইচ্ছায় তারপর আমার হাতে চলে এসেছে। এটা কিভাবে হল?

আমি নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলাম আদিদেবের দিকে। দেখলাম, লোকটা কোনমতে হাসি সংবরণের প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু পুরোটা চাপতে পারে নি, প্রবল হাস্যধারার একটুখানি যেন ফিনকি দিয়ে তার চোখের রাস্তা ধরে  নিঃশব্দে বেরিয়ে আসছে। এবার আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। পাঁচটাকার কয়েনটা টেবিলে রেখে একরকম দৌড় লাগালাম বাইরের দিকে।দরজা খোলা ছিল ভাগ্যিস। একলাফে চৌকাঠ ডিঙিয়ে রাস্তায় পড়তে পড়তে শুনলাম পিছনে আদিদেব ভয়ংকরভাবে খিলখিল করে অট্টহাস্য করছে আর বলছে, ‘ম্যাজিক! ম্যাজিক!’

স্টেশনে গিয়ে ট্রেন পেতে আজ আর কোন সমস্যা হয়নি। পকেটে এক টাকার পাহাড় জমিয়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। ট্রেনে যেতে যেতে পণ করেছিলাম, এই সাংঘাতিক লোকের ত্রিসীমানায় আর যাব না। কিন্তু আমার সেই প্রতিজ্ঞা পরবর্তী সময়ে আর টেকেনি। ওই যে গল্পের শুরুতেই বললাম, জীবনের কোন ঘটনা যে কার সাথে দেখা করিয়ে দেয়, আর কোন দেখা-হওয়া যে কি বহন করে আনে — আগের থেকে তার কিছুই বলা যায় না …

 

 

 

 

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ