02 Jan

আধুনিক বিদ্যাসাগর

লিখেছেন:শুভ্রজিৎ মৈত্র


বর্তমান পৃথিবীর মানুষ ধর্মকেই একমাত্র আশ্রয় করে সম্প্রদায়গত বিদ্বেষ ও হানাহানিতে মেতে উঠেছে। সারা পৃথিবীর মত এদেশেও ধর্মই যেন একমাত্র সত্য আর বাকি সব মিথ্যা বলে মনে হয়। এখনও মানুষ বান মারা, ওঝাদের ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করে। ডাইনি প্রথার প্রচলন এখনও অনেক গ্রামে দেখতে পাওয়া যায়। বাল্য বিবাহ এখনও বন্ধ করা যায়নি। শিক্ষিত বলে পরিচিত অনেকেই এখনও বিয়ের সময় ভিখারির মত পণ নিয়ে থাকে। এটাই যদি আধুনিক যুগ হয় তবে আজ থেকে দুশো বছর আগের সমাজ কি রকম ছিল সেটা আন্দাজ করা যেতেই পারে। তখনই জন্ম নিয়েছিলেন বাঙালী সমাজের আধুনিকতম পুরুষ বিদ্যাসাগর।

সমাজ পরিবর্তন করার মত মানুষ খুবই অল্প জন্মান। বুদ্ধই হোক বা সে রামমোহন রায় বা বিদ্যাসাগর। যা চলে আসছে সেটাই চলতে দাও, বাধা দিও না, পাল্টাবার দরকার নেই এটাই চিরাচরিত রীতি। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে তার রচিত বই জীবন চরিত-এ যে আটজন গুনি মানুষের কথা লিখেছিলেন তার মধ্যে কোপার্নিকাস একজন। তিনি কোপার্নিকাস সম্বন্ধে বলছেন “বিচারকালে চিরাগত কুতর্ক-পরতন্ত্রতা প্রযুক্ত তাঁহারা স্বয়ং তত্ত্ব নির্ণয় করিতে পারিতেন না এবং অন্যে সুস্পষ্ট রূপে বুঝাইয়া দিলেও, তাহা স্বীকার করিয়া লইতেন না।”  যে আটজনকে তিনি বেছে নিয়েছিলেন তারা প্রত্যেকেই তখনকার সমাজ ব্যবস্থার চলিত ভাবনার বিরুদ্ধে গিয়ে কথা বলেছিলেন। যারা সমাজটাকে পাল্টাবার চেষ্টা করেন যারা নতুন ভাবনা ভাবেন তারাই সমাজ সংস্কারক। বাঙালীদের মধ্যে অন্যতম সেরা সমাজসংস্কারক অবশ্যই বিদ্যাসাগর।

১৮২৩ সালের ১৭ জুলাই গভর্নর জেনারেল কর্তৃক গৃহীত এক প্রস্তাবে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জন্য জনশিক্ষা সংক্রান্ত একটি সাধারণ কমিটি গঠনের কাজ সক্রিয় বিবেচনাধীন ছিল। কমিটিতে এইচ.টি প্রিন্সেপ , মেকলে ও এইচ.এইচ উইলসনের মতো প্রাচ্যবিদ সহ দশজন সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ প্রাচ্যদেশীয় বিদ্যা শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন এবং কলকাতায় সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও ১৮২৩ সালে ১১ই ডিসেম্বর লর্ড অ্যামহাস্ট-কে একটি চিঠি লেখেন রামমোহন রায় সেখানে সংস্কৃত কলেজের শিক্ষানীতি নিয়ে তাঁর প্রবল আপত্তি ছিল। রামমোহন রায় লিখেছিলেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেসব “Useful Science” নিয়ে চর্চা করে সেখানে এই কলেজে পড়ানো হবে যা দু হাজার বছর আগেই জানা হয়ে গেছে। সারা ভারতে সর্বত্র এই ধরনের শিক্ষা খুব সহজেই পাওয়া যায়। আধুনিক ভারতে এই ধরণের শিক্ষা দেবার কোন প্রয়োজন নেই।

ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন সেই যুগে নিজের বিশ্বাসকে সবার সামনে তুলে ধরার জন্য যে সোজা শিরদাঁড়া দরকার তা বিদ্যাসাগরের ছিল। তাঁর মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৮৪৬ সালে ৫ এপ্রিল তিনি সংস্কৃত কলেজের সহ-সম্পাদকের পদে যোগদান করেন। তখন সেই কলেজের সম্পাদক ছিলেন রসময় দত্ত। কাজে যোগ দিয়ে প্রবল উৎসাহ নিয়ে তিনি এক কর্মসূচী রচনা করেন। যাতে প্রথাগত শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা যায়। তিনি পাশ্চাত্য শিক্ষা ও মাতৃভাষার মেলবন্ধন ঘটাতে চেয়েছিলেন।  কিন্তু সম্পাদক রসময় দত্ত এই ভাবনার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। এই কারণে ১৮৪৭ সালের ১৬ জুলাই উনি চাকরি ছেড়ে দেন।

ব্রিটিশ প্রশাসকদের একটি ছোট অংশ বিদ্যাসাগরের এই বৈজ্ঞানিক ভাবনাকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯৫০ সালের ৫ই ডিসেম্বর তিনি পুনরায় এই কলেজে অধ্যক্ষর পদে যোগদান করেন। রসময় দত্ত তার দায়িত্বভার বিদ্যাসাগরর হাতে অর্পণ করেন। সহ সম্পাদকের পদটি অবলুপ্ত হয়। সংস্কৃত কলেজ ছিল ব্রাহ্মণ ও বৈদ্যদের জন্য। তিনি ১৮৫১ সালের জানুয়ারি মাসে কায়স্থদের এবং ১৮৫৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সকল সম্মানিত হিন্দুদের জন্য কলেজের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন।

ব্রিটিশ প্রশাসকদের আবার দুটি অংশ ছিল একটি ধরণ ছিল বিজ্ঞানপন্থী ও অন্যটি সনাতনপন্থী। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাধারা সম্বন্ধে মতামত দেবার জন্য বারানসির সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ প্রাচ্যবিদ ডঃ জে আর ব্যালান্টাইন কে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। তিনি ইংরাজি ও সংস্কৃত একসাথে পড়ানোর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি চেয়েছিলেন কলেজে বেশী করে আধ্যাত্মবাদ পড়ানো হোক। বিদ্যাসাগর এই ভাবনার তীব্র বিরোধিতা করে বলেন বাংলা উত্তরপ্রদেশের মতন নয়। বাংলা তার আদিম অবস্থা পার করে এসেছে। বিদ্যাসাগর মহাশয় আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে বলছেন, ‘‘কতকগুলি কারণে সংস্কৃত কলেজে বেদান্ত-সাংখ্য-অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ আমাদের পড়াতেই হচ্ছে। কিন্তু সাংখ্য-বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন, তা আর বিবাদের বিষয় নয়। …ফলে ইউরোপ থেকে এমন দর্শন পড়ানো উচিত, যে দর্শন পড়লে আমাদের দেশের যুবকরা বুঝবে যে বেদান্ত এবং সাংখ্য ভ্রান্ত দর্শন’’। হিন্দুশাস্ত্রবিদ হয়েও ধর্মকে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে নির্বাসিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি বিদ্যাসাগর মহাশয়।

“সবই ব্যাদে আছে ” এই কথাটি সুবিখ্যাত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা অত্যন্ত ক্ষোভ ও কটাক্ষে ব্যবহার করেছিলেন ১৯৩৮ সালে। বুঝতে হবে বিদ্যাসাগর মহাশয় মারা যাবার প্রায় ৫০ বছর পর বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা বলছেন তার মানে বিদ্যাসাগরের ভাবনা পরাজিত। বিভিন্ন ধরণের জ্ঞান আরোহণের পর বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাভাবনা মানুষের উপলব্ধিকে দৃঢ় করে। কিন্তু আজও বিদ্যাসাগরের জন্মের দুশো বছরে এসে আমরা শিক্ষককুল কতটা তাঁর ভাবনার অনুসারী? অজান্তে আমাদের কোনরূপ আচরণ বা সজ্জা তাঁর ভাবনাকে অপমান করছে নাতো? এই প্রসঙ্গে আরও একজনের কথা বলতে হয় যাঁরও এবছরে জন্মের দুশো বছর তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত। অক্ষয়কুমার দত্ত অঙ্কের সমীকরণ দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন পরিশ্রম=শস্য। পরিশ্রম+প্রার্থনা=শস্য। অতএব, প্রার্থনা=শূন্য। প্রার্থনার কোনও উপযোগিতা নেই।

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ