02 Jan

প্লট ভাঙো, গল্প লেখো

লিখেছেন:রবিশংকর বল


গল্প লিখতে লিখতে, গল্পের কথা ভাবতে ভাবতে বোর হয়ে যাই। তখন রেকর্ড-প্লেয়ারে শচীন দেববর্মন কি ভীমসেন যোশী চালিয়ে দিই। গান আমাকে বাঁচায়। সঙ্গে যদি দু’এক পাত্তর থাকে, তাহলে আরও জমে। নেশা আমাকে বাঁচায়। প্রায়শই আমি টের পাই, গল্প লেখা কি বোরিং!

গল্প-ছোট গল্প কাকে বলে, সেসব কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক পড়েছি, থুড়ি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়িনি। তবে পড়ানো হয় শুনেছি। সেও বড় বিরক্তিকর। অথচ এই বাংলায় অধ্যাপক, বাংলা বা ইংরেজি বিভাগের প্রধানরাই তো সমালোচক। তাঁরাই ঠিক করেন, কে সত্যিকার গল্পকার, আর কে নয়। তাদের প্যারামিটার আমি জানি। ওই মোপাসঁ। জীবনের একটি খণ্ডাংশ এবং শেষে যেন একটা ঝাঁকুনি। যাকে বলে হঠাৎ আলোর ঝলকানি। নইলে আর গল্প কি! সেইসঙ্গে সমাজচেতনা, শিল্পীর দায়বদ্ধতা ইত্যাদি মশলা তো আছেই।

এমনকি বিপ্লবী ছোট পত্রিকার সম্পাদকরাও আমাকে বলেন, এবার একটা নিটোল গল্প দাও। কাকে বলে নিটোল গল্প। আমি সত্যিই বুঝি না। আমার জীবনের কোথাও তো কোন নিটোল গল্প নেই। সব ভাঙাচোরা। এক কাহিনীর মধ্যে অন্য কাহিনী, এক চরিত্রের কথার মধ্যে অন্য চরিত্রের কথা ঢুকে পড়ে। যে-ঘটনার সঙ্গে আমার রক্তমাংসের সম্পর্ক নেই, তা নিয়েতো লিখতে পারিনা আমি। তাই কিছুতেই শিল্প করা হয় না আমার। অর্থাৎ ওই নিটোল গল্প লিখতে পারি না।

কথা হল, ‘শিল্প’-এর ধারণাটি তো একটি বিশেষ সময়ের। ‘শিল্প’ তাই, যা দৈনন্দিন জীবনের নয়, সবার জন্য নয়, বিশেষ কয়েকজনের এবং তার কিছু নিয়ম নীতি আছে। ওইসব ফর্ম, কন্টেন্ট ইত্যাদি। এটি বিশেষভাবেই একটি পশ্চিম ইউরোপীয় ধারণা যার পিছনে গ্রীক আপোলোনীয়ান উপাদান রয়ে গেছে। সব কিছু সুন্দর, নিখুঁত, বাড়়তি কিছু নেই, এমনকি আবেগও নিয়ন্ত্রিত। ডায়োনেসিয়াস এখানে বাতিল। অর্থাৎ যে ভাঙতে চায়, ধ্বংস করতে চায়। অথচ সৃষ্টির ভিতরে ফর্ম নেই।ষ আছে সিমেট্রি, ওই টেনশনের সিমেট্রি।

আজকের লেখালিখি কি এজন্যই শিল্প হয়ে ওঠার চেয়ে দূরে সরে যেতে চায় সচেতনভাবে? যুক্তি ও প্রযুক্তির ভিতরকার চোরাবালি সে জেনে গেছে। সে চায় এমন বিজ্ঞান, যার সারা শরীর জুড়ে ও জীবন কথা পৃথিবীমাতার সংগীত বেজে ওঠে। গল্প, তুমি এই সংগীতের অংশমাত্র। এর বেশি নও, কমও নয়।

এসবও কোন নতুন কথা নয়। নতুন কথা বলে সাহেবরা, যারা সবসময় আমাদের চমকে দিতে চায়। আমরা জানি, একটি কথাকে ঘিরে সাতকাহন বাড়ে শুধু। এর বেশি কিছু নয়। একটি আদিকাহিনী। সাপটি তার লেজ থেকে নিজেকেই খাচ্ছে আর এই খাওয়া কখনও শেষ হয় না। সব গল্প এই আদিকাহিনীকে ঘিরে নানারকম বুনন আর কী।

ছোটবেলায় দিদিমার কাছে শুয়ে অনেক গল্প শুনতাম। আমার বেশ মনে আছে, একটি গল্প – হয়তো তা লেবুসুন্দরীর – এক একদিন এক একরকম ভাবে বদলে যেত, আমি না ঘুমনো পর্যন্ত একই গল্পে নানা ঘটনা জুড়ে দিত দিদিমা। অর্থাৎ লেবুসুন্দরীরই নানারকম গল্প। আসলে পুরোটাই একটা একটা নদীর পাড় ধরে হেঁটে যাওয়া। আপনি যেখানে থামলেন, গল্প সেখানেই শেষ; আবার চলতে শুরু করলে গল্প শুরু হয়। সভ্যতার তিন যমজের নাম – গল্প, নদী ও সংগীত।

উনি শতকের পশ্চিম ইউরোপ গল্পের একটা ছক আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। গল্প হবে জীবনের খণ্ডাংশ, শেষে থাকবে একটা চমক। আসলে ড্রয়িংরুমে আটকে যাওয়া মধ্যবিত্তের জীবনে তো কোন অ্যাডভেঞ্চার নেই। তাই গল্প বানাও, চমক তৈরি করো। এই ছকটা আমরা আজও গাধার মত বয়ে বেড়াচ্ছি। ছকের বাইরে গেলেই সোরগোল উঠছে, ওটা গল্প হল না, ভাই। এভাবে গল্প লেখে না। অথচ রবীন্দ্রনাথের বহু গল্প এই ছকে পড়ে না, আর বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দ তো পুরো ছকটাকেই অস্বীকার করেন।

চমক-প্রধান গল্পের এই ছকটাকে জিইয়ে রাখে আমাদের এখানকার খবর কাগজ-পত্রিকা-কেন্দ্রিক সাহিত্যের বাজার। খবরের কাগজের রবিবারের পাতা এবং সাপ্তাহিক / পাক্ষিকে প্রকাশিত গল্প হয়ে ওঠে আমাদের গল্পের মডেল। আর সাহিত্যের বাজারে নিজের নাম ধরে রাখার জন্য যেহেতু রবিবার / সাপ্তাহিক / পাক্ষিকে বছরে অন্তত ছ’টা গল্প লিখতেই হয় এবং পুজোর সাহিত্যে অন্তত গোটা দশেক, অতএব চেনা মডেল অনুসরণে লিখে যাওয়া ছাড়া গল্প লেখকের ভাবনার অবকাশই বা কোথায়? তারওপর সম্প্রতি টেলিফিল্ম বা সিরিয়ালের হাতছানি। ফলে গল্পের কথা ভেবে লাভ নেই, ভাবতে হবে আমার নাম নিয়ে। এর বাইরে গিয়ে যারা গল্প লিখতে চান, তাঁরা স্বভাবতই ব্রাত্য।

এই লেখা সেইসব ব্রাত্যদের নিয়ে। সারা পৃথিবীময় সেইসব ব্রাত্যরা, যাঁরা খবরের কাগজ-পত্রিকার খপ্পরে পড়েননি, দূরদর্শনের মোহিনীমায়ায় নাচনকোঁদন শুরু করেননি। আমার তো প্রথমেই মনে পড়ছে গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের কথা. ইনি ব্রাত্য নন, বাণিজ্যিকভাবে সফল লেখক বলতে যা বোঝায়, তাই-ই। অথচ মার্কেস তাঁর ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিটিউড’ উপন্যাসটি সিনেমা করতে দিলেন না। প্রত্যাখ্যান করলেন হলিউডের বিশাল টাকার অঙ্ক। কারণ মার্কেস জানেন, তাঁর উপন্যাসটি সাহিত্য হিসেবে যা, সিনেমা কখনোই তাকে ছুঁতে পারবে না। কোন বা.লে বিলোচন (বা.লে অর্থে বাঙালি লেখক, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সংক্ষেপণ) এই গাটস্ দেখাতে পারবেন কি? বরঞ্চ একজন বা.লে বিলোচন এমনভাবেই লিখবেন যাতে সিনেমা করা যায়, টেলিফিল্ম হয়।

সারা পৃথিবীর গল্প লেখার ধারার দিকে তাকালে ‘জীবনের খণ্ডাংশ ও চমক’ – প্রধান গল্পের ছকটি যে কত হাস্যকর, তা সহজেই বোঝা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, কবিতা, ছোটগল্প, বড় গল্প, উপন্যাস – এইসব জঁরের কোন নির্দিষ্ট সীমাই এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হয়ে উঠতে চাইছে একটি লেখা, যাকে রোলঁ বার্ত বলেন ‘টেকস্‌ট’ (Text)। সাধারণভাবে আমরা সাহিত্য বলতে যা বুঝি, ‘টেকস্‌ট’ সেই সীমায় আটকে থাকতে চাইছে না।জটিল এই পৃথিবীলোককে লেখার ভিতরে সে ধারণ করতে চায় যাবতীয় জটিলতা সমেত। ফলে ছক অনুযায়ী সেটা গল্প হল কি হল না, তা নিয়ে ব্রাত্যরা একেবারেই চিন্তিত নন। এঁরা সবাই মিলে রচনা করেছেন একটি দীর্ঘ কাহিনী।

এই শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিশাল এক ব্রাত্য ভূখণ্ড আমাদের সামনে জেগে উঠতে থাকে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন-আমেরিকা। এইসব মহাদেশের লেখাজোখা যখন আমাদের হাতে এসে পৌঁছতে লাগল, তখন বোঝা গেল, কয়েক বছরের নিঃসঙ্গতার আড়ালে কি কাণ্ডটাই না ঘটে গেছে! আমরা বুঝলাম, লন্ডন-প্যারিসের দিন শেষ। ভরকেন্দ্র সরছে। আর আমাদের ইউরোপীয় সাহিত্য পড়া মানে তো ইংরেজি আর ফরাসী; সেখানে ইতালী, জার্মানী, পূর্ব ইউরোপ নেই। অর্থাৎ আমাদের ইউরোপ মানে পশ্চিম ইউরোপ, তো পশ্চিম ইউরোপের সাহিত্যের ছকটাই যে একমেদ্বিতীয়ম নয়, সে-কথাটা ছয়ের দশক থেকে আমরা একটু একটু করে বুঝতে পারলাম। কথা হল যত মত, তত পথ। কোন একটাই মডেল নেই। লেখা এমন এক বৃত্ত, যার কেন্দ্র রয়েছে সব জায়গায়, কিন্তু পরিধি কোথাও নেই।

সেই যখন থেকে মুখে মুখে গল্প বলা শুরু, লেখা তো এ-সেই দিনের ব্যাপার, তখন থেকেই গল্পের কোন পরিধি ছিল না। কথককে যদি কেন্দ্র ধরা যায় তাহলে মানুষ অনুযায়ী সেই কেন্দ্র বদলে গেছে মাত্র। একই গল্প কতরকমভাবে বদলে গেছে। এ-দেশ, ও-দেশ, এর মুখ, ওর মুখ থেকে বদলে বদলে। একজন কথক হয়তো কারুর মুখ থেকে শুনেছিল গল্পটি, কিন্তু বলার সময় সেও কাড়িনীর অভিজ্ঞতার ভিতরে ঢুকে গেছে, নিজের চেতনার রঙে গল্পের রঙ কিছুটা বদলে দিয়েছে, মন্তব্য করেছে, যেন গল্পটা তারই। গল্প আসলে এক অন্তরঙ্গতা। অর্থাৎ আমি যা বলছি, সেটা আমার, আমি ছাড়া কেউ তা বলতে পারত না। আমার বলার কথার কোন পরিধি নেই। দিদিমার লেবুসুন্দরীর গল্প তাই নানাভাবে বেড়ে চলে, কেননা লেবুসুন্দরীর কথা যে তারই কথা। কাহিনী যখন কথক থেকে বিচ্যুত, যখন তার কোনকিছু প্রমাণের দায় থাকে – কোন মতাদর্শ, সমাজচেতনা যাই হোক না কেন – তখনই তা একটি মডেলে আটকে যায়। রবিবারের পাতায়, পত্রপত্রিকায় গল্পের নামে আমরা প্রায়শই এই মডেলই দেখতে পাই। অথচ গল্পতো আসলে জীবনেই সমান্তরাল এক অনিঃশেষ ধারা। জীবনের প্রতিফলন নয়। প্রতিফলনের তত্ত্বটা ওই পশ্চিম ইউরোপেরই ছক যার পিছনে রয়েছে অতি পরিচিত প্লেটোর গুহার মোটিফ। আসুন, আমরা প্লেটো কে হত্যা করে সক্রেটিসের কণ্ঠস্বর পুনরুদ্ধার করি, যার কাছে অজ্ঞানতাই চরম জ্ঞান। গল্প, নদী এবং সংগীত, জীবন সম্পর্কে সেই অজ্ঞানতাই বাঁচিয়ে রাখে যা না থাকলে জীবনও ছকে পরিণত হয়।

সমাজ ও সভ্যতার গতিপথ জীবনকে যত ছকে বাঁধতে চাইছে, গল্প ততই এক ঠকহীন জীবন প্রবাহকে ছুঁতে চায়। ছকহীনতা মানে গল্পহীনতা নয়, একটা গল্পকে আরও অনেক গল্পের ভিতরে ছড়িয়ে দেওয়া, অনেক অসংলগ্ন গল্পকে কাছাকাঠি নিয়ে আসা, যাকে বলা যেতে পারে ‘হেটেরোটোপিয়াস’ – অনেক, সন্নিবেশ, ছড়িয়ে যাওয়া, মহাকালের হা-গহ্বরের মত যা সব টেনে নিচ্ছে। আমরা, ব্রাত্যরা বলছি, প্লট ভাঙো, গল্প লেখো।

প্লট বন্দিত্ব আর গল্প মুক্তি।

বাংলা গল্প আবার কবে সেই মুক্তির স্বাদ পাবে?

আসলে গল্পের চেনা ছকটা, যার জন্ম মাত্রই উনিশ শতকে, তা এখন অনেক অনেক গল্পের আক্রমণে বিধ্বস্ত। নানা দেশের, নানা সময়ের নানারকম গল্প, যাকে আর কোন মডেলে আটকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। আর আমরা তো আজ ব্যাখ্যাও চাইও না। জগৎ ও জীবনের ভাষাকে আমরা অন্য একটি লিপিতে অনুবাদ করি মাত্র। পৃথিবীর আদি গল্পকাররা এই তিলমাত্র সত্যকে জানতেন। নাহলে আমাদের চারিপাশে গল্পের এত নদ-নদী প্রবাহিত হত না।

প্রিয় পাঠিকা/পাঠক, প্লটের কুয়ো ছেড়ে আমরা আবার গল্পের নদ-নদীতে অবগাহন করতে চাই।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ