09 Feb

ব্রণ সুন্দরী

লিখেছেন:দেবাশিস মজুমদার


বুঢঢা গালে টক দই মাখছে। রোজই মাখে। কারণ ওর দিদিও মাখে। ওর দিদি মানে টুকি; পাড়ার ‘আমরা সবাই’ সঙ্ঘের ছেলেরা যাকে পিছনে বলে ‘ব্রণ সুন্দরী’। গালে ব্রণ, নাকের ডগায় তিল। খুব সমস্যা ওর । শেহনাজ হোসেন থেকে কেয়া শেঠ, ফেয়ারনেস ক্রিম থেকে ফেসপ্যাক ওর গালে সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলে গেল। কত বিউটিশিয়ান ক্রিম, ল্যাভেন্ডার ওয়াটার, চন্দন,তুলসী,শশা, মধু গালে চুমু খেল। ওরে গাল যে কে সেই। গাল আর চেহারার ভারসাম্য তৈরি করতে গিয়ে হিমশিম খেলেন সুছন্দা। প্রচণ্ড হেলথ কনসাস। নিজেকে সুন্দরী রাখার চেষ্টায় পঞ্চাশেও লড়ে যাচ্ছেন। ডায়েটিংয়ে অভ্যস্ত হয়ে জিমে দৌড়োদৌড়ি করে আর মুখে ফেস প্যাক ঠেসে এখনও প্রায় ‘কে তুমি নন্দিনী’ পর্যায়ে। কিন্তু মেয়েকে এখনও ‘ঝাক্কাস’ করে তুলতে পারেননি। বর নামের বর্বর বস্তুটির প্রতি তার প্রায় ঘেন্না ধরে গিয়েছে। এই নৃপেনবাবু নামক ভদ্রলোকের মূল লক্ষ্য দুটি – জিভ আর বালিশ। ফলে মধ্যপ্রদেশ সাম্রাজ্য বিস্তার করে চলেছে তার শরীরের উপর। কারণ শরীরটা ছাড়া আর কিছুই প্রায় নিজের বলে নেই সরকারি অফিসারটির। মাইনে থেকে শুরু করে বাড়ি মায় ছেলেমেয়ে পর্যন্ত সবই এখন প্রায় বেসরকারি দখলে – থুড়ি, গিন্নির গুণপনায় মালিকানা খুইয়েছেন।

 

নিজে অঙ্কে মাধ্যমিকে বাইশ পেলে কী হবে জীবনের অঙ্কের গরমিল করেননি সুছন্দা। স্বামী নামক আসামীটাকে প্রায় ‘পেট ডগ’ আর ছেলেমেয়েগুলোও অবশ্যই ‘জো হুজুর’ বানিয়েছেন। শুধু একটাই সমস্যা ‘মেয়েটার ফিগারটা’ নিয়ে। নিজেরটা যত সহজে ম্যানেজ করতে পারেন ওরটা ঠিক ততটাই পারেন না। চোখের সামনে হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে মেয়েটার ফিগারটা। জিমের মালিক দত্তদা বোধহয় ঠিক সাজেস্ট করেছেন – ‘বোধহয় জেনেটিক্যাল’। ‘ধাতটাই ওরকম’। কিন্তু ও সব বললে হয়, আজকালকার ছেলেরা তো একটু ‘মডফিগার’ চায় হেলদি চায় না। কী করে বোঝাবেন তিনি মেয়েকে ভেবে পান না। একটু পাতলা কিন্তু ‘হেভি হিক্কারি’ হতে হবে। মানে পোশাকে আর চলায়। নিজে চুল লাল করার দিন দায়িত্ব নিয়ে মেয়েটারও লাল করে দিয়েছেন, এমনকী সল্টলেক সিটি সেন্টারের আপ টু ডেট চয়েস এনে দিয়েছেন, কিন্তু কোথায় কী? কতবার বলেছেন ব্রিটিশ কাউন্সিলে ভর্তি হতে। সব বোঝে কিন্তু সেই এক – খাবার পেলেই নোলা চকচক করে। কীভাবে সেদিন গোটা গোটা ক্যাডবেরি আর আইসক্রিমটা বাপ-মেয়ে মেরে দিল। খুব রাগ হয়েছিল সুছন্দার। কত চেষ্টা করে ‘রেডমিট’ আনা বন্ধ করেছেন বাড়িতে। এভাবে চললে আগেরবারের চন্দনের মতো হবে। কী ভাল ছিল ছেলেটা। একটু বোকাসোকাও ছিল সব চেয়ে বড় কথা ক্যারিয়ারটাও কত ভাল ছিল। সামনের বার জার্মানি যাওয়া প্রায় পাকা ছিল। তার সঙ্গে ঝগড়া করল কিনা খাওয়া নিয়ে! সহজে ছিপে উঠবে অমন ছেলে। কত দিনের শখ নিজের জামাই নিজে বাছাই করে নিজের বিয়ের ভুল শোধরাবেন।

 

দরজায় বেল বাজল। গায়ত্রী মন্ত্র শুরু হল। দরজা খুললেন। যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। টুকির নতুন কম্পিউটার ইন্সট্রাক্টর অর্পণ। নতুন টার্গেট। আগের বারের চন্দন বাতিল হওয়ার পর নতুন প্রার্থী।
– বলছিলাম মাসিমা, আজ একটু করতে পারছি না।
– কেন গো? কোথাও অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?
– না আজ একটু এসডিএফ বিল্ডিং-এ যেতে হবে।
– কেন গো? চাকরি পেয়ে গেলে নাকি?
চকচক করে ওঠে সুছন্দার মুখ, – তোমার যা ক্যারিয়ার বাবা!
– না, ওই আর কী। একটা ম্যাল্টিন্যাশনালের থেকে…এই জাস্ট একটা! ওই গ্রুপ ডিসকাশনে ডেকেছে আর কী!
– না, না ঠিক আছে। আজকাল এ সব সুযোগ কেউ ছাড়ে। আর তা ছাড়া টুকিও তো একটু এখন জিমে বেরোবে বলছিল।
– যদি কিছু মনে না কর… বলছিলাম কী তোমার তো বাইক আছে বাবা, যাবার সময় বুঢঢাকে যদি একটু নামিয়ে দিয়ে যাও।
– নো প্রবলেম মাসিমা।
বেরিয়ে যায় অর্পণ। সঙ্গে বুঢঢা।

 

হাই তুলতে তুলতে ঘরে ঢুকল টুকি, – কে মা, অর্পণদা এসেছিল?
– হ্যাঁ, শোন, ও বোধহয় একটা চাকরি পাচ্ছে। দয়া করে আর আগের বারের মতো খাওয়া নিয়ে খেয়োখেয়ি  করে প্ল্যানটা মাটি কোরো না।
– আচ্ছা মা, আমার গালের ব্রণগুলো আগের থেকে একটু মিলিয়েছে না? কাল নিকিতা বলছিল। নতুন অ্যান্টি পিমপিলসের ফেসপ্যাকটা বেশ ভাল মনে হচ্ছে।
– ঠিক আছে লাগিয়ে যাও। আর দয়া করে জিভটা সামলে। এই ছেলেটা গেলে না…বাপ মেয়েকে ধরে…
– কী হল বাড়িতে স্বয়ম্ভর বসেছে বুঝি? লুঙ্গি ঠিক ঠিক করতে করতে নৃপেনের প্রবেশ।
– খোঁচা দিয়ে লাভ নেই। পাড়ার ছেলেরা মেয়ের নাম দিয়েছে ‘ব্রণসুন্দরী’। তার উপর ওই চেহারা। না যায় জিন্স পরানো, না যায় টপ। আমার মেয়ে যে এমন হবে ভাবিনি কখনও।
– আমি তো চেষ্টা করছি মা।
– ওই চেষ্টাই করবে।
– কী করব বলো তো? ভাল খাবার দেখলে…
– যাক গে আমি এগোই। আজ একটু জিমের দত্তদার সঙ্গে ফুড ফেস্টিভ্যালে যাব ভাবছি। বলতে বলতে বাথরুমের দিকে এগোয় নৃপেন।
– আর কী করবে? বাবার মতো খাবার খাও আর কুস্তিগীর হও।
মুখ ঝামটে উঠে যান সুছন্দা। তার মনে হয় বারবার একটা কথা। তার মতো জেদ নেই এ মেয়ের। কম রোগা ছিলেন না তিনি। তখন তো রোগা মেয়ে মানেই ছেলেদের আওয়াজ আসত – ‘নিমাই’। তবুও তো কত বদলেছিলেন নিজেকে। লেবুজল খেয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে যেতেন জিমের জন্য।

 

বিকেল পাঁচটা। জিম থেকে ফিরছিলেন হেঁটে। পাশে বিক্রি হচ্ছে শশা। সঙ্গী জয়িতা এগোল কিনবে বলে। হঠাৎ কানে এল – ‘আস্তে চালাও, কী হচ্ছে কী? আমার খুব ভয় করে বলেছি না।’
টুকির গলা না? চট করে ঘুরলেন সুছন্দা। একটা অ্যাম্বিশন বাইক। বেরিয়ে যাচ্ছে। সামনে চালকের আসনে জিমের মালিক দত্তদার চাবুক ছেলে অর্জুন। পিছনে কোমর জড়িয়ে বসে আছে তার মেয়ে টুকি। হাতে স্কুপ আইসক্রিম।
– হয়ে গেছে, চল – জয়িতার গলা – তোকে যে কথাটা কদিন ধরে বলব ভাবছিলাম। তোর গালে যে ব্রণগুলো হচ্ছিল না সব মিলিয়ে গিয়েছে। কিন্তু গালের মেচেতার দাগগুলো না বড্ড বেশি বাড়ছে রে!

 

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ