10 Feb

অচেনা মানুষ

লিখেছেন:কৌস্তভ দাশগুপ্ত



‘চল রে নিষাদ, পাথর গলাই, ধরায় আনি জল
যেমন জলে রঙ লাগালে পাবিই না আর তল
চল রে নিষাদ, এই আঁধারে পাগলপারা নাচি
অনেকখানি মরার পরে একচিলতে বাঁচি’

-“কি রে ছুঁড়ি!…আবার তুই এমন করে এঁকেছিস? কতবার না বলেছি, পা-হাতগুলো ঠিক হচ্ছে না!…একটু খেয়াল করতে হবে তো।”

-“আরে!!…এ যে মহা জ্বালাতন হল!…তুমি আবার এসে জুটেছ? বিরক্তিকর!!…আর কতবার বলতে হবে তোমাকে যে দরজায় নক না করে ঢুকবে না?…এটা অভদ্রতা! আর দুমদাম তুইতোকারি করছ যে বড়!…গতকাল অব্দি তো ‘তুমি’ বলছিলে। কত বড় সাহস! আমি কিন্তু এটা একদম পছন্দ করছি না।”

একতলার একচিলতে ঘরটার পুব কোণে একটা ছোট সিঙ্গেল খাট….মাসদুয়েক হল কেনা হয়েছে পুরোন ফারনিচার কেনাবেচার ব্যবসায়ীর থেকে।এই ঘরটাই আঁকার ক্লাসরুমও বটে। রোজ বিকেলে কচিকাঁচাদের ভিড়ে ঘরখানা ভরে ওঠে।কেউ আঁকার জল উলটে ফেলে,কেউ আকাশের রঙ হলুদ আর গাছের পাতা নীল করে ফেলে…আবার কেউ বা রঙে হাত, মুখ মাখামাখি। এ ঘর থেকেই নতুন ধারার সব ছবি তৈরী হয়…এ ঘরটাতেই কোথাও কম্পিউটার, কোথাও পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কোথাও অবুঝ স্বপ্ন, কোথাও জমাট মেঘ। ঘরের বাঁপাশের একরত্তি জানলাটা দিয়ে বেশ রোদ, হাওয়া আসে। প্রায়শই একরাশ বইখাতা, তুলি, রঙ, ইজেল, টুকরো কাগজে ভরে থাকে খাটটা, সেই কবেকার লাল মেঝেটা।টুকরো কাগজগুলোর কোনটায় স্কেচ, কোনটায় কার্টুন, কোনটায় ক্যারিকেচার আঁকা…কোনটায় হয়ত আবার দু’কলি সখের অন্ত্যমিল। আজ খাটটায় রোদ পড়েছে বেশ। এই সকালবেলার যে রোদটাকে তিতাসের কখনও আলোর নদী মনে হয়, কখনও আবার ঝর্ণাধারা…সেই রোদটাতেই পিঠ দিয়ে আলুথালু, সাদা ফুলপাতাছাপ চাদরটাকে ঝেড়ে কিছুটা ঠিক করে নিয়ে বসে, লোকটা জুত করে একটা বিড়ি ধরাল। তারপর একগাল ধোঁয়া ছেড়ে তিতাসকে দেখতে দেখতে আর ফিকফিক করে ফিচেল হাসি হাসতে হাসতে বলল,

-“আরে ধুসসস!…তোকে তুইতোকারি করব না তো কি জো হুকুম মেরি ম্যাডাম–আই এ্যাম ইয়োর ওনলি এ্যাডাম বলতে বলিস?…আর আসতে তো হবেই। না এলে চলে?…সমাজসেবা বস্, সমাজসেবা। সমাজসেবা করতে গেলে অত ভাবাভাবি চলে না। আই ডোন্ট কেয়ার কানাকড়ি–জানিস, আমি স্যাণ্ডো করি?…কে বলেছিল বল ! দি গ্রেট নবনীতাদি।”

তিতাস স্পষ্ট বুঝতে পারল,বিপজ্জনক রাগটা আবার নতুন করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছে। কুকরিটা ঠিকঠাক আছে তো পকেটে?….হ্যাঁঃ,একদম পারফেক্ট। ঠাণ্ডা, নিষ্পাপ পড়ে আছে। গগ্যাঁর দিব্যি মাইরি, কোনদিন এই লোকের দৌলতেই একটা ভয়ানক রক্তারক্তি না হয়ে যায়! মাসখানেক হল এ এক মহা উৎপাত শুরু হয়েছে! যখনই একটা ছবি শেষ করে, বা, কাজটা হয়ত মোটামুটি শেষের দিকেই….কোত্থেকে যেন এই বিড়িখোর, চিড়িমার বয়স্ক লোকটা হাজির হয়ে যাচ্ছে! না বলা না কওয়া, সোজা ঘরে চলে এসে হঠাৎ কখন দুমদাম কথা বলা শুরু করে দেয়, জানতেও পারবে না।আর ঘরের দরজাটাও বাইরের দিকে খোলা থাকে মাঝেমধ্যে। হয় দেখবে খাটে টানটান হয়ে শুয়ে শুয়ে বিড়ি ফুঁকছে, নাহয় পশ্চিমের দেওয়ালে খুব কায়দা করে কেষ্টঠাকুরটির মত ঠেশ দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছবি মাপছে। হাতে শুধু বাঁশিটাই থাকে না…..থাকে একখানা বিড়ি।

প্রথমদিন ঢুকেছিল যখন, তিতাস ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।ফাঁকা একটেরে ঘর…সেখানে দুম করে বাইরের লোক ঢুকে পড়লে ভয় তো হবেই!…চুরি করতে এসেছে, না কি খুন টুনই করে দিল হয়ত। “খবর সব ভালো?”, শুনেই চমকে খাটের দিকে তাকাতে অনন্তশয়নের দৃশ্য!…মসিয়েঁ জুত করে পাশ ফিরে মাথায় ডানহাতের ঠেকনো দিয়ে জুলজুল করে দেখছেন!…. তিতাসের তো প্রায় কাপড়ে চোপড়ে হয়ে পড়ার মত অবস্থা!…খানিকক্ষণ আমতা আমতা করে কোনরকমে দরজাটা খুলে তিন লাফে ভেতরবাড়িতে আসে।এদিক ওদিক খুঁজে মা-কে দেখতে না পেয়ে, পাশের বাড়ির জয়ন্তদাকে ডেকে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে তিতাস যখন আবার ঘরে ফেরে, পাঠক বুঝতেই পারছেন, ঘর খালিই ছিল।জয়ন্ত খানিক খোঁজাখুঁজি করেও কাউকে দেখতে পায়নি।তিতাসের মুখের কাছে এসে কিসব শুঁকে খুব সন্দেহের চোখে দেখতে দেখতে বাড়ি ফিরে গেছিল।ভ্রূ কুঁচকে জয়ন্তর কাণ্ড দেখতে দেখতে আর লোকটা গেল কোথায় ভাবতে ভাবতে তিতাসের একটু হাসিই পেয়ে যায়।জয়ন্তদা নির্ঘাত ভাবছে গাঁজা, মদ কিছু খেয়েছে কিনা….।এরপর থেকে লোকটা আসে মাঝেমাঝে, আঁকা নিয়ে কিছু জ্ঞানের কথা বলে, তিতাসও চমকে যায় নিয়মিতই….কিন্তু প্রথমদিনের মত সেই পিলেচমকান ভয়টা আর নেই তত।তবে দুয়েকদিন এমন হওয়ার পরেই কুকরিটা পকেটে রাখা। বলা যায়না, সাবধানের মার নেই!

-“সে নবনীতাদিই বলুন আর অন্য যিনিই বলুন না কেন…এসব কথা আমাকে এসে বলার মানেটা কি? কেন বিরক্ত করছেন বলুন তো!…সক্কালবেলা যত ভেজাল!…ফুটুন না, কোথাকার কে আমড়াভাতে দে!…ও মা…মাআআ! …ও মাআআআআআ!… খেতে দাআআআআও।”, গালমন্দ করতে করতেই তিতাস দেয়ালঘড়িটা দেখে নিল। পাক্কা এগারোটা বাজছে। তিতাস ভালো করেই জানে, মা-কে এখন যতই ডাকুক কোন লাভ নেই।এর আগে এই লোকটা ঘরে ঢুকলে বারকয়েক ভেতরে গিয়ে দেখেছে, মা বাড়িতেই নেই। পরে শুনেছে, হয় দোকান, নয় বাজার, নয় পিন্টুদের বাড়ি…কিন্তু বাড়িতে নেই।লোকটার কথা বারকয়েক বলতে গেছিল মা-কে….তেমন পাত্তা পায় নি।আসলে মা ভাবে তিতাস বড় হয়ে খুব লায়েক হয়েছে।তার ঘরে প্রায়শই এত বাইরের লোক, বন্ধুবান্ধব এসে গপ্পো জোড়ে, মা আর এই লোকটার ব্যপারটাও তেমন সিরিয়াসলি নিল না।’হ্যাঁ’, ‘হুঁ’, ‘তাই তো’ করে কাটিয়ে দিল।

-“হেই হেই বাবুসোনা…মুখ খারাপ করে না।তুই না শিল্পী!…মুখ খারাপ করলে আঁকার হাতও খারাপ হয়ে যাবে কিন্তু।সেটা কি একটুও ভালো দেখায় বল! মনটাকে একদম প্যাসিফিক ওশেনের মত করে রাখতে হবে। আর মা-কে খামোখা ডেকে মরচিস কেন!…এই তো সে ওদিকের গেট দিয়ে চিনি কিনতে গেল, ঢোকার সময় পষ্ট দেখলাম।”

-“তোমার মতলবটা কি বলো তো!…নামও তো বললে না নিজের। চোরের মত ঘরে ঢোকো কেন ইচ্ছেমত?”

-“তা দরজা হাট করে খুলে রাখিস, তাই একটু ঢুকি।মতলব আর কি!…এই তো কটা সুখ-দুঃখের কথা কইতেই আসি, একটু গপ্পোগাছা যাকে বলে আর কি।তা মনে তো হয় ঝাঁটা জুতো মেরে তাড়াতে পারলেই বাঁচিস।”

-“একদম ঠিক ধরেছ।অজানা অচেনা লোক, বিনা নেমন্তন্নে ঘরে ঢুকে তুইতোকারি করছ…তাকে বসিয়ে পাত পেড়ে খাওয়াব না কি?…ঝটপট ঝেড়ে কাশো, আজ কি বক্তব্য।”

-“বক্তব্য আর কি…ছবি নিয়েই কটা কথা।এই যে ছবিটা এঁকেছিস, কতরকম খুঁত রেখে দিয়েছিস জানিস?”

তিতাস খুব ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকছে।খেলতে যেত পাড়ার মাঠে, যেমন ছোটবেলায় সবাই যায়…কিন্তু প্রায় রোজই হাত-পা কেটেছড়ে কান্নাকাটি করতে করতে বাড়ি ফেরার পর, কিছুদিন বাদেই মা বুঝে গেছিলেন এ মেয়ে খেলার মাঠের মেয়ে নয়। তারপর সেই কবে মা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিয়েছিল “রঙতুলি” স্কুলে….আর এখন?…কোলকাতার বুকে অন্যতম উঠতি নামী চিত্রশিল্পীদের মধ্যে তিতাসকে ধরা হয়।বড় বড় গ্যালারিতে প্রদর্শনী হচ্ছে। মোটা দামে কিছু ছবি বিক্রিও হয়েছে। ছবিআঁকাকে তো পেশা হিসেবে নিয়েছেই, এমনকি ছোটবেলাতেও যখন অন্যান্য বাচ্চারা মাসখানেক গিয়েই স্কুল ছেড়ে দিয়েছে, তিতাসের কাছে রঙতুলির বারান্দাটাই ছিল প্রিয় বন্ধু। কখনওই তার সেখানে গিয়ে না বসার কথা মনে হয়নি।লেমন ইয়েলো, আলট্রামেরিন ভায়োলেট, বার্ন্ট সিয়েনা, কোবাল্ট ব্লু আরও কতরকম রঙে রঙে তিতাস যেন মুক্তি খুঁজে পেয়েছিল!…আর্ট পেপার, হ্যাণ্ডমেড পেপার, ব্ল্যাক আর্ট পেপার এমন কতশত কাগজ…রাউণ্ড ব্রাশ, ফ্ল্যাট ব্রাশ, ফ্যান ব্রাশ, লাইনার ব্রাশ আরও কত ধরণের তুলি ও রঙ চাপাবার ছোটবড় যন্ত্রপাতি দিয়েছিল নিজের কথা, চিন্তা, অনুভবগুলোকে আঁকায় আঁকায় বলার, তুলে ধরার সুযোগ। রঙের জানালাটা খুলেই রেখেছিল ছোট্ট থেকে ধাপে ধাপে বড় হতে থাকা তিতাস। সুমন্তজ্যেঠুও ভারী ভালবাসতেন তাকে। মা-র ছেলেবেলার বন্ধু, রঙতুলির প্রাণপুরুষ সুমন্তজ্যেঠু, তিতাস ও আরও কয়েকজনের হাত ধরে, ছবিআঁকায় তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞানের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছিলেন উদার মনে। স্কুল কলেজ যেমন চলছিল, আঁকাও তার বিদ্যে বাড়াচ্ছিল ক্রমশঃ।শেষে যখন এক নৌকায় পা দেওয়ার সময় এল, যখন তিতাস কলমের বদলে তুলিরেখাকে আশ্রয় করে এগিয়ে চলার সিদ্ধান্ত নিল, সরকারী আর্ট কলেজে ভর্তি হল….মা-র মন কিছুটা ভেঙ্গে যায়। চাপা মানুষ, কয়েকবার বোঝাবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পরে মুখে আজকাল আর তেমন কিছু না বললেও, তিতাস বোঝে মা-র বুকের ভেতর অভিমানের একটা নদী তিরতির করে বয়ে চলেছে যে নদীটা সাগর পায়নি এখনও। সে তাই ঠিকই করে রেখেছে…অন্ততঃ মা-র মুখে হাসি ফোটাবার জন্য, ভাঙ্গা বিশ্বাস ফিরে পাওয়ার জন্য সফল তাকে হতেই হবে।
এই অল্প কয়েক বছরের জীবনে তিতাস জেনেছে দেশী-বিদেশী বহু শিল্পীর কথা।তাঁদের বড় হয়ে ওঠার গল্প কিছু শুনেছে সে সুমন্তজ্যেঠুর পাশে বসে। কোন কোনদিন এমন হত, আঁকা হয়ে যাওয়ার পরে সুমন্ত ওদের কোন একজন বিখ্যাত শিল্পীর বড় হয়ে ওঠা, বিখ্যাত হয়ে ওঠার আড়ালের সংগ্রামের রূপরেখা বর্ণণা করতেন। কখনও ভ্যান গঘের হতাশ জীবন…অসাফল্যর পরে অভেরা-জুর-ওয়াজে তাঁর নিঃসঙ্গ মৃত্যু। কখনও সালভাদর দালির দাদার কথা, যিনি মারা যাওয়ার পরে ছোটবেলায় দালিকে বোঝান হত, তিনি তাঁর দাদার নবজন্ম। আবার কখনও রুডল্ফ লেভির কাহিনী, যিনি প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী থেকে ভাগ্যের ফেরে আউশউইৎজ কনসেনট্রেশান ক্যাম্পের একজন হতভাগ্য মৃত মানুষের পরিচয় পেয়ে গেলেন।

-“কিছু ভাবছিস নাকি? এরকম ভাবছিস নাকি, আমি এত বড় আর্টিস্ট, দশটা ছোট বড় ম্যাগাজিনে ইলাসট্রেশান করছি…আর আমার মত কেউকেটার হাত নিয়ে কথা কইছে এই উটকোটা?”

-“না না…আমি এত কিছু ভাবছিই না তোমাকে নিয়ে।যা বলার তাড়াতাড়ি বলে কেটে পড়ো।”

-“আচ্ছা বেশ।আমারও আজ একটু তাড়াহুড়োই আছে বাপ।শোন বলি, মেয়েটার হাত-পা এর আঙ্গুলের দিকে একটু নজর দে।যত্নের দরকার আছে।ঠিকঠাক আকার পায়নি, পোষ্টাই হয়নি।আরও দেখ…নাভি থেকে শুরু করে বুকের নীচে পর্যন্ত যে রঙটা করেছিস, এই রঙটা কিন্তু করতে চাসনি তুই। রঙটা মনমত না হওয়ায় শেডের ব্যপারটাও ঘেঁটে গেছে।আমি ভুল কিছু বললে ধরিয়ে দিস।”

এবার তিতাস বেশ অবাক!…এমনটাই হয়েছে বটে।এতবছর ধরে আঁকার পরেও হাত-পা এর আঙ্গুল আঁকতে গিয়ে তিতাস এখনও বেশ সমস্যায় পড়ে। আর বুক থেকে নাভি পর্যন্ত যে রঙ, সেটা সত্যিই ক্যানভাসের ওই জায়গাটায় এসে ঠিক আকার পেল না। কি যে হল সেদিন!…ছায়া এসে অন্ধকারে কিভাবে কতটা মিশবে, ওই এলাকাটায় গিয়েই তিতাসের কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল। রঙটা একেবারেই ঠিক হয়নি।কিন্তু সেটা কি এই লোকের বোঝার কথা!!…ইনি কি নিজেও চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত!

-“ভাবছিস তো, এ আবার কেমন করে এত কিছু জেনে গেল?…ফোঁকে তো বিড়ি, আর ঢোকে তো জানালা দিয়ে।এর কি এত জানার কথা? ওরে শোন, কাউকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করিস নে।যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই…পাইলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।কে যে কবে বলেছিল, জানিনে বাপু। নে, এবার একগেলাস জল খাওয়া দিকি।গলাটা শুকিয়ে গেল একেবারে।”
ভারী বিরক্ত হয়ে তিতাস ভেতরে গিয়ে জল নিয়ে এসে অন্যদিনের মতই দেখল, ঘর ফাঁকা।যতবার চলে যাওয়ার সময় হয়েছে, কোন না কোন অজুহাতে তিতাসকে ভেতরে পাঠিয়ে সুট করে পালিয়ে যায়।এমন আচরণের যে কি কারণ, তিতাস কিছুতেই বুঝতে পারে না।কিছুক্ষণ ভোম্বু হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে তিতাস জলটা নিজেই ঢকঢক করে খেয়ে নিল।


রাত হয়েছে বেশ। নিঝুম রাত।এখন প্রায় দেড়টা বাজে।শীতের মধ্যে এত রাতে এ পাড়ায় তেমন কেউ জেগে থাকে না…শুধু চারমাথার মোড়ে জগুর চায়ের দোকান আর বোঁচার ওষুধের দোকান ছাড়া সকলেই লেপ কম্বলের ওম নিতে নিতে ঘুমের দেশে।সামনেই হাসপাতাল…ওষুধের দোকান তো খোলা থাকতেই হবে।এরা ছাড়া বাকী বাসিন্দাদের চোখে, শরীরে সারাদিনের ক্লান্তির পর সুখের ঘুম, শান্তির ঘুম। অথচ জয়ন্ত আজকেও কিছুতেই ভালভাবে ঘুমোতে পারছে না।

গত একমাস ধরেই জয়ন্ত ক্রমশঃ যেন একটা জালের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে। পুরোপুরি একটা শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রা থেকে সামান্য বেরিয়ে গিয়ে, জয়ন্তর যেন একটা মাকড়সার জালের মাঝখানে পড়ে যাওয়া মাছির মত অবস্থা! জীবনযাত্রা যদিও পুরোটা আগের মতই আছে…দিব্যি চলছে সেই সারা সপ্তাহ সেক্টর ফাইভে গাধার খাটুনি খাটার পর শুক্রবারে অফিস কলিগদের সঙ্গে কোন একটা বারে বসে ব্লেণ্ডার্স প্রাইডের সঙ্গে কাজু, ছোলা, বাদাম পেটে ফেলতে ফেলতে বসের মুণ্ডপাত…শনিবার একটু বেলার দিকে বাস ধরে ঘন্টা চারেকের রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি….আবার রবিবারে সন্ধেবেলায় বাস ধরে রিটার্ন টু দিস এক কামরার ভাড়াখুপচি।এমনিতে অদলবদল কিছুই হয়নি, কিন্তু মাঝখান থেকে এই অদ্ভুত অতিরিক্ত লোকটা একমাস ধরে কেমন সব ঘেঁটে দিয়েছে। বুঝতে পারছে, কিছু একটা খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে তিতাসের সঙ্গে….বুঝতে পারছে, তিতাসকে নিয়ে কোথাও যেন কিছু একটা ঘটনাক্রম, চিন্তাভাবনা হয়ে চলেছে…কিন্তু কি হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কারা করছে সবই বোধগম্যতার বাইরে।জয়ন্ত শুধু জেনে গেছে, এই মেশিনারির সেও একটা অংশ কখন যেন হয়ে পড়েছে।

শুরু হয়েছিল একটা সাধারণ রবিবারে।রুটের মাঝখান থেকে ওঠে বলে জয়ন্ত সচরাচর অনেকটা পরে বসার সিট পায়।কিন্তু সেদিন যেন ভাগ্য মিটিমিটি হাসছিল।বাসে উঠেই মাঝের দিকে জানালার ধারের সিট!…জয়ন্ত বেশ ফুরফুরে মেজাজেই যাচ্ছিল।চারটে স্টপেজ পার হওয়ার পরেই তিনি উঠে জয়ন্তর পাশটিতেই জুত করে বসলেন।

-“কি ভাই জয়ন্ত…খবরাখবর সব ভালো?…কাজকম্মো সব ঠিকঠাক? ”
জয়ন্ত একটু অবাক হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললে,-“হ্যাঁ, ওই… চলছে একরকম করে…”
লোকটা বেশ বিজ্ঞের মত ঘাড় নেড়ে, ভ্রূ তুলে বলল, “উঁহু, তা বললে চলবে কেন!!…ময়ূরী যে দিন গুণছে।তার কথাও তো একটু চেপে ভাবতে হবে।”
জয়ন্ত বেশ ভালরকমের চমক খেয়ে লোকটার মুখের দিকে বড় বড় চোখে তাকাল।ময়ূরীর ব্যপারটা তো বেশী কেউ জানেনা!…এনাকে তো ঠিক চেনা লাগছে না!…তবে কি ময়ূরীর চেনা?…ময়ূরীর থেকে জেনেছেন?

জুলজুল করে তাকিয়ে লোকটা বলল-“না হে বাপু!…যা ভাবছ তেমন কিছু না।ময়ূরী আমাকে মোটেও চেনে না।কস্মিনকালেও দেখে নি।আমাকেই চিনেটিনে রাখতে হয় সবাইকে…বলা তো যায় না, কখন কে কাজে লেগে যায়! তবে একটা কথা অভয় দাও তো বলি।”

জয়ন্তর হাঁ আর বন্ধ হচ্ছে না।একটু সামলে নিয়ে বলল, “বলুন।”

-“তোমাদের ছেলেমেয়ে হলে বেশ দেখতে হবে কিন্তু।যেমন তোমার মুখখানা টুকটুকে, তেমনি তোমার পছন্দটিও ভারী ফুটফুটে।বেশ চয়েস আছে যাই বলো। হেঃ হেঃ।”, বলে কেমন নির্লজ্জের মত ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে লাগল।

জয়ন্ত বেশ বিব্রত বোধ করল এবার। কে এক অচেনা লোক…তাদের ব্যপারে এত কথা কেন বলছে!…জানলোই বা কোথা থেকে!! একটু সাহস করেই জয়ন্ত বলে ফেললো এবার,”শুনুন, আমি আপনাকে একদম চিনতে পারছি না। কোনদিন আমাদের দেখা হয়েছে কিনা সেটাই মনে করতে পারছিনা।তাছাড়া আপনিই বললেন ময়ূরীও আপনাকে চেনে না।তা আপনি আমাদের কিভাবে চিনলেন সেটা যদি একটু খোলসা করে বলেন তাহলে একটু সুবিধে হত আর কি।”

-“তা এখন অসুবিধেটাই বা কি এমন হচ্ছে শুনি।এই তো দিব্যি কৌতূহল হচ্ছে, মনের মধ্যে বেশ একটা রহস্যময় ব্যপার জাগছে, একটা বেশ জমাট কি হয় কি হয় ভাব হচ্ছে। এসব শেষ কবে হয়েছিল বলতে পারো?…সেই যেদিন আই বি এম বিল্ডিং এর সামনে ময়ূরীকে প্রপোজ করলে সেদিনই লাস্ট, নাকি এমনি এমনিই হয় মাঝেমাঝে?”

খুব চৌকস লোক!…বেশী কথা না বাড়ানোই ভালো। এই ভেবে জয়ন্ত আর কথা না বাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।ঢিপিডাঙা পার হল বাস।

-“কি হে!…লজ্জা পেলে নাকি!…আচ্ছা বেশ বেশ…লজ্জা পেতে হবে না। বলব না কিছু ময়ূরীর ব্যপারে আর।তবে আড়ি করে দিয়ো না বাপু আমার সঙ্গে।খুবই আতান্তরে পড়ে যাব তাহলে।”
হাসি পেয়ে গেল জয়ন্তর।হাসতে হাসতেই বলল, “বলুন না, কি দরকার। বিয়েতে নেমন্তন্ন তো আপনাকে করছিই।আপনি হলেন যা দেখছি বরের ঘরের মেসো আর কনের ঘরের পিসে।আপনাকে ছাড়লে হয়? ঠিকানা আর মোবাইল নম্বরটা কিন্তু আজই নিয়ে নেবো।সঙ্গে পিসী বা মতান্তরে মাসীরও কিন্তু আসা চাই।”

লোকটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। খানিকক্ষণ থুম মেরে থাকার পর জয়ন্ত খেয়াল করল লোকটা রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।চূড়ান্ত অপ্রস্তুত হয়ে গিয়ে জয়ন্ত বলল,
-“আরে কি হল আপনার? ও দাদা। আপনি কাঁদছেন নাকি? আমার কথা শুনে কাঁদছেন? এ হেহে!…আমি তো মজা করেই বলেছিলাম।আপনি প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আমি অত না বুঝেই বলেছিলাম।প্লিজ প্লিজ। ও দাদা….”

-“না জয়ন্তভাই, ঠিক আছে।ওই চোখে একটু ঝাঁঝ লাগলো কোথা থেকে, তাই একটু…ওটা কান্না নয়।তোমার সঙ্গে ভাই আমার খুব দরকার। বাস থেকে নেমে কোথাও বসে বলি?”

-“বেশ, বলবেন নামার পর।তবে এখানে মাঝরাস্তায় কোথাও নামতে পারব না কিন্তু। লাস্ট স্টপে নামলে….. ও কি!!”
কথা বলতে বলতেই জয়ন্ত বিস্ফারিত নয়নে দেখল, লোকটার বাঁ হাতের তলা দিয়ে রুমালের আড়াল থেকে একটা কালো গোল ছোট্ট মুখ জয়ন্তর দিকে তাক করে বেরিয়ে আছে।ওটা তো সেমি-অটোমেটিক পিস্তল! ওরে বাবা!…যা ভেবেছিল তাই…নির্ঘাত কোন বদ মতলবে লোকটা বাসে উঠেছে।জয়ন্তর কথাবার্তা, চিন্তাভাবনা সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল।

-“শোন জয়ন্ত, এটা দেখে ভয় পেয়ো না।ভয় পেয়ো না, ভয় পেয়ো না, তোমায় আমি মারব না… সত্যি বলছি কুস্তি করে তোমার সঙ্গে পারব না। কে বলেছিলেন বল…পারলে না তো?…সুকুমারবাবু।খালি মাল খেলেই চলবে?…মগজটাকেও একটু খেলাতে হবে তো নাকি! এখন যা বলি মন দিয়ে শোন। তোমাকে ভাই আমার সঙ্গে একটু সামনেই, এই পাঁচখড়িতে নামতে হবে।ওখানেই বসার বেশ ভালো বন্দোবস্ত হয়েছে।কিছু দরকারী কথা সেরে তোমাকে তুলে ছেড়ে দেব…মানে বাসে তুলে দেব আর কি। এখন আমি সিট ছেড়ে উঠব…তুমি গুটিগুটি পায়ে দরজায় দাঁড়াবে…আমি পেছনে থাকব।গোলমাল করার চেষ্টা করলেই একদম মালামাল হয়ে যাবে।তাই চুপচাপ এগিয়ে যাবে।

আর গোলমাল!… জয়ন্তর শরীর মন কেমন যেন ভারী হয়ে আসছে।মাথাটা খুব খালি খালি লাগছে।এই কি তবে শেষ দিন? এবার পাঁচখড়িতে নামিয়ে কি লোকটা ধনে প্রাণে শেষ করে দেবে?

-“শোনো হে…ঘাবড়িও না।তোমাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে। বলছি তো, মারব না তোমায়।লুটপাটও করব না।যেমনটি আছ তেমনটিই বাসে তুলে দেব। বলা কিছু যায় না, উপরি কিছু রোজগারও হয়ে যেতে পারে।চলো চলো…. পাঁচখড়ি প্রায় এসে পড়েছে।”

জয়ন্ত উপায়ান্তর না দেখে আস্তে সিট ছেড়ে উঠে পড়ল।হাত পা কাঁপছে বেশ।আত্মবিশ্বাস কেমন যেন ধরা খাওয়া ধরা খাওয়া মনে হচ্ছে। টালমাটাল করতে করতে কোনরকমে দরজায় দাঁড়াল।লোকজন জানতে চাইছে শরীর খারাপ কিনা।বমি করবে কিনা। তখনই লোকটা এসে কাঁধে একটা হাত রাখল।

-“কি ভাই…অসুস্থ লাগছে?…নামবেন?…চলুন চিন্তা নেই।আমি আছি।”

জয়ন্ত মনে মনে ভাবল, তুই আছিস বলেই তো চিন্তা রে শুয়ার!…মুখে আর কিছু বলল না।পাঁচখড়িতে নামার জন্য অন্য কোন প্যাসেঞ্জার নেই।সবাই সরে গিয়ে ওদের নামার রাস্তা করে দিল।
জায়গাটা একটা ছোট গ্রাম।বাসস্ট্যাণ্ডটায় কিছুই নেই, শুধু দুটো মুদীখানার দোকান আর ভবার চায়ের দোকান ছাড়া।লোকটার খোঁচা খেয়ে দোকানে ঢুকতে ঢুকতে জয়ন্ত দেখল একটা রংচটা বোর্ডে লেখা, “ভবার চায়র দুকান।ভাল চা, বিষকুট, ঘুগুনি পাওয়া যায়।” আবার মোবাইল নম্বরও দেওয়া হয়েছে।বানানগুলো পড়ে আর চায়ের দোকানে কথা হবে দেখে জয়ন্তর মনটা একটু হাল্কা হয়ে গেল।
-“কি হে!!…ভবাভাই?…খবর ভালো!”
-“এজ্ঞে মাস্টারমশাই।”
-“দাও হে, দুটো তোমার মুড়ি-ঘুঘনি আর দুধ চা দাও দিকিনি।একটা চিনি ছাড়া।কি জয়ন্ত…চিনি দিয়েই খাবে তো?…এমনিতে বাড়িতে তো চা খাচ্ছ না শরবত খাচ্ছ বোঝা যায় না।”
জয়ন্ত এতক্ষণে বুঝে গেছে, এ লোক তার সম্বন্ধে সবটা না হোক, অনেককিছুই জানে।হতাশ গলায় বলল, “হ্যাঁ, আর কি।দিতে বলুন।”

-“বেশ বেশ।ভবাভাই…ঝটপট। আচ্ছা জয়ন্ত, এবারে সোজাসাপ্টা কাজের কথায় আসা যাক।তুমি তিতাসকে চেন নিশ্চয়ই? ”

এই শুরু। তারপর অনেকক্ষণ ধরে,কখন তিতাস বাড়ি থাকে, তিতাসের মা-এর নজর এড়িয়ে কিভাবে তিতাসদের বাড়ি ঢোকা যায়,তিতাসের সঙ্গে কথা বলা যায়, তিতাসের নজর এড়িয়ে ওর মা-এর সঙ্গে কিভাবে কখন কথা বলা যায়, এসব ব্যপারে অফিস কামাই করে জয়ন্ত কিভাবে সাহায্য করবে ইত্যাদি নানারকম কথা বিস্তারিতভাবে প্রচুর চা, সিগারেট সহযোগে আলোচনা হয়। শেষে বাস আসতে দেখে জয়ন্তর হাতে লোকটা একটা খাম গুঁজে দিয়ে বলল, “ভয় নেই।পাবে এরকম খাম মাঝেমাঝে।কাজটা মন দিয়ে করো।” খামটা পকেটে ভরে বাসে উঠে পড়ার পর সেদিন আর বাইরে তাকিয়ে লোকটাকে দেখতে পায়নি জয়ন্ত।খামে দশ হাজার টাকা ছিল।আর একটা কম্পিউটারে লেখা চিঠিতে কি কি কাজ করতে হবে তার একটা সারাংশ।সঙ্গে বেশ কিছুটা দুশ্চিন্তা বিনামূল্যে…… গত একমাস ধরে এরকমই চলছে। তিতাসের সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে থাকলে দু একদিন আগে ধূমকেতুর মত উদয় হয়ে একটা কম্পিউটারে লেখা চিঠি দিয়ে একটু ফাজলামি করে পালিয়ে যায়। কোথায় যে থাকে, কি কাজ করে কিছুই জানায় নি। এমনকি চিঠিতে নিজের নামটাও লেখে না।

যেদিন প্রথম তিতাসের ঘরে লোকটা ঢোকে, সেদিন তিতাস ভয় পেয়ে ছুটে জয়ন্তকেই ডাকতে এসেছিল।ওকে আর কি বলবে!…অবাক হওয়ার ভান করে খুঁজতে যেতেই হল। জয়ন্ত খুব ভালোই জানে লোকটা ততক্ষণে ভ্যানিশ হয়ে গেছে হাওয়াবাতাসের মধ্যে ধুলোকণার মত…..

“ক্লিক করুন এ্যাপের বেল আইকনে আর সাবস্ক্রাইব করুন “আপনার খবর”। না করলে?…খবর ছেড়ে থাকুন আঁধারে। নিউজডেস্কে আমি গার্গী। আর আবারও আমরা চলে আসছি আজকের সেই চাঞ্চল্যকর খবরে, যেখানে জানা যাচ্ছে খাস কোলকাতার বুকে নিরাপত্তারক্ষী ও জঙ্গীদের গুলির লড়াইয়ে নিহত দুই জঙ্গী। গতকাল ভোরবেলায় কোলকাতা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে পাঁচখড়ি গ্রামে জঙ্গী ঘাঁটির সন্ধান পায় পুলিশ। খবর পেয়ে সশস্ত্র বাহিনী বাড়িটি ঘিরে ফেললে ও সতর্কবার্তা পাঠালে ভেতর থেকে বৃষ্টির মত গুলি ছুটে আসতে থাকে। আকস্মিক এই আক্রমণে দুই পুলিশকর্মী গুরুতর জখম হয়েছেন। আমরা সরাসরি চলে যাব ঘটনাস্থলে, আমাদের রিপোর্টার অসীমের কাছে….হ্যাঁ অসীম, গার্গী বলছি।তুমি আমাদের জানাও, এখন পাঁচখড়ির পরিস্থিতি ঠিক কিরকম….

অবশ্যই গার্গী…যেমন আগেও জানিয়েছিলাম, পাঁচখড়ি একটি খুবই শান্ত গ্রাম।সেখানে এই ধরণের ঘটনার পর গ্রামের মানুষ এখন দৃশ্যতই আতঙ্কে ও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। গতকাল ভোর চারটের সময় প্রায় আড়াইশো সশস্ত্র পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী পাঁচখড়ির বাসিন্দা দুলু সরকারের বাড়িটি ঘিরে ফেলে।দুলুবাবু এই বাড়িতে থাকেন না।বিশ্বস্তসূত্রে খবর, তিনি বাড়িটি একজন আঁকা শেখাবার শিক্ষককে ভাড়া দিয়েছিলেন।পুলিশ জানিয়েছে এই শিক্ষক, যাঁকে এলাকার মানুষ “মাস্টারমশাই” নামে চেনেন, তিনিই জঙ্গীদের একজন মাস্টারমাইন্ড। বাড়িটি ঘিরে ফেলার পরে, পুলিশ কয়েকবার বাসিন্দাদের বেরিয়ে আসতে বলে। কিন্তু উত্তর আসে গুলির মাধ্যমে। পুলিশও তখন বাধ্য হয় বেশ কয়েক রাউণ্ড গুলি চালাতে। কিছুক্ষণ পরে ভেতর থেকে আর গুলি না চলায় পুলিশ দরজা ভেঙ্গে ঘরে ঢুকে এক জঙ্গীকে মৃত অবস্থায় পায়।তার হাতে ছিল অত্যাধুনিক একটি আগ্নেয়াস্ত্র যার নাম হেকলার এ্যাণ্ড কশ এম পি ফাইভ সাবমেশিনগান। ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ আরও কিছু অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, প্রচুর গুলি ও বিস্ফোরকের সন্ধান পেয়েছে।সন্দেহ করা হচ্ছে, এইসব অস্ত্র ও বিস্ফোরক, প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে বড় কোন নাশকতা ঘটাবার উদ্দেশ্যে অন্য কোথাও পাচারের চেষ্টা চলছিল।

পুলিশসূত্রে একজন জঙ্গীর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁর নাম জয়ন্ত পাত্র। তিনি কোলকাতার একটি নামী বেসরকারী সংস্থায় তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞর পেশায় চাকরি করেন। পাঁচখড়ির কাছাকাছি একটি গ্রামে তাঁর কিছু আত্মীয় থাকেন। পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করে সন্ত্রাসবাদের অন্য কোন সূত্র পাওয়া যায় কিনা খোঁজ চালাচ্ছে। জানা যাচ্ছে, কোলকাতার একটি অভিজাত এলাকায় ঘরভাড়া নিয়ে তিনি বসবাস করতেন।সেখানেও তদন্ত চালান হচ্ছে। জঙ্গীদের মধ্যে এমন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালী যুবকের সন্ধান পেয়ে পুলিশ এবং গ্রামবাসীরা বিস্মিত।

অন্যদিকে “মাস্টারমশাই” নামে এলাকায় পরিচিত এবং অল্প কয়েকদিন এসেই শিশুদের আঁকা শেখানোর জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা, বাংলাভাষী, পঞ্চাশোর্দ্ধ অপর এক নিহত জঙ্গীর প্রকৃত পরিচয় এখনও অজ্ঞাত। পুলিশসূত্র থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে খুব অল্পদিনের মধ্যেই এই ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয়ও ফাঁস করা যাবে। গার্গী, একদম এখনকার খবর, এই সূত্র ধরে তদন্ত চালিয়ে পুলিশ জঙ্গী ডেরা থেকে একটি ডায়েরি খুঁজে পেয়েছে যার ওপরদিককার ছবি আমরা এখন দর্শকদের দেখাবার চেষ্টা করছি। এই ডায়েরির কিছু পাতা আংশিকভাবে পড়ে পুলিশ জানতে পেরেছে, কোলকাতার শিল্পকলাজগতের সঙ্গে জড়িত কোন ব্যক্তির সঙ্গে এই মাস্টারমশাই ব্যক্তিটির রক্তের সম্পর্ক আছে। রক্তের সম্পর্ক কথাটির ওপর বিশেষভাবে জোর দিচ্ছি গার্গী…কারণ, সেই ব্যক্তি হয়ত এই মাস্টারমশাইয়ের সন্তান, এমনটাই পুলিশের সন্দেহ….কিন্তু সেই ব্যক্তির পরিচয় পুলিশসূত্র থেকে তদন্তের স্বার্থে গোপন রাখা হয়েছে। খুব শীঘ্রই তদন্ত শেষ করে আনার আশ্বাস দিয়েছেন স্বয়ং কোলকাতা পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ অফিসার। প্রায় চব্বিশ ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও এই দুই আতঙ্কবাদীর সদস্যপদ বা হিংসাত্মক কার্যকলাপের দায় স্বীকার করেনি কোন জঙ্গীগোষ্ঠীই। তবে গার্গী, আমরা যখনই নতুন কোন খবর পাব এ বিষয়ে, দর্শকের সামনে তুলে ধরব অবিলম্বে। ক্যামেরায় তিমিরবরণ আঢ্যর সঙ্গে অসীম গড়াই, আপনার খবর।”

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ