11 Jun

অনন্ত যাত্রা

লিখেছেন:মইনুল হক


ম ঝম ঝম ঝম । আমাদের বর্তমান বাসভূমি জলের তলায় । পুরো একটা জনগোষ্ঠী, যাবে কোথায় ? বৃষ্টিরও বিরাম নেই ।  অশিতিপর একটি শহর অথবা গ্রাম । সেখানে প্রতিদিনই চলছে মৃত্যুর মিছিল আর মৃত্যুর প্রতীক্ষা । সারি সারি মানুষ চলেছে আশ্রয়ের খোঁজে । মৃতদেহগুলো চারিদিকে জলে ভাসছে , পচা গলা , দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস মুখরিত । জীবন্ত মানুষেরা বাঁচতে চায় । চলা শুরু করলো তারা । ডাঙার সন্ধানে । আমিও তাদের সহযাত্রী । হেঁটেই চলেছি সকলে , চলার কোন বিরাম নেই । পথের কোন শেষ নেই । কোন অতীত নেই , কোন ভবিষ্যৎ নেই , বর্তমান নেই । এমনই একটি দেশের উদেশ্যে আমাদের যাত্রা – যেখানে আমরা আদৌ পৌঁছাবো কিনা তাও জানিনা । যাত্রা আমাদের ডাঙার উদ্দেশ্যে ।

এবং এভাবেই আমি আমার জীবনের একটি নতুনতর দৃশ্যের সম্মুখীন হলাম । দৃশ্যেটি এজন্য স্মরণীয় নয় যে , এটি খুবই মনোরম , এটি খুবই জঘন্য অথবা অভূতপূর্ব । কারণ ইতিপূর্বেই সন্তানকে স্তন্য পান করানোর মতো নান্দনিক দৃশ্য অথবা বাসের চাকার তলায় থেঁতলান মৃতদেহর দূষিত দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রসবকালীন কষ্ট ও আনন্দের মিশ্রিত দৃশ্যেরও সম্মুখীন হয়েছি । কিন্তু এই দৃশ্যটি একেবারেই স্বতন্ত্র ধরণের ।

একটা লোক বিছানায় আধ-শোয়া হয়ে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুর প্রহর গুনছে । আমরা বুঝতে না পারলেও মৃত্যুপথযাত্রী সম্ভবত উপলব্ধি করছে আজরাইল তার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্থ । পরিবারের লোকেরা চারিদিক থেকে তাকে ঘিরে প্রহর গুনছে । এবং কান্নায় ভেঙে পড়ার সেই বিশেষ সময়টিকে চিহ্ণিত করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ । যেমন ভাবে টাইটানিকের হতভাগ্য জ্যাক লাইফ বোটে উঠতে না পেরে জীবনের শেষ ক্ষণটির জন্য তৈরি হয়েছিল । এভাবেই নিঃশব্দে শেষ প্রস্তুতির অনিচ্ছাকৃত তীব্রতা পরিবেশকে নিয়ে যাচ্ছিল মূক বধিরতার দিকে, যেখানে কষ্টের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশে নেই কোন স্ফুটতর উচ্চারণ ; আছে কেবল কষ্টের অস্পষ্ট নৈশব্দের শব্দ । অথচ শব্দই ব্রম্ভ, এমন ভাবনার গভীরতা সব মনেই অলীক কল্পনার থেকেও সুদূর পরাহত । হঠাৎ লোকটির মাথা একটু নড়ে উঠল , ঠোঁট কেঁপে উঠল , হিমেল হাওয়া যেমন কাঁপিয়ে দেয় শরীর ; চোখ দুটোও বিস্ফারিত হয়ে খুঁজে নিতে চাইলো কোনকালে না দেখা, না শোনা কোন অভাবনীয় দৃশ্য । না পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় বিমুঢ কিনা তাও স্পষ্ট নয় !

এই রকম একটি অতি অ-সাধারন দৃশ্যকে ঘিরে কিছু অ-পূর্বপরিকল্পিত খণ্ড দৃশ্যের কোলাজ তৈরি হয়ে যাচ্ছে । ডানদিকের কোনায়  মৃত্যুপথযাত্রীর  দৃশ্যেটিকে সরিয়ে একটু পিছিয়ে , কিছু বয়স্ক বিধবা অথবা অ-বিধবা মহিলাদের একটা জটলা । তাদের কাছে মৃত্যুকালীন দৃশ্য নতুন কিছু নয় । কিম্বা নতুন কোন বিশেষত্বও উন্মোচন করেনি । নিস্তব্ধতাও অর্থহীন সেখানে । এক নাগাড়ে নিজেদের মধ্যে শব্দ বিনিময় করেই চলেছে , আদতেই কোন শ্রোতা এই দলে গুপ্তভাবেও আছে কিনা তার তোয়াক্কা না করেই । তারা এই সত্য জেনেই জন্মগ্রহণ করেছে – অভিজ্ঞতা বিনিময়ই হল মর্ত জীবনের প্রথমতম ও শেষতম লক্ষ্য , অন্তত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য । খুব উৎকর্ণ হয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে নানা স্বরের , বিভিন্ন মাত্রার যে সব শব্দ অথবা খণ্ড শব্দ কানে আসছিল তা থেকে অনুমান করা যাচ্ছিল — কোথায় কার বাবা বা মা বা পরিচিত কোন জন কি ভাবে মারা গিয়েছিল কিম্বা অন্ত্যেষ্টিতে কে কি ভাবে কত টাকা খরচ করেছিলো , ইত্যাদি ইত্যাদি ।

উপরের দৃশ্যদ্বয়কে সরিয়ে একটু নিচে নেমে এলে মুখোমুখি হওয়া যাবে তৃতীয় দৃশ্যের । এখানে কিছু মহিলা এবং পুরুষ , প্রায় সকলেই মধ্যবয়স্ক । সকলেই মৃত্যুপথযাত্রীর মহানুভবতা আদর্শচারিতা কিম্বা গৃহীসন্ন্যাসী  সুলভ আচরণের তীব্র সাধুবাদ বর্ষণ করে চলেছে । হতে পারে এদেরই কয়েকজন এই দৃশ্যটির মুখোমুখি হওয়ার আগে পর্যন্ত মৃত্যুপথযাত্রীর চরম সর্বনাশ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কামনা করতেও পিছপা ছিলনা । অথচ এখন সকলেই মহাপুরুষোচিত এই মানুষটির কাছে আজ পর্যন্ত জীবনের বিভিন্ন পর্বে কতরকম ভাবে কেবল মানসিক নয় আর্থিক কিম্বা সামাজিক সাহায্য পেয়েছে তারই বিস্তারিত ব্যাখ্যায় মশগুল ।

শেষের দৃশ্যটি একেবারে প্রায় সদর দরজার সামনে । মৃত্যু দৃশ্যটি এখান থেকে অনেকটা দূরে । একটা অন্ধকার বৃত্তে কিছু মানুষের ব্যস্থতা । খুব চাপা গলায় আলোচনা ।  বিভিন্ন আত্মীয় স্বজনদের কি ভাবে খবর দেওয়া যায় ……। কোথাও দূরত্ব বেশি , কোথাও যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ — তাই পথনির্দেশিকা, ইত্যাদি ইত্যাদি ।

এই মানুষগুলির কোনটার মধ্যেই আমার অস্তিত্ব নেই । অঝোরে বৃষ্টি এল । আবার শুরু হল অক্লান্ত সেই ডাঙার খোঁজে যাত্রা । জানিনা কখন থামবো , কোথায় থামবো !

এবং এভাবেই সহসা আবিষ্কার করলাম , আমার সহযাত্রীরা আমাকে ছেড়ে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে । আমার সামনে পেছনে আমার সহযাত্রীরা কেউ কোত্থাও নেই ।  একটি মৃতদেহকে ঘিরে অনেক না চেনা মানুষের জটলা । ওই মৃতদেহটির খুব কাছে গিয়ে চিৎকার করে উঠলুম । এটাও কি সম্ভব ! আপনারা ভুল করছেন , সকলে ভুল করছেন । আমি, আমি, আমি ! আপনাদের সকলের সামনে । কেউ শুনতেও পেলনা আমার চিৎকার । শেষকৃত্যের জন্য শবদেহটিকে তোলা হোল খাটিয়ায় । আমি শেষ বারের মতো চেয়ে রইলুম আমার শবদেহের দিকে ! আবার ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি এল —

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ