11 Jun

আমার ঘুড়ি

লিখেছেন:তপন মোদক


আমার একটা ঘুড়ি ছিল । কে উড়িয়েছিল – কোথা থেকে কেটে এসেছিল – জানা নেই । সুতো-কাটা ঘুড়ি ভাসতে ভাসতে আমার মাথায় গোঁত্তা মেরে আশ্রয় চেয়েছিল বোধ হয় ।

আমার নিজের কোনও লাটাই ছিল না – সুতো কেনার বাহুল্য ছিল না । কেতুদার সুতোয় মাঞ্জা দিতে আমার ডাক পড়ত বিশ্বকর্মা পুজোর আগে । ঘুড়িটা ছিল লাল রঙের – দুদিকে দুটো চোখ আঁকা ছিল । মা খুব যত্ন করে একটা পুরোনো ক্যালেন্ডারের ওপর টাঙিয়ে রেখেছিল । ঘুড়িটা সব সময় আমার দিকে তাকিয়ে থাকতো । মা যখন রান্না করত – সাবান কাচতো বা বাসন মাজত – ভাই বোন ঘুমিয়ে থাকত, তখন আমি ঘুড়িটার সঙ্গে গল্প করতাম বা এটাও বলা যেতে পারে , ঘুড়িটা আমাকে নির্বাক ভঙ্গীতে ডাকতো – ওর সঙ্গে গল্প করার জন্য ।

আমাদের পাড়ায় কেলো নামে একটা ছেলে ছিল – তার না ছিল বাবা না ছিল মা । এর ওর বাড়ী এটা  সেটা করে বেড়াতো । কোনও দিন কেউ খেতে দিলে গোগ্রাসে খেত – কখনও চাইতো না । আমি কেলোর সঙ্গে ঘুড়িটার মিল খুঁজে পেতাম । ঘুড়িটারও তো বাবা মায়ের খোঁজ নেই – ভাসতে ভাসতে আমার কাছে এসেছে । কেলোর সঙ্গে মিলিয়ে ঘুড়িটার নাম দিয়েছিলাম ‘লেলো’ । আমি যখন পড়তে চাইতাম না , মা একটা লাঠি দিয়ে ঠেঙাত । লেলো মায়ের দিকে কেমন  রেগে তাকিয়ে থাকত – বা – বাবা যখন কারখানা থেকে তেতেপুড়ে দুপুরে বাড়ী ফিরত আর হাতের কাছে যাকে পেত পিটিয়ে দিত – লেলোর একদম পছন্দ হত না – বেশ বুঝতে পারতাম । আমার তখন কোনও বন্ধু ছিল না । আস্তে আস্তে লেলো আমার প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠল । আমার সুখে লেলো আনন্দ পেত । একদিন মনে আছে – তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি । ক্লাসে সব অঙ্ক রাইট করতে পেরেছিলাম বলে কালীবাবুস্যার আমাকে একটা নতুন পেনসিল উপহার দিয়েছিল । বলতে গেলে সেটাই আমার প্রথম এবং শেষ উপহার । লেলোকে যখন ঘটনাটা বললাম – ওর চোখ একদম পালটে গেলো – খুশিতে খানিকটা দুলে উঠল । আমার মনে আছে , এক চৈত্রের বিকেলে গুলি খেলায় হেরে গিয়ে আমার সব মার্বেলগুলো পুলা’র কাছে চলে গেল । সেই ছোটবেলায় এত বড় দুঃখ আর পাইনি । এ দুঃখের কথা লেলোর কাছে চেপে রেখেছিলাম । কিন্তু লেলো বুঝতে পেরেছিল । চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে ছিল । লেলোর চোখে যদি জল থাকত – ওর কান্না বাঁধ ভাঙত – এ আমি নিশ্চিত বলতে পারি । আমি ওর দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারছিলাম না ।

আমাদের পাঁচজনের সংসারে লেলো বেশ জায়গা করে নিলো । মা প্রায়ই খুব যত্ন করে লেলোকে পরিষ্কার করত । মা যখন ওর গায়ের ঝুল ঝেড়ে দিত – লেলো আনন্দে খানিকটা দুলে নিত । আমার সদা-রাগী বাবা পর্যন্ত লেলোকে ফেলে দিতে বলত না । বরং মনে আছে , আমার একবার খুব জ্বর হয়েছিল । বাবা মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল । বাবা ঘুড়িটার দিকে তাকিয়ে বলেছিল , বোনাস পেলে তোকে একটা লাটাই কিনে দেব আর হাজার মিটার সুতো । বোনাস পেয়ে বাবা সুতো আর লাটাই কিনে দিত কিনা জানি না – তার আগেই বিশ্বকর্মা পুজো এসে গেল । আমাদের পাড়ায় হই হই করে মাঞ্জা দেওয়া চলছে । যথারীতি কেতুদা আমাকে ডেকেছে সুতোয় মাঞ্জা দেবার জন্য । মাঞ্জার রঙ লাল । মাঞ্জা দিতে দিতে পুলাকে বললাম , জানিস তো আমার না একটা লাল রঙের ঘুড়ি আছে । বলেই বুঝতে পারলাম ভুল করে ফেলেছি । এই রকম আরও  ভুল জীবনে বহুবার করেছি – কিন্তু এই ভুলটা আজও পর্যন্ত ভুলতে পারিনি । বিশ্বকর্মা পুজোর দিন মিতালি সঙ্ঘের ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো হচ্ছে । এবার পুলার মাঞ্জা একদম জমেনি – একের পর এক ঘুড়ি কেটে যাচ্ছে । নিমেষের মধ্যে   দু’ডজন ঘুড়ি শেষ । এতবড় পরাজয় পুলার আর কোনও দিন ঘটেনি । ওর চোখেমুখে একটা হতাশা আর ক্রোধের ছাপ । হঠাৎ পুলা আমার হাতে লাটাইটা দিয়ে বলল, ধরতো আসছি । কিছুক্ষণ ওর আর দেখা নেই । আমি লাটাইটা একজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে কেতুদাদের ছাদে চলে গেলাম । হঠাৎ দেখি মিতালি সংঘের ছাদ থেকে একটা লাল রঙের ঘুড়ি উড়ছে – আর সব ঘুড়িকে কেটে দিচ্ছে – তার মধ্যে কেতুদারও দুটো ঘুড়ি আছে ।আমি আবার ছুটে গেলাম মিতালি সংঘের ছাদে । দেখি পুলার অন্য রূপ । মুখে বিজয়ীর হাসি । আকাশে একটা লাল ঘুড়ি ফড়ফড় করে উড়ছে – আর কি তার দাপট । খাঁচার বন্দী পাখিকে ছেড়ে দিলে মুক্তির আনন্দে যেমন ওড়ে – অনেকটা সেইরকম – আর তার লাটাইটা পুলার হাতে ধরা ।আমাকে বলল, বুঝলি সুতোর প্রবলেম না । আরও বলল এদিকে আয় । বলে ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে আমাকে বিশ্রী ভাবে চুমু খেল । আমি কিছু বুঝতে পারলাম না । হঠাৎ আমার মনে কু গেয়ে উঠল । পড়িমরি করে ছুটে বাড়িতে চলে এলাম । মা বলল, ঘুড়িটা পুলাকে না দিলে চলছিল না । আমি চিৎকার করে বললাম, আমি দিইনি । তার মানে পুলা মিথ্যা কথা বলে ঘুড়িটা বাড়ী থেকে নিয়ে গেছে । আমি আর ভাবতে পারলাম না । আবার ছুটলাম মিতালি সংঘের ছাদে । দেখি পুলা দাঁড়িয়ে আছে । লাটাই গোটানো । তার মানে — । আমি পুলার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার আগেই পুলা বলল, তেরোটা কাটলাম তোর ঘুড়ি দিয়ে – তারপর একটা চাঁদিয়াল শালা কেটে দিল । আমি আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না । খালি বললাম, কোন দিকে কেটে গেছে বল । ও বলল, রেল লাইন পেরিয়ে গঙ্গার দিকে চলে গেছে । আমি আবার ছুটলাম । রেললাইন পেরিয়ে দক্ষিণ-পাড়া হয়ে গঙ্গার দিকে । ভেতর থেকে একটা কান্না উঠে আসছিল । চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছিল, ওরে লেলো রে । কিন্তু পারিনি । প্রাণপণে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছুটতে লাগলাম । অনেকবার পড়ে গিয়ে হাত পা ছড়ে গেল । আজ বুঝি, যে কোনও রকম বড় দুর্ঘটনা হতে পারতো ।

এখনও মিতালি সংঘের কাছে গেলে লেলোর কথা মনে পড়ে । আমি অনেকদিন পর্যন্ত পুলাকে ক্ষমা করতে পারিনি । এখন কিন্তু আমি ব্যাপারটা অন্যভাবে দেখি । পুলার সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হয়  । অত্যন্ত ভদ্রলোক – পাড়ায় গণ্যমান্য । এক মেয়ে নিয়ে সুখী সংসার । এই প্রান্ত বয়সে মনে হয়, পুলার মধ্যেই আমার ছেলেবেলার একটা রঙিন মুহূর্ত ক্যামেরা-বন্দী হয়ে আছে । যেমন ভাবে আমার একটা প্রিয় কলমের কথা বা একটা লেশ দেওয়া ফুটবলের কথা ভুলে গেছি তেমন ভাবেই হয়ত তলিয়ে যেত লেলো । পুলা আজও আমার লেলোকে বাঁচিয়ে রেখেছে – সেই সঙ্গে আমার ছেলেবেলাকেও ।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ