11 Jun

সহযাত্রী

লিখেছেন:কৌস্তভ দাশগুপ্ত


কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়াটা আজ সারাদিন ধরে একটানা বয়ে চলেছে। উত্তরদিক থেকে বয়ে আসা আত্মাকাঁপান হাওয়া একটা। বুধবারের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের থেকে ১ ডিগ্রি বেশি থাকতে থাকতে বৃহস্পতিবার একলাফে নেমে গেল দু ডিগ্রি নীচে! হাওয়াঅফিসের রিপোর্ট লোকের মুখে মুখে ঘুরছে। এ দিন কলকাতার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, স্বাভাবিকের থেকেও ৩ ডিগ্রি কম। পরের কটাদিন তাপমাত্রা এরকমই কম থাকবে বলে আবহবিদদের পূর্বাভাস।উপরি পাওনা, যে দিকেই তাকাও সেদিকেই ডানহাত বাঁহাত দেখতে না পাওয়া, কারখানার ধোঁয়ার মত ঘন কুয়াশা।হাওয়া তো দিচ্ছে এত, অথচ পুরো দিনটা ধরে এই মনের মাঝে একচিলতে দুঃখের মত কুয়াশাটা কাটার কিছুতেই নামগন্ধ নেই।নিজের চেনা মাঠে শীতের এমন সাবধানী ব্যাটিং-এ, অনেকেই সোয়েটার-টুপি তুলে রেখেছিলেন। হঠাৎই ঝোড়ো বাউণ্ডারি-ওভার বাউণ্ডারিতে, সেই সোয়েটার ফের বার করতে হয়েছে। ভোর থেকে কান-মাথা ঢাকতে হয়েছে টুপি-মাফলারে।

কোলকাতা থেকে কাজ সেরে বেরোতে বেরোতে অনেকটা রাত হল চরণের। কাজও কি আর কম কিছু থাকে!….একবার মেটিয়াবুরুজ, একবার হাতিবাগান, একবার বড়বাজার করতে করতে সারাদিনই শুধু ছুটে বেড়ানো, পাইকারদের কাছ থেকে মালপত্র কেনাকাটা করা…..ক্রেতার পছন্দসই জামা-কাপড় তোলার জন্য শুধু চক্কর কাটতে থাকা এদিক ওদিক। দুপুরবেলায় নিয়ে আসা দুইসতীন চালের ভাত জমে পাথর……সে পাথরকেই বেশ খানিকটা জলে ভিজিয়ে, গাঢ় বাদামীরঙা পাটালি গুড় দিয়ে….আবার কখনও মুসুরডাল সেদ্ধ দিয়ে পেটের মাঝখানে রেখে, কেটে যায় কারবারি দিনটা।এত শীতে, ঠাণ্ডা ভাত খেতে ইচ্ছে করে না…কিন্তু কি আর করা। “পেটের কাছে দিয়েছি বাঁধা জীবনসাধনা, সবাই শোনে কথা আমার, পেটই তো শোনে না!”…ভাতের হোটেলে গরম ভাত খাওয়ার কথা চরণ বাড়িতে বলেছিল একবার, কিন্তু রাস্তার  সস্তা হোটেলের খাবার, তেমন স্বাস্থ্যকর না হওয়ার কথা তুলে আপত্তি ওঠে। পুরো একটা দিন চলে গেলেও চরণের মনে হয় যেন, কত কাজ, কত কেনাকাটা বাকি থেকে গেল। কবে যে করা হবে! যদিও রোজ আসতে হয় না কোলকাতা।এমনিতে সপ্তাহে একদিন…বা পুজো, উৎসবের সময়ে খুব বেশী হলে দরকারে দু’দিন। শীতবস্ত্রর চাহিদা থাকে…সুতরাং, এখন দু’দিন করে আসতে হচ্ছে। তাছাড়া একখেপে অনেকটা মাল তুলতেও পারে না চরণ।ব্যবসা করতে গিয়ে অনেকের কাছে অনেক টাকা পাওনা রয়েছে।কেউ একেবারে যেচে দিয়ে যায়, কেউ আবার দিতেই চায় না।যদিও এতে খুব একটা আফসোস নেই চরণের।ভারী মায়া পড়ে গেছে কাজটার প্রতি। বহুবছর হয়ে গেলেও জামাকাপড়ের ব্যবসাটা ছেড়ে আজও অন্য কোন কাজ করতে পারেনি চরণ।সেই কত বছর আগে থেকে এ ব্যবসায় আসা। নিজের ও আশপাশের গ্রামের বহু পরিবারের সাথে সখ্যও হয়েছে বেশ।ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী খুচরো দামে লুঙ্গি, গামছা, শাড়ি, থ্রিপিস, জামাসহ যাবতীয় কাপড়চোপড় কেনাকাটার পর ট্রান্সপোর্টে বুক করে, পাইপয়সার হিসেব মিটিয়ে,ঘামের ফোঁটায় ভেজা পথ ধরে, হাজার মানুষের ভিড়ে একাকার হয়ে শিয়ালদা। নিজের আধোঘুমে থাকা স্টেশনে ফিরতে ফিরতে বেজে যায় রাত্তির সাড়ে দশটার কাছাকাছি। প্রায় দশ থেকে পনেরোটা স্টেশন ধরে, কোলকাতার মাটিতে জয়গান বা শোকগাথা লিখতে আসা আরও বহু মানুষের সঙ্গে নিজের একটা জায়গা তৈরী করার সংগ্রাম চালাতে চালাতে, শেষ পর্যন্ত একটা সিট পায় চরণ। ট্রেনযাত্রা যেন জীবনের চলারই সমনাম। অবিকল একরকম।

ট্রেন থেকে নেমে, হাঁফাতে হাঁফাতে প্ল্যাটফর্মের শেষপ্রান্তে জারুলতলার বেদীটায় বসে হা-ক্লান্ত চরণ জিরিয়ে নেয় একটু। গ্রীষ্মের স্টেশনে পাপড়ির নমনীয়তায়, দৃষ্টিনন্দন বেগুনীরঙা ফুলের শরীর নিয়ে, প্রকৃতিকে সুন্দরতর করে সাজিয়ে তোলে জারুলগাছটা।মানুষের জ্বরজারি হয়; সংসারের চিন্তায় জর্জরিত মানুষ অনিদ্রায় ভোগে, কখনও সাধারণ কাশি হয়, আবার কখনও অজীর্ণ রোগী হয়ে পড়ে। এখান থেকে ছাল, পাতা নিয়ে খেয়ে উপকার পায়।এখন শীতকাল…এই গাছের পাতা ঝরার দিন। নিরাভরণ শাখা-প্রশাখা আবারও পাতায় পাতায় সেজে উঠবে বসন্তের শেষভাগে। ওইসব দিনগুলোতে মাঝেমধ্যে শরীর এলিয়ে চরণ দেখতে পায়, রাতের তারাভরা আকাশ জেগে উঠেছে কখন।তার সংসারের কাজ, ব্যস্ততা আরম্ভ হয়ে গেছে বহুক্ষণ। বয়োজ্যেষ্ঠ ধ্রুবতারাকে কেন্দ্র করে সপ্তর্ষির ঘরবাড়ি….অরুন্ধতীর সঙ্গে বশিষ্ঠ সাংসারিক বাক্যালাপে মগ্ন…সবটুকু যাতায়াত ফেলে রেখে মানুষ যখন ঘুমের দেশে চলে যায়, তারাদের চলাচল শুরু হয়, ঘরকন্নার কাজে বসে তারারা সবাই…চরণের ছোট্টবেলার চেনা মানুষ সোনামিয়াঁ বলত।সোনামিয়াঁ নিজেই এখন হয়ত তারাদের ভিড়ে নিজের সংসার পেতেছে। এইসব ভাবে আর দেখে সে…. কিছু দূরের লাইটপোস্টটা থেকে, পেটে ছুরি খেয়ে মরে যাওয়া মানুষের শরীর যেমন, অনেকটা রক্ত বার করে আশপাশে রেখে দেয় চিহ্ন, তেমনই একটা আলোর ঘোলাটে ধারা চুঁইয়ে চুঁইয়ে জারুলতলা পর্যন্ত আসে। অন্ধকার দূর হয়না এতে…..আরও বরং ঘনীভূত হয়। স্টেশন লাগোয়া স্ট্যাণ্ডে সাইকেল রেখেই কোলকাতা যায় চরণ….ফিরতি পথে নিয়ে নেয়। তারপর স্ট্যাণ্ড থেকে সাইকেল নিয়ে নদী….শেষ ফেরিতে নদী পার হতে দশ মিনিট। আরও পনেরো মিনিট আলোআঁধারি মেঠো পথে, এপাশে মল্লিকদের বাঁশঝাড়, ওপাশে রায়দের তিনটে বিরাট পুকুর পেরিয়ে, সাইকেল চালিয়ে বাড়ি।সাইকেলস্ট্যাণ্ডের কাছে এসে অনেকসময়ই সুবলকে দেখতে পায় না।এইসময়টা আসলে, সুবলের তাস পেটানোর সময়। আসর থেকে হাঁকডাক করে তুলে নিয়ে আসতে হয়।

“এ্যাই সুবলা, আয় রে বাপ। শেষ খেয়াখানা আর পাব না।”

“আরে চরণদাদা, তুমি এদিকে এসো। একহাত খেলে যাও দিকি।”

“হ্যাঁ, সে না খেললে আর আমার পেটের কবরে শেষ পেরেকটা কে পুঁতবে বল।”

“আরে খাওয়ার চিন্তা কি করো দাদা!…তোমার জন্য ইস্পেশাল তরকা-রুটি আনিয়ে দিচ্ছি। চাও তো একটু ভাল জল, নরম নরম খোলামেলা উঁচুনিচু গা….কি দাদা?….চলবে তো, ছোট করে? বসো, বসো। খাটুনি গেল সারাদিন। একটু আয়েশ করো।”

খুব ফচকে সুবলাটা।লাজলজ্জা এক্কেবারে নেই। ইচ্ছে তো হয় বড্ড….তাই বলে কি সব ইচ্ছে পূরণ করতে হয়, নাকি, ফটাশ করে একটা কথা হাটের মাঝে ছেড়ে দিয়ে, বেলজ্জা হ্যা হ্যা করে হাসতে হয়! বিড়ি বার করে ফস করে দেশলাই জ্বেলে ধরিয়ে, কাঠিটা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে চরণ ব্যস্ত হয়ে বলতে থাকে,

“ছাড় বাবা, আমাকে ছাড়। গাড়িটা দে।আর ফকড়ামি করিস নে।”

-“এএএএএএ…দাদা!!… লজ্জায় তো পুরো লালুলালু!!…পারোও বটে”, সুবল হাসতে হাসতে উঠে পড়ে……

সাইকেলে প্যাডাল মারতে মারতে ফেরীঘাটের কাছে চলে এলে, চরণ অভ্যাসে থেমে পড়ে টিকিটঘরের কাছে। চলতে চলতেই ডান পা উঁচু করে আধঝুলো হয়ে, নিখুঁত ভারসাম্যে ঝুপ করে নেমে পড়ে কাউন্টারের সামনে। কবেকার এই ফেরীঘাট…কোনদিনই খুব একটা ব্যস্ত নয়। আগে টিকিট ছিল আট আনা। সেই সত্যযুগে। এখন ত্রেতা ছেড়ে দ্বাপর হয়ে কলিযুগে ঢুকে, প্যাসেঞ্জারভাড়া বেড়ে দু টাকা থেকে পাঁচ টাকা। সাইকেল বা গাড়ির ভাড়া আলাদা….আরও একটু বেশী। প্যাসেঞ্জার ভাড়াই নেয় ওরা….লোকটা চেনা খুব।নাগরিকজীবনের কর্মব্যস্ততায় সারাদিন ধরে লেপটে থাকা, ধেবড়ে যাওয়া মানুষগুলো, দিন শেষে এই দশ মিনিটের মশানডিহি বা রাঙ্গাচিতা ঘাট পর্যন্ত যাওয়ার মধ্যে দিয়ে, নিজেদের মেলে ধরতে পারে তবু একটু। ফেরীসার্ভিস চলে এপার থেকে ওপারের মশানডিহি হয়ে রাঙ্গাচিতা পর্যন্ত।মশানডিহিতেই নামে নব্বই শতাংশ প্যাসেঞ্জার। বাকিটা রাঙ্গাচিতার বরাদ্দ। সারাদিনে আপ ডাউন মিলিয়ে বেশ কয়েকবার নৌকার যাতায়াত। এপারে চারটে আর ওপারে পাঁচটা ফেরী। ছোট নদী। মাঝেমাঝে নাব্যতা সংকটের কারণে ফেরি চলাচল বন্ধ হয়ে যায় কিছু সময়ের জন্য। আবার নড়েচড়ে শুরু হয়। তবে পুরোপুরি বন্ধ কখনও হয়নি। হয়ত দিনের মধ্যে যে সময়টায় জল কম, তখন চলল না…জোয়ারের সময়ে কয়েকবার চলল। এই যেমন আজ সকালে… চারটে ফেরী আসা যাওয়ার পর থেকে সারাদিন এই মরণকুয়াশার জন্য নৌকা চলেনি, আবার সন্ধে থেকে চলেছে। যতদিন ধরে এই ছোট্ট ফেরীসার্ভিস শুরু হয়েছে, ঠিকঠাক কাজ হয়ত অনেকসময়েই হয়ে ওঠে নি….কিন্তু মানুষের মুখ কখনও ম্লান হয়নি।

এই নদী…নদীর ধার…নদীর বহতা স্রোত….বেশ কিছু পরিবারের প্রাণের সুরাহা করে।সাপ ধরা, সাপ খেলা,ঝাড়ঁফুক, মাছ শিকার করে জীবন কাটানো, ভাসমান নৌকায় ঘুরে চলা নদীর বন্ধু, বেদে সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের বাস এখানে।পোঁটলা-পুঁটলি নিয়ে গ্রামাঞ্চলে ঝাড়ঁফুক করে বেড়ায় ওরা। মশানডিহি, রাঙ্গাচিতাতেও আছে কয়েক ঘর। ওরা চরণের থেকে কাপড়ও কেনে। এবারের শীতেই তো বেশ কিছু কম্বল, সোয়েটার…গরমে জামা, বারমুডা…মাঝেমধ্যে ঘরোয়া শাড়ি, গেঞ্জি…এইসব টুকিটাকি কিনল। নৌকা ছাড়ার আগে ওদেরই এপারের একজন বাসিন্দা, গোলাম আলির সঙ্গে চরণ দুটো গল্প করছিল। বাঁশের সাঁকোয় দড়িবাঁধা গোটাকয়েক টিমটিমে বাল্বই যেটুকু আলো ছড়ায়। আর কোথাও কোন আলো নেই। মশানডিহিতে নেমে, চরণ কাঁচা সাঁকোর ধারকিনারে বসে কোন কোনদিন।নদীকে ভারী একা লাগে রাতে….তাকে সঙ্গ দিতে, তার কাছে একটু বসলই না হয়। কথা বলে নদীর দুঃখ হাল্কা করবে ভাবলই না হয়…যদিও ভারী সহজ নয় তাকে কাছে টেনে দুঃখ ভোলান।নদীর সঙ্গে একাত্ম হতে পারলে,তার যাত্রাপথের সাথী হতে পারলে, তার সঙ্গে মিশে যেতে পারলে তবেই জানা যায় নদীর ক্ষতর ইতিহাস, ব্যথার কথকতা। গাছপালা, সরীসৃপ, পলি মাটির গন্ধ, চেনা অচেনা ঢেউ, ভাঙ্গতে থাকা গড়তে থাকা তীরভূমি…কতজনই তো আত্মীয়ের মত পাশে আছে নদীর। তবু মাঝেমাঝে নদীর, তোমার সঙ্গও দরকার পড়ে। তবে এইসব নিষ্ফল সময়ের দীর্ঘশ্বাস ফেলে জমাট বাঁধা রাতগুলোতে, নদীর কাছে বসে থাকতে থাকতে চরণের মনে হয়, আসলে দরকারটা কার!…নদীর তাকে?…. নাকি নদীকেই তার!…..

জলের বুকে ভেসে চলা কুয়াশার স্তর ঘন হয়েছে বেশ। পাশের ক্ষেতগুলোর সদ্য কাটা ধানের সুঘ্রাণ আকাশে বাতাসে ভাসছে এখনও, ধুইয়ে দিয়ে যাচ্ছে শ্রান্তি। জলে ভেসে চলা এইসব সারিসারি কুয়াশাকে, কেমন যেন অপার্থিব লাগে চরণের। ঠিক যেন পরপারের নদীর বুকে বিদেহী প্রেতশরীর, এইসব আঁধারিয়া কুয়াশারা।সে পৃথিবীতে ঢুকতে গেলে ভয় জড়িয়ে ধরে।চেনা ঘাট থেকে বিশ তিরিশ হাত দূরের দৃশ্যও অচেনা। নৌকাটা যেখানে দাঁড় করান, সেখানে আলো আসছে না সাঁকো থেকে। অন্য আরএকটা খালি নৌকাকে দিব্যি আলোয় দাঁড় করিয়েছে। এ কি অন্যায়! আধিভৌতিক পরিবেশে, এই লোকভরা নৌকাটা যেন পীর-মুর্শীদ না পাওয়া রমতা সাধু। আত্মার মুক্তিপথ দেখাবার, দুনিয়ার দুঃখ থেকে নাজাত দেওয়ার শেষ সম্বল, পরপারের নাও।ফেরী অফিসার শেষ ঘন্টা বাজাতে চরণ উঠে পড়ল। নৌকা ছাড়বে এবার…….

 

 

সাঁকোতে গোলাম আলির সঙ্গে গল্প করার সময় থেকেই, চরণের চোখে পড়েছে, ছ’টা মানুষের একটা দল নৌকায় বসে আছে। চেনা লাগছে মুখগুলো কয়েকজনের…কিন্তু মনে করতে পারা যাচ্ছে না কোথায় দেখা হয়েছিল। হয়ত জামাকাপড় কিনতে এসেছিল কখনও। মশানডিহি বা আশপাশের গ্রামের লোক যে এরা নয় সে বিষয়ে সে নিশ্চিত। তবে কি রাঙ্গাচিতায় নামবে?…তাই হবে হয়ত। দুটো বৌ-মানুষও রয়েছে। এরা কীর্তনের দলটল হবে কি?…মনে মনে ভাবল চরণ। নাঃ, কীর্তনের দল নয় কোনমতেই। যেমন বাজনা থাকে সঙ্গে, ঝোলাপুঁটলি থাকে, গলায় তুলসীকাঠের মালা থাকে, রসকলি আঁকা থাকে নাক থেকে কপাল পর্যন্ত…তেমন কোন চিহ্নই এদের নেই। বরং জামাকাপড় বেশ জাঁকালো। যাকগে যাক!…যেখানে দু’চোখ যায় সেখানে যাক। গলুই-এর কাছাকাছি, একটা পছন্দমত জায়গা বেছে চরণ বসে পড়ল। এরা ছাড়া নৌকায় কেউ উঠল না আর। ক্যাঁচকোঁচ, ঠুংঠাং নানারকমের শব্দ করতে করতে নৌকা ছেড়ে বেশ কিছুটা এগোলে, সামনে থেকে ফেরীঘাটের আলোগুলোর চারপাশের অন্ধকার, সাঁকোয় ফেলে আসা গল্পগুলো, ওপারের সবরকম চলাচলকে হারিয়ে কে যেন কুয়াশার পর্দা টেনে দিল একটা।

চরণের সাইকেলটা যেখানে রাখা, সেখানেই ফেরীর নৌকায় আলো জ্বলে হাল্কা একটা।মোটরপাম্পের সঙ্গেই সেট করে দেওয়া থাকে আলোর লাইন। ভটভট করে ডিজেলের তীব্র গন্ধ ছেড়ে পাম্প চালু হলে, আলোখানা জ্বালান যায়। চরণ আবছায়া আলোতেই আড়ে চেয়ে দেখল।

ছ’জনের মধ্যে একজন ভারী মুশকো। তাকে দেখেই বেশ ষণ্ডচক্ষু ধাঁচের লাগছে। শুধু মুখ আর চেহারা দেখেই যদি ঠাসাঠাসি ভয় পেতে হয়, এই লোক একেবারে আদর্শ। যেমন পেটানো চেহারা, তেমনি রাগী মুখচোখের হাবভাব। এই লোকটার ডানপাশে বসা সবুজ জামা পরা লোকটা, যেমন সিড়িঙ্গে রোগা তেমনই তেঢ্যাং লম্বা। লোকটার চোখেমুখে বজ্জাতির ছাপ স্পষ্ট। এই লোকটা কখনও কারও উপকার চেয়েছে বলে মনে হল না চরণের। মানুষের ক্ষতি হলেই যেন তার আনন্দ, তার উল্লাস এমন একটা দৃষ্টি তার চোখে। এদের থেকে কিছুটা দূরে, যেন ছোঁয়া লাগলে জাত চলে যাবে এমন একটা ব্যাজার মুখ করে, আরও একজন বসে আছে। বাকীরা নিজেদের মধ্যে দু একটা কথা বললেও, এই লোকটা বড্ড চুপচাপ। তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে বাকীদের দেখে নিয়ে, বাইরের কুয়াশার দিকে তাকিয়ে থাকছে। তবে সবুজ জামার মত ধূর্ত, বা ক্ষতিকারক, এদের দুজনকেই মনে হচ্ছে না।

দুজন বৌমানুষ পাশাপাশি বসে আছে। ঘোমটা ঢাকা দুজনেরই মুখ ভালভাবে দেখা না গেলেও, এরা যে বড়লোকদের বাড়ির বৌ, সেটা সাজগোজের ধরণ বা কাপড় দেখেই পরিষ্কার। এই দুজন মহিলার সঙ্গেই বসে থাকা নাদুসনুদুস মোটাসোটা লম্বাচওড়া লোকটার মুখখানা ভারী আহাদি গোছের।দেঁতো হাসি একখানা ঝুলিয়ে রাখাই আছে ঠোঁটের দোরগোড়ায়। মাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে।এদের সকলেরই, সযত্নে লালিত চকচকে মুখগুলো, ঠিক গ্রামের লোকের মত না। সবাই বেশ শৌখিন লোক দেখা যাচ্ছে!..নৌকায় চড়া ইস্তক, এরা প্রাণমন এক করে চরণকে দেখছে।অন্ধকার যেন নৌকাটাকে দুই বাহুপাশে জড়িয়ে, আজন্মকাল শুয়ে। একটা আবছায়া অস্তিত্ব…শুধুমাত্র অন্ধকারে মিশে না যাওয়া কিনারটুকু ছাড়া, নৌকা আছে বলে মনেই হচ্ছে না চরণের। এ যেন আজন্মকালের জীবন-মৃত্যুর পৃথিবী ছেড়ে, মহাপৃথিবীর খোঁজে ভেসে চলা।কোথাও শব্দ নেই নৈঃশব্দ্যর অতিথিশালায়। কে যেন ধীরে ধীরে আলতো করে চরণের পাশে এসে বসল….

-“দাদার কাছে আগুন হবে নাকি একটু…..!”

আহ্লাদী গলায় পাশে এসে বসা মোটা লোকটা চরণকে জিজ্ঞাসা করছে। কোন উত্তর না দিয়ে, চরণ বুকপকেট থেকে দেশলাইটা বার করে দিল। একখানা লম্বা নলের মত কি যেন, বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে ধরিয়ে, দুটো কাঠি খরচা করে লোকটা দেশলাইখানা ফেরত দিল। এটা কি ধরাল রে বাবা! চরণ কৌতূহল চাপতে না পেরে জিজ্ঞাসাই করে ফেলল,

-“এইখানা কি টানা হচ্ছে শুনি?”

একটু যেন অবাকই হল লোকটা। হাতের বস্তুটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নিজেই ভাল করে একবার দেখে নিয়ে বলল-“এই আমার হাতেরটা?…ওহহো, এটা হল গিয়ে পাইপ।এটা দিয়ে তামাক খাই।আমার হাতেরটার নাম প্রিন্স পাইপ। তামাক সেবন করা হয় দাদার?”

-“অবশ্যই হয়…নাহলে আর আগুন দিতে পারলাম কিকরে।”

-“সত্যিই তো, সত্যিই তো। এটা তো ভাবিনি একবার। ভাবা উচিত ছিল। তাহলে আসুন না একটু, ছই এর নীচে। দাদাকেও একপক্কড় সাজিয়ে দিই। আরও আছে আমার কাছে।টানাও হবে, জানাও হবে।এই ঠাণ্ডায় বাইরে বসে আছেন…অসুখ করবে যে।আসুন আসুন, ভিতরে আসুন।”

এমন কেতাদুরস্ত ধোঁয়া গেলার বস্তু চরণ তার নিজের জন্মে তো দূর অস্ত, গত হওয়া দুই পুরুষদের জন্মেও দেখেনি।অভ্যর্থনা করতে করতে চরণকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে, ঘোমটা ঢাকা বৌমানুষ দুটোর একজনের পাশে বসতে দিয়ে, লোকটা নিজে চরণের সামনে বসল। তারপর আপন মনে হাসিহাসি মুখ নিয়ে, ঝোলার ভেতর থেকে আরও বেশী একটা জাঁদরেল, বাঁকানো যন্তর বার করে সেটার মুখে একটা জবরদস্ত ফুঁ দিয়ে বলল, “দাদাকে রোডেসিয়ান পাইপে দিই। নিজেকে বেশ রাজামশাই রাজামশাই লাগবে…সঙ্গে বসওয়েল কান্ট্রিসাইড তামাক। এই কুয়াশাভরা রাত…খুব জমে যাবে…জমে ক্ষীর হয়ে যাবে।” কিছুক্ষণ ধরে যন্তরটায় পাতা ভরে বলল, “নিন দাদা, এই যে, এইভাবে মুখে ধরুন। হাতটা এই যে…এইখানে এরকম করে, হ্যাঁ…একদম ঠিক।এখানটা মুখে রাখুন। দাঁড়ান, ধরিয়ে দিই। দিন, আগুনটা দিন।”

চরণের দেশলাইটা নিয়ে পাতাগুলোয় ধিকিধিকি আগুন ধরিয়ে দিয়ে লোকটা অতি উৎসাহে দাঁড়িয়ে পড়ে হাত কচলাতে কচলাতে ঝকঝকে চোখে বলল, “নিন, এবার আস্তে আস্তে টানুন দেখি। মৌতাত কেমন লাগছে শুধু বলুন।”

মুখের ভেতরে একটা অদ্ভুত মিষ্টি স্বাদ ছড়িয়ে পড়ছে চরণের। মনটা আস্তে আস্তে কেমন ফুরফুরে হয়ে যাচ্ছে। বহুদূর থেকে কি যেন একটা অপূর্ব সুর তার কানে ভেসে আসছে।সব মিলিয়ে এক নৈসর্গিক অনুভব।সুখের সঙ্গে সোঁদা মাটির গন্ধ মিশে গেছে সে অনুভবে। চরণ বিশেষ কিছু বলতে পারল না…অত সাজিয়ে গুছিয়ে কথা আসে না তার…তৃপ্তিতে যেন চোখ বুজে আসছে।

-“কি!…ভাল লাগছে তো?…হুঁ হুঁ, জানতাম। এ ভালো না লেগে যাবে কোথায়।”

চরণ সুখের ছোঁয়াটা একটু সামলে উঠে জিজ্ঞাসা করল, “আপনাদের পরিচয় কি?…কোথায় যাচ্ছেন?…আসছেনই বা কোথা থেকে?”

লোকটা উত্তর না দিয়ে, চুপ করে কিছুক্ষণ চরণের দিকে তাকিয়ে থেকে, পিছন ঘুরে অন্ধকারের দিকে চেয়ে রইল। নদী যেন নিভৃতচারিণীর অভিসারের পথ। শুধু নৌকার একঘেয়ে পাম্পের শব্দটা ছাড়া কোথাও কোন শব্দ নেই, কোন প্রত্যাশা নেই। চরণ শুনতে পেল, লোকটা আনমনে গাইছে,”কারে দিব দোষ, নাহি পরের দোষ…মনের দোষে আমি পলাম রে ফেরে….আমার মন যদি বুঝিত, লোভের দেশ ছাড়িত….লয়ে যেত আমায় বিরজা পারে…..”।গাইতে গাইতে চুপ করে যাচ্ছে, আনমনে তাকাচ্ছে অন্ধকারে, আবার একটু গাইছে। হঠাৎই চরণের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, খুব নাটকীয়ভাবে লোকটা জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো….আপনার মতামতটা শোনা খুব দরকার। আচ্ছা, ধরুন…এই যে যাচ্ছেন ভাসতে ভাসতে…খানিক বাদেই নেমেও যাবেন মশানডিহিতে…..তা এইরকম যেতে যেতে, ধরুন, আপনাকে বলা হল নদীর সঙ্গী হতে। মানে…..সঙ্গী হতে আপনাকে হচ্ছেই। না হলে কোন উপায় নেই। হয় স্থল বাছো, নয়ত নদীকে। তবে শুধুশুধু নয়…আপনি যা চান তাই আপনাকে দেওয়া হবে। ভরিয়ে দেওয়া হবে আনন্দে। খুব ভেবে বলুন তো, এইরকম অবস্থায় আপনি কাকে বাছবেন?”

-“ধুর মশায়!!..কি যে বলেন!….বাড়ি বাড়ি। ওর থেকে বেশী শান্তি আর কোথাও আছে নাকি!!”

-“কিন্তু আপনি তো নদীর পাড়ে বসে তার সঙ্গে আসঙ্গলিপ্সার, তার দুঃখের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার কথা ভাবেন, বলুন। ভাবেন না?”

-“তা ভাবি মাঝেমাঝে। কিন্তু সে তো এমনিই…মানে, খেয়ালে ভাবি…তেমন গুরুত্ব দিয়ে কিছু নয়।”

-“ধরুন, এই চিন্তা সত্যিই যদি হয়। আর পরিবর্তে যদি অনেক অনেক কিছু পেয়ে যান, ভেসে যাওয়ার জন্য…তাহলে কি আপনি ভেসে যাবেন?”

চরণের মাথায় কিছুই ঢুকছে না। ঘাটটা এলে বাঁচে সে। এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়া গেল!

হঠাৎই লোকটা উঠে পড়ল চরণের পাশ থেকে…….যে পুঁটলিটা খুলে পাইপের তামাক বার করেছিল,হাত ডুবিয়ে সেখান থেকে বার করে আনল, একরাশ ধোঁয়ার মত কি যেন। ধোঁয়াটা দু’হাতে ধরে চরণের বুকের কাছে নিয়ে আসতেই, সেটা তার মধ্যে ঢুকে একটা ইচ্ছের জন্ম দিতে লাগল….একটা খুব অদম্য ইচ্ছে….নিজের মধ্যে নিজেই আশ্চর্য হয়ে উঠল চরণ….এমন নারীসঙ্গ করার ইচ্ছা কখনও জাগেনি তার শরীরে….নিজের শরীরের গভীরে, মনের গভীরে, চরণ উত্থান অনুভব করল…

হতাশ পৃথিবীর এমন হতাশ এক নদী ধরে নৌকা চলেছে, যেন সেখানে কোন আনন্দ কখনও ছিল না। এমন একটা পঙ্গু পরিবেশ, যার ছোঁয়া গায়ে লেগে গেলে পাঁক থিকথিকে স্থিতি ছেঁকে ধরে। চরণ বারবার শরীরের মায়ামোহ ভরা অংশটিতে হাত রেখে, আনন্দ উল্লাসের বহিঃপ্রকাশকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেও, ঠিক যেন পেরে উঠছে না। ধোঁয়াটা যেন ভেতরে ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটাতে চেষ্টা করছে।আর ঠিক সেই সময়ের মধ্যে নৌকায় কিছু আলাদা আলাদা ঘটনাও ঘটে চলেছে। এদের দলের সবুজ জামা পরা রোগামত যে লোকটা, সে ভয়ঙ্করদর্শন রাগী ধরণের লোকটা ও তার পাশের গম্ভীর লোকটার কাছে বসে, তাদের কিসব আজেবাজে পরামর্শ দিয়ে, কান ভাঙ্গাবার চেষ্টা করছে চরণের বিরুদ্ধে। লোকটার চাহনি যেন বিষধর সাপের মত! ওর কথার মধ্যে কি ভীষণ জ্বলন, কি গভীর তঞ্চকতা!….হিসহিসে গলায়, বিষ ঢেলে চলেছে ওদের মনে,

-“দেখেছ তো?…আমি কি বলেছিলাম তোমাদের?…মিলল তো আমার কথা! ও প্রথম থেকে লেগে পড়বে দলভারী করতে। তুমি প্রিয়তমাকে কোনদিন পাবে না এটা জেনে রেখো। গরীবের কথা বাসি হলে ফলে। কি তোমরা!…কি ছিলে আর কি হয়েছ?….আমার তো মনে হয় মাঝেমধ্যে, মরে গেছে তোমাদের ভেতরটা।এত জলের মধ্যে থেকে থেকে তোমাদের আগুনটাই নিভে গেছে যেন। লোকটার দিকে খেয়াল করো। ওর লিঙ্গের মধ্যে পশু জাগছে কিন্তু। তোমরা বলো, তোমরা নাকি ভালবাস ওকে…অথচ এই লোকটা, এই উড়ে এসে জুড়ে বসা আধবুড়ো লোকটা, এখনই তোমাদের সামনে ওর সঙ্গে শোবে….এখনই ওরা ওকে জড়াবে, নিজেদের মেলে দেবে।কিন্তু তোমাদের তো মনে হবে না কিছুই? জেনে রেখো, হিংসা ছাড়া ভালবাসার মধ্যে আর কিছু নেই। তোমাদের হিংসাটাই মরে গেছে।তোমরা ধরেই নিয়েছ, ওকে তোমরা পাবে না।”

কথাগুলো শুনতে শুনতে, ভয়ঙ্করতম দেখতে লোকটা, সবুজ জামার ঘাড়টা ধরে খানিকক্ষণ জোরে ঝাঁকি দিলে, সবুজ জামা কাতরে আর্তনাদ করে উঠল। লোকটা রাগে ফুটছে।

-“তাই নাকি রে কুত্তা!…রাগটা মরে গেছে না!…দেখবি? তোর পেছনের গর্তে ফুটন্ত রাগটা বেশ করে ঢেলে মুখটা আটকে দেব, দেখবি?…ভেতরে বেশ টগবগ করে ফুটবে দেখবি?”

সবুজ জামার অবস্থা এখন শোচনীয়। চোখটা ঠেলে বেরিয়ে আসছে, জিভ বেরিয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, লোকটাকে বাঁচাতে চরণের একটুও ইচ্ছে করছে না। সঙ্গের লোকটাও সে চেষ্টায় একেবারেই উৎসাহী নয় দেখা যাচ্ছে। এদের দুজনের থেকে সামান্য সরে বসে, লোকটা বড় তাচ্ছিল্যের সঙ্গে, ঘৃণার সঙ্গে সবুজ জামার করুণ অবস্থাটা উপভোগ করে চলেছে।

অন্যদিকে আর একটা ঘটনা নৌকার মধ্যে জালবিস্তার করে চলেছে। বৌমানুষ দুজনের একজন, চরণের সঙ্গে আলাপ করা লোকটাকে জড়িয়ে ধরে বসেছে এমন, যেন তার আর এই পৃথিবীর কোথাও কেউ নেই, কিছু নেই। আদিগন্ত শূন্যতার মাঝে, জলের মাঝে সে যেন তার প্রাণপ্রিয় শেষ সম্বলটুকু, আঁকড়ে ধরে বসে আছে, শেষ স্থলভূমিটুকু দখল করে বসে আছে। এই নশ্বর মানবদেহই যেন তার গৃহকোণ, সংসারের সারাৎসার। মিলনই যেন তার জন্মের একমাত্র লক্ষ্য। লোকটা কিন্তু তাকে তত কিছু গুরুত্ব দিচ্ছে না। তার সব মনযোগ অন্য নারীটির দিকে। এই নারীর কথাবার্তায় যেন আলোর ঝলক। গলার স্বর যেন বাজিকরের যাদুকাঠি। অপরজন যেমন অসহায়ের মত, পরজীবীর মত লোকটিকে জড়িয়ে আছে…এই নারী তার ঠিক বিপরীত চরিত্রের। গলার স্বরে আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তার নিজস্ব শক্তিশালী স্থান আছে। এদের দুজনের কথোপকথন অনেকটা এরকম শুনল চরণঃ

-“হাটের মাঝে অন্যলোকের চোখের সামনে ছেনালটাকে জড়িয়ে ধরে বসে আছ কেন, শুনি!!…লাজলজ্জার মাথা কি সব খেয়েছ নাকি!”

-“ভুল বলছ কামিনী। আমি নয়, ও-ই আমাকে সেই কবে থেকে জড়িয়ে বসে আছে। ভালো করে দেখো।”

-“যা দেখার আমি দেখতেই পাচ্ছি। সবার সামনেই তো হচ্ছে যা হওয়ার। একজনের সবকিছু নেচে নেচে উঠছে মাথার ওপরে…দেখো দেখো, হায়ালজ্জাও নেই!….আর একজন হলে তুমি, সুঁড়ির সাক্ষী মাতাল। ওরে ও মেয়ে, তোদের জড়াজড়ি দেখে যে নতুনমানুষের তুলোর ভালুকটা ঘুম ভেঙ্গে, উঠে দাঁড়িয়েছে রে! আমার মৌচাক ছেড়ে ভালুকটা অন্য কিছু খুঁজতে চলে যাবে না তো!”–বলে ঘোমটা কিছুটা সরিয়ে চরণের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতভরা হাসি হাসল সেই নারী। ঘোমটার আড়ালে যে এমন দুপুরের গনগনে সূর্যের মত রূপের আগুন লুকিয়ে, চরণ কল্পনা করতেও পারেনি। উদ্ধত মুখশ্রীর মধ্যে নারীর চোখদুটিতে, কত জন্মের প্রাচীন ক্ষুধা আঁচল পেতে বসে আছে।মোটা লোকটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নজর করল তার চোখের চাহনি। যেন ভারী আমোদ হয়েছে, এমন স্বরে বলে উঠল,

-“তোমাকে ছেড়ে আর যাবো কোথায় গো সুন্দরী! গেলেই তো সন্ধের আলোয় ডুবে যাওয়া উদাসী উঠোন।”

-“যাবেই না যখন, তাহলে এবার বলো তো নাগর…আমাকে কখন ভরাবে?…এই দীনদুনিয়ার নিষ্ঠুর মার যে আর সহ্য হয়না গো।এসো, অঙ্গজ্বালা জুড়োও একটু।”

-“তোমার মন ভরাই এমন সাধ্য আমার এই ছোট দুটি তালুর কোথায় গো রাণী!…তোমার অসীম জ্বালা জুড়োয়, তেমন জলই বা পাই কোথা!”

-“এমনি করে বোলো না গো নাগর…পাপ লাগে।”

-“সত্যি বলছি। আমার সবকিছু কেড়ে নিয়ে এই জোঁকের মত ছেনাল মাগীটা ফতুর করে রেখে দিয়েছে। দেখছ না?….এখন কিছুই তো আর পায় না এই শরীরঘরে, তাও বিসর্জন হয়ে যাওয়া খাঁচাটার পিছুটান ছাড়তে পারেনা। পরবাসী মোহিনী মাগীটার মন বড় উচাটন। তোমাকে যদি কেউ সুখ দিতে পারে, উজাড় করে দিতে পারে কেউ যদি উজানভাটার আসা যাওয়া, তাহলে সে আর কেউ নয়…. আমাদের নতুন মানুষ।”

আবারও অন্তর্দাহী তীব্র দৃষ্টি তুলে চরণের দিকে তাকাল নারীটি। এখন তার দু’চোখ ভরা কামজড়ানিয়া কৌতুক। এই দুটি চোখ ভালবেসেছিল কি কখনও অন্য কোন চোখকে?….কখনও কি ভালবাসতে পারে এই দুই ছলনাময়ী চোখের আড়ালে থাকা মোহময়ী, কাঞ্চনসম্ভূতা নারীদেহটির আত্মা!!…বিশ্বাস হয়না ঠিক। চরণ চোখ রাখতেও পারছে না, আবার সরিয়ে নিতেও পারছে না। একসমুদ্র চাওয়া নিয়ে আদরদেহ নারীটি চরণের গলা জড়িয়ে আশরীর সমর্পণ নিয়ে তার কোলে এসে বসল।তাহলে কি সবুজ জামার কথা সত্যিই ফলে যাচ্ছে! বহুকালের বিবাহিত সে….অথচ এই প্রথমবার, অন্য নারীশরীর পাওয়ার আকুতি, ছটফটানি চরণকে রাহুগ্রাস করে নিচ্ছে। কিছু করতে পারছে না সহায়হীন সম্বলহীন চরণ।আঁকড়ে ধরা নারীশরীরের চুম্বনে উত্তাপে পুড়ে যেতে যেতে, গলে যেতে যেতে, ভালবাসার শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছতে পৌঁছতে চরণ শুনতে পেল…

“সুস্বাগতম বন্ধু। আলেয়া-রিপুর পৃথিবীতে, চির আঁধারের অশেষ নদীতে, দিনের শেষ খেয়ায় সুস্বাগতম। নাও-মাঝি উল্লাস-দরজা খুলে দিয়েছে। কি ভাল যে বাসব তোমাকে আমরা, ভাষায় ব্যখ্যা করি কি করে!…কাম-নারী জড়িয়ে ধরুক তোমার শুক্রকীটের অন্তঃস্থলে জন্ম নেওয়া পরিতৃপ্তির স্বাদকোরক….মোহ-নারী জুড়ে থাকুক তোমার লোভ তৃপ্ত হওয়ার শিকড়বাকড়…আমি লোভপুরুষ, নিজে প্রশ্রয় দেব তোমার ইচ্ছেপূরণের যত অবকাশ, তাদের সকল অন্তরতমকে….হে মদ! বাড়িয়ে তোলো আত্মগর্ব, যাতে নারীসঙ্গমকালে চরণের কামনালিপ্ত জিভ বারংবার উচ্চারণ করতে পারে, “আমিই শ্রেষ্ঠ, শ্রেষ্ঠতম”….আর এতকিছুর পরেও তোমার, আমার, আমাদের সকলের মাৎসর্য জাগিয়ে দিক ঈর্ষা, যার জঠরদেশ জন্ম দিক ভয়াবহ ক্রোধ!….সকল আনন্দরতি শেষে, ক্রোধপুরুষ তোমার ব্যর্থ আত্মার ভক্ষক হয়ে উঠুক আজ। হে চরণ, মনে রেখো চিরকাল, লোভে পাপ -পাপে মৃত্যু….লোভে পাপ -পাপে মৃত্যু….লোভে পাপ -পাপে মৃত্যু…..লোভে পাপ পাপে……”। ভয়ের আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখল চরণ, সবুজ জামা মাৎসর্যপুরুষ কুৎসিততম, ক্ষয়ের আনন্দে আনন্দিত হাসি হাসছে নেচে নেচে….নৌকায় যারা আছে সকলেই হাসছে….মোটাসোটা লোভপুরুষটির হাসি; সব পাওয়ার আনন্দ পেলে মানুষ যেমন অট্টহাসি হাসে, ঠিক তেমনই…..তাকে জড়িয়ে ধরা পরজীবী মোহ-নারীটির ঠোঁটে যান্ত্রিক হাসি….গর্বিত, অহংসমৃদ্ধ মদপুরুষ তার দিকে আড়ে চেয়ে হাসছে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে…কামের দিগন্তজুড়ে চরণের ছড়িয়ে দেওয়া, তরল জন্মদিন পালন করতে করতে কাম-নারীটিও সারা শরীর জুড়ে হাসছে ঝরণা হাসি।সবাই প্রাণখোলা হাসছে….শুধু ভয়ংকরদর্শন ক্রোধপুরুষ ছাড়া। সে কখন যেন উঠে দাঁড়িয়েছে। হত্যার উত্তেজনায় দৃঢ়চিত্ত ক্রোধপুরুষ, দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে চরণের দিকে। এত হাসি, এত বিলাসের মাঝখান থেকে চরণকে পাঁজাকোলা করে তুলে, বড় অশ্রদ্ধায়, ঘৃণায় সে ছুঁড়ে ফেলে দিল নৌকার বাইরে…..ভিক্ষারত নদী ও কুয়াশা গ্রহণ করল তার টালমাটাল দেহখানি,বড় সহজ কাছে আসার ভঙ্গিমাখানি….শ্বাসরুদ্ধ হতে হতে, ডুবতে ডুবতে, জলের অতল মায়ার আবরণে জড়াতে জড়াতে কোথাও সে চিরচেনা মশানডিহির ঘাট পেল না, রাঙাচিতার ঘাট পেল না….শেষ খেয়া মিলিয়ে যাচ্ছে দূরে….আরও দূরে…..বহুদূরে….সময়ের বরফ ভাঙা অনেকখানি জল, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত পার করে, তাকে ভালবাসার বাঁধনে আপন করে নিল…

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ