31 Jul

উল্টো রথ

লিখেছেন:অভিষেক ঘোষ


(১)

অতুলের বস্তির লোক অতুলকে ‘ওতুল’ বলেই ডাকে । আপত্তির যথেষ্ট কারণ থাকলেও অতুলের কুড়ি ইঞ্চির শুকনো বুকে এত বাতাস আঁটে না, যাতে প্রতিবাদ করা যায় । তার ওপর ঈশ্বরের দেওয়া মুফতের জল-হাওয়া-টুকুও তাকে গত পাঁচবছর ধরে ভাগ করে নিতে হচ্ছে আরেকজনের সাথে। হ্যাঁ অতুল বিয়ে করেছিল, কিন্তু তার বউ শ্যামা মারা গেছে । রয়েছে ছেলেটা — অপু । তা নাম নিয়ে এই আদিখ্যেতা বস্তির লোকেদের ঠাট্টার কারণ হলেও অতুলের কিছু করার নেই — অতুল কিন্তু ক্লাস ফোর পাস । চাষবাস না থাকলেও চাষী যেমন স্বভাবে চাষীই থাকে, অতুলও তেমনি । পুরা কালে হেড মাস্টার প্রণব বাবু তাকে বলেছিলেন, “মন দিয়ে পড়িস বাপ্ ! তোর একটু খাটলেই হবে !”

অতুলের পাশে দাঁড়িয়ে তার সত্যিকারের বাপ দেঁতো হাসি হেসে বলেছিল, “কি যে বলেন কত্তা ! গরীবের আবার নেকাপড়া !”

কিন্তু অতুল হাল ছাড়ে নি । আজ তিনদিন হল অতুলের ছেলে-টা পাড়ার নার্সারি-তে যাচ্ছে । কেউ ভাবতে পেরেছিল ? হুঁ হুঁ বাবা ! শিক্ষা । শিক্ষা হল আসল জিনিস্ । শালা কেউ বলুক দেকি এবার, ‘অশিক্ষিত’ ! বাল্ ।

অন্ধকার ঘনিয়ে আসার মুখে অতুল ছেলেটাকে তার ঠেলাগাড়ি-তে তোলে । ব্যাপারটা অবাক করার মত । এই ঠেলাগাড়ি-টাই অতুলের ক্যারাভ্যান — ঘরবাড়ি । অপু ওর ওপরেই ঘুমায় । একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড মশারি সে কোনোমতে পঞ্চাশ টাকায় কিনেছে পার্ক সার্কাস থেকে । ছেঁড়াগুলো শ্যামা সেলাই করে দিয়েছিল — তারপরেই তো ছেঁড়া হৃদয় নিয়ে বউ-টা মরে গেল । এদিকে সরকারী হাসপাতাল লাগোয়া ড্রেনের মুখে শোয় বলে ভারী মশা কামড়ায় – তা ঐভাবেই চলছে । সে খায় মশার কামড় আর ছেলেটা শোয় মশারি-তে । কিন্তু কে জানতো যে নার্সারি-তে ভর্তির তিনদিনের মাথায় ছেলে এমন জ্বরে পড়বে । শালা কোত্থেকে মশার বাচ্চা ঢুকলো কে জানে ! পেটে নেই ভাত, তার ওপর এতো সমস্যা ! জগন্নাথের মত ঠুঁটো ছেলেটা মশারির মধ্যে নেতিয়ে পড়ে আছে ।

অতুল ডাকে, “ও বাপ্ ওঠ একবার !”

অপু সাড়া দেয় না । অতুলের রথের রশি মাড়িয়ে চলে যায় বাবুদের সুসজ্জিত গাড়ি — রথ যাত্রা আজ । “কচি কচি খোকা-খুকিরা বাপ-কাকাদের সাথে শখ মেটাতে বেইরেচে । বাপ্ সুস্থ থাকলে দেখতো” — অতুল আনমনে ধোঁয়াটে মশারির দিকে তাকিয়ে বলে, কিন্তু বাপ্ ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে ।

অতুল ছোটে হাসপাতালে । ছাতের মুখে ছাতি হাতে, সবসময় বসে থাকে শ্রীদাম দা । হেব্বি অলস । খালি কথায় কথায় বলে, ‘অতুলনীয়’ । কিন্তু অতুলকে কখনোই বলে না । অনুপ্রাসের আশেপাশে ঘেঁষতে চায় না বলেই হয়তো — ।

এই শ্রীদাম দা-র সাথে ওর যোগাযোগ অপু-র জন্মের সময় । শ্যামার রুগ্ন শরীরের রক্ত-জারিত দুধ টানতে টানতে সদ্যোজাত শিশুটি এতটুকু নড়াচড়া করছে না দেখে সে সন্দেহের চোখে শ্যামার দিকে তাকিয়েছিল । কিন্তু শ্যামা তখুনি তার সজল চোখ নামিয়ে নিয়েছিল । মৃদু স্বরে বলেছিল, “খোকা কথা বলবে নে । হাত-পা-ও চলবে নে । ডাগতারে কয়, কঠিন রোগ — পেরালিজ্ না কি !” তারপর খোকা বাড়ে, কিন্তু হাত-পায়ের বিকাশ হয় না । পেট-টা ফুলে ওঠে শুধু । খালি খাই খাই করে কিন্তু খেতে পারে না । বমি হয়ে যায় । অবসন্ন নিঝুম হয়ে এতকাল ঐ মশারির মধ্যেই সে কাটিয়েছে । শ্রীদাম দা শুরুতে অনেক করেছিল । ডাক্তার দেখানো, ওষুধ-ইঞ্জেকশান — এসবের জন্য ভাবতে হয় নি তখন । কিন্তু মানুষের মহত্ত্বেরও তো একটা সীমা থাকে । অতুলের চোখের দিকে চেয়ে একদিন তীব্র হতাশায় বলেছিল, “হবে না রে কিছু, অনেক তো চেষ্টা করা গেল । অপুষ্টি । ভালো খাদ্য না পেলে বাঁচবে না বোধহয় !”

আশ্চর্য এই যে এরপর অতুল শুধু স্বপ্ন দেখতো, অপু লেখাপড়া শিখবে । তার বিশ্বাস ছিল, একমাত্র লেখাপড়া শিখলেই ওই অশক্ত শরীরে দুর্বল হাত-পায়ে শক্তি সঞ্চারিত হবে । যেমন রিক্ত গাছের শূন্য ডালে ফের পাতা গজায়, তেমনি ওর ছেলেটাও নিশ্চই – ।

আর এভাবেই অপু একদিন তিন বছরে পা দেয় । আশপাশে অনেকেই অপু-কে দেখতে আসতো । সামান্য সামর্থ্যে যে যার মতো ফল-মূল দিয়ে যেত । শ্রীদাম দা-ও আগে আগে আসতো । কিন্তু ইদানিং আর আসে না । শুধু যেদিন অপু-কে সে কোলে করে রাস্তার ধারের নার্সারি-তে ভর্তি করে দিয়ে এলো, সেদিন সে নার্সারির দেওয়াল-লাগোয়া বেঞ্চে অপুকে ঠেস্ দিয়ে বসিয়েই ছুটে গিয়েছিল শ্রীদাম দা-কে খবরটা জানাতে, আনন্দ-টা ভাগ করে নিতে । শ্রীদাম দা ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে হাল্কা হেসে বলতে যাচ্ছিল, “অতুলনীয়” — কিন্তু ‘অতু -’ অব্দি বলে থেমে গিয়ে শুধু গলা খাঁকারি দিয়েছিল ।

আজ আবার অতুল-কে শ্রীদাম দা-র দ্বারস্থ হতে হল । সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে কাঁচুমাচু মুখে বলতে হল, “জ্বর যে সারচে না গো !”

শ্রীদাম দা বিরক্ত মুখে বলল, “আমি কি করবো বল্ দেখি ? আমার কি টাকার গাছ আছে ?”

“বলচি, একটু চাইল্ড স্পেসালিট-কে বলো না গো !”

অতুলের মুখের উপর চোখ বুলিয়ে শ্রীদাম বুঝে নিতে চায়, কীভাবে এই ছেলেটা তার ঐ বঞ্চিত বুকে এখনো স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে পারে ! মুখে বলে, “আরে কিছু হবে না রে — কোনো লাভ নেই – আগেই বলেছিলাম — ঐ শরীরে আবার স্কুলে দিয়ে এলি ! ঐ মাথায় বিদ্যের ভার সয় ?”

অতুল মাথা নাড়ে । বোঝে, কিছু হবে না এখানে । তারপর ঠেলাগাড়ি ঠেলে ঠেলে কলকাতার রাস্তায় হাজারো গাড়ি-ঘোড়া আর সুসজ্জিত রথের সাথে চলতে চলতে পৌঁছে যায় হসপিটালে — ওর অপুর আঁতুড় ঘরে । যে মাসি অর্থাৎ নার্স-টি শ্যামাকে শেষ দিন অবধি দেখেছিল, সেই বলে-কয়ে সরকারী হসপিটালের একটা বারান্দায় ব্যবস্থা করে দেয় অপুর, ঐ ঠেলাগাড়িতেই । ছেলেটা কথা খুব কম বলে । অতুল গল্প বলে । ও শোনে আর থেকে থেকে শুধু বলে ওঠে, “বাবা !” যেন ঐ ডাক-টুকু দিয়ে একটা অন্ধকার স্রোতে ভাসতে ভাসতে সে মানুষের পৃথিবী বারবার আঁকড়ে ধরতে চায় ।

(২)

তারপর কয়েকটা দিন ঐভাবেই কেটে যায় । অতুলের জানা সব গল্প শেষ হয়ে যায় আর অপুর চোখের সব আলো ক্রমশ নিভে আসে । কিন্তু তবু কোথাও যেন একটা লড়াই সে ভিতরে ভিতরে চালিয়ে যায় । বাপ-ছেলে বনাম নিয়তির এই লড়াই অবশেষে শেষ হয় যেদিন, সেদিন বিকেলে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল — সেদিন আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া — উল্টোরথ । কয়েকটা ইঞ্জেকশনে শুকনো পাতায় প্রাণ সঞ্চার হয় সেদিন । অতুলকে চমকে দিয়ে অপু বাবার পঞ্জর-সার বুকের ঘাম চিটচিটে কালো ক্ষয়াটে চামড়ার ওপর আঙুল বুলোয় । ওর ওই আঙুলের মৃদু নড়াচড়ায় অতুল আহ্লাদে আটখানা হয়ে ওঠে — কি করবে ভেবে পায় না । মাসি — ডাক্তার বাবু — শ্রীদাম বাঁড়ুজ্জে — সবাই-কে দাঁড় করিয়ে রেখে অতুলের রথ বেরোয় রাজপথে । হসপিটালের গেট ছাড়িয়ে অতুল ঠেলাগাড়ি নিয়ে প্রায় দৌড়াতে চায় । কিন্তু ঠোক্কর খায় রাস্তার লালবাতি দেখে । সার সার বাবুদের গাড়ি তার মতো ছোটোলোকের স্পর্ধাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চোখের সামনে দিয়ে অদৃশ্য হয় । সবে অতুল সবুজ বাতি দেখে পা বাড়াবে, তার লুঙ্গির কোনায় মৃদু  টান অনুভব করে । তাকিয়ে দেখে, একটা ফুটফুটে বাচ্ছা মেয়ে ।

“কী গো খুকি ?”

“আমি একটু তোমার গাড়িটা ঠেলবো ?”

শঙ্কিত অতুল তাকিয়ে দেখে এক বৃদ্ধ পাশেই দাঁড়িয়ে । তাঁর চোখে নাতনির প্রতি প্রশ্রয় । আশ্বস্ত অতুল বলে, “আচ্ছা — কিন্তু আস্তে টেনো !”

মেয়েটি একগাল হেসে বলে ওঠে, “থ্যাঙ্ক ইউ !”

অতুল কল্পনা করে, একদিন তার অপুও অমন বলবে — “থ্যাঙ্ক ইউ — ” ।

তার পরের দৃশ্যটা রোমাঞ্চকর — অতুলনীয় । অতুল-অপুর রথ মেয়েটি ঠেলতেই, আরো পাঁচটা বাচ্ছা এসে জোটে — দেখাদেখি আরো কয়েক জন । ওরা ভারী মজা পেয়েছে । গলি দিয়ে তস্য গলিতে ঢোকে তার রথ । অতুল ইতস্তত ভঙ্গিতে গলা উঁচু করে দেখে নিতে চায়, অপু নিরাপদ কিনা — সহসা সে চমকে ওঠে । যে নীরব হাত এতকাল স্তিমিত হয়ে পড়েছিল, হঠাৎ মনে হয়, শিশুদের ভিড়ের মধ্যে থেকে যেন সেই হাত উপরে ওঠে — আন্দোলিত হয় । অতুল কি ভুল দেখলো ! এও কি সম্ভব ? তার মনে হল ঊর্ধ্বে আন্দোলিত , হাত-টা যেন তাকে বলছে, “থ্যাঙ্ক ইউ বাবা !”

 

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ