31 Jul

ফাউ

লিখেছেন:ত্রিদিবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়


এক

অভিষেক সাধারনতঃ একটু বেশি রাতেই ফোন করে। অনেকক্ষণ কথা বলে ওরা। কালও কথা হয়েছে। তাই রবিবার দুপুরে খাবার সময়ে ওর ফোন পেয়ে একটু অবাকই হল শিউলি। ফোনটা নিয়ে নিজের ঘরে গেল।

-হ্যাঁ -বল। হঠাৎ এই সময়ে?

– আজ বিকেলে বালি ব্রীজের ওপর আসতে পারবে?

-কেন? হয় তুমি উত্তরপাড়ায় চলে এস, নইলে আমি বরানগর চলে আসব।আর বালি ব্রীজের ওপর কেন?

-এস না, ঠিক ব্রীজের মাঝখানে আসতে হবে।

-এ কি পাগলামি! বালি ব্রীজের মাঝখানে বাস দাঁড়ায় না জান না?

-তা জানব না কেন? আমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে একটু না হয় হাঁটলে। চলে এসো।

-আগে বল কেন -তবে আসব।

– ঠিক যখন সূর্য অস্ত যাবে তখন আমরা ওখান থেকে আমরা বেলুড় মঠ দেখব।

-বাজে কথা বোল না।তুমি বেলুড় মঠ দেখবে! তোমাকে বলে বলে বেলুড়, দক্ষিণেশ্বর নিয়ে যেতে পারিনা। আমাকে বোকা পেয়েছ!

– যাকগে, অত কথার দরকার নেই, চলে এস ঠিক সময়ে। আমি দক্ষিণেশ্বরে নেমে হেঁটে এগিয়ে যাব। তুমে বালিঘাটে নেমে একটু হেঁটে এগিয়ে আসবে।

দূর হতে দেখি   যে কেহ আসিছে

তুমি এলে আমি ভাবি।

অবশেষে এক সময় দেখা হয়ে যাবে ব্রীজের মাঝামাঝি।…।বিকেল পাঁচটা।

 

দুই

 

শিউলি দূর থেকেই দেখতে পায় অভিষেক দাঁড়িয়ে।

-বাব্বা, আজ একেবারে বিফোর টাইম! কোনদিন তো সময়ে আস না।

– আজ আমি প্রপোজ করব কিনা!

– প্রপোজ!না না, আর একটু ভাবনা চিন্তা করি। দুম করে প্রপোজ করলেই হল?

-আরে না না। প্রপোজ ‘করব’ না, আজকে এইখানে দেখা হওয়াটা আমি ‘প্রপোজ করেছি’ তো , তাই অ্যাডভানস এসেছি আর কি!

– তাই বল। তা বেলুড় মঠের কী দেখবে বলছিলে যেন?

-একটা বই পড়েছি, তোমাকে তাই নিয়ে বলব।

-ওমা! বই তো রোজ পড়ছ। বই নিয়ে কথা বলার জন্যে বালি ব্রীজের মাঝখানে এসে বেলুড় মঠ দেখা- এসব কী পাগলামি!

– বলছি বলছি, একটু ধৈর্য ধর। বইটা হচ্ছে মৃনাল সেনের অটো বায়োগ্রাফি… Always Being Born.

– তার সঙ্গে বালি ব্রীজ, বেলুড় মঠের সম্পর্ক…

– সেটাই তো বলব বলে ডেকেছি। মৃনাল সেন ও গীতা সেনের তখন প্রেম পর্ব চলছে।গীতা সেনের বাড়ি বালি, মৃনালের কলকাতা। দুজনেই গণনাট্যের কর্মী,  রোজগার পাতি বিশেষ নেই বললেই চলে। গণনাট্যের অনুষ্ঠান থাকলে সেখানে দেখা হয়। না থাকলে মৃনাল চলে আসেন বালিতে। নিরিবিলি বালি ব্রীজের ওপর রেলিং এ হেলান দিয়ে ওরা স্বপ্নের জাল বোনে।। একদিন বিকেল বেলা, সূর্য অস্ত যাচ্ছে, পশ্চিম আকাশের লাল রং বেলুড় মঠ, গঙ্গা কে রাঙিয়ে ওদের দুজনকেও রাঙিয়ে দিয়েছে। সেই অপার্থিব পরিবেশে মৃনাল গীতা কে প্রপোজ করে বসলেন, আচমকাই।প্রথমে থতমত খেলেও গীতা সম্মতি জানিয়ে অধোবদন হলেন। আনন্দে মৃণাল ডান হাতে গীতাকে কাছে টেনে নিয়ে জীবনের প্রথম চুম্বনটি করেছিলেন। মৃণাল এতই নার্ভাস হয়েছিলেন যে বাঁ হাতে ধরে থাকা একটা বই ফসকে গঙ্গায় পড়ে গিয়েছিল।……… কেমন গল্প?

– খুব সুন্দর।

– দেখ, এতো প্রায় সত্তর পঁচাত্তর বছর আগের গল্প। আজও সূর্য অস্ত যাচ্ছে, আজও আকাশ লালে লাল, আজও একই রকম ভাবে আমি তোমাকে…

-দাঁড়াও দাঁড়াও আজ থাক। আরেকদিন- একটু ভেবে নিই। সেদিন একটু ভাল পোশাকে আসব, ছোটখাট কিছু উপহার হাতে থাকবে। আর এখান থেকে কোনও রেস্টোরেন্টে  যাব।

– বাধা পড়ে গেল। ঠিক আছে তাই হবে । তবে-

– নিশ্চয়ই হবে, কেন হবে না?

– আর ফাউ টা?

শিউলি লজ্জা পায়।

– আজ নয়। যেদিন আসল সেদিন ফাউ। আজ ফাউ আর সেদিন আসল হলে দুটোরই মূল্য কমে যাবে।

– তাই সই।

 

তিন

 

-আচ্ছা, লক ডাউন কি ৪ঠা মে উঠবে? আর তো পারা যাচ্ছেনা। কতদিন দেখা হয়নি।

-সেটা কি করে বলি বলত। তবে মনে তো হয়না। কেউ কেউ বলছে মে তো বটেই জুন অবধি চলতে পারে।

– তুমি মোটর সাইকেলে আসতে পার না? কতটুকুই বা রাস্তা?

-উরেব্বাবা, লকডাউনের মধ্যে প্রেম করতে যাচ্ছি জানলে পুলিশ কান ধরে ওঠবোস করাবে।

– শোন, আমি ঠিক করে ফেলেছি। যেদিন লকডাউন উঠবে সেইদিনই আমরা বালি ব্রীজ যাব বিকেল বেলায়, তুমি যেমন বলেছিলে – সূর্যাস্তের আলোয় বেলুড় মঠ দেখব। ঠিক আছে তো?

-নিশ্চয়ই।

 

চার

 

– আজ আমরা দুজনেই তাড়াতাড়ি এসেছি। মনে হচ্ছে এক যুগ পরে …

– তাই তো হয়। বিরহের রাত অনন্ত আর মিলনের রাত ক্ষণিকের। যাকগে কী করলে বল এই দেড় মাস।

– কী আর করব!স্কুল বন্ধ কিন্তু তোমরা এতদিন খুব ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম দেখাতে। আমরাও ওয়ার্ক-ফ্রম –হোম করলাম। বাড়ি থেকে ক্লাস করলাম। মেয়েরা কী সুন্দর শিখে গেল সব।আর বসে বসে কোভিড-১৯ এর খবরাখবর, আলোচনা শুনলাম।  তবে জানলামও অনেক কিছু। কত সাধারণ জিনিষ অথচ কী ভয়ঙ্কর।

– কী জানলে আমাকে একটু বল। সারাদিন কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকিয়ে অফিসের কাজ সেরে আর  টিভির দিকে তাকাতে ইচ্ছে করতো না। অনেক বই কেনা আছে, পড়া হয়নি সেগুলো পড়ে ফেললাম। বল নতুন কী জানলে।

-না না তেমন কিছু নয়। তবে আশ্চর্য হবার মত কিছু জিনিস জেনেছি বইকি।মানুষের হাঁচি কাশি তো সাধারণ জিনিষ। কিন্তু এখন জানছি যে আমাদের একটা হাঁচিতে হাজার হাজার ড্রপলেট বা লালাকণা থাকে, তাতে ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়া পূর্ন থাকে।  হাঁচির সময় সেগুলো ঘন্টায় তিনশ কুড়ি কিমি বেগে ছোটে। আমাদের লালার একটা ড্রপলেট এ কুড়ি লক্ষ করোনা ভাইরাস থাকতে পারে। এর মধ্যে কিছু যদি সুস্থ মানুষের শ্বাসনালীতে ঢোকে কয়েকদিনের মধ্যেই তা লক্ষ লক্ষ ভাইরাসে পরিনত হয়।ভাবা যায়! আলোচনা হচ্ছিল যে করোনা ভাইরাস চলে গেলেও নাকি আমাদের জীবনকে একেবারে বদলে দিয়ে যাবে।

– সত্যিই, আজ বিটি রোডে বাসে উঠতে গিয়ে থমকে গেলাম- এই ভীড়ে উঠব? সকলের মুখেই মাস্ক,সকলেই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে । সকলেই সকলের দিকে সন্দেহের দৃস্টিতে তাকিয়ে। সত্যিই কত কিছু বদলে যাবে।

– কিন্তু গোধূলির রঙ তো বদলায়নি, সে তো বেলুড় মঠ,গঙ্গার জলের ঢেউ কে রাঙিয়ে আমাদেরও রাঙিয়ে যাচ্ছে। আমরাও দেখ করোনাকে হারিয়ে রঙিন জীবনের স্বপ্ন দেখছি।– শিউলি আকাশের দিকে তাকায়, তার মুখে গোধূলির আভা।

অভিষেক একটা গোলাপের তোড়া হাতে নিয়ে শিউলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,  ‘আমদের এক সঙ্গে থাকার অঙ্গীকার। তুমি রাজি?’ ফুলের তোড়া গ্রহণ করে শিউলি গাঢ় চোখে তাকাল। চার হাত এক। ওরা অনেকক্ষণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকল কিন্তু আর  এগোল না। অভিষেকের ‘ফাউ’ এর কথা মনে এল কিন্তু সে উচ্চারণ করতে পারল না।

ওদের হয়তো মনে হল লকডাউন উঠলেও বাতাস এখনও করোনার বিষমুক্ত নয়, অধর সুধায় আজ বিষ থাকতেও পারে। পৃথিবী আজ যেমন করমর্দন, আলিঙ্গন কে অতীত করে সৌজন্য প্রকাশের ভঙ্গী ‘জোড়হস্ত’ কে গ্রহণ করেছে তেমনি প্রেম প্রকাশে চুম্বনও কি ব্রাত্য হয়ে যাবে। হয়তো বা।

ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। কোথা থেকে যেন গান ভেসে আসছে-

আর কি কখনো কবে  এমন সন্ধ্যা হবে –  জনমের মত হায় হয়ে গেল সারা ।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ