25 Aug

দেবেশ রায়ের মুখোমুখি

লিখেছেন:অনিন্দ্য সৌরভ


[দেবেশ রায়ের জন্ম ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ ডিসেম্বর  অধুনা  বাংলাদেশের পাবনার বাগমারা গ্রামে।  তাঁকে বাংলা কথাসাহিত্যের সেই বিস্ময়কর লেখকদের একজন বলে মনে করা হয়  যিনি আখ্যানের ফর্ম বা আঙ্গিক নিয়ে  আজীবন সচেতন ভাবে ভেবেছেন। উপন্যাস বা আখ্যানরীতি নিয়ে তিনি ছিলেন একজন  গভীর অন্বেষণকারী । এখানেই তিনি স্বতন্ত্র, সমুজ্জ্বল।  মাত্র কয়েক মাস আগে ২০২০র ১৪ মে দেবেশ রায়ের জীবনাবসান হয়। তাঁর লেখালিখি নিয়ে, গল্পের  ফর্ম নিয়ে, উপন্যাসের ভাবনা নিয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লেখক ও অনুবাদক অনিন্দ্য সৌরভ। সাক্ষাৎকারটি ইতিপূর্বে ‘শিল্প সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আরও বেশী পাঠকের  কাছে  সাক্ষাৎকারটি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে লেখকের অনুমতিক্রমে তা ‘গল্পের সময়’এ তা প্রকাশ করা হল। পড়ুন সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব। পরের সংখ্যায় প্রকাশিত হবে দ্বিতীয় পর্ব।]     

অনিন্দ্যসৌরভ:  আশির দশকের গোড়া পর্যন্ত সাহিত্য-পাঠক আপনাকে একজন গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার হিসেবে চিনত, যদিও ততদিনে “মানুষ খুন করে কেন’ সহ আপনার একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। আশির দশক থেকে সাহিত্য-পাঠক আপনাকে একজন বিশিষ্ট ঔপন্যাসিক হিসেবে চেনে, যদিও এই দীর্ঘ সময়ে সংখ্যায় কিছু কম হলেও আপনি অনেক গল্প লিখেছেন। লক্ষ্য করেছি, এ সময়ের অনেক গল্পই যেন উপন্যাসের গণ্ডিকে ছুঁতে চাইছে। তাই আমরা কি ধরে নিতে পারি, এই দুই দশকে লেখক হিসেবে আপনার অবস্থানের বড় বদল  ঘটেছে?

দেবেশ রায়  :     মনে হয় আমাকে নিয়ে একটু বিভ্রান্তি আছে। আমি কবে গল্প লেখা শুরু করেছি তার সন, তারিখ প্রয়োজনীয় নয়। সর্বত্র বলেছি, আমি ধরে নিই ১৯৫৫-তে “দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘হাড়কাটা’-ই আমার প্রথম গল্প। যদিও সন তারিখের হিসেবে কথাটা ঠিক নয়। এর আগেও দু-চারটে গল্প লিখেছি, সেগুলো কাগজে বেরিয়েছে। তার কথা বলা উচিত নয় এই কারণে যে সেগুলো কোনও ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার শুরু নয়। তারপরে পঞ্চান্ন সাল থেকে নিয়মিত লিখে আসছি। তখন আমার থার্ড ইয়ার। বছরে ছ-সাতটা গল্প লিখতাম। এটা কোনও সময়েই ব্যাহত হয়নি। আমার বন্ধু দীপেনের কাছে একবার বানানো দুঃখ করেছিলাম, যে আগে ছটা গল্প লিখতাম, এখন দুটো গল্প লিখি, পুজো সংখ্যায়। শুনে ও ঠাট্টা করে বলল, ‘আগে তোর একটা গল্প দু ফর্মায় হত, এখন একটা গল্প ছ ফর্মা হয়। ফর্মার দিক থেকে ঠিখ আছিস’। সুতরাং আমার গল্প লেখার, সাহিত্য যদি সময়ের পর্ব ভাগ করতে চান, তাহলে আমি অনেক লেখাতে দেখেছি, অনেকের মুখর কথাতেও শুনেছি – এই মারাত্মক ভুলটা আছে। সঠিকভাবে বলছি, ১৯৫৫ থেকে আজ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ও অব্যাহতভাবে আমি লিখে যচ্ছি। প্রবন্ধ, রিপোর্ট, মন্তব্য, ফিচার, গল্প-উপন্যাস, অনুবাদ কোনও সময়েই আমি লেখা থেকে ছুটি নিইনি।

অনিন্দ্য :     আমার প্রশ্নটা হচ্ছে একজন গল্পকার হিসেবে আপনার যে পরিচিতি বা প্রতিষ্ঠা, পরবর্তীতে সেটা পাঠকের চোখে ততটা মনোযোগ পায়নি। মফস্বলি বৃত্তান্ত, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত ইত্যাদি লেখার পর থেকে পাঠক আপনাকে একজন ঔপন্যাসিক হিসেবে যতটা চেনে, গল্পকার হিসেবে ততটা নয়।

দেবেশ :     এর উত্তর আমি কী করে দিই? গল্প নভেলে কোনো ভাগাভাগি করে কি লেখা হয়? আবার এও বলছি, ৬১-৬২ সাল পর্যন্ত আমার সব লেখাই প্রায় সবসময় গল্পের আকারে আসত। তখন আমার মনের গড়ন বা তখনকার লেখালেখির পরিবেশ বা আমার চিন্তা উপন্যাসগত ছিল না। তত্সত্ত্বেও বলছি, এ সময় লেখা আমার দুটি প্রায় সম্পূর্ণ উপন্যাস অপ্রকশিত অবস্থায় আছে। বের করিনি। আরেকটি উপন্যাস, বোধহয়  ৫৮-৫৯  সালে লেখা, কলকাতার বাটানগর থেকে “সপ্তর্ষি’ বলে একটা কাগজ বেরুত, তাতে ছাপা হয়েছিল। উপন্যাসটির নাম ‘কালীয়দমন’। উপন্যাসটি ছাপা অবস্থায় আমি আর দেখিনি, খুঁজে পাইনি। যদি চর্চার কথা বলেন, তাহলে ১৯৫৫ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত এতগুলো উপন্যাস লিখেছি, তবে বের করিনি। এগুলো লিখেও আমার মনে হচ্ছিল উপন্যাস আমার দ্বারা হবে ন। এখন এত বছর পর মনে হয় ঐ অপ্রকাশিত গোটা-গোটা উপন্যাসগুলি ছিল বানানো। বানানো তো বটেই। কিন্তু বানানোর কোনো ছিরিছাঁদ ছিল না।

অনিন্দ্য :     পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আপনি তিনটি উপন্যাস লিখেও কার্যত প্রকাশ করেননি, তাই জনসমক্ষে আপনার পরিচিতি গল্পকার হিসেবেই ছিল। আশির দশকেই পাঠকের চোখে আপনি গল্পকার থেকে ঔপন্যাসিক হয়ে উঠলেন। এই চেঞ্জটা …

দেবেশ :     ঠিকই বলেছেন, যেহেতু আমি উপন্যাস লিখিনি অনেকদিন। বোধহয় উপন্যাস আকারে প্রথম বেরিয়েছে, ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে’ অথবা ‘যযাতি’। তখন আমি প্রধানত গল্পই লিখতাম। উপন্যাসের আকর কী হবে, উপন্যাস কীভাবে লিখব তার কোনো ধারণা তখনো আমার তৈরি হয়নি। সেই ধারণা গড়ে তুলবার জন্যই আমি প্র্যাকটিস করছিলাম কিন্তু খুব একটা উন্নতি হচ্ছিল না তো। ১৯৬২ সাল নাগাদ একটা বড় উপন্যাস ফাঁদলাম। বেশ আয়োজন করে। কাগজ কিনে, ছাঁটাই করে, গুছিয়ে ফাইলে আটকে, বেশ একটা লম্বা যাত্রা শুরু হল। সেটাই আমার উপন্যাস লেখার প্রথম সচেতন চেষ্টা। এটাই পরে “মানুষ খুন করে কেন’ নামে বেরিয়েছিল। তাও আমার ছোটবেলার বন্ধু পুষ্পেন কিছু টাকা জুগিয়েছিল। আমার তো কোনো প্রকাশক ছিল না। তার আগেরগুলো এমন কী ‘যযাতি’-কেও আমি সেই অভ্যাসের মধ্যেই ধরব। ফর্ম সম্পর্কে মৌলিক চিন্তা ছাড়া একটা ফর্মে কাজ করা যায় ন। ‘মানুষ খুন করে কেন’ দিয়েই আমি তার অভ্যাস করছিলাম। এটা অনেকবছর ধরে লেখা। অজস্র পুনর্লিখন করেছি। অনেক পরে বেরিয়েছে। সুতরাং আশির দশক পর্যন্ত গল্প লেখক, তারপর থেকে ঔপন্যাসিক এইরকম কোনো ভাগাভাগি যদি নাও থাকে, তাহলেও এটা সত্যি কথা যে উপন্যাসের আকার আয়ত্ত করতে আমার সময় লেগেছে।

অনিন্দ্য :     তাহলে ‘যযাতি’ আপনার ‘নিজস্ব’ উপন্যাস নয়?

দেবেশ :     ও-ভাষায় তো বলা যায় না।

অনিন্দ্য :     পরে আপনি গল্প লেখা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছেন।

দেবেশ :     না গল্প লেখা কমিয়ে দিইনি। আমি নিজের থেকে কমিয়েছি, নিজের থেকে বাড়িয়ে দিয়েছি – তেমন নয়। অত মোটা উপন্যাস লিখলে আর গল্প লিখবার সময় পাব কখন? সময় শুধু না, চিন্তাটাও আসত না। কমিয়ে দিইনি। বলতে পারেন, এর দু-চার বছর আগে থেকে আমি বলতে শুরু করেছিলাম যে গল্প আমাকে ছেড়ে গেছে। আর গল্প ধরতে পারছি না।

অনিন্দ্য :     ব্যাপারটা উপন্যাসের দিকেই সরে আসছে।

দেবেশ :     ওটার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। গল্প আলাদা ফর্ম।

অনিন্দ্য :     উপন্যাসের দিকে মন সরে গেছে বলেই …

দেবেশ :     তা নয়। গল্প লিখতে পারছি না বলে উপন্যাস লিখতে পারব, উপন্যাস লিখছি বলে গল্প লিখতে পারব না – এরকম নয়। গল্পের আকারের মধ্যে স্থান বা পরিসরকে ছোট করে কুঁচকে নিতে হয়। দুটো আকারে উল্টো কাজ। গল্প লিখতে পারছি না বলে খুব কষ্ট লাগছিল। গতবছর বা তার আগের বছর থেকে প্রায় জোর করেই আবার গল্প লিখতে শুরু করেছি। গত বছর দুটো আর এ বছর দুটো গল্প লিখেছি।

অনিন্দ্য :     শহুরে জীবন নিয়েই আপনি লিখতে শুরু করেছিলেন – দীর্ঘদিন শহরই ছিল আপনার গল্প-উপন্যাসের পটভূমি। সম্ভবত ‘মফস্বলি বৃত্তান্ত’ থেকে গ্রামের গরিব মানুষের জীবন-সংগ্রাম আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে অথচ আপনি তারাশঙ্করের মতো গ্রামের নন, চিরকাল শহরেরই মানুষ। সে জলপাইগুড়ি হোক বা কলকাতা। লেখক জীবনর আদিপর্বের পর গ্রাম – জীবন কেন আপনার মনোযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে?

দেবেশ :     এরকম না-ভাবাই ভাল। শহরের কথা লিখেছি, গ্রামের কথাও লিখেছি। তারাশঙ্কর গ্রামের মানুষ ছিলেন কিন্তু তাঁকে কলকাতায় আসতে হয়েছে। ১৯৬০ থেকে ৭০ সাল আমি একেবারে রাজনীতিতে ডুবে ছিলাম, রাজবংশী সমাজের মধ্যে রাজনীতি করতে হত। প্রধানত কৃষক আন্দোলন, তাছাড়া পার্টি সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন  – নানা ভাবে। যাকে আঞ্চলিক নেতৃত্ব বলে, সেইরকম নেতা হিসেবেই আমাকে কাজ করতে হত। তারপর পার্টি ভাঙাভাঙি। সুতরাং আপনি বলতে পারেন, যখন গ্রাম জনতাম না, তখন শহর বলুন বা মফস্বল শহর বলুন, সেখানকার বাস্তবটাই আমার একমাত্র জায়গা ছিল। যখন গ্রাম জানলাম, তখন গ্রামে ঘুরতাম।

অনিন্দ্য :     তখন থেকে গ্রাম এসেছে আপনার লেখায়। ‘বেঁচে বততে থাকা’র ভূমিকায় আপনি লিখেছেন, ‘উপন্যাসটির প্রথম পরিচ্ছেদে তিনটি লেখা – বছর বাইশ আগে শারদীয় সুযোগে, ১৯৬৯-এ। ১৯৭৫-এ শেষ পরিচ্ছেদটির পরও বছর দশেক কেটে যাওয়ায় ধরে নেয়া গিয়েছিল লেখাটি শেষ হয়ে গেছে।’ আমার জিজ্ঞাসা, উপন্যাস লিখতে শুরু করার সময় সেটার সমাপ্তি কোথায় ঘটবে, আপনি কি ভেবে রাখেন ন?

দেবেশ :     ভাল প্রশ্ন করেছেন, আমার লেখা সম্পর্কে কথাটা দরকারি। ঠিকই একটু অদ্ভূত লাগে, একজন লেখক তো লেখার শুরু থেকেই জানবেন যে লেখা কোথায় শেষ হবে। গল্প-উপন্যাস লেখাকে আমি এভাবে দেখি না এবং কেন দেখিনা তার কোনও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেব না। কারণ তত্ত্বটা পরে বানিয়েছি। যুক্তি হিসেবে। তাই তেমন ব্যাখ্যা থেকে লেখা সম্পর্কে কোনও ধারণা তৈরি হয় না।  একেবারে প্রাথমিক স্তরের কথা বাদ দিচ্ছি। ৬০-৬১-৬২-র কথাও বাদ দিচ্ছি। তারপর থেকে বলছি। কিন্তু কাজ করতে করতেই হঠাৎ এক সময় বুঝে যাই – আমার লেখাতে তেমন হচ্ছে ন। সেখানে কিছু একটা শুরু হয়ে যায়। তারপর চলতে থাকে। শুরু হয়ে যায় কী? ঐ একটা কিছু। তারপর এতগুলি পর্যায় একসঙ্গে কাজ করে। গল্পের নিজস্বতা। স্পেসের, সংলাপের, ঘটনার, কল্পনার, এইসব। সবচেয়ে ভাল হচ্ছে, আমার একটা লেখার উদাহরণ। ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ হয়ে আছে’ আমি পুজোর সময় লিখেছিলাম। তখন আমার রাজনৈতিক ব্যস্ততা এত বেশি যে আমাকে বাড়ি থেকে বাইরে এক জায়গায় গি‍য়ে লিখতে হচ্ছিল। টানা লিখতে লিখতে দেখতে পাচ্ছিলাম, লেখাটা যে আয়তনের হবে বলে ভেবেছিলাম সেই আয়তন ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তাহলে কি আমি আয়তন ভেবে লিখি? কোনও কোনও সময় এরকম উদ্ভট ব্যাপার ঘটে। ধরুন, ভাবলাম যে বিশ পাতার মতো লেখা হবে। বিস্ময়কর ভাবে দেখি যে বিশ পাতা পর্যন্তই হল। কোনও কোনও সময় এরকম একটা আন্দাজি আয়তন ভেবেই লেখা শুরু করি। তারপর দেখি লেখাটা নিজের পূর্ব-নির্ধারিত আয়তন ছেড়ে এগোচ্ছে। ‘আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে’ উপন্যাসটি লিখতে লিখতে দেখলাম যে আয়তন চাড়িয়ে যাচ্ছে – আমি কোনও বাধা দিলাম ন। তার কারণ প্রথমত, আমি তখন লুকিয়ে ছিলাম, সুতরাং আমার উপর তখন কোনও বাহির চাপ ছিল না। মনটা স্থির ছিল। লেখার জন চলাচলহীন অবসর দরকার। রোজ লেখার টাইমে লিখলেও সেই অবসরের বোধটা আসে না। পুরো এলিয়ে যাওয়া যাকে বলে। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে লেখাটা পরত খুলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত এখন যে আকারে আপনারা দেখছেন – সেটাই সম্পূর্ণ আকর। আমি ওটাকে তিনটে গল্পে ভাগ করে তিনটে কাগজ পাঠিয়ে দিলাম। তিন জায়গায় একই নামে প্রকাশিত হল।

অনিন্দ্য :     তিনটি পার্ট?

দেবেশ :     তিনটি পার্ট না। প্রত্যেকটা স্বয়ংসম্পূর্ণ গল্প।

অনিন্দ্য :     তারপর সেগুলিকে একসঙ্গে বই আকারে?

দেবেশ :     এর মধ্যে কোনও চাতুরী নেই। সমস্তটই লেখা হয়েছে একবারে। লেখাটাই নিজেকে খুলেছে পরতে পরতে। আমি যখন পত্রিকাগুলোতে পাঠিয়েছি, তখন সচেতনভাবেই পাঠিয়েছি যে সেটা একটা সম্পূর্ণতার বোধ দেয় কী না। একটা গল্প – সে পড়া যায় কী না! তারজন্য হয়তো দু-এক লাইন – আরম্ভে বা শেষে বদলে দিয়েছি। কিন্তু নামটা এক রেখেছি এই করণে যে এটা একটই গল্প, তার চিহ্নটা থাক। পরে যখন বই আকারে বেরিয়েছে তখন সামান্যতম অদলবদলও করিনি। শুধু আমার মনে হয় একটা চ্যাপ্টার আলাদা করে দিয়েছি। তিনটে ছিল, সেটা বইয়ে চারটে চ্যাপ্টারে। ‘বেঁচে বততে থাকা’ কে নিয়ে যে প্রশ্নটা করলেন, আপনি কি জানেন না গল্প লিখছেন না উপন্যাস। আমি বললাম, ভাল প্রশ্ন, সেটা এই জায়গায় যে হ্যাঁ, আয়তন আগে ঠিক থাকে এবং না, আয়তন আগে ঠিক থাকে না।

অনিন্দ্য :     দু রকমই হয়। যখন যেমন।

দেবেশ :     হ্যাঁ, কিন্তু কোনও ফর্মুলা নেই। এবার বলছি। ধরুন ‘বেঁচে বততে থাকা’ নাম দিয়ে একটা গল্প লিখলাম। আবার যখন পুজোর সময় লেখার কথা হল, তখন আমি ‘বেঁচে বততে থাকা’ নাম দিয়েই আরেকটা গল্প লেখার কথা ভাবলাম। এইরকম লিখতে লিখতে দেখলাম ‘বেঁচে বততে থাকা’ নিয়ে তিন-চারটে গল্প হল। আমি শুধু এইটুকুই সংযোগ রাখলাম, গল্পের নামটা বদলালাম ন। আর বোধহয় বিজিত নাম বদলালাম না। তারপর দু’তিন বছর কেটে গেল। ঐ রকম গল্প আর লিখলাম না। দু-তিন বছর পর তেমন আর একটা গল্প লিখলাম। আবার বন্ধ। তারপর যে সালগুলো দিয়ছেন, সেখানে আসার পর অনেক বছর পেরিয়ে গেল। তখন মনে হল, আমার মন থেকে গল্পটা চলে গেছে। আমি আর গল্পটাকে ধরে রাখতে পারছি না। তাহলে বই বের করে দিলে হয়। এটা উপন্যাস না গল্প? আমার মতে নিশ্চিতভাবেই উপন্যাস। কারণ এটা থিমেটিক্যালি উপন্যাস। আর বাইরের কথাটা হচ্ছে, চরিত্রগুলো এক। একরকম কাজকর্ম করছে। একরকম ঘুরে বেড়াচ্ছে। একরকম দুঃখবেদনা পাচ্ছে – তাই একটা ধারাবাহিকতা আছে।

অনিন্দ্য :      হ্যাঁ, থিমেটিক্যাল ঐক্য আছে।

দেবেশ :     এগুলো বাইরের কথা। আসল কথা, কল্পনাটা ঔপন্যাসিক কী না। ঔপন্যাসিক কল্পনা থেকে এটা বেরিয়েছে কী না। এই যে ভাগগুলো আমরা করি – গল্প – উপন্যাস, এই ভাগাভাগিতে কথা বলার কাজ করার সুবিধে হয়। একজন লেখককে তো কতরকমই লিখতে হয়। ২০০০ শব্দের গল্প বা আলোচনা। হ্যাঁ, নানা হুকুম মেনেও লিখতে হয়। সেখানে এসব ভাগাভাগি পরিষ্কার থাকাই দরকার। লেখক অনেকসময় জ্ঞানত জানতে পারেন না, কী লিখছেন। কিন্তু, কী যে লিখছেন না, সেটা তিনি টের পেয়ে যান – জ্ঞান দিয়ে নয়, তত্ত্ব দিয়ে নয়, শুকে ছুঁয়ে টের পেয়ে যান। ধরুন রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্ট-নীড়’ গল্প। যদিও তিনি দু-একবার উপন্যাসও বলেছেন তবু অতবড় হওয়া সত্ত্বেও সেটা গল্প। “চতুরঙ্গ’ – অত ছোট হওয়া সত্ত্বেও উপন্যাস। যদিও তিনি নামকরণ থেকে শুরু করে ইঙ্গিত দিয়েছেন – চারটে আলাদা গল্প। ‘তিনসঙ্গী’ – তিনটে গল্পের মধ্যে থিমেটিক্যাল মিল থাকতে পারে। তৎসত্ত্বেও গল্প। যে যোগটা আছে সেটা একসময় লেখা – লেখক সেটুকুই ইঙ্গিত করেছেন – আর কিছু না। বিদেশী উদাহরণ অনেক দেওয়া যায়। ‘ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য সি’ – উপন্যাস। যদিও সেটা ঔপন্যাসিক কল্পনার ফসল। কল্পনা ছাড়া তো কোনো লেখা হয় না। কল্পনাকেও তো আমরা রোজ কত ভাগ করি। শীতকালে সৌন্দর্যের কল্পনা বড় বেশি কোল্ডক্রিম নির্ভর। কল্পনাকে কোঠায় ভাগ করা বরং সহজ। কোনো কোনো কল্পনা টুকরো, যেমন মুখে বলা জোকস। কোনো কল্পনা গল্প বানায়। কোনো কল্পনা তাত্ত্বিক। কোনো কল্পনা নভেলের। এখন আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, কাকে আপনি বলবেন নভেলি কল্পনা, আর কাকে বলবেন অনভেলি কল্পনা? এটা খুব প্যাঁচের প্রশ্ন। কারণ প্রথমত ইমাজিনেশন। কোনটা ইমাজিনেশন, কোনটা ইমাজিনেশন নয়। দ্বিতীয়ত – নভেল। আপনি কোথায় ইমাজিনশনকে জায়গা দিচ্ছেন নভেলে? এরও উত্তর আমার মনে স্বচ্ছভাবে আছে। নভেলি কল্পনার বড় লক্ষ্মণ হচ্ছে একটা কোনও সমগ্রতাবোধ। সেটা কাল্পনিক। কল্পনাতেও একটা বড় সমগ্রতাবোধ আসছে কী না। সেটা ঐতিহসিক দিক থেকে হতে হবে তা নয়, জীবনের কোনও দিক থেকে একটা সমগ্রতবোধ – যেখান থেকেই তা আসুক। যে কথাটাকে ফটোগ্রাফিতে বলে প্যানোরামিক, কল্পনার মধ্যে সেই প্যানোরামা আছে কী না। ‘ওল্ড ম্যান এণ্ড দ্য সি’-তে সেই প্যানোরামা কাজ করছে। সবচেয়ে বড় কথা লোকটার বয়স, তার সারাজীবন, তার দর্শনিক চিন্তা-ভাবনা এবং সমুদ্রের বিশালতা। সমস্ত মিলে একটা প্যানোরামা হচ্ছে, উপন্যাস হচ্ছে। এখন আপনি যদি পাল্টা বলেন, তার মানে কি ছোটগল্পে প্যানোরামা থাকবে না?

অনিন্দ্য :     অবশ্যই এ প্রশ্ন উঠতে পারে।

দেবেশ :     ছোটগল্পেও আসতে পারে। যদি সম্ভাবনার কথা বলেন, কেন আসতে পারবে না। কিন্তু সব গল্পই প্যানোরামিক নয়। যেমন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসমান্য গল্প – কুশল পাহাড়ী, ওঁর বেধহয় শেষ লেখা। ততে এই প্যানোরামা আছে। বা গোর্কির ‘চেলকাস’-এর প্রথমটা। মনে মনে এরকম ভাগ করে নিয়েছি। যেজন্য এইসব ‘বেঁচে বততে থাক’কে উপন্যাস হিসেবে দেখেছি। খানিকটা ভাঙতে চেয়েছি এইসব ধারণা যে উপন্যাস মানে একটাই গল্প, ধারাবাহিকতা, ক্রমিকতা, একটা সময়ানুগত্য। এটাও স্বীকার করা ভাল, যত টুকরো হলে আমি খুশি হতাম তত টুকরো করিনি।

অনিন্দ্য :     আরও টুকরো টুকরা করলে কি অসুবিধে হত?

দেবেশ :     সাবধানতার করণে।

অনিন্দ্য :     কীসের সবধানতা। পাঠক নিতে পারবে না?

দেবেশ :     ওসব না। পারিনি মানে করতে পারতাম, করলাম না – তা নয়। ওখানে হয়তো একটা বড় চাপ থাকে, আকারটা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে শিল্পের পুরো আকারটাকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না, তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ আছে। সাহিত্যের আবার বিষয় কী? যে আকার, গড়ন নিচ্ছে, সেটাই সাহিত্য। যে আকারটা আমি দিচ্ছি, সেটার বাইরের অন্য চাপ যদি মেনে নিই, পাঠকের, তত্ত্বের, নিজের সুনামের – তা হলে গড়ন ভেঙে যায়। সেইসঙ্গে ভাবতে হয়, যে – আকারটা নেবে তার শৃঙ্খলা থাকবে তো? শৃঙ্খলা বা ব্যালান্স শিল্পের একটা প্রাথমিক শর্ত। দেখতে হবে, সামঞ্জস্য থাকছে কী না। বকিটা আপনি যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। তবে এটাকে খুব বেশি ব্যাখ্যা করা যবে না। ( এরপর পরের সংখ্যায়) 

Tags: , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ