29 Sep

মাছ বিক্রেতা

লিখেছেন:তপন রায়চৌধুরি


সংখ্যায় ওরা আট-দশ জনের বেশি হবে না। বয়স কুড়ি থেকে বাইশের মধ্যে হবে সকলের। স্থানীয় বস্তিতেই ওদের বসবাস। সারা বছর ওদের দেখতে পাওয়া যায় না। বিভিন্নরকম কাজে ওরা ব্যস্ত থাকে। কোন বহুতল বাড়িতে হয়ত রঙের কাজ চলবে দু-মাস ধরে। ওদের মধ্যে কয়েকজন হয়ত সেই কাজে ব্যস্ত থাকল কিছুদিন। দিন প্রতি কিছু টাকা জোটে। তাই দিয়ে পরিবারের ভরণপোষণ চলে। কেউ হয়ত ইলেকট্রিকের  অথবা প্লাম্বিং-এর কাজ করে। তবে কোনোটাই স্থায়ী কাজ নয়। কিছুদিন কাজ করার পর আবার হয়ত ওরা অন্যরকমের কাজে লেগে যায়।  কিছুদিন বসেও থাকে কেউ কেউ। এইভাবে চলে যায় ওদের। কিন্তু ঠিক সরস্বতী পুজোর সময় সকলকে দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের আবাসন ‘আশ্রয়’-এর ঠিক সামনে দিয়েই চলে গিয়েছে পিচের রাস্তা। রাস্তার অপর প্রান্তে একটা পুকুর, আর সেই পুকুরের পাশটাতে রয়েছে একফালি ফাঁকা জায়গা। সেখানেই ওরা পুজো করে ধূমধাম করে। ছোটখাট প্যান্ডেল হয়। সেটাও ওরা নিজেরাই করে সকলে মিলে। একেবারে শেষ মুহূর্তে। সারা বছরের মধ্যে ওই পুজোটাকে ঘিরেই ওদের যত আনন্দ। বিশেষত্ব হচ্ছে প্রত্যেক বছর ওদের প্যান্ডেলের কারুকার্য হয় ভিন্ন রকমের। বেশ একটা চমক থাকে। প্যান্ডেলের সামনে রাস্তার গা ঘেঁষে একটা মোটা কাপড় পর্দার মতন করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে প্যান্ডেলের নির্মাণকার্য প্রস্তুতির সময় পথচারীর দৃষ্টিগোচরে না আসে। পুরো থিমটা বোঝা যায় একেবারে পুজোর দিন সকালে। সেদিন সরে যায় পর্দা। লোকজন চমকে যায় ওদের ক্রিয়াকলাপ দেখে। খুশি হয়ে অনেকে টাকা দেয়। আমিও একবার একশ টাকা ওদের দিয়েছিলাম মনে পড়ে।

পুজোর চাঁদা ওদের তুলতে তো দেখিনি কখনও। ভাবি, পয়সাকড়ির ব্যাপারটা কী করে ম্যানেজ করে ওরা! ছোটো পুজো হলেও তো আজকের বাজারে একটা খরচ তো আছেই। তবে লোকমুখে শুনেছি, সারা বছর ধরে ওরা প্রত্যেকে ওদের রোজগারের টাকা থেকে একটু একটু করে জমায়, আর সেটাই নিজেদের সরস্বতী পুজোর চাঁদা হিসেবে ব্যবহার করে। সাকুল্যে এক একজনের ভাগে মোটামুটি সাতশ থেকে আটশ টাকা পড়ে। বেশি বই কম নয়।

আমার ঘরটা ‘আশ্রয়’-এর তিনতলায়। রাস্তার ধারেই। ফলে চারদিন ধরে চলা পুজো প্যান্ডেলের নির্মাণকার্য প্রস্তুতির সময় থেকে আমি দেখতে পাই আমার ঘরের জানালা দিয়েই। ওদের ঝোলানো পর্দা টপকে। একটা দৃশ্য নজরে পড়ে – একটা লম্বা ফর্সা ছিপছিপে ছেলেকে ঘিরে রয়েছে চার-পাঁচ জন,  হাত নেড়ে বোধ হয় কিছু বলছে ছেলেটি, অন্যরা শুনছে মন দিয়ে, ঘাড় নাড়ছে মাঝে মাঝে। বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করে যাচ্ছে যে-যার মতন। শুনেছি ওর নাম সুকেশ। ছেলেটি কথা প্রায় বলেই না। অন্তত গলা তো শুনিনি। সবসময় কিছু-না-কিছু ভাবছে, আর তারপর কাজ করছে নিঃশব্দে। ওরই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী প্যান্ডেলের পরিকল্পনা, আলোকসজ্জা তৈরি হয়। ঘুরে ফিরে সবার কাছে যাচ্ছে ছেলেটি, তাদের কাজ তদারকি করছে, মাঝে মাঝে নিজেও হাত লাগাচ্ছে ওদের কাজে। তারপর কখনও বা ছুটে চলে যাচ্ছে পিছনে, দূর থেকে দেখছে কেমন দাঁড়াচ্ছে সব মিলিয়ে ব্যাপারটা। আমি আমার ঘরের জানালা দিয়ে অবাক চোখে শুধু ওরই দিকে তাকিয়ে থাকি।

একবার সরস্বতী পুজোর দশদিন আগে থাকতেই প্যান্ডেলের কাজ শুরু হয়। বুঝলাম, বিশেষ কিছু একটা হতে চলেছে। প্ল্যান হচ্ছে। সুকেশ হাত নেড়ে কিছু একটা বলছে, বাকিরা শুনছে। আমরা যেতে আসতে ওদেরকে খেয়াল করছি। কয়েকঘণ্টা বাদেই বাঁশ কেটে কেটে ছোট ছোটো বাখারি তৈরি করা হল। সেই বাখারি ছড়িয়ে ছিটিয়ে মাটিতে পোঁতা হল। বাখারিগুলোর উপর বড় কাপড় বিছিয়ে দেওয়া হল। তারপর গোটা কাপড়টাতে মাটি লেপে দিয়ে তার ওপর সরষের দানা ছড়িয়ে দেওয়া হল। পুজোর দুদিন আগেই সরষে শাকে সবুজ হয়ে পাহাড় তৈরি হল। তারপর আলোকসজ্জা।

এবারই তো। পুজোর ঠিক দুদিন আগে। পাচ-ছ’ফুট লম্বা পাতলা কাঁচা বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে ত্রিভুজের দুই বাহুর আকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি ছেলে। এবার তাদের লাঠিগুলো সেই আকারে বাঁকানো হচ্ছে দেখলাম। সুকেশ মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ও বোধ হয় দুই বাহুর মধ্যবর্ত্তী কোণের সম্ভাব্য সঠিক মান নির্ধারণ করছিল। প্রথমটায় ঠিক বুঝতে পারছিলাম না, কী ঘটতে চলেছে শেষমেষ। প্যান্ডেল হল গিয়ে একটা বিরাট বই, খোলা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানের ফাঁক দিয়ে বসে গেছেন মা সরস্বতী। আর, প্যান্ডেলের সামনের দিকে গোটা গোটা করে লেখা হয়েছে বাংলা অক্ষর অ, আ, ই, ঈ ইত্যাদি। সবটাই সুকেশের মস্তিস্কপ্রসূত। একেবারে মন-প্রাণ ঢেলে কাজ করে ছেলেটা।

কোনোবার হয় না, এবারই হল, ভাবলাম  সুকেশের সঙ্গে একটু আলাপ করি। সরস্বতী পুজোর দিন সকালে হঠাৎ ওকে দেখি রাস্তায়। লোকজনের ভিড় জমছে ওর তৈরি পুজোপ্যান্ডেলের কারুকার্য দেখার জন্য। সুকেশ আনমনে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে ঠিক প্যান্ডেলের সামনে। মুখোমুখি হওয়ার মুহূর্তে বললাম, ‘তোমার সঙ্গে পরে আমি একবার কথা বলব। এখন তো কাজে ব্যস্ত তুমি।‘ সুকেশ মৃদু হেসে ঘাড় নাড়ল শুধু। মুখে কিছু বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল একভাবে।

পুজো শেষ হয়ে গেল দুদিন বাদে। ছেলের দলও যথারীতি উধাও। আমিও আর ধরতে পারলাম না সুকেশকে। আর কিছু নয়, এত প্রতিভাবান একটি ছেলে, বছরের বাকি সময়টা ও কী করে, কী ধরনের কাজ করে, সেসব নিয়ে ওর সঙ্গে একটু গল্প করতাম। সেটা আর হয়ে উঠল না এযাত্রা। আবার তো সেই পরের পুজো পর্যন্ত অপেক্ষা।

সেদিন ছিল রবিবার। ঘোষপাড়াতে যেতে হবে একজনের বাড়িতে বেলা ন’টা নাগাদ। আমাদের ‘আশ্রয়’ আবাসন থেকে বেশ খানিকটা দূরে ঘোষপাড়া। রবিবারের বাজার। বাবুরা স্বভাবতই একটু বেলা করে বাজারে যায় ওই দিনটাতে।  ঘোষপাড়ার মূল বাজারটা ছাড়িয়ে আমাকে যেতে হবে একজনের বাড়ি। ওই বাজারে ঢোকার মুখে একটা ছোটখাট বাজার বসে – কেউ সবজি নিয়ে বসে, কেউ ফল নিয়ে, আবার দু-একজন মাছের বড় হাঁড়ি বা ডেকচি নিয়ে বসে। মূল বাজারের থেকে অপেক্ষাকৃত কম দামে এইসব বিক্রেতারা তাদের পসরা বিক্রি করে ক্রেতাদের কাছে।  ঠিক করলাম, কাজ সেরে ফেরার পথে কিছু মাছ নাহয় এখান থেকে কিনে নিয়ে বাড়ি যাবো। ভাবলাম, এখন একবার অন্তত যাওয়ার পথে দেখে যাই, কী কী মাছ নিয়ে বসেছে ছেলেগুলো, দামদরই বা কেমন। দু-একজন লোকের ফাঁক দিয়ে সামান্য এগিয়ে একজন মাছবিক্রেতার সামনে গিয়ে হাজির হয়ে বলি, ‘ভাই, কী মাছ আছে গো তোমার?’ ছেলেটি একমনে মাথা নীচু করে দুহাত দিয়ে দুটো জলে ভর্তি বড় হাড়ির মধ্যে হাত ডুবিয়ে জোরে জোরে ঝাকানি দিচ্ছিল। যারা মাছ বিক্রি করে তারা সর্বদাই এটা করতে থাকে যতক্ষণ না সব মাছ বিক্রি হয়। এতে নাকি মাছ জ্যান্ত থাকে। আমি আবারও একই প্রশ্ন করলাম ছেলেটিকে। ও কোন সাড়া দিল না। আমি আবারও কিছু বলতে যাব এমন সময় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোক আমাকে বললেন, ওর গায়ে হাত দিয়ে কথা বলুন। ছেলেটি বোবা আর কালা। আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা আচ্ছা।‘ তারপর ছেলেটির গায়ে হাত দিতেই ও মুখ তুলে চাইল, আর আমার কথা আটকে গেল নিমেষে। এ যে সুকেশ! সেই নির্বাক শিল্পী! আমার ভেতরটা বিদীর্ণ হয়ে গেল।  যার নিবেদিত মন-প্রাণ শুধুমাত্র সরস্বতীর আরাধনায় ডুবে থাকে বছরের পর বছর, সে কিনা মাছ বিক্রি করে তার জীবিকা নির্বাহ করে! সে বোবা আর কালা! ছেলেটি তখন আমার দিকে তাকিয়ে আছে একভাবে। বোধ হয় চিনতে পেরেছে। মুখে এক অপরূপ নির্মল হাসি। ওর সরল নিষ্পাপ নিরপরাধ চোখের দিকে আমি  বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারলাম না।

Tags: , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ