01 Jan

‘গল্পমেলা’র বিশাল খরচ…আসলে ভূতে দেয় – গৌর বৈরাগী

লিখেছেন:সাক্ষাৎকার/গৌর বৈরাগী


[প্রতি বছর হুগলি জেলার চন্দননগরে দু দিন ধরে হয় গল্প নিয়ে উৎসব ‘গল্পমেলা’। সাহিত্য নিয়ে এমন জমজমাট আড্ডা ও আলোচনার আসর ভূ-ভারতে আর একটিও হয় না বলে দাবি আয়োজকদের।গল্প নিয়ে ফি বছরের এমন আয়োজনের বিষয়ে বিশদে জানতেই গল্পমেলার অন্যতম উদ্যোক্তা গৌর বৈরাগীর সঙ্গে কথা বলেছে ‘গল্পের সময়’ ]

গল্পের সময়  –  গল্পমেলার ভাবনা প্রথমে কীভাবে আসে। প্রথম কবে গল্পমেলা শুরু হয়?

গৌর বৈরাগী–   তখন ১৯৭৮-৭৯ সাল শাস্ত্র বিরোধী আন্দোলন চলছে। তাদের মূল হোতা ছিলেন বলরাম বসাক,শেখর বসু, রমানাথ রায় প্রমুখ। এই সময় বলরাম বসাক ‘মুক্ত গল্পসভা’ নামে একটি আসর বসান। সেখানে গল্পপাঠ হত এবং আলোচনা হত। আমি চন্দননগর থেকে সেখানে যেতাম। সেখানেই আমার প্রথম আলাপ হয় অমর মিত্র, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, ঝড়েশ্বর চট্যোপাধ্যায়, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। এরা তখন সেই গল্পপাঠের আলোচনায় আসতেন এবং গল্প পাঠ করতেন। তখন দেখতাম তাদের উপস্থিতিতে গল্পের আলোচনা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। সাধারণত তখন গল্পপাঠের আসর পশ্চিমবঙ্গের কোথাও হত না। এটা ছিল রেয়ার ব্যাপার। আমার ভেতরে ভেতরে একটা ক্ষোভ ছিল যে লেখকরা শুধু লিখেই যান – পাঠকরা পড়ছেন কি না, আর তাদের কী প্রতিক্রিয়া তা সে জানতে পারে না। অন্তত বাংলা সাহিত্যের লেখকদের জীবনে এই ফিডব্যাক ব্যাপারটা নেই। ফিডব্যাক বিভিন্ন আকারে হতে পারে। অর্থ দিয়ে হতে পারে,যশ-পুরস্কার দিয়ে ফিডব্যাক হতে পারে। কিন্তু বাংলা সাহিত্য এমন একটা জায়গা দাঁড়িয়ে আছে সেখানে ফিডব্যাকই আসে না, অর্থের তো কোনও প্রশ্নই নেই। আমার এখানে একটা ক্ষোভ ছিল। লেখক নিশ্চয়ই নিজের জন্যই লেখে, কিন্তু তারপরও একটা আকাঙ্ক্ষা থাকে পাঠকের কাছ থেকে কিছু পাওয়ার। পাঠক একটা গালাগাল দিলেও সেটা পাওনা। মুক্ত গল্পসভায় এই উদাহরণ টা দেখেছিলাম আর বুকের ভেতর ছিল ক্ষোভ। দুটো মিশে আমার মনে হল যে চন্দননগরে যদি এমন গল্পের আসর করি তাহলে কেমন হয়। সেই দিক থেকে বলতে গেলে আমাদের এখানে, আশি – একাশি সাল নাগাদ প্রথম গল্পপাঠের আসর বসে। তার নাম আমিই দিই – গল্পমেলা। ১০ জন মত মানুষ বা লেখক সেটা শুরু করে।

গল্পের সময়  –  ১৯৮০-৮১ থেকে ২০১৬ দীর্ঘ  বছর ধরে চলছে এই গল্পপাঠের আসর। আমন্ত্রন পত্রে আছে ২৮৩–২৮৪ তম অধিবেশন – এই ব্যাপারটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন।

গৌর বৈরাগী–   আমাদের সাধারণত প্রতিমাসে একটা করে গল্পপাঠের আসর করার কথা। যেমন প্রথম অধিবেশন, দ্বিতীয় আধিবেশন ইত্যাদি। আমরা চন্দননগর, চুচুড়া, শ্রীরামপুর, হরিপাল, সিঙ্গুর,বালি, উত্তরপাড়া, শ্যামনগর, বারাকপুর বিভিন্ন জায়গায় এই গল্পমেলার গল্প পাঠের আসর হয়। মাসে একটা করে হলে ৩৬ x ১২ অর্থাৎ প্রচুর গল্পপাঠের অধিবেশন হওয়ার কথা। কিন্তু সবটা নিয়ম মেনে হয় নি। লিটল ম্যাগাজিন যেমন অনিয়মিত – নিয়মিত পত্রিকা তেমনই গল্পমেলাও অনিয়মিত – নিয়মিত। কোনও বছর চারটে, কোনও বছর ছটা আবার কোনও বছর আটটা মেলা হয়। তবে বছরে একটি করে বার্ষিক মেলা অব্যশই হয়। প্রথমে একদিন হত, এখন দুদিন। তবে আশি–একাশি সাল থেকে এই গল্পপাঠ হত ঘরোয়াভাবে। আমার বড়িতে হয়েছে, অন্য অনেকের বাড়িতে হয়েছে। নব্বই এর পর থেকে তা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক চেহারা নেয়। এর মধ্যে অনেক সদস্য গল্পমেলায় এসেছেন আবার অনেক সদস্য চলেও গেছেন। সদস্যদের মধ্যে দু-একজনের নাম করতেই হয়। যেমন আশিষ ভট্টাচার্য, উনি প্রয়াত হয়েছেন। আর একজন সৌম্য দেব বসু। নাটকের মানুষ, বিখ্যাত মানুষ। আর একজন অজিত মুখোপাধ্যায়। এরা নব্বই সাল নাগাদ আসেন। মূলত তাদের উদ্যোগেই বার্ষিক গল্পমেলার সূচনা। সেই সময়েই ঠিক হয় সেরা প্রতিশ্রুতিবান গল্পকারকে আমরা গল্পমেলা পুরস্কার দেব। ৯২ সালে আমরা প্রথম গল্পমেলা পুরস্কার দেওয়া শুরু করি। সেই পুরস্কার পান স্বপ্নময় চক্রবর্তী। কোনও বিতর্ক ছাড়াই ওই নাম নির্বাচিত হয়েছিল।

গল্পের সময়  –  মূলত কারা অংশ নেন এই গল্পমেলায়? আর সারা দিনের কাজকর্মের বিভাগ কী কী?

গৌর বৈরাগী – বড় বড় সাহিত্যিকরাও এই মেলায় অংশ নেন। যেমন সম্ভবত ১৯৯২ ও ১৯৯৬ সালে এসেছিলেন প্রয়াত শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। আবুল বাশার এসেছেন। অমর মিত্র, স্বপ্নময় চক্রবর্তী , ভগীরথ মিশ্র, ঝড়েশ্বর চট্যোপাধ্যায়, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, কিন্নর রায় থেকে নলিনী বেরা-বাংলা সাহিত্যের নামকরা প্রায় সব সাহিত্যিকই এসেছেন আমাদের মেলায়। মেলাতে শ’দুয়েক মানুষ আসেন। এর মধ্যে বলা যায় প্রায় দেড়শো জনই গল্পকার।

গল্পের সময় –  গল্পমেলায়  সারা দিনের কাজকর্মের বিভাগ কী কী থাকে?

গৌর বৈরাগী–  বিভাগের মধ্যে থাকে শিশু কিশোর গল্পপাঠ, অনুগল্প পাঠ, বিতর্ক সভা, পুরস্কার প্রদান ইত্যাদি।এছাড়াও প্রতিবছর মেলার একটা মূল বিষয় থাকে। যেমন এবছর আমাদের বিষয় ছিল শতবর্ষে নরেন্দ্রনাথ মিত্র।  দ্বিতীয় দিনে থাকে মধ্যাহ্ন ভোজনের আয়োজন। সে এক দেখবার মত বিষয়। বিখ্যাত লেখক–সাহিত্যিকরা থালা হাতে খাবারের লাইনে দাড়িয়ে আছেন, একেবারে পিকনিকের পরিবেশ। সকলেই হাসিমুখে লাইনে দাড়িয়ে খাবার নিচ্ছেন। সে এক দারুণ ব্যাপার।

গল্পের সময় –  এখন আমরা প্রযুক্তি তাড়িত। আপনার কী মনে হয় এই সময়ের মানুষের হাতে গল্প পড়ার বা শোনার মত অবসর বা ইচ্ছে আছে?

গৌর বৈরাগী –  মানুষের সত্যিই সময়ের অভাব, সাহিত্য পাঠের ইচ্ছেও অনেকাংশে চলে গেছে। তবে আমার মনেহয় এটা অনেকটা সময় তাড়িত।  এটা দোষ না ত্রুটি সেটা ভেবে লাভ নেই। আমাদের ছোটবেলায় গল্প বলার একটা জনপ্রিয় মাধ্যম ছিল তরজা গান। ছিল কবি গান, রামযাত্রা, কথকতা। কথকতায় একটা সাদামাটা পোষাকের একটা লোক রামায়নের যা গল্প বলতেন তা মুগ্ধ হয়ে শোনার মত। আমি শুনছি আর আশেপাশে দেখছি ঠাকুমা–দিদিমারা হাও-হাও করে কাঁদছে। সেসব জিনিস নেই। তার জন্য কেউ হা-হুতাশ করে না। কথকতা নেই, তরজা নেই, পালা গান নেই, এমনকি যাত্রাও নেই। এটা সময়ের ব্যাপার। আজ যেমন ইন্টারনেটের যুগ। তাই আমাদের সেই ভাবে এগিয়ে যেতে হবে। এই যে ‘গল্পের সময়’ যে কাজটা করছে সেটাই করতে হবে। ইন্টারনেটকে সঙ্গী করে সাহিত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। কিন্তু সেখানে বিশাল কিছু চলবে না। মানুষের সময় কম। তাই চাই অনুগল্প। ট্রেনে চলতে চলতে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর জন্য কপালকুন্ডলা বা আরণ্যকের মত বিশাল টেক্সট নয়,ছোট সাহিত্যকর্ম তুলে দিতে হবে। ইন্টারনেট এসেছে বলে ভয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। যে গেম খেলছে তাকেও আকর্ষণ করার মত গল্প আমাদের উপহার দিতে হবে।

গল্পের সময়  –  ফি বছর গল্পমেলার এই বিপুল আয়োজনের ব্যয়ভার আপনারা সামলান কী করে?

গৌর বৈরাগী –  প্রতি বছর দুর্গোৎসবের আগে অগষ্ট মাস থেকেই আমরা মোটামুটি গল্পমেলার প্রস্তুতিতে লেগে পড়ি। পুজোর পর তৎপরতা আরও বাড়ে। এই মেলার আয়োজনে আমরা পকেট থেকে যা না দিই তার থেকে বেশি দেয় সাহিত্যপ্রেমী লোকজন। যারা যোগ দিতে আসেন তারা নিজেরাই ডোনেশন দেয়। আমাদের না চাওয়াতেই কেউ পাঁচশো, কেউ দুশো, কেউ একশো টাকা ডোনেশন দেয়। এই বিশাল আয়োজনে আমাদের প্রায় ৭০০০০ টাকার মতো খরচা হয়। সেই খরচটা আসলে ভূতে দেয়। মানুষের রূপধারী ভূত। না হলে এই খরচা তোলা সম্ভব নয়। তবে শুধু খরচ নয়, এত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, আয়োজন করতে আমাদের জনাদশেক লোককে একেবারে ছুটে বেড়াতে হয়। আমাদের একজন মার্কিন প্রবাসী বন্ধু আছেন। তিনি অর্থ সাহায্য করেন। একজন লিটল ম্যাগাজিনের মানুষ আছেন, তিনি গল্প লেখেন –  গল্পমেলার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করে দিলেন। একজন বললেন আমি টাকা দেব, কিন্তু কাউকে বলা যাবে না। অর্থাৎ গল্পমেলার আয়োজনের মধ্যেই সুন্দর একটা গল্প প্রবাহমান।

গল্পের সময়  –  আপনি নিজে একজন গল্পকার। একজন কন্ঠশিল্পী, অভিনয় শিল্পী বা খেলোয়াড়ের থেকে সমাজে গল্পকারের অবদান মোটে কম নয়। তবু সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মিডিয়ার কাছেও একজন লেখক ব্রাত্য। এটা আপনি কেমন ভাবে দেখেন?

গৌর বৈরাগী –  সিনেমা তো দুরের কথা। একটা সিরিয়ালে একদিন বাড়ির পরিচারিকার ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেত্রীটির জন্য চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর উদ্বোধনে যে উন্মাদনা দেখা যায় , একজন  গল্পকার তা চায়ও না আশাও করে না। গল্পকার বা সাহিত্যিক এই তাৎক্ষনিকতায় বিশ্বাস করে না। সাহিত্যিক নীরবে কাজ করেন। যদি তিনি ঠিকমত কাজ করতে পারেন তা হলে   ভবিষ্যত তার মূল্য দেবে। এই উন্মাদনা মানুষ ভুলে যাবে। তবে মিডিয়া সচেতন ভাবে হৈ-হুল্লোর, বিনোদনকে সমাজে চাড়িয়ে দেয়। পণ্যায়নকে ছড়িয়ে দেয়।  সাহিত্য, সর্বদা সৎ ও সত্যের পক্ষে থেকেছে। পৃথিবীতে বারংবার লোভ–হিংসা -শঠতার কাছে মাথা নোয়ানো মানুষকে সত্যের আলো দেখিয়েছে কে? সে হল সাহিত্য। ফলে সাহিত্যিকের কাজ অনেক কঠিন,অনেক দায়িত্বেরও।

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ