05 Feb

আমার বইমেলা

 

 

শীতের শেষ আর বসন্তের আগমনের এই সময়টা বেশ অন্যরকম। আমরা যারা নতুন বইয়ের দু-মলাট হাতে ধরে গন্ধ শুঁকতে ভালবাসি,কোনও চেনা গল্পকারের বা নবীন কবির সদ্য প্রকাশিত বইটির অন্দরে না উঁকি মারা অবধি শান্তি পাই না, তাদের জন্য এই সময়েই হাজির হয় হাজারো বইমেলা। কলকাতা বইমেলা চলে জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম পর্যন্ত। ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় একুশে বইমেলা। ‘বইমেলা’ নিয়ে  ভাল লাগা,খারাপ লাগা,আকুতি,অনুভব আমাদের শুনিয়েছেন  নানা ক্ষেত্রের বিখ্যাতরা ও ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের কথা শুনলেন সাংবাদিক মিতালি মিত্র। 

 

প্রফুল্ল রায়/সাহিত্যিক 

বই আর বইমেলা ভাল লাগে। লেখাই তো আমার নেশা এবং জীবিকা। যবে থেকে বইমেলা হচ্ছে আমি যাই। অন্য বইমেলাতেও আমন্ত্রণ পেলে যাই। শরীর অশক্ত, বয়স হয়েছে- তাই বেশি ঘোরাফেরা করতে পারি না। এত বছর ধরে লিখছি , কত স্মৃতি। এই সব নিয়েই আছি। আমার সঙ্গে একদিন যারা বইমেলায় পা মেলাতেন তাদের অনেকেই আজ চলে গেছেন। তাদের জন্য মন কেমন করে বইমেলা গেলে। তেমনই ঠিক, অনেক নতুন নতুন লেখকের সঙ্গে পাঠকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়। এদের অনেকেই যখন আমাকে ঘিরে ধরে তখন খুব ভাল লাগে। নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ এনে দেয় বইমেলা। তাই যতদিন বাঁচব বইমেলা আমাকে যেতেই হবে। না গিয়ে পারব না।

 

 

 

বুদ্ধদেব গুহ/সাহিত্যিক

বইমেলায় যাই তো নিশ্চয়ই। এখন ভীর হয় খুব বেশী। চারিদিকে বড্ড আওয়াজ, হট্টগোল। ভাল করে কারও সঙ্গে কথা বলতে পারি না। তবু নতুন মানুষ, নতুন বই, অনেক চরিত্র ভাল লাগে। এখন তো অনেকেই অনলাইনে বই কেনেন। তাই বইমেলায় বই কেনাবেচা কতটা হয় জানি না। তবে অনেক দোকান হয়। বই ছাড়া অন্য জিনিসও থাকে। অনেক প্রকাশক পাঠকের সঙ্গে মুখোমুখি বসার ব্যবস্থা করেন, সেটাও কাজের হয়। আবার বইমেলায় ঢুকতেই যখন কেউ এসে আমার লেখা নিয়ে কথা বলেন তখন সেটাও খুব ভাল লাগে।    

 

 

 

কণা বসু মিশ্র /সাহিত্যিক 

বইমেলা আমার কাছে একটি অতি প্রিয় জায়গা। সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি কলকাতার এই বইমেলার জন্য। দেশে,বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় বইমেলা দেখেছি কিন্তু কলকাতার বইমেলা আমার  কাছে মুক্তির জায়গা। মেলায় গেলে অন্য লেখকদের সঙ্গে দেখা হয়, নতুনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। খাওয়া-দাওয়া, ছবি আঁকা, কবিতা নিয়ে চেঁচামেচি, আড্ডা,প্রেম সব মিলিয়ে আমার  বইমেলা বেশ লাগে। অন্য সব পার্বণ সে ভাবে টানে না যতটা টানে এই বই পার্বণ। লেখক-কবি-সাহিত্যিক প্রকাশক-পাঠকদের এই মিলন মেলার শেষের দিনটা খুবই বেদনার।

 

 

 

 

 

কিন্নর রায় /সাহিত্যিক

বইমেলার জন্য সারা বছর অপেক্ষা  করি। সত্যি বলতে কী প্রেমেন্দ্র মিত্রর কথা অনুযায়ী এই মেলা ‘বইভোক্তা বাঙালির চতুর্দশ পার্বণ’। খালি দুঃখ একটাই পার্কস্ট্রিটের ময়দান থেকে মিলনমেলার মাঠে বইমেলা নির্বাসিত হওয়ার পর যেতে আসতে  ভয়ানক অসুবিধে বোধ করি।  বিশেষ করে ঘরে  ফেরার বাস পাওয়া যায় না। তবু বলব নতুন করে খানিকটা কর্পোরেট লুক হওয়া সত্ত্বেও কলকাতা পুস্তকমেলা বাঙালির ও বাংলার গৌরব। একটা ছোট্ট দাবি , বইমেলায় ঢোকার নূন্যতম প্রবেশমূল্য দরকার। নইলে বাজে ভিড় বাড়ে।

 

 

সত্যম রায়চৌধুরী / লেখক ও শিল্পপতি

ময়দানে যখন বইমেলা হত, সেকথা ভাবলে এখনও মন কেমন করে। নস্টালজিক হয়ে পড়ি। সেই পুকুরপাড়ে আড্ডা, সুনীলদার মত লেখকের পাশে গিয়ে বসে থাকা, প্রিয় লেখকের সঙ্গে ছবি তোলা, হয়ত দু-একটা কথা হত, তাতেই বুক ভরে যেত। ময়দানের সেই বইমেলায় পুকুর পাড়ের আড্ডার কথা ভোলার নয়, তখন তো মোবাইল ছিল না, গেট খোলার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সব হাজির হয়ে যেতাম, বই দেখতাম, নতুন বইয়ের গন্ধ, পুরনো রেয়ার বই খুঁজে পেলে তো বিশ্বজয় করা হয়ে যেত…। তারপর পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা চলত, একই ঠোঙা থেকে মুড়ি-বাদাম খাওয়া চলত, জমে উঠত আড্ডা….মাইকে ভেসে আসত রবীন্দ্রসঙ্গীত। তখন বইমেলায় একটাই মাইক বাজত, তো সেই গানের সুরে গলা মেলাতাম আমরাও। ময়দানের সেই মেলায়, ছোট ছোট দল করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতেন অনেকেই, তারাও গান গাইতেন, কবিতা পড়তেন, মাইক-টাইক থাকত না বলে কারও কোনও অসুবিধে হত না। মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠান হত, নতুন নতুন বই প্রকাশ করা হত, কত নতুন শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হত, সেই বন্ধুত্ব আজও আছে। সেই বইমেলা আমার আবেগ।

এখনও বইমেলায় যাই, তবে আগের মত ভাললাগার অনুভূতিটা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বইমেলায় এখন বড় কোলাহল। শুধু বই নয়, খাবারদাবার, জামাকাপড়, গয়নাগাটি সবই এখন পাওয়া যাচ্ছে বইমেলায়। আর মাইকের কথা আর কী বলব, তারস্বরে বিরামহীন মাইক বেজে চলেছে। তাতে গান, কবিতা, ঘোষণা কী নেই। কথাটা হচ্ছে, এসব আমার ভাল লাগে না। বইমেলা অনেক দেখেছি-দেশে বিদেশে, কিন্তু এমন কোথাও হয় না। বইমেলায় লেখক-পাঠক-প্রকাশক মুখোমুখি হবেন, নিজ নিজ আগ্রহের বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, সেই পরিবেশটাই হারিয়ে যাচ্ছে, এখন কেবল হট্টগোল বেশি। হয়ত সেই কারণেই আগের মত কবি-লেখকদের এখন আর বইমেলায় ঘুরতে দেখি না। স্টল যত বাড়ছে, বিজ্ঞাপন বাড়ছে- এত প্রচার, এত কোলাহল । না আমি বইমেলায় যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছি।

 

 

স্বাগতা বসু/অভিনেত্রী

কলকাতা বইমেলা মানেই জনঅরণ্য। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে গেছি। বড় হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর বরের সঙ্গে।পুঁচকে ছেলে নিয়েও গেছি বইমেলায়। এখনও সবাই যাই । বুড়ি বেলাতে লাঠির সঙ্গে বইমেলাতে যেতে চাই। কলকাতা বইমেলা হবে আমি যাব না এটা ভাবতেই পারি না। খুব ইচ্ছে করে বাংলাদেশের ২১শের মেলায় যেতে। বাংলাদেশে বহুবার গেলেও ২১শের মেলায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি। দেখি কবে পারি। কলকাতা বইমেলায় দুটি কারণে  খুব দুঃখ হয়। খাবারের স্টল বেড়ে গেছে। যত দিন যাচ্ছে দেখি মানুষ খেতেই ব্যস্ত। বইয়ের চেয়ে মানুষের যেন খাবারেই ঝোঁক বেশি। আমি  অভিনয় করি বলেই আমার খুব ইচ্ছে এমন একটা সিরিয়াল বা বই হোক যেখানে প্রেম হবে বইমেলাতেই। দুর্গাপুজো ,দোলের মত বাংলা সিরিয়ালের সেট পড়ুক বইমেলাতেও।

 

 

শুভ্রজিৎ দত্ত/অভিনেতা

ছোটবেলায় দাদাদের হাত ধরে বইমেলায় যাওয়া।তখন ক্লাস সেভেন কি এইতে পড়তাম।কোনও বইমেলা মিস করি না। কাজের চাপে প্রতিদিন যেতে না পারলেও শেষের দিন ঘণ্টাধ্বনির সময় উপস্থিত থাকতে চেষ্টা করি। নতুন আর একটা বইমেলার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয় সেদিন। বইমেলায় বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হয়,সেটা ভীষণ উপভোগ্য, বাড়তি পাওয়া। বইমেলায় নতুন নতুন বই খুঁজে বেড়াই, দেখি। যেহেতু অভিনয়ের পেশার সঙ্গে যুক্ত তাই চিনতে পারলে আগে অটোগ্রাফ নিতেন অনেকে,এখন ছুটে আসেন সেলফি তুলতে – সব মিলিয়ে বইমেলা অবশ্য গন্তব্য। তবে এখন একটা কিছু মিস করি। হয়ত ময়দানে যে আবেগ ছিল,নানা কারণে তা নেই। তবুও বইমেলা আমার প্রাণের।

 

 

 

 

ঋদ্ধি সান্যাল/ছাত্রী , আর্ন্তজাতিক সর্ম্পক বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়  

বইমেলা আমার কাছে বাত্সরিক উৎসবের  মত। বই আমার কাছে অবসর যাপনের এক অন্যতম উপকরণ। ই-বুক এর যুগে বই পড়া কমে গেছে । কিন্তু কাগজের হরফে লেখা বই পড়ার অনুভূতি- ই আলাদা । নতুন বইয়ের গন্ধ মনে এক অন্যরকম উন্মাদনার সৃষ্টি করে । তাই , বইমেলা চিরন্তন।

 

 

 

তপোব্রত সেন/ গবেষক, আই আই টি খড়গপুর

বইমেলা বরাবরই আলাদা রকম। কয়েকবছর আগেও বইমেলা যাওয়াটা একটা নেশার মতোই ছিল। মেলা শুরুর প্রথম দু-এক দিনেই একবার গিয়ে ভালো করে মেলাটা ঘুরে দেখা হত। তারপর আরও একবার বা কখনও দুবারও  যাওয়া হত শুধু বই কিনতে –  ব্যাগ ভর্তি করে। আর শুধু কি বই! বইমেলা টা বরাবরই একটা reunion spot হয়ে ওঠে – পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা হবেই কোনও না কোনও stall এ। আর তার সঙ্গে খাওয়া দাওয়া অল্প-বিস্তর তো আছেই।

এখন অবশ্য বাড়ির বাইরে থাকা হয়, তাই সেভাবে যাওয়া হয়ে উঠছে না বছর দুয়েক। তবু বইমেলা আছে মনের মধ্যে, বইমেলার ওপর টানটাও সবসময় feel করছি। বইমেলার সময়  তো শহরের all roads lead to, শুধুমাত্র, বইমেলা।

 

 

আহেন্দ্রিলা গোস্বামী/ ছাত্রী , বেথুন কলেজ

বর্তমান বাজারে বইমেলা মানে খানিকটা typical বাঙালি, intellectual ভাবের রসাস্বাদন এবং সেলফি ও খাবারের প্রাচুর্যের ছিটেফোঁটা social media-র সাদা screen-এ দেখতে পাওয়া কয়েকটা ছবি মাত্র। যারা এখনও বই ভালবাসেন,বইয়ের গন্ধে আবার করে ভালবাসাকে ঝালিয়ে নিতে বইমেলা যান তারা সত্যিই এই সময়ের বাসিন্দা নন। তবে বইয়ের নেশায় বইমেলা গেলে বুঝবেন ওইটে এমন একটা জায়গা যেখান থেকে বাড়ি ফিরে এলেও মনে হয় বাড়ি ফেরা হল না।  

Tags: , , , , , , ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ