06 Feb

গেমস অফ কমিটমেন্ট-এর গল্প

লিখেছেন:দেবাশিস সাহা


[ ‘Games of commitment’ অর্থনীতি ও গনিতশাস্ত্রে ব্যবহৃত ‘Game theory’ গুলোর application গুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৯৪ সালে মার্কিন গণিতবিদ্‌ জন ন্যাশ Game theory সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত ‘Nash Equilibrium’ concept এর জন্য নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। সম্প্রতি ২০১৬ সালে ‘কনট্র্যাক্ট থিয়োরি’ তে অসামান্য অবদানের জন্য অর্থনীতিতে যুগ্মভাবে নোবেল পান অর্থনীতিবিদ্‌ অলিভার হার্ট ও বেনট্‌ হমস্ট্রম। Game theory র প্রাসঙ্গিকতা শুধু পড়ার বইতে নয়, মানুষের জীবনের প্রতি পদে এর উপস্থিতি রয়েছে বলে মনে করা হয়। অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিকে চিনে নিতে এটি একটি অমূল্য সম্পদ।]

কথায় নয় কাজে মানুষকে বিশ্বাস করা উচিত। এই দৌড়ঝাঁপময় জীবনে নিজের জন্য সেরাটা বেছে নিতে সবাই খুব বদ্ধপরিকর এবং তা যদি অন্যকে বঞ্চিত করে হয় তাতেও ক্ষতি নেই। তাই আবেগ নয়, মানুষকে যাচাই করা শিখতে হয় বুদ্ধি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে। নইলে কে যে কখন তার অন্তরের গভীরতম বাসনা পরিপূর্ণ করতে গিয়ে আপনার সাথে পথ চলতে চলতে আপনাকেই মেরে ফেলে দেবে না; এ ব্যাপারে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। বেশী ভারী কথা না বলে বরং একটা গল্প বলি। কে বলতে পারে গল্পটা শোনার পর আপনি হয়তো- যে আপনার অজান্তে আপনাকেই ল্যাং মারতে আসছে; তার থেকে এক পা এগিয়ে গেলেন।

কারও অন্তরের বাসনা গুলোকে যদি Quantify ( পরিমান নির্ণয় করা) করা যেত আর তার মনকে পড়ে নিয়ে সেই ব্যাক্তির Preference Pattern ( নিজ পছন্দের ধরণ) গুলো সম্বন্ধে যদি ধারনা করা যেত, তাহলে এ দুনিয়ায় কেউ কাউকে ঠকাতে পারত না হয়তো। চলুন শুরুতেই আমরা এই দুটি অবাস্তব বিষয়কে assume      ( ধরে নেওয়া) করে নিই।

ব্যাঙ আর বিছে নিয়ে একটা উপকথা আছে শুনেছেন তো ! যদি না শুনে থাকেন তো আমি আবার শোনাচ্ছি। তবে একটু অন্যরকম ভাবে; তাদের উপযোগিতা গুলোকে খানিকটা Quantify করার চেষ্টা করে।

একটি নদীর তীরে একটি ব্যাঙ ও একটি বিছে দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনেরই নদীটা পার করা দরকার। এমন সময় বিছে বলে উঠল “ আমি জানি নদীটা কীভাবে পার করতে হবে”। ব্যাঙ আসলে নদীটা পার করার পদ্ধতি জানত না। বিছের কথা শুনে ওর দিকে তাকাতেই বিছে আবার বলে উঠল “আমি তোমায় বলতে পারি যে নদী কীভাবে পার করতে হবে, যদি তুমি আমাকে তোমার পিঠে করে ওপারে পৌঁছে দাও”।

“কিন্তু যদি তুমি তোমার হুল দিয়ে আমাকে আঘাত কর তাহলে ?” ব্যাঙ প্রশ্ন করল। বিছে উত্তরে বলল – “কিন্তু কেন আমি তা করতে যাব ? তাহলে তো আমরা দুজনেই মারা যাব”। ব্যাঙ এই কথা শোনার পর বিছেকে বিশ্বাস না করে পারল না। অতএব, বিছেটি চড়ে বসল ব্যাঙের পিঠে আর ব্যাঙ নদী পার করা শুরু করল।

ব্যাঙ জানত না বিছের মনে তখন আসলে কি চলছে। অর্ধেক পথ যেতেই বিছে ব্যাঙকে হঠাৎই হুল ফুঁটিয়ে বসল। ব্যাঙ চিৎকার করে উঠল – “এ কি করলে তুমি ? এবার তো আমরা দুজনেই ডুবে মারা যাব !”

বিছে জিভ কেটে বলল – “কি করব বলো ! এটা যে আমার স্বভাব।”

 

গল্পটা এখানেই শেষ তবে এর ব্যাখ্যাটি আমরা এভাবে করতে পারি –

ধরে নিই, ব্যাঙ ও বিছে দুজনেই নদী পার করে সমান উপযোগীতা পাবে। অতএব দুজনের একে অপরকে উপকার করাটাই হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু হুল ফোটানো হল বিছের ‘স্বাভাবিক প্রবৃত্তি’। বিছের এই প্রাকৃতিক ‘স্বভাব’ তাকে কিছু অতিরিক্ত উপযোগীতা এনে দেয়। অর্থাৎ ব্যাঙের কাছে বিছের মনবাসনার যে Quantification ( রাশিকরন) টা অজানা ছিল সেটা এইরকম –

‘ হুল ফোটানোর উপযোগীতা নদীর ওপারে পৌঁছানোর চেয়ে বেশী।’

আপনি হয়তো ভাবছেন যে, উপযোগীতাকে (utility) এত Quantification ইত্যাদি করেও তো ব্যাঙের বাঁচার কোনো উপায়ই রইল না। আরে দাঁড়ান ! আগে পার্ট টু তো শুনুন।

ব্যাঙ-বিছের উপকথা যুগ – যুগান্তর ধরে প্রচলিত হয়ে এসেছে। এমন সময় আবির্ভাব হল এক বুদ্ধিমান ব্যাঙ এর। বুদ্ধিমান এইজন্য কারণ সে অপরের উপযোগীতা Quantify করা জানত। সে ঠিক করল বিছের স্বাভাবিক স্বভাবকে (যা বেশী উপযোগী) করে তুলবে ব্যয়বহুল( costly) আর ওপারে পৌঁছানো (যা কম উপযোগী)–কে করে তুলবে লাভজনক (rewarding)।

যথাসময়ে একটি বিছে এসে উপস্থিত হল। সে ব্যাঙকে নদী পার করা শেখাবে বলে আশ্বাস দিল এবং তারা নদী পেরোনো শুরু করল।

অর্ধেক এসে বিছেটি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। যেই না সে হুল ফোটাতে যাবে, অমনি সে লক্ষ্য করল তার হুলটা শক্ত করে বাঁধা। অবাক হয়ে সে ব্যাঙকে জিজ্ঞাসা করল “এ তুমি কি করেছ ? আমার হুলটা যে ছিঁড়ে যেতে বসেছে। আমি যে তোমাকে বললাম তোমায় হুল ফোটালে আমরা দুজনেই মারা যাব সেটা কি আমাকে বিশ্বাস করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না ?”

ব্যাঙ হেসে বলল – “সে বিশ্বাস তো এখনো করছি না তোমায় বন্ধু। এখন আপাতত এইটুকু বলে রাখি যে এখন তোমার উপযোগীতার Quantification সামান্য বদলে গেছে আমার দৌলতে।

“তার মানে ?” বিছে প্রশ্ন করল।

“তার মানে হল এই যে তোমার প্রাকৃতিক প্রবৃত্তি (হুল ফোটানো) অবশ্যই বেশী উপযোগী কিন্তু বেশী যন্ত্রণাদায়ক  বুঝতেই পারছ ; আর ওপারে পৌঁছানোটা তোমার কাছে অপেক্ষাকৃত কম উপযোগী হলেও বেশী লাভজনক !”

বিছে বুঝতে পারল যে তার অন্তরের প্রবৃত্তির Quantification আর ব্যঙের অজানা নেই। সে খালি বলল – “এমন চালাকি করতে পারলে আমার সাথে” ব্যাঙ একটা গর্বের হাসি হাসল আর জবাবে বলে উঠল “দেখ ভাই। আমরা কেউই নিজের নিজের বিচারে ভুল নই। তবে এটাকে চালাকি বোলো না। এটা হল গিয়ে Games of Commitment”।

বিছে বলল – “সেটা আবার কি?” ব্যাঙ বলল “বুঝলে না তো ! চল আগে ওপারে নিয়ে চল। সব বোঝাচ্ছি”।

Tags: ,

 

 

 




  • খোঁজ করুন

  • পুরানো সংখ্যা




  • আমাদের ফেসবুক পেজ

  • মতামত

    আপনার মন্তব্য লিখুন

    আপনার ইমেল গোপনীয় থাকবে।




    Notify me when new comments are added.

    যোগাযোগ


    email:galpersamay@gmail.com

    Your message has been sent. Thank you!

    গল্পের সময় পরিবার
    সমীর
    অগ্নীশ্বর
    দেবাশিস
    চিন্ময়
    পার্থ
    মিতালি
    জাগরণ
    দেবব্রত

    © 2016 গল্পের সময়। ডিজাইন করেছেন অগ্নীশ্বর। নামাঙ্কন করেছেন পার্থ